কবিতা- হায় চিল
কবি- জীবনানন্দ দাশ
হায় চিল, সোনালি ডানার চিল, এই ভিজে মেঘের দুপুরে
তুমি আর কেঁদোনাকো উড়ে-উড়ে ধানসিড়ি নদীটির পাশে!
তোমার কান্নার সুরে বেতের ফলের মতো তার ম্লান চোখ মনে আসে;
পৃথিবীর রাঙা রাজকন্যাদের মতো সে যে চ’লে গেছে রূপ নিয়ে দূরে;
আবার তাহারে কেন ডেকে আনো? কে হায় হৃদয় খুঁড়ে
বেদনা জাগাতে ভালোবাসে!
হায় চিল, সোনালি ডানার চিল, এই ভিজে মেঘের দুপুরে
তুমি আর উড়ে-উড়ে কেঁদোনাকো ধানসিড়ি নদীটির পাশে।
হায় চিল : স্মৃতি-বিরহের সানন্দ জাগরণ
অনিশ রায়
।।১।।
মহৎ কবিতা কীভাবে লেখা হয়, তা স্রষ্টা জানেন না। কবিতার মধ্যে কী কী উপাদান পেলে পাঠক কবিতাটিকে মহৎ কবিতা বলে স্বীকৃতি দিতে পারে, তা পাঠকও জানে না; তবে এক গভীর বিস্ময়ের আবেশে মগ্ন হয় পাঠক। সেই বিস্ময়-ই তো নতুন আবিষ্কারের সম্ভাবনাকে উসকে দেয় অবিরাম। এই একটাই পথের কথা বোধহয় নিশ্চিত করে বলা যায় মহৎ কবিতার শর্ত নির্ণয়ে। যা পাঠককে কখনো মসৃণ ও নির্বিঘ্ন থাকতে দেয় না। যা পাঠকের আবিষ্কার-প্রবণ যাত্রাকে অব্যাহত রাখে সুদীর্ঘ কাল ধরে। জীবনানন্দের কবিতা এই কারণেই মহৎ। কবিতার বিভিন্ন স্তরে তিনি এই আশ্চর্য বিস্ময় তৈরি করে গেছেন বার বার। বেদনাবোধের অস্তিত্বিক প্রতিবেদনও সেই আশ্চর্য বিস্ময়ের বাহক হয়ে মিথ ও আত্মস্মৃতিধারক ইতিহাসের অকথিত বয়ান হয়ে উঠতে চেয়েছে কবির অনেক কবিতায়। ‘বনলতা সেন’ কাব্যের ‘হায় চিল’ সেই সাক্ষ্যই বহন করে।
॥২॥
রোমান্টিক প্রেমের বেদনাবিধুর স্মৃতির রসোদ্গার জীবনানন্দের এই কবিতা। কবিতায় ব্যর্থ প্রেমের অনুষঙ্গ এবং প্রেমিকসত্তার নিঃসঙ্গ কাতরতা-ই মূল বিষয়। তবে পরিবেশনের যে শৈল্পিক মাত্রা, তা অনন্য। এক বর্ষণসিক্ত মেঘলা দিনের বিষণ্ণতার আবহে কবিতাটি শুরু—
“হায় চিল, সোনালি ডানার চিল, এই ভিজে মেঘের দুপুরে
তুমি আর কেঁদো নাকো উড়ে উড়ে ধানসিড়ি নদীটির পাশে।
তোমার কান্নার সুরে বেতের ফলের মতো তার ম্লান চোখ মনে আসে।”
কোনো এক মেঘাচ্ছন্ন ভেজা দুপুরে ধানসিড়ি নদীর পাশে একটি চিল কেবলই উড়ে উড়ে ডেকে যায়। একা, সম্পূর্ণ একাকী। চিলের সেই ডাক কবির কাছে কান্না জড়ানো আর্ত হাহাকারের মতো মনে হয়। এক অসামান্য চিত্রকল্পের আয়োজনে কবিতার স্বল্পায়তনও ভাস্কর্যপ্রতিম হয়ে উঠেছে। যদিও শিল্প-আঙ্গিকের এই নির্মাণ প্রচ্ছন্ন হয়ে যায় অনুভূতির গভীরতায়। কেননা, চিলের বেদনার্ত কান্নার ক্ষণিকতার সঙ্গে কবির হৃদয়প্লাবিত বিরহ-বেদনার সুর মিশে গিয়ে তা চিরন্তন হয়ে উঠতে চেয়েছে। কবির যে অতীতবাহিত ব্যথা-বোধ অন্তরের গভীর আড়ালে প্রোথিত ছিল, তা-ই চিলের মায়াময় কান্নার অবিরাম আবর্তে ভেসে উঠতে চাইল—
