১. স্বর্ণডিমের অভিশাপ
সংকেত :
এক কৃষকের হাঁস প্রতিদিন সোনার ডিম পাড়ত—লোভে পড়ে কৃষক একসঙ্গে সব ডিম পাবার আশায় হাঁসটিকে হত্যা করল।
গল্প
শরতের শেষ বিকেল। গ্রামের মাঠের ধানগাছগুলো বাতাসে দুলছে। পশ্চিম আকাশে অস্তগামী সূর্যের আলো ছড়িয়ে পড়েছে। গ্রামের এক কোণে ছোট্ট কুঁড়েঘরে বাস করত কৃষক গদাধর। সংসারে ছিল স্ত্রী আর দুটি সন্তান। অভাব ছিল তার জীবনের নিত্যসঙ্গী।
প্রতিদিনের মতো একদিন সকালে সে হাঁস-মুরগির খোঁয়াড়ে ঢুকল। হঠাৎ তার চোখ বিস্ময়ে স্থির হয়ে গেল। খড়ের মধ্যে পড়ে আছে এক অদ্ভুত ডিম। সূর্যের আলো পড়তেই সেটি ঝলমল করে উঠল।
গদাধর কাঁপা হাতে ডিমটি তুলে নিল। প্রথমে সে ভাবল—চোখের ভুল। পরে বাজারে নিয়ে গেলে স্বর্ণকার বিস্ময়ে বলল—
“এ তো খাঁটি সোনা!”
সেদিন আনন্দে গদাধরের চোখে জল চলে এসেছিল। সংসারে একটু স্বচ্ছলতা এল। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, পরদিনও হাঁসটি আরেকটি সোনার ডিম পাড়ল। এভাবে প্রতিদিন একটি করে সোনার ডিম পেতে লাগল সে।
কয়েক মাসের মধ্যে তার ভাঙা ঘর মেরামত হল, সংসারে সুখ ফিরল।
কিন্তু মানুষের মনের ভেতরে একটি অদৃশ্য আগুন থাকে—লোভের আগুন।
এক রাতে গদাধর বিছানায় শুয়ে ভাবছিল—
“প্রতিদিন একটা করে কেন? হাঁসের পেটের মধ্যে নিশ্চয় আরও অনেক সোনার ডিম জমে আছে। যদি সব একসঙ্গে পাই?”
সেই ভাবনা ধীরে ধীরে তার বিবেককে গ্রাস করল।
পরদিন সকালে ধারালো ছুরি হাতে সে হাঁসটির কাছে গেল। তার স্ত্রী অবাক হয়ে বলল—
“ওগো, কী করছ?”
গদাধর কোনো উত্তর দিল না।
এক মুহূর্তের মধ্যেই সব শেষ হয়ে গেল।
কিন্তু হাঁসের পেট কেটে সে হতভম্ব হয়ে গেল।
ভেতরে কোনো সোনার ডিম নেই—শুধু সাধারণ রক্ত-মাংস।
তার হাত থেকে ছুরিটি পড়ে গেল। উঠোনে বসে সে বুঝল—সে শুধু একটি হাঁস নয়, নিজের ভবিষ্যৎকেও হত্যা করেছে।
সন্ধ্যার অন্ধকার ধীরে ধীরে নেমে এলো। কিন্তু তার মনের অন্ধকার আরও গভীর হয়ে উঠল।
নীতিবাক্য : অতি লোভ মানুষের প্রজ্ঞাকে অন্ধ করে দেয়।
২. টুপিওয়ালা ও বানরের কৌশল
সংকেত :
এক টুপি-বিক্রেতা দূরের মেলায় যাচ্ছিল—গাছতলায় বিশ্রাম নিতে গিয়ে ঘুমিয়ে পড়ল—জেগে দেখে টুপির ঝুড়ি খালি—গাছে বানরের চেঁচামেচি—প্রত্যেক বানরের মাথায় টুপি—বিক্রেতা নিজের মাথার টুপি ছুঁড়ে ফেলল—বানরেরা তা অনুকরণ করল—টুপি ফিরে পেল।
গল্প
জ্যৈষ্ঠ মাসের দুপুর। সূর্য যেন আকাশের বুক থেকে আগুন বর্ষণ করছে। মাটির পথের ওপর গরম বাতাস কাঁপছে। গ্রামের টুপিবিক্রেতা হরিপদ মাথায় বড় একটি বাঁশের ঝুড়ি নিয়ে পাশের জেলার বার্ষিক মেলার উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছে। ঝুড়িভর্তি লাল, নীল, সাদা, সবুজ নানা রঙের টুপি। সেগুলো বিক্রি করেই তার সংসার চলে।
অনেকটা পথ হাঁটার পর ক্লান্তিতে তার শরীর অবসন্ন হয়ে পড়ল। সামনে একটি বিশাল বটগাছ দেখতে পেল। তার ডালপালা চারদিকে ছড়িয়ে আছে, যেন পথিকদের বিশ্রামের জন্য প্রকৃতিরই আশ্রয়।
হরিপদ গাছের নীচে বসে ঝুড়িটি পাশে রাখল। হালকা বাতাস এসে তার ঘামে ভেজা শরীরকে শীতল করে দিল। চোখ দুটি ধীরে ধীরে ভারী হয়ে এলো। কিছুক্ষণের মধ্যেই সে গভীর ঘুমে তলিয়ে গেল।
অনেকক্ষণ পরে হঠাৎ তার ঘুম ভাঙল। চোখ খুলেই সে ঝুড়ির দিকে তাকাল। তারপর যেন তার বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল।
ঝুড়ি প্রায় খালি!
সে আতঙ্কিত হয়ে চারদিকে তাকাতে লাগল। কোনো মানুষ নেই। এমন সময় মাথার ওপর থেকে অদ্ভুত চিৎকার আর কিচিরমিচির শব্দ ভেসে এল।
মাথা তুলে সে বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেল।
গাছের প্রায় প্রতিটি ডালে বানর বসে আছে, আর প্রত্যেকের মাথায় তার টুপি!
হরিপদ প্রথমে রেগে গিয়ে হাত নাড়ল। বানরেরাও হাত নাড়ল।
সে চিৎকার করল। বানরেরাও চিৎকার শুরু করল।
সে মাথায় হাত দিল। বানরেরাও তাই করল।
হঠাৎ তার মাথায় একটি বুদ্ধি এল।
সে মনে মনে বলল—“আচ্ছা! এরা তো আমার সব কাজ নকল করছে!”
মাথা থেকে নিজের টুপিটি খুলে সে জোরে মাটিতে ছুঁড়ে মারল।
পরমুহূর্তেই আশ্চর্য ঘটনা ঘটল।
গাছের ওপর থেকে একে একে সব বানর নিজেদের মাথার টুপি খুলে নিচে ছুঁড়ে ফেলতে লাগল। মুহূর্তের মধ্যে চারদিক টুপিতে ভরে গেল।
হরিপদের মুখে হাসি ফুটে উঠল। দ্রুত সব টুপি কুড়িয়ে ঝুড়িতে ভরে নিল।
আবার পথ চলতে চলতে সে আকাশের দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বলল—
“বিপদে রাগ নয়, বুদ্ধিই মানুষের প্রকৃত সহায়।”
নীতিবাক্য : উপস্থিত বুদ্ধি বিপদ থেকে মুক্তির পথ দেখায়।
৩. মিথ্যার মূল্য
সংকেত :
এক রাখাল বনের ধারে গোরু চরাত—দুষ্টুমি করে “বাঘ! বাঘ!” বলে চিৎকার করত—গ্রামের লোক ছুটে এলে হাসত—একদিন সত্যিই বাঘ এল—কেউ সাহায্য করতে এল না।
গল্প
গ্রামের শেষ প্রান্তে বিস্তৃত সবুজ মাঠের পাশেই ছিল এক ঘন বন। সেই মাঠে প্রতিদিন গোরু চরাতে যেত রাখাল ছেলে নিতাই। ছেলেটি খুব চঞ্চল ছিল। সারাদিন একা মাঠে বসে থাকতে তার ভালো লাগত না। তাই সে মানুষের সঙ্গে মজা করতে ভালোবাসত।
একদিন দুপুরে তার মাথায় দুষ্টুবুদ্ধি এল।
সে হঠাৎ জোরে চিৎকার করে উঠল—
“বাঘ! বাঘ! বাঁচাও!”
