বাংলা প্রবাদ-প্রবচন – ১

অর্থ, জীবনবোধ ও স্বাভাবিক বাক্যে প্রয়োগের বৃহৎ সংকলন

ভূমিকা

বাংলা ভাষার সবচেয়ে প্রাচীন ও প্রাণবন্ত সম্পদগুলির মধ্যে প্রবাদ-প্রবচন অন্যতম। মানুষের দীর্ঘ জীবনের অভিজ্ঞতা, সুখ-দুঃখ, আশা-নিরাশা, বুদ্ধি-কৌশল, কৃষিজীবন, পারিবারিক সম্পর্ক, সামাজিক সংঘাত, অর্থনৈতিক টানাপোড়েন, নৈতিক শিক্ষা এবং মানুষের স্বভাবের সূক্ষ্ম পর্যবেক্ষণ—সব মিলিয়ে প্রবাদ গড়ে ওঠে। ফলে প্রবাদ কেবল ভাষার অলংকার নয়; প্রবাদ হল অভিজ্ঞতার সংক্ষিপ্ত দর্শন।

একটি দীর্ঘ অভিজ্ঞতা কখনও কখনও চার-পাঁচটি শব্দে ধরা পড়ে—

‘অতি লোভে তাঁতি নষ্ট।’

একটি সামাজিক সত্য—

‘এক হাতে তালি বাজে না।’

একটি মনস্তাত্ত্বিক সত্য—

‘দূরের ঢোলের শব্দ মধুর।’

একটি রাজনৈতিক সত্য—

‘যার লাঠি তার মাটি।’

একটি নৈতিক সত্য—

‘যেমন কর্ম তেমন ফল।’

এই কারণেই প্রবাদ মুখস্থ করার বিষয় নয়; প্রবাদকে বুঝতে হয়, অনুভব করতে হয় এবং যথাস্থানে প্রয়োগ করতে হয়।


অ

১. অতি লোভে তাঁতি নষ্ট

অর্থ: অতিরিক্ত লোভে শেষ পর্যন্ত নিজেরই ক্ষতি হয়।
বাক্যে প্রয়োগ: বেশি লাভের আশায় ঝুঁকিপূর্ণ ব্যবসায় টাকা ঢেলে সে সব হারাল—অতি লোভে তাঁতি নষ্ট।

২. অতি ভক্তি চোরের লক্ষণ

অর্থ: অতিরিক্ত ভক্তি বা তোষামোদের আড়ালে স্বার্থ থাকতে পারে।
বাক্যে প্রয়োগ: নতুন কর্তাকে ঘিরে তার অতিরিক্ত তোষামোদ দেখে মনে হল, অতি ভক্তি চোরের লক্ষণ।

৩. অতি চালাকের গলায় দড়ি

অর্থ: অতিরিক্ত চালাকি করতে গেলে নিজেরই বিপদ হয়।
বাক্যে প্রয়োগ: সবাইকে ফাঁকি দিতে গিয়ে শেষ পর্যন্ত নিজেই ধরা পড়ল—অতি চালাকের গলায় দড়ি।

৪. অতি দর্পে হত লঙ্কা

অর্থ: অতিরিক্ত অহংকারের পরিণতি ধ্বংস।
বাক্যে প্রয়োগ: ক্ষমতার অহংকারে মানুষের কথা অগ্রাহ্য করলে অতি দর্পে হত লঙ্কার কথাই মনে পড়ে।

৫. অল্প বিদ্যা ভয়ংকরী

অর্থ: সামান্য জ্ঞান নিয়ে অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস বিপজ্জনক।
বাক্যে প্রয়োগ: দুদিন বই পড়ে নিজেকে বিশেষজ্ঞ ভাবা অল্প বিদ্যা ভয়ংকরীর লক্ষণ।

৬. অধিক সন্ন্যাসীতে গাজন নষ্ট

অর্থ: অতিরিক্ত লোকের হস্তক্ষেপে কাজের শৃঙ্খলা নষ্ট হয়।
বাক্যে প্রয়োগ: প্রত্যেকে নিজের মত চাপিয়ে দিতে গিয়ে পরিকল্পনাটি ভেস্তে গেল—অধিক সন্ন্যাসীতে গাজন নষ্ট।

৭. অভাবে স্বভাব নষ্ট

অর্থ: দীর্ঘদিন অভাবের মধ্যে থাকলে মানুষের স্বভাব ও নৈতিকতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
বাক্যে প্রয়োগ: দীর্ঘ অনাহার তাকে এমন সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করেছিল যা স্বাভাবিক সময়ে সে কখনও নিত না—অভাবে স্বভাব নষ্ট।

৮. অতি মেঘে অনাবৃষ্টি

অর্থ: অতিরিক্ত আয়োজন বা কথাবার্তায় অনেক সময় কাজের ফল পাওয়া যায় না।
বাক্যে প্রয়োগ: সভায় এত আলোচনা হল, অথচ সিদ্ধান্ত কিছুই হল না—অতি মেঘে অনাবৃষ্টি।

৯. অন্ধ হলে কি প্রলয় বন্ধ থাকে

অর্থ: সত্য অস্বীকার করলেই বাস্তবতা বদলে যায় না।
বাক্যে প্রয়োগ: সমস্যার কথা না বললেই সমস্যা মিটবে না; অন্ধ হলে কি প্রলয় বন্ধ থাকে?

১০. আপন ভালো পাগলেও বোঝে

অর্থ: নিজের স্বার্থের বিষয় মানুষ সাধারণত বুঝতে পারে।
বাক্যে প্রয়োগ: ছেলেটি নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তার কারণ অন্যেরা না বুঝলেও আপন ভালো পাগলেও বোঝে।

১১. আপনি বাঁচলে বাপের নাম

অর্থ: বিপদের সময়ে আগে নিজের নিরাপত্তা রক্ষা করা জরুরি।
বাক্যে প্রয়োগ: আগুন লাগতেই সবাই নিরাপদ জায়গায় সরে গেল—আপনি বাঁচলে বাপের নাম।

১২. অতি দুঃখে কাতর, অতি সুখে পাগল

অর্থ: অতিরিক্ত দুঃখ বা সুখ মানুষকে স্বাভাবিক ভারসাম্য থেকে সরিয়ে দেয়।
বাক্যে প্রয়োগ: জীবনে সুখ-দুঃখ দুটিকেই সংযমের সঙ্গে গ্রহণ করতে হয়; অতি দুঃখে কাতর, অতি সুখে পাগল।


আ

১৩. আগে দর্শনধারী, পরে গুণবিচারী

অর্থ: মানুষ প্রথমে বাহ্যিক রূপ দেখে আকৃষ্ট হয়, পরে গুণ বিচার করে।
বাক্যে প্রয়োগ: শুধু পোশাক দেখে কাউকে বিচার করা উচিত নয়—আগে দর্শনধারী, পরে গুণবিচারী।

১৪. আপন পায়ে কুড়াল মারা

অর্থ: নিজের কাজেই নিজের ক্ষতি করা।
বাক্যে প্রয়োগ: রাগের মাথায় চাকরিটা ছেড়ে দিয়ে সে নিজের পায়ে কুড়াল মারল।

১৫. আঙুল ফুলে কলাগাছ

অর্থ: অল্প সময়ে অস্বাভাবিকভাবে ধনী বা প্রভাবশালী হয়ে ওঠা।
বাক্যে প্রয়োগ: কয়েক বছরের ব্যবসায় এত সম্পত্তির মালিক হয়ে গেল যে সবাই বলল, আঙুল ফুলে কলাগাছ।

১৬. আতুরে নিয়ম নাস্তি

অর্থ: অসুস্থ বা বিপন্ন অবস্থায় স্বাভাবিক নিয়মকানুন অনেক সময় শিথিল হয়।
বাক্যে প্রয়োগ: গুরুতর অসুস্থ মানুষের ক্ষেত্রে সব নিয়ম একইভাবে প্রয়োগ করা যায় না—আতুরে নিয়ম নাস্তি।

১৭. আকাশ কুসুম

অর্থ: অলীক বা অসম্ভব কল্পনা।
বাক্যে প্রয়োগ: কোনো পরিশ্রম না করে রাতারাতি ধনী হওয়ার স্বপ্ন আকাশ কুসুম ছাড়া কিছু নয়।

১৮. আকাশে তোলা

অর্থ: অতিরিক্ত প্রশংসা করা।
বাক্যে প্রয়োগ: সামান্য সাফল্যেই তাকে আকাশে তুলে দিলে তার অহংকার বাড়বে।

১৯. আসল কথা গোপন করে কিসের বাহাদুরি

অর্থ: মূল সত্য আড়াল করে বাহ্যিক প্রদর্শন অর্থহীন।
বাক্যে প্রয়োগ: সমস্যার সমাধান না করে সাজসজ্জা বাড়ানো আসল কথা গোপন করে কিসের বাহাদুরির মতো।


