দাসত্ব-উত্তর দেহের খেলা: ব্রাজিল ও জোগো বনিটো  (পর্ব-২)

ব্রাজিলে ফুটবলের জন্ম ইউরোপীয় অনুকরণ হিসেবে হলেও তার বেড়ে ওঠা সম্পূর্ণ ভিন্ন পথে। উনিশ শতকের শেষভাগে চার্লস মিলারের হাত ধরে ফুটবল যখন ব্রাজিলে আসে, তখন তা ছিল শ্বেতাঙ্গ অভিজাতদের ক্লাবভিত্তিক খেলা— পরিষ্কার মাঠ, নির্দিষ্ট পোশাক, নিয়মের কঠোরতা। কিন্তু ব্রাজিল সমাজ নিজেই ছিল এক ভিন্ন বাস্তবতার নাম— দাসত্বের দীর্ঘ ইতিহাস, আফ্রিকান উত্তরাধিকার, শ্রেণি-বৈষম্য, আর তার মধ্যেই টিকে থাকার জন্য গড়ে ওঠা এক বিকল্প সাংস্কৃতিক বুদ্ধিমত্তা। ফুটবল সেই বাস্তবতায় ঢুকেই বদলে যেতে শুরু করে।

ব্রাজিলে দাসপ্রথা বিলুপ্ত হয় ১৮৮৮ সালে— বিশ্বের অন্যতম বিলম্বে। তার মানে, ফুটবল আসার সময় ব্রাজিলের সমাজে কালো ও মিশ্র জাতিগোষ্ঠীর মানুষেরা সদ্য-স্বাধীন, কিন্তু সামাজিকভাবে বঞ্চিত। তাদের শরীর ছিল শ্রমের জন্য, আনন্দের জন্য নয়— এই ধারণাই প্রচলিত ছিল। কিন্তু এই শরীরই বহন করত আফ্রিকান সাংস্কৃতিক স্মৃতি— ছন্দ, নাচ, ছলা, কৌশল, এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণভাবে দেহকে অস্ত্র ও ভাষা হিসেবে ব্যবহার করার ক্ষমতা। এই দেহ যখন ফুটবলের সংস্পর্শে আসে, তখন ইউরোপীয় নিয়ম ভেঙে পড়ে। এখানেই ব্রাজিলিয়ান ফুটবলের মূল রূপান্তর। ইউরোপে ফুটবল যেখানে ছিল স্থান-নির্ভর ও শৃঙ্খলাভিত্তিক—কে কোথায় দাঁড়াবে, কীভাবে পাস করবে—ব্রাজিলে ফুটবল হয়ে ওঠে দেহ-নির্ভর। এখানে সিদ্ধান্ত আসে চোখে নয়, শরীরে। এই দেহভাষার নামই পরে পরিচিত হয় ‘গিঙ্গা’ হিসেবে। গিঙ্গা কোনো নির্দিষ্ট স্কিল নয়; দুলে চলার এক মানসিকতা— যেখানে খেলোয়াড় স্থির থাকে না, নিজের শরীরকে ক্রমাগত প্রশ্নবিদ্ধ করে তোলে। প্রতিপক্ষ এখানে কেবল বাধা নয়; সে এক বিভ্রান্তিযোগ্য মন।

এই গিঙ্গার সাংস্কৃতিক উৎস লুকিয়ে আছে ক্যাপোইরায়— একটি আফ্রো-ব্রাজিলিয়ান নৃত্য– আবার যুদ্ধকলা। দাসেরা যখন অস্ত্র বহন করতে পারত না, তখন তারা যুদ্ধ শিখেছিল নাচের ছদ্মবেশে। এই বিশেষ জায়গা থেকেই ব্রাজিল ফুটবলের সঙ্গে অন্য সব দেশের মৌলিক পার্থক্য তৈরি হয়— এখানে আনন্দ কোনো পার্শ্বফল নয়, এটি মূল নীতি।

