মঙ্গলকাব্য / বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস

মঙ্গলকাব্য : মধ্যযুগীয় বাংলা সাহিত্যের লোকায়ত মহাকাব্যধারা

ভূমিকা, ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও মনসামঙ্গল কাব্যের বিস্তৃত

আলোচনা


ভূমিকা : মঙ্গলকাব্যের উৎপত্তি, রূপ ও তাৎপর্য

বাংলা মধ্যযুগীয় সাহিত্যের অন্যতম প্রধান, জনপ্রিয় এবং বিস্তৃত সাহিত্যধারা হল মঙ্গলকাব্য। বাংলা ভাষার আদি ও মধ্যযুগীয় সাহিত্যচর্চার যে বিশাল ভাণ্ডার, তার মধ্যে মঙ্গলকাব্য এক অনন্য আসন অধিকার করে আছে। এই কাব্যধারা কেবল ধর্মীয় আখ্যান নয়, বরং মধ্যযুগীয় বাংলার সমাজজীবন, অর্থনীতি, লোকবিশ্বাস, সংস্কৃতি, ধর্মচেতনা এবং সাধারণ মানুষের জীবনসংগ্রামের এক বিশাল দলিল।

‘মঙ্গল’ শব্দের অর্থ শুভ, কল্যাণ বা মঙ্গলসাধন। যে কাব্য পাঠ, শ্রবণ বা গানের মাধ্যমে দেবদেবীর মাহাত্ম্য প্রচারিত হয় এবং মানুষের কল্যাণ সাধিত হয় বলে বিশ্বাস করা হত, তাকে বলা হত মঙ্গলকাব্য।

মঙ্গলকাব্যের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল—

  • কোনো দেবতা বা দেবীর মাহাত্ম্য প্রচার,
  • সমাজে সেই দেবতার পূজার প্রচলন,
  • সাধারণ মানুষের ধর্মবিশ্বাসকে সুদৃঢ় করা,
  • এবং লোকায়ত দেবতাদের ব্রাহ্মণ্য সমাজে প্রতিষ্ঠা করা।

এই কাব্যের একটি বড় বৈশিষ্ট্য হল—এখানে দেবতা ও মানুষের সম্পর্ক অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ। দেবতারা মানুষের মতো রাগ করেন, অভিমান করেন, প্রতিশোধ নেন, আবার করুণাও করেন। ফলে এই কাব্যে দেবত্বের তুলনায় মানবিক আবেগই অধিক উজ্জ্বল।


মঙ্গলকাব্যের ঐতিহাসিক ও সামাজিক পটভূমি

বাংলার মধ্যযুগ ছিল ধর্মীয় সংঘাত, সামাজিক বিভাজন, অর্থনৈতিক টানাপোড়েন এবং রাজনৈতিক অস্থিরতার যুগ। মুসলিম শাসনের বিস্তার, ব্রাহ্মণ্যবাদের কঠোরতা, নিম্নবর্গের মানুষের বঞ্চনা, লোকবিশ্বাসের প্রসার—সব মিলিয়ে সমাজে এক জটিল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল।

এই সময়ে সমাজের নিম্নবর্গীয় মানুষ তাদের নিজস্ব দেবদেবীকে প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিল। ফলে মনসা, চণ্ডী, ধর্মঠাকুর, শীতলা, মনসা প্রভৃতি লোকদেবতার মাহাত্ম্য প্রচারের জন্য রচিত হয় মঙ্গলকাব্য।

মঙ্গলকাব্যের মধ্যে আমরা দেখতে পাই—

  • বাংলার নদীমাতৃক প্রকৃতি,
  • কৃষিভিত্তিক সমাজ,
  • বণিক সম্প্রদায়ের উত্থান,
  • নারীজীবনের সংগ্রাম,
  • সমাজের জাতিভেদ,
  • লোকবিশ্বাস ও কুসংস্কার,
  • এবং মধ্যযুগীয় বাঙালির জীবনদর্শন।

মঙ্গলকাব্যের প্রধান শাখা

বাংলা সাহিত্যে মঙ্গলকাব্যের বিভিন্ন শাখা দেখা যায়। যেমন—

  • মনসামঙ্গল
  • চণ্ডীমঙ্গল
  • ধর্মমঙ্গল
  • অন্নদামঙ্গল
  • রায়মঙ্গল
  • শিবায়ন
  • শীতলামঙ্গল প্রভৃতি।

এর মধ্যে মনসামঙ্গল, চণ্ডীমঙ্গল, ধর্মমঙ্গল ও অন্নদামঙ্গল সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ।


।। মনসামঙ্গল কাব্য ।।

প্রঃ মনসা মঙ্গল কাব্যের কাহিনি উল্লেখ করে একজন শ্রেষ্ঠ কবির কাব্যের পরিচয় দাও।

উঃ

* মনসার পূজা প্রচলনের কারণ :

দেবী মনসা নিম্নবর্গের কৌম-সমাজে পূজিতা দেবী। প্রাগার্য কাল থেকেই তাঁর পূজা প্রচলিত। পালযুগ থেকেই এই দেবী উচ্চবর্গের মর্যাদা পেতে শুরু করেন। বাংলার সর্পদেবী মনসার পরিকল্পনায় অনার্যদের শক্তিপূজার প্রভাব আছে।

যাই হোক, জলা-জঙ্গলে পরিবেষ্টিত মানুষ সাপের ভয় থেকে মনসা পূজার প্রচলন করেছিল।


মনসাদেবীর উৎস ও রূপ : বিস্তৃত আলোচনা

মনসা মূলত বাংলার লৌকিক সর্পদেবী। ভারতীয় পুরাণে মনসার উল্লেখ থাকলেও বাংলায় তাঁর যে জনপ্রিয়তা, তা মূলত লোকবিশ্বাসজাত। গবেষকদের মতে, মনসা ছিলেন অনার্য জনগোষ্ঠীর দেবী, যিনি পরে ব্রাহ্মণ্য সমাজে স্বীকৃতি লাভ করেন।

মনসার মধ্যে দ্বৈত রূপ লক্ষ করা যায়—

১. তিনি ভয়ংকরী ও প্রতিহিংসাপরায়ণা
২. আবার তিনি জীবনরক্ষাকারী মাতৃদেবী

বাংলার ভৌগোলিক পরিবেশ—নদী, খাল, বিল, জঙ্গল, জলাভূমি—সাপের বিস্তারের জন্য অত্যন্ত উপযোগী ছিল। ফলে মানুষের মনে সাপভীতি প্রবল ছিল। এই ভয় থেকেই সর্পদেবীর পূজার প্রচলন।

মনসা মূলত কৃষিজীবী ও নিম্নবর্গীয় মানুষের দেবী ছিলেন। পরবর্তীকালে সমাজে তাঁর মর্যাদা বৃদ্ধি পায় এবং তিনি পুরাণসম্মত দেবী রূপে প্রতিষ্ঠা লাভ করেন।


★ মনসামঙ্গলের কাহিনিসূত্র :

অনার্য দেবী মনসাকে পুজো দিতে চাননি সম্ভ্রান্ত বণিক চাঁদ সদাগর। তিনি মনসার বিরুদ্ধে জেহাদ ঘোষণা করেছিলেন। মনসা শত চেষ্টা করেও যখন তাকে পদানত করতে ব্যর্থ হন, তখন চাঁদের একের পর এক অনিষ্ট করতে শুরু করে।

১) চাঁদের গুয়াবাড়ি মনসা ধ্বংস করেন।

২) চাঁদের প্রাণের বন্ধু শংকরের মৃত্যু ঘটান।

৩) চাঁদের মহাজ্ঞান হরণ করেন।

৪) ছয় পুত্রের জীবন নাশ করেন।

৫) চাঁদের গর্বের সপ্ত ডিঙা মধুকর ডুবিয়ে দেন।

৬) চাঁদকে ভিখারিতে পরিণত করেন।

৭) শেষে চাঁদের কনিষ্ঠ পুত্র লখিন্দরের জীবন কেড়ে নেন বাসরঘরে।

এত বিপর্যয়ের পরও চাঁদ কিন্তু অনমনীয় ছিল। অবশেষে কনিষ্ঠ পুত্রবধূ বেহুলার মহান আত্মত্যাগের মহিমা দেখে, এবং তার করুণ প্রার্থনা শুনে চাঁদ মনসাকে পুজো দিতে রাজি হন। যদিও সে পূজা বামহস্তে সমর্পিত হয়।