ই

২০. ইটের জবাব পাটকেলে

অর্থ: আক্রমণের সমান শক্তিতে পাল্টা জবাব দেওয়া।
বাক্যে প্রয়োগ: অন্যায় অপমানের জবাবে সে ইটের জবাব পাটকেলে দিয়েছে।

২১. ইচ্ছা থাকলে উপায় হয়

অর্থ: আন্তরিক ইচ্ছা থাকলে কোনো না কোনো পথ বের হয়।
বাক্যে প্রয়োগ: অর্থের অভাব সত্ত্বেও সে পড়াশোনা চালিয়ে গেছে—ইচ্ছা থাকলে উপায় হয়।

২২. ইঁদুরের গর্তে হাতি ঢোকানো

অর্থ: কোনো বিষয়ের সঙ্গে সম্পূর্ণ অসামঞ্জস্যপূর্ণ বড়ো আয়োজন করা।
বাক্যে প্রয়োগ: ছোটো অনুষ্ঠানের জন্য অযথা বিশাল আয়োজন করা ইঁদুরের গর্তে হাতি ঢোকানোর মতো।


উ

২৩. উলুবনে মুক্তো ছড়ানো

অর্থ: অনুপযুক্ত ব্যক্তির কাছে মূল্যবান জ্ঞান বা সম্পদ ব্যয় করা।
বাক্যে প্রয়োগ: যে বই পড়তেই চায় না, তাকে সাহিত্য বোঝানো উলুবনে মুক্তো ছড়ানো।

২৪. উভয় সংকট

অর্থ: দুই দিকেই বিপদ।
বাক্যে প্রয়োগ: চাকরি ছাড়লেও বিপদ, থাকলেও অপমান—অবস্থা উভয় সংকট।

২৫. ওজন বুঝে চলা

অর্থ: নিজের সামর্থ্য ও পরিস্থিতি বুঝে কাজ করা।
বাক্যে প্রয়োগ: ব্যবসায় বড়ো ঝুঁকি নেওয়ার আগে নিজের ওজন বুঝে চলা দরকার।

২৬. এক হাতে তালি বাজে না

অর্থ: কোনো বিরোধে সাধারণত উভয় পক্ষের ভূমিকা থাকে।
বাক্যে প্রয়োগ: শুধু ভাইটিকেই দোষ দিলে হবে না; এক হাতে তালি বাজে না।

২৭. এক মাঘে শীত যায় না

অর্থ: একবার বিপদ কেটে গেলেই ভবিষ্যতে আর বিপদ আসবে না—এমন নয়।
বাক্যে প্রয়োগ: একবার পরীক্ষায় ভালো করেই নিশ্চিন্ত হয়ো না; এক মাঘে শীত যায় না।

২৮. এক ঢিলে দুই পাখি

অর্থ: এক কাজের মাধ্যমে দুই উদ্দেশ্য সাধন।
বাক্যে প্রয়োগ: বাজারে গিয়ে কেনাকাটাও হল, বন্ধুর সঙ্গেও দেখা হল—এক ঢিলে দুই পাখি।

২৯. একতাই বল

অর্থ: ঐক্যের মধ্যে শক্তি।
বাক্যে প্রয়োগ: শ্রমিকেরা একজোট হওয়াতেই দাবি আদায় করতে পারল—একতাই বল।

৩০. একে রামে রক্ষা নেই, সুগ্রীব দোসর

অর্থ: এক বিপদের সঙ্গে আরেক বিপদ যুক্ত হওয়া।
বাক্যে প্রয়োগ: চাকরি হারানোর পর ঋণের চাপও এল—একে রামে রক্ষা নেই, সুগ্রীব দোসর।


ক

৩১. কষ্ট করলে কেষ্ট মেলে

অর্থ: পরিশ্রম করলে সাফল্য আসে।
বাক্যে প্রয়োগ: বছরের পর বছর অনুশীলনের পর সে সফল হয়েছে—কষ্ট করলে কেষ্ট মেলে।

৩২. কেঁচো খুঁড়তে সাপ

অর্থ: সামান্য বিষয় অনুসন্ধান করতে গিয়ে বড়ো সমস্যা বেরিয়ে আসা।
বাক্যে প্রয়োগ: পুরোনো হিসাব পরীক্ষা করতে গিয়ে বিশাল দুর্নীতি ধরা পড়ল—কেঁচো খুঁড়তে সাপ।

৩৩. কান টানলে মাথা আসে

অর্থ: কোনো বিষয়ের সঙ্গে সম্পর্কিত অন্য বিষয়ও সামনে আসে।
বাক্যে প্রয়োগ: একটি দুর্নীতির তদন্ত শুরু হতেই আরও অনেক অনিয়ম প্রকাশ পেল—কান টানলে মাথা আসে।

৩৪. কাঁটা দিয়ে কাঁটা তোলা

অর্থ: এক বিপদ বা উপায় দিয়ে অন্য বিপদ দূর করা।
বাক্যে প্রয়োগ: এক প্রতিদ্বন্দ্বীর সাহায্যে অন্য প্রতিদ্বন্দ্বীকে সরানো হল কাঁটা দিয়ে কাঁটা তোলার মতো।

৩৫. কপাল যার মন্দ, সে যায় যেথা সাগর শুকায়

অর্থ: দুর্ভাগা মানুষের সর্বত্রই বিপদ।
বাক্যে প্রয়োগ: যেখানে চাকরি পেল সেখানেই প্রতিষ্ঠান বন্ধ হল—কপাল যার মন্দ, সে যায় যেথা সাগর শুকায়।

৩৬. কাঁচায় না নোয়ালে বাঁশ পাকলে করে ঠাস

অর্থ: ছোটোবেলায় শিক্ষা না দিলে পরে সংশোধন করা কঠিন।
বাক্যে প্রয়োগ: শিশুর চরিত্র গঠনে শৈশবের শিক্ষার গুরুত্ব অপরিসীম—কাঁচায় না নোয়ালে বাঁশ পাকলে করে ঠাস।

৩৭. খ

৩৮. খাল কেটে কুমির আনা

অর্থ: নিজের হাতে বিপদ ডেকে আনা।
বাক্যে প্রয়োগ: স্বার্থের জন্য অপরিচিত লোককে অংশীদার করে সে খাল কেটে কুমির আনল।

৩৯. খালি কলসি বাজে বেশি

অর্থ: অল্প জ্ঞানীরাই অনেক সময় বেশি কথা বলে।
বাক্যে প্রয়োগ: নিজের কাজের চেয়ে নিজের গুণের কথা যে বেশি বলে, তাকে দেখে মনে হয় খালি কলসি বাজে বেশি।

৪০. খেতে বসলে ভূতের ভয়

অর্থ: প্রয়োজনের সময়ে অযথা ভয় পেয়ে পিছিয়ে যাওয়া।
বাক্যে প্রয়োগ: সুযোগ সামনে এসেও সে নানা ভয় দেখাতে শুরু করল—খেতে বসলে ভূতের ভয়।

৪১. খরার মধ্যে বৃষ্টি

অর্থ: দুর্দিনের মধ্যে হঠাৎ স্বস্তি বা আশার দেখা পাওয়া।
বাক্যে প্রয়োগ: দীর্ঘ বেকারত্বের পর চাকরির খবর তার জীবনে খরার মধ্যে বৃষ্টির মতো এল।


গ

৪২. গাছে কাঁঠাল গোঁফে তেল

অর্থ: কাজ হওয়ার আগেই ফল ভোগের প্রস্তুতি নেওয়া।
বাক্যে প্রয়োগ: চাকরি এখনও হয়নি, তার আগেই নতুন গাড়ি কেনার পরিকল্পনা—গাছে কাঁঠাল গোঁফে তেল।

৪৩. গরু মেরে জুতো দান

অর্থ: বড়ো ক্ষতি করে সামান্য উপকার করা।
বাক্যে প্রয়োগ: বেতন কমিয়ে সামান্য উৎসবভাতা দেওয়া গরু মেরে জুতো দানের মতো।

৪৪. গেঁয়ো যোগী ভিখ পায় না

অর্থ: নিজের জায়গায় যোগ্য ব্যক্তির যথাযথ মূল্যায়ন হয় না।
বাক্যে প্রয়োগ: নিজের শহরে তাঁর প্রতিভার মূল্য কেউ বুঝল না—গেঁয়ো যোগী ভিখ পায় না।

৪৫. গায়ে মানে না আপনি মোড়ল

অর্থ: যোগ্যতা না থাকলেও নিজেকে নেতা বা কর্তাব্যক্তি ভাবা।
বাক্যে প্রয়োগ: কাজ কিছুই জানে না, অথচ সবাইকে নির্দেশ দেয়—গায়ে মানে না আপনি মোড়ল।

