ডি. ডব্লিউ. গ্রিফিথ: দৃশ্যভাষার মহিমায় নৈতিক অন্ধকারের স্থপতি
অনিশ রায়
সিনেমার সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত এমন কিছু মানুষ আছেন, যাঁদের কথা বলতে গেলে একই সঙ্গে শ্রদ্ধা এবং অস্বস্তি—দুই অনুভূতিই আমাদের মধ্যে কাজ করে। ডেভিড ওয়ার্ক গ্রিফিথ তাঁদেরই একজন। তাঁকে বাদ দিয়ে আধুনিক চলচ্চিত্রের ভাষার ইতিহাস লেখা অসম্ভব; আবার তাঁকে নিছক ‘মহান’ বলে উদযাপন করাও ইতিহাসের প্রতি অন্যায়। তিনি একই সঙ্গে সিনেমার এক অসামান্য ভাষা-নির্মাতা এবং গভীর বর্ণবিদ্বেষী মতাদর্শের বাহক। তাঁর শিল্পকীর্তির ভিতরে যেমন রয়েছে চলচ্চিত্রের ব্যাকরণ নির্মাণের বিপুল সৃজনশীলতা, তেমনই রয়েছে সেই ব্যাকরণকে ব্যবহার করে ইতিহাস ও জাতিগত রাজনীতিকে একপাক্ষিকভাবে নির্মাণ করার বিপজ্জনক ক্ষমতা। এই দ্বন্দ্বই গ্রিফিথকে শুধু চলচ্চিত্রের ইতিহাসে নয়, আধুনিকতার নৈতিক ইতিহাসেও গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র করে তুলেছে।
১৮৭৫ সালে কেনটাকির গ্রামীণ অঞ্চলের দক্ষিণে জন্মগ্রহণ করেছিলেন গ্রিফিথ। তাঁর শৈশব ও কৈশোরের সামাজিক পরিবেশ ছিল আমেরিকার গৃহযুদ্ধ-পরবর্তী দক্ষিণের গভীর বর্ণবিভাজিত সমাজ। দাসপ্রথা আইনত বিলুপ্ত হলেও তার সামাজিক স্মৃতি, অর্থনৈতিক কাঠামো এবং শ্বেতাঙ্গ আধিপত্যের মানসিকতা তখনও শক্তিশালী। গ্রিফিথের পরিবারও সেই দক্ষিণী ঐতিহ্যের বাইরে ছিল না। তাঁর বাবা জ্যাকব ‘রোরিং জেক’ গ্রিফিথ ছিলেন কনফেডারেট বাহিনীর সাবেক সৈনিক। ফলে গ্রিফিথের কল্পনার ভিতরে আমেরিকার দক্ষিণ, অতীত, গৃহযুদ্ধ, পরাজয়, শ্বেতাঙ্গ পরিচয় এবং জাতিগত ক্ষমতার সম্পর্ক গভীরভাবে প্রবেশ করেছিল।
তাঁর জীবনের শুরু কিন্তু সিনেমা দিয়ে নয়। তিনি অভিনেতা হতে চেয়েছিলেন, নাটক লিখেছেন, লেখক হওয়ার চেষ্টা করেছেন, ভ্রাম্যমাণ থিয়েটারের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তাঁর অর্থনৈতিক জীবনও স্থিতিশীল ছিল না। চলচ্চিত্র তখনও তথাকথিত ‘উচ্চ’ শিল্পের মর্যাদা পায়নি। শিক্ষিত বা সাহিত্যিক মানুষদের অনেকেই তাকে নিচুস্তরের বিনোদন হিসেবে দেখতেন। গ্রিফিথও প্রথমে সিনেমাকে খুব উচ্চ মর্যাদায় দেখতেন না। জীবিকার প্রয়োজনে তিনি চলচ্চিত্রে আসেন। এই আপাত অনিচ্ছার মধ্যেই ইতিহাস কখনও কখনও তার সবচেয়ে বড়ো পরিহাস লুকিয়ে রাখে।
এডউইন এস. পোর্টারের নজরে পড়ে গ্রিফিথ অভিনয় শুরু করেন। ১৯০৮ সালে পোর্টারের Rescued from an Eagle’s Nest ছবিতে তিনি অভিনয় করেন। পরে বায়োগ্রাফ কোম্পানিতে তাঁর সামনে খুলে গেল পরিচালনার দরজা। কোম্পানির প্রয়োজন ছিল দ্রুত ও কম খরচে ছবি তৈরি করা; গ্রিফিথ সেই প্রয়োজন মেটাতে গিয়ে চলচ্চিত্রের ভাষা নিয়ে একের পর এক পরীক্ষা শুরু করলেন। তাঁর প্রথম ছবি The Adventures of Dollie নির্মিত হয় ১৯০৮ সালে। সিনেমার ইতিহাসে এর গুরুত্ব ছবির কাহিনির জন্য নয়; বরং গ্রিফিথের ক্রমাগত পরীক্ষার জন্য। তিনি খুব তাড়াতাড়ি বুঝতে পেরেছিলেন—চলচ্চিত্রের শক্তি শুধু ক্যামেরার সামনে কী ঘটছে তার মধ্যে নেই; ক্যামেরা কোথায় দাঁড়াচ্ছে, কখন কাটছে, কোন মুখকে কতক্ষণ দেখানো হচ্ছে, কোন দৃশ্যের পর কোন দৃশ্য আসছে—এসবের মধ্যেও গল্পের অর্থ তৈরি হয়। এখানেই শুরু হয় চলচ্চিত্রের ব্যাকরণ নির্মাণের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