মনসামঙ্গলের কাহিনির অন্তর্নিহিত তাৎপর্য

মনসামঙ্গল কেবল দেবী মনসার পূজা প্রতিষ্ঠার কাহিনি নয়; এর মধ্যে মধ্যযুগীয় সমাজসংঘাতের গভীর প্রতিফলন রয়েছে।

চাঁদ সদাগর ছিলেন উচ্চবর্ণীয়, প্রতিষ্ঠিত, শৈব বণিক। অন্যদিকে মনসা ছিলেন নিম্নবর্গীয় লোকদেবী। ফলে চাঁদের মনসাপূজা প্রত্যাখ্যান আসলে উচ্চবর্ণীয় সমাজের লোকদেবতার প্রতি অবজ্ঞার প্রতীক।

অন্যদিকে মনসার জয় নিম্নবর্গীয় সংস্কৃতির সামাজিক স্বীকৃতির প্রতীক।


বেহুলা : বাংলা সাহিত্যের চিরন্তন নারী

মনসামঙ্গলের সবচেয়ে উজ্জ্বল চরিত্র বেহুলা। তিনি শুধু পতিব্রতা স্ত্রী নন, তিনি সংগ্রামী নারীশক্তির প্রতীক।

মৃত স্বামী লখিন্দরকে নিয়ে ভাসতে ভাসতে তিনি দেবলোক পর্যন্ত পৌঁছে যান। তাঁর প্রেম, ধৈর্য, ত্যাগ ও মানসিক শক্তি বাংলা সাহিত্যে এক চিরন্তন আদর্শ নির্মাণ করেছে।

বেহুলা চরিত্রের মধ্যে—

  • প্রেম,
  • প্রতিবাদ,
  • আত্মত্যাগ,
  • সহিষ্ণুতা,
  • মানবিকতা
    একত্রিত হয়েছে।

সমালোচকদের মতে, বেহুলাই বাংলা সাহিত্যের প্রথম পূর্ণাঙ্গ ট্র্যাজিক নারীচরিত্র।


★ মনসামঙ্গলের কবি কেতকাদাস ক্ষেমানন্দ :

★ কবিকথা :

চৈতন্যোত্তর যুগের কবি ক্ষেমানন্দ কায়স্থ বংশের সন্তান। তাঁর রচনার মধ্যে সে-কথা উল্লেখ আছে—

“ক্ষেমানন্দের বাণী রক্ষ ঠাকুরানী / যতেক কায়স্থ আছে।”


কেতকাদাস ক্ষেমানন্দ : জীবন ও সাহিত্য

ক্ষেমানন্দ ছিলেন সপ্তদশ শতকের অন্যতম প্রধান মনসামঙ্গল কবি। তিনি পশ্চিমবঙ্গের কবি এবং মনসামঙ্গল ধারাকে নতুন জীবনদান করেছিলেন।

তাঁর রচনায় বৈষ্ণব ভাবধারা, লোকজ জীবন এবং মানবিক আবেগের অপূর্ব সমন্বয় দেখা যায়।


★ কাব্য রচনাকাল :

পঞ্চদশ শতাব্দী থেকে মনসামঙ্গলের পুঁথিগুলি আবিষ্কৃত হতে থাকে। বিজয়গুপ্ত, নারায়ণদেব, বিপ্রদাস প্রমুখ এই সময়ের উল্লেখযোগ্য নাম। আর সপ্তদশ শতকে এই কাব্যধারাকে যিনি সঞ্জীবিত করেছিলেন, তিনি কেতকাদাস ক্ষেমানন্দ।

ক্ষেমানন্দ পশ্চিমবঙ্গের কবি। এবং তিনি সর্বশ্রেষ্ঠ মনসাকাব্য রচয়িতা। তাঁর কাব্যের নাম ‘পদ্মপুরাণ’।


মনসামঙ্গল কাব্যের অন্যান্য কবি

মনসামঙ্গল কাব্যের বিকাশে আরও যাঁরা গুরুত্বপূর্ণ—

  • বিজয়গুপ্ত
  • বিপ্রদাস পিপলাই
  • নারায়ণ দেব
  • দ্বিজ বংশীদাস

প্রত্যেক কবিই মনসার কাহিনিকে নিজস্ব আঙ্গিকে রূপ দিয়েছেন।


*ক্ষেমানন্দের কাব্যের বিষয়বস্তু :

প্রায় সব মনসামঙ্গলের প্রথাকে মান্যতা দিয়েই ক্ষেমানন্দ তাঁর কাব্যকাহিনিকে বিন্যস্ত করেছেন। যেমন —

১) মনসার জন্মরহস্য ও চণ্ডীর প্রহার

২) রাখালদের পূজা ও দেবীর বরদান।

৩) চাঁদকে স্বপ্নাদেশ ও চাঁদের প্রত্যাখ্যান

৪) বাণিজ্যতরী নিমজ্জন ও চাঁদের সন্তানদের অপমৃত্যু।

৫) বেহুলা ও লখিন্দরের অলৌকিক মৃত্যু।

৬) বেহুলার ভাসান ও লখিন্দরের জীবনলাভ।

৭) চাঁদের পূজাদান ও মনসার মাহাত্ম্য প্রচার।

ক্ষেমানন্দের কাহিনিতে বেহুলা চরিত্রটিকে জীবন্ত রূপে পরিবেশন করা হয়েছে। বেহুলা চরিত্রটি সৃষ্টিতেই এই কবির কৃতিত্বই সর্বাধিক।


বেহুলা-লখিন্দর উপাখ্যানের সাংস্কৃতিক গুরুত্ব

বেহুলা-লখিন্দরের কাহিনি বাংলা সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ।
লোকগান, যাত্রা, পালাগান, পটচিত্র, মৃৎশিল্প, নাটক, সিনেমা—সব ক্ষেত্রেই এই কাহিনির প্রভাব দেখা যায়।

বাংলার লোকশিল্পে বেহুলার ভাসান এক অত্যন্ত জনপ্রিয় বিষয়।


★ক্ষেমানন্দের কাব্য-প্রতিভার পরিচয় :

১) কবি সুপণ্ডিত। তাঁর কাব্যে বাংলার নিখুঁত ভৌগোলিক পরিচয় মেলে।

২) পশ্চিমবঙ্গের নদ-নদী, পাক-পাখালি, পথ-ঘাটের এমন বর্ণনা তাঁর কাব্যের চিত্রগুণকে উজ্জ্বল করে তুলেছে।

৩) কৌতুক রস সৃষ্টিতে তিনি যেমন পারদর্শী, তেমনি করুণরস সৃজনেও সফল।

৪) কবির ভাষা মেদহীন, সুমার্জিত, অলংকরণে পরিশীলিত।

৫) তাঁর কাব্যে চৈতন্যের প্রেম-ভক্তি ও অহিংস ভাবের প্রভাব বিশেষ ভাবেই লক্ষিত হয়।


ক্ষেমানন্দের ভাষা ও শিল্পরীতি : সমালোচনামূলক আলোচনা

ক্ষেমানন্দের ভাষা সহজ অথচ কাব্যময়। তাঁর বর্ণনাশক্তি অত্যন্ত শক্তিশালী। প্রকৃতিচিত্র, নদীপথ, গ্রামবাংলার পরিবেশ—সবকিছু তিনি জীবন্ত করে তুলেছেন।

তাঁর কাব্যের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য—

  • বাস্তবধর্মিতা
  • নাটকীয়তা
  • সংগীতধর্মিতা
  • সংলাপের প্রাণবন্ততা
  • আবেগের গভীরতা
  • লোকজ শব্দের ব্যবহার

করুণরস সৃষ্টিতে তিনি বিশেষ কৃতিত্ব দেখিয়েছেন। বেহুলার শোক, চাঁদের গর্বভঙ্গ, লখিন্দরের মৃত্যু—সব ক্ষেত্রেই পাঠকের আবেগ গভীরভাবে স্পর্শিত হয়।