এই নীতির নামই পরে দেওয়া হয় জোগো বনিটো— সুন্দর খেলা। কিন্তু ‘সুন্দর’ শব্দটি এখানে আলংকারিক নয়; একেবারেই নৈতিক ও আস্তিত্বিক। জোগো বনিটো মানে এমন খেলা, যেখানে মানুষ যন্ত্রে পরিণত হয় না; যেখানে সৃজনশীলতা শাস্তিযোগ্য অপরাধ নয়; যেখানে ভুল করা মানে লজ্জা নয়, আবার চেষ্টা করা। ব্রাজিলে একটি ড্রিবল ব্যর্থ হলে দর্শক রাগ করে না—কারণ তারা জানে, চেষ্টা না-করলে সৌন্দর্য আসে না। এই দর্শক-খেলোয়াড় সম্পর্কই জোগো বনিটোর সামাজিক ভিত্তি।

এই দর্শনের ব্যবহারিক রূপ হলো জোগা বনিটো— ‘সুন্দরভাবে খেলো’। যা কোনো নির্দিষ্ট কৌশল নয়; তা মাঠে নামার মানসিকতা। জোগা বনিটো খেলোয়াড়কে বলে— তুমি কেবল ম্যাচ জিততে নামোনি; তুমি একটি সংস্কৃতির প্রতিনিধিত্ব করতে নেমেছ। এই আহ্বানেই লুকিয়ে আছে ব্রাজিলীয় ফুটবলের নৈতিক দায়ের চাপ। তাই ব্রাজিলের খেলোয়াড়রা শুধু হারলে নয়— কুৎসিতভাবে জিতলেও সমালোচিত হয়। এই সাংস্কৃতিক বাস্তবতা থেকেই জন্ম নেয় রাস্তার ফুটবল—‘পেলাদা’। পেলাদা কোনো একাডেমি নয়; একেবারে কাঠামোবিহীন খেলা। অসমান মাঠ, ভাঙা বল, অনির্দিষ্ট নিয়ম—এই অনিশ্চয়তার মধ্যেই ব্রাজিলীয় খেলোয়াড় শেখে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে। এখানে কোচ নেই, কিন্তু আছে পরিস্থিতি। এই পরিস্থিতিই ব্রাজিলীয় স্কিলের সবচেয়ে বড়ো শিক্ষক। ইউরোপীয় একাডেমি যেখানে খেলোয়াড়কে নির্দিষ্ট সমাধান শেখায়, পেলাদা সেখানে শেখায় সমাধান সৃষ্টি করতে।

এই কারণেই ব্রাজিলীয় স্কিল কখনো পাঠ্যবইয়ের অনুশীলন নয়। বাইসাইকেল কিক, এলাস্টিকো, নো-লুক পাস— এসব স্কিল আগে ছিল খেলোয়াড়ের আনন্দ, পরে কোচের টুলস। এই উল্টো ধারাটিই ব্রাজিলকে আলাদা করেছে। এখানে শিল্প আগে, প্রয়োগ পরে। এই ধারাই বিশ্ব ফুটবলকে নতুন নতুন সম্ভাবনা দিয়েছে।

ক্যাপোইরা: যুদ্ধের ছদ্মবেশে দেহের শিক্ষা

কিছু লড়াই সামনে থেকে হয় না।

কারণ সামনে দাঁড়ালে শুধু প্রতিপক্ষ দেখা যায় না— পরিণতিও দেখা যায়। দাসত্ব-উত্তর সমাজ খুব তাড়াতাড়ি এই সত্যটা বুঝে গিয়েছিল। তাই সে যুদ্ধকে বাতিল করেনি; যুদ্ধের ভাষা বদলে দিয়েছিল। আঘাতকে সরিয়ে রেখেছিল শরীরী দোলার ভেতরে, সংঘর্ষকে লুকিয়ে দিয়েছিল ছন্দের আড়ালে। এই বদলটাই ক্যাপোইরা। ক্যাপোইরাকে প্রায়ই যুদ্ধকলার তালিকায় রাখা হয়। এই তালিকাভুক্তি আসলে তাকে বোঝার সবচেয়ে সহজ, এবং সবচেয়ে ভুল পদ্ধতি। ক্যাপোইরা যুদ্ধের জন্য তৈরি হয়নি; তৈরি হয়েছে যুদ্ধ এড়ানোর জন্য। এখানে দেহের লক্ষ্য প্রতিপক্ষকে ধ্বংস করা নয়, পরিস্থিতিকে অকার্যকর করে দেওয়া। দেহ সোজা দাঁড়ায় না, নিচু হয়। আঘাতের রেখায় থাকে না, পাশ কাটায়। শক্তির সঙ্গে সরাসরি সংঘর্ষ নয়— শক্তির ভেতরের ফাঁক তৈরি করা।