“তোমার কান্নার সুরে বেতের ফলের মতো তার ম্লান চোখ মনে আসে।”
এ শুধু কবি-স্বভাবের ইঙ্গিতে মনুষ্যেতরের সঙ্গে মানবিক আত্মীয়তার ভাষ্যমাত্র নয়। এ এক অবিচ্ছিন্ন সত্তার বিস্তীর্ণ অনুভূতি। চিলের কান্না আর আত্মিক বেদনা-বোধের সমধর্মিতায় কবি বুঝেছেন যে, অতীতের স্মৃতি, ব্যথা বর্তমানেও থেকে যায়, ভবিষ্যতের পথেও হয় নীরব সঙ্গী। সে যেন জলের মতো ঘুরে ঘুরে কথা বলে চলে। প্রসঙ্গ অথবা অপ্রসঙ্গের বাইরে বেরিয়েই রবীন্দ্রনাথের ‘ছিন্নপত্রাবলী’ স্মরণ করা যাক—
“… জানি, এই গভীর বেদনাটুকু, যারা রইলো এবং যে গেল উভয়েই ভুলে যাবে, হয়তো এতক্ষণে লুপ্ত হয়ে গিয়েছে। বেদনাটুকু ক্ষণিক এবং বিস্মৃতিই চিরস্থায়ী। কিন্তু ভেবে দেখতে গেলে— এই বেদনাটুকু বাস্তবিক সত্য, বিস্মৃতি সত্য নয়। এক-একটা বিচ্ছেদ এবং এক-একটা মৃত্যুর সময় মানুষ সহসা জানতে পারে এই ব্যথাটা কী ভয়ংকর সত্যি।” (২৬ নং পত্র)
ফলত, বিস্মৃতির-বিভ্রম আমাদের সাময়িক সান্ত্বনা মনে হলেও, কোনো সংগত মুহূর্তে সেই ছদ্ম-আবরণ খসে পড়ে; আমরা অনুভব করি সময়ের তরঙ্গে যে সঞ্চয়, তা বিচ্ছেদাতুর বেদনারই এক অনির্বাণ উৎসারণ। কোনো বস্তুসংগতির সন্নিকর্ষেই তা কখনো কখনো প্রবল হয়ে ওঠে। এইখানে, এই কবিতায় ‘চিল’ হয়ে ওঠে সেই পুনর্জাগরিত বেদনার আলম্বন বিভাব, আর তার কান্না কবির স্ব-নিষ্কর্ষিত স্মৃতি উদ্ধারের উদ্দীপন বিভাব। সমগ্র কবিতায় তাই ‘চিল’ একই সঙ্গে সূত্রধর এবং রূপক হয়ে সত্তার বিকল্প সন্ধানকে বেগবান করেছে।
কবিতাটি শুরু হয় স্তোত্র কবিতার ঢঙে, ‘চিল’-কে সম্বোধন করে। আবার এই সম্বোধন পুনরাবৃত্ত এবং প্রসারিত— “হায় চিল, সোনালি ডানার চিল।” এর ফলে একদিকে কবির করুণ আর্তি এবং আন্তরিক অনুরোধের ভঙ্গিটি স্পষ্টতা পেয়েছে, সন্দেহ নেই। কিন্তু মনে হয়, এই পুনরাবৃত্ত এবং প্রসারিত উচ্চারণে ‘চিল’-এর দুই স্বভাব ও সময়-কালের পৃথক প্রেক্ষিত-ই অভিব্যক্ত। চিল মাংসাশী পাখি, হিংস্রতাই তার স্বাভাবিক পরিচয়, তবু সেই আমিষাশী ইন্দ্রিয়পরায়ণতার মধ্যেও তার প্রেমিক-হৃদয়ের নীলাঞ্জন আকুলতা রয়ে গেছে। আবার, বর্তমানে চিলের বেদনা-মিশ্রিত কান্নার যে অনুরণন তা ‘হায়’ শব্দে যেমন ফুটে ওঠে, তেমনি তার সোনালি ডানার বাহারে মেলে ধরা যেন অতীতের সোনালি প্রেমের স্মৃতি। স্মৃতির এই অবিরাম ভার বহন করেই সে সুখহীন হয়ে উড়ে উড়ে বেড়ায়। অথবা, হয়তো সোনার মতো বর্ণশোভিত সামাজিক পরিচয়ের আড়ালেই থাকে যন্ত্রণার কথকতা; আমাদের অন্তর্বর্তী চেতনায় জেগে থাকা শূন্যতার অসহায় কাতরতা। এই কারণেই বোধহয় জীবনানন্দ ‘চিল’-কে প্রেমিকসত্তার এক বিশেষ স্বীকৃতি দান করতে চান। অন্যত্র-ও দেখা যায় এই মনোভঙ্গির প্রকাশ—