৪৬. গোলায় ধান নেই, গোফে তেল

অর্থ: সামর্থ্য নেই, অথচ বড়ো বড়ো আয়োজন বা অহংকার।
বাক্যে প্রয়োগ: সংসারে টাকা নেই, অথচ বিলাসী জীবনের পরিকল্পনা—গোলায় ধান নেই, গোফে তেল।


ঘ

৪৭. ঘর পোড়া গরু সিঁদুরে মেঘে ভয় পায়

অর্থ: একবার বড়ো বিপদে পড়লে সামান্য আশঙ্কাতেও ভয় হয়।
বাক্যে প্রয়োগ: আগের ব্যবসায় ক্ষতির পর সামান্য ঝুঁকিতেও সে ভয় পায়—ঘর পোড়া গরু সিঁদুরে মেঘে ভয় পায়।

৪৮. ঘরের শত্রু বিভীষণ

অর্থ: আপনজনের মধ্যেই বিশ্বাসঘাতক থাকা।
বাক্যে প্রয়োগ: বাইরের শত্রুর চেয়ে দলের ভেতরের লোকই বেশি ক্ষতি করল—ঘরের শত্রু বিভীষণ।

৪৯. ঘোড়া ডিঙিয়ে ঘাস খাওয়া

অর্থ: প্রয়োজনীয় বিষয় বাদ দিয়ে অপ্রয়োজনীয় বিষয়ে মন দেওয়া।
বাক্যে প্রয়োগ: পরীক্ষার প্রস্তুতি না নিয়ে সাজসজ্জা নিয়ে ব্যস্ত থাকা ঘোড়া ডিঙিয়ে ঘাস খাওয়ার মতো।

৫০. ঘুঁটে পোড়ে গোবর হাসে

অর্থ: একজনের দুরবস্থায় অন্যজনের আনন্দ পাওয়া।
বাক্যে প্রয়োগ: বন্ধুর বিপদে সাহায্য না করে হাসাহাসি করা ঘুঁটে পোড়ে গোবর হাসের মতো নিষ্ঠুরতা।


চ

৫১. চোর পালালে বুদ্ধি বাড়ে

অর্থ: ক্ষতি হয়ে যাওয়ার পরে বুদ্ধির উদয় হওয়া।
বাক্যে প্রয়োগ: টাকা চুরি যাওয়ার পর নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা হল—চোর পালালে বুদ্ধি বাড়ে।

৫২. চোরে চোরে মাসতুতো ভাই

অর্থ: অসৎ লোকেরা নিজেদের স্বার্থে পরস্পরের সহযোগী হয়।
বাক্যে প্রয়োগ: দুই দুর্নীতিবাজের মধ্যে যতই বিরোধ থাকুক, স্বার্থের প্রশ্নে তারা একজোট—চোরে চোরে মাসতুতো ভাই।

৫৩. চোরের মায়ের বড়ো গলা

অর্থ: দোষী ব্যক্তি অনেক সময় উল্টো বেশি অভিযোগ করে।
বাক্যে প্রয়োগ: নিজের ভুল ধরা পড়তেই সে অন্যদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করতে লাগল—চোরের মায়ের বড়ো গলা।

৫৪. চাচা আপন প্রাণ বাঁচা

অর্থ: বিপদের সময়ে সবাই নিজের নিরাপত্তার কথা আগে ভাবে।
বাক্যে প্রয়োগ: বিপদ দেখা দিতেই সবাই যে যার পথে পালাল—চাচা আপন প্রাণ বাঁচা।

৫৫. চাঁদের হাট

অর্থ: সুন্দর ও আনন্দময় সমাবেশ।
বাক্যে প্রয়োগ: বহু শিল্পীর উপস্থিতিতে মেলার মাঠ যেন চাঁদের হাট হয়ে উঠেছিল।


ছ

৫৬. ছাই ফেলতে ভাঙা কুলো

অর্থ: যার কোনো মূল্য বা প্রয়োজন নেই।
বাক্যে প্রয়োগ: প্রয়োজনের সময় কেউ তাকে ডাকে না—যেন ছাই ফেলতে ভাঙা কুলো।

৫৭. ছাই চাপা আগুন

অর্থ: বাইরে শান্ত কিন্তু ভিতরে সুপ্ত ক্রোধ বা শক্তি।
বাক্যে প্রয়োগ: এতদিনের নীরবতা দেখে তাকে দুর্বল ভাবা ভুল; তার ভিতরে ছাই চাপা আগুন আছে।

৫৮. ছাগলে কি না খায়, পাগলে কি না বলে

অর্থ: নির্বোধের কথাবার্তা বা কাজের কোনো স্থিরতা নেই।
বাক্যে প্রয়োগ: তার অদ্ভুত কথার কোনো যুক্তি নেই—ছাগলে কি না খায়, পাগলে কি না বলে।


জ

৫৯. জলে কুমির ডাঙায় বাঘ

অর্থ: দুই দিকেই বিপদ।
বাক্যে প্রয়োগ: চাকরি ছাড়লেও বিপদ, থাকলেও অপমান—অবস্থা জলে কুমির ডাঙায় বাঘ।

৬০. জলে বাস করে কুমিরের সঙ্গে বিবাদ

অর্থ: যার ওপর নির্ভর করে চলতে হয়, তার সঙ্গে শত্রুতা করা বোকামি।
বাক্যে প্রয়োগ: চাকরিদাতার সঙ্গে অকারণে বিরোধ করে সে জলে বাস করে কুমিরের সঙ্গে বিবাদ করল।

৬১. যত গর্জে তত বর্ষে না

অর্থ: যে বেশি হুমকি দেয়, তার কাজ সবসময় তত বড়ো হয় না।
বাক্যে প্রয়োগ: সে প্রতিদিন বড়ো বড়ো কথা বলে, কিন্তু কাজে কিছুই করে না—যত গর্জে তত বর্ষে না।

৬২. যত দোষ নন্দ ঘোষ

অর্থ: নিজের দোষ অন্যের ওপর চাপানো।
বাক্যে প্রয়োগ: নিজের ভুলের কথা না ভেবে সবাইকে দোষ দেওয়া—যত দোষ নন্দ ঘোষ।

৬৩. জলে কুমির, ডাঙায় বাঘ

অর্থ: নিরাপদ পথের অভাব; দুই দিকেই বিপদ।
বাক্যে প্রয়োগ: ঋণ শোধ করাও কঠিন, ব্যবসা বন্ধ করাও কঠিন—জলে কুমির, ডাঙায় বাঘ।


ঝ

৬৪. ঝড়ে বক মরে, ফকিরের কেরামতি

অর্থ: অন্যের কারণে ঘটে যাওয়া ঘটনাকে নিজের কৃতিত্ব বলে দাবি করা।
বাক্যে প্রয়োগ: প্রকল্পের সাফল্য পুরো দলের হলেও নিজের কৃতিত্ব বলে বেড়ানো ঝড়ে বক মরে, ফকিরের কেরামতি।


ট

৬৫. টনক নড়া

অর্থ: হুঁশ হওয়া বা বাস্তব পরিস্থিতি উপলব্ধি করা।
বাক্যে প্রয়োগ: কয়েকজন কর্মী চাকরি ছেড়ে দেওয়ার পর কর্তৃপক্ষের টনক নড়ল।

৬৬. ঠেলায় পড়লে বাঘে গরুতে এক ঘাটে জল খায়

অর্থ: প্রবল বিপদে পরস্পরবিরোধীরাও একজোট হয়।
বাক্যে প্রয়োগ: বিপদের সময় দুই বিরোধী দলও একসঙ্গে দাঁড়াল—ঠেলায় পড়লে বাঘে গরুতে এক ঘাটে জল খায়।

৬৭. ঠেলার নাম বাবাজি

অর্থ: চাপ না দিলে অনেকেই কাজ করতে চায় না।
বাক্যে প্রয়োগ: বারবার মনে করিয়ে না দিলে সে কাজই করে না—ঠেলার নাম বাবাজি।

৬৮. ঢেঁকি স্বর্গে গেলেও ধান ভানে

অর্থ: স্বভাব সহজে বদলায় না।
বাক্যে প্রয়োগ: শহরে গিয়েও তার পুরোনো অভ্যাস গেল না—ঢেঁকি স্বর্গে গেলেও ধান ভানে।


ত

৬৯. তিলকে তাল করা

অর্থ: সামান্য ঘটনাকে অযথা বড়ো করে তোলা।
বাক্যে প্রয়োগ: ছোটো ভুল নিয়ে এত আলোচনা করে সে তিলকে তাল করেছে।

৭০. তেলে মাথায় তেল দেওয়া

অর্থ: যার যথেষ্ট আছে, তাকেই আরও দেওয়া।
বাক্যে প্রয়োগ: দরিদ্রদের বাদ দিয়ে ধনীদের আরও সুবিধা দেওয়া তেলে মাথায় তেল দেওয়া।