‘ব্যাকরণ’ শব্দটি শুনলে প্রথমে আমরা ভাষার কথা ভাবি। বাংলা ভাষায় কর্তা, ক্রিয়া, কর্মের সম্পর্ক আছে; বাক্যে শব্দের অবস্থান বদলালে অর্থও বদলে যেতে পারে। কিন্তু সিনেমার তো শব্দ নেই—অন্তত নির্বাক যুগে ছিল না। তাহলে তার ব্যাকরণ কী? সিনেমার ব্যাকরণ আসলে দর্শকের চোখ ও মনের গতিকে পরিচালনা করার নিয়ম। এক চরিত্রকে প্রথমে দূর থেকে দেখিয়ে তার অবস্থান বোঝানো, তারপর তার মুখের ক্লোজ-আপ দেখিয়ে আবেগ বোঝানো, তারপর তার দৃষ্টির দিকে অন্য কোনো বস্তু দেখানো—এই ক্রম-পর্যায়ে দর্শক শুধু ছবি দেখে না, ছবির মধ্যে সম্পর্ক তৈরি করে। সিনেমা বলে দেয় না, এই মানুষটি ভয় পেয়েছে। সে মানুষের চোখের ক্লোজ-আপ দেখায়; দর্শক নিজেই চরিত্রের ভয় পাঠ করে নেয়। গ্রিফিথ এই সম্পর্কগুলিকে ক্রমশ সচেতনভাবে ব্যবহার করতে শুরু করেছিলেন।
তার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অবদান হলো বিভিন্ন শটের কার্যকর ব্যবহার। একটি দৃশ্যকে কেবল সম্পূর্ণভাবে দেখিয়ে যাওয়া নয়, প্রয়োজনে ক্যামেরাকে চরিত্রের কাছে নিয়ে আসা। আজ ক্লোজ-আপ আমাদের কাছে এত স্বাভাবিক যে তার ঐতিহাসিক গুরুত্ব অনুভব করা কঠিন। কিন্তু চলচ্চিত্রের প্রথম যুগে একটি মুখকে হঠাৎ পর্দা জুড়ে এত বড়ো করে দেখানো ছিল এক বিপ্লব।
দূর শট আমাদের বলে—মানুষটি কোথায়। মিড শট বলে—সে কী করছে। ক্লোজ-আপ বলে—সে কী অনুভব করছে। এই তিনটি তথ্য একত্রে একটি চরিত্রকে পূর্ণতা দেয়।
গ্রিফিথ বুঝেছিলেন, দর্শকের চোখকে কখনও চরিত্রের শরীরের সঙ্গে, কখনও তার মুখের সঙ্গে, কখনও তার চারপাশের পরিবেশের সঙ্গে যুক্ত করতে হয়। ফলে সিনেমার দৃশ্য আর একক ছবি রইল না; হয়ে উঠল বিভিন্ন মাপের ছবির সংগীত। এই সংগীতের আর একটি গুরুত্বপূর্ণ নিয়ম ছিল ১৮০-ডিগ্রি নিয়ম বা axis of action। ধরা যাক, দুজন মানুষ মুখোমুখি কথা বলছে। তাদের মধ্যকার কাল্পনিক রেখার এক পাশে ক্যামেরা রেখে শট নিলে এক চরিত্রকে পর্দার এক দিকে এবং অন্য চরিত্রকে বিপরীত দিকে দেখা যাবে। পরের শটগুলিতেও এই স্থানিক সম্পর্ক বজায় রাখলে দর্শকের মনে হয় দুই ব্যক্তি একই জায়গায় মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু ক্যামেরা হঠাৎ কাল্পনিক রেখার অপর পাশে চলে গেলে চরিত্রগুলির পর্দার অবস্থান উল্টে যেতে পারে; দর্শক মুহূর্তের জন্য বিভ্রান্ত হয়। এই নিয়মের আসল উদ্দেশ্য ছিল দর্শকের সামনে অদৃশ্য মানচিত্র অক্ষুণ্ণ রাখা। দর্শক যেন না ভাবে—ক্যামেরা কোথায় গেল? বরং সে যেন ভাবতে পারে—এরপর কী হবে?
