সিনেমা কথা-৩

এডউইন এস. পোর্টার: দৃশ্যের ব্যবচ্ছেদে সময়ের নতুন ভাষার কারিগর

অনিশ রায়

সিনেমার আদিমযুগেও এমন মানুষ এসেছেন, যাঁরা ক্যামেরা দিয়ে শুধু ছবি তোলেননি—তাঁরা মানুষের দেখার পদ্ধতি-ই বদলে দিয়েছেন। জর্জ মেলিয়েস ক্যামেরাকে বাস্তবতার অনুগত যন্ত্র থেকে কল্পনার জাদুবাক্সে পরিণত করেছিলেন। কিন্তু মেলিয়েসের সামনে তখনও এক বড়ো প্রশ্ন অমীমাংসিত ছিল—কোনো গল্পের বিচ্ছিন্ন ঘটনাগুলিকে কীভাবে এমনভাবে পরপর সাজানো যায়, যাতে দর্শকের মনে না হয় তারা আলাদা আলাদা ছবি দেখছে? কীভাবে একটি দৃশ্যের ভিতর থেকে আরেকটি দৃশ্যের জন্ম হবে? কীভাবে একই সময়ে ভিন্ন ভিন্ন স্থানে ঘটে চলা ঘটনাকে একসঙ্গে অনুভব করা সম্ভব হবে?

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়েই সিনেমা তার নিজস্ব ভাষার দিকে এগিয়ে গেল। আর সেই ভাষার অন্যতম প্রথম ও গুরুত্বপূর্ণ নির্মাতা ছিলেন এডউইন এস. পোর্টার। উনিশ শতকের শেষ দশক পেরিয়ে বিশ শতকের শুরুতে সিনেমা দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে উঠছিল। ইউরোপে তার জন্ম, ফ্রান্সে তার শৈশব, কিন্তু আমেরিকায় এসে তার শিল্পভাষা দ্রুত পরিবর্তিত হতে শুরু করল। নিউ ইয়র্কের ‘এডিসন স্টুডিও’ হয়ে উঠল সেই পরীক্ষাগার। যেখানে প্রযুক্তি, বাণিজ্য এবং গল্প বলার নতুন কৌশলগত বিভিন্ন ভাবনা একসঙ্গে কাজ করছিল। পোর্টার সেই পরিবেশেরই সন্তান। তিনি প্রথম থেকেই চলচ্চিত্র পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না। তাঁর কর্মজীবনের শুরু যন্ত্রপাতি ও প্রযুক্তির সঙ্গে। মেকানিক হিসেবে কাজ করার অভিজ্ঞতা তাঁকে চলচ্চিত্রের ভিতরের যন্ত্রভাষা বুঝতে সাহায্য করেছিল। ফলে তাঁর কাছে সিনেমা শুধু অভিনয় বা দৃশ্যের সমষ্টি ছিল না; ছিল সময়, স্থান, আলো, ক্যামেরা এবং সম্পাদনার একটি জটিল সংগঠন।এই কারণেই পোর্টারের অবদান বুঝতে গেলে তাঁকে শুধু একজন পরিচালক হিসেবে দেখার পাশাপাশি চলচ্চিত্রের ব্যাকরণ আবিষ্কারের সময়কালীন একজন বৈয়াকরণিক হিসেবেও দেখতে হবে।

মেলিয়েস জানতেন কীভাবে কোনো দৃশ্যকে জাদুর মতো আকর্ষণীয় করে তোলা যায়। কিন্তু তাঁর চলচ্চিত্রের দৃশ্যগুলি অনেক সময় এখনও মঞ্চের মতো আলাদা আলাদা। ক্যামেরা যেন দর্শকের চোখের জায়গায় বসানো স্থির আসন। একটি ঘটনা শেষ হয়, তারপর আরেকটি ঘটনা শুরু হয়। পোর্টার বুঝলেন, সিনেমা যদি সত্যিই উপন্যাসের মতো বিস্তৃত হতে চায়, তাহলে তাকে এই বিচ্ছিন্নতার সীমা ভাঙতে হবে।