গ্রামের লোকেরা লাঠিসোঁটা নিয়ে ছুটে এল। কিন্তু এসে দেখল নিতাই মাটিতে গড়াগড়ি দিয়ে হাসছে।
একজন বৃদ্ধ রেগে বললেন—
“এভাবে মানুষকে নিয়ে ঠাট্টা করতে নেই।”
কিন্তু নিতাই এসব কথায় কান দিল না।
কয়েকদিন পরে সে আবার একই কাজ করল। আবারও সবাই প্রতারিত হল।
এভাবে ধীরে ধীরে গ্রামের মানুষ তার ওপর বিশ্বাস হারিয়ে ফেলল।
তারপর একদিন সন্ধ্যার দিকে আকাশ কালো হয়ে এলো। চারদিকে অদ্ভুত নীরবতা নেমে এসেছে। হঠাৎ বনের ভেতর থেকে বেরিয়ে এল এক বিশাল বাঘ।
গোরুগুলো ছুটোছুটি করতে লাগল।
নিতাই এবার সত্যিই ভয়ে কাঁপতে শুরু করল।
সে প্রাণপণে চিৎকার করতে লাগল—
“বাঁচাও! সত্যি বাঘ এসেছে!”
কিন্তু গ্রামের কেউ আর এল না।
সবাই ভেবেছিল—এও নিশ্চয় তার পুরনো মিথ্যা।
পরদিন সকালে গ্রামের মানুষ মাঠে এসে ছড়িয়ে থাকা দড়ি আর ভাঙা বাঁশি দেখতে পেল।
সেদিন তারা শুধু একটি ছেলেকে হারায়নি; তারা দেখেছিল—মিথ্যা কিভাবে বিশ্বাসকে হত্যা করে।
নীতিবাক্য : মিথ্যাবাদীর সত্য কথাও কেউ বিশ্বাস করে না।
৪. কৃতঘ্নতার বিষ
সংকেত :
তীব্র শীতের সকাল—চাষি এক অধমরা সাপকে বাড়িতে নিয়ে এল—লালনপালন করে সুস্থ করল—সুস্থ হয়ে সাপ চাষির ছেলেকে কামড়াতে গেল—চাষির হাতে সাপের মৃত্যু।
গল্প
পৌষের ভোর। চারদিক ঘন কুয়াশায় ঢাকা। গাছের পাতায় জমে থাকা শিশিরবিন্দু যেন মুক্তোর মতো ঝলমল করছে। গ্রামের কৃষক হরনাথ প্রতিদিনের মতো জমিতে যাচ্ছিল। এমন সময় পথের পাশে শুকনো পাতার মধ্যে তার চোখ পড়ল এক সাপের ওপর।
প্রচণ্ড ঠান্ডায় সাপটি প্রায় জমে গিয়েছিল। তার শরীর নিস্তেজ, চোখদুটি আধবোজা। দেখে মনে হচ্ছিল মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করছে।
হরনাথের মনে দয়া হল।
সে ভাবল, “প্রাণ তো সবারই আছে। মৃত্যু থেকে যদি একে বাঁচানো যায়, তাতে ক্ষতি কী?”
সে সাপটিকে কাপড়ে জড়িয়ে বাড়িতে নিয়ে এল। আগুনের উষ্ণতার কাছে রাখল, যত্ন করল। কয়েকদিনের মধ্যেই সাপটি সুস্থ হয়ে উঠল।
একদিন বিকেলে হরনাথের ছোট ছেলে উঠোনে খেলছিল। হঠাৎ সাপটি ফণা তুলে শিশুটির দিকে এগিয়ে গেল।
এক মুহূর্তের জন্য হরনাথের বুক কেঁপে উঠল।
পরের মুহূর্তেই সে হাতে থাকা লাঠি দিয়ে সাপটিকে আঘাত করল।
সাপটি ছটফট করতে করতে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল।
হরনাথ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল—
“যার স্বভাবে বিষ, তার কাছে উপকারও ঋণ হয়ে থাকে না।”
নীতিবাক্য : দুর্জনের স্বভাব সহজে পরিবর্তন হয় না।
৫. সিংহ ও ইঁদুর
সংকেত :
নিদ্রিত সিংহের নাকে এক ইঁদুরের প্রবেশ—সিংহের ঘুম ভাঙল—সিংহ তাকে মারতে গেল—অনুনয়ের পর ছেড়ে দিল—পরে ইঁদুর জাল কেটে তাকে উদ্ধার করল।
গল্প
গভীর বনের মধ্যে একটি বিশাল বটগাছের ছায়ায় দুপুরবেলায় এক সিংহ গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন ছিল। তার গর্জনে যেমন বন কাঁপত, তেমনি তার উপস্থিতিতে সমস্ত প্রাণী ভয়ে দূরে সরে যেত।
সেই সময় একটি ছোট্ট ইঁদুর খেলতে খেলতে হঠাৎ সিংহের শরীরের ওপর উঠে পড়ল। দৌড়াতে দৌড়াতে সে সিংহের নাকের কাছেও চলে গেল।
সিংহের ঘুম ভেঙে গেল।
রাগে তার চোখ লাল হয়ে উঠল। এক থাবায় সে ইঁদুরটিকে ধরে ফেলল।
ইঁদুর কাঁদতে কাঁদতে বলল—
“মহারাজ, আমাকে ক্ষমা করুন। আমি ইচ্ছে করে করিনি। হয়তো কোনোদিন আমিও আপনার উপকারে আসতে পারি।”
সিংহ হেসে উঠল।
“তুই এত ছোট! তুই আবার আমার উপকার করবি?”
তবুও করুণা করে সে ইঁদুরটিকে ছেড়ে দিল।
কয়েকদিন পরে এক শিকারির পাতা জালে সিংহ আটকা পড়ল। প্রাণপণে গর্জন করেও সে মুক্ত হতে পারল না।
সেই আওয়াজ শুনে ছোট্ট ইঁদুরটি ছুটে এল।
সে দাঁত দিয়ে একের পর এক জালের দড়ি কাটতে লাগল।
অল্পক্ষণেই জাল ছিঁড়ে গেল।
মুক্ত হয়ে সিংহ বিস্মিত হয়ে বলল—
“আজ বুঝলাম, পৃথিবীতে কেউ তুচ্ছ নয়।”
নীতিবাক্য : ক্ষুদ্রকেও কখনও অবহেলা করতে নেই।
৬. লোভের অন্ধকার
সংকেত :
প্রবচন — “লোভে পাপ, পাপে মৃত্যু।”
গল্প
নগরের ধনী ব্যবসায়ী মাধবের অর্থের কোনো অভাব ছিল না। বিশাল বাড়ি, জমিজমা, দাস-চাকর—সবই ছিল। কিন্তু তার মনে শান্তি ছিল না।
একদিন সে শুনল, জঙ্গলের গভীরে নাকি গুপ্তধন লুকিয়ে আছে।
অনেকে তাকে বলল—
“যা আছে, তা নিয়েই সন্তুষ্ট থাকো।”
কিন্তু লোভ তার বিবেককে ঢেকে ফেলেছিল।
গভীর রাতে সে একাই জঙ্গলে প্রবেশ করল। অনেক খোঁজার পরে সত্যিই একটি সিন্দুক পেল।
আনন্দে উন্মত্ত হয়ে সে সিন্দুক খুলতেই চারদিক থেকে বিষধর সাপ বেরিয়ে এল।
ভয়ে সে দৌড়াতে লাগল। কিন্তু অন্ধকারে পথ হারিয়ে ফেলল।
পরদিন মানুষ তাকে অচেতন অবস্থায় উদ্ধার করল।
চোখ খুলে সে শুধু বলেছিল—
“যা দরকার ছিল, তা আমার ছিল; যা দরকার ছিল না, তার পেছনেই আমি ছুটেছিলাম।”
নীতিবাক্য : লোভে পাপ, পাপে সর্বনাশ।
৭. সবুরে মেওয়া ফলে
সংকেত :
এক দরিদ্র কৃষক—অনাবৃষ্টি—পরপর ফসল নষ্ট—গ্রামের লোকের উপহাস—আশা না ছাড়া—ধৈর্য ও শ্রম—শেষে সাফল্য।
গল্প
বীরভূমের একটি ছোট্ট গ্রামে হরনাথ নামে এক কৃষক বাস করত। গ্রামের প্রায় সকলেই তাকে চিনত তার পরিশ্রমের জন্য। কিন্তু পরিশ্রমী মানুষটির ভাগ্য যেন তাকে বারবার পরিহাস করত।
এক বছর অনাবৃষ্টিতে তার জমি ফেটে চৌচির হয়ে গেল। ধানের চারা শুকিয়ে মাঠের বুক মরুভূমির মতো হয়ে উঠল। বহু কষ্টে সংসার চলল।
পরের বছর সে আবার নতুন উদ্যমে চাষ শুরু করল। কিন্তু দুর্ভাগ্য আবার তার দরজায় কড়া নাড়ল। অতিবৃষ্টিতে জমি ডুবে গেল।
গ্রামের অনেকেই বিদ্রূপ করে বলত—
“হরনাথ, এত চেষ্টা করে কী হবে? ভাগ্য যখন বিপক্ষে, তখন আর পরিশ্রমে লাভ কী?”
