শতবর্ষে চলচ্চিত্র: শত জলঝর্ণার ধ্বনি
সত্যজিৎ থেকে ঋত্বিক হয়ে একুশ শতক : একশ বছরের বাংলা সিনেমার বিবর্তনের গল্প
ড. অনিশ রায়
॥ এক ॥
একুশ শতকের এই দশক শতবর্ষ আর সার্ধ শতবর্ষের মিলন-আঙিনা যেন। তবু, সেই উজ্জ্বল ঘটনা-ক্রিয়ার মুগ্ধ আলাপচারিতার মধ্যেই ঘটে গেল দুটি দুর্ঘটনা। বেশ আড়ম্বরের সঙ্গেই। আজি হতে শতবর্ষ আগে ঘটে যাওয়া অর্জন এবং বিস্মরণের ঐতিহাসিক পুনরাবৃত্তিতে।
এক ॥ রবীন্দ্রনাথ ও তাঁর নোবেল প্রাপ্তি
দুই ॥ ভারতীয় চলচ্চিত্রের ভাব-মহিমা সূচনা
দুটো অর্জনই আমাদের গর্বিত করে। মহত্তর প্রত্যয়কে চিন্তার সাধ্য-সীমায় আনে। আরো অহং জাগে, যখন এই দুটির সাথেই মিশে আছে বাঙালির মেধা-ঘাম-অশ্রু-রক্ত এবং বাঙালির বিশ্বসাধনার কথকতা। তাহলে, নিশ্চয়ই প্রশ্ন জাগে ‘দুর্ঘটনা’ এবং ‘বিস্মরণ’ এমন ঘাতক-শব্দ ব্যবহারের কারণ কী? উত্তরে এন.সি. চৌধুরীর বহুখ্যাত শব্দবন্ধ প্রথম অভিব্যক্তি হিসেবে ধার নিলাম-“আত্মঘাতী বাঙালি”।
হায় বাঙালি, হে বাঙালি, আসুন, দায় এড়িয়েও স্বীকার করি ‘দুর্ঘটনা’ মারাত্মক; কেননা, ওই নোবেল প্রাপ্তিটুকুই সেদিন থেকে এখনো হয়ে আছে রবীন্দ্রনাথের বৃহত্তর পরিচিতি। আমরা আজও এমন সত্যদ্রষ্টা ঋষিতুল্য কবি-মানুষটির সর্বব্যাপী জীবনবোধকে বিস্মৃতির অতলে ডুবিয়ে রেখেছি। আবার এই আমরা, ক’জনই বা মনে রেখেছি বা স্বীকৃতি দিয়েছি ভারতীয় চলচ্চিত্রের আদিপুরুষ হীরালাল সেন কে? যাঁর আত্মবিসর্জিত কর্মসাধনার মধ্য দিয়েই এদেশে চলচ্চিত্র নামক আধুনিকতম শিল্পসন্তানের জন্মলাভ ঘটেছে। সুতরাং বলতে পারি, এই দুটি প্রাপ্তি যেমন আমাদের অন্তঃসারশূন্যতাকে প্রকট করে, তেমনি আমাদের ইতিহাস-ঘাতক রূপকেও স্পষ্ট করে।
॥ দুই ॥
২৮ডিসেম্বর, ১৮৯৫ সালে প্যারিসের হোটেল ডি ক্যাফেতে ল্যুমিয়ের ভ্রাতৃদ্বয় বিশ্বের প্রথম চলচ্চিত্র শুরু করেন। অবশ্য অনেকেই বলেন, ১৮৮৯ সালে আমেরিকায় এই শিল্পের প্রথম পদক্ষেপ ঘটেছিল। এসব বিতর্কের বিষয়, তেমন মনে করলে তো বলতে হয়, ১৬৬১ সালেই ক্রিচার ম্যাজিকলষ্ঠনের সাহয্যে যিশুর যে জীবনচক্র তৈরি করেছিলেন, সেখানেই চলচ্চিত্রের আদি সূত্রপাত ঘটে গেছে। আসলে এসব-ই ছিল শুরুর আগের প্রস্তুতি। তাই অগাস্ট ল্যুমিয়ের ও লুই ল্যুমিয়ের, এই দুই ভাইয়ের প্রয়াসকেই চলচ্চিত্র শিল্পের প্রস্তাবনা বলে মনে করা হয়। যাই হোক, ল্যুমিয়ের কোম্পানির এক চিত্র গ্রাহক ১৮৯৬ সালের ৭ জুলাই মুম্বই-র ওয়াটসন হোটেলে ভারতীয় উপমহাদেশের মাটিতে প্রথম চলচ্চিত্র প্রদর্শনটি দেখান। তখন অবশ্য চলচ্চিত্রকে বায়োস্কোপ বলা হতো। প্রথম প্রদর্শনে টিকিটের দাম মহার্ঘ (১ টাকা) হলেও পরে সস্তায় বায়োস্কোপ প্রদর্শনী শুরু হয়।
এই ঘটনার ১৮ বছরের মধ্যেই, অর্থাৎ ১৯১৩ সালের ৩ মে দাদা সাহেব গোবিন্দ ফালকের নির্বাক ছায়াছবি ‘রাজা হরিশচন্দ্র’-র হাত ধরে উপমহাদেশের মাটিতে চলচ্চিত্র শিল্প তার গৌরবোজ্জ্বল যাত্রা শুরু করে। এই বক্তব্যেই অবশ্য সেই ঐতিহাসিক বিতর্ক; না, বলা ভালো ইতিহাস অস্বীকারের সত্যটি নিজস্ব অস্তিত্ব প্রকট করে তোলে। কেননা, প্রকৃত প্রস্তাবে দাদা সাহেব ফালকের এমন সাড়ম্বর সূচনার বহু পূর্বেই চলচ্চিত্র বিষয়টিকে ভারতের মাটিতে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন এক বঙ্গ সন্তান; তিনি চির শ্রদ্ধেয় অথচ আজও অস্বীকৃত হীরালাল সেন। তাঁর প্রতিষ্ঠিত ‘দ্য রয়েল বায়োস্কোপ কোম্পানি’ (১৮৯৮)-ই বাংলা তথা ভারতীয় চলচ্চিত্রের সূতিকাগার। সুতরাং এই বাক্যটিকেই সবচেয়ে গাঢ়, জোড়ালো এবং উচ্চস্বরে বলা যায়– শতবর্ষে ভারতীয় চলচ্চিত্রের প্রাণ-পুরুষ হলেন হীরালাল সেন। কিন্তু অদ্ভুতভাবে এদেশে তিনি আজও ব্রাত্য। বাংলা তথা বাঙালির প্রতি আরো আর অনেক ঘটনার মতো এ-ও এক বড় বঞ্চনার নির্মম সাক্ষ্য। সবচেয়ে বড় কথা, এ এক ভয়ঙ্কর আত্মপ্রতারণা। এদেশের ইতিহাস চিরকাল বাঙালিকে পশ্চাতে রাখার ঘৃণ্য প্রয়াস চালিয়েছে, মানুষকে ভুল ব্যাখ্যা শুনিয়েছে। আর বাঙালি সব দেখে, সব বুঝেও চিরকাল পাশ কাটিয়ে গেছে; কিংবা সাফল্যের বলয়ে প্রবেশ করার দুর্মর লোভে সেই কপট-কণ্ঠে কণ্ঠ মিলিয়েছে। নাহলে আজ এদেশের ইতিহাস অন্যভাবে লেখা হতো। লেখা হতো চলচ্চিত্র শিল্পেরও নতুন ইতিহাস। সত্যিই, এই ইতিহাস-বিকৃত ইতিকথা নির্মাণ যন্ত্রনার। তবু সেই স্বীকৃতি বা অস্বীকৃতির পর্ব থেকে কয়েক পা সরে এসে সীমিত অক্ষরমালায় হীরালাল সেনের শিল্পিত-অবয়ব দানের প্রয়াস রাখা যাক।
হীরালাল সেন, মানিকগঞ্জ জেলার বগজুরী গ্রামের বাসিন্দা, এদেশের প্রথম বায়োস্কোপ কোম্পানির প্রতিষ্ঠাতা। প্রতিষ্ঠার দিন ৪এপ্রিল, ১৮৯৮; প্রতিষ্ঠানের নাম ‘রয়াল বায়োস্কোপ কোম্পানি’। সহযোগী ছিলেন ভাই মতিলাল সেন। দুই ভাই চলচ্চিত্রে অনুপ্রাণিত হন প্রফেসর স্টিফেন্সের প্রদর্শনী থেকে। হীরালাল ছিলে একজন চিত্রগ্রাহক। তিনি ইউরোপিয়ানদের পরাজিত করে আলোকচিত্রের প্রতিযোগিতায় শ্রেষ্ঠ হয়েছিলেন।
হীরালাল সেন, এদেশে প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্যের চলচ্চিত্রের নির্মাতাই শুধু নন; তিনিই প্রথম তথ্যচিত্র নির্মাতা, প্রথম বিজ্ঞাপন বিষয়ক চলচ্চিত্রের নির্মাতা, প্রথম রাজনৈতিক চলচ্চিত্রের-ও নির্মাতা। হীরালাল সেনের সৃষ্টিশীল কর্মজীবন ব্যাপ্ত ছিল ১৯১৩ সাল পর্যন্ত। যার মধ্যে তিনি ৪০টি–র বেশি চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছিলেন। বেশিরভাগ ছবিতেই তিনি ক্যামেরাবদ্ধ করেন অমরেন্দ্রনাথ দত্তের কলকাতার ক্লাসিক থিয়েটারে মঞ্চস্থ বিভিন্ন থিয়েটারের দৃশ্য।
১৯০১ আর ১৯০৪-এর মধ্যে ক্লাসিক থিয়েটারের পক্ষে তিনি অনেকগুলি ছবি নির্মান করেন; সীতারাম, মৃণালিনী, আলিবাবা, হরিরাজ, সরলা, ভ্রমর, বুদ্ধদেব, দুটি প্রাণ, সুরেন্দ্রনাথের শোভাযাত্রা, পঞ্চম জর্জের দিল্লি আগমন ইত্যাদি। তিনি ১৯০৩ সালে একটি পূর্ণদৈর্ঘ্যের ছবি নির্মাণ করেন, —‘আলিবাবা ও চল্লিশ চোর’; এটি নির্মিত হয়েছিল ক্লাসিক থিয়েটারে অভিনীত ওই নামের থিয়েটারের ওপর ভিত্তি করে। তবে এ ছবি সম্পর্কে কিছুই জানা যায় না। সম্ভবতঃ এর কোনো প্রদর্শন হয়নি। তাঁর সৃষ্ট তথ্যচিত্রের মধ্যে আছে— চিৎপুর রোড, ধলেশ্বরী নদীতে স্নান, মল্লিক বাড়ির বিয়ে ইত্যাদি। তাঁর তথ্যচিত্র ‘Anti Partition Demostration and Swadeshi movemnet at the Town Hall, Calcutta on 22nd September, 1905’-কেই ভারতের প্রথম রাজনৈতিক চলচ্চিত্র বলে মান্যতা দেওয়া হয়। এ ছবির বিজ্ঞাপনে বলা হয়েছিল—“আমাদের নিজেদের স্বার্থে খাঁটি স্বদেশী সিনেমা”। ছবির শেষে ‘বন্দে মাতরম্’ গানটি রাখা হয়েছিল। বাণিজ্যিক ভিত্তিতে তিনি কতগুলি বিজ্ঞাপন বিষয়ক আর কিছু সংবাদমূলক চলচ্চিত্র-ও নির্মাণ করেন। তাঁর সৃষ্ট ‘জবাকুসুম হেয়ার ওয়েল’ এবং ‘এডওয়ার্ড টনিক’-ই সম্ভবতঃ এদেশের প্রথম ‘অ্যাড ফিল্ম’।
‘রয়াল বায়োস্কোপ কোম্পানি’ প্রথম ছবি বানায় ১৯১৩ সালে। তারপর-ই হীরালাল পারিবারিক দুর্যোগ এবং ব্যাপক আর্থিক সমস্যার সম্মুখীন হন। (এ প্রসঙ্গে উল্লেখ্য, বিখ্যাত ‘প্যাথে কোম্পানি’ একসময় হীরালাল সেনকে গড়ের মাঠে তাঁবু খাটিয়ে তাদের ছবি দেখানোর প্রস্তাব দিয়েছিল; কিন্তু হীরালাল সেই প্রস্তাব প্রত্যাখান করেন। যে সুযোগটি কাজে লাগিয়ে বিপুল মুনাফা অর্জন করেন দুঁদে পারসি ব্যবসায়ী জামসেদজি ফ্রামজি ম্যাডান।) পারিবারিক ও আর্থিক সমস্যার মোকাবিলা করতে করতে হীরালাল সেন ক্যান্সারে আক্রান্ত হন। তাঁর মৃত্যু কিছুদিন আগে, ভাই মতিলাল সেনের বাড়িতে রাখা তাঁর সমস্ত ফিল্ম এবং নথি আগুনে পুড়ে যায়। সেই আগুনে হীরালাল সেন নামটিও পুড়ে ভস্ম হয়ে যায়। এই দেশ, তাঁর স্বজাতি বাঙালি তাঁকে বে-মালুম বিস্মৃতির অতলে ডুবিয়ে দেয়। (দাদা সাহেব ফালকে পেলেন এদেশীয় চলচ্চিত্রের আদি পুরুষের মর্যাদা)। ২০১৭ সাল, অর্থাৎ তাঁর মৃত্যুর শতবর্ষে দাঁড়িয়েও আমরা এই বিস্মৃতির কলঙ্ক কি গায়ে মেখে বসে থাকবো?