এটাই ধ্রুপদি চলচ্চিত্রের অন্যতম মৌল নীতি: প্রযুক্তি যেন দর্শকের চেতনায় দৃশ্যমান না হয়; গল্প বা আখ্যানই যেন দৃশ্যমান থাকে। এখানে গ্রিফিথের শিল্পের গভীর দিকদর্শন আছে। তিনি সিনেমাকে এমন এক স্বচ্ছ মাধ্যম করে তুলতে চেয়েছিলেন, যার কৌশল দর্শকের সামনে প্রকাশ পাবে না। দর্শক যেন ক্যামেরার অস্তিত্ব ভুলে যায়। সে যেন মনে করে, সে নিজেই ঘটনাস্থলে উপস্থিত।।এই ‘অদৃশ্য কৌশল’ই পরে হলিউডের ধ্রুপদি চলচ্চিত্রভাষার অন্যতম ভিত্তি হয়ে ওঠে।
কিন্তু গ্রিফিথ শুধু স্থানিক ধারাবাহিকতার নিয়মেই থেমে থাকেননি। তাঁর বড়ো আবিষ্কার ছিল parallel editing বা cross-cutting-এর ব্যাপক ও নাটকীয় ব্যবহার। একটি চরিত্র বিপদের মধ্যে; অন্যদিকে কেউ তাকে বাঁচাতে ছুটছে। আমরা একবার বিপন্ন চরিত্রকে দেখি, আবার উদ্ধারকারীকে দেখি, আবার বিপদের কাছে ফিরে যাই। বাস্তবে দুটি ঘটনা হয়তো কয়েক মাইল দূরে ঘটছে; সিনেমা সেগুলিকে একই সময়ের মধ্যে পাশাপাশি বসিয়ে দেয়। এতে জন্ম নেয় উত্তেজনা। দর্শক একই সঙ্গে দুটি সময়ের ভিতর বসবাস করতে শেখে। একটি ঘটনা ঘটছে, আর অন্য একটি ঘটনা তার দিকে এগিয়ে আসছে। দুই রেখা শেষ পর্যন্ত কোথায় মিলবে—এই অপেক্ষাই দর্শককে ধরে রাখে।
গ্রিফিথের The Lonedale Operator (১৯১১) কিংবা The Musketeers of Pig Alley (১৯১২)-এর মতো ছবিতে এই কৌশল আরও পরিণত হয়। পরে The Birth of a Nation-এ তা বিশাল আখ্যানের পরিসরে ব্যবহৃত হয়। এখানে সিনেমা নতুন ধরনের সময় সৃষ্টি করল—সম্পাদিত সময়।বাস্তব সময় একটানা। সিনেমার সময় বিচ্ছিন্ন। বাস্তব জীবনে আমরা একই মুহূর্তে দুই জায়গায় থাকতে পারি না; চলচ্চিত্র আমাদের সেই অসম্ভব ক্ষমতা দেয়। একটি কাট আমাদের মহাকাশে নয়, সময়ের মধ্যেও স্থানান্তরিত করে। এই কারণেই চলচ্চিত্র আধুনিক মানুষের অভিজ্ঞতার সঙ্গে এত গভীরভাবে যুক্ত। আধুনিক জীবন নিজেই তো বিচ্ছিন্ন দৃশ্যের সমষ্টি—টেলিগ্রাফ, রেলপথ, সংবাদপত্র, টেলিফোন, শহরের দ্রুততা, শিল্পায়ন। মানুষ একই সঙ্গে দূরের ঘটনার সঙ্গে যুক্ত হতে শুরু করেছিল। গ্রিফিথের চলচ্চিত্র সেই নতুন আধুনিক সময়েরই এক নান্দনিক প্রতিফলন।