হরনাথ শুধু মৃদু হেসে বলত—
“মাটিকে যত ভালোবাসা যায়, সে একদিন প্রতিদান দেয়।”
তৃতীয় বছর সে আরও মন দিয়ে জমিতে কাজ করল। নতুন বীজ আনল, সেচের ব্যবস্থা করল, দিনরাত মাঠে কাটাতে লাগল।
কয়েক মাস পরে গ্রামের মানুষ বিস্ময়ে দেখল—হরনাথের মাঠ যেন সোনার সমুদ্র। বাতাসে ধানের শীষ দুলছে, চারদিকে সোনালি আলো ছড়িয়ে পড়েছে।
যারা একদিন তাকে উপহাস করেছিল, তারাই আজ এসে বলল—
“তুমি কীভাবে পারলে?”
হরনাথ আকাশের দিকে তাকিয়ে শান্ত কণ্ঠে বলল—
“যে মানুষ অপেক্ষা করতে জানে, পরিশ্রম করতে জানে, তার কাছে সময় একদিন মাথা নত করে।”
নীতিবাক্য : সবুরে মেওয়া ফলে।
এভাবেই বাকি গল্পগুলো দিলে সেগুলো অনেক বেশি সাহিত্যিক ও পরিণত হবে।
৮. কষ্ট করলে কেষ্ট মেলে
সংকেত :
দরিদ্র পরিবারের মেধাবী ছেলে—অভাবের জন্য পড়াশোনায় বাধা—দিনে কাজ, রাতে পড়াশোনা—অবিরাম সংগ্রাম—শেষে সাফল্য।
গল্প
নদিয়ার এক প্রত্যন্ত গ্রামে অরুণ নামে এক কিশোর বাস করত। তার বাবা ছিলেন একজন দিনমজুর। সংসারে অভাব ছিল নিত্যদিনের অতিথি। অনেক দিন এমনও গেছে, যখন বাড়িতে দুবেলা খাবার জোটেনি। কিন্তু অভাব অরুণের চোখের স্বপ্ন কেড়ে নিতে পারেনি।
ছোটবেলা থেকেই পড়াশোনার প্রতি তার গভীর আগ্রহ ছিল। স্কুলের শিক্ষকরা বলতেন, “এই ছেলেটির মধ্যে কিছু আছে।” কিন্তু মেধা থাকলেও সংসারের কঠিন বাস্তবতা তার পথের সামনে পাহাড়ের মতো দাঁড়িয়ে ছিল।
মাধ্যমিক পরীক্ষার আগে বাবার অসুখ ধরা পড়ল। সংসারের সমস্ত দায়িত্ব প্রায় অরুণের কাঁধে এসে পড়ল। ভোরে সে বাজারে সবজি বেচত, কখনও দোকানে কাজ করত, কখনও মানুষের বাড়িতে ছোটখাটো কাজ করে কিছু টাকা উপার্জন করত।
সারাদিনের ক্লান্তি শেষে যখন গ্রাম ঘুমিয়ে পড়ত, তখন অরুণ কুপির ক্ষীণ আলোয় বই খুলে বসত। চোখে ঘুম নেমে এলেও সে নিজের মনকে বলত—
“আজ একটু কষ্ট করলেই হয়তো আগামীকাল ভালো হবে।”
গ্রামের অনেকেই তাকে দেখে হাসত—
“এত পড়ে কী হবে? কাজকর্ম করলেই তো পেট চলবে!”
কিন্তু অরুণ থামেনি।
অবশেষে পরীক্ষার ফল বেরোল। সারা জেলার মধ্যে অরুণ প্রথম স্থান অধিকার করল। তার বাড়ির সামনে লোকজনের ভিড় জমে গেল। সাংবাদিক এল, শিক্ষক এল, গ্রামের মানুষ এল।
সেদিন অরুণের অসুস্থ বাবা চোখ মুছতে মুছতে বললেন—
“আমি তোকে কিছু দিতে পারিনি বাবা।”
অরুণ বাবার হাত ধরে মৃদু হেসে বলল—
“তুমি আমাকে একটা জিনিস দিয়েছ—পরিশ্রম করতে শিখিয়েছ।”
সেদিন গ্রামের মানুষ বুঝতে পারল—স্বপ্ন শুধু ভাগ্যে পূরণ হয় না; স্বপ্ন পূরণ করতে হয় ঘাম দিয়ে।
নীতিবাক্য : কষ্ট করলে কেষ্ট মেলে।
৯. অসময়ের বন্ধু প্রকৃত বন্ধু
সংকেত :
দুই বন্ধু—একজন ধনী, অন্যজন দরিদ্র—হঠাৎ বিপদ—সকলের মুখ ফিরিয়ে নেওয়া—বন্ধুর সাহায্য—প্রকৃত বন্ধুত্বের পরিচয়।
গল্প
একটি ছোট শহরে রাহুল ও সুমন নামে দুই বন্ধু ছিল। ছোটবেলা থেকে তারা একসঙ্গে পড়াশোনা করেছে, খেলেছে, বড় হয়েছে। তবে তাদের পারিবারিক অবস্থার মধ্যে ছিল আকাশ-পাতাল পার্থক্য। রাহুল ছিল ধনী ব্যবসায়ীর ছেলে, আর সুমনের বাবা ছিলেন একজন সাধারণ কর্মচারী।
সময় গড়াতে দুজনেই বড় হল। রাহুল বাবার ব্যবসা সামলাতে লাগল, আর সুমন শিক্ষকতার কাজ পেল।
একদিন হঠাৎ রাহুলের ব্যবসায় বড় ক্ষতি হয়ে গেল। ধারদেনা বাড়তে লাগল। যারা একসময় তার চারপাশে ঘুরে বেড়াত, তারা ধীরে ধীরে দূরে সরে গেল।
রাহুল সাহায্যের জন্য অনেকের কাছে গেল। কিন্তু সবাই নানা অজুহাত দেখিয়ে মুখ ফিরিয়ে নিল।
অসহায় রাহুল একদিন পার্কে বসে ভাবছিল—
“আজ বুঝলাম, সুখের সময় সবাই আপন হয়।”
ঠিক তখনই সুমন এসে তার পাশে বসল।
সব কথা শুনে সুমন বলল—
“বন্ধু, কষ্টের সময়ে হাত ছেড়ে দিলে বন্ধুত্বের মূল্য কোথায়?”
সে নিজের সামান্য সঞ্চয় রাহুলের হাতে তুলে দিল। শুধু তাই নয়, দিনরাত পরিশ্রম করে রাহুলকে আবার নতুনভাবে ব্যবসা দাঁড় করাতে সাহায্য করল।
কয়েক বছর পরে রাহুল আবার সফল হল।
একদিন সে সুমনকে বলল—
“যখন সবাই দূরে সরে গিয়েছিল, তখন তুই পাশে দাঁড়িয়েছিলি।”
সুমন হেসে বলল—
“বন্ধুত্ব তো রোদ্দুরের দিনে ছাতা ধরা নয়; ঝড়ের দিনে পাশে দাঁড়ানো।”
নীতিবাক্য : অসময়ের বন্ধু প্রকৃত বন্ধু।
১০. যেমন কর্ম তেমন ফল
সংকেত :
এক ধনী জমিদার—অহংকার ও অত্যাচার—গরিব মানুষের প্রতি নিষ্ঠুরতা—সময়ের পরিবর্তন—নিজেই বিপদে পড়া—নিজ কর্মের ফল ভোগ।
গল্প
এক গ্রামে রমেশবাবু নামে এক ধনী জমিদার ছিলেন। তাঁর অনেক জমিজমা, ধনসম্পত্তি এবং প্রভাব-প্রতিপত্তি ছিল। কিন্তু তাঁর মধ্যে দয়া বা মানবতা খুব কম ছিল। তিনি গ্রামের গরিব মানুষদের তুচ্ছজ্ঞান করতেন। সামান্য ভুল হলেই চাষিদের অপমান করতেন, কখনও কখনও তাদের প্রাপ্য মজুরিও আটকে রাখতেন।
একদিন গ্রামের এক বৃদ্ধ কৃষক হাতজোড় করে বলল—
“বাবু, এ বছর বন্যায় সব ফসল নষ্ট হয়েছে। কিছুটা সময় দিলে ঋণ শোধ করে দেব।”
রমেশবাবু কঠোর কণ্ঠে বললেন—
“আমার কাছে দয়া চাইতে আসবে না। টাকা না দিতে পারলে জমি ছেড়ে দাও।”
বৃদ্ধ চোখের জল ফেলতে ফেলতে ফিরে গেল।
কিন্তু মানুষের সময় চিরকাল একরকম থাকে না।
কয়েক বছর পর রমেশবাবুর ব্যবসায় ভয়ানক ক্ষতি হল। দেনার দায়ে তাঁর সম্পত্তি একে একে বিক্রি হতে লাগল। যারা একসময় তাঁর চারপাশে ঘুরে বেড়াত, তারা সবাই দূরে সরে গেল।
একদিন অসহায় অবস্থায় তিনি সেই বৃদ্ধ কৃষকের বাড়ির সামনে এসে দাঁড়ালেন। বৃদ্ধ তাঁকে দেখে ঘরে ডেকে বসালেন, খাবার দিলেন এবং সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিলেন।
লজ্জায় রমেশবাবুর মাথা নীচু হয়ে গেল।
তিনি বুঝলেন—মানুষ পৃথিবীতে যা বপন করে, একদিন তাই ফিরে পায়।
নীতিবাক্য : যেমন কর্ম তেমন ফল।
১১. যে সহে সে রহে
সংকেত :
এক দরিদ্র ছাত্র—অভাব ও অপমান—ধৈর্য ও সহিষ্ণুতা—সংগ্রাম—শেষে প্রতিষ্ঠা লাভ।
গল্প
শুভ একটি দরিদ্র পরিবারের ছেলে ছিল। তার বাবা রিকশা চালাতেন। সংসারের অভাব তাদের নিত্যসঙ্গী ছিল। অনেকদিন স্কুলে যাওয়ার সময় শুভর পায়ে জুতো থাকত না।
স্কুলে কিছু সহপাঠী তাকে নিয়ে হাসাহাসি করত। কেউ বলত—
“ওকে দেখ, ছেঁড়া জামা পরে এসেছে!”