এই ফাঁক তৈরির মধ্যেই ক্যাপোইরার দর্শন। কারণ দাসত্ব-উত্তর সমাজ জানত— শক্তির সঙ্গে সরাসরি লড়াই মানে নিশ্চিহ্ন হওয়া। তাই দেহ শিখে নেয়, কীভাবে শক্তির সম্মুখে না-গিয়ে শক্তিকে ঘুরিয়ে দিতে হয়। এই ঘুরিয়ে দেওয়ার ভেতরে কোনো কাপুরুষতা নেই; আছে দীর্ঘমেয়াদি বুদ্ধি। ক্যাপোইরার দেহ তাই নিচু। এই নিচু থাকা কোনোভাবেই নম্রতার প্রতীক নয়; এক কৌশল। নিচু দেহ মানে ভারকেন্দ্র বদলে দেওয়া। যে দেহ নিচু, সে সহজে ধরা পড়ে না। যে দেহ ঘোরে, সে আঘাতের কেন্দ্রকে অস্থির করে তোলে। এই অস্থিরতাই নিরাপত্তা। এই ঘূর্ণনও তাই খুব গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ঘূর্ণন মানে রেখা ভাঙা। আর উপনিবেশিক ক্ষমতা সবসময় রেখায় কাজ করে— সীমা, নিয়ম, শৃঙ্খলা। রেখা মানে নিয়ন্ত্রণযোগ্যতা। ক্যাপোইরার পরিবর্তিত বৃত্ত সেই রেখাকে অকার্যকর করে। সেই বৃত্তে কোনো স্থায়ী কেন্দ্র থাকে না। কেন্দ্র না-থাকলে ক্ষমতাও স্থির থাকে না। এই কারণেই ক্যাপোইরা কখনো মুখোমুখি লড়াই নয়। এখানে প্রতিপক্ষের সঙ্গে সম্পর্ক সরাসরি নয়; বরং পাশ কাটানো। আর এই পাশ কাটানোর মধ্যেই এক ধরনের নৈতিক বুদ্ধি কাজ করে— শক্তিকে সম্মান না-করে, শক্তিকে ব্যবহার করা। এই ব্যবহার আবার কোনো চাতুর্যও নয়। তা অস্তিত্বের প্রশ্ন।

এইখানেই ক্যাপোইরার পদ্ধতি নাচের কাছাকাছি আসে। কিন্তু নাচ এখানে সৌন্দর্যের অনুশীলন নয়। এক ছদ্মবেশ। দেহ যা করতে চায়, তা সরাসরি করলে বিপদ। তাই দেহ তাকে ঘুরিয়ে নেয়। নড়াচড়াকে বিনোদনের আকার দেয়, যাতে আঘাত চোখে না-পড়ে। এক ধরনের ভান তৈরি হয়— যেখানে প্রতিপক্ষ ভেবে নেয়, কিছু হচ্ছে না, অথচ ঠিক তখনই সব হচ্ছে। এই ভানের নাম ‘মালিসিয়া’। মালিসিয়া কোনো সাধারণ চালাকি নয়। দেহের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা। এমন এক বুদ্ধি, যা জানে— সব সুযোগ নিতে নেই। সব শক্তি দেখাতে নেই। সব আঘাত দিতে নেই। কোনটা দেখাতে হবে, কোনটা লুকোতে হবে— এই বাছাইয়ের মধ্যেই টিকে থাকার শিল্প। এই সংযম কিন্তু দুর্বলতার লক্ষণ নয়। বলা যায়, পরিণতির লক্ষণ। যারা দীর্ঘদিন বেঁচে থাকে, তারা জানে— সব লড়াই জেতার জন্য নয়।