(১) “সমস্ত পৃথিবী যেন মিশে যায় রৌদ্রের সাগরে
সিন্ধুচিল আর তার বনিতা যেখানে খেলা করে;”
(সমুদ্রচিল)
(২) “তাই বিরাট আকাশচিল উড়ে এসে
শূন্য বাতাসের ভিতর আঁকাবাঁকা ব্যর্থ জ্যামিতির দাগ রেখে গেল শুধু, তারপর দূর নীড়ের দিকে উড়ে গেল
হৃদয়ের পানীয়ের দিক।”
(চিঠি এল)
(৩) “চিলের কান্নার মতো শব্দ করে মেঠো ইঁদুরের ভিড় ফসলের
ঘুম গাঢ় করে দিয়ে যায়।”
(আবহমান)
(৪) “পৃথিবীর শেষ রৌদ্র খুঁজে
কেউ কি পেয়েছে কিছু কোনো দিকে? পায়নি তো কেউ।
তারপর বাদুড়ের কালো কালো ঢেউ
উড়ায়ে শঙ্খচিল কোথায় ডুবল চোখ বুজে।”
(সোনালি অগ্নির মতো)
(৫) “সোনালি সোনালি চিল— শিশির শিকার ক’রে নিয়ে গেছে তারে
কুড়ি বছরের পরে সেই কুয়াশায় পাই যদি হঠাৎ তোমারে।”
(কুড়ি বছর পরে)
(৬) “পৃথিবীর সমস্ত ধূসর প্রিয় মৃতদের মুখও সেই নক্ষত্রের ভিতর
দেখেছি আমি; অন্ধকার রাতে অশ্বত্থের চূড়ায় প্রেমিক চিলপুরুষের শিশির-ভেজা চোখের মতো ঝলমল করছিল সমস্ত নক্ষত্রেরা;” (হাওয়ার রাত)
(৭) “সমস্ত দিনের শেষে শিশিরের শব্দের মতো সন্ধ্যা আসে;
ডানার রৌদ্রের গন্ধ মুছে ফেলে চিল;”
(বনলতা সেন)
এভাবেই কবি রোমান্টিক কাব্য-চেতনার জগতে উপেক্ষিত পাখি চিলকে করে তোলেন সঙ্গ-কাতর নির্জন স্বভাবী প্রেমিক। নিজের মতো করে। প্রেম-হারানো প্রেমিক প্রেমের প্রতিফলনে যে অব্যক্ত ব্যথা, বিস্ময় ও অমৃত-আস্বাদ অনুভব করে, তা-ই যেন চিলের রূপকে করুণ রসোচ্ছলতা লাভ করে। সেই প্রেমিক-স্বভাব চিলকেই কবির অনুভবী অনুরোধ—
“এই ভিজে মেঘের দুপুরে
তুমি আর উড়ে উড়ে কেঁদো নাকো ধানসিড়ি নদীটির পাশে।”
“ভিজে মেঘের দুপুর” যেন ধূসর হৃদয়ের অশ্রুসিক্ত পরিসর। ‘আর’ অব্যয় সেই গোপন কান্নারই নিরবচ্ছিন্ন প্রবাহ। ‘উড়ে উড়ে’ ক্রিয়া নিঃসঙ্গতার অবিরাম চক্রমণকেই যেন দ্যোতিত করে। ‘কেঁদো নাকো’ বলার মধ্যে ‘নাকো’ শব্দে নিবিড় সংবেদনায় আন্তরিক আবেদনের স্বরটিই বেদনার দোসর হয়ে উঠতে চেয়েছে। ‘ধানসিঁড়ি নদী’ যতটা না নদী, তার থেকে অনেক বেশি ‘magic verbale’; তা যেন ধ্বনির ইশারায় চেতনার এক অবিরাম স্রোতধারা। বক্তব্যের সমর্থন পাওয়া যাবে ‘সে’ কবিতার দিকে দৃষ্টিপাত করলে। ‘হায় চিল’ পাঠকালে ‘সে’ কবিতাটির এক প্রাসঙ্গিক স্মরণ এসে যেতে পারে। কবিতার বয়ানে বলা হয়েছে—
“এর নাম ধানসিড়ি বুঝি?