তবে তাঁর চলচ্চিত্র-ভাষার সবচেয়ে বড়ো পরীক্ষা আসে The Birth of a Nation (১৯১৫)-এ। ছবিটি ১৯১৫ সালে মুক্তি পায় এবং ডি. ডব্লিউ. গ্রিফিথের চলচ্চিত্রজীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, একই সঙ্গে সবচেয়ে বিতর্কিত কাজ। প্রায় তিন ঘণ্টার এই বিপুলায়তন চলচ্চিত্র আগের ছোটো ছোটো রিলের সীমা ভেঙে দীর্ঘ আখ্যানের সম্ভাবনা দেখিয়েছিল। বিপুল সংখ্যক শট, বৃহৎ যুদ্ধদৃশ্য, সমান্তরাল সম্পাদনা, ক্লোজ-আপ, দূরশট, ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা—সব মিলিয়ে চলচ্চিত্রের বর্ণনাভাষায় এক বড়ো প্রযুক্তিগত ও শিল্পগত পদক্ষেপ।
কিন্তু এই শিল্পগত সাফল্যের ভিতরে লুকিয়ে ছিল এক গভীর নৈতিক বিপর্যয়। ছবিটি আমেরিকার গৃহযুদ্ধ ও পুনর্গঠন-পর্বকে এমনভাবে উপস্থাপন করে—যেখানে কৃষ্ণাঙ্গ চরিত্রদের বিপজ্জনক, বর্বর ও নৈতিকভাবে অধঃপতিত হিসেবে দেখানো হয়। এবং শ্বেতাঙ্গ দক্ষিণী আধিপত্যকে রোমান্টিক করা হয়। কু ক্লাক্স ক্ল্যানকে প্রায় ত্রাণকর্তার মতো উপস্থাপন করা হয়। ফলে এই ছবি শুধু ইতিহাসের কোনো নির্দিষ্ট ব্যাখ্যা দেয়নি; তা আমেরিকার বর্ণবাদী কল্পনাকে শক্তিশালী করার ক্ষেত্রেও ভূমিকা রেখেছিল।
এই কারণেই The Birth of a Nation নিয়ে কথা বলার সময় দুটি সত্যকে একসঙ্গে ধরে রাখতে হয়।
প্রথম সত্য: চলচ্চিত্রের ভাষার ইতিহাসে এর প্রভাব বিপুল।
দ্বিতীয় সত্য: এর রাজনৈতিক ও বর্ণবাদী বক্তব্য গভীরভাবে ক্ষতিকর এবং নিন্দনীয়।
একটিকে স্বীকার করতে গিয়ে অন্যটিকে আড়াল করা চলবে না।
প্রাক্তন মার্কিন প্রেসিডেন্ট উড্রো উইলসনের সঙ্গে ছবির প্রদর্শনের যে ঐতিহাসিক সম্পর্ক রয়েছে এবং তিনি এই ছবিকে ‘history written with lightning’ বলে অভিহিত করেছিলেন বলে যে উদ্ধৃতি প্রচলিত, তা-ও সেই বিতর্কের অংশ। কারণ ছবিটি ইতিহাসকে নিরপেক্ষভাবে দেখায়নি; বরং ইতিহাসকে নির্দিষ্ট জাতিগত দৃষ্টিভঙ্গি থেকে নির্মাণ করেছিল।
এখানেই গ্রিফিথের চলচ্চিত্র আমাদের এক অস্বস্তিকর কিন্তু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়: সিনেমা যত শক্তিশালী শিল্প, তত শক্তিশালী মতাদর্শের মাধ্যম।ক্যামেরা শুধু দেখায় না। ক্যামেরা বেছে নেয়। আর যা বেছে নেয় না, তা অদৃশ্য হয়ে যেতে পারে। কাকে নায়ক করা হচ্ছে? কাকে খলনায়ক? কার মুখ ক্লোজ-আপে? কার মৃত্যুতে সংগীত? কার দুঃখকে মানবিক করা হচ্ছে? কার অস্তিত্বকে ভয়ের প্রতীক বানানো হচ্ছে?—এসব প্রশ্ন শুধু নন্দনতত্ত্বের নয়, রাজনীতিরও। এই অর্থে গ্রিফিথকে দেখা বা পড়া মানে শুধু চলচ্চিত্রের ব্যাকরণ শেখা নয়; দৃশ্যের নৈতিকতাও শেখা।