ক্যাপোইরার দেহ তাই অপেক্ষা করতে জানে। এই অপেক্ষা নিষ্ক্রিয় নয়। ভেতরে ভেতরে সক্রিয়। দেহ নিচু হয়ে থাকে, কিন্তু সর্বদা প্রস্তুত। চোখ সবকিছু দেখে, কিন্তু কিছু প্রকাশ করে না। এই সময়বোধ খুব গুরুত্বপূর্ণ। যা ঘড়ির সময় নয়; দেহের সময়। যে দেহ বহুদিন অপেক্ষা করেছে, সে জানে— সব মুহূর্ত সমান নয়। এই দেহগত সময়বোধ-ই পরে ফুটবলে ঢুকে পড়ে। ব্রাজিলীয় ফুটবলে যে বিলম্ব, যে থেমে যাওয়া, যে হঠাৎ দিক বদল— তা অলসতা নয়। তা স্মৃতি। ক্যাপোইরার স্মৃতি। যেখানে দেহ জানে— আগে সরো, পরে এগোও। আগে ঘুরে যাও, পরে আঘাত আসবে। এই কারণেই ব্রাজিলীয় ফুটবলের ড্রিবল প্রায়শই অপ্রয়োজনীয় বলে মনে হয়। কেন সামনে যেতে গিয়ে হঠাৎ থামা? কেন সহজ পাসের জায়গায় অতিরিক্ত স্পর্শ? এই প্রশ্নগুলো আসলে ভিন্ন নৈতিকতার প্রশ্ন। ব্রাজিলীয় ড্রিবল কেবল বল এগোনোর কৌশল নয়; তা প্রতিপক্ষের প্রত্যাশা ভাঙার পদ্ধতি। প্রতিপক্ষ শুধু পা দিয়ে খেলছে না; সে ভাবছে। ড্রিবল সেই ভাবনাকেই আঘাত করে।

এই আঘাত নিঃশব্দ। কিন্তু গভীর।

এইখানেই ফুটবল আর কেবল শারীরিক খেলা থাকে না। একেবারে মানসিক খেলাও হয়ে ওঠে। ক্যাপোইরা দেহকে শিখিয়েছিল— কীভাবে প্রতিপক্ষকে এমন জায়গায় দাঁড় করাতে হয়, যেখানে সে ভুল সিদ্ধান্ত নেবে। মাঠে এই ভুল সিদ্ধান্তই সবচেয়ে বড়ো জয়। এই কারণে ব্রাজিলীয় ফুটবলে ভুলের ধারণা আলাদা। এখানে ভুল মানে ব্যর্থতা নয়। ভুল মানে পরীক্ষা। এই মানসিকতা ক্যাপোইরা থেকেই আসে। কারণ ক্যাপোইরায় সরাসরি জয় নেই। আছে টিকে থাকা। আর টিকে থাকতে হলে পরীক্ষা করতেই হয়। সেই পরীক্ষার মধ্যেই দেহ নিজের ভাষা খুঁজে পায়। এই ভাষা কোনো বইয়ের ভাষা নয়। অনুশীলনের ভাষা। দেহ জানে, কিন্তু ব্যাখ্যা করতে পারে না। এই অচেতন ধারাবাহিকতাই সংস্কৃতি।

এইখানেই বোঝা যায়— কেন ব্রাজিলীয় ফুটবল অনুকরণীয়, কিন্তু অনুকরণযোগ্য নয়। ট্রিক অনুকরণ করা যায়। ভঙ্গি নকল করা যায়। কিন্তু দেহের স্মৃতি নকল করা যায় না। কারণ সেই স্মৃতি সময় চায়। পরিবেশ চায়। সামাজিক চাপ চায়।