মনসামঙ্গল কাব্যের সাহিত্যিক গুরুত্ব

মনসামঙ্গল বাংলা সাহিত্যের এক অমূল্য সম্পদ। এর গুরুত্ব বহুমাত্রিক—

১. লোকসংস্কৃতির দলিল

বাংলার লোকবিশ্বাস, আচার, ধর্মীয় সংস্কৃতি এতে সংরক্ষিত হয়েছে।

২. নারীচরিত্রের বিকাশ

বেহুলা বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ নারীচরিত্র।

৩. সমাজসংঘাতের প্রতিফলন

উচ্চবর্ণ ও নিম্নবর্গের সাংস্কৃতিক সংঘাত এতে প্রতিফলিত।

৪. বাস্তব জীবনচিত্র

বণিকসমাজ, নদীপথ, ব্যবসা-বাণিজ্য, পারিবারিক জীবন—সব ফুটে উঠেছে।

৫. বাংলা ভাষার বিকাশ

মঙ্গলকাব্য বাংলা ভাষাকে সমৃদ্ধ করেছে এবং আখ্যানকাব্যের ভিত গড়ে তুলেছে।


উপসংহার

মনসামঙ্গল কাব্য মধ্যযুগীয় বাংলা সাহিত্যের এক অসাধারণ সৃষ্টি। এটি কেবল দেবীর মাহাত্ম্যকীর্তন নয়; বরং বাঙালির জীবনসংগ্রাম, বিশ্বাস, প্রেম, প্রতিবাদ ও মানবিকতার কাব্য।

চাঁদ সদাগরের অহংকার, মনসার প্রতিশোধ, বেহুলার প্রেম ও ত্যাগ—সব মিলিয়ে এই কাব্য বাংলা সাহিত্যে এক চিরন্তন মহিমা লাভ করেছে।

।। চন্ডীমঙ্গল কাব্য ।।

প্রশ্ন – চন্ডীমঙ্গল কাব্যের পরিচয় ও এই ধারার শ্রেষ্ঠ কবির কাব্যপ্রতিভা সম্পর্কে যা জানো লেখো।

উত্তর –

*চন্ডী পূজা প্রচলিত হওয়ার কারণ :

বৃন্দাবন দাস তাঁর ‘চৈতন্যভাগবত’ গ্রন্থে বলেছিলেন—

“ধৰ্ম-কৰ্ম লোকে সভে এইমাত্র জানে / মঙ্গলে চণ্ডীর গীত করে জাগরনে”।

দেবী চণ্ডী বাংলা লোক সমাজে বহু চর্চিত এবং পূজিতা দেবী। মার্কণ্ডেয় পুরাণে এই দেবীর পরিচয় পাওয়া যায়। ওরাওঁ নামে প্রোটো-অস্ট্রালয়েড গোষ্ঠীর অনার্য উপজাতির মধ্যে চণ্ডী নামে শক্তিদেবীর পূজা প্রচলিত। ছোট নাগপুরের বিরহোর জাতির মধ্যে তাদের অধিষ্ঠাত্রী দেবী চণ্ডীবোঙার উল্লেখ পাওয়া যায়।

পুরাণে যে দেবী চণ্ডীর কথা পাওয়া যায়, তার সঙ্গে লৌকিক চণ্ডীর কোনো সাদৃশ্য নেই।

চন্ডীমঙ্গলের চন্ডী হলেন—

ক) লৌকিক দেবী
খ) তিনি পশু গণের মাতা বা ত্রাতা
গ) হারানো বস্তু উদ্ধারের দেবী।

সম্ভবত গৃহ মঙ্গল কামনায়, ধনসম্পত্তি প্রাপ্তির আকাঙ্ক্ষায়, শত্রু নিধনের অভীপ্সায়, এবং শান্তি প্রতিষ্ঠা ও দুঃসাধ্য কর্ম-সম্পাদনের অভিলাষে দেবী চণ্ডীর পুজো প্রচলিত।


চণ্ডীদেবীর উৎস ও লোকায়ত চরিত্র : বিস্তৃত আলোচনা

চণ্ডী বাংলা লোকবিশ্বাসের এক অত্যন্ত জনপ্রিয় শক্তিদেবী। যদিও পুরাণে চণ্ডীর উল্লেখ রয়েছে, তবুও বাংলার চণ্ডী মূলত লৌকিক দেবী।

গবেষকদের মতে, চণ্ডী মূলত উপজাতীয় সমাজের মাতৃদেবী ছিলেন। পরে ব্রাহ্মণ্য সংস্কৃতি তাঁকে দুর্গা বা শক্তিদেবীর রূপে আত্মসাৎ করে।

চণ্ডীমঙ্গল কাব্যে দেবী চণ্ডীর যে রূপ দেখা যায়, তা অত্যন্ত মানবিক ও বাস্তবধর্মী। তিনি—

  • মানুষের বিপদে সাহায্য করেন,
  • ধনসম্পদ দান করেন,
  • হারানো বস্তু ফিরিয়ে দেন,
  • পশুদের রক্ষা করেন,
  • এবং ভক্তদের জীবনে মঙ্গল সাধন করেন।

এই দেবীর মধ্যে মাতৃত্ব, শক্তি ও লোকবিশ্বাস একাকার হয়ে গেছে।


★ চন্ডী মঙ্গলের কাহিনি :

চন্ডীমঙ্গল কাব্যের কাহিনি দুটি ধারায় বিন্যস্ত। যথা—

১) আখেটিক বা ব্যাধখন্ড বা কালকেতু উপাখ্যান
২) বণিক খন্ড বা ধনপতি উপাখ্যান


১) আখেটিক খন্ড / ব্যাধ খণ্ড / কালকেতুর উপাখ্যান :

দেবী চণ্ডীর ইচ্ছানুসারে ইন্দ্র পুত্র নীলাম্বর এবং তাঁর পত্নী ছায়া মর্ত্য পৃথিবীতে জন্ম গ্রহণ করেন।

ধর্মকেতু ও নিদয়ার গৃহে কালকেতু জন্ম নেয়। যথাসময়ে ফুল্লরার সঙ্গে তার বিবাহ হয়। তাদের সংসার পশুশিকার করেই চলতে থাকে। আর মহান বীর কালকেতু পশুশিকারে ছিল বিশেষ দক্ষ।

কালকেতুর জন্য পশুদের জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছিল। তাই কালকেতুর হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য পশুরা সমবেতভাবে দেবী চণ্ডীর কাছে প্রার্থনা জানায়। এবং দেবী চণ্ডী তাদের প্রার্থনায় সাড়া দেন।

তিনি স্বর্ণগোধিকা রূপে কালকেতুকে ছলনা করেন। পরে অবশ্য দেবী তাঁর আত্মপরিচয় প্রদান করেন।

দেবী চণ্ডীর আশীর্বাদে কালকেতু ধনে-মানে স্ফীত হয়ে, গুজরাট নগর স্থাপন করে।

কিন্তু খলতার শিরোমণি ভাড়ুদত্তের ছলনায় ও প্রতারণায় গুজরাট নগরে দুর্যোগের মেঘ ঘনিয়ে আসে।

ভাড়ুর প্ররোচনায় কলিঙ্গরাজ গুজরাট নগর আক্রমণ করে। কালকেতু যুদ্ধে জয় লাভ করে, কিন্তু ভাড়ুর দুর্বুদ্ধিতে কলিঙ্গরাজের কাছে কালকেতু বন্দি হয়।

অবশেষে দেবী চণ্ডী কলিঙ্গরাজকে স্বপ্নাদেশ দিলে কালকেতু মুক্তি পায়।

অতঃপর পুত্র পুষ্পকেতুকে রাজ্যভার অর্পণ করে কালকেতু ও ফুল্লরা, অর্থাৎ নীলাম্বর ও ছায়া স্বর্গে প্রত্যাবর্তন করে।


কালকেতু উপাখ্যানের তাৎপর্য

কালকেতুর কাহিনি মূলত এক সাধারণ শিকারির উত্থানের কাহিনি। দেবীর কৃপায় সে রাজশক্তির অধিকারী হয়।

এই উপাখ্যানের মধ্যে দেখা যায়—

  • নিম্নবর্গীয় মানুষের সামাজিক উত্থান,
  • দেবীর করুণার মাহাত্ম্য,
  • এবং ভাগ্যপরিবর্তনের স্বপ্ন।

এখানে কালকেতু কেবল একজন ব্যক্তি নয়; তিনি মধ্যযুগীয় সমাজে অবহেলিত মানুষের প্রতিনিধি।


ফুল্লরা চরিত্রের মূল্যায়ন

ফুল্লরা বাংলা সাহিত্যের অন্যতম বাস্তবধর্মী নারীচরিত্র। তিনি—

  • সংসারী,
  • প্রেমময়ী,
  • দুঃখসহিষ্ণু,
  • এবং বুদ্ধিমতী।

মুকুন্দ চক্রবর্তী ফুল্লরার মুখ দিয়ে যে বারোমাস্যা রচনা করেছেন, তা বাংলা সাহিত্যের অমূল্য সম্পদ।

ফুল্লরার বারোমাস্যায় মধ্যযুগীয় দরিদ্র নারীর জীবনসংগ্রাম, অভাব, বেদনা ও প্রেম অত্যন্ত বাস্তবভাবে ফুটে উঠেছে।