যাই হোক, সে-কথা আজ আড়ালেই চলুক। আজ না হয় স্মরণ করি, শতবর্ষে চলচ্চিত্রের দুর্গম পথ অতিক্রমের মধুর স্মৃতি। প্রয়াস রাখি তার বিবর্তন পথের রূপরেখা নির্মাণের। অবশ্যই তা হবে অযোগ্যের অক্ষম প্রয়Tস। তবু, বলে যাই কিছু কথা।
॥ তিন ॥
চলচ্চিত্র জীবন ও সমাজের প্রতিচ্ছবি। সেলুলয়েডে বন্দি করে রাখা মানুষের জীবন চিত্রায়ন সর্বদাই মানুষকে করেছে আকৃষ্ট। এদেশের মানুষের কাছে চলচ্চিত্রের আবেদন তুলনায় অনেক বেশি এবং সুদূরপ্রসারী। এদেশে চলচ্চিত্র শতবর্ষ পূর্ণ করেছে। এই শতবর্ষে ঘটে গেছে যুদ্ধ, মন্বন্তর, দাঙ্গা, স্বাধীনতা, দেশভাগ, খাদ্য-সংকট, উদ্বাস্তু সমস্যা, একের পর এক রাজনৈতিক পট পরিবর্তন, বিশ্বায়নের বাজারনীতি ইত্যাদি ইত্যাদির মতো ঘটনা। রাষ্ট্রিক, সামাজিক এবং মানসিক ক্ষেত্রে বিচিত্র ভাঙনের সূত্র ধরে এদেশের চলচ্চিত্র ভাবনা-ও ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেছে। তার শরীরেও পরিবর্তনের চিহ্ন হয়েছে স্পষ্ট।
আগেই বলেছি, বাংলায় চলচ্চিত্র প্রদর্শনীর বিষয়টিকে প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি দান করেন, জে.এফ.ম্যাডান। ১৯১৩ সালে বম্বেতে ‘রাজা হরিশচন্দ্র’ মুক্তি পেলে সেই প্রাতিষ্ঠানিক প্রয়াসে জোয়ার আসে। ম্যাডান কোম্পানির প্রযোজনায়, প্রিয়নাথ গাঙ্গুলি ও জ্যোতিষ বন্দ্যোপাধ্যায়ের পরিকল্পনায় তৈরি হয় প্রথম বাংলা পূর্ণ দৈর্ঘ্য নির্বাক চলচ্চিত্র ‘বিল্বমঙ্গল’ (১৯১৬)। ১৯১৭ সালে, ফালকের ‘রাজা হরিশচন্দ্র’, রুস্তমজী ধোতিওয়ালার নির্দেশনায় বাংলা টাইটেল সহ দেখানো হয়।
তবে সম্পূর্ণ বাঙালি অংশগ্রহনে, বাঙালির মূলধনে, বাঙালির মেধায় ও পরিশ্রমে, বাঙালি চিত্রগৃহে মুক্তিপ্রাপ্ত চলচ্চিত্র হিসেবে ধীরেন্দ্রনাথ গঙ্গোপাধ্যায়ের ( ডি.জি.) ‘বিলেতফেরৎ’-ই (১৯২১) প্রথম নাম। তখন ছিল নির্বাক চলচ্চিত্রের যুগ। এই যুগে চলচ্চিত্রকে নিয়ন্ত্রন করে ইন্দো-ব্রিটিশ ফিল্ম কোম্পানি, তাজমহল ফিল্মস, অরোরা ফিল্মস কোম্পানি, ইন্ডিয়ান সিনেমা, গ্রাফিক আর্টস, ইন্টারন্যাশনাল ফিল্ম ক্রাফট্ প্রভৃতি সংস্থা। প্রায় শতাধিক চলচ্চিত্র এদের দ্বারা নির্মিত ও পরিবেশিত হয়। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল ইন্দো-ব্রিটিশ ফিল্ম কোম্পানি। কারণ এর কর্ণধার ছিলেন ধীরেন গঙ্গোপাধ্যায় ওরফে ডিজি এবং নীতীশচন্দ্র লাহিড়ী।যারা নির্বাক যুগের একটি বড় অধ্যায়। বাংলা সিনেমায় চ্যাপলিনের ম্যানারিজম, কৌতুকভঙ্গি এবং কিটনের ক্যারিক্যাচার ধীরেন্দ্রনাথ-ই প্রথম আমদানি করেন। তিনিই প্রথম এই দেশের শিক্ষিত মহিলাদের চলচ্চিত্র জগতে নিয়ে আসেন। যা তৎকালীন সময়ে বৈপ্লবিক উদ্যোগ বলা যায়। এভাবে তাঁর হাত ধরেই এদেশীয় সিনেমা একটা সমাজ স্বীকৃত শিল্প মাধ্যম হয়ে ওঠে।
এই যুগে চলচ্চিত্রে স্মরণীয় পদাপর্ণ শিশিরকুমার ভাদুড়ির। তাঁর তত্ত্বাবধানে তাজমহল ফিল্ম কোম্পানি সাহিত্য-কে নিয়ে আসে চলচ্চিত্রের ঘরে। সিনেমায় অভিনব ব্যঞ্জনা সৃষ্টির এক যুগান্তকারী প্রয়াস শুরু হয়। রবীন্দ্রনাথের ‘মানভঞ্জন’ এবং শুরৎচন্দ্রের ‘আঁধারে আলো’ সেই প্রয়াসের গৌরচন্দ্রিকা। শ্রদ্ধেয় চলচ্চিত্র বিশেষজ্ঞ সঞ্জয় মুখোপাধ্যায়ের মতে, রবীন্দ্রনাথের ‘মানভঞ্জন’ গল্পটি চলচ্চিত্র শুরুর আগেই চলচ্চিত্র শিল্পের ভবিষ্যম্ভাবী প্রস্তাবনা ছিল।
নির্বাক পর্বে সিনেমা সংক্রান্ত দুটি আইন জারি হয়—(১) সিনেমাটোগ্রাফি অ্যাক্ট অব ইন্ডিয়া(১৯১৮); (২) বেঙ্গল অ্যামিউজমেন্ট ট্যাক্স অ্যাক্ট। প্রথমটিতে সিনেমার সেন্সরশিপ হয়; দ্বিতীয়টিতে টিকিটের দামে ট্যাক্স বসে। যদিও এই সময়ের সিনেমা যাত্ৰাসুলভ মনোরঞ্জনের মাধ্যম ব্যতীত অন্য বিশেষত্বের চিহ্ন তুলে ধরতে সক্ষম হয়নি। তবে সম্ভাবনার বীজটি কিন্তু রোপিত হয়েছিল।
॥ চার ॥
১৯২৮ সাল। আবার জে.এফ. ম্যাডানের এক যুগান্তকারী উদ্যোগ। এলফিনস্টোন পিকচার প্যালেসে দেখানো হয় হলিউডের ইউনিভার্সাল কোম্পানির ‘মেলোডি অব লাভ’। ভারতের মাটিতে প্রদর্শিত প্রথম সবাক ছবি। শুরু হল টকি–র যুগ।
অতঃপর, ১৯৩১ সালে বাংলা ভাষায় প্রথম সবাক চলচ্চিত্র ‘জামাইষষ্ঠী’ মুক্তি পায়। পরিচালক অমর চৌধুরী, প্রযোজনায় ম্যাডান কোম্পানি। বলা যায়, এখান থেকেই শুরু হল বাংলা তথা ভারতীয় সিনেমার ঐহিত্য নির্মানের ধারাবাহিক প্রবাহ । টকি সিনেমাকে আরও জীবন্ত করার কাজটি শুরু করেছিলেন বীরেন্দ্রনাথ সরকার। তাঁর ‘নিউ থিয়েটার্স কোম্পানি’ প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে। বাংলা সিনেমায় তিরিশ এবং চল্লিশের দশকে এই কোম্পনির প্রভাব ছিল সবচেয়ে বেশি।
এই যুগে চলচ্চিত্র পরিচালনায় এলেন দিকপাল ব্যক্তিবর্গ- দেবকীকুমার বসু, প্রমথেশ বড়ুয়া, প্ৰেমাঙ্কুর আতর্থী, নরেশচন্দ্র মিত্র, চারু রায়, নীতিন বসু প্রমুখ। কিছুদিন পর এলেন বিমল রায়, নিমাই ঘোষ, মধু বসু, উদয়শঙ্কর, অজয় করের মতো যুগ-নিয়ন্ত্রনকারী পরিচালকবর্গ। এখানে একটি কথা বলতেই হয়, ১৯৩২ সালে স্বয়ং রবীন্দ্রনাথও তাঁর নাটক ‘নটীর পূজা’কে চলচ্চিত্রায়িত করার উদ্যোগে মহড়া শুরু করেছিলেন। কিন্তু বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে তাঁর ডাক আসায় তিনি ব্যস্ত হয়ে পড়েন; এবং কাজটি পরিনতি লাভ করে না। এ আমাদের বড়ো পরিতাপের বিষয়।
যুগটি শুধুমাত্র পরিচালনায় নক্ষত্র-প্রতিম ব্যক্তিদের জন্যই চিহ্নিত হয়ে থাকে না; এ যুগ মহান অভিনেতাদেরও মহৎ শিল্প অধ্যায় হিসেবে মর্যাদার দাবিদার। এ সময়েই এসেছিলেন পাহাড়ী সান্যাল, কে এল সায়গল, দুর্গাদাস বন্দ্যোপাধ্যায়, কানু বন্দ্যোপাধ্যায়, অহীন্দ্র চৌধুরী, নরেশ মিত্র, ছবি বিশ্বাস, অমৃতলাল বসু, কাননবালা দেবী, নিভাননী, ছায়াদেবীর মতো তাবড় অভিনেতা-অভিনেত্রীগণ।
এঁদের দ্বারা নির্মিত এবং অভিনীত চলমান চিত্র-শিল্পের সঙ্গে রাইচাঁদ বড়াল, কৃষ্ণচন্দ্র দে, পঙ্কজ মল্লিক, শচীন দেব বর্মন, কমল দাশগুপ্ত, দিলীপ রায়, অজয় ভট্টাচার্যের মতো বিখ্যাত সঙ্গীত স্রষ্টাগণ।
তৈরি হল একের পর এক জনপ্রিয় সিনেমা। চন্ডীদাস, বিদ্যাপতি, দেনা-পাওনা, কপালকুন্ডলা, নৌকাডুবি, দেবদাস, মুক্তি, বিদ্যা, সাথি, শেষ উত্তর, পরিচয়, আলিবাবা, উদয়ের পথে, ছিন্নমূল, কল্পনা, ভুলি নাই, নতুন ইহুদি, শহর থেকে দূরে, মানে না মানা, পরিনীতা, কুমকুম, তটিনীর বিচার, ডাক্তার, শাপমুক্তি, নর্তকী, উত্তরায়ন, যোগাযোগ, প্রিয় বান্ধবী, দুই পুরুষ, সাত নম্বর বাড়ি, বিরাজ বৌ, পথের দাবী, চন্দ্রশেখর, অরক্ষণীয়া, অঞ্জনগড়, সন্দীপন, পাঠশালা, দেবী চৌধুরানী, পুতুল নাচের ইতিকথা, চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠন, মেজ দিদি, বিদ্যাসাগর, দত্তা, বাবলা, পণ্ডিতমশাই, বসু পরিবার, ৪২(বিয়াল্লিশ), নীলদর্পন, হানাবাড়ি, পল্লীসমাজ, মহাপ্রস্থানের পথে প্রভৃতি। যতগুলো এই মুহূর্তে মাথায় এল বললাম।