ক্যাপোইরা তাই কোনো অতীত নয়। এক চলমান প্রক্রিয়া। আজও মাঠে, খেলার ফাঁকে, দেহ যখন সামনে না-গিয়ে পাশ কাটায়— তখন ক্যাপোইরা কাজ করে। কোনো ঘোষণা ছাড়াই।

এই কাজ চুপচাপ। কারণ ঘোষণা মানে দৃশ্যমানতা। আর দৃশ্যমানতা মানে ঝুঁকি।

দাসত্ব-উত্তর দেহ ঝুঁকি নিতে জানে। কিন্তু সে জানে— কোন ঝুঁকি নেবে না। এই বাছাই-বুদ্ধিই ক্যাপোইরার সবচেয়ে গভীর উত্তরাধিকার। ফুটবল এই উত্তরাধিকারকে বড়ো মঞ্চ দিয়েছে। বদলে দেয়নি। এই জন্যই ব্রাজিলীয় ফুটবল কখনো পুরোপুরি শৃঙ্খলায় বাঁধা পড়ে না। নিয়ম থাকে, কৌশল থাকে, পরিকল্পনা থাকে। কিন্তু নিয়মের ফাঁকে দেহ কথা বলে। এই কথার ভাষা সোজা নয়। এই কথার ভাষা ঘুরে আসে। এ-ই তো ক্যাপোইরা। এই ঘুরে আসাই হলো ব্রাজিলীয় ফুটবলের স্বর।

এই স্বর যখন আরেকটি স্বরের মুখোমুখি হবে— যখন ইংরেজ শৃঙ্খলা, রেখা আর অবস্থানের ভাষার সঙ্গে সংঘর্ষ হবে—তখন খেলার ভেতর নতুন দ্বন্দ্ব জন্ম নেবে। সেই দ্বন্দ্বেই ফুটবল প্রথম সত্যি সত্যি নিজের ভাষা খুঁজে পাবে।

ইংরেজ খেলাব্রাজিলীয় ভাষা: শৃঙ্খলার বিরুদ্ধে স্মৃতি

ফুটবল যখন ব্রাজিলে আসে, তখন সে কোনো শূন্য জায়গায় আসে না। সে এমন এক সমাজে ঢোকে, যেখানে দেহ ইতিমধ্যেই কথা বলতে শিখেছে— কিন্তু সেই কথা শব্দে নয়। নড়াচড়ায়। দোলে। অপেক্ষায়। ভানে। ইংরেজরা যে খেলাটি এনেছিল, তার ভাষা ছিল পরিষ্কার। রেখা টানা মাঠ, নির্দিষ্ট অবস্থান, নির্দিষ্ট দায়িত্ব। ফুটবল এখানে ছিল এক ধরনের চলমান জ্যামিতি। কে কোথায় দাঁড়াবে, কে কখন এগোবে, কে কখন বল ছাড়বে— সবকিছু আগেভাগে পরিকল্পনা করা যায়। এই পরিকল্পনাই ছিল ইংরেজ ফুটবলের শক্তি।

কিন্তু ব্রাজিলের দেহ সেই পরিকল্পনা-নির্ভরতায় অভ্যস্ত ছিল না। দাসত্ব-উত্তর সমাজে ভবিষ্যৎ সবসময় অনিশ্চিতই থাকে। আগামী মুহূর্ত কী হবে, তা জানা ছিল না। ফলে দেহ শিখে নিয়েছিল— পরিকল্পনার চেয়ে প্রতিক্রিয়া গুরুত্বপূর্ণ। স্মৃতির চেয়ে তাৎক্ষণিক বুদ্ধি জরুরি। এই দেহভাষার সঙ্গে ইংরেজ ফুটবলের প্রথম সংঘর্ষ তাই অনিবার্য ছিল।

ইংরেজ ফুটবল দেহকে বিশ্বাস করত না। সে কাঠামোকে বিশ্বাস করত। খেলোয়াড় এখানে কাঠামোর অংশ। ব্রাজিলে দেহ কাঠামোর বাইরে থেকেও কথা বলতে চেয়েছিল। এইখানেই দ্বন্দ্ব।