মাছরাঙাদের বললাম;
গভীর মেয়েটি এসে দিয়েছিল নাম
আজও আমি মেয়েটিকে খুঁজি;
জলের অপার সিঁড়ি বেয়ে
কোথায় যে চলে গেছে মেয়ে।
মাছ আর মন আর মাছরাঙাদের ভালোবেসে ঢের আগে নারী এক—
তবু চোখ ঝলসানো আলো ভালোবেসে ষোল-আনা নাগরিক যদি না হয়ে
বরং হত ধানসিড়ি নদী।”
এই ‘ধানসিড়ি’-র পাশে উড়তে থাকা চিলের কান্নার সুরে “বেতের ফলের মতো তার ম্লান চোখ মনে আসে”। কোথায় যেন মনে হয়, ‘সে’ কবিতার গভীর মেয়েটিই ‘হায় চিল’ কবিতায় অম্লান স্মৃতির ম্লান বিষণ্ণতা হয়ে উপস্থিত হয়। (লক্ষণীয়, এই বাক্য একই সঙ্গে পূর্ণোপমা, স্মরণোপমা ও লুপ্তোপমার বোধকে কার্যকরী করে তোলে। এই আলংকারিক কারুকর্ম একেবারেই জীবনানন্দীয়। এবং এখানেই তার অনন্যতা)। ‘বেতের ফলের মতো ম্লান চোখ’ উপমা মুহূর্তেই আমাদের বিস্ময় আদায় করে নেয়। ‘বেতের ফল’ সহজ দৃষ্টিলভ্য নয়; কিন্তু কবি ‘ম্লান’ শব্দটি উল্লেখ করে তার একটা রূপাভাস দিয়েছেন। তাতে বেতফলের ধূসর বর্ণের ঔজ্জ্বল্যহীনতার ছবি জড়িয়ে যায় চোখে; অবশ্য এক রহস্যনিবিড় ভাবানুষঙ্গও এর অন্তর্গত উদ্দেশ্য-অভিমুখে খেলা করে। চোখের সঙ্গে বেতের ফলের অনুষঙ্গ জীবনানন্দে অন্যত্র-ও পাওয়া যায়—
(১) “আমাকে সে নিয়েছিল ডেকে বলেছিল : ‘এ নদীর জল তোমার চোখের মতো ম্লান বৈতফল।’” (সে)
(২) “বেতের ফলের মতো টলমল দুই চোখ জুড়ে নীল আশা ছিল ঢের।”
(পড়ে গেল একেবারেই আমারই ছায়ার কাছে)
এই সমস্ত নিয়ে চোখের যে ছবিটা মূর্ত হয়, তার সঙ্গে সহজেই মিশে যায় ধানসিড়ি নদীর অভিন্নতার কথা। এভাবেই কবিতার আবহে বহুস্তরীয় জটিলতার বাষ্প ‘ভিজে মেঘের দুপুরে’ মাখামাখি হয়ে থাকে।
॥৪॥
কবি যে বেদনাবিধুর অথচ উজ্জ্বল স্মৃতিতে “তার ম্লান চোখ” উদ্ধার করেন, তাকে বস্তুসঙ্গতি দানের অকৃত্রিম প্রয়োজনে বলেন—
“পৃথিবীর রাঙা রাজকন্যাদের মতো সে যে চলে গেছে রূপ নিয়ে দূরে
আবার তাহারে কেন ডেকে আন?”