বোঝা যাচ্ছে, নিশ্চই, ১৯১৭-২০ সাল, ৩/৪ বছরের চলচ্চিত্রে যে প্রচলিত পৌরাণিকতা ও ধর্মমূলকতার আবরণ ছিল, তিরিশ এবং চল্লিশের দশকে তা কাটিয়ে ফেলল। তার জায়গায় নিয়ে এল সাহিত্যের জোয়ার। যে পথের পথিকৃৎ অবশ্যই ছিলেন নির্বাকযুগের জ্যোতিষ বন্দ্যোপাধ্যায়। ১৯২০ থেকে ১৯৫০ সাল পর্যন্ত এই প্রবণতা ধারাবাহিকভাবে অক্ষুন্ন থাকে। আর যোগ্য পরিচালক এবং অভিনেতার শিল্পিত অংশ গ্রহণে বাংলা চলচ্চিত্র শৈশবদশা কাটিয়ে ফেলল। পরিপুষ্ট হল।
তবু, বেশ বড়ো-সড়ো একটা ‘কিন্তু’ থেকেই গেল। কেননা, মূলত শহুরে মধ্যবিত্তের জন্য, মধ্যবিত্তের দ্বারা নির্মিত এই ছবিগুলি হল মধ্যমানের। সাহিত্যের জোয়ারে সরাসরি ভাসল তা। এগুলি হয়ে উঠল আদি-মধ্য-অন্ত যুক্ত সাহিত্য ন্যারেটিভের ফটোগ্রাফড্ ভার্সান মাত্র। সঙ্গে সেন্টিমেন্ট সম্বলিত সঙ্গীত বহুলতায় বাংলা সিনেমা হয়ে উঠল মধ্য-মন ও মধ্য-মেধা তুষ্টির-ই উতরোল অবলম্বন। তখনও বাংলা সিনেমা বিনোদনের বাইরে কিছু ভাবার বাতিক তৈরি করতে সক্ষম হয়নি।
যদিও যুগের অভ্যন্তরেই যুগসন্ধির বেলা নেমে আসে। বাংলা সিনেমায় এই সন্ধি-র প্রস্তাবনা যে সিনেমাগুলির মধ্য দিয়ে ব্যক্ত হয়, সেগুলি— প্রমথেশ বড়ুয়ার ‘মুক্তি’ (১৯৩৭), বিমল রায়ের ‘উদয়ের পথে’ (১৯৪২) ও ‘অঞ্জনগড়’ (১৯৪৮), উদয়শঙ্করের ‘কল্পনা’ (১৯৪৮), নিমাই ঘোষের ‘ছিন্নমূল’ (১৯৫০)। এগুলি সম্পর্কে দু-একটি বাক্য না বললে অপরাধ হবে।
সবদেশে সবকালে শিল্প, সংস্কৃতি ও সমাজে মহাক্রান্তি আসে কোনো মহান প্রতিভাকে আশ্রয় করে। কিন্তু সেই প্রতিভা আগমনের একটা পূর্ব প্রস্তুতি বা পটভূমি থাকে। এই পটভূমি হিসেবেই উল্লিখিত সিনেমাগুলি নির্দেশ করতে পারি। মানছি যে, এ দেশীয় চলচ্চিত্রে শুদ্ধ চিত্রভাষা, দৃশ্যবস্তু নির্ভরতা, অনন্য শিল্পভাষা প্রতিষ্ঠা বেশ বিলম্বিত। কিন্তু আজকের মন নিয়ে স্মৃতিপথে দূরের অভিজ্ঞতায় গেলে এসবের চকিত দৃষ্টান্তে প্রথম বিস্ময় আদায় করে নেয় প্রমথেশ বড়ুয়ার ‘মুক্তি’(১৯৩৭)। সিনেমাটির সূচনা অংশটুকু স্মরণ করি। নায়ক একজন শিল্পী। জীবনযাপনে স্ত্রী-র সঙ্গে দুস্তর ব্যবধান। একটি ‘সিকোয়েন্সে’ পরিচালক সেই সুদূরতা ব্যক্ত করছেন। একটার পর একটা দরজা খুলে এগোয় নায়ক। বন্ধ-দরজার মুখগুলি কী অসামান্য তাৎপর্যে গল্প-মুখটি প্রসারিত করে দেয় দর্শক চেতনায়। হতে পারে—এ দৃশ্যপুঞ্জ পরিচালকের সচেতন শিল্পসিদ্ধ বোধে উৎসারিত নয়; হতে পারে-হঠাৎ-ই উদ্ভাবন; হতে পারে—কোনো বিদেশি ফিল্মের প্রভাবে নিষ্পন্ন। তবু, চলচ্চিত্রে নিজস্ব ভাষার সন্ধানক্রিয়ায় একে উপেক্ষা করার মতো উন্নাসিকতা দেখাব কীভাবে?
চল্লিশের দশকে রাজনীতি ও সংস্কৃতির ওঠা-নামার বিক্ষুব্ধ বিচলন চলচ্চিত্রকেও বুঝিয়েছিল পুরোনো সঞ্চয় নিয়ে কেনা বেচা আর চলবে না। আর সেই বুঝে ওঠার নান্দীপাঠ প্রথম শোনা গেল বিমল রায়ের ‘উদয়ের পথে’(১৯৪৪) সিনেমায়। ১৯৪৪-এ এদেশীয় চলচ্চিত্র ভাবনায় ডি-সিকা ছিলেন না, ভিসকান্তি ছিলেন না, এমনকি কুরোশোয়া-ও ছিলেন না। এবং ‘উদয়ের পথে’-তে কোথাও এঁদের বাস্তব চেতনার-ও কোনো ছাপ ছিল না। তবু এই সিনেমা ‘রোমান্টিক রিয়ালিস্ট মেলোড্রামা’। যদিও এই ‘রিয়ালিজম্’-কে বলা যায়, মধ্যবিত্তের দৃষ্টিতে দেখা মজুর-জীবন-বিলাস। ‘উদয়ের পথে’ আসলে শিল্পপতির শোষণের বিরুদ্ধে শ্রমিকের প্রতিবাদ এবং ধনী কন্যা ও গরিব ছেলের প্রণয় আখ্যান। এই সিনেমা আজকের উন্নত দৃষ্টি নিয়ে দেখলে অল্প আয়াসেই এর বহু শৈথিল্য চোখে পড়বে; ফিল্মিক যুক্তিক্রমেও মন সায় দেবে না। তবু ‘উদয়ের পথে’ বাংলা সিনেমার ইতিহাসে একটা মাইলস্টোন। তৎকালে অসম্ভব জনপ্রিয়-ও হয়েছিল এই সিনেমা। কেন? কারণ : (১) এই সিনেমা প্রথম বা ছায়াছবিতে সমকালীন বাস্তবতার ছাপ জুড়ে দেয়, (২) বিষয়বস্তুর নতুনত্ব এবং উপস্থাপনায় সাহসিকতার পরিচয় রাখে, (৩) আনকোরা অভিনেতা-অভিনেত্রীদের দিয়ে প্রধান চরিত্রে অভিনয় করানো হয়, (৪) নায়ক কল্পনায় নতুন মাত্রা সংযোজন করে; কেননা, প্রচলিত ব্যর্থ প্রণয়ীর সকরুণ স্রোতে ভাসা প্রতিরোধহীন নায়ক ভাবনার বিপরীতে সেই প্রথম সিনেমার নায়ক এক প্রবল সতেজ আপসহীন ব্যক্তিত্ব নিয়ে দাঁড়ায়, (৫) এই প্রথম চলচ্চিত্রের মাধ্যমে এদেশীয় সংস্কৃতিতে রবীন্দ্রনাথের ছবির সঙ্গে কার্ল মার্কসের ছবি দেখা যায় (নায়ক অনুপের ঘরের দেওয়ালে), (৬) এই ছবির গুরুত্বপূর্ণ দিক হল জ্যোতির্ময় রায়ের চিত্রনাট্য এবং সংলাপ। এই ছবির সংলাপ সিনেমা নিরপেক্ষ থেকেও বছরের পর বছর মানুষের মুখে মুখে ফিরেছে।
সত্যিই, বাংলা তথা ভারতীয় ফিল্মে ‘উদয়ের পথে’ একটা নতুন পথের দিশা দেখিয়েছে। উল্লেখ্য, ‘উদয়ের পথে’ সিনেমায় পরিচালক বিমল রায় বাস্তবতার যে উজ্জ্বল উদ্ধার চেয়েছিলেন, তা আরো খানিকটা পরিশীলিত রূপ পায় সুবোধ ঘোষের ‘ফসিল’ গল্প অবলম্বনে নির্মিত ‘অঞ্জনগড়’ (১৯৪৮) সিনেমায়। এখানে মজুর জীবনের বাস্তবতা অনেক বেশি বিশ্বাসযোগ্যভাবে প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছিলেন পরিচালক বিমল রায়।
ফিল্মে স্বাবলম্বন অর্জনের এই উদ্যোগ পর্বে এক উজ্জ্বলতম কাজ, অসামান্য একটি শিল্পকীর্তি উদয়শঙ্করের ‘কল্পনা’ (১৯৪৮)। কারণ, এই প্রথম আমরা সিনেমা মাধ্যমের সচেতন পরীক্ষায় এক এমন সৃজনের পরিচয় পাই যার প্রতিটি ফ্রেমে, প্রতিটি শটে আধুনিক শিল্পী মনের অভিজ্ঞান রয়েছে। এই মন আপন দেশ-কালের তীক্ষ্ণ, ধারালো বাস্তবতা সম্পর্কে সচেতন, নিজেদের সাংস্কৃতিক দ্বান্দ্বিকতা সম্পর্কে সচেতন, শিল্পের দায়ে সেই দ্বান্দ্বিক বাস্তবকেই আধেয় বস্তুতে রূপান্তরিত করার সংকল্পে অবিচল। এই মন দেশের প্রতি দায় মানে, শিল্পের স্বদেশকে সন্ধান করে চিরায়তে ও লোকায়তে। ‘কল্পনা’ একটি সুঠাম ফিল্ম, যা একজন শিল্পীর জীবন ও কল্পনা ও স্বপ্ন, তার সাধনা ও সিদ্ধির উপাখ্যান। যার সঙ্গে নানা মাত্রায় জড়িয়ে আছে সমাজ ও সংস্কৃতির বাস্তব মর্মবস্তু। আরো একটি কথা, এই ফিল্মে পরিচালক বাণ্যিজিক ফিল্মের পরিচালকদের তীক্ষ্ণ ব্যঙ্গে বিদ্ধ করেন। শিল্পিত চলচ্চিত্রের পক্ষ নিয়ে এই অবলোকনে তিনি ধরিয়ে দেন ‘চলচ্চিত্র প্রমোদপণ্য নয়’; ষাটের দশকের আগে এই কথাটা এদেশে কোনোভাবেই প্রতিষ্ঠা পায়নি। সুতরাং, বলা যায়, ‘কল্পনা’ সামগ্রিকভাবেই ভারতীয় চলচ্চিত্রের একটি বড়ো ধাপ। শিল্পী মকবুল ফিদা হোসেনের কথায়—“অতীতে তৈরি আগামী প্রজন্মের রচনা।”