আবার কেউ বলত—
“এরা পড়ে কী হবে?”
এইসব কথা শুনে শুভর মন খুব কষ্ট পেত। কিন্তু সে কখনও কাউকে পাল্টা কিছু বলত না।
তার মা তাকে বলতেন—
“জীবনে অনেক কথা শুনতে হবে বাবা। যে সহ্য করতে পারে, সে-ই শেষ পর্যন্ত জিতে যায়।”
শুভ মায়ের কথা মনে রেখে পড়াশোনায় আরও মন দিল। দিনের পর দিন সে নিজের কষ্টকে শক্তিতে পরিণত করল।
কয়েক বছর পরে শুভ বড় পরীক্ষায় প্রথম স্থান অধিকার করল। সে একজন প্রতিষ্ঠিত চিকিৎসক হয়ে উঠল।
একদিন স্কুলের পুনর্মিলনী অনুষ্ঠানে সেই পুরোনো সহপাঠীরা তার সামনে এসে দাঁড়াল।
শুভ শুধু মৃদু হেসে বলল—
“মানুষকে ছোট করা সহজ, কিন্তু বড় হওয়ার জন্য ধৈর্য লাগে।”
নীতিবাক্য : যে সহে সে রহে।
১২. ঘুঁটে পোড়ে গোবর হাসে
সংকেত :
এক ব্যক্তি অন্যের দুর্দশা দেখে হাসাহাসি করে—নিজেও একই বিপদে পড়ে—শিক্ষা লাভ।
গল্প
এক গ্রামে মহিম ও করিম নামে দুই প্রতিবেশী ছিল। মহিমের স্বভাব ছিল অন্যের দুঃখে হাসাহাসি করা।
একবার করিমের গোয়ালঘরে আগুন লেগে কয়েকটি গরু মারা গেল। করিমের পরিবার দুঃখে ভেঙে পড়ল।
কিন্তু মহিম লোকজনের সামনে বলল—
“হা হা! এত বড় গরুর ব্যবসা করত, এখন বুঝুক!”
গ্রামের মানুষ তার কথা শুনে বিরক্ত হল।
কয়েক মাস পরে হঠাৎ এক ঝড়ের রাতে মহিমের বাড়িতেও আগুন লাগল। মুহূর্তের মধ্যে তার অনেক ক্ষতি হয়ে গেল।
সেই সময় করিম ছুটে এসে তাকে সাহায্য করল।
মহিম লজ্জায় মাথা নীচু করে বলল—
“আজ বুঝলাম, অন্যের বিপদ দেখে হাসা উচিত নয়।”
নীতিবাক্য : ঘুঁটে পোড়ে গোবর হাসে।
১৩. লোভে পাপ, পাপে মৃত্যু
সংকেত :
দুই দরিদ্র বন্ধু—হঠাৎ সোনার মুদ্রাভর্তি থলি পাওয়া—লোভ জন্মানো—পরস্পরের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র—শেষে দুজনেরই সর্বনাশ।
গল্প
এক গ্রামে নির্মল ও যতীন নামে দুই বন্ধু বাস করত। তারা খুব দরিদ্র ছিল। দিনমজুরি করে কোনোমতে সংসার চালাত। অভাব থাকলেও তাদের বন্ধুত্ব ছিল গভীর।
একদিন কাজের সন্ধানে তারা দূরের এক শহরে যাচ্ছিল। পথে একটি পুরোনো বটগাছের নীচে তারা বিশ্রাম নিতে বসে। হঠাৎ নির্মলের চোখে পড়ল—ঝোপের পাশে একটি ভারী থলি পড়ে আছে।
থলি খুলতেই দুজনের চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে গেল। ভেতরে ঝকমক করছে অসংখ্য সোনার মুদ্রা।
প্রথমে দুজনেরই আনন্দের সীমা রইল না। তারা ভাবল, এবার তাদের দুঃখের দিন শেষ হবে।
কিন্তু ধীরে ধীরে আনন্দের জায়গায় লোভ এসে বসতে শুরু করল।
যতীন মনে মনে ভাবল—
“যদি সব মুদ্রা আমি একাই পাই?”
অন্যদিকে নির্মলের মনেও একই চিন্তা জন্ম নিল।
তারা ঠিক করল, আগে খাবার খেয়ে তারপর মুদ্রাগুলো ভাগ করবে। যতীন খাবার আনতে বাজারে গেল। কিন্তু তার মনে তখন অন্য পরিকল্পনা। সে খাবারের মধ্যে বিষ মিশিয়ে দিল।
এদিকে নির্মলও মনে মনে সিদ্ধান্ত নিল—যতীন ফিরে এলেই তাকে হত্যা করবে।
যতীন ফিরে আসার পর নির্মল সুযোগ বুঝে তাকে আক্রমণ করল। যতীন ঘটনাস্থলেই মারা গেল।
এরপর নির্মল আনন্দে খাবার খেতে বসে ভাবল—
“এবার সব ধনসম্পদ আমার।”
কিন্তু কিছুক্ষণ পর বিষক্রিয়ায় সেও ছটফট করতে করতে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ল।
সন্ধ্যায় পথচারীরা এসে দেখল—সোনার থলির পাশে দুই বন্ধুর নিথর দেহ পড়ে আছে।
সোনা পড়ে রইল, কিন্তু লোভ দুই প্রাণ কেড়ে নিল।
নীতিবাক্য : লোভে পাপ, পাপে মৃত্যু।
১৪. সোনার ডিম পাড়া হাঁস
সংকেত :
এক কৃষক—প্রতিদিন হাঁসের সোনার ডিম—অতিরিক্ত লোভ—একসঙ্গে সব পাওয়ার চেষ্টা—শেষে সর্বনাশ।
গল্প
এক গ্রামের প্রান্তে হরিপদ নামে এক কৃষক বাস করত। সে ছিল অত্যন্ত গরিব। বহু কষ্টে তার সংসার চলত।
একদিন হাট থেকে ফেরার পথে সে একটি অদ্ভুত হাঁস কিনে আনল। পরদিন সকালে হাঁসের ঘরে গিয়ে সে বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেল। হাঁসটি একটি সোনার ডিম পেড়েছে।
প্রথমে সে বিশ্বাস করতে পারছিল না। পরে বাজারে নিয়ে গিয়ে জানতে পারল—ডিমটি সত্যিই খাঁটি সোনা।
এরপর প্রতিদিন হাঁসটি একটি করে সোনার ডিম দিতে লাগল। কিছুদিনের মধ্যেই হরিপদের অভাব দূর হয়ে গেল।
কিন্তু মানুষের মন সহজে সন্তুষ্ট হয় না।
একদিন সে ভাবল—
“হাঁসটি প্রতিদিন যখন একটি করে সোনার ডিম দেয়, তাহলে নিশ্চয়ই এর পেটের ভেতরে অনেক সোনা জমে আছে!”