৭১. তাসের ঘর

অর্থ: ভঙ্গুর ভিত্তির ওপর দাঁড়ানো ব্যবস্থা।
বাক্যে প্রয়োগ: মিথ্যার ওপর গড়ে ওঠা সম্পর্ক তাসের ঘরের মতো; সামান্য আঘাতেই ভেঙে পড়ে।

৭২. তীর্থের কাক

অর্থ: অধীর আগ্রহে অপেক্ষমাণ ব্যক্তি।
বাক্যে প্রয়োগ: চিঠির উত্তরের জন্য সে তীর্থের কাকের মতো অপেক্ষা করছে।

৭৩. তিন কাল গিয়ে এক কালে ঠেকা

অর্থ: জীবনের শেষ পর্যায়ে এসে দুরবস্থায় পড়া।
বাক্যে প্রয়োগ: একসময় প্রচুর সম্পত্তির মালিক ছিলেন, এখন নিঃস্ব—তিন কাল গিয়ে এক কালে ঠেকেছে।


দ

৭৪. দাঁত থাকতে দাঁতের মর্যাদা বোঝে না

অর্থ: কোনো জিনিস থাকা অবস্থায় তার মূল্য বোঝা হয় না।
বাক্যে প্রয়োগ: সুস্থ থাকতেই শরীরের যত্ন নিতে হয়; দাঁত থাকতে দাঁতের মর্যাদা বোঝে না।

৭৫. দুধ কলা দিয়ে কালসাপ পোষা

অর্থ: শত্রুকে নিজের হাতে লালন করা।
বাক্যে প্রয়োগ: যে লোক পরে প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করল, তাকেই এতদিন প্রশ্রয় দেওয়া হয়েছিল—দুধ কলা দিয়ে কালসাপ পোষা।

৭৬. দুধের স্বাদ ঘোলে মেটানো

অর্থ: আসল জিনিস না পেয়ে বিকল্পে সন্তুষ্ট হওয়া।
বাক্যে প্রয়োগ: বিদেশে যেতে না পেরে পাহাড়ে বেড়াতে গেলাম—দুধের স্বাদ ঘোলে মেটানো।

৭৭. দূরের ঢোলের শব্দ মধুর

অর্থ: দূরের বা অজানা জিনিসকে বাস্তবের চেয়ে ভালো মনে হয়।
বাক্যে প্রয়োগ: অন্যের জীবন দেখে ঈর্ষা করার আগে নিজের বাস্তবতা বোঝা দরকার—দূরের ঢোলের শব্দ মধুর।

৭৮. ধর্মের কল বাতাসে নড়ে

অর্থ: অন্যায় বা পাপ চিরকাল গোপন থাকে না; একদিন প্রকাশ পায়।
বাক্যে প্রয়োগ: বছরের পর বছর দুর্নীতি লুকিয়ে রাখা গেলেও শেষ পর্যন্ত সব প্রকাশ পেল—ধর্মের কল বাতাসে নড়ে।

৭৯. ধর্মের ঢাক আপনি বাজে

অর্থ: সত্য বা ন্যায় শেষ পর্যন্ত নিজেই প্রকাশিত হয়।
বাক্যে প্রয়োগ: সত্যকে চেপে রাখার চেষ্টা করে লাভ নেই—ধর্মের ঢাক আপনি বাজে।


ন

৮০. নাচতে না জানলে উঠোন বাঁকা

অর্থ: নিজের অক্ষমতার জন্য অন্যকে দোষ দেওয়া।
বাক্যে প্রয়োগ: পরীক্ষায় খারাপ করে প্রশ্নপত্রকে দায়ী করা নাচতে না জানলে উঠোন বাঁকা।

৮১. নেই মামার চেয়ে কানা মামা ভালো

অর্থ: একেবারে কিছু না থাকার চেয়ে সামান্য কিছু থাকা ভালো।
বাক্যে প্রয়োগ: আপাতত কম বেতনের চাকরিটা নাও—নেই মামার চেয়ে কানা মামা ভালো।

৮২. নতুন ঝাড়ু বেশি ঝাড়ে

অর্থ: নতুন ব্যক্তি প্রথমে অতিরিক্ত উৎসাহ দেখায়।
বাক্যে প্রয়োগ: অফিসে নতুন এসেই সে সবাইকে নিয়ম শেখাতে শুরু করেছে—নতুন ঝাড়ু বেশি ঝাড়ে।

৮৩. নুন আনতে পান্তা ফুরোয়

অর্থ: চরম দারিদ্র্য; সামান্য প্রয়োজন মেটাতেও অসুবিধা।
বাক্যে প্রয়োগ: সংসারে এমন অভাব যে নুন আনতে পান্তা ফুরোয়।


প

৮৪. পাকা ধানে মই দেওয়া

অর্থ: কারও ভালো অবস্থার মধ্যে ইচ্ছাকৃতভাবে ক্ষতি করা।
বাক্যে প্রয়োগ: প্রতিদ্বন্দ্বীর ব্যবসা ভালো চলছিল দেখে মিথ্যা প্রচার করা পাকা ধানে মই দেওয়া।

৮৫. পড়েছি মোগলের হাতে, খানা খেতে হবে সাথে

অর্থ: এমন পরিস্থিতিতে পড়া যেখান থেকে সহজে বেরোনোর উপায় নেই।
বাক্যে প্রয়োগ: চুক্তিতে সই করার পর শর্তগুলো বুঝে সে বলল, পড়েছি মোগলের হাতে, খানা খেতে হবে সাথে।

৮৬. পাপের ফল ভুগতেই হয়

অর্থ: অন্যায় কাজের পরিণতি একদিন ভোগ করতেই হয়।
বাক্যে প্রয়োগ: বহুদিন অন্যায় করার পর শেষ পর্যন্ত ধরা পড়ল—পাপের ফল ভুগতেই হয়।

৮৭. পাগলে কি না বলে

অর্থ: উন্মাদ বা নির্বোধ মানুষের কথার ঠিক নেই।
বাক্যে প্রয়োগ: তার আজকের কথার সঙ্গে গতকালের কথার কোনো মিল নেই—পাগলে কি না বলে।


ব

৮৮. বিনা মেঘে বজ্রপাত

অর্থ: কোনো পূর্বাভাস ছাড়াই আকস্মিক বিপদ আসা।
বাক্যে প্রয়োগ: হঠাৎ চাকরি চলে যাওয়ার খবর তার জীবনে বিনা মেঘে বজ্রপাতের মতো এল।

৮৯. বাঁশের চেয়ে কঞ্চি দড়

অর্থ: মূল ব্যক্তির চেয়েও অধীন ব্যক্তি বেশি উদ্ধত বা ক্ষমতাবান হয়ে ওঠা।
বাক্যে প্রয়োগ: মালিকের চেয়েও তাঁর সহকারী বেশি দাপট দেখায়—বাঁশের চেয়ে কঞ্চি দড়।

৯০. বাঘে গরুতে এক ঘাটে জল খাওয়ানো

অর্থ: পরস্পরবিরোধী শক্তিকে একত্রে সামলানো।
বাক্যে প্রয়োগ: দুই চরম বিরোধী পক্ষকে আলোচনায় বসানো বাঘে গরুতে এক ঘাটে জল খাওয়ানোর মতো কঠিন।

৯১. বাঘে ছুঁলে আঠারো ঘা

অর্থ: শক্তিশালী শত্রুর আক্রমণে বড়ো ক্ষতি হওয়া।
বাক্যে প্রয়োগ: প্রভাবশালী ব্যক্তির সঙ্গে বিরোধে গিয়ে সে বুঝল—বাঘে ছুঁলে আঠারো ঘা।

৯২. বসে বসে রাজার হাল

অর্থ: পরিশ্রম না করে আরামে থাকা।
বাক্যে প্রয়োগ: সারাদিন কাজ না করে অন্যের উপার্জনে থাকা বসে বসে রাজার হাল।

৯৩. বামুন গেল ঘর, তো লাঙল তুলে ধর

অর্থ: নিজের কাজ নয় এমন কাজে অনধিকার চর্চা করা।
বাক্যে প্রয়োগ: বিষয় না জেনেই বিশেষজ্ঞের মতো মত দেওয়া বামুন গেল ঘর, তো লাঙল তুলে ধর।


ম

৯৪. মেঘ না চাইতেই জল

অর্থ: না চাইতেই প্রয়োজনীয় জিনিস পাওয়া।
বাক্যে প্রয়োগ: যখন টাকার সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন, তখনই পুরোনো বন্ধুর সাহায্য এল—মেঘ না চাইতেই জল।

৯৫. মরার উপর খাঁড়ার ঘা

অর্থ: বিপদের ওপর আরও বিপদ এসে পড়া।
বাক্যে প্রয়োগ: চাকরি হারানোর পর বাড়িও ভাড়া দিতে হল—মরার উপর খাঁড়ার ঘা।