আমাদের চলচ্চিত্রে আধুনিকতা বিকাশের ক্ষীণ ধারায় আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ নিমাই ঘোষের ‘ছিন্নমূল’ (১৯৫০)। দেশভাগের বিপর্যয়ে মানুষের শিকড় ছেঁড়া অস্তিত্বের সংকট নিয়ে নির্মিত এই ছবি। জনপ্রিয় সিনেমার খতিয়ানে এই সিনেমার নাম উচ্চারিত হওয়ার কথা নয়; কিন্তু জনপ্রিয়তার বাইরে এসে ভারতবর্ষের সিনেমার ইতিহাসে এই ‘ছিন্নমূল’-ই এদেশের প্রথম নিও-রিয়েলিষ্টিক ফিল্ম। হ্যাঁ, ইতালীয় কীর্তির সঙ্গে পরিচিত হবার আগেই এই আঙ্গিক এখানে আশ্রিত। এই সিনেমায় নিমাই ঘোষ কোনোরকম পেশাদার কুশীলব ছাড়া, গানের প্রয়োগ ছাড়াই, মানুষের দীর্ঘশ্বাস ও অশ্রুর দলিলচিত্র পেশ করেন। আঁকাড়া বাস্তবকে পর্দায় তুলে আনেন শিয়ালদা স্টেশন ও মিলিটারি ব্যারাকের প্রান্ত প্রান্ত থেকে। অভিনেতাদের সঙ্গে মিশিয়ে দেন সাধারণ মানুষকে। কোনো কৃত্রিম আলো নয়, সম্পূর্ণ স্বাভাবিক আলোর নির্ভরতায় এই ছবি গৃহিত হয়। কোনো নিটোল শিল্পায়ন নয়, বিষয়ের তীব্রতায় গোটা প্রকল্পটি নিয়ন্ত্রিত হয় ভিন্ন মেজাজে। সিনেমার সর্বাঙ্গে সেই দুঃসময়ের চিহ্ন লেগে আছে। প্রতিটি দৃশ্যপুঞ্জ আজও স্নায়ুর সমতা ছিন্নভিন্ন করে। বাস্তব ও বিষয়ের এমন সমানুপাত রক্ষা করার মতো দুঃসাহস হয়তো পৃথিবীতে কোনো কাহিনি চিত্রকার-ই দেখাননি। যাঁরা ছবিটি দেখেছেন, তাঁরা কোনোদিন-ও কি ভুলতে পারবেন সেই বৃদ্ধার আর্ত প্রতিরোধের প্রত্যয়ী স্বর-টি “মোর স্বামী, শ্বশুরের ভিটা ছাইড়্যা মুই যমুনা। যামুনা। যামুনা।” জানেন তো, সেই বৃদ্ধা কোনকালেই অভিনেত্রী ছিলেন না।
‘ছিন্নমূল’ আরেকটি কারণে গুরুত্বের দাবি রাখে। এই সিনেমার সহকারী পরিচালক এবং একটি চরিত্রে অভিনয়ে ছিলেন ভারতীয় সিনেমার প্রবাদপ্রতিম শিল্পী ঋত্বিক ঘটক। এমনকি এই ছবির সঙ্গে পরোক্ষে যুক্ত ছিলেন ভারতীয় সিনেমার শ্রেষ্ঠ শিল্পী সত্যজিৎ রায়; চিত্রনাট্য রচনায় সহায়কের ভূমিকা নিয়ে।
কিন্তু, সেন্সরের অনেক বাধা পেরিয়ে ছবিটি মুক্তি পাওয়ার পরে বাঙালি দর্শক ছবিটিকে গ্রহণ করেনি। যাদের নিয়ে এই ছবি, সেই উদ্বাস্তুরাও ছবিটি থেকে বিমুখ থাকে। আর্থিক দিক থেকে বিপর্যস্ত হয়ে নিমাই ঘোষ এক বুক ক্ষুদ্ধ অভিমান নিয়ে চলেন গেলেন সুদূর মাদ্রাজে। আর কোনোদিন বাংলায় ছবি করেন নি। একবার অনেক দুঃখে বলেছিলেন—“ছিন্নমূল আমায় ছিন্নমূল করেছে”। বাঙালি দর্শক সমাজে এ এক লজ্জা ও কলঙ্কের চিহ্ন হয়ে আছে। অবশ্য এরও পরে আরো কলঙ্ক রচিত হবে ঋত্বিক ঘটকের প্রতি বাঙালির নির্মম উদাসীনতায়।
যাই হোক, নিমাই ঘোষ এ বঙ্গে দর্শক পাননি, এদেশে পুরস্কার পাননি, কিন্তু যা পেয়েছিলেন তা পুরস্কারের অধিক। রাশিয়ার অন্যতম শ্রেষ্ঠ পরিচালক পুদভ্কিন এই ছবির উচ্চ প্রশংসা করেন। ছবির স্বত্ব কিনে নিয়ে রাশিয়ায় গিয়ে রুশভাষায় ডাব করে একশোটি প্রিন্ট দিয়ে সিনেমা হলে প্রদর্শন করেন। এবং স্তালিনের জীবদ্দশায়, রুশ সংবাদপত্র ‘প্রাভদা’-য় ‘ছিন্নমূলের’ উচ্চসিত প্রশংসা করে ‘রিভিউ’ লেখেন। ‘ছিন্নমূল’ সম্পর্কে বিদগ্ধ সমালোচক সঞ্জয় মুখোপাধ্যায় বলেছেন –“তরুণ নিমাই ঘোষ প্রায় ভগীরথের মতো উদ্ভাবনী প্রতিভায় জল এনে দিলেন সিনেমার খরাতপ্ত বঙ্গ ভূমিতে। আমরা বুঝলাম আমাদের ছায়াছবি যৌবনের দ্বারপ্রান্তে।”
॥ পাঁচ ॥
এই পর্বে এমন কয়েকটি ঘটনা ঘটে যায় যে, ইতিহাস তা নথিভুক্ত করতে বাধ্য হয়। প্রথমত, ১৯৪৭ সালে সত্যজিৎ রায় সবান্ধব প্রতিষ্ঠা করলেন কলকাতার প্রথম ফিল্ম সোসাইটি। উদ্দেশ্য ছিল প্রকৃত চলচ্চিত্র রুচির উদ্বোধন।
দ্বিতীয়টি, জাঁ রেনোয়ার এবং পুদভ্কিনের মতো দুজন মহান চলচ্চিত্র স্রষ্টার কলকাতা সফর এই রুচি তৃষ্ণার সূচিমুখ উন্মুক্ত করে তুলল। এ প্রসঙ্গে বিশেষভাবেই জাঁ রেনোয়ারের কথা বলতে হয়। ‘দ্য রিভার’ ছবির শুটিংয়ে এসে বাংলার অপরূপ রূপে তিনি মুগ্ধ হন; এবং এখানকার জিজ্ঞাসু তরুণদের ঘনিষ্ট সঙ্গ দেন। যে তরুণরা চলচ্চিত্রে আধুনিক মনের আলো বিকিরণ করতে উৎসুক ছিলেন। এই মহৎ পরিচালকের ব্যক্তিত্বের প্রভাব সত্যজিৎ রায়, সুব্রত মিত্র, বংশীচন্দ্র গুপ্ত, তপন সিংহদের মতো প্রতিভার সংকল্পকে দিশা দিল। এবং সত্যিই ভারতীয় সিনেমায় এক ক্রান্তিকালের উদ্যোগ শুরু হল। রেনোয়ার-ই এই সকল তরুণকে বোঝালেন—“হলিউডের প্রভাব ঝেড়ে ফেলে দিয়ে নিজেদের দেশি রুচি কখনো যদি গড়ে তুলতে পারেন, আপনারা তাহলে একদিন মহৎ ফিল্মের জন্ম দিতে পারবেন।” তিনি মনে করিয়ে দেন যে, শ্রেষ্ঠ মার্কিন ছবি বলতে গ্রিফিথ, চ্যাপলিন এবং মুষ্টিমেয় কয়েকজন পরিচালকের সমৃদ্ধ ঐতিহ্যকে বুঝতে হয়। কিন্তু তার বাইরে হলিউডে বাজার চলতি ও গতে বাঁধা চিন্তারই পুনরাবৃত্তি। কলকারখানার উৎপাদনের মতোই ফিল্ম-উৎপাদনও সেখানে হয়ে উঠছে যান্ত্রিক। সৃজন-কল্পনা খেলাবার জায়গা সেখানে কম। রেনোয়ার বুঝিয়েছিলেন, ভালো ফিল্ম করার জন্য, বাস্তবের মর্ম শিল্পিত করার পক্ষে দৈন্য ভালো। তাঁর এই উপদেশ এদেশীয় তরুণ চলচ্চিত্রকারদের মনের জমি তৈরি করে দিয়েছিল। রেনোয়ার ও পুদভ্কিনের আগমন ঋত্বিক ঘটককেও চলচ্চিত্র শিল্পের প্রতি অস্বাভাবিক উদ্দীপনা দান করেছিল।
তৃতীয়ত, ১৯৫২ সালে বোম্বাই, দিল্লি, কলকাতায় অনুষ্ঠিত হল ভারতের প্রথম আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব। এই অভিজ্ঞতা কলকাতার শিক্ষিত দর্শক সম্প্রদায়ের মধ্যে একটা সম্পূর্ণ নতুন চেতনার আলোড়ন নিয়ে এল। বিস্মিত বাঙালি দর্শক দেখল নিও-রিয়ালিস্ট রীতিতে তোলা ডি-সিকার ‘বাই-সাইকেল থিভস্’, রসেলিনির ‘ওপেন সিটি রোম’ এবং ভিসকান্তির ছবি; আরো কিছুদিন পর কুরোশাওয়ার ‘রশোমন’। একটা স্থির বোধ কাজ করলো এই পরিবেশে যে, ফিল্মের নিজস্ব ভাষা বাস্তবের উপলব্ধিকে অমোঘ শিল্পরূপ দিতে পারে; যা দাবি করে দর্শকের নান্দনিক সংবেদন। সুতরাং চলচ্চিত্রের জন্য জীবন অন্যরকম আঙ্গিক চাইলো। বিদগ্ধ সমালোচকের কথায়—“এই পরিস্থিতিতেই সম্ভব হয়েছিল একদিকে সত্যজিৎ-ঋত্বিকের মতো অসামান্য ও বিপরীতমুখী প্রতিভার উত্থান ও অন্যদিকে উত্তম-সুচিত্রা রোমান্টিক মেলোড্রামার অবিশ্বাস্য জনপ্রিয়তা। ‘পথের পাঁচালী’ দিয়ে আমাদের ভোর হল”। (সঞ্জয় মুখোপাধ্যায়)
॥ ছয় ৷৷
দু-একটি ব্যতিক্রমী দৃষ্টান্ত ব্যতীত বাংলা চলচ্চিত্র যখন গতানুগতিকতার বদ্ধ ঘেরাটোপে আত্ম-অনুকরণের পুনরাবৃত্তিতে আত্মসত্তাই ধূসর করে তুলেছে—তখনই এক বিস্ফোরক ঘটনা ঘটে গেল বিস্ফোরক প্রতিভার হাত ধরে। সেই প্রতিভার নাম সত্যজিৎ রায়। চলচ্চিত্রে শিল্পসত্য জয়ের অঙ্গীকার নিয়েই তিনি আবির্ভূত হলেন। বাংলা তথা ভারতীয় চলচ্চিত্রকে তিনি একাই বিশ্বের দরবারে অবিস্মরণীয়তায় প্রতিষ্ঠা করে দিলেন। সত্যজিৎ রায়ের সিনেমা প্রতিভা উন্মোচিত হয়েছিল, বলা যায়, জাঁ রেনোয়ার ঘনিষ্ঠ সান্নিধ্য এবং ডি-সিকার ‘বাই-সাইকেল থিভ্স’ সিনেমার প্রভাবে। এই দুটি সংঘটন-ই তাঁকে প্রত্যক্ষভাবে চলচ্চিত্র পরিচালনার কাজে উৎসাহী করে তোলে। এরপরই তাঁর অভাবনীয় ঐতিহাসিক সিদ্ধান্তে বিভূতিভূষণের কালজয়ী উপন্যাস ‘পথের পাঁচালি’-র চলচ্চিত্রায়ন হয়। অভাবনীয়; কেননা, তিনি এ-সময়ে একেবারেই পূর্ব অভিজ্ঞতাবিহীন কিছু যুবককে একত্রিত করে এই দুরূহ কাজে হাত দেন। এঁদের মধ্যে ক্যামেরাম্যান সুব্রত মিত্র এবং শিল্প নির্দেশক বংশীচন্দ্রগুপ্ত সারা বিশ্বেই স্বনামে স্বীকৃতি।