ভাড়ুদত্ত : বাংলা সাহিত্যের প্রথম বাস্তব খলচরিত্র

ভাড়ুদত্ত চরিত্রটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি চতুর, প্রতারক, স্বার্থপর এবং ক্ষমতালোভী।

সমালোচকদের মতে, বাংলা সাহিত্যের অন্যতম সফল বাস্তবধর্মী খলচরিত্র হল ভাড়ুদত্ত।


২) বণিক খণ্ড / ধনপতি উপাখ্যান :

শৈব উপাসক উজানি নগরের বণিক ধনপতি ছিলেন নিঃসন্তান। তিনি ছিলেন ভীষণ ভাবেই চণ্ডী বিদ্বেষী।

প্রথমা পত্নী লহনা থাকতেও তিনি খুল্লনাকে বিবাহ করেন।

রাজার নির্দেশে পত্নীকে রেখে তিনি একদিন বাণিজ্য-যাত্রা করেন।

এই সুযোগে দাসী দুর্বলার কু-মন্ত্রণায় লহনা সতীন খুল্লনাকে ছলনা করে বনে পাঠায়।

উদ্দেশ্য ছিল, খুল্লনার যৌবনধর্ম নষ্ট করা। কেননা, খুল্লনা অপগত যৌবন হলে ধনপতি লহনাকে সাদরে গ্রহণ করবেন।

ইতিমধ্যে বনপথে খুল্লনার ‘সর্বশী’ নামের ছাগল হারিয়ে গেলে খুল্লনা দেবী চণ্ডীর শরণাগত হয় ; এবং দেবীর কৃপায় তার হারানো ধন পুনরুদ্ধার হয়।

দেবীর নির্দেশে চণ্ডীর ঘট প্রতিষ্ঠা করে খুল্লনা। সেই প্রতিষ্ঠিত ঘটে পদাঘাত করেন ধনপতি। দেবী হন রুষ্টা।

অতঃপর, সিংহল বাণিজ্য-যাত্রাকালে দেবীর ছলনায় ধনপতি ‘কমলে কামিনী’ দেখেন।

সেই দৃশ্য সিংহলরাজকে দেখানোর অঙ্গীকার করে ব্যর্থ হলে, সিংহলরাজ তাকে বন্দি করেন।

ইতোমধ্যে খুল্লনার পুত্র-সন্তান হলে, ধনপতির ইচ্ছানুসারে তার নাম রাখা হয় শ্রীমন্ত।

পরিণত শ্রীমন্ত একদিন পিতাকে খুঁজতে সমুদ্র-যাত্রা করলে, সে-ও ‘কমলে কামিনী’ দেখে।

এবার সে-ও সিংহলরাজকে সেই অলৌকিক দৃশ্য দেখাতে ব্যর্থ হয়, এবং বন্দিত্ব প্রাপ্ত হয়।

অবশেষে দেবীর কৃপায় ধনপতি ও শ্রীমন্ত মুক্তি পায়।

রাজকন্যা সুশীলার সঙ্গে শ্রীমন্তর বিবাহ হয়। পিতা-পুত্র প্রত্যাবর্তন করে উজানি নগরে।

তারপর মহা আয়োজনে চণ্ডীর পূজা প্রচারিত হয়।


ধনপতি উপাখ্যানের সামাজিক তাৎপর্য

ধনপতি উপাখ্যান মধ্যযুগীয় বণিকসমাজের জীবনচিত্র তুলে ধরে।

এখানে দেখা যায়—

  • সমুদ্রবাণিজ্য,
  • পারিবারিক দ্বন্দ্ব,
  • বহুবিবাহ,
  • নারীর অবস্থা,
  • ধর্মবিশ্বাস,
  • এবং সম্পদলোভী সমাজব্যবস্থা।

ধনপতির চণ্ডীবিদ্বেষ আসলে লোকদেবতার প্রতি উচ্চবর্ণীয় অহংকারের প্রতীক।


খুল্লনা চরিত্রের মূল্যায়ন

খুল্লনা বাংলা সাহিত্যের অন্যতম মর্মস্পর্শী নারীচরিত্র।

তিনি—

  • সহিষ্ণু,
  • ভক্তিমতী,
  • প্রেমময়ী,
  • এবং আত্মমর্যাদাসম্পন্ন।

লহনার অত্যাচার সহ্য করেও তিনি মানবিকতা হারান না।

খুল্লনার মধ্যে মধ্যযুগীয় বাঙালি নারীর দুঃখ, প্রেম ও সহিষ্ণুতার প্রতিফলন ঘটেছে।


* চণ্ডীমঙ্গল কাব্যধারার কবিগণ :

মাণিক দত্ত, দ্বিজ মাধব, মুকুন্দ চক্রবর্তী, দ্বিজ রামদেব প্রমুখ।


* চণ্ডীমঙ্গল কাব্যধারার শ্রেষ্ঠ কবি ও কাব্যের নাম :

মুকুন্দ চক্রবর্তী হলেন চণ্ডীমঙ্গল কাব্যধারার শ্রেষ্ঠ কবি।

তাঁর লেখা কাব্যের নাম ‘অভয়ামঙ্গল’।

এছাড়া ‘চণ্ডিকামঙ্গল’, ‘অম্বিকামঙ্গল’ নামও ব্যবহার করেছেন।


* কবির পরিচয় :

কবি মুকুন্দ চক্রবর্তী রচিত ‘অভয়ামঙ্গল’ কাব্যের ‘গ্রন্থোৎপত্তির কারণ’ শীর্ষক অংশে কবি যে আত্মপরিচয় দিয়েছেন, তা লক্ষ রাখলে যে তথ্যগুলো পাওয়া যায়, সেগুলি হল—

১) বর্ধমান জেলার দামুন্যা গ্রামে কবির সাত পুরুষের বাসস্থান।

২) কবির পিতা হৃদয় মিশ্র, এবং মাতা দৈবকী।

৩) ডিহিদার মাহমুদ শরীফের অত্যাচারে কবিরা ভিটে ত্যাগ করতে বাধ্য হন।

৪) বাঁকুড়া রায়ের পুত্র রঘুনাথ এর অনুরোধে কবি ‘অভয়ামঙ্গল’ কাব্য রচনা করেন।

৫) রঘুনাথ কবিকে ‘কবিকঙ্কন’ উপাধি প্রদান করেন।


মুকুন্দ চক্রবর্তী : জীবন ও সাহিত্যভাবনা

মুকুন্দ চক্রবর্তী বাংলা মধ্যযুগীয় সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ আখ্যানকার।

তাঁর কাব্যে—

  • বাস্তববাদ,
  • মানবচরিত্রের গভীর বিশ্লেষণ,
  • সমাজসচেতনতা,
  • এবং শিল্পিত কাহিনিবিন্যাস
    অসাধারণ দক্ষতায় প্রকাশ পেয়েছে।

অনেক সমালোচক তাঁকে বাংলা সাহিত্যের প্রথম ঔপন্যাসিকসুলভ কবি বলে মনে করেন।


*কাব্যের রচনাকাল :

কবির আত্মপরিচয় থেকে জানা যায়, মানসিংহের বঙ্গ শাসনকালে এই কাব্য রচিত হয়।

কাব্যের রচনাকাল উল্লেখ করতে গিয়ে ড. সুকুমার সেন জানান ১৫৮৪ খ্রিঃ এই কাব্য সমাপ্ত হয়।

ড. আশুতোষ ভট্টাচার্য জানান, ১৫৯৪ খ্রিঃ থেকে ১৬০০ খ্রিঃ মধ্যে কাব্যটি রচিত।

সুতরাং, বলা যায় ষোড়শ শতকের শেষ দিকে কাব্যটি রচিত।


* কবিপ্রতিভা :

অধ্যাপক শ্রীকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় কবি মুকুন্দ চক্রবর্তীর কবিত্বের প্রশংসা করতে গিয়ে বলেছিলেন—

“এ যুগে জন্ম গ্রহণ করিলে তিনি কবি না হইয়া ঔপন্যাসিক হইতেন”।

এই বক্তব্যের মধ্যেই মুকুন্দ চক্রবর্তীর কবি প্রতিভার সম্যক পরিচয় পাওয়া যায়।

আসলে তার কাব্যের মধ্যেই কথাশিল্পের মেজাজটি লক্ষিত। যেমন—

১) বাস্তব চিত্র উপস্থাপন করার কুশলী কৃতিত্ব।

২) চরিত্র সৃষ্টিতে অসামান্য দক্ষতা।

৩) ঘটনা বিন্যাসের শিল্প কারুকার্য।

৪) চরিত্রের অন্তর্দ্বন্দ্ব উদঘাটনের কৃতিত্ব।

৫) জীবনকে দেখার বহুকৌণিক দৃষ্টিভঙ্গি।

৬) সমকালীন সামাজিক রাজনৈতিক ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটকে বর্ণনার স্বাভাবিক গুণ।


