সারাংশ, সারমর্ম ও ভাবার্থ

সারাংশ, সারমর্ম ও ভাবার্থ

সংজ্ঞা, নিয়ম, বৈশিষ্ট্য ও নির্বাচিত উদাহরণসমূহ

(পদ্য ও গদ্য অংশ)


ভূমিকা

বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অনুশীলন হলো সারাংশসারমর্ম ও ভাবার্থ রচনা। একটি বৃহৎ বক্তব্য, কবিতা বা গদ্যের অন্তর্নিহিত মূলভাবকে সংক্ষেপে, প্রাঞ্জল ভাষায় এবং অর্থের গভীরতা বজায় রেখে প্রকাশ করার মধ্যেই এদের সার্থকতা নিহিত। এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীর ভাষাবোধ, বিশ্লেষণক্ষমতা, সাহিত্যরুচি ও মননশীলতার পরিচয় পাওয়া যায়।


সারাংশ : সংজ্ঞা

‘সার’ শব্দের অর্থ মূল এবং ‘অংশ’ শব্দের অর্থ ভাগ। সুতরাং ‘সারাংশ’ শব্দের অর্থ দাঁড়ায় মূল বক্তব্যের সংক্ষিপ্ত অংশ। কোনো নির্দিষ্ট বিষয়ের বিস্তৃত বা ব্যাখ্যামূলক আলোচনা থেকে অপ্রয়োজনীয় অলংকার, উপমা, উদাহরণ ও বর্ণনা বাদ দিয়ে কেবল মূল বক্তব্যটিকে সংক্ষেপে উপস্থাপন করাই সারাংশ।

সারাংশকে অনেক সময় সংক্ষিপ্ত সার বা সারমর্মও বলা হয়ে থাকে।


সারমর্ম : সংজ্ঞা

‘সার’ অর্থ মূল এবং ‘মর্ম’ অর্থ অন্তর্নিহিত তাৎপর্য। তাই ‘সারমর্ম’ বলতে বোঝায় কোনো বক্তব্য, কবিতা বা রচনার মূল তাৎপর্য বা গভীর ভাবকে সংক্ষেপে প্রকাশ করা।

সারাংশ যেখানে বক্তব্যের সংক্ষিপ্ত রূপ, সেখানে সারমর্ম সেই বক্তব্যের অন্তর্নিহিত সত্য ও তাৎপর্যের ব্যাখ্যা।


ভাবার্থ : সংজ্ঞা

ভাবার্থ হলো কোনো কবিতা, উক্তি বা বক্তব্যের অন্তর্নিহিত ভাবকে সহজ, স্পষ্ট ও ব্যাখ্যামূলক ভাষায় প্রকাশ করা। ভাবার্থে মূল বক্তব্যের গভীর তাৎপর্য উন্মোচিত হয়।


সারাংশ, সারমর্ম ও ভাবার্থের পার্থক্য

বিষয়সারাংশসারমর্মভাবার্থ
প্রকৃতিসংক্ষিপ্ত মূল বক্তব্যমূল তাৎপর্যঅন্তর্নিহিত ভাবের ব্যাখ্যা
উদ্দেশ্যবক্তব্যকে সংক্ষেপ করাগভীর তাৎপর্য প্রকাশভাব বিশ্লেষণ
ভাষাসরল ও সংক্ষিপ্তভাবগম্ভীরব্যাখ্যামূলক
প্রয়োগগদ্য ও প্রবন্ধে বেশিকবিতা ও নীতিবাক্যে বেশিসাহিত্য বিশ্লেষণে

সারাংশ লেখার নিয়ম

সারাংশ রচনার সময় নিম্নলিখিত বিষয়গুলোর প্রতি বিশেষ দৃষ্টি রাখতে হবে—

১. মূল বক্তব্য অনুধাবন

উদ্ধৃত অংশটি কয়েকবার মনোযোগ দিয়ে পড়ে তার মূল ভাবটি বুঝে নিতে হবে।

২. অপ্রয়োজনীয় অংশ বর্জন

বিশেষণ, উপমা, অলংকার, দৃষ্টান্ত, পুনরুক্তি ইত্যাদি বাদ দিতে হবে।

৩. নিজের ভাষায় লেখা

মূল বক্তব্যের অর্থ অক্ষুণ্ণ রেখে সহজ ও সাবলীল ভাষায় লিখতে হবে।

৪. সংক্ষিপ্ততা বজায় রাখা

সাধারণত সারাংশ মূল লেখার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ আকারে হওয়া উচিত।

৫. পরোক্ষ পদ্ধতি অনুসরণ

সরাসরি উদ্ধৃতি না দিয়ে পরোক্ষভাবে বক্তব্য প্রকাশ করতে হবে।

৬. ধারাবাহিকতা বজায় রাখা

বিষয়বস্তুকে সুসংগঠিত ও যুক্তিসংগতভাবে সাজাতে হবে।


সারমর্মের কয়েকটি উদাহরণ [পদ্যাংশ]


১। বসুমতি, কেন তুমি এতই কৃপণা?

“বসুমতি, কেন তুমি এতই কৃপণা?
কত খোঁড়াখুঁড়ি করি পাই শস্যকণা।
দিতে যদি হয় সে-মা প্রসন্ন সহাস,
কেন এ মাথার ঘাম পায়েতে বহাস?
বিনা চাষে শস্য দিলে কি তাহাতে ক্ষতি?”
শুনিয়া ঈষৎ হাসি কহেন বসুমতি—
“আমার গৌরব তাহে সামান্যই বাড়ে,
তোমার গৌরব তাহে একেবারে ছাড়ে।”

সারমর্ম

মানুষের জীবনে পরিশ্রমই গৌরবের মূল ভিত্তি। বিনা শ্রমে প্রাপ্ত সম্পদ মানুষকে মর্যাদা দেয় না; বরং আত্মপ্রচেষ্টা ও ঘামের বিনিময়ে অর্জিত সফলতাই প্রকৃত সম্মান এনে দেয়। শ্রমের মধ্যেই আত্মমর্যাদা ও জীবনের সত্যিকার সার্থকতা নিহিত।


২। ছোটো ছোটো বালুকার কণা

ছোটো ছোটো বালুকার কণা, বিন্দু বিন্দু জল,
গড়ে তোলে মহাদেশ, সাগর অতল।
মুহূর্ত নিমেষকাল, তুচ্ছ পরিমাণ,
গড়ে যুগ-যুগান্তর অনন্ত মহান।

প্রত্যেক সামান্য ত্রুটি, ক্ষুদ্র অপরাধ
ক্রমে টানে পাপপথে, ঘটায় প্রমাদ;
প্রতি করুণার দান, স্নেহপূর্ণ বাণী,
এ ধরায় স্বর্গসুখ নিত্য দেয় আনি।