তবে গ্রিফিথের পরবর্তী Intolerance (১৯১৬) তাঁর শিল্পচিন্তার অন্য দিককে প্রকাশ করে। এই ছবি চারটি ভিন্ন সময় ও কাহিনিকে পাশাপাশি রেখে মানুষের অসহিষ্ণুতার ইতিহাস দেখাতে চেয়েছিল—প্রাচীন ব্যাবিলন থেকে খ্রিস্টের যুগ, ফ্রান্সের সেন্ট বার্থোলোমিউ হত্যাকাণ্ড এবং আধুনিক আমেরিকা পর্যন্ত। এই বহুকাহিনির কাঠামো ছিল অসাধারণ উচ্চাভিলাষী। এখানে গ্রিফিথ সময়কে শুধু এগিয়ে নিয়ে যাননি; সময়কে পরস্পরের সঙ্গে কথোপকথনে বসিয়েছেন।
এক যুগের অন্যায়ের পাশে আরেক যুগের অন্যায়। এক সভ্যতার হিংসার পাশে অন্য সভ্যতার হিংসা। অর্থাৎ ইতিহাস বদলেছে, পোশাক বদলেছে, রাষ্ট্র বদলেছে—কিন্তু মানুষের অসহিষ্ণুতা কি বদলেছে?এই প্রশ্নেই Intolerance তার সময়কে অতিক্রম করে। এখানে montage বা montage-চিন্তার যে ব্যবহার দেখা যায়, তা পরবর্তী চলচ্চিত্রতত্ত্বের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। যদিও ‘মন্তাজ’ শব্দের অর্থ পরবর্তী সোভিয়েত চলচ্চিত্রকারদের হাতে আরও সুসংহত তাত্ত্বিক রূপ পাবে, গ্রিফিথের ক্রস-কাটিং ও বহুকাহিনি নির্মাণ সেই পথ প্রস্তুত করেছিল।
সোভিয়েত চলচ্চিত্রকার লেভ কুলেশভ, ভসেভোলোদ পুদভকিন, সের্গেই আইজেনস্টাইন প্রমুখ আমেরিকান চলচ্চিত্রের, বিশেষত গ্রিফিথের, সম্পাদনা-পদ্ধতি গভীরভাবে অধ্যয়ন করেছিলেন। আশ্চর্যের বিষয়, রাজনৈতিকভাবে আমেরিকা ও সোভিয়েত রাশিয়া ছিল দুই বিপরীত মেরুতে; কিন্তু শিল্পের ভাষা সীমান্ত মানে না। একজন আমেরিকান পরিচালক যে সম্পাদনার কৌশল তৈরি করেছিলেন, তা বিপ্লবী রাশিয়ার চলচ্চিত্রকারদের হাতে নতুন রাজনৈতিক ও নান্দনিক অর্থ পেয়ে গেল। এই ঘটনা চলচ্চিত্রের আন্তর্জাতিক চরিত্রকে স্পষ্ট করে।
শিল্পের ইতিহাস কখনও সরল রেখায় এগোয় না। একজনের আবিষ্কার অন্যজনের হাতে বদলে যায়। এক প্রযুক্তি অন্য দেশে গিয়ে নতুন দর্শন লাভ করে। গ্রিফিথের ক্রস-কাটিং সোভিয়েত মন্তাজে নতুন অর্থ পায়; ইউরোপীয় পরিচালকরা আবার অন্যভাবে সিনেমার ভাষাকে ভাঙেন; পরে জাপানি, ভারতীয়, লাতিন আমেরিকান, আফ্রিকান চলচ্চিত্রকারেরা নিজেদের ইতিহাস ও সংস্কৃতির ভিতর দিয়ে তাকে পুনর্নির্মাণ করেন। সিনেমা তাই কোনো এক জাতির সম্পত্তি নয়। তার ভাষা আন্তর্জাতিক, কিন্তু তার দৃষ্টিভঙ্গি সবসময় রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক।