মুকুন্দ চক্রবর্তীর কাব্যশিল্প : বিস্তৃত সমালোচনা

মুকুন্দ চক্রবর্তীর কাব্যের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হল তাঁর বাস্তবধর্মিতা।

তিনি দেবতার আড়ালে মানুষের জীবনকে তুলে ধরেছেন।

তাঁর কাব্যে—

  • দরিদ্র মানুষের অভাব,
  • নারীর দুঃখ,
  • সমাজের বৈষম্য,
  • ক্ষমতার রাজনীতি,
  • পারিবারিক টানাপোড়েন
    অত্যন্ত বাস্তবভাবে চিত্রিত হয়েছে।

তাঁর সংলাপ অত্যন্ত জীবন্ত ও নাটকীয়। চরিত্রগুলিও রক্তমাংসের মানুষের মতো।


চণ্ডীমঙ্গল কাব্যের সাহিত্যিক গুরুত্ব

১. বাস্তবধর্মী সমাজচিত্র

মধ্যযুগীয় বাংলার বাস্তব জীবন এতে প্রতিফলিত।

২. শক্তিশালী নারীচরিত্র

ফুল্লরা, খুল্লনা, লহনা—সব চরিত্রই জীবন্ত।

৩. লোকসংস্কৃতির সংরক্ষণ

বাংলার লোকবিশ্বাস ও আচার এতে রক্ষিত হয়েছে।

৪. চরিত্রসৃষ্টির সার্থকতা

ভাড়ুদত্ত বাংলা সাহিত্যের অন্যতম সফল খলচরিত্র।

৫. আখ্যানশিল্পের উৎকর্ষ

ঘটনা বিন্যাস ও নাটকীয়তা অত্যন্ত উন্নত।


উপসংহার

চণ্ডীমঙ্গল কাব্য বাংলা সাহিত্যের এক অনন্য সৃষ্টি। দেবীমাহাত্ম্যের আড়ালে এখানে মধ্যযুগীয় সমাজ, মানুষ, প্রেম, লোভ, বিশ্বাস ও সংগ্রামের এক বাস্তব জগৎ নির্মিত হয়েছে।

কালকেতুর উত্থান, ফুল্লরার বেদনা, ধনপতির অহংকার, খুল্লনার সহিষ্ণুতা এবং চণ্ডীর করুণা—সব মিলিয়ে এই কাব্য বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে এক চিরস্থায়ী মহিমা লাভ করেছে।

।।ধর্মমঙ্গল।।

প্রঃ ধর্মমঙ্গল কাব্যের কাহিনি উল্লেখ করে শ্রেষ্ঠ কবির পরিচয় দাও।

উঃ

* ধর্মপূজা প্রচলিত হওয়ার কারণ :

ধর্মঠাকুর মূলত অনার্য দেবতা। তাঁর পুজো পশ্চিমবঙ্গের রাঢ় অঞ্চলের অধিবাসীদের মধ্যে ব্যাপক প্রচলিত। সমাজের নিম্নবর্গের মানুষ, যেমন ডোম, কৈবর্ত, বাগদি শ্রেণির মানুষেরাই ধর্মঠাকুরের পুরোহিত।

ধর্মঠাকুরের কোনো মূর্তি নেই। তিনি নিরাকার শিলা-বিগ্রহ ; কিন্তু বিষ্ণুর খড়মের চিহ্ন রেখে তাঁকে পুজো করা হয়। ধর্মের বাহন হলো ঘোড়া। মূলত কুষ্ঠ রোগ দূরীকরণের উদ্দেশ্যে ধর্ম ঠাকুরের পুজো করা হয়।


ধর্মঠাকুর : উৎস, পরিচয় ও লোকবিশ্বাস

ধর্মঠাকুর বাংলা লোকধর্মের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দেবতা। বিশেষত রাঢ়বাংলার গ্রামীণ সমাজে তাঁর পূজা অত্যন্ত জনপ্রিয় ছিল। গবেষকদের মতে, ধর্মঠাকুর মূলত অনার্য জনগোষ্ঠীর দেবতা; পরবর্তীকালে ব্রাহ্মণ্য সংস্কৃতির প্রভাবে তিনি হিন্দুধর্মের দেবমণ্ডলীতে স্থান লাভ করেন।

ধর্মঠাকুরের পূজার মধ্যে এক আশ্চর্য সমন্বয় দেখা যায়—

  • বৌদ্ধ ধর্মচেতনা,
  • শৈব প্রভাব,
  • বৈষ্ণব ভাবধারা,
  • এবং লোকবিশ্বাস।

অনেক গবেষক মনে করেন, ‘ধর্ম’ শব্দটি বৌদ্ধ ‘ধর্ম’ ধারণার সঙ্গে সম্পর্কিত। আবার কেউ কেউ মনে করেন, তিনি মূলত সূর্যদেবতার এক লৌকিক রূপ।

ধর্মঠাকুরের পূজায় মূর্তির পরিবর্তে শিলাখণ্ড ব্যবহৃত হওয়া তাঁর আদি লোকায়ত চরিত্রের প্রমাণ বহন করে।


* ধর্মমঙ্গল কাব্যের পরিচয় :

ধর্মমঙ্গল কাব্যের দুটি কাহিনি প্রচলিত। যথা—

১) হরিশ্চন্দ্রের কাহিনি
২) লাউসেনের কাহিনি


১) হরিশ্চন্দ্রের কাহিনি :

এই কাহিনি হরিশ্চন্দ্র ও তাঁর পত্নী মদনাকে অবলম্বন করে রচিত হয়েছে। যার মূল উদ্দেশ্যই ছিল মাহাত্ম্য কীর্তন।

ধর্মঠাকুরের করেই রাজা হরিশ্চন্দ্র পুত্র মুখ দর্শনের সৌভাগ্য অর্জন করেছিলেন ; কিন্তু শর্ত ছিল সেই পুত্রকে ধর্মের ইচ্ছানুসারে রাজার সমর্পণ করতে হবে।

রাজপুত্র লুই ধর কৈশোরের দিনগুলোতে যখন সৌন্দর্যের দ্যুতি ছড়িয়ে বেড়ে উঠছে, তখন একদিন ধর্ম এলেন পরীক্ষা নিতে। পূর্ব শর্তানুযায়ী তিনি রাজাকে বললেন, পুত্র লুই ধরকে ধর্মের উদ্দেশ্যে বলি দিতে হবে।

হরিশ্চন্দ্র সেই অঙ্গীকার রক্ষা করলেন। ধর্মঠাকুর রাজার সত্য রক্ষার দায়বদ্ধতা দেখে খুশি হলেন ; এবং মৃত পুত্রের প্রাণ দান করলেন।


হরিশ্চন্দ্র উপাখ্যানের তাৎপর্য

হরিশ্চন্দ্রের কাহিনি মূলত সত্যনিষ্ঠা ও ধর্মবিশ্বাসের কাহিনি। এখানে রাজা হরিশ্চন্দ্র ভারতীয় নৈতিক আদর্শের প্রতীক।

এই আখ্যানের মাধ্যমে কবি দেখাতে চেয়েছেন—

  • ধর্মের প্রতি অটল বিশ্বাস,
  • সত্যের জন্য আত্মত্যাগ,
  • এবং দেবতার করুণা।

এখানে ধর্মঠাকুর কেবল অলৌকিক শক্তির অধিকারী নন, তিনি নৈতিকতারও প্রতীক।


২) লাউসেনের কাহিনি :

ক) রঞ্জাবতীর পুত্রসন্তান লাভ :

বৃদ্ধ কর্ণসেনের সঙ্গে রঞ্জাবতীর বিবাহ হয়েছিল গৌড়েশ্বরের অনুমতি নিয়েই। কিন্তু রঞ্জাবতীর ভাই মহামদ এই বিবাহকে মেনে নেননি ; এবং রঞ্জাবতীকে লাঞ্ছনা করতেও সে দ্বিধা করে না।

এই অপমানের প্রতিশোধ নিতে রঞ্জাবতী ধর্মঠাকুরের নাম করে তপস্যা করে, এবং পুত্র সন্তান লাভ করে। এই পুত্রই হলো লাউসেন।