রাঙা রাজকন্যার মতো সেই নারী কবির জীবন থেকে বহুদূরে রূপ নিয়ে চলে গেছে। চলমান জীবনের মধ্যে স্মৃতির অস্তিত্বকে স্থির প্রতিষ্ঠার পথ ও প্রক্রিয়া যেহেতু সহজ নয়, তাই বাস্তবঘেঁষা উপমার চেনা ছকে নয়, কবি রূপকথার কল্পনামথিত পথেই সেই নারীর স্মৃতি-নির্মাণ করতে চেয়েছেন। ‘রাঙা রাজকন্যা’ বলার সঙ্গে সঙ্গেই রূপকথার সৌন্দর্যদীপ্ত নারীর কথা স্মরণে আসে; তার পেলব, রহস্যময়, নীরব প্রেম-আকাঙ্ক্ষার কথাও সজীব হয়ে ওঠে। ‘পৃথিবীর’ শব্দে সেই রূপকথার দেশ জাগতিক পরিসীমা লাভ করে, কিন্তু সংকীর্ণ গণ্ডিবদ্ধতাকেও অতিক্রম করে যায়। ‘সে যে চলে গেছে রূপ নিয়ে দূরে’ বাক্যটি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র শব্দ সমাবেশে দ্রুত চলন তৈরি করেছে; তাতে এক চলচ্চিত্রধর্মী গতিময়তা প্রাপ্ত হয়েছে। আবার, ‘রূপ নিয়ে দূরে’ বাক্যাংশটি যেন রূপকথার মোহময় আবেশকে ভেঙে চুরমার করে দিয়েছে। বুঝতে অসুবিধা হয় না, সেই নারী রূপকথাসম রঞ্জিত প্রেমাকাঙ্ক্ষাকে অপূর্ণ রেখেই তার রূপরাশি নিয়ে চিরদিনের মতো দূরে চলে গেছে। অর্থাৎ, কবিতার এই পর্বে প্রেমের অপসরণ তথা বিচ্ছেদের নিরালম্ব বেদনার কথাই অভিব্যক্ত হয়েছে। তবে শুধু বেদনা নয়, রূপ-বিরহের বেদনাই বড়ো নির্দয় হয়ে বেজে উঠেছে। বাস্তব প্রেমের এই সরল-সমৃদ্ধ বিচ্ছেদ-যন্ত্রণাই চিলের কান্নার সাথে কবি-হৃদয়কে তোলপাড় করে তুলেছে। চিলের কান্না যেন আকাশী সত্তা হয়ে সেই সুদূরলোকের পথিককে আবার পুরনো পথে ফিরিয়ে আনতে ব্যস্ত; তবু সে যে অক্ষম, এক বিচ্ছিন্ন স্মৃতিলোকের অধিবাসী। তাই, অপ্রাপনীয়তার বাস্তব বোধে জর্জরিত কবি হৃদয়-নিংড়ানো সকরুণ আর্তিতে চিলের কাছে প্রশ্ন করেন— “আবার তাহারে কেন ডেকে আন?” সে থাক-না তার রূপহীন প্রবাসের পথে, বিস্মৃতির অতল শান্তি নিয়ে। কবির ছিন্ন-ভিন্ন সত্তার উৎপাত তাকে যেন সহ্য করতে না হয়। এর থেকে মহৎ প্রেমের ভাষ্য আর কী-ই বা হতে পারে? এখানে ‘তার’ এবং ‘তাহার’, দুই সর্বনামের পার্থক্য অনুধাবন জটিল নয়। বহুদূরের প্রাচীন রাজকন্যার প্রসঙ্গ আসার পরেই ‘তাহার’ সর্বনামের প্রয়োগ হয়েছে। যদি তা না হত, তবে বর্তমান থেকে প্রাচীনের ব্যবধানগত দূরত্বের বোধ যেমন ক্ষুণ্ণ হতো, তেমনি সুদূর পরাহত আবেগের দ্যোতনাও সৃষ্টি হতো না। এ জীবনানন্দের শিল্প-চেতনারই এক সচেতন প্রকাশ।
চিলের কাছে এমন সপ্রশ্ন আকুলতা জানিয়েই কবি উচ্চারণ করেন আত্ম-অসহায়তার ওপর ছদ্ম প্রলেপ মাখানো এক নিরাবেগ বিবৃতি—
“কে হায় হৃদয় খুঁড়ে
বেদনা জাগাতে ভালোবাসে।”