গ্রিফিথকে ‘সিনেমার শেক্সপিয়র’ বলা হয়েছে। তুলনাটি আকর্ষণীয়, কিন্তু সাবধানে ব্যবহার করা প্রয়োজন। শেক্সপিয়র যেমন ইংরেজি নাট্যভাষাকে অসাধারণ উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিলেন, গ্রিফিথও চলচ্চিত্রের প্রাথমিক ব্যাকরণকে দ্রুত পরিণত করেছিলেন। কিন্তু শেক্সপিয়রের সঙ্গে তাঁর তুলনা করার সময় মনে রাখতে হবে—গ্রিফিথ ছিলেন একেবারে নবজাত শিল্পমাধ্যমের প্রাথমিক ভাষা নির্মাণের যুগের মানুষ। তাঁর কৃতিত্ব ছিল—তিনি বুঝেছিলেন সিনেমা কেবল দৃশ্যের প্রদর্শনী নয়; তা সময়, স্থান, দৃষ্টি এবং আবেগকে সংগঠিত করার শিল্প। কিন্তু তাঁর সীমাবদ্ধতাও ছিল—সেই সংগঠিত দৃষ্টি সবসময় মানবিকভাবে সমান ছিল না।
কারণ ইতিহাসের মহান শিল্পীদের আমরা যদি শুধু মূর্তিতে পরিণত করি, তাহলে ইতিহাসকে বুঝতে পারি না। বরং তাঁদের কাজের ভিতরের আলো এবং অন্ধকার দুটোকেই দেখতে হয়। গ্রিফিথ আমাদের শেখান, শিল্পের প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ নৈতিক উৎকর্ষের নিশ্চয়তা নয়। একজন মানুষ চলচ্চিত্রের ভাষাকে বিপ্লবী করে তুলতে পারেন, অথচ মানুষের সমতার প্রশ্নে গভীরভাবে পশ্চাৎপদ থাকতে পারেন। এই সত্য আজকের পৃথিবীর জন্যও অত্যন্ত জরুরি।
আজ সিনেমা, টেলিভিশন, বিজ্ঞাপন, সামাজিক মাধ্যম এবং ডিজিটাল ভিডিও মানুষের চিন্তাকে প্রভাবিত করে। কোনো দৃশ্য বারবার দেখালে তা সত্য বলে মনে হতে পারে। কোনো গোষ্ঠীকে বারবার ভয়ের সঙ্গে যুক্ত করলে তাদের সম্পর্কে সামাজিক ধারণা বদলে যেতে পারে। একজন মানুষকে নায়ক বানানো আর অন্যজনকে খলনায়ক বানানো কেবল গল্পের কৌশল নয়; তা দর্শকের মানসিক মানচিত্রও তৈরি করে। গ্রিফিথের উত্তরাধিকার তাই দ্বিমুখী। তিনি আমাদের দিয়েছেন চলচ্চিত্রের এক শক্তিশালী ভাষা। এবং তাঁর চলচ্চিত্র আমাদের সতর্ক করেছে—শক্তিশালী ভাষা ভুল হাতে গেলে শক্তিশালী মিথ্যাও তৈরি করতে পারে। এই কারণেই গ্রিফিথকে অস্বীকার করা যায় না, আবার অন্ধভাবে পূজাও করা যায় না।
আজ আমরা যখন কোনো ছবিতে দেখি—একজন মানুষ দৌড়ে আসছে, অন্যদিকে বিপদ এগিয়ে আসছে; ক্যামেরা হঠাৎ মুখের কাছে চলে যাচ্ছে; তারপর আবার দূরের দৃশ্যে ফিরে যাচ্ছে; তারপর দুজনের দৃশ্য পালা করে দেখানো হচ্ছে—আমরা হয়তো জানিই না যে এই ব্যাকরণের শিকড় এক শতাব্দীরও বেশি পুরোনো। আমরা যে ভাষায় সিনেমা দেখি, তার অনেক শব্দই গ্রিফিথের যুগে তৈরি।
