অনিশ রায়
একদিন দেখলাম
আমার শরীরের উপর ঝুঁকে আছে কয়েকটি বিচিত্র আলোর মুখ।
তারা ডাক্তার নয়,
ঈশ্বরও নয়,
তবু তাদের হাতে ছিল সংখ্যার খাতা,
গ্রাফ,
সম্ভাবনার হিসাব,
এবং ভবিষ্যতের নামে লেখা কিছু প্রতিশ্রুতি।
আমি জিজ্ঞেস করলাম—
আমাকে কি বাঁচানো হবে?
তারা বলল—
না,
তোমাকে ব্যবহার করা হবে।
আশ্চর্য, চারপাশটা অদ্ভুত হয়ে গেল।
রাস্তাগুলোয় মানুষ হাঁটছে না,
পরিসংখ্যান নড়েচড়ে বেড়াচ্ছে।
মুখগুলো মুখের মতো না,
হয়ে যাচ্ছে নাম্বারের স্ক্রিন।
হৃদস্পন্দন যেন সংকেত।
আর রক্ত কেবলই রিপোর্ট।
একদিন দেখলাম,
এক শিশুর জন্ম হবে।
অবশ্য আরও দেখলাম,
জন্মের আগে থেকেই
তার জন্য তৈরি হয়ে আছে
একটি ফাইল,
একটি নম্বর,
একটি সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ।
মা তাকে কোলে তুলে নেয়,
ওদিকে অদৃশ্য কোথাও
কেউ তার নাম লেখে—
এক বিশাল পরীক্ষাগারের দেওয়াল চারিদিকে।
বলা হলো—
এ তো উন্নয়ন।
বলা হয়—
একেই তো বলে নিরাপত্তা।
এবং বলা হয়—
এরই নাম জনকল্যাণ।
শুধু বলা হয় না এই কথা,
কবে থেকে
নমুনা সংগ্রহ হয়ে গেল মানুষ!
আমি দেখেছি,
আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকা
চাষির চোখে
একদিন হঠাৎ ঢুকে পড়েছে
এক অদৃশ্য মাইক্রোস্কোপ।
সে আর মেঘ দেখে না, বৃষ্টিও না—
দেখে চলে পরিমাপ।
আমি শুধু দেখেই যাচ্ছি,
একজন বৃদ্ধ তার শিরায়
ধীরে ধীরে প্রবেশ করা সময়কে দেখছে
আর গোপনে চিৎকার করে বলছে—
“আমার শরীর কি আমারই?”
কেউ উত্তর দেয় না।
শুধু দূরে কোথাও
কাঁচের দেয়ালের আড়ালে
অসংখ্য সাদা পোশাকের ছায়া
নতুন নতুন লিপি সাজায়।
তারা মানুষের পুরনো ভাষা জানে না।
তারা তাই যা জানে,
অর্থাৎ শতকরা হার
সেটাই শক্ত করে কষে চলেছে।
তারা অবশ্য জানে
ঝুঁকির কী কী অনুপাত।
তারা বেশ জানে
কত লক্ষ প্রাণের ভেতর
কতজনকে ভুলে গেলে
সভ্যতার মুখ রক্ষা করা যায়।
তারপর একদিন
আমি জলের দিকে ঝুঁকে দাঁড়ালাম।
আমার প্রতিবিম্ব পড়ল না—
কিন্তু
জল থেকে উঠে কুড়ুলের মতো দেখাল একটা বারকোড।
তারপর কিছু অনুমোদনপত্র।
তারপর কিছু সিলমোহর।
দেখাল আমার চেয়ে
বেশি মূল্যবান সব তথ্য।
সেই রাতে
আমি স্বপ্নে দেখলাম—
একটি বিশাল দাবার ছক জল থেকে উঠে এল
সেই সাদা-কালো সব ঘরে
হাঁটছে কোটি কোটি মানুষ
আমিও, তুমিও, তার ভিতর
ভাবছি নিজেদের ইচ্ছায় আমরা চলেছি —
আমাদের নাড়াচাড়ার বিধাতা যারা সেই খেলোয়াড়দের
কেউ দেখতে পায় না।
শুধু মাঝে মাঝে
কোনো ঘুঁটি হারিয়ে যায়।
আর বোর্ডের পাশে প্ল্যাকার্ডে
লেখা থাকে— ‘সাইড এফেক্ট’।
ভোর হলে
আমি জানালার পাশে দাঁড়ালাম।
সূর্য উঠেছিল
দেখি রাস্তা দিয়ে এক শিশু স্কুলে যাচ্ছে।
এক প্রৌঢ়া গাছে জল দিয়ে চলেছে।
বৃদ্ধ এক প্রতিবেশী খবরের কাগজ পড়ছে।
সবকিছু চেনা জানা পরিচিত।
তবু মনে হচ্ছিল—
পৃথিবীর সবচেয়ে বড়ো পরীক্ষাগার
কোনো দালানের ভিতরপ্রদেশ নয়।
তা সম্ভবত
মানুষ নামক প্রাণির বিশ্বাসের তলদেশে।
আর সবচেয়ে দুর্লভ ও বিপন্ন
পদার্থটির নাম— প্রশ্ন!
৩০/৫/২০২৬