সারমর্ম

ক্ষুদ্রকে অবহেলা করা উচিত নয়। সামান্য বালুকণা মিলেই যেমন মহাদেশ সৃষ্টি হয়, তেমনি ছোটো ছোটো কাজ, ক্ষুদ্র সহানুভূতি কিংবা সামান্য অপরাধও একসময় বিরাট প্রভাব বিস্তার করে। মানুষের সামান্য মমতাই পৃথিবীকে সুখময় করে তুলতে পারে।


৩। নদী কভু পান নাহি করে নিজ জল

নদী কভু পান নাহি করে নিজ জল,
তরুগণ নাহি খায় নিজ নিজ ফল;
গাভী কভু নাহি করে নিজ দুগ্ধ পান,
কাষ্ঠ দগ্ধ হয়ে করে পরে অন্ন দান;
স্বর্ণ করে নিজ রূপে অপরে শোভিত,
বংশী করে নিজ স্বরে অপরে মোহিত।
শস্য জন্মাইয়া নাহি খায় জলধর,
সাধুর ঐশ্বর্য শুধু পরহিত তরে।

সারমর্ম

প্রকৃতির প্রতিটি সত্তাই পরের কল্যাণে আত্মনিয়োগ করে। নদী, বৃক্ষ, গাভী কিংবা স্বর্ণ কেউই নিজের জন্য বাঁচে না; সবাই অন্যের উপকারে আত্মবিসর্জন দেয়। তেমনি প্রকৃত মহৎ মানুষের জীবনও পরোপকারেই মহিমান্বিত হয়।


৪। চিরসুখী জন ভ্রমে কি কখন

চিরসুখী জন ভ্রমে কি কখন
ব্যথিত বেদন বুঝিতে পারে?
কী যাতনা বিষে
বুঝিবে সে কিসে
কভু আশীবিষে দংশেনি যারে?

যতদিন ভবে
না হবে, না হবে
তোমার অবস্থা আমার সম—
ঈষৎ হাসিবে,
শুনে না শুনিবে,
বুঝে না বুঝিবে যাতনা মম।

সারমর্ম

যে ব্যক্তি কখনো দুঃখ ভোগ করেনি, সে অন্যের বেদনার গভীরতা উপলব্ধি করতে পারে না। দুঃখই মানুষকে সহানুভূতিশীল ও মানবিক করে তোলে।


৫। যে নদী হারায়ে স্রোত চলিতে না পারে

যে নদী হারায়ে স্রোত চলিতে না পারে,
সহস্র শৈবালদাম বাঁধে আসি তারে।
যে জাতি জীবনহারা, অচল, অসার,
পদে পদে বাঁধে তারে জীর্ণ লোকাচার।

সর্বক্ষণ সর্বজন চলে যেই পথে,
তৃণগুলা সেথা নাহি জন্মে কোনো মতে।
যে জাতি চলে না কভু, তারি পথ ধরে
তন্ত্র-মন্ত্র, সহিংসতার চরণ না পড়ে।

সারমর্ম

কর্মহীনতা ব্যক্তি ও জাতিকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যায়। যে নদীর স্রোত নেই, তা যেমন শৈবালে ভরে অকেজো হয়ে পড়ে, তেমনি কর্মবিমুখ জাতি কুসংস্কার ও অবক্ষয়ে নিমজ্জিত হয়। কর্মমুখর জাতিই উন্নতির পথে অগ্রসর হয়।


৬। বাবুই পাখিরে ডাকি বলিছে চড়াই

বাবুই পাখিরে ডাকি বলিছে চড়াই—
“কুঁড়েঘরে থেকে কর শিল্পের বড়াই?
আমি থাকি মহাসুখে অট্টালিকা পরে,
তুমি কত কষ্ট পাও রোদ, বৃষ্টি, ঝড়ে।”

হাসিয়া বাবুই কহে, “সন্দেহ কি তায়?
কষ্ট পাই, তবু থাকি নিজের বাসায়।
পাকা হোক, তবু ভাই, পরের বাসা—
নিজ হাতে গড়া মোর কাঁচা ঘর খাসা।”

সারমর্ম

পরের ঐশ্বর্যের চেয়ে নিজের সামান্য অর্জনও অধিক মর্যাদার। আত্মনির্ভরতা ও আত্মসম্মানের মধ্যেই প্রকৃত সুখ নিহিত। নিজের শ্রমে গড়া কাঁচা ঘরও পরের অট্টালিকার চেয়ে শ্রেয়।


৭। কোথায় স্বর্গ কোথায় নরক?

কোথায় স্বর্গ, কোথায় নরক— কে বলে তা বহুদূর?
মানুষেরই মাঝে স্বর্গ-নরক, মানুষেতে সুরাসুর।

রিপুর তাড়নে যখনি মোদের বিবেক পায় গো লয়,
আত্মগ্লানির নরক-অনলে তখনি পুড়িতে হয়।

প্রীতি ও প্রেমের পুণ্যবন্ধনে যবে মিলি পরস্পরে,
স্বর্গ আসিয়া দাঁড়ায় তখন আমাদেরই কুঁড়েঘরে।

সারমর্ম

স্বর্গ ও নরক কোনো দূরবর্তী স্থান নয়; মানুষের মন ও আচরণের মধ্যেই তার অবস্থান। প্রেম, সহমর্মিতা ও মানবতা পৃথিবীকে স্বর্গে পরিণত করে, আর লোভ, হিংসা ও বিবেকহীনতা পৃথিবীকে নরকে রূপ দেয়।


৮। সিন্ধুতীরে বসি শিশু খেলে বালু নিয়ে খেলা

সিন্ধুতীরে বসি শিশু খেলে বালু নিয়ে খেলা,
বাসগৃহে হাসিমুখে ফিরে সন্ধ্যাবেলা।
জননীর অঙ্কে ফিরে প্রাতে ফিরে আসি,
হেরে তার গৃহখানি কোথা গেছে ভাসি।

আবার গড়িতে বসে— সেই তার খেলা,
ভাঙা আর গড়া নিয়ে কাটে তার বেলা।
এ যে খেলা, হায়, তার আছে কিছু মানে?
যে জন খেলায় খেলা, সেই বুঝি জানে।

সারমর্ম

সৃষ্টি ও বিনাশের মধ্য দিয়েই জীবনের চিরন্তন গতি প্রবাহিত। পৃথিবীর সর্বত্রই ভাঙা-গড়ার খেলা চলছে, যার অন্তর্নিহিত তাৎপর্য মানুষের পক্ষে সম্পূর্ণ উপলব্ধি করা সম্ভব নয়।


৯। পরের মুখে শেখা বুলি

পরের মুখে শেখা বুলি পাখির মতো কেন বলিস?
পরের ভঙ্গি নকল করে নটের মতো কেন চলিস?