৯৬. মোল্লার দৌড় মসজিদ পর্যন্ত

অর্থ: কারও ক্ষমতা বা সামর্থ্যের সীমা খুব সংকীর্ণ।
বাক্যে প্রয়োগ: তার পরিকল্পনা কেবল কথাতেই সীমাবদ্ধ—মোল্লার দৌড় মসজিদ পর্যন্ত।

৯৭. মুখে রাম, বগলে ছুরি

অর্থ: বাইরে বন্ধুত্ব, ভিতরে শত্রুতা।
বাক্যে প্রয়োগ: সামনে মিষ্টি কথা বলে পেছনে ক্ষতি করা লোকটি মুখে রাম, বগলে ছুরির আদর্শ উদাহরণ।

৯৮. মায়ের চেয়ে মাসির দরদ বেশি

অর্থ: অতিরিক্ত কৃত্রিম দরদ দেখানো।
বাক্যে প্রয়োগ: প্রয়োজনের সময় যে পাশে থাকে না, তার হঠাৎ এত দরদ দেখে মনে হল—মায়ের চেয়ে মাসির দরদ বেশি।


য

৯৯. যার লাঠি তার মাটি

অর্থ: শক্তিশালী ব্যক্তি ক্ষমতা ও সম্পদের ওপর আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করে।
বাক্যে প্রয়োগ: আইনের শাসন দুর্বল হলে সমাজে যার লাঠি তার মাটি নীতি প্রতিষ্ঠিত হয়।

১০০. যেমন কর্ম তেমন ফল

অর্থ: কাজ অনুযায়ী ফল পাওয়া যায়।
বাক্যে প্রয়োগ: অন্যায় করে কেউ চিরকাল পার পায় না—যেমন কর্ম তেমন ফল।

১০১. যত দোষ নন্দ ঘোষ

অর্থ: সব দোষ অন্যের ওপর চাপানো।
বাক্যে প্রয়োগ: নিজের ভুলের জন্য সবাইকে দায়ী করা যত দোষ নন্দ ঘোষ।

১০২. যে রাঁধে সে চুলও বাঁধে

অর্থ: দক্ষ ব্যক্তি একসঙ্গে বহু দায়িত্ব সামলাতে পারে।
বাক্যে প্রয়োগ: সংসার, চাকরি ও পড়াশোনা একসঙ্গে সামলিয়ে সে প্রমাণ করেছে—যে রাঁধে সে চুলও বাঁধে।

১০৩. যে সহে সে রহে

অর্থ: ধৈর্য ও সহিষ্ণুতা মানুষকে টিকিয়ে রাখে।
বাক্যে প্রয়োগ: কঠিন সময়েও ধৈর্য হারিও না—যে সহে সে রহে।

১০৪. যার বিয়ে তার খবর নেই, পাড়াপড়শির ঘুম নেই

অর্থ: যার বিষয় সে যতটা চিন্তিত নয়, অন্যেরা তার চেয়ে বেশি আগ্রহী।
বাক্যে প্রয়োগ: নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে সে শান্ত, কিন্তু আত্মীয়দের উৎকণ্ঠার শেষ নেই—যার বিয়ে তার খবর নেই, পাড়াপড়শির ঘুম নেই।


র

১০৫. রথ দেখা কলা বেচা

অর্থ: একসঙ্গে দুই উদ্দেশ্য সাধন করা।
বাক্যে প্রয়োগ: চিকিৎসাও হল, পুরোনো বন্ধুর সঙ্গেও দেখা হল—রথ দেখা কলা বেচা।

১০৬. রাঁধতে জানে না, শ্বশুরবাড়ির দোষ

অর্থ: নিজের অযোগ্যতার দায় অন্যের ওপর চাপানো।
বাক্যে প্রয়োগ: কাজ করতে না পেরে পরিবেশকে দায়ী করা রাঁধতে জানে না, শ্বশুরবাড়ির দোষ।

১০৭. রাখে হরি, মারে কে

অর্থ: ঈশ্বর রক্ষা করলে কেউ ক্ষতি করতে পারে না।
বাক্যে প্রয়োগ: ভয়াবহ দুর্ঘটনার পরও সে অক্ষত রইল—রাখে হরি, মারে কে।


ল

১০৮. লোভে পাপ, পাপে মৃত্যু

অর্থ: লোভ মানুষকে অন্যায়ের পথে নিয়ে যায় এবং তার ভয়াবহ পরিণতি হয়।
বাক্যে প্রয়োগ: সামান্য লাভের জন্য জালিয়াতি করে শেষ পর্যন্ত সব হারাল—লোভে পাপ, পাপে মৃত্যু।

১০৯. লঙ্কায় যে যায় সেই রাবণ

অর্থ: খারাপ পরিবেশে গিয়ে মানুষও তার প্রভাবে বদলে যেতে পারে।
বাক্যে প্রয়োগ: দুর্নীতিগ্রস্ত পরিবেশে গিয়ে সৎ কর্মীরাও বদলে গেল—লঙ্কায় যে যায় সেই রাবণ।

১১০. লোহার সঙ্গে লোহা ঘষলে আগুন জ্বলে

অর্থ: দুই শক্তিশালী পক্ষের সংঘাতে বড়ো উত্তেজনা তৈরি হয়।
বাক্যে প্রয়োগ: দুই পক্ষের সংঘাত ক্রমেই ভয়াবহ হয়ে উঠল—লোহার সঙ্গে লোহা ঘষলে আগুন জ্বলে।


শ

১১১. শাক দিয়ে মাছ ঢাকা

অর্থ: বড়ো দোষ বা সত্যকে ছোটো বিষয় দিয়ে আড়াল করার চেষ্টা।
বাক্যে প্রয়োগ: সামান্য অনিয়মের কথা বলে বড়ো দুর্নীতি আড়াল করা শাক দিয়ে মাছ ঢাকা।

১১২. শেয়ালের এক রা

অর্থ: একই স্বার্থে সবাই একই কথা বলা।
বাক্যে প্রয়োগ: নিজেদের সুবিধার প্রশ্নে সবাই একসঙ্গে কথা বলল—শেয়ালের এক রা।

১১৩. শাপে বর

অর্থ: আপাতদৃষ্টিতে ক্ষতিকর ঘটনা শেষ পর্যন্ত উপকারী হওয়া।
বাক্যে প্রয়োগ: চাকরিটা চলে যাওয়াই শেষ পর্যন্ত তার জন্য শাপে বর হল; পরে সে আরও ভালো কাজ পেল।

১১৪. শেয়াল পণ্ডিত

অর্থ: ধূর্ত অথচ নিজেকে খুব জ্ঞানী মনে করে এমন ব্যক্তি।
বাক্যে প্রয়োগ: সামান্য জ্ঞান নিয়ে এত পাণ্ডিত্য দেখায় যে সবাই তাকে শেয়াল পণ্ডিত বলে।


স

১১৫. সাপও মরবে, লাঠিও ভাঙবে না

অর্থ: এমন কৌশল অবলম্বন করা যাতে উদ্দেশ্যও সিদ্ধ হয়, বড়ো ক্ষতিও না হয়।
বাক্যে প্রয়োগ: দুই পক্ষের বিরোধ এমনভাবে মেটাতে হবে যাতে সাপও মরবে, লাঠিও ভাঙবে না।

১১৬. সাপের পাঁচ পা দেখা

অর্থ: অতিরিক্ত চালাকি করা বা অকারণে দূরের হিসাব কষা।
বাক্যে প্রয়োগ: সামান্য সুযোগ পেয়েই ভবিষ্যতের দশ বছরের পরিকল্পনা করা সাপের পাঁচ পা দেখার মতো।

১১৭. সোনায় সোহাগা

অর্থ: ভালো কিছুর সঙ্গে আরও ভালো কিছু যুক্ত হওয়া।
বাক্যে প্রয়োগ: ভালো ফলের সঙ্গে বৃত্তিও পেল—সোনায় সোহাগা।

১১৮. সবুরে মেওয়া ফলে

অর্থ: ধৈর্য ধরলে ভালো ফল পাওয়া যায়।
বাক্যে প্রয়োগ: তাড়াহুড়ো না করে অপেক্ষা করো; সবুরে মেওয়া ফলে।

১১৯. সাত পাঁচ ভাবা

অর্থ: নানা দিক নিয়ে অযথা বেশি চিন্তা করা।
বাক্যে প্রয়োগ: সুযোগ সামনে এসেও সে সাত পাঁচ ভেবে সিদ্ধান্ত নিতে পারল না।

১২০. সাত ঘাটের জল খাওয়া

অর্থ: বহু অভিজ্ঞতা অর্জন করা।
বাক্যে প্রয়োগ: ব্যবসার জগতে সে সাত ঘাটের জল খাওয়া মানুষ; তাকে সহজে ঠকানো যাবে না।