খ) লাউসেনের বীরত্ব ও পারদর্শিতা :

শাস্ত্র ও অস্ত্রবিদ্যায় লাউসেন অল্পকালেই পারদর্শী হয়ে ওঠেন। তারপর পরিণত লাউসেন একদিন গৌড়ের পথে যাত্রা করে। এবং নানা বাধা-বিঘ্ন অতিক্রম করে নিজেকে ধর্মের মানসপুত্র রূপে প্রতিষ্ঠা করে।


গ) লাউসেনের বিরুদ্ধে চক্রান্ত :

মহামদের চক্রান্তে গৌড়ে পৌঁছনো মাত্র লাউসেন বন্দি হয়। তবে খুব শীঘ্রই সে বাহুবল দেখিয়ে গৌড়েশ্বরকে খুশি করে কারামুক্ত হয়। সঙ্গে লাভ করে ময়নাগড়ের ইজারা।


ঘ) কামরূপরাজ দমন :

মহামদের চক্রান্তে গৌড়েশ্বর লাউসেনকে কামরূপরাজ দমনের জন্য প্রেরণ করলেন। মহামদ নিশ্চিত ছিল যে, এই যুদ্ধে লাউসেনের মৃত্যু অনিবার্য।

কিন্তু কামরূপরাজকে অনায়াসে দমন করে লাউসেন রাজকন্যা কলিঙ্গাকে লাভ করে।


ঙ) ইছাই ঘোষের সঙ্গে লড়াই :

ইছাই ঘোষ চণ্ডীর বরে ছিল অপরাজেয় ও পূর্ণ জীবন লাভের অধিকারী। লাউসেন তাকে পরাজিত ও হত্যা করে।


চ) লাউসেনের গভীর তপস্যায় পশ্চিমে সূর্যোদয় :

নিজের মানসপুত্র স্বরূপ মহিমাকে প্রতিষ্ঠার জন্য ধর্মঠাকুরের কাছে লাউসেন তপস্যা করে এবং পশ্চিমে সূর্যোদয় ঘটায়।


ছ) লাউসেনের স্বর্গারোহণ :

মহামদ লাউসেনের তপস্যার সময় ময়নাগড় আক্রমণ করে। কিন্তু বীরাঙ্গনা কলিঙ্গের কৌশলে সেই আক্রমণ ব্যর্থ হয়।

তারপর মহামদ কুষ্ঠ রোগে আক্রান্ত হয়। এবারেও লাউসেনের প্রার্থনায় মহামদ আরোগ্য লাভ করে। তারপরে লাউসেন স্বর্গারোহণ করে।


লাউসেন চরিত্রের মূল্যায়ন

লাউসেন ধর্মমঙ্গল কাব্যের প্রধান নায়ক। তিনি মধ্যযুগীয় বীরপুরুষের আদর্শরূপ।

তাঁর চরিত্রে দেখা যায়—

  • বীরত্ব,
  • নৈতিকতা,
  • ধর্মবিশ্বাস,
  • ক্ষমাশীলতা,
  • আত্মত্যাগ।

তিনি শুধু যোদ্ধা নন; তিনি ধর্মপ্রচারক, মানবদরদী ও ন্যায়রক্ষক।

লাউসেন চরিত্রের মাধ্যমে কবি আদর্শ মানবিক গুণাবলির প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছেন।


কলিঙ্গা : মধ্যযুগীয় সাহিত্যের অসামান্য নারীচরিত্র

ধর্মমঙ্গলে কলিঙ্গা চরিত্রটি অত্যন্ত উজ্জ্বল। তিনি কেবল রাজকন্যা নন; তিনি বুদ্ধিমতী, বীরাঙ্গনা এবং কৌশলী নারী।

ময়নাগড় রক্ষার সময় তাঁর বীরত্ব মধ্যযুগীয় বাংলা সাহিত্যে বিশেষভাবে স্মরণীয়।

বাংলা সাহিত্যে নারীর শক্তিশালী রূপ নির্মাণে ধর্মমঙ্গলের অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।


* ধর্মমঙ্গল কাব্যের শ্রেষ্ঠ কবি :

ধর্মমঙ্গল কাব্যের শ্রেষ্ঠ কবি ঘনরাম চক্রবর্তী। তিনি বর্ধমানের কৃষ্ণপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।

পিতা – গৌরীকান্ত ; মাতা – সীতাদেবী।

কবি বর্ধমানের মহারাজা কীর্তিচন্দ্রের পৃষ্টপোষকতা লাভ করেছিলেন।

ধর্মমঙ্গল ছাড়াও কবি লিখেছিলেন ‘সত্যনারায়ণের পাঁচালি’।

অনুমান করা হয়, কবির কাব্য রচনাকাল ১৭১১ খ্রিঃ।

কাব্য প্রতিভার জন্য তিনি লাভ করেছিলেন ‘কবিরত্ন’ উপাধি।

ঘনরামের ধর্মমঙ্গল কাব্যের নাম ‘অনাদিমঙ্গল’। তবে কাব্যটি ‘শ্রীধর্মসঙ্গীত’ এবং ‘মধুরভারতী’ নামেও পরিচিত।


ঘনরাম চক্রবর্তী : জীবন ও সাহিত্যভাবনা

ঘনরাম ছিলেন মধ্যযুগীয় বাংলা সাহিত্যের অন্যতম পণ্ডিত কবি। তাঁর কাব্যে লোকজ উপাদান ও সংস্কৃতজ্ঞানের চমৎকার সমন্বয় দেখা যায়।

তিনি শুধু দেবমাহাত্ম্য প্রচার করেননি; বরং সমাজ, ইতিহাস ও মানুষের জীবনকেও কাব্যের অন্তর্ভুক্ত করেছেন।


* কবিপ্রতিভা :

১) ধর্মমঙ্গল একান্তভাবেই কবির আঞ্চলিক কাব্য। কিন্তু ঘনরাম তাঁর কাব্যকে মহাকাব্যোচিত বিশালতা দান করতে চেয়েছিলেন। এবং সেই অনুযায়ী লাউসেনের মধ্য দিয়ে বীরত্বের আদর্শ, অনমনীয় পৌরুষ ও উচ্চ নৈতিকতাকে ব্যক্ত করেছেন।

২) কবির রচনাভঙ্গি সংস্কৃত প্রধান ও মার্জিত। পাণ্ডিত্য ও মেধার মিলনে তাই এই কাব্য গ্রাম্যতা দোষ থেকে মুক্ত হয়েছে।

৩) চরিত্র বর্ণনায় ঘনরামের কৃতিত্ব অনস্বীকার্য। নারীর বীরত্ব বর্ণনায় তাঁর পরিবেশনগুণ অভাবনীয়। কলিঙ্গা, কানাড়ার মতো নারী সমগ্র মধ্যযুগে আর কোনো কাব্যে নেই।

৪) ধর্মঠাকুরের মহিমা কীর্তন করলেও তাঁর কাব্যে রামভক্তি ও চৈতন্যভক্তির পরিচয় পাওয়া যায়। উদার মনুষ্যত্বের ধারণাও কবি তাঁর কাব্যে বিশেষ ভাবে প্রচার করেছেন।

৫) তাঁর কাব্যে রাঢ় বাংলার ইতিহাস, ভূগোল, লোকসংস্কৃতির অভিজ্ঞতা বিশেষ ভাবেই লক্ষ্য করা যায়।

৬) ঘনরাম শব্দ নির্বাচন যেমন কৌশলী, তেমনি বুদ্ধিদীপ্ত। তা ছন্দ-অলংকারের বন্ধনে পরিশীলিত। এই দিক থেকে তিনি আধুনিকপন্থী। তবে কাব্যের কোথাও কোথাও তাঁর পাণ্ডিত্য সামান্য হলেও উগ্রভাবে প্রকাশিত – এ কথা মানতেই হয়।


ঘনরামের কাব্যশিল্প : বিস্তৃত মূল্যায়ন

ঘনরাম চক্রবর্তীর কাব্যে মহাকাব্যিক গাম্ভীর্য রয়েছে। তিনি আঞ্চলিক কাহিনিকে জাতীয় মর্যাদা দিতে চেয়েছিলেন।

তাঁর কাব্যের বিশেষ বৈশিষ্ট্য—

  • দীর্ঘ কাহিনির দক্ষ বিন্যাস
  • যুদ্ধবর্ণনার নাটকীয়তা
  • চরিত্রের মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ
  • রাঢ়বাংলার বাস্তব জীবনচিত্র
  • ভাষার মার্জিত ব্যবহার