তোর নিজস্ব সর্বাঙ্গে তোর দিলেন ধাতা আপন হাতে,
মুছে সেটুক, বাজে হলি— গৌরব কী বাড়ল তাতে?

আপনারে যে ভেঙে চুরে গড়তে চায় পরের ছাঁচে,
অলীক, ফাঁকি, মেকি সে জন, নামটা তার কদিন বাঁচে?

পরের চুরি ছেড়ে দিয়ে আপন মাঝে ডুবে যা রে,
খাঁটি ধন যে সেথায় পাবি, আর কোথাও পাবি নারে।

সারমর্ম

অন্ধ অনুকরণ মানুষকে আত্মপরিচয়হীন করে তোলে। মানুষের প্রকৃত গৌরব তার নিজস্ব স্বকীয়তায়। আত্মঅনুসন্ধান ও সহজাত গুণের বিকাশেই প্রকৃত সাফল্য নিহিত।


১০। বহুদিন ধরে বহুক্রোশ দূরে

বহুদিন ধরে বহুক্রোশ দূরে
বহু ব্যয় করি বহু দেশ ঘুরে
দেখিতে গিয়াছি পর্বতমালা,
দেখিতে গিয়াছি সিন্ধু।

দেখা হয় নাই চক্ষু মেলিয়া
ঘর হতে শুধু দুই পা ফেলিয়া
একটি ধানের শিষের উপরে
একটি শিশিরবিন্দু।

সারমর্ম

সৌন্দর্য দূরে নয়, মানুষের চোখের সামনেই ছড়িয়ে আছে। প্রকৃত সৌন্দর্য উপলব্ধির জন্য প্রয়োজন সংবেদনশীল দৃষ্টি ও মনের গভীর অনুভব।


১১। পরের কারণে স্বার্থ দিয়া বলি

পরের কারণে স্বার্থ দিয়া বলি
এ জীবন মন সকলই দাও।
তার মতো সুখ কোথাও কি আছে?
আপনার কথা ভুলিয়া যাও।

পরের কারণে মরণেও সুখ,
সুখ সুখ করি কেঁদো না আর;
যতই কাঁদিবে ততই ভাবিবে,
ততই বাড়িবে হৃদয়ভার।

আপনারে লয়ে বিব্রত রহিতে
আসে নাই কেহ অবনীপরে—
সকলের তরে সকলে আমরা,
প্রত্যেকে আমরা পরের তরে।

সারমর্ম

নিঃস্বার্থ আত্মত্যাগ ও পরোপকারই মানবজীবনের শ্রেষ্ঠ আদর্শ। নিজের সুখের চেয়ে অন্যের মঙ্গলকে বড়ো করে দেখার মধ্যেই জীবনের সত্যিকারের সার্থকতা।


১২। বিশ্বজোড়া পাঠশালা মোর

বিশ্বজোড়া পাঠশালা মোর, সবার আমি ছাত্র,
নানাভাবে নতুন জিনিস শিখছি দিবারাত্র।

এই পৃথিবীর বিরাট খাতায়
পাঠ্য যে সব পাতায় পাতায়,
শিখছি সে সব কৌতূহলে,
সন্দেহ নাই মাত্র।

সারমর্ম

বিশ্বপ্রকৃতিই মানুষের সর্বশ্রেষ্ঠ বিদ্যালয়। কৌতূহলী মন নিয়ে পৃথিবীকে পর্যবেক্ষণ করলে প্রতিনিয়ত নতুন জ্ঞানের দ্বার উন্মোচিত হয়।


১৩। সার্থক জনম মোর জন্মেছি এই দেশে

সার্থক জনম মোর জন্মেছি এই দেশে,
সার্থক জনম মাগো, তোমায় ভালোবেসে।

জানিনে তোর ধনরতন আছে কিনা রাণীর মতন,
শুধু জানি, আমার অঙ্গ জুড়ায় তোমার ছায়ায় এসে।

কোন্‌ বনেতে জানি নে ফুল গন্ধে এমন করে আকুল,
কোন্‌ গগনে ওঠে রে চাঁদ এমন হাসি হেসে।

আঁখি মেলে তোমার আলো প্রথম আমার চোখ জুড়ালো,
ওই আলোতে নয়ন রেখে মুদব নয়ন শেষে।

সারমর্ম

মাতৃভূমির প্রতি ভালোবাসাই মানুষের জীবনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ অনুভূতি। দেশের প্রকৃতি, মাটি ও সংস্কৃতির সঙ্গে মানুষের আত্মিক বন্ধন অবিচ্ছেদ্য।


১৪। মরিতে চাহি না আমি সুন্দর ভুবনে

মরিতে চাহি না আমি সুন্দর ভুবনে,
মানবের মাঝে আমি বাঁচিবারে চাই।
এই সূর্যকরে, এই পুষ্পিত কাননে,
জীবন্ত হৃদয় মাঝে যদি স্থান পাই।

ধরার প্রাণে খোলা চিরতরঙ্গিত
বিরহ-মিলন কত হাসি অশ্রুময়,
মানুষের সুখে দুঃখে গাঁথিয়া সংগীতে
যদি গো রচিতে পারি অমর আলয়।

তা যদি না পারি তবে বাঁচি যতকাল
তোমাদেরই মাঝখানে লভি যেন ঠাঁই,
তোমরা ভুলিবে বলে সকাল-বিকাল
নব নব সংগীতের কুসুম ফুটাই।

সারমর্ম

মানুষ পৃথিবীর সৌন্দর্য, প্রেম ও মানবসম্পর্কের মধ্য দিয়ে চিরকাল বেঁচে থাকতে চায়। সৃষ্টি ও মানবপ্রেমের মধ্য দিয়েই মানুষ অমরত্বের সন্ধান করে।

সারাংশ ও সারমর্ম [গদ্য অংশ]

সার শব্দের অর্থ মূল এবং অংশ শব্দের অর্থ ভাগ। সুতরাং সারাংশ শব্দের অর্থ মূল বক্তব্যের সংক্ষিপ্ত অংশ। কোনো নির্দিষ্ট বিষয়ের বিস্তারিত বা বিবৃতিমূলক বর্ণনা থেকে ব্যাখ্যামূলক কথাগুলো বাদ দিয়ে শুধু সার বা মূল কথাগুলো সংক্ষেপে উপস্থাপন করাকে সারাংশ বলে। সারাংশকে সারমর্ম বা সংক্ষিপ্ত সারও বলা হয়ে থাকে।