১৯৫৫ সালে সত্যজিতের ‘পথের পাঁচালি’ মুক্তি পাওয়ার পর এর প্রতিক্রিয়া ছিল উৎসাহব্যাঞ্জক। ‘The Times of India’—য় বলা হয়— “It is absurd to compare it with anyother Indian Cinema… ‘Pather Panchali is pure cinema”। এই সিনেমা এবং সত্যজিৎ রায়ের একক প্রতিভাতেই এদেশের চলচ্চিত্র প্রকৃত শিল্প-প্রাণের স্পর্শ পেল। বুঝতে শিখলো তার উদ্দেশ্য ও দায়িত্ব। সত্যজিৎ রায়-ই এদেশীয় চলচ্চিত্রে পূর্ব–লালিত ধারণাকে বদলে দিলেন। এদেশের দর্শক প্রথম অনুভব করলো যে, সিনেমার একটা নিজস্ব ভাষা আছে; তা সাহিত্যের ফোটোগ্রাফ্ড ভার্সান নয়। তারা এ-ও বুঝলো, সিনেমা শুধু বিনোদন নয়, তা দিয়ে বৃহত্তম শিল্পসৃষ্টিও সম্ভব। ‘পথের পাঁচালি’ শিক্ষিত ভারতীয় সমাজে একটা আলোড়ন নিয়ে এল। সমালোচকের ভাবনায় ‘পথের পাঁচালি’তে যখন অপু পাঠশালায় যাওয়ার জন্য চোখ মেলল, আমাদের সিনেমা দেখারও চোখ ফুটল। যেন দৈবানুগ্রহ। সত্যজিৎ রায়ই পথপ্রদর্শক, তিনিই প্রথম পথিক, রৌদ্রে, সিন্ধুর উৎসবে চলচ্চিত্রের অধিকার বর্ণনা করে গেলেন। আসলে এই সিনেমায় সত্যজিৎ রায় বাস্তবতার যে মর্মার্থ ব্যাখ্যা করেন, তা দিয়েই আমরা সিনেমার বর্ণপরিচয়ে অভ্যস্ত হয়ে উঠি। ছবি যে সংলাপের নয়, শব্দের নয়, এমনকি অক্ষরাশ্রয়ী সাহিত্যের শিল্পভূমি পেরিয়ে দৃশ্যাশ্রয়ী শিল্পবিগ্রহের পদপ্রার্থী—সত্যজিৎ রায় ছাড়া আমরা কোনওদিন কি বুঝতাম? এই যে কাহিনি নিরপেক্ষভাবে দৃশ্য স্বয়ম্ভর হয়ে উঠতে পারে—এই ঐতিহাসিক উপলব্ধির জন্যই ‘পথের পাঁচালি’ চিরস্মরণীয়। এই সিনেমাতেই সত্যজিৎ রায় অপরিসীম ঔদ্ধত্যে নিজের সবর্ণ, সগন্ধ ফুল ফোটাতে পেরেছিলেন। শুধু দৃশ্যপ্রেক্ষিত দান করে তাকে সম্মুখবর্তী করেছিলেন বলেই নয়; ভাবনার কুম্ভকে ছারখার করে কথকতার ইমেজকে তুলনারহিত ভাবে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন বলেও নয়; বিশ শতকীয় আধুনিক চেতনায় শিল্পকে বিষয়ের ভারমুক্ত করেছিলেন বলেই। সিনেমায় বিষয়ের গুরুত্ব নগন্য— এমন ভেবেছিলেন আপলিনেয়ার। তাতে আখ্যানের ক্ষতি অস্বীকার করার উপায় নেই। কিন্তু যা পেলাম, তা হল— দেখা এবং অকিঞ্চিৎকরভাবে দেখা। এই দেখার কাজে দৃশ্য হয়ে ওঠে মূক প্রকৃতি ও আলোর খেলা। ‘পথের পাঁচালি’ সেই আলোকেই আদরনীয় করে তুলেছে। আর এখানেই সত্যজিৎ সমগ্র সত্তায় স্ব-কৃত চেতনার রূপকার হয়ে উঠেছেন। ‘পথের পাঁচালি’ থেকে ‘আগন্তুক’ পর্যন্ত তাঁর প্রতিটি সৃষ্টিতে এই চেতনাই বিচিত্রপথে প্রবাহিত হয়েছে।
সত্যজিৎ রায় নির্মিত চলচ্চিত্রগুলি শিল্পমাত্রার সমস্ত উচ্চ প্রকোষ্ঠকে ছুঁয়ে গেছে। এগুলির নিবিষ্ট দর্শক হলে উপলব্ধ হয়, সুস্থির ও বিকাশশীল মণীষার আলোয় সত্যজিৎ আপন দেশ-কালের, স্বদেশের ইতিহাসের ‘অন্তর্গত সত্য’ নিজের সৃষ্টির ভুবনে শিল্পিত করে তুলেছিলেন। তিনি চলচ্চিত্রকে শুধু শিল্পশ্রী-ই দান করেননি, তাকে করে তুলেছেন সমাজ-মনেরই চলমান ভাষ্য। আর এই শিল্পভাষ্যকে স্থিতধী ধ্যানমগ্নতায়, কঠোর শৃঙ্খলাপরায়ণতায়, বিষয় ও আঙ্গিকের নব উদ্ভাবনী কল্পনায় সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্যে চালিত করে গেছেন। আর এই শিল্পভাষ্যের বৈচিত্র্যময় প্রয়োগের দুর্বার প্রতিভায় তিনি আজও আমাদের কাছে উজ্জ্বল আলোক-সূর্য হয়ে আছেন।
সত্যজিৎ রায়ের পরেই জীবনের মর্মসন্ধানী শিল্পদৃষ্টির বিচারে বংলা চলচ্চিত্রে এলেন বিস্ফোরক প্রতিভা ঋত্বিক ঘটক। ঋত্বিকের পরিবারে ছিল উন্মুক্ত শিল্পচর্চার আবহ। ৪৩-এর মন্বন্তর, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, ৪৬-এর দাঙ্গা, সর্বোপরি ৪৭-এর খণ্ডিত স্বাধীনতায় প্রাপ্ত ‘উদ্বাস্তু’ উপাধি—এই নিয়ে ঋত্বিককে বাধ্য হয়ে সপরিবারে ঢাকা ছেড়ে চলে আসতে হয় কলকাতায়। দেশভাগ তথা বঙ্গভাগকে ঋত্বিক মনে করতেন বাঙালির ‘স্থায়ী ট্রাজেডি’। আর এই স্থায়ী যন্ত্রনার অনুভূতি থেকে তিনি কখনো সরে আসতে পারেননি। তাঁর শিল্পও পারেনি; এমনকি তিনি দর্শককেও মুক্ত থাকতে দেননি। এই আবেগদীপ্ত ভাবালুতার জন্য তাঁর চলচ্চিত্রের কাহিনি ও উপস্থাপনা কখনো কখনো বাস্তবতার সীমা ছাড়িয়ে মেলোড্রামার স্তরে পৌঁছে গেছে। অবশ্য তা নিয়ে তাঁর ভ্রূক্ষেপও ছিল না; তিনি বলতেন—“আমি চলচ্চিত্রের প্রেমে পড়িনি। চলচ্চিত্রকে জীবন সংগ্রামের একটা হাতিয়ার বলেই মনে করি।”
ঋত্বিকের পূর্ণাঙ্গ চলচ্চিত্রের সংখ্যা মাত্র ৮টি। এক্ষেত্রে রাশিয়ান পরিচালক তারকোভস্কির মতো তিনিও প্রাচ্যদেশে হাতে গোনা মাত্র কয়েকটি ছবির সূবাদেই হয়ে উঠেছেন আধুনিক চৈতন্যের নির্বিকল্প অংশ।
ঋত্বিকের সিনেমা সম্পর্কে বলতে গেলে একটা সাধারণ ঘটনা সবার আগে চোখে পড়ে, তা হল রবীন্দ্রনাথের উপস্থিতি। রবীন্দ্রনাথের কোনো কাহিনি নিয়ে কাজ না করলেও তাঁর সিনেমার পরতে পরতে জড়িয়ে আছেন রবীন্দ্রনাথ। বিশেষ করে তাঁর সিনেমায় রবীন্দ্রসঙ্গীতের ব্যবহার বিধ্বংসীপ্রায়। বলা যায়, মিথিক্যাল পুননির্মাণের মতো।এমনভাবে রবীন্দ্রসঙ্গীতের ব্যবহার ভারতীয় সিনেমায় আগে এবং পরে, কখনোই দেখা যায়নি। রবীন্দ্রনাথকে ঋত্বিক তাঁর সমস্ত ভাবনার উৎস বা প্রতিমেরু বলে মনে করতেন। একদা বলেছিলেন—“রবীন্দ্রনাথকে ছাড়া আমি কিছুই প্রকাশ করতে পারি না।”
ঋত্বিক এবং তাঁর শিল্প মূলত আবেগতাড়িত। জীবন ও শিল্পে শৃঙ্খলাময় বিন্যাস দীর্ণ করে তিনি শিল্পীর সৃজন উল্লাস অনুভব করেন। তাঁর প্রতিভার ‘স্ব-ধর্ম’ হলো বিস্ফোরণ। শিল্প ভাবনায় সত্যজিতের সম্পূর্ণ বিপরীত ছিলেন তিনি। প্রতিভার মারাত্মক বিস্ফোরণে তিনি সিনেমার সাজানো প্রচ্ছদ, তার ব্যাকরণকে ছিন্নভিন্ন করে দেন। অথচ অব্যর্থ অভিঘাতে তাঁর প্রতিটি সৃষ্টি আমাদের সংবেদন বিদ্ধ করে। আমরা পারিনা উদাসীন থাকতে। তা সত্তার মূল ধরে টান দেয়। রক্তের ভিতর জাগায় তুমুল প্রতিক্রিয়া।
ঋত্বিকের রচনাকর্ম যে-সব ত্রুটির জন্য অতিখ্যাত (অসংযম, এলোপাথারি ফ্রেম, অমসৃণ ন্যারেটিভ, এডিট জার্কস, পদে পদে কো-ইন্সিডেন্স, গল্পাংশ আরোপিত, ক্ষণভঙ্গুর, নড়বড়ে ইত্যাদি ইত্যাদি)— ছিন্নরেখ সেইসব পর্যায়ে আসলে একজন শিল্পীর আত্মার দার্শনিক অবস্থানকেই মূর্ত করে। ঋত্বিক মূলত দার্শনিক ও ইতিহাসকার। মেধার সর্বতোমুখী প্রকাশে তাঁর সিনেমাই প্রথম ‘সেরিব্রাল প্রতিমা’ হয়ে ওঠে। অত্যন্ত সচেতনভাবেই সাহিত্যাশ্রয়ী চলচ্চিত্ৰবোধকে বিসর্জন দিয়ে তিনি ঐতিহ্যাশ্রয়ী সন্দর্ভধর্মিতা আরোপ করেন। হলিউড শাসিত রৈখিক কাহিনি-বিন্যাস, ঘটনার ঘনঘটা, দৃশ্যাড়ম্বর তাই স্বাভাবিকভাবেই অস্বীকৃত হয়ে যায় তাঁর সৃষ্টিকর্মে। ফরাসি ‘ন্যুভেল ভাগ’-র প্রধান সারথি জাঁ লুক গোদার যখন সিনেমার পর্দায় পরিসংখ্যান, রাজনীতি, দর্শন, কাব্য ও ব্যক্তিগত সংস্কার অন্তর্ভুক্ত করে সিনেমাশিল্পকে বর্ণনাধর্মের অভিশাপমুক্ত করেন— প্রায় তার সামান্য আগে-পরে প্রাচ্যদেশে এই কাজটি সুচারুভাবে করেন ঋত্বিক। যা প্রচলিত সিনেমা-প্লটের মায়াজাল ছিন্ন করে অনভ্যস্ত অভিনবত্বে বক্তব্যধর্মী হয়ে ওঠে। আর এই কারণেই তাঁর বৃহত্তর জীবননিষ্ঠ নন্দনভাবনা সার্বিক মেধায় ধারণ করতে আমরা অক্ষম থেকেছি।