এই দ্বন্দ্ব কোনো নাটকীয় মুহূর্তে ঘটেনি। ধীরে ধীরে, ছোটো ছোটো অনিয়মের মাধ্যমে। খেলোয়াড় ঠিক জায়গায় দাঁড়াল না। পাস দেওয়ার কথা থাকলেও ড্রিবল করল। থামার কথা থাকলেও এগোল। এই সবকিছু প্রথমে ভুল বলে মনে হয়েছিল। কিন্তু সেই ভুলগুলোই খেলার ভাষা বদলে দিতে শুরু করল। এই বদল খুব সূক্ষ্ম। কারণ ফুটবল নিজেই এক ধরনের নীরব শিল্প। এখানে পরিবর্তন ঘোষণার মাধ্যমে আসে না; আসে অভ্যাসের মাধ্যমে। ব্রাজিলীয় খেলোয়াড়রা ইংরেজ নিয়ম মানছিল, কিন্তু শরীর মানছিল না। শরীর তার পুরনো স্মৃতি ভুলে যেতে পারছিল না। ক্যাপোইরার ঘূর্ণন, সাম্বার দোল, কার্নিভালের ভান— সবই মাঠে ঢুকে পড়ছিল। এই যে ঢুকে পড়া, তা কোনো সচেতন বিদ্রোহ ছিল না। ছিল অবচেতন অনুবাদ। ইংরেজ খেলাকে ব্রাজিলীয় দেহ নিজের ভাষায় পড়তে শুরু করেছিল। আর এই অনুবাদ প্রক্রিয়ায় একটি বড়ো পরিবর্তন ঘটে— ফুটবল আর কেবল ফলাফলের খেলা থাকে না। ফুটবল হয়ে ওঠে অভিব্যক্তির জায়গা। মাঠ তখন শুধু প্রতিযোগিতার স্থান নয়; মাঠ হয়ে ওঠে দেহের প্রকাশভূমি। এখানে দেহ লুকোতে বাধ্য নয়। দেহ আরও দৃশ্যমান হতে পারে।

দৃশ্যমানতার এই প্রশ্নটি খুব গুরুত্বপূর্ণ। কারণ দাসত্ব-উত্তর সমাজে দেহকে দৃশ্যমান করাই ছিল রাজনৈতিক কাজ। ইংরেজ ফুটবল দেহকে প্রায় অদৃশ্য রাখতে চেয়েছিল— সবাই একইরকম চলবে, একইরকম খেলবে। ব্রাজিলীয় ফুটবল এই সমতা মেনে নেয়নি। এখানে প্রত্যেক দেহ নিজের ইতিহাস নিয়ে খেলতে চেয়েছে। এই কারণেই ব্রাজিলীয় ফুটবলে ব্যক্তিত্ব এত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। একই পজিশনে দুই খেলোয়াড় একরকম খেলেন না। কারণ পজিশন এখানে নির্দেশ নয়; তা কেবল সম্ভাবনা। এই ধারণা ইংরেজ ফুটবলের বিপরীত। সেখানে পজিশন মানে দায়িত্ব। এখানে পজিশন মানে সুযোগ।

এই সুযোগের ধারণাই জোগো বনিটোর প্রথম বীজ।

ইংরেজ ফুটবল সময়কে ভাগ করে নেয়— ডিফেন্স, মিডফিল্ড, আক্রমণ। ব্রাজিলীয় দেহ এই ভাগ মানতে চায় না। দেহ জানে— সময় ভাঙা যায় না। সময় প্রবাহমান। তাই একজন খেলোয়াড় কখনো ডিফেন্ডার, কখনো মিডফিল্ডার, কখনো আক্রমণকারী হয়ে ওঠে। এই তরলতা ইংরেজের চোখে বিশৃঙ্খলা। ব্রাজিলীয় চোখে যা ছিল স্বাভাবিক।