তিনি মধ্যযুগীয় বাংলা কাব্যে বীররসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ স্রষ্টা।


* ধর্মমঙ্গল কাব্য রাঢ়ের জাতীয় কাব্য :

ধর্মমঙ্গল কাব্যের কাহিনি ও চরিত্রগত বিন্যাস এতো বিস্তৃত এবং এতো অসংখ্য ঘটনার ঘনঘটায় আবৃত যে, এ কাব্যকে রাঢ়ের জাতীয় কাব্য বলা যায়।

মহাকাব্যের মতো স্বর্গ-মর্ত্য-পাতাল ব্যাপী কাহিনি প্রসারিত হয়েছে। এখানেও অধর্মের পরাজয় এবং ধর্মের বিজয় ঘোষিত হয়েছে।

এছাড়া মহাকাব্যের মতো এখানেও অঙ্গীরস হিসেবে প্রাধান্য পেয়েছে বীররস।

মহাকাব্যের নায়ক হন বীর্যবান, শক্তিশালী পুরুষ। এ কাব্যের নায়ক লাউসেনও তাই।

মহাকাব্যের মতো এ কাব্যেও অসংখ্য চরিত্র, ঘটনা, শাখাকাহিনি লক্ষিত হয়। ফলে অনেকেই এই কাব্যকে রাঢ়ের মহাকাব্য রূপে চিহ্নিত করতে চেয়েছেন।

কিন্তু মহাকাব্যের মধ্যে যে vastness এবং synthesis থাকে, যে সমুন্নত জাতীয় দর্শন থাকে – তা এই কাব্যের মধ্যে সর্বাংশে নেই বলে আমরা কাব্যটিকে ‘মহাকাব্য’ না বলে মহাকাব্যোপম বলতে পারি।


ধর্মমঙ্গল কাব্যের সাহিত্যিক গুরুত্ব

ধর্মমঙ্গল বাংলা সাহিত্যে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ—

১. রাঢ়বাংলার ইতিহাসের দলিল

এতে রাঢ় অঞ্চলের সমাজ ও সংস্কৃতি সংরক্ষিত হয়েছে।

২. বীররসের সার্থক প্রকাশ

লাউসেন বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ বীরচরিত্র।

৩. নারীচরিত্রের শক্তিশালী উপস্থাপন

কলিঙ্গা ও কানাড়ার চরিত্র অসামান্য।

৪. লোকধর্মের প্রতিষ্ঠা

ধর্মঠাকুরের মাহাত্ম্য প্রচারিত হয়েছে।

৫. মহাকাব্যিক বিস্তার

ঘটনা, চরিত্র ও আখ্যানের বিশালতা কাব্যটিকে অনন্য করেছে।


উপসংহার

ধর্মমঙ্গল কাব্য বাংলা মধ্যযুগীয় সাহিত্যের এক বিশাল সৃষ্টি। এতে লোকধর্ম, বীরত্ব, মানবিকতা, নৈতিকতা ও আঞ্চলিক ইতিহাস একসূত্রে গাঁথা হয়েছে।

লাউসেনের বীরত্ব, কলিঙ্গার প্রজ্ঞা, ধর্মঠাকুরের মাহাত্ম্য এবং রাঢ়বাংলার লোকজ জীবনচিত্র—সব মিলিয়ে ধর্মমঙ্গল বাংলা সাহিত্যে এক মহিমান্বিত স্থান অধিকার করে আছে।

।। অন্নদামঙ্গল ।।

প্রঃ কবি ভারতচন্দ্র ও তাঁর কাব্যগুলির পরিচয় দাও। তাঁর শ্রেষ্ঠ কাব্য সম্পর্কে যা জানো লেখো।

উঃ

* অষ্টাদশ শতকের যুগ-বৈশিষ্ট্য :

দু-একটি ব্যতিক্রমী প্রয়াস ব্যতীত মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যে দেবমহিমার আড়ালে মানবিক কণ্ঠস্বর প্রায় শোনাই যায় না। তবে অষ্টাদশ শতকে মানব পৃথিবীর গভীর গভীরতর অসুখটি গাঢ় ভাবে উপলব্ধির সীমায় ধরা পড়ে। আর সে যুগ মনীষীদের মহান অবদানে আমলকির মতো নিরাময়ের বার্তাও বহন করে আনেনি। সত্যিই সেদিন বঙ্গ-মানচিত্র জুড়ে ‘কালো শিরার অসুখ’ দেখা দিয়েছিল।

এই শতকের ঐতিহাসিক ঘটনাগুলি লক্ষ করলে বক্তব্যের সত্যতা ধরা পড়বে—

১) মুঘল শাসকদের উগ্র শাসন এবং সিংহাসনের অস্থিরতা।

২) হিন্দু ব্রাহ্মণ্যবাদী সমাজের অজ্ঞ, নীতিহীন বিধান। কৌলিন্য প্রথা, বহুবিবাহ, গৌরিদান, সহমরণ প্রভৃতি সমাজ জীবনকে করেছিল কলুষিত।

৩) ১৭৫৭ খ্রিস্টাব্দে পলাশীর যুদ্ধে এদেশীয় শাসকের পতন।

৪) ১৭৬৪ খ্রিস্টাব্দে বক্সারের যুদ্ধ।

৫) ১৭৬৫ খ্রিস্টাব্দে দেওয়ানী লাভ।

৬) ১৭৭০ খ্রিস্টাব্দের ছিয়াত্তরের মন্বন্তর।

৭) শাসকের শিথিলতায় বাংলাদেশ তখন হয়ে উঠেছিল বহিরাগতদের স্বেচ্ছাচারী আক্রমণের রঙ্গভূমি। বৰ্গী আক্রমণ ছিল তখন বঙ্গজীবনে নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা।

৮) বাণিজ্যের নামে বিদেশি বণিকদের রাজ্য বিস্তারী ষড়যন্ত্র।

এই সামাজিক অস্বস্তির মুহূর্তে মানুষ ছিল সম্পূর্ণ দিশাহারা। দেব বিশ্বাস তখন স্বাভাবিকভাবেই ভঙ্গুর হতে শুরু করেছিল। মানুষ বুঝে গিয়েছিল “নগর পুড়িলে দেবালয়” এড়ায় না। দেবতাও হয়ে যায় শালগ্রাম শিলা মাত্র। এই যুগবৈশিষ্ট্য সুতরাং সাহিত্যেরও অক্ষরলিপি হয়ে ওঠে।


অষ্টাদশ শতকের সমাজবাস্তবতা : বিস্তৃত আলোচনা

অষ্টাদশ শতক ছিল বাংলার ইতিহাসে এক গভীর সংকটের সময়। রাজনৈতিক অস্থিরতা, সামাজিক অবক্ষয়, অর্থনৈতিক শোষণ এবং ধর্মীয় কুসংস্কার মানুষের জীবনকে বিপর্যস্ত করে তুলেছিল।

মুঘল সাম্রাজ্যের পতনের সঙ্গে সঙ্গে বাংলায় নবাবি শাসনের দুর্বলতা দেখা দেয়। বিদেশি বণিকেরা বাণিজ্যের অজুহাতে রাজনৈতিক ক্ষমতা দখলের ষড়যন্ত্র শুরু করে। পলাশীর যুদ্ধের পর সেই ষড়যন্ত্র বাস্তব রূপ লাভ করে।

অন্যদিকে সমাজে—

  • কৌলিন্য প্রথা,
  • বহুবিবাহ,
  • সতীদাহ,
  • জাতিভেদ,
  • নারীনির্যাতন
    প্রচণ্ডভাবে বিস্তার লাভ করে।

এই অস্থির সময়েই বাংলা সাহিত্যে দেবকেন্দ্রিকতা থেকে মানবকেন্দ্রিকতার দিকে পরিবর্তন শুরু হয়। ভারতচন্দ্র এই যুগপরিবর্তনের অন্যতম প্রধান সাহিত্যিক প্রতিনিধি।


★কবি রায়গুণাকর ভারতচন্দ্র :

অষ্টাদশ শতকের অসুস্থ ও কবন্ধ যুগ-বৈশিষ্ট্যের প্রকরণগুলি কবি রায়গুণাকরের কলম নিখুঁত ভাবেই ধারণ করেছিল।