একুশ শতকের শিল্পচেতনা যখন আমাদের বলে দিচ্ছে, ন্যাচারলিস্টিক অবরোহন নয়, বরং বাস্তবতার উচ্চতর ও কৃত্রিম আরোহণ আধুনিক স্রষ্টার অন্বিষ্ট—তখন দেখি, ঋত্বিক অনেক আগেই আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতার দ্বারা জারিত হয়ে দেখিয়েছিলেন শিল্প আপাত সত্যের প্রতিরূপ নয়, বরং অধিকতর এক প্রতিমেরু ; যা আমাদের কাছে পৌঁছে দিতে পারে প্রকৃত সত্যের কাছাকাছি। অর্থাৎ, আজ অন্তত তিনি প্রমাণ করতে পেরেছেন মেলোড্রামাও একটা ফর্ম। দেশভাগের অতি প্রত্যক্ষ বাস্তবতাকে তাই তিনি বাস্তববাদের সমাধিমৃত্তিকা হিসেবেই মেলোড্রামাটিক আঙ্গিকে তুলে ধরেন। তাঁর সিনেমার বহু আলোচিত ‘মাদার আর্কিটাইপ্যাল’-র ভাববীজও এই বাস্তব-ভাঙা বাস্তব-চেতনার উর্ধসীমায় অবধারিত হয়ে পড়ে। জার্মান কবি-নাট্যকার ব্রেখটের চেতনার উত্তরধারক হয়ে তাই তিনি বলেন—“প্রতিমুহূর্তে আপনাকে হ্যামার করে বোঝাব যে যা দেখছেন তা একটা কল্পিত ঘটনা, কিন্তু এর মধ্য দিয়ে যেটা বুঝাতে চাইছি আমার থিসিসটা বুঝুন— সেটা সম্পূর্ণ সত্যি…। যদি ভালো বোধ করেন তবে বাইরে গিয়ে বাস্তবকে বদলাবার কাজে নিযুক্ত হন।” ‘নাগরিক’ থেকে ‘যুক্তি তক্কো আর গপ্পো—প্রতিটি সৃষ্টিতেই ঋত্বিক সমকালীনতার সীমা মুছে, কিংবদন্তী আর ইতিহাসের নিয়ত সংঘর্ষের ভিতর দিয়ে বাস্তববাদের পাহারা অতিক্রম করে গেলেন। আর উত্তর প্রজন্মের জন্য একইসঙ্গে রেখে গেলেন যন্ত্রণা ও জয়মন্ত্র।
মনস্বিতার এই মৌলিক অভিজ্ঞান এবং সর্বার্থ-সার্থক বিকাশেই তাঁর সিনেমা ‘এপিক’ বিস্তার লাভ করে। বিশ্ব-চলচ্চিত্রে এ-ই তাঁর শ্রেষ্ঠ দান। এখানেই ঋত্বিক একক, অনন্য। এখানেই তিনি চলচ্চিত্র-অতিরিক্ত এক পরাক্রান্ত সংস্কৃতির উপস্থাপক।
এই সময়ের খুব গুরুত্বপূর্ণ আরেক নাম মৃণাল সেন। যাঁর শিল্পদৃষ্টি গঠিত হয়েছিল গণনাট্য আন্দোলনের অভিজ্ঞতায়। তাই স্বাভাবিকভাবেই তার ফিল্মে জীবনমুখী রাজনীতি মনস্কতা ও মানবিক অভিব্যক্তিগুলি ‘মাস’কে(mass) অবলম্বন করে প্রসারিত হয়। তিনি সমকালের জটিল বাস্তবকে তুলে ধরেন মানবিক আবেগ-অনুভূতির প্রতিক্রিয়া বৈশিষ্ট্য সুনির্দিষ্ট এবং সুস্থিরভাবে চিহ্নিত করে। তবে মৃণালের শিল্প নির্মাণের ধারা এক-পার্বিক নয়; মোটা দাগে তা ত্রিপার্বিক।
প্রথম পর্ব ‘রাতভোর’ থেকে ‘ইচ্ছাপূরণ’ পর্যন্ত। এ পর্বের শ্রেষ্ঠ নির্মাণগুলি ‘বাইশে শ্রাবণ’, ‘আকাশ কুসুম’, ‘ভুবন সোম’। বোঝা যায়, আত্মবিকাশের এই পর্বে তিনি যে বিষয়গুলি ধরেন, তাকে নিঃসন্দেহে বাংলা তথা ভারতীয় জীবনের যাবতীয় দুর্দৈবের মূল বলা যায়। ‘ভুবন সোম’–এ যেন ফুটে ওঠে ‘অবসিত গরিমা বুর্জোয়াতন্ত্রের প্রতি ঠাট্টা’। অর্থাৎ এই পর্বে মৃণালের ছবি সাংস্কৃতিক হানাদারি তৈরি করে না। দ্বিতীয়পর্বের উল্লেখযোগ্য সিনেমা ‘ইন্টারভিউ’, ‘কলকাতা ৭১’, ‘কোরাস’, ‘পদাতিক’, মৃগয়া’ ইত্যাদি। এ পর্বের সিনেমায় মৃণাল গতানুগতিকতা ভাঙলেন। ফর্ম এবং আঙ্গিক নিয়ে ওলটপালট করলেন। এগুলিতে তৎকালীন রাজনীতি, সময়ের অস্থিরতা ও অবক্ষয়কে তুলে ধরলেন নিপুণ সমাজতাত্বিকের পর্যবেক্ষণে। আর এ পর্বের প্রতিটি ছবিতে আমরা পেয়েছি এক ‘অ্যাংরি ইয়ং ম্যান’–র ইমেজ। এই ছবিগুলিতে কলকাতার পরিসর দক্ষিণপন্থার বাস্তবতা ধারণ করে আছে। তাই ‘কলকাতা ৭১’–র যুবকটি যখন সমুদ্র-অরণ্য-প্রান্তরের মধ্য দিয়ে দৌঁড়ায়, তখন বুঝতে পারি মৃণালের অধৈর্য ক্রঁফো–র ‘ফোর হানড্রেড ব্লোজ’ কে বড়ো ব্যক্তিগত অনুভূতির স্তরে পৌঁছে দিতে চাইছে। তৃতীয় পর্বে ‘একদিন-প্রতিদিন’, ‘খারিজ’, ‘আকালের সন্ধানে’, ‘মহাপৃথিবী’, ‘অন্তরীণ’ ‘খণ্ডহর’ ইত্যাদি ছবিতে মৃণাল ফিরে আসেন গল্পের পথে। অন্তর্মুখী, শান্ত, সমাহিত হয়ে। এগুলিতে তিনি মধ্যবিত্ত সমাজকে, তার নীতিবোধকে, তার ভঙ্গুর আদর্শকে অনুবীক্ষণে ফেলে যেন পর্যবেক্ষণ করেন।
সত্যিই, এত স্ব-বিরোধ, নিজেকে অনিঃশেষ পাল্টে নেওয়ার এত আবেগ আর কার মধ্যে আমরা দেখেছি? মৃণাল সেন সম্পর্কে সঞ্জয় মুখোপাধ্যায় জাঁ পল সার্ত্র প্রসঙ্গ টেনে বলেন, মৃণালও বস্তুত ‘সেলফ কনশাসলি কনটেমপোরারি’। আসলে মৃণাল সময়ের মধ্যে থেকেই সময়কে ছুঁতে চেয়েছেন। তিনি যেভাবে জীবনকে দেখেছেন, সে জীবন চূড়ান্তভাবেই জীবন্ত সময়ের গতিচিত্র। তিনি মূলত সেই জীবন পরিসরে স্ব-শ্রেণির ব্যর্থতা ও বিচ্যুতির-ই সমালোচক। কিন্তু এই সূত্রেই বলতে হয়, যা কিছু সাকার, তা-ই মৃণালের অবলম্বন।
বাংলা তথা ভারতীয় চলচ্চিত্রে সুবর্ণরথের এক বর্ণময় সারথি তপন সিংহ। তিনি বহু আলোচিত কিন্তু অনালোকিত। আসলে তপন সিংহকে দেখার চোখ সেদিনের শিল্পবোদ্ধাদের ছিল না। কারণ, আমাদের শিল্পবোধ যেমন একদেশদর্শী, তেমনি যুক্তি ও শৃঙ্খলার পারম্পর্যহীন। তাই ইউরোপীয় ‘আর্ট’ সিনেমার ভাষা শৈলীকেই চলচ্চিত্র নিমার্ণের শিখরপ্রদেশ ভেবে সত্যজিৎ এবং ঋত্বিককে ‘মানদণ্ড’ হিসেবে বিবেচনা করে বসেছিলাম আমরা। তপন সিংহের মতো শিল্পীও আমাদের বিচারে গৌন, অকিঞ্চিৎকর হয়ে পড়েছিলেন।
সতীর্থ সত্যজিৎ এবং হার্দ্য ঋত্বিকের সঙ্গে তাঁর চলচ্চিত্র ভাবনার প্রধান পার্থক্য এই যে, তিনি নব্যতার ভাষা ও পরিশীলিত শিল্প-টেকনিকের সঙ্গে একপেশে আপস না করে এক অভিনব বিবর্তনরেখা অঙ্কন করতে চান। তিনি আজীবন বিশ্বাস করেছেন যে, সিনেমা যেহেতু একটা বাণিজ্য ব্যবস্থা, তাই তাকে যদি সুন্দরের অভিযানে যেতেও হয় সেই অভিযান বাণিজ্য সমর্থিত হতেই হবে। যদি সিনেমা স্বয়ংশাসিত হয়ও, তবু তাকে গল্পের উপর নির্ভরশীল থেকে যেতে হবে। তবে সেই গল্প বলা হলিউডি মার্কা হবে না, তা হবে আমাদের কথকতার ধরনে। তপন সিংহের ধারণা ছিল ছবির কোনো অধিকার-ই নেই বিমূর্ত হওয়ার; তাকে আলো-শব্দ-চিত্র দিয়ে বিচিত্র স্বাদের গল্প বুনে যেতে হবে। আসলে তপন সিংহের মধ্যে ছিল স্বাদেশিয়ানা বা বাঙালিয়ানার মুদ্রা। বলা ভালো, শিক্ষিত মধ্যবিত্ত বাঙালিয়ানার বিস্তৃত মনোপরিসর। তাই যে মধ্যবিত্ত দারিদ্র-দুঃখ চেনে অথচ দীনতামুক্ত, যে মধ্যবিত্ত শব্দের সৌজন্যে হৃদয়ের উৎসবে যোগ দেওয়ার জন্য আকুল— তপন সিংহ তাদেরই প্রতিনিধিত্ব করেন। তাই তো সৃষ্টি হয় ‘নির্জন সৈকতে’, ‘গল্প হলেও সত্যি’, ‘জতুগৃহ’, ‘ক্ষণিকের অতিথি’, ‘কাবুলিওয়ালা’, ‘ক্ষুধিত পাষাণ ’, ‘হাটে-বাজারে’, ‘ঝিন্দের বন্দি’, ‘বাঞ্ছারামের বাগান’, ‘হুইলচেয়ার’, ‘এক ডক্টর কি মওত’ ইত্যাদি সিনেমা। এই সিনেমাগুলি থেকেই বোঝা যায় তিনি মধ্য-সিনেমার পথিক নন, বরং আমাদের ঐতিহ্য-সম্পৃক্ত মূল কাহিনি পথেরই এক সফল পদাতিক; মধ্যপন্থী নন, বরং একটি সাম্যাবস্থা। তার শিল্পরা কথা বলে, কিন্তু কোলাহল করে না; তার চরিত্ররা সংলাপমুখর, কিন্তু অতিশয়োক্তিপ্রবণ নয়।
এরকম অপ্রত্যাশিত কাহিনি নির্বাচনকে স্বাভাবিক প্রত্যাশার মধ্যে বুনে দেওয়া যে কতবড় কৃতিত্ব তা আজ বাংলা ছবির পতিত, কাণ্ডজ্ঞানবর্জিত আবহাওয়ার মধ্যে বসবাস করে মর্মে মর্মে অনুভব করা যায়। তপন সিংহ-কে গৌন, অকিঞ্চিৎকর ভেবে একদা যে পাপ আমরা করেছি, আজ তার প্রায়শ্চিত্ত করছি হতাশাগ্রস্ত দৈন্যে এবং তৃতীয় প্রজন্মের কাছে উপহাসিত হওয়ার লজ্জিত আশঙ্কায়।
ভেবে দুঃখ পেতে হয়, বারীন সাহার মতো পারঙ্গম পরিচালক মাত্র দুটি ছবি, ‘তেরো নদীর পারে’ এবং ‘শনিবার’ করে ফিল্ম জগৎ ছেড়ে গেলেন!