লোভ তার বিচারবুদ্ধিকে অন্ধ করে দিল।
পরদিন সে ধারালো ছুরি নিয়ে হাঁসটিকে কেটে ফেলল।
কিন্তু হাঁসের পেটের ভিতর আর পাঁচটা সাধারণ হাঁসের মতোই ছিল—কোনো সোনা নেই।
হরিপদ মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়ল।
যা ধীরে ধীরে তাকে সুখী করছিল, লোভের কারণে সেটাই সে নিজ হাতে নষ্ট করল।
নীতিবাক্য : অতি লোভে সর্বনাশ।
১৫. টুপি-বিক্রেতা ও বানরের দল
সংকেত :
এক টুপি-বিক্রেতা দূরের মেলায় যাচ্ছিল—গাছতলায় বিশ্রাম নিতে গিয়ে ঘুমিয়ে পড়ল—জেগে দেখে টুপির ঝুড়ি খালি—গাছে বানরের চিৎকার—প্রত্যেক বানরের মাথায় টুপি—বুদ্ধি করে নিজের টুপি ছুড়ে ফেলা—বানরেরা অনুকরণ করল—টুপি ফিরে পাওয়া।
গল্প
শরতের স্নিগ্ধ এক সকালে নিবারণ নামে এক টুপি-বিক্রেতা পাশের গ্রামের বড় মেলায় যাওয়ার উদ্দেশ্যে রওনা দিল। মাথায় একটি টুপি, আর কাঁধে রঙিন টুপিভর্তি বড় ঝুড়ি। লাল, নীল, সবুজ, হলুদ—নানা রঙের টুপিতে ঝুড়ি ভরে ছিল।
পথ দীর্ঘ ছিল। দুপুরের দিকে সূর্যের তাপ বেড়ে গেল। হাঁটতে হাঁটতে সে একটি বিশাল বটগাছের নীচে এসে বসল। শীতল বাতাস বইছিল, পাখিরা ডেকে উঠছিল। ক্লান্ত নিবারণ কখন যে চোখ বন্ধ করে ঘুমিয়ে পড়েছিল, সে নিজেও বুঝতে পারেনি।
কিছুক্ষণ পরে হঠাৎ অদ্ভুত কোলাহলে তার ঘুম ভাঙল। চোখ খুলেই সে বিস্ময়ে হতবাক। তার ঝুড়ি একেবারে খালি!
ভয়ে সে চারদিকে তাকাতে লাগল। হঠাৎ মাথার ওপর থেকে “কিচির-মিচির” শব্দ শুনে উপরে তাকাতেই সে অবাক হয়ে গেল। গাছের ডালে ডালে অনেকগুলো বানর বসে আছে, আর প্রত্যেকের মাথায় তার টুপি!
নিবারণ প্রথমে খুব রেগে গেল। সে চিৎকার করে বলল—
“ওই, আমার টুপিগুলো ফেরত দাও!”
কিন্তু বানরেরা তার কথার উত্তরে আরও বেশি লাফালাফি করতে লাগল।
সে মাটির ঢেলা ছুড়ল, বানরেরাও গাছ থেকে শুকনো ডাল ছুড়তে লাগল।
হতাশ হয়ে নিবারণ বসে পড়ল। হঠাৎ তার মনে পড়ল—বানর নাকি মানুষের কাজ নকল করে।
সে মাথা থেকে নিজের টুপিটি খুলে রাগের ভান করে মাটিতে ছুঁড়ে ফেলল।
অদ্ভুত ব্যাপার! সঙ্গে সঙ্গে সব বানরও নিজেদের মাথার টুপিগুলো খুলে নিচে ছুড়ে ফেলল।
নিবারণ আনন্দে দ্রুত সব টুপি কুড়িয়ে ঝুড়িতে ভরে নিল। তারপর গাছের দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে বলল—
“শুধু শক্তি নয়, বিপদের সময় বুদ্ধিও বড় অস্ত্র।”
এরপর সে নিশ্চিন্ত মনে মেলার পথে রওনা দিল।
নীতিবাক্য : বুদ্ধির জোর অনেক সময় শক্তির চেয়েও বড়।
১৬. মিথ্যাবাদী রাখাল
সংকেত :
এক রাখাল—মজা করার জন্য “বাঘ এসেছে” বলে চিৎকার—গ্রামের লোক ছুটে আসে—পরে সত্যিই বাঘ আসে—কেউ বিশ্বাস করে না—বিপদ।
গল্প
এক গ্রামের পাশে ছিল বিস্তীর্ণ সবুজ মাঠ। সেই মাঠে প্রতিদিন গরু চরাতে যেত রাখাল ছেলে রতন। কাজের সময় সে প্রায়ই একা হয়ে পড়ত। একঘেয়ে সময় কাটাতে তার ভালো লাগত না।
একদিন তার মাথায় এক দুষ্টু বুদ্ধি এল।
সে হঠাৎ চিৎকার করে উঠল—
“বাঁচাও! বাঘ এসেছে! বাঘ এসেছে!”
গ্রামের লোকজন লাঠিসোঁটা নিয়ে ছুটে এল। কিন্তু এসে দেখল কোথাও কোনো বাঘ নেই। রতন হো হো করে হাসতে লাগল।
লোকেরা রাগ করে ফিরে গেল।
কয়েকদিন পরে রতন আবার একই কাজ করল। আবার সবাই ছুটে এল, আর আবারও তারা প্রতারিত হল।
এভাবে কয়েকবার ঘটল।
গ্রামের লোকেরা বিরক্ত হয়ে বলল—
“এই ছেলেটার কথা আর বিশ্বাস করব না।”
কিছুদিন পর এক বিকেলে সত্যিই একটি বাঘ জঙ্গল থেকে বেরিয়ে এল। বাঘটিকে দেখে রতনের মুখ শুকিয়ে গেল।
সে প্রাণপণে চিৎকার করতে লাগল—
“বাঁচাও! সত্যি বাঘ এসেছে! আমাকে বাঁচাও!”
কিন্তু গ্রামের লোকেরা দূর থেকে তার চিৎকার শুনেও ভাবল—
“আবার নিশ্চয়ই মিথ্যা বলছে।”
কেউ এগিয়ে এল না।
বাঘটি গরুগুলোর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। অনেক ক্ষতি হলো। রতন প্রাণে বেঁচে গেলেও সেদিন সে জীবনের সবচেয়ে বড় শিক্ষা পেল।
মিথ্যা কথা মানুষকে এমন জায়গায় নিয়ে যায়, যেখানে সত্য বললেও কেউ বিশ্বাস করে না।
নীতিবাক্য : মিথ্যাবাদীর কথা কেউ বিশ্বাস করে না।
১৭. কৃষক ও বিষধর সাপ
সংকেত :
তীব্র শীতের সকাল—এক কৃষক পথের ধারে অধমরা সাপ দেখতে পেল—দয়া করে বাড়িতে নিয়ে এল—যত্নে সুস্থ করল—সুস্থ হয়ে সাপ কৃষকের ছেলেকে কামড়াতে গেল—কৃষক সাপকে হত্যা করল।
গল্প
পৌষের এক কনকনে শীতের সকাল। চারদিকে ঘন কুয়াশা নেমেছে। মাঠের ঘাসের ডগায় শিশিরবিন্দু জমে আছে। গ্রামের কৃষক গদাধর প্রতিদিনের মতো জমিতে যাচ্ছিল।
পথে হঠাৎ সে দেখতে পেল একটি বিষধর সাপ ঠান্ডায় জমে প্রায় মৃত অবস্থায় পড়ে আছে। সাপটি দুর্বল হয়ে কুণ্ডলী পাকিয়ে পড়েছিল। তার শরীর কাঁপছিল।
গদাধরের মনে দয়া হল। সে ভাবল—
“জীবন তো জীবনই। বিপদে কাউকে ফেলে রাখা উচিত নয়।”
সে সাপটিকে সাবধানে একটি ঝুড়িতে তুলে বাড়িতে নিয়ে এল। আগুনের কাছে রেখে গরম করল, দুধ দিল, যত্ন করতে লাগল।
কয়েকদিনের মধ্যেই সাপটি ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে উঠল।
গদাধরের ছোট ছেলে রবি প্রতিদিন দূর থেকে অবাক হয়ে সাপটিকে দেখত। একদিন সে খেলতে খেলতে সাপটির কাছে এগিয়ে গেল।
হঠাৎ সাপটি ফণা তুলে ছোবল মারার জন্য ঝাঁপিয়ে পড়ল।
গদাধর ঠিক সেই মুহূর্তে ঘটনাটি দেখতে পেয়ে দৌড়ে এল। হাতে থাকা লাঠি দিয়ে এক আঘাতে সে সাপটিকে মেরে ফেলল।
ছেলেকে বুকে জড়িয়ে ধরে সে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল—
“দয়া করা ভালো, কিন্তু যার স্বভাবই বিষাক্ত, তাকে অন্ধভাবে বিশ্বাস করা বিপজ্জনক।”
গ্রামের লোকেরা ঘটনাটি শুনে বলাবলি করতে লাগল—মানুষের চরিত্রের মতো কিছু স্বভাবও সহজে বদলায় না।
নীতিবাক্য : দুর্জনের স্বভাব সহজে পরিবর্তন হয় না।
১৮. সিংহ ও ইঁদুর
সংকেত :
নিদ্রিত সিংহ—ইঁদুরের দৌড়ঝাঁপে ঘুম ভাঙা—সিংহ ইঁদুরকে ধরল—ইঁদুর প্রাণভিক্ষা চাইল—পরে সিংহ শিকারির জালে আটকা পড়ল—ইঁদুর জাল কেটে উদ্ধার করল।
গল্প
ঘন জঙ্গলের মধ্যে এক বিশাল বটগাছের নীচে একদিন এক সিংহ নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে ছিল। বহু শিকার করার পরে সে ক্লান্ত হয়ে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে পড়েছিল।
ঠিক সেই সময় একটি ছোট্ট ইঁদুর খাবারের সন্ধানে এদিক-ওদিক ছুটোছুটি করতে করতে ভুল করে সিংহের শরীরের ওপর উঠে পড়ল।
ইঁদুরটি কখনও তার পিঠে, কখনও তার কাঁধে ছোটাছুটি করতে লাগল।
হঠাৎ সিংহের ঘুম ভেঙে গেল।
প্রচণ্ড রাগে সে থাবা দিয়ে ইঁদুরটিকে চেপে ধরে গর্জন করে বলল—
“এত সাহস! আমার শরীরের উপর দৌড়াদৌড়ি করছিস?”