উপন্যাসে আমরা এক অধ্যায়ে এক চরিত্রের সঙ্গে থাকি, পরের অধ্যায়ে চলে যাই অন্য চরিত্রের কাছে। কখনও একই সময়ে দুই জায়গায় কী ঘটছে, লেখক তা পাশাপাশি বর্ণনা করেন। কখনও এক চরিত্র বিপদের মধ্যে পড়ে, আর আমরা জানি অন্য একজন তাকে উদ্ধার করতে ছুটে আসছে। পাঠক একই সঙ্গে দুটি সময় ও দুটি স্থানের মধ্যে মানসিকভাবে যাতায়াত করে।পোর্টার হয়তো নিজেকে প্রশ্ন করলেন—সিনেমা কি একই কাজ করতে পারে না? এই প্রশ্নের উত্তর থেকেই জন্ম নিল চলচ্চিত্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কৌশল—cross-cutting, অর্থাৎ একাধিক স্থানে ঘটে চলা ঘটনাকে পালা করে দেখানো। আর এর সঙ্গে জন্ম নিল এমন এক চলচ্চিত্র-সময়, যা বাস্তব সময়ের অনুগত নয়। বাস্তবে দু-জন মানুষ যদি দুই মাইল দূরে থাকে, তারা একই মুহূর্তে কী করছে তা জানতে আমাদের এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যেতে হবে। কিন্তু সিনেমার কোনো শারীরিক দূরত্ব নেই। ক্যামেরা এক মুহূর্তে ডাকাতদের কাছে, পরের মুহূর্তে টেলিগ্রাফ অফিসে, তার পরের মুহূর্তে ঘোড়ায় চড়ে ছুটে চলা উদ্ধারকারীদের কাছে পৌঁছে যেতে পারে। এই ক্ষমতাই সিনেমাকে অন্য সব শিল্প থেকে আলাদা করে তুলল।

১৯০৩ সালে পোর্টার নির্মাণ করলেন The Great Train Robbery। মাত্র বারো মিনিটের এই ছবিকে চলচ্চিত্রের ইতিহাসে এক যুগান্তকারী কাজ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ছবিটি আজকের চোখে সরল মনে হতে পারে—একদল দস্যু ট্রেন লুট করে, পালিয়ে যায়, তারপর তাদের ধরার চেষ্টা শুরু হয়। কিন্তু এই সরল কাহিনির ভিতরেই পোর্টার চলচ্চিত্রের ভবিষ্যতের অনেকগুলি বীজ রেখে দিয়েছিলেন। একটি ট্রেন, কয়েকজন ডাকাত, টেলিগ্রাফ অফিস, যাত্রী, বন্দুক, পালানো এবং ধাওয়া—এসবকে তিনি এমনভাবে সাজালেন যে গল্প আর বিচ্ছিন্ন দৃশ্যের সমষ্টি রইল না। দৃশ্যগুলি পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করল। একটি দৃশ্যের উত্তেজনা অন্য দৃশ্যের অপেক্ষা তৈরি করল।

ধরা যাক, ডাকাতেরা ট্রেন দখল করেছে। অন্যদিকে টেলিগ্রাফ অপারেটর বিপদের খবর পাঠানোর চেষ্টা করছে। আবার কোথাও মানুষ সেই সংবাদ পেয়ে ডাকাতদের ধরতে প্রস্তুত হচ্ছে। পোর্টার এই ঘটনাগুলিকে পাশাপাশি বসিয়ে দিলেন। দর্শক জানে, ঘটনাগুলি একই সময়ে ঘটছে। কিন্তু সে একসঙ্গে দুই জায়গায় থাকতে পারে না। সিনেমা তাকে সেই অসম্ভব ক্ষমতা দিল। এখানেই চলচ্চিত্রের সময় বাস্তব সময় থেকে স্বাধীন হয়ে গেল।

