ভূমিকা
“বিজ্ঞান চায় সবার মাঝে প্রাণের কথা বলতে,
অন্ধ আবেগ সরিয়ে দিয়ে আলোর পথে চলতে।”
মানবসভ্যতার অগ্রগতির ইতিহাসে বিজ্ঞান এমন এক শক্তি, যা মানুষের চিন্তা, জীবনবোধ ও সমাজব্যবস্থাকে আমূল পরিবর্তন করেছে। আবেগ ও বিশ্বাস মানুষের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হলেও, শুধুমাত্র আবেগ দিয়ে জগতের জটিল সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। সত্যকে অনুসন্ধান করার জন্য প্রয়োজন যুক্তি, পর্যবেক্ষণ এবং বিচারবোধ। সেই বিচারনির্ভর বিশেষ জ্ঞানের নাম বিজ্ঞান। বিজ্ঞানের আলো যেমন অন্ধকার দূর করে পথ দেখায়, তেমনি বিজ্ঞানচেতনা মানুষের মন থেকে অজ্ঞতা, কুসংস্কার ও ভ্রান্ত ধারণার আবরণ সরিয়ে দেয়। সমাজকে বাস্তবমুখী, যুক্তিবাদী এবং সচেতন করে তোলার ক্ষেত্রে বিজ্ঞানের ভূমিকা অপরিসীম।
(বার্ট্রান্ড রাসেল) বলেছিলেন, “Fear is the main source of superstition.” অর্থাৎ, “ভয়ই কুসংস্কারের প্রধান উৎস।” অজ্ঞতা ও ভয় মানুষের মনকে দীর্ঘদিন ধরে অন্ধবিশ্বাসের শৃঙ্খলে আবদ্ধ করে রেখেছিল।
মানুষের অসচেতনতা ও বিজ্ঞানচেতনার অভাব
প্রাচীন সমাজে নানা রোগব্যাধিকে দেবতার অভিশাপ বলে মনে করা হতো। কলেরা, বসন্ত, ম্যালেরিয়া কিংবা কালাজ্বরের মতো মহামারিতে গ্রামের পর গ্রাম জনশূন্য হয়ে পড়লেও মানুষ প্রকৃত কারণ অনুসন্ধানের পরিবর্তে অলৌকিক শক্তির আশ্রয় নিত। শীতলার পূজা, ওলাবিবির আরাধনা কিংবা ওঝার ঝাড়ফুঁকে মানুষ মুক্তির পথ খুঁজত।
কিন্তু আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান মানুষের সেই ভ্রান্ত ধারণাকে ভেঙে দিয়েছে। বিজ্ঞান প্রমাণ করেছে রোগের পেছনে রয়েছে জীবাণু, পরিবেশগত কারণ এবং স্বাস্থ্যগত অবহেলা। টিকা, আধুনিক চিকিৎসা এবং বৈজ্ঞানিক গবেষণার ফলে বহু প্রাণঘাতী রোগ আজ নিয়ন্ত্রণে এসেছে। মানুষের বিশ্বাস দৃঢ় হয়েছে—রোগ নিরাময়ের পথ চিকিৎসাবিজ্ঞানে, অন্ধবিশ্বাসে নয়।
কুসংস্কার দূরীকরণে বিজ্ঞানচেতনা
বিজ্ঞানচেতনা মানুষের মানসিক মুক্তির অন্যতম প্রধান উপায়। সমাজের বহু মানুষ এখনও ভূত-প্রেত, মন্ত্র-তন্ত্র, ডাইনিবিদ্যা কিংবা জ্যোতিষশাস্ত্রের অলৌকিক ব্যাখ্যায় বিশ্বাস করেন। অনেকেই কালো বিড়াল, টিকটিকির শব্দ কিংবা নানা ঘটনাকে অশুভ লক্ষণ বলে মনে করেন। এমন বিশ্বাস মানুষের চিন্তাকে সংকীর্ণ করে এবং সমাজের অগ্রগতিকে বাধাগ্রস্ত করে।
(রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর) তাঁর প্রার্থনায় লিখেছিলেন—
“চিত্ত যেথা ভয়শূন্য, উচ্চ যেথা শির।”
ভয়মুক্ত ও মুক্তচিন্তার সমাজ গঠনের জন্য বিজ্ঞানচেতনা অপরিহার্য। যুক্তির আলো মানুষের মনকে কুসংস্কারের অন্ধকার থেকে মুক্ত করে।
উপসংহার
বিজ্ঞানচেতনা মানুষের সর্বাঙ্গীণ বিকাশের অন্যতম চাবিকাঠি। আগুনের আবিষ্কার যেমন মানুষের জীবনকে নতুন দিশা দিয়েছিল, তেমনি বিজ্ঞানচেতনা মানুষের মানসিক অন্ধকার দূর করার শক্তি জুগিয়েছে। (কার্ল সেগান) বলেছিলেন, “Science is a candle in the dark.” অর্থাৎ, “বিজ্ঞান অন্ধকারের মধ্যে এক প্রদীপশিখা।” জ্ঞানের সেই আলো যত বিস্তৃত হবে, সমাজ তত সচেতন, মানবিক ও প্রগতিশীল হয়ে উঠবে।