সারাংশ লেখার নিয়ম

সারাংশ লেখার সময় নিম্নলিখিত নিয়মগুলোর প্রতি লক্ষ রাখতে হবে—

উদ্ধৃত অংশটি তিন-চার বার ভালোভাবে পড়ে তার মূল কথাটি বুঝতে হবে। উদ্ধৃত অংশের মূল ভাবটুকু অল্প কথায় প্রকাশ করাই সারাংশ লেখার মূল উদ্দেশ্য। সারকথা লেখার সময় মূল অংশের বিশেষণ, উপমা, দৃষ্টান্ত প্রভৃতি বাদ দিতে হবে। লেখার ভিতর একটি বিষয়ের যাতে পুনরাবৃত্তি না ঘটে সেদিকে লক্ষ রাখতে হবে।

মূল বিষয়টার সঙ্গে পরস্পর সম্পর্ক রেখে সহজ-সরল করে নিজের ভাষায় সারাংশ লেখা উচিত।

মোটামুটি সারাংশটা মূল অংশের তিন ভাগের এক ভাগ হওয়া উচিত।

পুরো লেখাটাই হবে পরোক্ষ পদ্ধতিতে।

সারাংশ লেখার সময় উপরোক্ত নিয়মগুলো লক্ষ করে বিষয়বস্তু ধারাবাহিকভাবে সাজিয়ে লিখলে সারাংশ সহজ, সরল ও সুন্দর হয়।


সারাংশ

‘সার’ শব্দের অর্থ হলো ‘মূল’ এবং ‘অংশ’ শব্দের অর্থ ‘ভাগ’। তার মানে ‘সারাংশ’ অর্থ হলো ‘মূলভাগ’। অর্থাৎ সারাংশ হলো কোনো ব্যাখ্যামূলক বা বিবৃতিমূলক অংশের মূল বক্তব্য।


সারমর্ম

‘সার’ শব্দের অর্থ হলো ‘মূল’ এবং ‘মর্ম’ শব্দের অর্থ ‘তাৎপর্য’। সুতরাং ‘সারমর্ম’ মানে ‘মূল তাৎপর্য’। অর্থাৎ ‘সারমর্ম’ হচ্ছে কোনো ব্যাখ্যামূলক বা বিবৃতিমূলক অংশের মূল তাৎপর্য। বাংলায় সারমর্ম ও সারাংশের মধ্যে যে সূক্ষ্ম পার্থক্য লক্ষ করা যায় তা হলো— সারাংশ বলতে বক্তব্যের সংক্ষিপ্ত মূল অংশকে বোঝায়, কিন্তু সারমর্ম বলতে বক্তব্যের বা ভাবের সংক্ষিপ্ত মূল অংশের মর্ম বা তাৎপর্যকে বোঝায়।


সারাংশ এবং ভাবার্থ

সারাংশ এবং ভাবার্থ দুটিই হলো মূল লেখার সংক্ষিপ্ত রূপ। সারাংশ হলো একটি রচনার মূল বিষয়বস্তুর সংক্ষিপ্ত রূপ, যা মূল লেখার মূল ধারণাটিকে তুলে ধরে। অন্যদিকে, ভাবার্থ হলো মূল লেখার অন্তর্নিহিত অর্থ বা তাৎপর্য, যা মূল লেখার বাইরেও বিদ্যমান থাকতে পারে।


সারাংশ

সারাংশ (Abstract) লেখার মূল উদ্দেশ্য হলো একটি বৃহৎ রচনা, যেমন গবেষণাপত্র, প্রবন্ধ বা বইয়ের মূল বিষয়বস্তু সংক্ষেপে উপস্থাপন করা। এটি সাধারণত রচনার শুরুতে বা শেষে যুক্ত করা হয় এবং মূল লেখার মূল ধারণা, উদ্দেশ্য, পদ্ধতি এবং ফলাফলের একটি সংক্ষিপ্ত বিবরণ দেয়।


ভাবার্থ

ভাবার্থ (Connotation) হলো একটি শব্দের অন্তর্নিহিত অর্থ বা অনুভূতি, যা তার আক্ষরিক অর্থের বাইরেও প্রকাশ পায়। একটি শব্দ বা বাক্যের অন্তর্নিহিত অর্থ ইতিবাচক, নেতিবাচক বা নিরপেক্ষ হতে পারে এবং এটি মানুষের উপলব্ধি ও প্রতিক্রিয়ার উপর গভীর প্রভাব ফেলে।


সারাংশ এবং ভাবার্থের মধ্যে পার্থক্য

সারাংশ হলো একটি রচনার সংক্ষিপ্ত রূপ, যেখানে মূল লেখার মূল বিষয়বস্তু তুলে ধরা হয়।

ভাবার্থ হলো একটি শব্দের অন্তর্নিহিত অর্থ বা অনুভূতি, যা তার আক্ষরিক অর্থের বাইরেও বিদ্যমান থাকে।

সারাংশ সাধারণত একটি রচনার শুরুতে বা শেষে যুক্ত করা হয়, যখন ভাবার্থ একটি শব্দের সঙ্গে সম্পর্কিত।

উদাহরণস্বরূপ, “কমল” শব্দটি “পদ্মফুল”-এর আক্ষরিক অর্থ বহন করে, তবে এর ভাবার্থ হতে পারে “পবিত্রতা” বা “সুন্দর”।

সংক্ষেপে, সারাংশ হলো মূল লেখার সংক্ষিপ্ত রূপ এবং ভাবার্থ হলো শব্দের অন্তর্নিহিত অর্থ, যা শব্দের বাইরেও বিদ্যমান থাকে।


সারাংশের কয়েকটি উদাহরণ [গদ্য অংশ]

১।

বাল্যকাল হতেই আমাদের শিক্ষার সঙ্গে আনন্দ নেই। কেবল যা কিছু নির্ঘাত আবশ্যক, তাই কণ্ঠস্থ করছি। তেমনি করে কোনো মতে কাজ চলে যায়; কিন্তু মনের বিকাশ ঘটে না। হাওয়া গেলে পেট ভরে না, আহার করলে পেট ভরে। কিন্তু আহারটি রীতিমতো হজম করবার জন্য হাওয়ার দরকার। তেমনি একটি পাঠ্যপুস্তককে রীতিমতো হজম করতে অনেকগুলো অপাঠ্যপুস্তকের সাহায্যের দরকার।

সারাংশ

আমাদের দেশে শিক্ষা গতানুগতিক। আমাদের শিক্ষার সঙ্গে আনন্দের সংযোগ নেই বলে এটি আমাদের মানসিক বিকাশে সহায়ক নয়। পাঠ্যপুস্তকের বিষয়বস্তু আয়ত্ত করার জন্য অপাঠ্যপুস্তকও পড়া দরকার।