ভয়ে ইঁদুর কাঁপতে কাঁপতে বলল—
“মহারাজ, আমাকে ক্ষমা করুন। আমি ইচ্ছা করে করিনি। আজ যদি প্রাণে বাঁচিয়ে দেন, হয়তো একদিন আমিও আপনার উপকারে আসতে পারি।”
কথাটি শুনে সিংহ হো হো করে হেসে উঠল।
“তুই? এতটুকু প্রাণী? আমার উপকার করবি?”
তবু তার দয়া হল। সে ইঁদুরটিকে ছেড়ে দিল।
কয়েকদিন পর এক শিকারির পাতা জালে সিংহ আটকা পড়ল। সে প্রাণপণে গর্জন করতে লাগল, কিন্তু বেরোতে পারছিল না।
দূরে ইঁদুর সেই গর্জন শুনে ছুটে এল।
সে সঙ্গে সঙ্গে ধারালো দাঁত দিয়ে জালের দড়ি কাটতে শুরু করল। কিছুক্ষণ পর জাল ছিঁড়ে গেল, আর সিংহ মুক্ত হলো।
সিংহ বিস্ময়ে ইঁদুরের দিকে তাকিয়ে বলল—
“আজ বুঝলাম, পৃথিবীতে কেউই তুচ্ছ নয়।”
ইঁদুর মৃদু হেসে বলল—
“শক্তি বড় কথা নয়, প্রয়োজনের সময় সাহায্যই বড় কথা।”
নীতিবাক্য : ক্ষুদ্রকেও তুচ্ছ ভাবা উচিত নয়।
১৯. ঘুঁটে পোড়ে গোবর হাসে
সংকেত :
এক ব্যক্তি অন্যের বিপদ দেখে উপহাস করে—নিজেকে নিরাপদ ভাবে—পরে নিজেই একই বিপদে পড়ে—শিক্ষা লাভ।
গল্প
শ্যামল ও বিমল একই গ্রামের প্রতিবেশী ছিল। শ্যামল ছিল একটু উদ্ধত স্বভাবের মানুষ। অন্যের দুঃখকষ্টে সহানুভূতি দেখানোর বদলে সে প্রায়ই বিদ্রূপ করত।
এক বর্ষার রাতে হঠাৎ বিমলের গোয়ালঘরের চাল ভেঙে পড়ল। প্রবল বৃষ্টিতে তার অনেক ক্ষতি হল। গরুগুলোও আহত হল।
পরদিন গ্রামের মানুষ সাহায্য করতে এলো। কিন্তু শ্যামল দূরে দাঁড়িয়ে মুচকি হেসে বলল—
“এত আয়োজন করলে এই তো হবে! এখন বুঝুক।”
বিমল কিছু বলল না।
কয়েক মাস পরে শরৎকালে হঠাৎ একদিন আগুন লেগে শ্যামলের ধানের গোলা পুড়ে যেতে শুরু করল। মুহূর্তের মধ্যে চারদিকে হাহাকার পড়ে গেল।
খবর পেয়ে গ্রামের লোকজন ছুটে এল। সবার আগে এল বিমল। সে নিজের প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে আগুন নেভাতে সাহায্য করল।
সব শান্ত হলে শ্যামল মাথা নিচু করে বলল—
“আমি তোমার দুঃখে হাসছিলাম, আর তুমি আমার বিপদে পাশে দাঁড়ালে!”
বিমল শুধু মৃদু হেসে বলল—
“মানুষের দুঃখ দেখে হাসলে একদিন সেই হাসি নিজের কাছেই ফিরে আসে।”
নীতিবাক্য : ঘুঁটে পোড়ে গোবর হাসে।
২০. সবুরে মেওয়া ফলে
সংকেত :
এক দরিদ্র কৃষক—বারবার ব্যর্থতা—মানুষের উপহাস—ধৈর্য ও অধ্যবসায়—শেষে সাফল্য।
গল্প
অমল ছিল এক দরিদ্র কৃষক। তার ছোট্ট একখণ্ড জমিই ছিল সংসারের একমাত্র ভরসা।
প্রথম বছর খরায় তার সব ফসল নষ্ট হয়ে গেল। দ্বিতীয় বছর অতিবৃষ্টিতে মাঠ জলের নিচে ডুবে গেল।
গ্রামের অনেকে বলত—
“এত চেষ্টা করে কী হবে? ভাগ্য খারাপ হলে পরিশ্রমেও লাভ নেই।”
অমল শুধু হাসত।
সে আবার নতুন করে জমিতে কাজ শুরু করল। আরও যত্ন নিল, আরও পরিশ্রম করল।
কয়েক মাস পরে মাঠে সোনালি ধানের ঢেউ উঠল। গ্রামের লোকেরা বিস্ময়ে তাকিয়ে রইল।
তখন অমল বলল—
“মাটিরও মন আছে। তাকে সময় দিতে হয়।”
নীতিবাক্য : সবুরে মেওয়া ফলে।
২১. কষ্ট করলে কেষ্ট মেলে
সংকেত :
দরিদ্র ছাত্র—অভাবের সঙ্গে সংগ্রাম—অধ্যবসায়—শেষে সাফল্য।
গল্প
গ্রামের ছেলে শুভর পড়াশোনার খুব ইচ্ছে ছিল। কিন্তু তার বাবা ছিলেন একজন রিকশাচালক। সংসারে অভাব ছিল নিত্যসঙ্গী।
দিনে সে বাবাকে কাজে সাহায্য করত, আর রাতে কুপির আলোয় পড়ত।
অনেকেই তাকে উপহাস করত—
“এত পড়ে কী হবে?”
কিন্তু শুভ থামেনি।
বছরের পর বছর কঠোর পরিশ্রমের পরে সে বড় পরীক্ষায় প্রথম হল। সেদিন তার বাবা চোখ মুছতে মুছতে বললেন—
“আজ আমার কষ্ট সার্থক হলো।”
শুভ বলল—
“স্বপ্ন কখনও নিজে নিজে পূরণ হয় না, তাকে পরিশ্রম দিয়ে তৈরি করতে হয়।”
নীতিবাক্য : কষ্ট করলে কেষ্ট মেলে।
২২. যে সহে সে রহে
সংকেত :
এক দরিদ্র যুবক—সংসারে অভাব—মানুষের অবজ্ঞা ও অপমান—ধৈর্য ও সহিষ্ণুতা—অবশেষে সাফল্য ও সম্মান।
গল্প
মুর্শিদাবাদের এক ছোট্ট গ্রামে নীলয় নামে এক যুবক বাস করত। সংসারে চরম অভাব ছিল। তার বাবা বহুদিন অসুস্থ, মা মানুষের বাড়িতে কাজ করতেন। নীলয় ছোটবেলা থেকেই বুঝেছিল—দারিদ্র্য শুধু পেটের কষ্ট দেয় না, মানুষের চোখে সম্মানও কেড়ে নেয়।
কাজের ফাঁকে ফাঁকে সে পড়াশোনা করত। ভোরে সংবাদপত্র বিলি করত, দুপুরে বাজারে মাল টানার কাজ করত, আর রাতে বই নিয়ে বসত। কিন্তু গ্রামের কিছু মানুষ তাকে নিয়েই হাসাহাসি করত।
কেউ বলত—
“ওর আবার এত বড় স্বপ্ন!”