১২১. সৎ সঙ্গে স্বর্গবাস, অসৎ সঙ্গে সর্বনাশ

অর্থ: সঙ্গ মানুষের চরিত্র ও ভবিষ্যৎকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে।
বাক্যে প্রয়োগ: বন্ধুবাছাইয়ে সতর্ক হও; সৎ সঙ্গে স্বর্গবাস, অসৎ সঙ্গে সর্বনাশ।


হ

১২২. হাতে কড়ি নেই, অথচ বাজারে রাজা

অর্থ: সামর্থ্য না থাকলেও বড়ো বড়ো দাবি বা আকাঙ্ক্ষা করা।
বাক্যে প্রয়োগ: আয় নেই, অথচ বিলাসী জীবনের পরিকল্পনা—হাতে কড়ি নেই, অথচ বাজারে রাজা।

১২৩. হাতি পুষলে খরচ আছে

অর্থ: বড়ো কিছু অর্জনের সঙ্গে বড়ো দায়িত্ব ও ব্যয়ও থাকে।
বাক্যে প্রয়োগ: বড়ো ব্যবসা মানেই শুধু লাভ নয়; বিপুল দায়িত্বও আছে—হাতি পুষলে খরচ আছে।

১২৪. হরি ঘোষের গোয়াল

অর্থ: যেখানে কোনো শৃঙ্খলা বা গোছানো ব্যবস্থা নেই।
বাক্যে প্রয়োগ: অফিসের নথিপত্রের এমন অবস্থা যে মনে হয় হরি ঘোষের গোয়াল।

১২৫. হাতের লক্ষ্মী পায়ে ঠেলা

অর্থ: সহজে পাওয়া সুযোগ বা সম্পদ নিজের ভুলে নষ্ট করা।
বাক্যে প্রয়োগ: ভালো চাকরির সুযোগ পেয়েও অহংকারে ছেড়ে দিয়ে সে হাতের লক্ষ্মী পায়ে ঠেলেছে।


আরও নির্বাচিত প্রবাদ

১২৬. অতি বাড় বেড়ো না, ঝড়ে পড়ে যাবে

অর্থ: অতিরিক্ত অহংকার বা বাড়াবাড়ির পরিণতি খারাপ।
বাক্যে প্রয়োগ: সাফল্যে অহংকার কোরো না—অতি বাড় বেড়ো না, ঝড়ে পড়ে যাবে।

১২৭. অল্প শোকে কাতর, অধিক শোকে পাথর

অর্থ: সামান্য দুঃখ মানুষকে কাঁদায়, কিন্তু অতিরিক্ত দুঃখ মানুষকে অনুভূতিহীন করে দেয়।
বাক্যে প্রয়োগ: পরপর আঘাতে সে আর কাঁদতেও পারল না—অল্প শোকে কাতর, অধিক শোকে পাথর।

১২৮. অভাগা যেদিকে চায়, সাগর শুকিয়ে যায়

অর্থ: দুর্ভাগ্যবান মানুষের সব চেষ্টাই ব্যর্থ হয়।
বাক্যে প্রয়োগ: সে যে ব্যবসাতেই হাত দিয়েছে, সেখানেই ক্ষতি হয়েছে—অভাগা যেদিকে চায়, সাগর শুকিয়ে যায়।

১২৯. আপন চোরে না খায়, পর চোরে কী খাবে

অর্থ: নিজের লোকের ক্ষতি না হলে বাইরের লোক সহজে ক্ষতি করতে পারে না।
বাক্যে প্রয়োগ: প্রতিষ্ঠানের ভিতরের লোকেরাই যখন তথ্য পাচার করছে, তখন বাইরের লোককে দোষ দিয়ে কী লাভ—আপন চোরে না খায়, পর চোরে কী খাবে।

১৩০. অতি দানেও সর্বনাশ

অর্থ: সীমাহীন উদারতাও কখনও ক্ষতির কারণ হতে পারে।
বাক্যে প্রয়োগ: নিজের সামর্থ্য না বুঝে সবাইকে সাহায্য করতে গিয়ে সে নিজেই বিপদে পড়ল—অতি দানেও সর্বনাশ।

১৩১. যার ধন তার ধন নয়, নেপোয় মারে দই

অর্থ: সম্পদের প্রকৃত মালিক অনেক সময় তার সুফল ভোগ করতে পারে না; অন্য কেউ লাভবান হয়।
বাক্যে প্রয়োগ: বছরের পর বছর ব্যবসা গড়ে শেষ পর্যন্ত অন্যের হাতে সব চলে গেল—যার ধন তার ধন নয়, নেপোয় মারে দই।

১৩২. কানা ছেলের নাম পদ্মলোচন

অর্থ: বাস্তবতার সম্পূর্ণ বিপরীত নাম বা পরিচয় দেওয়া।
বাক্যে প্রয়োগ: যার কোনো যোগ্যতাই নেই তাকে ‘বিশেষজ্ঞ’ বলা কানা ছেলের নাম পদ্মলোচন।

১৩৩. গরিবের ঘোড়া রোগ

অর্থ: সামর্থ্যের তুলনায় অসম্ভব বড়ো আকাঙ্ক্ষা বা বিলাসিতা।
বাক্যে প্রয়োগ: সামান্য আয় করে বিলাসবহুল গাড়ি কেনার স্বপ্ন দেখা গরিবের ঘোড়া রোগ।

১৩৪. গাছেরও খায়, তলারও কুড়োয়

অর্থ: একই সঙ্গে দুই দিক থেকে লাভ নেওয়া।
বাক্যে প্রয়োগ: সে ব্যবসা থেকেও লাভ করছে, আবার মধ্যস্থতার কমিশনও নিচ্ছে—গাছেরও খায়, তলারও কুড়োয়।

১৩৫. ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানো

অর্থ: নিজের ক্ষতি করে অন্যের কাজে অতিরিক্ত ব্যস্ত হওয়া।
বাক্যে প্রয়োগ: নিজের সংসার সামলাতে না পেরে সারাদিন অন্যের সমস্যা মেটানো ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানো।

১৩৬. চোরের দশ দিন, গৃহস্থের এক দিন

অর্থ: অন্যায়কারী কিছুদিন সুবিধা পেলেও শেষ পর্যন্ত ধরা পড়ে।
বাক্যে প্রয়োগ: বহুদিন জালিয়াতি করেও সে শেষ পর্যন্ত ধরা পড়ল—চোরের দশ দিন, গৃহস্থের এক দিন।

১৩৭. চোরে না শোনে ধর্মের কাহিনি

অর্থ: স্বার্থান্ধ বা অপরাধী ব্যক্তি নীতির কথা শুনতে চায় না।
বাক্যে প্রয়োগ: যতই বোঝানো হোক, ঘুষখোর লোকটি শুনল না—চোরে না শোনে ধর্মের কাহিনি।

১৩৮. জলে কুমিরের ভয়, ডাঙায় বাঘের ভয়

অর্থ: সব পথেই বিপদ।
বাক্যে প্রয়োগ: ঋণ শোধ করাও কঠিন, ব্যবসা বন্ধ করাও কঠিন—জলে কুমিরের ভয়, ডাঙায় বাঘের ভয়।

১৩৯. ঠাকুর ঘরে কে, আমি কলা খাই

অর্থ: অন্যের দায়িত্ব বা কর্তব্যের সুযোগ নিয়ে নিজের স্বার্থসিদ্ধি করা।
বাক্যে প্রয়োগ: অফিসের নিয়মের ফাঁক গলে নিজের সুবিধা নেওয়া যেন ঠাকুর ঘরে কে, আমি কলা খাই।

১৪০. ডুবন্ত মানুষ খড়কুটো আঁকড়ে ধরে

অর্থ: বিপন্ন মানুষ সামান্য আশাকেও অবলম্বন করে।
বাক্যে প্রয়োগ: শেষ আশাটুকুও সে ছাড়েনি; ডুবন্ত মানুষ খড়কুটো আঁকড়ে ধরে।

১৪১. ঢেঁকি গিলেছে

অর্থ: অসম্ভব বড়ো দায়িত্ব বা বোঝা গ্রহণ করা।
বাক্যে প্রয়োগ: এত বড়ো প্রকল্পের দায়িত্ব নিয়ে সে যেন ঢেঁকি গিলেছে।

১৪২. তেলা মাথায় তেল দেওয়া

অর্থ: যার যথেষ্ট আছে, তাকেই আরও সুবিধা দেওয়া।
বাক্যে প্রয়োগ: দরিদ্রের কথা না ভেবে ধনীদের আরও সুবিধা দেওয়া তেলা মাথায় তেল দেওয়া।