মনে হয়, এক কঠিন হৃদয়ের বাস্তবমুখী অভ্যস্তগ্রাহ্য উচ্চারণ এই বাক্য। কিন্তু শব্দের অন্বিষ্ট ইশারায় পৌঁছোতে পারলে দেখা যাবে কবি সম্পূর্ণ এক বিপরীত প্রস্তাব-ই রাখতে চাইছেন। ‘কে হায়’ শব্দবন্ধ কবির বেদনাঘন দীর্ঘশ্বাসেরই প্রকাশ। আর ‘খুঁড়ে’ শব্দটি তো সমগ্র কবিতার রোমান্টিক তরলতাকে মুহূর্তে ভেঙে দেয়। ‘খনন’ শব্দে যে মসৃণতা, ‘খুঁড়ে’ শব্দে তা নেই, এক আদিম রূপ তাতে ধরা পড়ে। হৃদয়ের প্রাচীন স্মৃতিকে এভাবেই চরমতার মধ্যে জাগিয়ে তুলতে হয়। আসলে সকল মানুষই হৃদয়ের অতলে বেদনার দহনকে নিবিয়ে রাখতে চায়। সকলেই ভুলে যায়, বেদনার আঘাতকে আড়ালে রাখতে চায়। কিন্তু সংবেদনশীল প্রেমিক হৃদয় তা পারে না; বিরহের যন্ত্রণাকে সজীব রেখেই সে প্রেমকে বাঁচিয়ে রাখতে চায় অনন্তকাল। সেই ব্যতিক্রমী প্রেমিকের গাঢ় আবেগার্দ্র স্বভাবেই কবি আরেক বিরহী প্রেমিকসত্তা চিলের সঙ্গে এভাবে সংলগ্ন হতে পেরেছেন। যেন ব্যথার ব্যথিতকে পেয়েই মনের সবেদন আলাপচারিতার মধুর অবকাশ পেয়ে গেলেন কবি। সত্যি বলতে, ভুলে থাকা যায় না, ভোলার ভ্রমে কেবল আত্মছলনাকেই প্রশ্রয় দেওয়া হয়। এই নির্মম, নির্দয় আত্মছলনার অভিশাপ থেকে নিজের শুদ্ধ প্রেমিক হৃদয়কে, নিজের প্রেমকে বাঁচাতে কবি তাই চিলের সঙ্গে সম্ভাষণে একটা কপট নির্ভার ছলনার অভিনয় করেন মাত্র। যে ছলনার প্রকাশ্য অভিনয় আমাদের প্রেম-বিস্মৃত পাথুরে মনেও বেদনাঘন স্মৃতির ঝরনা বয়ে আনে। এইভাবে প্রেমিক-অস্তিত্বের নিশ্চিত পরাজয়ের শাপমুক্তিতে, কবির সৌজন্যেই, আমরাও সত্তার প্রসারিত আকাশে তাকিয়ে দেখি নিঃসঙ্গ এক প্রেমিক চিল-পুরুষ অবিরাম উড়ে চলেছে। কবিতায় তাই আবর্তিত হয় প্রথম দুই পংক্তি—
“কে হায় হৃদয় খুঁড়ে
বেদনা জাগাতে ভালোবাসে।”
“হায় চিল, সোনালি ডানার চিল, এই ভিজে মেঘের দুপুরে
তুমি আর উড়ে উড়ে কেঁদো নাকো ধানসিড়ি নদীটির পাশে।”
তবে লক্ষণীয়, শেষ বাক্যটি অপরিবর্তিত ভাবে আবর্তিত হয়নি, তার পদক্রমের বিন্যাস গেছে সামান্য বদলে (প্রথমে— “কেঁদো নাকো উড়ে উড়ে”; দ্বিতীয় ক্ষেত্রে— “উড়ে উড়ে কেঁদো নাকো”)। কবিতার সূচনায় যে বেদনাবোধ কবির একক হৃদয়কে উস্কে দিয়েছিল, শেষে এসে তা বিশ্বগত প্রেমিক হৃদয়ে যেন ছড়িয়ে পড়তে চেয়েছে; তাই ‘উড়ে উড়ে’ শব্দের সম্মুখন ঘটেছে।
॥৫॥