কেউ বলত—
“গরিবের ছেলে কি বড়লোক হবে?”
এইসব কথা শুনে নীলয়ের বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠত। তবুও সে কোনো উত্তর দিত না। তার মা প্রায়ই বলতেন—
“জীবনে অপমানের জবাব কথায় দিতে নেই; কাজ দিয়ে দিতে হয়।”
মায়ের সেই কথাগুলো নীলয়ের মনের মধ্যে পাথরের মতো গেঁথে গিয়েছিল।
দিন গড়াল। বছর পার হলো। দীর্ঘ সংগ্রাম ও অক্লান্ত পরিশ্রমের পরে নীলয় বড় পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে একজন উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা হলো।
একদিন সেই গ্রামেই তাকে সংবর্ধনা দেওয়া হলো। যাঁরা একদিন তাকে অপমান করেছিল, তারাই আজ হাততালি দিচ্ছিল।
মঞ্চে উঠে নীলয় শান্ত কণ্ঠে বলল—
“কষ্ট, অপমান আর প্রতিকূলতা মানুষকে ভেঙেও দিতে পারে, আবার গড়েও তুলতে পারে। যে সহ্য করতে জানে, শেষ পর্যন্ত সে-ই টিকে থাকে।”
চারদিকে করতালির শব্দ বেজে উঠল।
নীতিবাক্য : যে সহে সে রহে।
২৩. দুই বন্ধু ও ভালুক
সংকেত :
দুই বন্ধু—গভীর বন—হঠাৎ ভালুক—একজন আত্মরক্ষা—অন্যজন বিপদে—বুদ্ধি করে বাঁচা—বন্ধুত্বের পরীক্ষা।
গল্প
বর্ষার শেষভাগ। আকাশে সাদা মেঘের ভেলা ভাসছে। গ্রামের দুই বন্ধু অমিত ও রঞ্জন পাশের শহরে কাজের সন্ধানে যাচ্ছিল। পথের মধ্যে পড়েছিল একটি বিশাল শাল-সেগুনের বন। বনটি নিয়ে গ্রামের লোকদের নানা গল্প ছিল। কেউ বলত সেখানে বন্য পশুর বাস, কেউ বলত সন্ধ্যার পর পথিকের আর ফিরে আসা হয় না।
দুজনেই গল্প করতে করতে পথ চলছিল।
রঞ্জন বলল—
“বন্ধু, মানুষ যদি পাশে থাকে, তবে কোনো পথই কঠিন নয়।”
অমিত হেসে বলল—
“ঠিকই বলেছ। সুখে-দুঃখে আমরা তো একসঙ্গেই আছি।”
কিন্তু জীবনের সত্য কথা অনেক সময় হঠাৎ করেই পরীক্ষা নিয়ে ফেলে।
বনের মাঝখানে পৌঁছতেই তারা দেখতে পেল—একটি বিশাল ভালুক ধীরে ধীরে তাদের দিকে এগিয়ে আসছে।
দুজনের মুখের রঙ মুহূর্তে বদলে গেল।
অমিত গাছে চড়তে জানত। নিজের প্রাণ বাঁচানোর তাড়নায় সে কোনো কথা না বলেই দ্রুত একটি গাছে উঠে গেল।
কিন্তু রঞ্জন গাছে চড়তে জানত না। কয়েক মুহূর্তের জন্য সে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
তার মনে হল—
“আজ বুঝি সব শেষ।”
হঠাৎ তার মনে পড়ল—সে কোথাও শুনেছিল, ভালুক মৃত মানুষকে আক্রমণ করে না।
সে তৎক্ষণাৎ মাটিতে উপুড় হয়ে নিঃশ্বাস বন্ধ করে পড়ে রইল।
কিছুক্ষণের মধ্যে ভালুকটি কাছে এল। তার বিশাল শরীরের ছায়া রঞ্জনের ওপর পড়ল। ভালুকটি তার মুখের কাছে নাক নিয়ে গিয়ে শুঁকতে লাগল।
রঞ্জনের বুকের ভিতর ভয়ে ঝড় বয়ে যাচ্ছিল, কিন্তু বাইরে তার শরীর ছিল নিশ্চল।
কিছুক্ষণ পরে ভালুকটি ধীরে ধীরে চলে গেল।
ভয় কেটে গেলে অমিত গাছ থেকে নেমে এসে মুচকি হেসে বলল—
“আরে, ভালুকটা তো তোমার কানে কানে কিছু বলছিল! কী বলল?”
রঞ্জন কিছুক্ষণ চুপ করে তার দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর শান্ত গলায় বলল—
“ভালুক আমাকে একটা কথা বলে গেছে—যে বন্ধু বিপদের সময় পাশে থাকে না, তাকে কখনও বিশ্বাস করা উচিত নয়।”
অমিত লজ্জায় মাথা নিচু করে ফেলল।
সেদিন বনপথের নিস্তব্ধতা যেন বন্ধুত্বের আসল অর্থ বুঝিয়ে দিয়েছিল।
নীতিবাক্য : বিপদের বন্ধুই প্রকৃত বন্ধু।
২৪. কাঠুরিয়া ও জলদেবতা
সংকেত :
দরিদ্র কাঠুরিয়া—নদীতীরে কাঠ কাটতে গিয়ে কুড়োল জলে পড়ে যাওয়া—দুঃখ ও অসহায়তা—জলদেবতার আবির্ভাব—সোনার, রুপোর ও লোহার কুড়োল—সততার পুরস্কার।
গল্প
একটি পাহাড়ঘেরা গ্রামের প্রান্তে রঘু নামে এক দরিদ্র কাঠুরিয়া বাস করত। ছোট্ট কুঁড়েঘর, স্ত্রী ও দুটি সন্তান নিয়ে তার সংসার। প্রতিদিন ভোরের আলো ফুটতেই সে কাঁধে কুড়োল নিয়ে বনের পথে বেরিয়ে পড়ত। সারাদিন কাঠ কেটে বাজারে বিক্রি করেই তার সংসারের চাকা কোনোমতে ঘুরত।
একদিন ভোরবেলা আকাশে হালকা কুয়াশা ছিল। পাখিরা গাছের ডালে বসে গান গাইছিল। রঘু প্রতিদিনের মতো একটি নদীর ধারে এসে বড় একটি শুকনো গাছ কাটতে শুরু করল।
নদীটি ছিল গভীর এবং স্রোতও বেশ তীব্র।
রঘু পরিশ্রম করে গাছ কাটছিল। হঠাৎ তার হাত ফসকে কুড়োলটি সোজা নদীর জলে পড়ে গেল।
“ঝপাং!”
মুহূর্তের মধ্যে কুড়োলটি গভীর জলের নিচে হারিয়ে গেল।
রঘুর মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ল।
সে নদীর ধারে বসে পড়ল। তার চোখে জল এসে গেল। সে ভাবতে লাগল—
“এই কুড়োলটাই ছিল আমার জীবনের একমাত্র সম্বল। এটা ছাড়া আমি কাজ করব কী করে? আমার ছেলেমেয়েরা খাবে কী?”
সে অসহায়ের মতো কাঁদতে লাগল।
হঠাৎ নদীর জল যেন অদ্ভুতভাবে আলোড়িত হয়ে উঠল। জলের ভেতর থেকে এক আশ্চর্য আলোকরেখা ধীরে ধীরে উপরে উঠতে লাগল।
সেই আলোর মধ্য থেকে আবির্ভূত হলেন জলদেবতা।
তিনি শান্ত কণ্ঠে বললেন—
“কাঠুরিয়া, তুমি কাঁদছ কেন?”
রঘু হাত জোড় করে সব কথা খুলে বলল।
জলদেবতা কিছুক্ষণ নদীর জলে ডুব দিলেন। তারপর হাতে একটি ঝকঝকে সোনার কুড়োল নিয়ে উঠে এসে বললেন—
“এটা কি তোমার কুড়োল?”
সোনার কুড়োল দেখে রঘুর চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে গেল। কিন্তু সে মাথা নেড়ে বলল—
“না দেবতা, এটা আমার নয়।”
জলদেবতা আবার জলে ডুব দিলেন। এবার তিনি একটি রুপোর কুড়োল নিয়ে এলেন।
“এটি কি তোমার?”