১৯৫৫-৬৪, পর্বটাকে বাঙালির চলচ্চিত্র চেতনার শ্রেষ্ঠ যুগ বলা যেতে পারে। সত্যজিৎ-ঋত্বিক-মৃণাল-তপনের সাথে সাথে এই সময় চলচ্চিত্রে এসেছিলেন বারীন সাহা, রাজেন তরফদার, অসিত সেন, পার্থপ্রতিম চৌধুরীর মতো বহুমাত্রিক প্রতিভা সম্পন্ন ব্যক্তিত্ববর্গ। যাঁরা একঝাঁক শিল্পসমৃদ্ধ ছায়াছবি নির্মাণ করে বাঙালি তথা ভারতীয় দর্শকের চলচ্চিত্র চেতনাকে বেশ-কিছুটা উন্নত করে তোলেন। ১৯৬৫-৭৪, এমকি ৮০-র গোড়া পর্যন্ত আগের দশকেরই ধারা বজায় থাকল। এই সময় বাংলা চলচ্চিত্রে শিল্প-জনরুচি তৈরিতে সক্রিয় ছিলেন তরুণ মজুমদার, বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত, উৎপলেন্দু চক্রবর্তী, গৌতম ঘোষ, অপর্ণা সেন, নব্যেন্দু সেনের মতো শক্তিমান পরিচালকবৃন্দ। এ পর্বে রাজা মিত্র, অশোক বিশ্বনাথন ও বিপ্লব রায়চৌধুরীর কথা না বললে অপরাধ সীমা ছাড়ায়। এই প্রতিভা-সমূহের বিচিত্র ও বহুকৌণিক রশ্মিচ্ছটায় বাংলা চলচ্চিত্র এমন এক শিল্প পর্যায়ে উন্নীত হয় যে, বিশ্বের মানুষ চিরকালই এদেশের চলচ্চিত্র শিল্পকে সমীহের দৃষ্টিতে দেখবে।
এই শিল্পচেতনাঋদ্ধ ধারার পাশাপাশি বাংলা সিনেমার জনপ্রিয় ধারাটিও রুচিসিদ্ধ ভাবনায় অসাধারণ সাফল্যের সাথে তার গতিপথ নির্দিষ্ট করেছে। ১৯৫৫ সালটি যেমন ‘পথের পাঁচালি’ নামক শিল্প-সন্তানের জনক, তেমনি ‘সাড়ে চুয়াত্তর’-র মতো জনরুচিরঞ্জনেরও ধারক। দুই ধারা যেন জীবন-সমাজের দো-রঙা পাখির মতো এদেশের সাংস্কৃতিক আকাশে ডানা মেলে দিল। এই ধারাকে ঐতিহ্য আর আধুনিকতার মেলবন্ধনে পুষ্ট করে চলেন অজয় কর, অরবিন্দ মুখোপাধ্যায়, অসিত সেন, সলিল সেন, দীনেন গুপ্ত, নির্মল দে, অরুন্ধুতী দেবী প্রমুখ। এবং অগ্রদূত, অগ্রগামী, যাত্রিকের মতো দলগুলি। এঁদের ছবির সুবাদে আমরা এদেশের শ্রেষ্ঠ অভিনেতাদের উত্থান ও প্রতিষ্ঠার সাক্ষ্য থেকেছি; যেমন— তুলসী চক্রবর্তী, রবি ঘোষ, ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়, জহর রায়, অনিল চ্যাটার্জী, জ্ঞানেশ মুখার্জী, সুপ্রিয়া দেবী, মাধবী মুখোপাধ্যায়, সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায় প্রমুখ। আর অবশ্যই উত্তমকুমার ও সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। পেয়েছি ভারতের কিংবদন্তী জুটি উত্তমকুমার ও সুচিত্রা সেনকে। আবার এই সিনেমাগুলির সূত্র ধরে আমরা পেয়েছি সলিল চৌধুরী, নচিকেতা ঘোষ, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, সুধীন দাশগুপ্তের মতো আরো ভারত-বিখ্যাত সুরকারদের।
তৈরি হয়েছে শাপমোচন, সপ্তপদী, পলাতক, সাত পাকে বাঁধা, হারানো সুর, দ্বীপ জ্বেলে যাই, বালিকাবধূ, যদুবংশ, দাদাঠাকুর, অ্যান্টনী ফিরিঙ্গি, উত্তর ফাল্গুনী, দাদার কীর্তি, দখল, দূরত্ব, পরমার মতো অসংখ্য অসংখ্য সিনেমা।
॥ সাত ॥
সমুদ্র মন্থনে অমৃতের সাথে বিষও ওঠে। বাংলা চলচ্চিত্রে ৭০ দশক থেকেই এই বিষের অভ্যুত্থান দেখা যায়, যখন রঙিন অতিনাটকীয় হিন্দি বাণিজ্যিক ছবি বাংলার শহরাঞ্চল ছাড়িয়ে মফঃস্বল ও পাড়াগাঁয়ে অবাধে প্রবেশ করলো। বোধ হয় সেই থেকেই সাধারণ বাঙালি চলচ্চিত্র দর্শকের নিম্নগামিতার সূচনা হল।
১৯৭৭ সাল, রাজনৈতিক ও সামাজিক দিক থেকে পশ্চিমবঙ্গে এক বিরাট পরিবর্তন হল। কিন্তু দুঃখের সঙ্গে লক্ষ্য করা গেল, এই বছরেই বাঙালি দর্শক সবচাইতে বেশি দেখল ‘বাবা তারকনাথ’ সিনেমা। হ্যাঁ; সত্যজিৎ রায়ের ‘অরণ্যের দিনরাত্রি’ কিংবা বিমল ভৌমিকের ‘দিবারাত্রির কাব্য’ সিনেমাকে অবলীলায় ম্লান করে সেইদিন রমরমিয়ে বাজার মাত করলো ‘বাবা তারকনাথ’। সেই থেকেই বোধহয় চলচ্চিত্র রুচির অবক্ষয়ে সিলমোহর পড়ল। সেই থেকেই বাঙালি দর্শকের ভেতরে একটা সুস্পষ্ট বিভাজনরেখা দেখা দিল।
৮০-র দশকের মাঝামাঝি থেকে ৯০-এর শুরু পর্যন্ত বাংলা চলচ্চিত্র একটা প্রতিভাশূন্য এবং দ্বান্দ্বিক জটিলতায় ধোঁয়াশামগ্ন হল। এই সময়ে গৌতম ঘোষ, নব্যেন্দু সেন, তপন সিংহ, তরুণ মজুমদার, বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত, ঋতুপর্ণ ঘোষ বিশেষ প্রয়াসে বাংলা চলচ্চিত্রকে শিল্পমাত্রায় স্বতঃপ্রবাহিত রাখার প্রয়াস চালিয়ে গেছেন সাধ্যমতো। (কিন্তু, এ প্রসঙ্গে মনে পড়ছে সত্যজিৎ রায় জীবনের শেষ ছবি ‘আগন্তুক’-এ প্রোটাগনিস্ট মনমোহন মিত্রের মুখ দিয়ে বলিয়ে দিলেন যুগের অমোঘ সত্য—“দেশে এখন সবকিছুই নিম্নগামী”।) এইসময় রুচির বদল দেখা দিয়েছিল দর্শক সমাজে। তারা সিনেমাকে দেখতে শুরু করলো জনমনোরঞ্জনের উপাদান হিসেবে। অঞ্জন চৌধুরী ও সুখেন দাসের মতো পরিচালক পেল বিপুল জনপ্রিয়তা। মেজ বৌ, ছোট বৌ, এয়ী, গুরুদক্ষিণা, প্রতিশোধ, অমরসঙ্গী, শত্রু ইত্যাদি সিনেমা হল এই সময়ের চিহ্নায়ক। এমনকি বেদের মেয়ে জ্যোৎস্না, রাজার মেয়ে পারুল, বাবা কেন চাকর ইত্যাদি যাত্রা পালা মার্কা নিম্নরুচির সিনেমা এদেরই উত্তরাধিকারীগণ বহন করে চলল। ‘বাবা কেন চাকর’ সিনেমাকে ব্যাপক দর্শক-প্রীতি লাভ করতে দেখে সঞ্জয় মুখোপাধ্যায় বলেন—“অবশেষে আমাদের রুচি সংক্রান্ত মৌতাতের অবসান হল”। বোঝা যায়, বটতলার চটচটে ঐতিহ্য এখনো বঙ্গসংস্কৃতির একটা সমৃদ্ধ শাখা।
এরপর পুরো ৯০ দশক জুড়ে এক বিচিত্র মিশ্র জগাখিচুড়ি মার্কা সিনেমা তৈরি হতে লাগল। অতীতে বাঙালির সিনেমা সাহিত্যরসাশ্রিত যে নিটোল গল্প সম্বলিত ছিল—তার জায়গায় এসে গেল ঐতিহ্যহীন, পরিচয়হীন, ভালগার নাচ-গান আর হিংস্রতায় ভরা এক বীভৎস বিনোদনের ছবি। একুশ শতকেও তার জয়ধ্বনি সর্বব্যাপী। এই ধারার কীর্তিমান ব্যক্তিত্ববর্গ হলেন—স্বপন সাহা, সুজিত মণ্ডল, হরনাথ চক্রবর্তী, রাজা চন্দ, রাজ চক্রবর্তী প্রমুখ। এদের তৈরি সুজন সখি, সাথি, পাগলু, এমএলএ ফাটাকেষ্ট, খোকাবাবু, চ্যালেঞ্জ, বস্, রংবাজ ইত্যাদি ছবিগুলিই আজ রমরমিয়ে প্রেক্ষাগৃহ ভরায়। সিনেমা হয়ে ওঠে তাৎক্ষণিক উল্লাসের উগ্র পানপাত্র। তবু বলবো, সিনেমা যদি দেশের আর্থিক সহায়তা করে থাকে, তবে এই জাতীয় সিনেমাগুলি তার উপযুক্ত রোজগারী কল।