২।

সততা শ্রেষ্ঠ পন্থা। সৎ ব্যক্তি সবার শ্রদ্ধেয়। প্রত্যেকে তাকে বিশ্বাস করে। সৎ না হলে জীবনে কেউ উন্নতি করতে পারে না। সৎ দোকানদারকে ক্রেতারা পছন্দ করে। সবাই তার দোকানে যায় এবং জিনিসপত্র কেনে। তাঁরা তাঁকে বিশ্বাস করতে শুরু করে। তাঁর প্রশংসা বৃদ্ধি পায় এবং ব্যবসায় উন্নতি হয়।

সারাংশ

সততা মানুষের শ্রেষ্ঠ গুণ। সৎ ব্যক্তিকে সবাই বিশ্বাস করে ও সম্মান করে। সততার মাধ্যমে মানুষ জীবনে সাফল্য ও উন্নতি লাভ করতে পারে।


৩।

পরার্থে কাজ করতে পারলেই মনুষ্যত্ব অর্জন করা যায়। আপন স্বার্থে কাজ করলে বা ভোগে মত্ত হওয়াতে কোনো আনন্দ নেই। ভোগ মানুষকে ক্লান্ত করে, ক্ষুদ্র গণ্ডিতে আবদ্ধ করে। ত্যাগের মধ্য দিয়েই মহিমা লাভ করে; তার চিত্ত প্রশস্ত হয়, প্রসন্ন হয়, সুন্দর হয়। এই সুন্দর হওয়াই মানুষের সাধনা। এতেই প্রকৃত মনুষ্যত্ব প্রকাশিত হয়।

সারাংশ

ত্যাগ ও পরোপকারের মধ্য দিয়েই প্রকৃত মনুষ্যত্বের বিকাশ ঘটে। স্বার্থপরতা মানুষকে সংকীর্ণ করে তোলে, আর মহান আদর্শ মানুষকে সুন্দর ও মহৎ করে।


৪।

ফুল ফুটেছে— এটাই ফুলের চরম কথা। যার ভালো লাগলো সে জিতল, ফুলের জিত তার আপন আবির্ভাবেই। সুন্দরের অন্তরে আছে একটি রসময়, রহস্যময়, অতীত সত্য; আমাদের অন্তরের সঙ্গে তার অনির্বচনীয় সম্বন্ধ। তার সম্পর্কে আমাদের আত্মচেতনা হয় মধুর, গভীর ও উজ্জ্বল। আমাদের ভিতরের মানুষ বেড়ে ওঠে, রাঙিয়ে ওঠে, রসিয়ে ওঠে। আমাদের সত্তা যেন তার সঙ্গে সঙ্গে রসে মিলে যায়— একেই বলে অনুরাগ।

সারাংশ

সৌন্দর্যের একটি নিজস্ব সত্তা আছে। সেই সৌন্দর্যের বিকাশ মানুষের অন্তর্জগতকে সমৃদ্ধ করে এবং সত্য ও সুন্দরের প্রতি মানুষের গভীর অনুরাগ সৃষ্টি করে।


৫।

বিদ্যা মানুষের মূল্যবান সম্পদ, সে বিষয়ে সন্দেহ নাই। কিন্তু চরিত্র তদপেক্ষা মূল্যবান। অতএব, কেবল বিদ্বান বলিয়াই কোনো লোক সমাদর লাভের যোগ্য বলিয়া বিবেচিত হইতে পারে না। চরিত্রহীন ব্যক্তি যদি নানা বিদ্যায় আপনার জ্ঞানভাণ্ডারকে পূর্ণ করিয়াও থাকে, তথাপি তাহার সঙ্গ পরিত্যাগ করাই শ্রেয়। প্রবাদ আছে যে, কোনো কোনো বিষধর সর্পের মস্তকে মণি থাকে। মণি মহামূল্যবান পদার্থ বটে, কিন্তু তাই বলিয়া মণি লাভের নিমিত্তে বিষধর সর্পের কাছে কেহ যায় না। সেরূপ বিদ্বান দুর্জনের নিকট গমন করা বিধেয় নহে।

সারাংশ

চরিত্র বিদ্যার চেয়েও মূল্যবান। চরিত্রহীন বিদ্বান ব্যক্তি সমাজের জন্য কল্যাণকর নয়; তাই জ্ঞানীর চেয়ে সচ্চরিত্র মানুষ অধিক সম্মানের যোগ্য।

৬।

অভ্যাস ভয়ানক জিনিস। একে হঠাৎ স্বভাব থেকে তুলে ফেলা কঠিন। মানুষ হবার সাধনাতে তোমাকে ধীর ও সহিষ্ণু হতে হবে। সত্যবাদী হতে চাও? তাহলে ঠিক কর, সপ্তাহে একদিন মিথ্যা কথা বলবে না। ছয় মাস ধরে এমনি করে নিজে সত্য কথা বলতে অভ্যাস কর। তারপর এক শুভদিনে আর একবার প্রতিজ্ঞা কর, সপ্তাহে দুই দিন তুমি মিথ্যা কথা বলবে না।

এক বছর পরে দেখবে, সত্য কথা বলা তোমার কাছে অনেক সহজ হয়ে পড়েছে। সাধনা করতে করতে এমন একদিন আসবে তখন ইচ্ছা করেও মিথ্যা বলতে পারবে না।

নিজেকে মানুষ করার চেষ্টায় পাপ ও প্রবৃত্তির সঙ্গে সংগ্রামে তুমি হঠাৎ জয়ী হতে কখনও ইচ্ছা করো না। তাহলে সব পণ্ড হবে।

সারাংশ

ভালো অভ্যাস ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে। ধৈর্য, সাধনা ও নিয়মিত অনুশীলনের মাধ্যমে সত্যবাদিতা ও মানবিক গুণের বিকাশ ঘটে। আত্মসংযম ও অধ্যবসায়ই মানুষকে প্রকৃত মানুষ হিসেবে গড়ে তোলে।