একটি দৃশ্য শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে অন্য দৃশ্যে যাওয়া আর কেবল স্থান পরিবর্তন নয়; তা হয়ে উঠল উত্তেজনা নির্মাণের কৌশল। দর্শক জানে বিপদ কোথায়, উদ্ধারকারী কোথায়, কিন্তু চরিত্রগুলি জানে না। ফলে দর্শকের মনে তৈরি হয় এক বিশেষ ধরনের উদ্বেগ—“আর একটু দেরি হলেই সব শেষ!” পরবর্তী শতাব্দীতে থ্রিলার, অ্যাকশন, যুদ্ধের ছবি, অপরাধকাহিনি, প্রেমের কাহিনি—প্রায় সমস্ত চলচ্চিত্রের ভাষায় এই কৌশল ছড়িয়ে পড়বে। আমরা আজ খুব স্বাভাবিকভাবে দেখি—একজন বিপদের মধ্যে, অন্যজন তাকে বাঁচাতে ছুটছে; একজন দরজা খুলছে, অন্যজন বন্দুক তাক করে অপেক্ষা করছে; একটি বোমার সময় ফুরিয়ে আসছে, আর পুলিশ ঘটনাস্থলের দিকে ছুটছে। আমরা জানি না এরপর কী হবে, কিন্তু জানি দুটি ঘটনা একে অপরের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। এই উত্তেজনার স্থপতিদের একজন ছিলেন পোর্টার।

The Great Train Robbery-কে প্রাথমিক পশ্চিমী চলচ্চিত্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণও বলা হয়। পরবর্তী কালের অসংখ্য পশ্চিমী ছবির মতো এখানেও রয়েছে ডাকাত, বন্দুক, ট্রেন, খোলা প্রান্তর, ধাওয়া এবং অপরাধের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ। ভারতীয় জনপ্রিয় সিনেমায় আমরা পরে যে ডাকাতি, ধাওয়া, প্রতিশোধ এবং নায়ক-খলনায়কের দ্বন্দ্বের বিপুল ঐতিহ্য দেখব, তার বহু প্রাথমিক চলচ্চিত্র-উপাদান এই ছবির মতো কাজগুলির মধ্যেই গড়ে উঠেছিল।আজ শোলে-র গব্বর সিং, জয়-বীরু বা ধুলোমাখা পাহাড়ি ভূদৃশ্য আমাদের কাছে ভারতীয় চলচ্চিত্রের এক নিজস্ব মিথ। পোর্টারের The Great Train Robbery সেই মিথের সরাসরি ‘পূর্বপুরুষ’ না হলেও, একই ধরনের পশ্চিমী চলচ্চিত্র-রীতির এক আদিম ভিত্তি। সিনেমার ভাষা দেশ অনুযায়ী বদলে গেছে, সংস্কৃতি বদলে গেছে, চরিত্র বদলেছে—কিন্তু ডাকাতি, ধাওয়া, বন্দুক এবং প্রতিশোধের নাটকীয়তা বিশ্বজুড়ে দর্শককে একইভাবে আকর্ষণ করেছে।

তবে পোর্টারের আসল বিপ্লব কেবল The Great Train Robbery-র বিষয়বস্তুতে নয়; তার নির্মাণ-পদ্ধতিতে। তিনি বুঝেছিলেন যে সিনেমার শক্তি কেবল কোনো দৃশ্যের ভিতরে নেই; দৃশ্যগুলির পারস্পরিক সম্পর্কের মধ্যেও রয়েছে। একটি মুখের ছবি যদি আলাদাভাবে দেখানো হয়, তা কেবল একটি মুখ। কিন্তু তার আগে যদি আমরা দেখি কেউ বিপদের মধ্যে পড়েছে, তারপর সেই মুখ দেখি, তাহলে মুখটির অর্থ বদলে যায়। অর্থাৎ চলচ্চিত্রের অর্থ কেবল ছবির ভিতরে নয়—ছবির মাঝখানের সম্পর্কের মধ্যেও জন্মায়।

এই উপলব্ধিই পরবর্তীকালের মন্টাজ তত্ত্বের দূরবর্তী পূর্বসূরি।

একটি ছবি + আরেকটি ছবি = তৃতীয় একটি অর্থ।

এই সরল সূত্রই পরে আইজেনস্টাইনের হাতে চলচ্চিত্র-চিন্তার এক বিপুল তত্ত্বে পরিণত হবে। কিন্তু তার আগে পোর্টারের মতো নির্মাতারা বাস্তব কাজের ভিতর দিয়ে বুঝতে শুরু করেছিলেন—সম্পাদনা কেবল ছবি ছোট করার কাজ নয়; সম্পাদনা হলো অর্থ নির্মাণের কাজ।