তবে সেই ভাষা আজ আর গ্রিফিথের একার নয়। তা চ্যাপলিনের হাতে হাসির ভাষা হয়েছে, আইজেনস্টাইনের হাতে বিপ্লবের ভাষা, ওরসন ওয়েলসের হাতে গভীরতার ভাষা, সত্যজিৎ রায়ের হাতে মানুষের অন্তর্জীবনের ভাষা, কুরোসাওয়ার হাতে গতি ও নৈতিকতার ভাষা, ফেলিনির হাতে স্বপ্নের ভাষা, ঋত্বিক ঘটকের হাতে ইতিহাস ও বিচ্ছেদের ভাষা, গদারের হাতে ভাষা ভাঙার ভাষা।গ্রিফিথ দরজা খুলেছিলেন; পরবর্তী চলচ্চিত্রকারেরা সেই দরজা দিয়ে বেরিয়ে এসে অসংখ্য রাস্তা তৈরি করেছেন। তাই চলচ্চিত্রের ইতিহাসে গ্রিফিথের স্থান এক অদ্ভুত সন্ধিক্ষণে। তিনি পুরোনো মঞ্চের উত্তরাধিকারী, কিন্তু নতুন চলচ্চিত্রের স্থপতি। তিনি প্রযুক্তির ব্যবহারকে শিল্পে পরিণত করেছিলেন, কিন্তু শিল্পের শক্তিকে কখনও কখনও ক্ষতিকর মতাদর্শের বাহনও করেছিলেন। তাঁর হাতে সিনেমা শিখেছিল কীভাবে দর্শকের চোখকে পরিচালনা করতে হয়; তাঁর চলচ্চিত্রের রাজনৈতিক ইতিহাস আমাদের শেখায় সেই পরিচালিত চোখকে কীভাবে প্রশ্ন করতে হয়।
শেষপর্যন্ত গ্রিফিথের সবচেয়ে বড়ো উত্তরাধিকার হয়তো কোনো কৌশল নয়; তা এই উপলব্ধি যে, সিনেমা নিজেই এক ভাষা। গ্রিফিথ সেই ভাষার প্রথম বৃহৎ ব্যাকরণ-রচনাকারদের একজন।কিন্তু ভাষা যেমন সত্যও বলতে পারে, মিথ্যাও বলতে পারে, সিনেমাও তেমনই। তাই গ্রিফিথকে মনে রাখার সবচেয়ে পরিণত উপায় তাঁকে ‘সিনেমার পিতা’ বলে দেওয়া নয়; বরং তাঁর কীর্তি ও অপরাধ, উদ্ভাবন ও সীমাবদ্ধতা, শিল্প ও মতাদর্শ—সবকিছুকে পাশাপাশি রেখে দেখা। তাহলেই বোঝা যায়, সিনেমা আসলে কেবল ছবি নয়। সেই শক্তিশালী ভাষা, যার ভিতর দৃষ্টিও নির্মাণ হয়। আর যে মানুষ দৃষ্টি বা দৃষ্টিভঙ্গির ব্যাকরণ তৈরি করেন, তিনি শুধু শিল্পের ভাষা তৈরি করেন না—তিনি পরবর্তী প্রজন্মের মানুষ কীভাবে পৃথিবীকে দেখবে, তারও অংশ নির্ধারণ করে দেন।
ডি. ডব্লিউ. গ্রিফিথ সিনেমাকে শুধু গল্প বলতে শেখাননি; তিনি তাকে এমন এক ভাষা দিয়েছিলেন, যার শক্তি এত গভীর যে সেই ভাষা দিয়ে মানবতার মহিমাও নির্মাণ করা যায়, আবার বিদ্বেষের মিথও। তাই তাঁকে পাঠ করা মানে দেখার ইতিহাস পর্যালোচনা করা—এবং একই সঙ্গে শেখা যে, আমরা যা দেখি, তাকে সবসময় প্রশ্ন করতে হয়। আর সেই দৃষ্টিকে প্রশ্ন করার ক্ষমতাই শেষপর্যন্ত একজন সত্যিকারের দর্শকের প্রথম স্বাধীনতা।
[কৃতজ্ঞ স্মরণ- সঞ্জয় মুখোপাধ্যায়-এর বিভিন্ন নিবন্ধ, গ্রন্থাদি ও আলোচনাসমূহ ]