অনেকেই ‘হায় চিল’ কবিতাটির সঙ্গে -এর ‘He Reproves the Curlew’ কবিতার নিকট সাদৃশ্য খুঁজে পান। অনেকে আবার ইয়েটস্-এর কবিতার অনুসরণ হিসেবে দেখতে চান ‘হায় চিল’ কবিতাকে। এ প্রসঙ্গে বলতে হয়, প্রভাব কখনোই অনুসরণ হতে পারে না। ‘হায় চিল’ কবিতায় ইয়েটস্-এর প্রভাবজনিত একটা বাচনিক সাদৃশ্য আছে ঠিকই, কিন্তু তা কোনোভাবেই অনুসরণ নয়। কবিতা দুটি পাশাপাশি রেখে পড়লে বোঝা যাবে, জীবনানন্দ তাঁর কবিতায় রসগ্রাহী ব্যঞ্জনা সৃষ্টিতে ইয়েটস্-কে ছাড়িয়ে গেছেন। অনায়াসেই প্রতিটি শব্দের ভিতরে যে নীলাঞ্জন ইশারা জীবনানন্দ তৈরি করে গেছেন, সেখানে ইয়েটস্-এর কবিতা যেন অনেকখানিই প্রতিবেদনসুলভ বলে মনে হয়। বক্তব্যের প্রতিষ্ঠার জন্য ‘He Reproves the Curlew’ কবিতাটিকে তুলে দেওয়া হল—
“O Curlew, cry no more in the air
Or only to the water in the west;
Because your crying brings to my mind
Passion-dimmed eyes and long heavy hair
That was shaken over my breast
There is enough evil in the crying of the wind.”
ইয়েটস্-এর ‘Passion-dimmed eyes’-এ যে কামনামথিত রক্তরাগ আছে, তা ‘বেতের ফলের মতো ম্লান চোখ’-এ নেই; সেখানে আছে উজ্জ্বলতাহীন ধূসর রহস্যের আবেগতপ্ত ইশারা। কিংবা, ইয়েটস্ পাখির কান্নায় ‘shaken over my breast’ এবং বাতাসে ‘enough evil in the crying’ অনুভব করেন; অপরদিকে, জীবনানন্দের কবিতায় এই অনুভবের থেকে অনেক বেশি গভীরতা লাভ করেছে হৃদয় খুঁড়ে বেদনা জাগানোর বোধ। এছাড়াও, ইয়েটস্-এর তুলনায় জীবনানন্দের কবিতা অনেক বেশি ‘impersonal’। এই কবিতায় ইতিহাস, ভূগোল, রূপকথা এবং আলংকারিক তাৎপর্য-ও অনেক সুদূরপ্রসারী।
বরং, কোনো কোনো সমালোচক ‘হায় চিল’ কবিতায় ‘নবমেঘদূত’-এর আভাস পান। এবং তা নিঃসন্দেহে সমর্থনযোগ্য। তবে ‘মেঘদূত’-এর মতো সেখানে বার্তা প্রেরণ উদ্দেশ্য নয়; বলা যায়, বার্তা জ্ঞাপন-ই একমাত্র উদ্দেশ্য। মেঘের মতো এখানে চিল কবির বিরহের ব্যথাকে প্রেমিকার কাছে পৌঁছে দেয় না, পরিবর্তে সে কবির গোপন ব্যথার রতনখানি খুঁড়ে খুঁড়ে উদ্ধার করে আনে। বিরহের এই যন্ত্রণা লাভেই কবি যক্ষের মতো মিলনের আনন্দ পেতে চান। তবে দুজনেই হতে চান হারানো প্রিয়ার রূপে আত্মহারা। বিপরীত অবস্থানের এই সমারোহ সত্ত্বেও মেঘাক্রান্ত দিন আবার স্মৃতিজীবী হয়ে উঠতে চেয়েছে। আর স্মৃতি-বিরহের এই অনুভূতি যেন ‘নবমেঘদূত’-এর ভাবনাকে প্রশ্রয় দিয়েছে।
#গ্রন্থবদ্ধ- জীবনানন্দ দাশ-এর শ্রেষ্ঠ কবিতা / জিজ্ঞাসায়, অন্বেষায় / অনিশ রায় / নিউ বইপত্র ( প্রকাশ – এপ্রিল, ২০১৯)
Lorem ipsum dolor sit amet, consectetur adipiscing elit. Ut elit tellus, luctus nec ullamcorper mattis, pulvinar dapibus leo.