৭।

যে ব্যক্তি শ্রমবিমুখ হইয়া আলস্যে কালক্ষেপ করে, তাহার চিরকাল দুঃখ ও চিরকাল অপ্রতুল। যে ব্যক্তি শ্রম করে সে কখনও কষ্ট পায় না, প্রত্যুৎ স্বাচ্ছন্দ্যে কাল যাপন করে। ফলত যে যেমন পরিশ্রম করে, তাহার তদ্রূপ সুখ-সমৃদ্ধি লাভ হয়। সংসারে যাবতীয় উত্তম বস্তু শ্রমলভ্য; সুতরাং শ্রম ব্যতিরেকে সে সকল বস্তু লাভ করিবার উপায়ান্তর নাই। পরিশ্রম না করিলে স্বাস্থ্যরক্ষা ও সুখলাভ হয় না; কিন্তু অতিশয় পরিশ্রম করাও অবিধেয়, যেহেতু তদ্বারা শরীর অত্যন্ত দুর্বল হইয়া যায় ও রোগ জন্মে। প্রতিদিন দশ ঘণ্টা পরিশ্রম করিলে স্বাস্থ্যভঙ্গের সম্ভাবনা নাই।

সারাংশ

পরিশ্রমই সুখ ও সমৃদ্ধির মূল চাবিকাঠি। অলস ব্যক্তি দুঃখে জীবন কাটায়, আর পরিশ্রমী ব্যক্তি সফলতা অর্জন করে। তবে পরিমিত পরিশ্রমই স্বাস্থ্য ও কল্যাণের জন্য উপকারী।


৮।

যারা স্বয়ং চেষ্টা করেন, আল্লাহ তাঁদের সহায় হন। পৃথিবীতে যারা বড়ো হয়েছেন তাঁদের প্রত্যেকের জীবনী পাঠ করলে আমরা এ শিক্ষা পেয়ে থাকি। বিদ্যাই হোক, ধনই হোক, স্বয়ং পরিশ্রম না করলে কেউ তা লাভ করতে পারে না। এক রাজপুত্র একবার এক পণ্ডিতকে বলেছিলেন, “মহাশয়, সাধারণ মানুষ পরিশ্রম করে বিদ্যালাভ করে থাকে। আমি তো রাজপুত্র, পরিশ্রমে আমি অভ্যস্ত নই, আমার জন্য বিদ্যার্জনের সহজ উপায় করতে পারেন না?” পণ্ডিত বললেন, “রাজার বিদ্যা শিক্ষার স্বতন্ত্র উপায় নেই।”

অনেক বালক আছে যারা কেবল শিক্ষক মহোদয়ের সাহায্যের আশায় বসে থাকে। অভিধান খুলবার কষ্ট স্বীকার না করে অর্থপুস্তকের সাহায্য গ্রহণ করে। এরূপ লোক কখনও জগতে উন্নতি লাভ করতে পারে না।

সারাংশ

আত্মপ্রচেষ্টা ছাড়া কোনো সাফল্য অর্জন সম্ভব নয়। যারা নিজের শ্রম ও সাধনার উপর নির্ভর করে, তারাই জীবনে উন্নতি লাভ করে। পরের সাহায্যের উপর নির্ভরশীল মানুষ প্রকৃত সাফল্য পায় না।


৯।

গানের সহিত বাজনার মিল না থাকিলে গান-বাজনা শুনিতে ভালো লাগে না। কবিতা আবৃত্তি করিবার সময় ছন্দের তাল রক্ষিত না হইলে আবৃত্তি শ্রুতিমধুর হয় না। তাল বা ছন্দ একটি বড়ো জিনিস; আমরা স্বভাবতই চলিতে ফিরিতে, গান-বাজনা করিতে, কবিতা পড়িতে তাহা মানিয়া চলি। সিঁড়ির ধাপ যদি এলোমেলো বা অসমান হয় তাহা হইলে চলার গতি ব্যাহত হয়, উপরে আরোহণ করিতে কষ্ট হয়। শুধু চলার নহে, বলারও তাল আছে। প্রতি কাজেই এই তাল যাহাতে ঠিক থাকে তাহার দিকে লক্ষ রাখা উচিত। তাহাতে জীবন স্বচ্ছন্দ হইয়া উঠিবে।

সারাংশ

জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে ছন্দ ও শৃঙ্খলা প্রয়োজন। সঠিক তাল ও নিয়ম জীবনকে সুশৃঙ্খল, সুন্দর ও গতিময় করে তোলে।


১০।

তুমি জীবনকে সার্থক সুন্দর করিতে চাও? ভালো কথা, কিন্তু সেজন্য তোমাকে প্রাণান্ত পরিশ্রম করিতে হইবে। এইসব তুচ্ছ করিয়া যদি তুমি লক্ষ্যের দিকে ক্রমাগত অগ্রসর হইতে পার, তবে তোমার জীবন সুন্দর হইবে। আরও আছে। তোমার ভিতর এক ‘আমি’ আছে— সে বড়ো দুরন্ত। তাহার স্বভাব পশুর মতো বর্বর ও উচ্ছৃঙ্খল। সে কেবল ভোগবিলাস চায়। সে বড়ো লোভী। এই ‘আমি’কে জয় করিতে হইবে। তবেই তোমার জীবন সুন্দর হইয়া উঠিবে।

সারাংশ

পরিশ্রম, আত্মসংযম ও অহংকার দমনের মধ্য দিয়েই জীবন সুন্দর ও সার্থক হয়। ভোগবিলাস ও লোভ মানুষকে অধঃপতনের দিকে নিয়ে যায়।


সারাংশ ও সারমর্ম

১১।

অপরের জন্য তুমি তোমার প্রাণ দাও, আমি বলতে চাই না। অপরের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দুঃখ দূর কর। অপরকে একটুখানি সুখ দাও। অপরের সঙ্গে একটুখানি মিষ্টি কথা বল। পথের অসহায় মানুষটির দিকে একটা করুণ কটাক্ষদৃষ্টি নিক্ষেপ কর— তাহলেই অনেক হবে। চরিত্রবান মনুষ্যত্বসম্পন্ন মানুষ নিজের চেয়ে পরের অভাবে বেশি অধীর হন। পরের দুঃখকে ঢেকে রাখতে গৌরববোধ করেন।

সারাংশ

সহানুভূতি, মমতা ও পরোপকারই প্রকৃত মানবিকতার পরিচয়। যারা অপরের দুঃখে পাশে দাঁড়ায় এবং মানুষের কল্যাণে নিজেকে নিয়োজিত করে, তারাই প্রকৃত মনুষ্যত্বের অধিকারী।


১২।

মুখে অনেকেই টাকা অতি তুচ্ছ, অর্থ অনর্থের মূল বলিয়া থাকেন। কিন্তু জগৎ এমনি এক ভয়ানক স্থান যে, টাকা না থাকলে তার স্থান কোথাও নাই। সমাজে নাই, স্বজাতির নিকট নাই, ভ্রাতা-ভগিনীর নিকট নাই, স্ত্রীর নিকট নাই। স্ত্রীর মতো ভালোবাসে জগতে এরকম কে আর আছে! টাকা না থাকলে এমন অকৃত্রিম ভালোবাসারও আশা নাই, কাহারও নিকট সম্মান নাই। টাকা না থাকলে রাজায় চেনে না, সাধারণে মান্য করে না, বিপদে জ্ঞান থাকে না। জন্মমাত্র টাকা, জীবনে টাকা, জীবনান্তেও টাকা— জগতে টাকারই খেলা।