রঘু আবার বলল—
“না দেবতা, এটাও আমার নয়।”
তৃতীয়বার জলদেবতা জলে ডুব দিয়ে একটি সাধারণ লোহার কুড়োল নিয়ে এলেন।
রঘুর মুখ আনন্দে উজ্জ্বল হয়ে উঠল।
সে বলে উঠল—
“হ্যাঁ দেবতা! এটাই আমার কুড়োল।”
জলদেবতা মৃদু হেসে বললেন—
“তুমি দারিদ্র্যের মধ্যেও সত্যকে ত্যাগ করনি। তাই তোমার সততার পুরস্কারস্বরূপ এই তিনটি কুড়োলই তোমাকে দিলাম।”
রঘুর চোখে আনন্দাশ্রু চলে এল।
সেদিন সে শুধু তিনটি কুড়োলই পায়নি, জীবনের সবচেয়ে বড় সম্পদও পেয়েছিল—সততার মর্যাদা।
নীতিবাক্য : সততাই শ্রেষ্ঠ সম্পদ।
২৫. বোকা কাক ও ধূর্ত শিয়াল
সংকেত :
এক কাক মুখে মাংস নিয়ে গাছের ডালে বসেছিল—এক শিয়ালের নজরে পড়ল—শিয়ালের লোভ—চাটুবাক্য ও প্রশংসা—কাকের আত্মপ্রবঞ্চনা—মাংস পড়ে যাওয়া—শিয়ালের লাভ।
গল্প
বসন্তের এক মধুর সকাল। চারদিকে কোমল রোদ ছড়িয়ে পড়েছে। গাছের ডালে ডালে পাখিদের কোলাহল, বাতাসে ফুলের মৃদু গন্ধ। এমন সময় একটি কাক গ্রামের বাজারের পাশের মাংসের দোকান থেকে সুযোগ বুঝে এক টুকরো মাংস ঠোঁটে নিয়ে উড়ে গেল।
অনেক দূরে একটি বিশাল আমগাছের উঁচু ডালে বসে সে নিশ্চিন্তে মাংস খাওয়ার প্রস্তুতি নিতে লাগল।
এদিকে কাছাকাছি ঝোপের আড়ালে একটি শিয়াল ঘুরে বেড়াচ্ছিল। হঠাৎ তার চোখ পড়ল কাকের ঠোঁটে ধরা মাংসের দিকে।
শিয়ালের জিভে জল এসে গেল।
সে মনে মনে ভাবল—
“ওটা যদি কোনোভাবে পাওয়া যায়! কিন্তু জোর করে তো সম্ভব নয়। কৌশলই একমাত্র উপায়।”
শিয়াল ধীরে ধীরে গাছের নীচে এসে দাঁড়াল। মুখে মিষ্টি হাসি এনে বলল—
“আহা! এ যে পাখিদের রাজা! তোমাকে আজ সত্যিই অপূর্ব লাগছে।”
কাক একটু অবাক হলো।
শিয়াল আবার বলল—
“তোমার ডানার রং যেন মেঘের মতো সুন্দর, তোমার চোখ দুটি যেন মুক্তোর মতো উজ্জ্বল। তোমার মতো সুন্দর পাখি আমি কখনও দেখিনি।”
কাকের বুক আনন্দে ফুলে উঠতে লাগল।
শিয়াল এবার আরও এক ধাপ এগোল—
“তোমার রূপ যখন এত সুন্দর, তখন তোমার কণ্ঠস্বর নিশ্চয়ই আরও মধুর! আমি যদি তোমার গানের সৌভাগ্য পেতাম!”
কাক নিজের প্রশংসা শুনে আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না।
সে মনে মনে ভাবল—
“আমার মতো সুন্দর আর গুণী পাখি সত্যিই হয়তো নেই!”
গান গাওয়ার জন্য সে মুখ খুলে “কা—কা” করে ডাকতে শুরু করল।
আর সঙ্গে সঙ্গে তার ঠোঁট থেকে মাংসের টুকরোটি নীচে পড়ে গেল।
শিয়াল মুহূর্তের মধ্যে সেটি মুখে তুলে নিল।
চলে যাওয়ার আগে সে মুচকি হেসে বলল—
“প্রশংসা শুনতে ভালো, কিন্তু চাটুকারিতায় বিশ্বাস করা বুদ্ধিমানের কাজ নয়।”
কাক মাথা নিচু করে গাছের ডালে বসে রইল। নিজের ভুল সে তখন বুঝতে পেরেছে, কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে।
নীতিবাক্য : স্তাবকদের চাটুবাক্য বিশ্বাস করা উচিত নয়।
২৬. সিংহ ও খরগোশ
সংকেত :
এক দুর্দান্ত সিংহের অত্যাচারে বন আতঙ্কিত—পশুদের সভা—প্রতিদিন একটি প্রাণী পাঠানোর সিদ্ধান্ত—একদিন খরগোশের পালা—বুদ্ধির আশ্রয়—কুয়োর জলে প্রতিবিম্ব দেখে সিংহের মৃত্যু।
গল্প
সুদূর এক অরণ্যে এক ভয়ংকর সিংহ বাস করত। তার শক্তি ছিল অসাধারণ, আর তার গর্জনে বন কেঁপে উঠত। কিন্তু সেই শক্তির সঙ্গে ছিল সীমাহীন অহংকার ও নিষ্ঠুরতা। সে ক্ষুধা লাগুক বা না লাগুক, প্রতিদিন বহু প্রাণী হত্যা করত। ফলে অরণ্যের পশুপাখিরা আতঙ্কে দিন কাটাত।
হরিণেরা আর খোলা মাঠে বেরোত না, খরগোশেরা গর্তের বাইরে খেলত না, পাখিরাও ভয়ে নিচে নামত না। বন যেন ধীরে ধীরে আনন্দহীন হয়ে উঠল।
একদিন অরণ্যের সমস্ত প্রাণী গোপনে একটি সভায় মিলিত হলো। সভায় সবাই উদ্বিগ্ন।
এক বৃদ্ধ হরিণ বলল—
“এভাবে চলতে থাকলে আমাদের কেউই আর বাঁচব না।”
অনেক আলোচনা শেষে ঠিক হলো—প্রতিদিন একটি করে প্রাণী স্বেচ্ছায় সিংহের কাছে যাবে। এতে অন্তত নির্বিচারে হত্যাকাণ্ড বন্ধ হবে।
সিংহও প্রস্তাবে রাজি হয়ে গেল। তার মনে হলো, এতে আর শিকার খুঁজে বেড়াতে হবে না।
কিছুদিন এভাবেই চলতে লাগল।
একদিন পালা এল একটি ছোট্ট খরগোশের।
খরগোশটি খুব চিন্তিত হয়ে পড়ল। কিন্তু পথ চলতে চলতে তার মাথায় একটি বুদ্ধি এল।
সে ইচ্ছা করে অনেক দেরি করে সিংহের কাছে পৌঁছল।
ক্ষুধায় কাতর সিংহ তখন রাগে অস্থির।
সে গর্জে উঠল—
“এত দেরি হলো কেন?”
খরগোশ ভয়ে কাঁপছে এমন ভান করে বলল—
“মহারাজ, আমি তো ঠিক সময়েই আসছিলাম। কিন্তু পথে আরেকটি সিংহ আমাকে আটকায়। সে নিজেকে এই বনের আসল রাজা বলে দাবি করেছে।”
এই কথা শুনে সিংহের চোখ রাগে লাল হয়ে উঠল।
সে গর্জে বলল—
“আমার বনে আরেক সিংহ! কোথায় সে? আমাকে দেখাও!”
খরগোশ তাকে নিয়ে একটি পুরোনো গভীর কুয়োর কাছে গেল।
তারপর বলল—
“মহারাজ, ওই কুয়োর ভেতরে লুকিয়ে আছে সে।”
সিংহ রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে কুয়োর ভেতরে তাকাল।
জলের মধ্যে সে নিজেরই প্রতিবিম্ব দেখতে পেল।
সে ভাবল সত্যিই আরেকটি সিংহ সেখানে দাঁড়িয়ে আছে। রাগে গর্জন করতেই জলের ভেতর থেকেও একই শব্দ ফিরে এল।
আর এক মুহূর্ত দেরি না করে সিংহ কুয়োর ভেতরে ঝাঁপিয়ে পড়ল।
কুয়োটি ছিল খুব গভীর। অনেক চেষ্টা করেও সে আর ওপরে উঠতে পারল না।
অরণ্যের সমস্ত প্রাণী যখন খবরটি জানল, আনন্দে চারদিক মুখর হয়ে উঠল।
সেদিন বনবাসীরা বুঝেছিল—শুধু শক্তি নয়, বুদ্ধিও মানুষের ও প্রাণীর সবচেয়ে বড় শক্তি।
নীতিবাক্য : গায়ের শক্তির চেয়ে বুদ্ধিই বড়ো।