আসলে দারিদ্র্যের ভিতর থেকে আসে এই স্বাভাবিকতা। যেখানে জীবনে কোনো কিছু স্থির নয়, সেখানে দেহও স্থির থাকতে শেখে না। এই দেহ যখন ফুটবলে নামে, তখন খেলা বদলে যায়। যে বদল একসময় দর্শকও বুঝতে শুরু করে। তারা দেখে— এই খেলা অন্যরকম। এখানে বল শুধু এগোয় না; দোলে। এখানে গতি শুধু দ্রুত নয়; ছন্দময়। এই ছন্দ আসে মাঠের বাইরে থেকে। রাস্তাঘাট, উঠোন, উৎসব— সবকিছু মাঠে ঢুকে পড়ে।

এইখানেই ইংরেজ ফুটবল হেরে যায়। কারণ সে শুধু খেলাকে এনেছিল। ব্রাজিল তার সঙ্গে এনেছিল জীবন।

এই জীবনকে নিয়ন্ত্রণ করা সহজ নয়। কোচরা চেষ্টা করেছেন। নিয়ম বানানো হয়েছে। শৃঙ্খলা আনার চেষ্টা হয়েছে। কিন্তু দেহ সবসময় ফাঁক খুঁজে নিয়েছে। এই ফাঁক যে-কোনো দুর্বলতা কাটিয়ে শক্তির জায়গা খুঁজে পেয়েছে। কারণ ফাঁক মানেই সম্ভাবনা। এর ওপরে দাঁড়িয়েই ব্রাজিলীয় ফুটবল নিজের নৈতিকতা তৈরি করে। এখানে ঝুঁকি নেওয়া অপরাধ নয়। বরং ঝুঁকি না-নেওয়াই সন্দেহজনক। যেখানে ইংরেজ তথা ইউরোপের ফুটবলে ছিল কেবল নিরাপত্তা; তা-ই ছিল প্রধান গুণ।

এই পার্থক্যই দুই ফুটবলকে আলাদা করে দেয়।

ফলত এসে পড়ে দর্শনের প্রশ্ন। ইংরেজ ফুটবল বিশ্বাস করে— মানুষ কাঠামোর মধ্যে থাকলেই সেরা হয়। ব্রাজিলীয় ফুটবল বিশ্বাস করে— মানুষ কাঠামো ভাঙলেই নিজেকে খুঁজে পায়। এই দুই বিশ্বাসের সংঘর্ষই আধুনিক ফুটবলের ইতিহাস। ব্রাজিল এই সংঘর্ষে কখনো পুরোপুরি জেতেনি। কখনো হেরেও যায়নি। সে শিখেছে— কখন শৃঙ্খলা দরকার, কখন স্মৃতি। এই শেখাটাই তাকে আলাদা করেছে। এই কারণেই ব্রাজিলীয় ফুটবল কোনো নির্দিষ্ট যুগে আটকে থাকে না। সে বদলায়, কিন্তু নিজেকে অস্বীকার করে না। ইংরেজ খেলা তাকে শিখিয়েছে— কাঠামো কী। ব্রাজিলীয় দেহ তাকে শিখিয়েছে— কাঠামোর ভেতর কীভাবে নিশ্বাস নিতে হয়।

এই নিশ্বাস-ই তো জোগো বনিটো।

জোগো বনিটো মানে কেবল সুন্দর খেলা নয়। জোগো বনিটো মানে— খেলা যেন দেহের বিরুদ্ধে না যায়। দেহকে যেন নিজের স্মৃতি ভুলে খেলতে না হয়। এই কাজ সহজ নয়। কারণ আধুনিক ফুটবল শৃঙ্খলা চায়। ফলাফল চায়। হিসেব চায়। পরের দ্বন্দ্ব জন্ম নেবে ঠিক এই অবস্থান থেকেই। যখন ব্রাজিল বুঝবে— শুধু ভাষা থাকলেই চলবে না; ফলাফলও চাই। এই দ্বন্দ্বই পরের পর্বের বিষয়।

(চলবে…)

### ড. অনিশ রায়

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!
Scroll to Top