এখানে সিনেমা সাহিত্য থেকে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাটি নিল, কিন্তু তাকে নিজের মতো করে বদলে ফেলল। উপন্যাস শব্দ দিয়ে পাঠকের কল্পনায় স্থানান্তর ঘটায়; সিনেমা কাট দিয়ে দর্শকের চোখকে স্থানান্তরিত করে। উপন্যাসে লেখক বলতে পারেন—“এদিকে যখন এই ঘটনা ঘটছে, অন্যদিকে…”। সিনেমা সেই বাক্য উচ্চারণ না করেও দুটি দৃশ্যকে পাশাপাশি রেখে তা দর্শককে বুঝিয়ে দিতে পারে। এই কারণে এডউইন পোর্টারের চলচ্চিত্রকে সিনেমার ‘বাক্যগঠন’-এর ইতিহাসে বিশেষভাবে দেখতে হয়। আর এখানেই তাঁর কাজের সঙ্গে সময়ের এক গভীর দার্শনিক সম্পর্ক তৈরি হয়।

মানুষ বাস্তব জীবনে সময়ের মধ্যে বন্দি। অতীত ফিরে আসে না, ভবিষ্যৎ এখনও ঘটেনি। বর্তমান এক মুহূর্তের বেশি স্থায়ী হয় না। কিন্তু সিনেমা এই নিয়ম ভেঙে দেয়। সম্পাদকের টেবিলে অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ পাশাপাশি বসতে পারে। একটি শটের পরে এমন একটি শট বসানো যায় যা গল্পের সময় অনুযায়ী পরে ঘটছে; আবার প্রয়োজনে আগের কোনো মুহূর্তে ফিরে যাওয়া যায়। সিনেমা তাই কেবল স্থানকে নয়, সময়কেও সম্পাদনা করতে শেখে। পোর্টারের কাজের মধ্য দিয়ে এই সম্ভাবনা স্পষ্ট হতে শুরু করল।

এডিসনের স্টুডিওতে তাঁর কাজের আর একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল প্রযুক্তির সঙ্গে শিল্পের সম্পর্ক নির্মাণ। আলো, সেট, ক্যামেরার অবস্থান, ফিল্মের দৈর্ঘ্য—এসবকে তিনি নিছক যান্ত্রিক সমস্যা হিসেবে দেখেননি। The Great Train Robbery-র বহু দৃশ্য স্টুডিওতে নির্মিত হলেও সেগুলির সঙ্গে বাইরের দৃশ্যের সংযোগ এমনভাবে তৈরি হয়েছিল যে দর্শকের কাছে পুরো ঘটনা এক অবিচ্ছিন্ন জগত বলে মনে হয়। চলচ্চিত্র তখন আর শুধু ক্যামেরার সামনে ঘটে যাওয়া কোনো ঘটনা নয়; ক্যামেরার পিছনে পরিকল্পিত বিশেষ নির্মাণ হয়ে ওঠে।

এই পরিবর্তন ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ শিল্প মানেই শুধু বাস্তবকে পুনরুৎপাদন নয়; বাস্তবকে বেছে নেওয়া, সাজানো এবং অর্থপূর্ণ করে তোলা। একজন ঔপন্যাসিক যেমন শত ঘটনার মধ্যে কয়েকটি নির্বাচন করেন, একজন চিত্রশিল্পী যেমন ক্যানভাসের সীমার ভিতর এক পৃথক পৃথিবী নির্মাণ করেন, তেমনই চলচ্চিত্রকারও বাস্তবতার অসীম প্রবাহ থেকে নির্দিষ্ট মুহূর্ত বেছে নেন। পোর্টার সেই নির্বাচনের শিল্পকে চলচ্চিত্রের কেন্দ্রে নিয়ে এলেন। তাঁর কাজের পর সিনেমা আর কেবল, এখানে যা ঘটেছিল—তার রেকর্ড হয়ে থাকে না। তা হয়ে উঠল, এই ঘটনার পর দর্শক কী দেখবে, আর তার ফলে কী অনুভব করবে—এই প্রশ্নের শিল্প।