এই ধারার একটা ভিন্নমুখ অতি সম্প্রতি নিজস্ব পরিচিতি নির্মাণ করেছে। কিছু এমন সিনেমা বর্তমানে তৈরি হচ্ছে, যেগুলি মেধাবী চতুরতা ও বিনোদনের দ্বৈত-মশলায় ‘প্যারালাল’ সিনেমার নামে আসলে বেশ চিত্তরঞ্জনী প্রসাদ বিতরণ করে চলেছে। রঙ-চঙা কন্টিনেন্টাল প্যাকেজে। এদের মধ্যে সৃজিৎ মুখার্জী, বাপ্পাদিত্য বন্দ্যোপাধ্যায়, অগ্নিদেব চ্যাটার্জী, সুব্রত সেন প্রমুখ যথেষ্ট খ্যাতনামা। আশ্চর্য হতে হয়, অঞ্জন দত্তের মতো প্রতিভাকেও যখন দেখি, এই দলে নাম লিখিয়েছেন। এঁদের সিনেমার এক বিশেষ রূপ আছে। সিনেমাগুলিতে আছে অসঙ্গত যৌনতার সুঁড়সুড়ি। আছে স্মার্টনেসের নামে বিকৃত শহুরে রুচির দেদার সমাবেশ। হলিউড এবং বলিউডের নির্লজ্জ অনুকরণ। কৃত্রিম ভঙ্গিসর্বস্ব নতুন মাত্রার বেলেল্লাপনা। আছে সুক্ষ্ম মনস্তত্বের নামে মনোবিকারের হুটোপুটি। উদ্দীপনার প্রবল প্রতিস্রোতে এগুলি সামাজিক ও শৈল্পিক দায়বোধের ধার ধারে না। এর মধ্যে নেই মহত্তম দূরদৃষ্টির অভিক্ষেপ। নেই ঐতিহাসিক পুনর্মূল্যায়ণের আকাঙ্ক্ষা। অবশ্য এগুলি ‘আলট্রা মডার্ন’ শ্রেণির নাগরিক সমাজে ও উদ্দীপনাগ্রস্ত যুবসমাজের কাছে বেশ উপভোগ্য; এবং এর মার্কেটিং ভ্যালু বেশ উচ্চমাত্রার।
এখন কথা হল, বাজার চলতি যে সিনেমাগুলি আজকাল জনপ্রিয় হয়ে থাকে, সেগুলিকে কেবলমাত্র বাংলা সিনেমারই কলঙ্ক বলতে চাই না, সত্যজিৎ চৌধুরীর ভাষায় বলতে হয়, সেগুলো আদপে কোনো সিনেমাই নয়, তা কোনোরকম আলোচনার যোগ্যই নয়, যে বাঙালি দর্শকের আনুকূল্য পায় এই ছবিগুলি, তারা কারা? অর্ধ-শিক্ষিত, অশিক্ষিত, নিরক্ষর নয়তো কুশিক্ষিত শিল্পজ্ঞানহীন দর্শকের দল। এই দর্শকদের নেই সাহিত্যচর্চার পটভূমি, নেই শিল্পানুরাগের প্রকাশ; সবচেয়ে দুঃখের বিষয়, ভালো আর মন্দকে চিনবার শক্তি-ও এদের নেই। তাই অপর্ণা সেনের ‘যুগান্ত’ দর্শক পায় না, কমলেশ্বরের ‘মেঘে ঢাকা তারা’ ফ্লপ হয়, বুদ্ধদেবের ‘কালপুরুষ’ হাতে গোনা লোক দেখে, কৌশিক গাঙ্গুলীর ‘অপুর পাঁচালি’-র ক-জন খবর রাখে? হায়, মাত্র একশো বছরেই এই শিল্পমাধ্যম তবে কি শুধু ভোগ্যবস্তুতে পরিণত হল? জানি না, আগামি একশো বছরে এই মাধ্যম থাকবে কীনা। থাকলেও তার চেহারা কেমন হবে, বলা মুশকিল। কিন্তু থাকবে মানুষ। থাকবে দর্শক। থাকবেই। তারা কোন সিনেমা দেখবেন, তাদের রুচি-প্রগতি কোন্ পথে এগোবে, তা সমাজবিজ্ঞানীর অনুসন্ধানের বিষয়। শুধু বলবো, আজকের অধিকাশ বাংলা সিনেমা ও চারপাশের দর্শকের যে চেহারা, তাতে উদ্বুদ্ধ হওয়া যায় না, বরং বিষণ্ণই হতে হয়।
তবে প্রতিকার আছে। এই শতকেই যদি একটা চলচ্চিত্র সংস্কৃতি গড়ে তোলা যায়। তবে সেক্ষেত্রে প্রথম কাজটাই হল— শিক্ষা, শিক্ষা এবং শিক্ষা; যথার্থ শিক্ষা। ব্যাপক মানুষকে শিক্ষা দিতে হবে। ফরাসি পরিচালক জাঁ লুক গোদারের ভাষা পৌঁছে দিয়ে এদেশের সকল সিনেমা-আমোদী মানুষকে বোঝাতে হবে— “a film is a film, is a film” |
॥ আট ॥
সবশেষে রাবীন্দ্রিক চেতনায় জেগে উঠে বলতে চাই, মানুষের অন্তহীন পরাভবকে চরম ভাবা সত্যিই পাপ। তাই বলবো, বাংলা সিনেমার সার্বিক ঐতিহ্য বা পরিচিতি কিন্তু ৮০ এবং ৯০ দশকের বিকৃতির মধ্যেই আবদ্ধ নয়। এর মধ্যেই সব শেষ হয়ে যায়নি। যে অর্থে সত্যজিৎ, ঋত্বিক, মৃণাল, তপন সিংহ, বারীন সাহাদের পরে আসেন গৌতম ঘোষ, বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত, অপর্ণা সেন, ঋতুপর্ণ ঘোষ, তেমনি অল্প কয়েক বছরে বাংলা সিনেমায় দেখি বেশকিছু উজ্জ্বল মুখ। তাঁরা হলেন—সুমন মুখোপাধ্যায়, কৌশিক গাঙ্গুলি, কমলেশ্বর মুখোপাধ্যায়, সুমন ঘোষ, অনীক দত্ত প্রমুখ। তৈরি হয় হারবার্ট, পদক্ষেপ, চতুরঙ্গ, শুন্য এ বুকে, ভূতের ভবিষ্যৎ, মেঘে ঢাকা তারা, নোবেল চোর, শব্দ, অপুর পাঁচালি, সিনেমাওয়ালার মতো অসাধারণ সিনেমা। যে সিনেমাগুলি রুচিসন্ধানী দর্শক থেকে শুরু করে ওয়াই-জেনারেশনের সফ্ট টেকনিকধর্মী মনকেও আকৃষ্ট করে চলেছে।
এই তো চাই। সিনেমার স্মার্ট পরিবেশনেও থাকবে জীবনের সারসত্য। থাকবে বৌদ্ধিক দ্বন্দ্ব, থাকবে শিল্পরসদৃষ্টি এবং পুনর্মূল্যায়ণের দাবি। এই সিনেমাগুলি দেখে বা পরিচালকদের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে মনে আশার সঞ্চার হয়। এ প্রত্যয়ও বোধহয় জাগে যে, বাঙালি তার চলচ্চিত্র ঐতিহ্যের যথার্থ উত্তরাধিকারে আবারও শিল্পমাত্রার মহান শৃঙ্গে আরোহন করবে। তাই হে বাঙালি দর্শক, আসুন, আমরা সেই বিশেষ দিনের জন্য নিজেদের প্রস্তুত করি। ঋত্বিক ঘটকের সেই মারাত্মক ঐতিহাসিক মন্তব্য মনে আছে তো—“আমার সিনেমা ফ্লপ নয়, দর্শক ফ্লপ’’। সেই মন্তব্যের সত্য-সংঘটনের পরে আজ সলজ্জ অথচ দীপ্র উচ্চারণে সংকল্প করি—না, এবার দর্শক আমরা; আর ফ্লপ করবো না।
যাই হোক, চলচ্চিত্র হল পৃথিবীর আধুনিকতম শিল্পমাধ্যম। আর এই মাধ্যমকে শুরু থেকেই বাঙালি আপন কল্পনায় স্থান দিয়েছিল। একদা এই চলচ্চিত্র-ই হয়ে উঠেছিল পরাধীন জাতির রুদ্ধ-কণ্ঠের ঝংকৃত বাণী। উত্তরকালে এই শিল্প-ই হয়েছিল খণ্ডিত দেশের যন্ত্রনাদগ্ধ হৃদয়ের চিত্রবাণীমূর্তি। এবং জাতির প্রাণসত্তার বাধাহীন চলমানতার প্রতীক। তার প্রতিবাদের, তার অধিকারের, তার সংকটের, তার অস্তিত্বের, তার মর্যাদার শিল্প সরাৎসার। আজ তা বিনোদন ও নান্দনিক সহাবস্থানে বঙ্গীয় রুচি নির্মাণের শ্রেষ্ঠ মাধ্যম। বলতে দ্বিধা নেই, আজ বঙ্গ–চলচ্চিত্র বিবর্তনের মধ্য দিয়ে বিচিত্র পথ সৃষ্টি করে জাতীয় মনকেই সহযাত্রী করে তুলেছে। বর্তমানে সিনেমাকে বাদ দিয়ে বঙ্গ সংস্কৃতি ও বঙ্গ-মনের মানচিত্র অঙ্কন করতে যাওয়া কষ্ট কল্পনা। হলেও তা হবে খণ্ডিত। তাই বলবো বাংলা চলচ্চিত্রের শতবর্ষ পেরিয়ে, ২০১৭ সাল, অর্থাৎ এদেশের সিনেমার আদিপুরুষ হীরালাল সেনের মৃত্যু-শতবর্ষের পর এই মাধ্যম নিশ্চই হয়ে উঠবে বঙ্গসংস্কৃতি তথা বঙ্গ-মনেরই রুচি-স্বীকৃত চলমান ইতিভাষ্য— এই স্বপ্নই না-হয় দেখি।
গ্রন্থঋণ :–
(১) রজত রায়, বাংলা চলচ্চিত্র ও সংস্কৃতি, সৃষ্টি প্রকাশনী, বইমেলা ২০০১
(২) সঞ্জয় মুখোপাধ্যায়, অনভিজাতদের জন্য অপেরা , প্রতিভাস, জানুয়ারী ২০১৪
(৩) অভিজিৎ বিশ্বাস, সিনেমা নাটক গান, প্রকাশক-মলয় ভট্টাচার্য, বইমেলা ২০০২
(৪) সত্যজিৎ চৌধুরী, ফিল্ম নিয়ে, একুশ শতক, জানুয়ারী ২০১৩
(৫) অমিতাভ চট্টোপাধ্যায়, চলচ্চিত্র সমাজ ও সত্যজিৎ রায়, প্রতিভাস, জুলাই ২০১২
(৬) ধীমান দাশগুপ্ত, সত্যজিৎ, ঋত্বিক, মৃণাল ও অন্যান্য, এবং মুশায়েরা, জানুয়ারী ২০১৭
(৭) সঞ্জয় মুখোপাধ্যায়, ঋত্বিকতন্ত্র, সপ্তর্ষি প্রকাশন, জানুয়ারী ২০১৪
#২০২১ সালে আন্তর্জাতিক পাঠশালা পত্রিকায় মুদ্রিত
Lorem ipsum dolor sit amet, consectetur adipiscing elit. Ut elit tellus, luctus nec ullamcorper mattis, pulvinar dapibus leo.