সারাংশ

বাস্তব জীবনে অর্থের গুরুত্ব অপরিসীম। অর্থের অভাবে সমাজে সম্মান, নিরাপত্তা ও সম্পর্কের মূল্যও ক্ষুণ্ণ হয়। তাই জীবনের প্রয়োজন পূরণে অর্থ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।


১৩।

আমরা স্কুল-কলেজে ছেলে পাঠাইয়া ভাবি যে, ছেলেকে শিক্ষা দিবার সমস্ত কর্তব্যই প্রতিপালন করিলাম। বৎসরের পর বৎসর পাস করিয়া গেলেই অভিভাবকেরা ছেলের যথেষ্ট তারিফ করেন। কিন্তু তলাইয়া দেখেন না যে, কেবল পাস করিলেই বিদ্যার্জন হয় না। বাস্তবিক পক্ষে ছাত্রের বা সন্তানের মনে জ্ঞানের অনুরাগ এবং জ্ঞানের প্রতি আনন্দজনক শ্রদ্ধার উদ্রেক হইতেছে কিনা তাহাই দেখিবার জিনিস। জ্ঞানচর্চার মধ্যে যে এক পরম রস ও আত্মপ্রসাদ আছে, তাহার স্বাদ কোনো কোনো শিক্ষার্থী এক বিন্দুও পায় না। এই রসের স্বাদ গ্রহণেচ্ছা জন্মাইয়া দেওয়াই হইতেছে স্কুল-কলেজের শিক্ষার একমাত্র উদ্দেশ্য।

সারাংশ

প্রকৃত শিক্ষার উদ্দেশ্য শুধু পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া নয়; জ্ঞানের প্রতি অনুরাগ, কৌতূহল ও আত্মতৃপ্তি সৃষ্টি করাই শিক্ষার মূল লক্ষ্য।

১৪।

পরীক্ষায় পাস করিবার এইরূপ হাস্যোদ্দীপক উন্মত্ততা পৃথিবীর আর কোথাও দেখিতে পাওয়া যায় না। পাস করিয়া সরস্বতীর নিকট চিরবিদায় গ্রহণ, শিক্ষিতের এইরূপ জঘন্য প্রকৃতিও আর কোনো দেশে নাই। এ দেশে আমরা যখন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা শেষ করিয়া জ্ঞানী ও গুণী হইয়াছি বলিয়া অহঙ্কারে স্ফীত হই, অপরাপর দেশে সেই সময়ে প্রকৃত জ্ঞানচর্চার কাল আরও আরম্ভ হয়। কারণ, সে সকল দেশের লোকের জ্ঞানের প্রতি যথেষ্ট অনুরাগ আছে। তাহারা একথা উপলব্ধি করিয়াছে যে, বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বার হইতে বাহির হওয়ার পরই জ্ঞান-সমুদ্র মন্থনের প্রশস্ত সময় উপস্থিত হয়। আমরা দ্বারকে গৃহ মনে করিয়াছি। সুতরাং জ্ঞানমন্দিরের দ্বারেই অবস্থান করি, অভ্যন্তরস্থ রত্নরাজি না দেখিয়াই ক্ষুণ্ণ মনে প্রত্যাবর্তন করি।

সারাংশ

শিক্ষা কেবল পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। প্রকৃত শিক্ষা হলো আজীবন জ্ঞানচর্চা ও আত্মউন্নয়নের সাধনা। আমরা যেখানে শিক্ষার সমাপ্তি ভাবি, প্রকৃতপক্ষে সেখান থেকেই জ্ঞানের প্রকৃত যাত্রা শুরু হয়।


১৫।

মুখস্থ করিয়া পাস করাই তো চৌর্যবৃত্তি। যে ছেলে পরীক্ষাশালায় গোপনে বই লইয়া যায় তাহাকে খেদাইয়া দেওয়া হয়। আর যে ছেলে তাহার চেয়েও লুকাইয়া লয়, অর্থাৎ চাদরের মধ্যে না লইয়া মগজের মধ্যে লইয়া যায়, সেই বা কম কী করিল? সভ্যতার নিয়ম অনুসারে মানুষের স্মরণশক্তির মহলটা ছাপাখানায় অধিকার করিয়াছে। অতএব যাহারা বই মুখস্থ করিয়া পাস করে তাহারা অসভ্যরকমে চুরি করে।

সারাংশ

মুখস্থবিদ্যা প্রকৃত জ্ঞানার্জনের অন্তরায়। অনুধাবন ও চিন্তার পরিবর্তে কেবল মুখস্থ করে পরীক্ষায় পাস করা নকলেরই আরেক রূপ।


১৬।

সুশিক্ষিত লোকমাত্রই স্বশিক্ষিত। আজকের বাজারে বিদ্যাদাতার অভাব নেই। এমনকি এ ক্ষেত্রে দাতা কর্ণেরও অভাব নেই, এবং আমরা আমাদের ছেলেদের তাদের দ্বারস্থ করিয়াই নিশ্চিত থাকি— এই বিশ্বাসে যে, সেখান থেকে তারা একটি বিদ্যার ধন লাভ করে ফিরে আসিবে, যার সুবাদে তাহার বাকি জীবন আরামে কাটিয়া দিতে পারিবে। কিন্তু এ বিশ্বাস নিতান্ত অমূলক। মনোরাজ্যেও দান গ্রহণসাপেক্ষ, অথচ আমরা দাতার মুখ চাহিয়া গ্রহীতার কথাটা একেবারে ভুলিয়া যাই।

সারাংশ

প্রকৃত শিক্ষা আত্মপ্রচেষ্টা ও আত্মসাধনার মাধ্যমে অর্জিত হয়। অন্যের উপর নির্ভর করে সত্যিকার জ্ঞানলাভ সম্ভব নয়; শিক্ষার্থীর নিজস্ব আগ্রহ ও সাধনাই শিক্ষার মূল ভিত্তি।