১৪৩. দুষ্ট গরুর চেয়ে শূন্য গোয়াল ভালো

অর্থ: ক্ষতিকর ব্যক্তি থাকার চেয়ে একেবারেই না থাকা ভালো।
বাক্যে প্রয়োগ: অসৎ কর্মীর চেয়ে শূন্য পদ ভালো—দুষ্ট গরুর চেয়ে শূন্য গোয়াল ভালো।

১৪৪. দুধের মাছি

অর্থ: প্রয়োজন ফুরোলেই যাকে সহজে দূরে সরিয়ে দেওয়া হয়।
বাক্যে প্রয়োগ: কাজ শেষ হতেই পুরোনো সহযোগীকে দূরে সরিয়ে দিল—দুধের মাছির মতো।

১৪৫. নুনের ছিটে ক্ষতে

অর্থ: দুঃখের ওপর আরও কষ্ট দেওয়া।
বাক্যে প্রয়োগ: চাকরি হারানোর পর বন্ধুর বিদ্রূপ যেন নুনের ছিটে ক্ষতে।

১৪৬. নিজের নাক কেটে পরের যাত্রা ভঙ্গ

অর্থ: অন্যের ক্ষতি করতে গিয়ে নিজেরই বেশি ক্ষতি করা।
বাক্যে প্রয়োগ: প্রতিদ্বন্দ্বীর ব্যবসা বন্ধ করতে গিয়ে নিজের ব্যবসাও হারাল—নিজের নাক কেটে পরের যাত্রা ভঙ্গ।

১৪৭. পিঁপড়ের পাখা ওঠে মরিবার তরে

অর্থ: অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস বা অহংকার অনেক সময় পতনের পূর্বলক্ষণ।
বাক্যে প্রয়োগ: সাফল্য পেয়ে তার অহংকার এমন বেড়েছে যে মনে হয় পিঁপড়ের পাখা ওঠে মরিবার তরে।

১৪৮. পাকা খেলোয়াড়ের চাল বোঝা কঠিন

অর্থ: অভিজ্ঞ মানুষের কৌশল সহজে বোঝা যায় না।
বাক্যে প্রয়োগ: ব্যবসায়ীর পরবর্তী পদক্ষেপ কেউ বুঝতে পারল না—পাকা খেলোয়াড়ের চাল বোঝা কঠিন।

১৪৯. বাঘে ছুঁলে আঠারো ঘা

অর্থ: শক্তিশালী শত্রুর সঙ্গে সংঘর্ষের ফল ভয়াবহ হতে পারে।
বাক্যে প্রয়োগ: ক্ষমতাবান ব্যক্তির সঙ্গে অকারণে বিরোধে যেও না—বাঘে ছুঁলে আঠারো ঘা।

১৫০. বিষে বিষক্ষয়

অর্থ: এক বিষ বা শক্তির সাহায্যে অন্য বিষ বা বিপদ দূর করা।
বাক্যে প্রয়োগ: দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর তদন্তই শেষ পর্যন্ত দুর্নীতির জাল ভাঙল—বিষে বিষক্ষয়।

১৫১. মায়ের চেয়ে মাসির দরদ বেশি

অর্থ: কৃত্রিম বা অতিরঞ্জিত দরদ দেখানো।
বাক্যে প্রয়োগ: এতদিন খোঁজ নেয়নি, আজ হঠাৎ এত উদ্বেগ—মায়ের চেয়ে মাসির দরদ বেশি।

১৫২. মেঘ ডেকে আনে বৃষ্টি

অর্থ: কোনো ঘটনার পূর্বলক্ষণ পরে সত্য হয়ে ওঠা।
বাক্যে প্রয়োগ: বাজারে অস্থিরতার লক্ষণ ছিল, পরে সত্যিই মন্দা এল—মেঘ ডেকে আনে বৃষ্টি।

১৫৩. রক্ষকই ভক্ষক

অর্থ: যে রক্ষা করার দায়িত্বে, সেই যদি ক্ষতি করে।
বাক্যে প্রয়োগ: নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা কর্মীরাই যখন চুরি করল, তখন মনে হল রক্ষকই ভক্ষক।

১৫৪. শেয়ালের কাছে মুরগি বর্গা

অর্থ: দায়িত্ব এমন ব্যক্তির হাতে দেওয়া, যে নিজেই স্বার্থসংশ্লিষ্ট বা অবিশ্বস্ত।
বাক্যে প্রয়োগ: দুর্নীতির তদন্তের দায়িত্ব দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যক্তির হাতে দেওয়া শেয়ালের কাছে মুরগি বর্গা।

১৫৫. সময়ের এক ফোঁড়, অসময়ের দশ ফোঁড়

অর্থ: সঠিক সময়ে কাজ করলে সামান্য প্রচেষ্টায় ফল পাওয়া যায়; দেরি করলে বেশি কষ্ট হয়।
বাক্যে প্রয়োগ: সময়মতো চিকিৎসা করলে রোগ বাড়ত না—সময়ের এক ফোঁড়, অসময়ের দশ ফোঁড়।

১৫৬. সোজা আঙুলে ঘি ওঠে না

অর্থ: কখনও কৌশল বা কঠোরতা ছাড়া কাজ উদ্ধার করা যায় না।
বাক্যে প্রয়োগ: বহুবার অনুরোধেও কাজ হয়নি; শেষে কঠোর হতে হল—সোজা আঙুলে ঘি ওঠে না।

১৫৭. সবুরে মেওয়া ফলে

অর্থ: ধৈর্য ধরলে ভালো ফল পাওয়া যায়।
বাক্যে প্রয়োগ: তাড়াহুড়ো করে সিদ্ধান্ত নিও না—সবুরে মেওয়া ফলে।

১৫৮. হালে পানি পাওয়া

অর্থ: কাজের সাফল্যের সম্ভাবনা দেখা দেওয়া।
বাক্যে প্রয়োগ: নতুন বিনিয়োগ আসায় প্রতিষ্ঠানের ব্যবসায় হালে পানি পাওয়া গেল।

১৫৯. হাতি গেল বাজার, লেজ গেল ঘাট

অর্থ: বড়ো অংশ সম্পন্ন হলেও সামান্য অংশের জন্য কাজ অসম্পূর্ণ থাকা।
বাক্যে প্রয়োগ: প্রায় সব প্রস্তুতি শেষ, শুধু অনুমতিটা বাকি—হাতি গেল বাজার, লেজ গেল ঘাট।

১৬০. হাতে চাঁদ পাওয়া

অর্থ: অত্যন্ত আকাঙ্ক্ষিত বা দুর্লভ কিছু লাভ করা।
বাক্যে প্রয়োগ: বহু বছরের সাধনার পর পুরস্কার পেয়ে তার মনে হল হাতে চাঁদ পেয়েছে।


বিষয়ভিত্তিক প্রবাদ

পরিশ্রম ও সাফল্য

কষ্ট করলে কেষ্ট মেলে।
ইচ্ছা থাকলে উপায় হয়।
সবুরে মেওয়া ফলে।
যে সহে সে রহে।
সময় গেলে সাধন হবে না।
সময়ের এক ফোঁড়, অসময়ের দশ ফোঁড়।

এই প্রবাদের ভিতরে বাঙালির জীবনদর্শনের একটি বড়ো সূত্র আছে—সাফল্য আকস্মিক নয়; তার পেছনে থাকে শ্রম, ধৈর্য এবং সময়ের সদ্ব্যবহার।


লোভ ও অহংকার

অতি লোভে তাঁতি নষ্ট।
অতি দর্পে হত লঙ্কা।
অতি চালাকের গলায় দড়ি।
পিঁপড়ের পাখা ওঠে মরিবার তরে।
হাতের লক্ষ্মী পায়ে ঠেলা।

এই প্রবাদেরা মনে করিয়ে দেয়—মানুষের পতনের বড়ো কারণ বাইরের শত্রু নয়, অনেক সময় নিজের লোভ ও অহংকার।


মানুষের স্বভাব

খালি কলসি বাজে বেশি।
নাচতে না জানলে উঠোন বাঁকা।
নতুন ঝাড়ু বেশি ঝাড়ে।
ঢেঁকি স্বর্গে গেলেও ধান ভানে।
গায়ে মানে না আপনি মোড়ল।
মুখে রাম, বগলে ছুরি।

মানুষের চরিত্রের অসংখ্য সূক্ষ্ম দিক বাংলা প্রবাদে এমনভাবে ধরা পড়েছে, যা অনেক সময় দীর্ঘ মনস্তাত্ত্বিক আলোচনাতেও পাওয়া কঠিন।


বিপদ ও দুর্ভাগ্য

উভয় সংকট।
জলে কুমির ডাঙায় বাঘ।
মরার উপর খাঁড়ার ঘা।
বিনা মেঘে বজ্রপাত।
অভাগা যেদিকে চায়, সাগর শুকিয়ে যায়।
ঘর পোড়া গরু সিঁদুরে মেঘে ভয় পায়।