এই পথ ধরেই খুব শিগগির এসে দাঁড়াবেন ডি. ডব্লিউ. গ্রিফিথ। পোর্টারের কাছেই ১৯০৮ সালে অভিনয়ের সুযোগ পেয়েছিলেন এক তরুণ অভিনেতা, Rescued from an Eagle’s Nest-এ যার উপস্থিতি আজ চলচ্চিত্রের ইতিহাসে অন্য কারণে স্মরণীয়। সেই তরুণ ছিলেন ডেভিড ওয়ার্ক গ্রিফিথ। কয়েক বছরের মধ্যেই তিনি পরিচালক হিসেবে চলচ্চিত্রের ভাষাকে আরও বহুদূর এগিয়ে নিয়ে যাবেন। ১৯১৪ সালের The Birth of a Nation চলচ্চিত্রের ইতিহাসে গভীর প্রভাব ফেলবে—যদিও তার বর্ণবাদী মতাদর্শ ও কু ক্লাক্স ক্ল্যানের প্রতি প্রচারমূলক সহানুভূতির কারণে ছবিটি আজ কঠোর নৈতিক ও ঐতিহাসিক সমালোচনার বিষয়। শিল্পের ইতিহাসে কোনো কাজের প্রভাব স্বীকার করা আর তার রাজনৈতিক বা নৈতিক অবস্থানকে সমর্থন করা এক কথা নয়। বরং গ্রিফিথকে বোঝার জন্য এই দ্বৈততাই গুরুত্বপূর্ণ।

তবে গ্রিফিথের চলচ্চিত্রভাষার আগের পথটি পোর্টারের মতো নির্মাতাদের হাতেই প্রস্তুত হয়েছিল। ক্লোজ-আপ, কাটিং, সমান্তরাল ক্রিয়া, দৃশ্যের ধারাবাহিকতা—এসব কৌশল ধীরে ধীরে চলচ্চিত্রকে তার নিজস্ব ভাষা খুঁজে পেতে সাহায্য করছিল। সত্যজিৎ রায় গ্রিফিথকে ‘ধ্রুপদি চলচ্চিত্রের পিতা’ হিসেবে যে মর্যাদা দিয়েছিলেন, তার পিছনে এই চলচ্চিত্র-ভাষার বিবর্তনের ইতিহাস রয়েছে। কিন্তু কোনো ‘পিতা’ একা সন্তান জন্ম দেন না—তার আগে থাকে বহু আবিষ্কার, পরীক্ষা, ব্যর্থতা এবং অদৃশ্য শ্রম। পোর্টার সেই প্রস্তুতিপর্বের এক অপরিহার্য কারিগর।

মেলিয়েস সিনেমাকে স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন। পোর্টার তাকে স্বপ্নের ভিতর দিয়ে হাঁটতে শেখালেন। মেলিয়েস বলেছিলেন—ক্যামেরা দিয়ে অসম্ভবকে সম্ভব দেখানো যায়। পোর্টার দেখালেন—সেই অসম্ভবকে ধারাবাহিকভাবে সাজিয়ে একটি গল্পও বলা যায়। এই দুইয়ের মিলনেই সিনেমা ধীরে ধীরে শিশুকাল পেরিয়ে কৈশোরে প্রবেশ করল।

একদিন লুমিয়েরের ট্রেন পর্দার দিকে ছুটে এসেছিল। দর্শক ভয়ে সরে গিয়েছিল। তারপর মেলিয়েস সেই ট্রেনকে কল্পনার মহাকাশযানে বদলে দিলেন। পোর্টার এসে সেই চলমান পৃথিবীর মধ্যে ঘটনার পর ঘটনা, স্থানান্তর, উত্তেজনা ও সময়ের সম্পর্ক তৈরি করলেন। ক্যামেরা তখন আর কেবল চোখ নয়; সে হয়ে উঠল বর্ণনাকারী। আর এইখানেই সিনেমা সত্যিকার অর্থে কথা বলতে শুরু করল—যদিও তার মুখে তখনও শব্দ আসেনি।

তার ভাষা ছিল কাট।

তার ব্যাকরণ ছিল সম্পাদনা।

তার বাক্য ছিল শট।

আর তার প্রথম বড়ো গল্পকারদের একজন—এডউইন এস. পোর্টার।

[কৃতজ্ঞ স্মরণ- সঞ্জয় মুখোপাধ্যায়-এর বিভিন্ন নিবন্ধ, গ্রন্থাদি ও আলোচনাসমূহ]

 
 
 

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!
Scroll to Top