১৭।

মাতৃস্নেহের তুলনা নাই, কিন্তু অতি স্নেহ অনেক সময় অমঙ্গল আনয়ন করে। যে স্নেহের উত্তাপে সন্তানের পরিপুষ্টি, তাহারই আধিক্যে সে অসহায় হইয়া পড়ে। মাতৃহৃদয়ের মমতার প্রাবল্যে মানুষ আপনাকে হারাইয়া আপন শক্তির মর্যাদা বুঝিতে পারে না। নিয়ত মাতৃস্নেহের অন্তরালে অবস্থান করিয়া আত্মশক্তির সন্ধান সে পায় না— দুর্বল, অসহায় পক্ষিশাবকের মতো চিরদিন স্নেহাতিশয্যে আপনাকে সে একান্ত নির্ভরশীল মনে করে। ক্রমে জননীর পরম সম্পদ সন্তান অলস, ভীরু, দুর্বল ও পরনির্ভরশীল হইয়া মনুষ্যত্ব বিকাশের পথ হইতে দূরে সরিয়া যায়। অন্ধ মাতৃস্নেহ সে কথা বুঝে না।

সারাংশ

মায়ের স্নেহ অমূল্য হলেও অতিরিক্ত স্নেহ সন্তানের ব্যক্তিত্ব বিকাশে বাধা সৃষ্টি করে। অতিরিক্ত আদর মানুষকে দুর্বল, ভীরু ও পরনির্ভরশীল করে তোলে।


১৮।

ভবিষ্যতের ভাবনা ভাবাই হলো জ্ঞানীর কাজ। পিঁপড়ে, মৌমাছি পর্যন্ত যখন ভবিষ্যতের জন্য ব্যতিব্যস্ত, তখন মানুষের কথা বলাই বাহুল্য। ফকির-সন্ন্যাসী যে ঘরবাড়ি ছেড়ে আহার-নিদ্রা ভুলে পাহাড়-জঙ্গলে চোখ বুজে বসে থাকে, সেটা যদি নিতান্ত গাঁজিকার কৃপায় না হয়, তবে বলতে হবে ভবিষ্যতের ভাবনা ভেবে। সমস্ত জীবজন্তুর দুটো চোখ সামনে থাকিবার মানে হলো, ভবিষ্যতের দিকে যেন নজর থাকে। অতীতের ভাবনা ভেবে লাভ নেই। পণ্ডিতেরা বলে গেছেন— “গতস্য শোচনা নাস্তি।” আর বর্তমান সে তো নেই বললেই চলে।

এই যেটা বর্তমান, সেই কথা বলতে বলতেই অতীত হইয়া গেল। জলের তরঙ্গ গণনা আর বর্তমানের চিন্তা করা সমানই অনর্থক। ভবিষ্যৎটাই হলো আসল জিনিস। সেটা কখনও শেষ হয় না। তাই ভবিষ্যতের মানব কেমন হইবে, সেটা একবার ভাবিয়া দেখা উচিত।

সারাংশ

জ্ঞানী ব্যক্তি ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তা করেন। অতীত ফিরে আসে না এবং বর্তমান ক্ষণস্থায়ী; তাই দূরদর্শিতা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাই মানুষের উন্নতির প্রধান উপায়।


১৯।

মানুষের সুন্দর মুখ দেখিয়া আনন্দিত হইও না। স্বভাবে যে সুন্দর নয়, দেখিতে সুন্দর হইলেও তাহার স্বভাব, তাহার স্পর্শ, তাহার রীতিনীতি মানুষ ঘৃণা করে। দুঃস্বভাবের মানুষ মানুষের হৃদয়ে জ্বালা ও বেদনা দেয়। তাহার সুন্দর মুখ দেখিয়া মানুষ তৃপ্তি পায় না। অবোধ লোকেরাই মানুষের রূপ দেখিয়া মুগ্ধ হয় এবং তাহার ফলভোগ করে।

সারাংশ

বাহ্যিক সৌন্দর্যের চেয়ে চরিত্রের সৌন্দর্য অধিক মূল্যবান। অসৎ স্বভাবের মানুষ কখনও প্রকৃত সম্মান লাভ করতে পারে না।


২০।

কিসে হয় মর্যাদা? দামি কাপড়ে, গাড়ি-ঘোড়ায়, না ঠাকুরদাদার উপাধিতে? না, মর্যাদা এমন জিনিসে নেই। আমি দেখতে চাই তোমার ভিতর, তোমার বাহির, তোমার অন্তর। আমি জানতে চাই তুমি চরিত্রবান কিনা। তোমায় দেখলে দাস-দাসী উড়ে আসে, প্রজারা তোমায় দেখে সন্ত্রস্ত হয়। তুমি মানুষের ঘাড়ে চড়ে হাওয়া খাও, মানুষকে দিয়ে জুতো খোলাও, তুমি দিনের আলোতে মানুষের টাকা আত্মসাৎ করো, বাপ-মা, শ্বশুর-শাশুড়ি তোমায় আদর করেন— আমি তোমায় অবজ্ঞায় বলব, “যাও!”

সারাংশ

মানুষের প্রকৃত মর্যাদা ধনসম্পদ বা বংশগৌরবে নয়; চরিত্র, মানবিকতা ও নৈতিক গুণেই মানুষের সত্যিকার সম্মান প্রতিষ্ঠিত হয়।


সারাংশ ও সারমর্ম [গদ্য অংশ]

২১।

ক্রোধ মানুষের পরম শত্রু। ক্রোধ মানুষের মনুষ্যত্ব নাশ করে। যে লোমহর্ষক কাজগুলো পৃথিবীকে ত্রাসের রাজ্যে পরিণত করেছে, তার মূলে ক্রোধই। ক্রোধ যে মানুষকে পশুভাবাপন্ন করে, তা একবার ক্রুদ্ধ ব্যক্তির মুখের প্রতি দৃষ্টিপাত করিলেই স্পষ্ট প্রতীয়মান হয়। যে ব্যক্তির মুখখানি সর্বদা হাসিমাখা, উদারভাবে পরিপূর্ণ মনে হয়, দেখিলেই তোমার মনে আনন্দ ধরে; একেবারে ক্রোধের সময় সেই মুখখানির দিকে তাকাও— দেখিবে স্বর্গের সেই সুষমা আর নেই, নরকাগ্নিতে বিকট রূপ ধারণ করিয়াছে। সমস্ত মুখ যেন কালিমায় ঢাকিয়া গিয়াছে। তখন তাহাকে আলিঙ্গন করা দূরে থাকুক, নিকট যাইতেও ইচ্ছা হয় না। সুন্দরকে মুহূর্তের মধ্যে কুৎসিত করিতে অন্য কোনো রিপু ক্রোধের ন্যায় কৃতকার্য হয় না।

সারাংশ

ক্রোধ মানুষের মনুষ্যত্ব নষ্ট করে এবং তাকে পশুতুল্য করে তোলে। ধৈর্য, আত্মসংযম ও সহিষ্ণুতার মাধ্যমেই মানুষ ক্রোধকে জয় করতে পারে।

 
 
 

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!
Scroll to Top