কৌশল ও বুদ্ধি

কাঁটা দিয়ে কাঁটা তোলা।
বিষে বিষক্ষয়।
সাপও মরবে, লাঠিও ভাঙবে না।
সোজা আঙুলে ঘি ওঠে না।
রথ দেখা কলা বেচা।
এক ঢিলে দুই পাখি।


সম্পর্ক ও বিশ্বাসঘাতকতা

ঘরের শত্রু বিভীষণ।
চোরে চোরে মাসতুতো ভাই।
দুধ কলা দিয়ে কালসাপ পোষা।
রক্ষকই ভক্ষক।
শেয়ালের কাছে মুরগি বর্গা।
মুখে রাম, বগলে ছুরি।


প্রবাদ ব্যবহারের সাহিত্যিক কৌশল

প্রবাদকে আলাদা করে বসিয়ে দিলে ভাষা অনেক সময় কৃত্রিম শোনায়। ভালো লেখায় প্রবাদ বাক্যের সঙ্গে মিশে যায়।

সাধারণ বাক্য:

‘সে নিজের ভুলের জন্য অন্যকে দোষ দেয়।’

আরও শক্তিশালী বাক্য:

‘নিজের অক্ষমতার দায় অন্যের ঘাড়ে চাপানো তার পুরোনো অভ্যাস—নাচতে না জানলে উঠোন বাঁকা।’

সাধারণ বাক্য:

‘সে সুযোগ পেয়েও তা নষ্ট করল।’

সাহিত্যিক প্রয়োগ:

‘দরজাটা নিজের হাতেই খুলেছিল; অথচ অহংকারের এক ধাক্কায় আবার বন্ধ করে দিল—হাতের লক্ষ্মী পায়ে ঠেলা।’

সাধারণ বাক্য:

‘তার বন্ধুরাই তাকে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে।’

প্রবাদময় প্রয়োগ:

‘বাইরের শত্রুর আঘাত সামলানো যায়, কিন্তু ঘরের শত্রু বিভীষণের আঘাত এড়ানো কঠিন।’

সাধারণ বাক্য:

‘অনেক চেষ্টা করার পর সে সফল হয়েছে।’

প্রবাদময় প্রয়োগ:

‘বছরের পর বছর ব্যর্থতার পরও সে থামেনি; শেষ পর্যন্ত প্রমাণ করল—সবুরে মেওয়া ফলে।’


প্রবাদ দিয়ে সাহিত্যিক বাক্য

১.
‘অন্যায়ের সামনে নীরব থাকা মানে অন্যায়কে শক্তি দেওয়া; একদিন সেই নীরবতারই মূল্য দিতে হয়—ধর্মের কল বাতাসে নড়ে।’

২.
‘ক্ষমতার অহংকার যত উঁচুতে ওঠে, পতনের শব্দ তত দূর পর্যন্ত শোনা যায়—অতি দর্পে হত লঙ্কা।’

৩.
‘নিজের ভুল স্বীকার করার সাহস যার নেই, সে সারাজীবন নাচতে না জানলে উঠোন বাঁকা বলে বেড়ায়।’

৪.
‘বন্ধুত্বের মুখোশের আড়ালে যে বিশ্বাসঘাতকতা লুকিয়ে থাকে, তার চেয়ে ভয়ংকর শত্রু আর নেই—ঘরের শত্রু বিভীষণ।’

৫.
‘সময় কাউকে চিরকাল ক্ষমা করে না; আজ যে অন্যায়ের হিসাব চাপা পড়ে আছে, কাল তার দরজায় কড়া নাড়বেই।’

৬.
‘অভাব মানুষকে শুধু ক্ষুধার সঙ্গে লড়তে শেখায় না, কখনও কখনও নিজের বিবেকের সঙ্গেও যুদ্ধ করতে শেখায়—অভাবে স্বভাব নষ্ট।’

৭.
‘দূর থেকে অন্যের জীবন যত উজ্জ্বলই মনে হোক, কাছে গেলে তারও অন্ধকার দেখা যায়; দূরের ঢোলের শব্দ মধুর।’

৮.
‘সাফল্যের প্রথম দিনেই যে নিজের শিকড় ভুলে যায়, তার জন্য প্রকৃতির সতর্কবাণী খুব পুরোনো—পিঁপড়ের পাখা ওঠে মরিবার তরে।’

৯.
‘কোনো সমাজের ভিতরে যদি রক্ষকেরাই ভক্ষকের ভূমিকা নেয়, তবে আইন থাকলেও ন্যায় থাকে না।’

১০.
‘সব যুদ্ধ অস্ত্র দিয়ে জেতা যায় না; কখনও ধৈর্যই সবচেয়ে ধারালো অস্ত্র—সবুরে মেওয়া ফলে।’


প্রবাদ মনে রাখার সহজ পদ্ধতি

প্রবাদ মুখস্থ করার সবচেয়ে ভালো পদ্ধতি হল অর্থের পরিবার তৈরি করা।

লোভ

অতি লোভে তাঁতি নষ্ট
লোভে পাপ, পাপে মৃত্যু

অহংকার

অতি দর্পে হত লঙ্কা
পিঁপড়ের পাখা ওঠে মরিবার তরে

অযোগ্যতা

নাচতে না জানলে উঠোন বাঁকা
খালি কলসি বাজে বেশি

বিশ্বাসঘাতকতা

ঘরের শত্রু বিভীষণ
মুখে রাম, বগলে ছুরি
রক্ষকই ভক্ষক

ধৈর্য

সবুরে মেওয়া ফলে
যে সহে সে রহে

বিপদ

উভয় সংকট
জলে কুমির ডাঙায় বাঘ
মরার উপর খাঁড়ার ঘা
বিনা মেঘে বজ্রপাত

সুযোগ

হাতের লক্ষ্মী পায়ে ঠেলা
গাছে কাঁঠাল গোঁফে তেল
নেই মামার চেয়ে কানা মামা ভালো


প্রবাদ ও বাগধারা—শেষবারের মতো পার্থক্য

বাগধারা:
‘চোখে ধুলো দেওয়া’
অর্থ—প্রতারণা করা।

প্রবাদ:
‘চোর পালালে বুদ্ধি বাড়ে।’
অর্থ—ক্ষতি হওয়ার পর বুদ্ধির উদয় হওয়া।

বাগধারা বাক্যের অংশ।
প্রবাদ নিজেই প্রায় সম্পূর্ণ বক্তব্য।

তবে লোকভাষার স্বাভাবিক বিবর্তনের কারণে সব ক্ষেত্রে সীমারেখা একেবারে কঠোর নয়। বহু লোকোক্তি একদিকে প্রবাদ, অন্যদিকে বাগধারাসুলভ বাক্যাংশ হিসেবেও ব্যবহৃত হয়েছে। তাই পরীক্ষার প্রয়োজনে কেবল নামের শ্রেণিবিভাগ নয়, প্রচলিত অর্থ ও যথাযথ প্রয়োগ জানা বেশি গুরুত্বপূর্ণ।


শেষ কথা

বাংলা প্রবাদ-প্রবচনের প্রকৃত শক্তি তার সংক্ষিপ্ততায় নয়, তার সঞ্চিত অভিজ্ঞতায়। ‘অতি লোভে তাঁতি নষ্ট’ বলার মধ্যে শুধু লোভের বিরুদ্ধে সতর্কতা নেই; আছে মানুষের আকাঙ্ক্ষার সীমা সম্পর্কে বহু যুগের উপলব্ধি। ‘এক হাতে তালি বাজে না’-র মধ্যে শুধু ঝগড়ার কথা নেই; আছে দায় ভাগ করে দেখার সামাজিক বোধ। ‘দূরের ঢোলের শব্দ মধুর’-এর মধ্যে মানুষের চিরন্তন তুলনামূলক মনস্তত্ত্ব আছে। ‘যার লাঠি তার মাটি’-র মধ্যে ক্ষমতার নির্মম বাস্তবতা আছে। ‘রক্ষকই ভক্ষক’-এর মধ্যে রাষ্ট্র, প্রতিষ্ঠান ও সমাজের গভীর সংকটের ইঙ্গিত আছে।

তাই প্রবাদ-প্রবচন আসলে বাংলা মানুষের জীবনদর্শনের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র আয়না। হাজার বছরের অভিজ্ঞতা, হাসি-কান্না, কৃষিজীবন, সংসার, প্রেম, প্রতারণা, দারিদ্র্য, ক্ষমতা, বুদ্ধি, ধৈর্য ও সংগ্রাম—সব মিলিয়ে বাংলা প্রবাদ-প্রবচন বাংলা ভাষার এক অনন্য লোকদর্শন।

প্রবাদ যত ছোটো, তার ভিতরের জীবন তত বড়ো।

 
### পরিবেশনে – ড. অনিশ রায়
 

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!
Scroll to Top