কবি দেখেছিলেন—

১) জাতীয় তথা রাষ্ট্রীয় জীবনের সার্বিক বিপর্যয়।

২) ধর্মের মুণ্ডহীন ধরগুলির বিকৃত আহ্লাদ, জাতের নামে বজ্জাতি, ভোগসর্বস্ব উন্মাদনা, ইন্দ্রিয়পরায়ণ ব্যভিচার, উলঙ্গ হানাদারি।

৩) চারিদিকে মানুষের মধ্যে সন্দেহ, ঘৃণা, হিংসা, ভয়ের আবহ।

৪) ভক্তির প্রাবল্য কমে স্থুল কৌতুকের প্রবণতা এবং আপাত যুক্তির প্রতি অগভীর পক্ষপাত।

৫) সনাতন চিন্তা-চেতনার নড়বড়ে অবস্থা।


ভারতচন্দ্র : যুগসন্ধিক্ষণের কবি

ভারতচন্দ্র এমন এক সময়ে আবির্ভূত হন, যখন মধ্যযুগীয় বিশ্বাসব্যবস্থা ভেঙে পড়ছে এবং আধুনিকতার বীজ অঙ্কুরিত হচ্ছে।

তাঁর কাব্যে তাই একই সঙ্গে দেখা যায়—

  • দেবমাহাত্ম্য,
  • মানবজীবনের বাস্তবতা,
  • হাস্যরস,
  • সমাজসমালোচনা,
  • এবং যুক্তিবাদী প্রবণতা।

তিনি মধ্যযুগ ও আধুনিক যুগের সন্ধিস্থলের কবি।


★ কবি-কথা :

১) কবির জন্ম ১৭০৫ খ্রিঃ, হুগলী জেলার ভুরশুট পরগনার পেঁড়ো গ্রামে। এবং কবির মৃত্যু ১৭৬০ খ্রিঃ।

২) কবির পিতা – বিখ্যাত জমিদার নরেন্দ্রনাথ রায়। যদিও কবি মাতুলালয়ে পালিত হয়েছেন।

৩) কৈশোরেই কবি সংস্কৃত, আরবি ও ফারসি ভাষা ; এবং ব্যাকরণ, অলংকার, পুরাণ ও তন্ত্রশাস্ত্রে অসাধারণ ব্যুৎপত্তি লাভ করেন।

৪) অনন্য কবিত্বশক্তির জন্য তিনি কৃষ্ণনগরের রাজা কৃষ্ণচন্দ্র রায়ের সভাকবি হন।


ভারতচন্দ্রের শিক্ষা ও মানসগঠন

ভারতচন্দ্র বহুভাষাবিদ ছিলেন। সংস্কৃত, ফারসি ও আরবি ভাষাজ্ঞান তাঁর কাব্যকে সমৃদ্ধ করেছিল।

তিনি—

  • পুরাণ,
  • অলংকারশাস্ত্র,
  • তন্ত্র,
  • রসশাস্ত্র
    ইত্যাদিতে বিশেষ পারদর্শিতা অর্জন করেছিলেন।

তাঁর সাহিত্যচর্চায় ভারতীয় ঐতিহ্য ও নবীন জীবনবোধের এক চমৎকার সমন্বয় দেখা যায়।


★ কাব্য কথা :

কবি ভারতচন্দ্র রচিত কাব্যগুলি হল—

১) সত্যপীরের পাঁচালী
২) গীতিকবিতা (ইন্দ্রনারায়ণ চৌধুরীর মনোরঞ্জনের জন্য এগুলি লিখিত)
৩) রসমঞ্জরী (অলংকার শাস্ত্র ও রতিমঞ্জরীর আদর্শে এটি রচিত। রতিশাস্ত্র, রসশাস্ত্র, নায়িকাভেদ প্রভৃতি এখানে আলোচিত।)
৪) নাগাষ্টক (পত্তনিদার রামদেব নাগের বিরুদ্ধে অভিযোগ করে সংস্কৃতে এটি লেখা)
৫) চণ্ডীনাটক (বাংলা, হিন্দি, সংস্কৃত ভাষায় রচিত অসম্পূর্ণ নাটক)
৬) অন্নদামঙ্গল কাব্য।


ভারতচন্দ্রের সাহিত্যকীর্তি : বিস্তৃত মূল্যায়ন

ভারতচন্দ্র ছিলেন বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী। তিনি—

  • আখ্যানকবি,
  • গীতিকার,
  • নাট্যকার,
  • রসতাত্ত্বিক,
  • এবং সমাজসচেতন শিল্পী।

তাঁর রচনায় যেমন কৌতুক আছে, তেমনি গভীর জীবনবোধও রয়েছে।


★ শ্রেষ্ঠ কাব্য ও কবিপ্রতিভার মূল্যায়ন :

“ভারত ভারত খ্যাত আপনার গুণে” — এই উচ্চারণ কোনোভাবেই অতিশয়োক্তি নয়। বাস্তবিকই ভারতচন্দ্র তাঁর ‘অন্নদামঙ্গল’ কাব্যের জন্য সমগ্র মধ্যযুগের একজন খ্যাতিমান কবি।

আর এই কাব্যকে কবি স্বয়ং ‘নৌতনমঙ্গল’ বলেছেন ; রবীন্দ্রনাথও এই কাব্যকে বলেছেন ‘রাজকণ্ঠের মণিমালা’।

ফলত, এই কাব্য বিশেষ অর্থেই মনোযোগ দাবি করে। এবং যে-কারণে এই মর্যাদা, সেগুলি আলোচনাযোগ্য।


১) বিষয় নির্বাচন :

৩ টি খণ্ডে অন্নদামঙ্গল কাব্য বিন্যস্ত।

ক) অন্নদামঙ্গল
খ) কালিকামঙ্গল বা বিদ্যাসুন্দর
গ) অন্নপূর্ণামঙ্গল বা মানসিংহের উপাখ্যান


প্রথম খণ্ড : অন্নদামঙ্গল

প্রথম খণ্ডে, দেবী অন্নদার মাহাত্ম্য কীর্তিত হয়েছে।

এই পর্বে শিব-পার্বতীর সাংসারিক জীবনের চালচিত্র উপস্থাপনে দৈবী ভাব কোথাও নেই, বরং আঠারো শতকের গ্রাম্য কৃষক-কৃষাণীর রোজনামচাই ফুটে উঠেছে।

রঙ্গে-ব্যঙ্গে, আনন্দে-নিরানন্দে, কথায়-ব্যবহারে ভারতচন্দ্র দেব-চরিত্রকে মানব-চরিত্রে রূপান্তরিত করেছেন।

এই খণ্ডে দুটি কাহিনি সমান্তরাল ভাবে এগিয়েছে—

  • ব্যাসদেবের কাহিনি
  • হরিহোড়ের কাহিনি।

দ্বিতীয় খণ্ড : বিদ্যাসুন্দর

দ্বিতীয় খণ্ডে, রাজকুমারী বিদ্যার সঙ্গে রাজকুমার সুন্দরের প্রণয়-কাহিনি লিপিবদ্ধ হয়েছে।

বিদ্যার উদ্দেশ্যে সুন্দরের অভিসার, সুন্দরের প্রাণদণ্ড, দেবীর কৃপায় সুন্দরের মুক্তি — এই খণ্ডের উপজীব্য।


বিদ্যাসুন্দর কাহিনির সাহিত্যিক গুরুত্ব

বিদ্যাসুন্দর বাংলা সাহিত্যের অন্যতম জনপ্রিয় প্রেমকাহিনি।

এখানে—

  • প্রেম,
  • রোমান্টিকতা,
  • বুদ্ধির লড়াই,
  • সামাজিক বাধা,
  • এবং মানবিক আবেগ
    অত্যন্ত শিল্পিতভাবে প্রকাশিত হয়েছে।

এই কাহিনির ভাষা, ছন্দ ও রসবোধ বাংলা কাব্যসাহিত্যে এক নতুন মাত্রা যোগ করে।


তৃতীয় খণ্ড : মানসিংহ উপাখ্যান

তৃতীয় খণ্ডে, ভবানন্দ মজুমদারের প্রতি দেবীর কৃপা, মানসিংহ কর্তৃক প্রতাপাদিত্যের বন্দিত্ব, প্রতাপাদিত্যের মৃত্যু ইত্যাদি ঘটনা বর্ণিত।


২) যুগের পালাবদলের চিত্র :

মধ্যযুগের এক অস্থির কালপর্বে ভারতচন্দ্রের কাব্য-জগতে আবির্ভাব।

তাই যুগের বিপন্ন অবস্থা, কালের কালো ব্যাধি, অস্থির মানসিকতা এবং বেদনার বিভঙ্গগুলিকে তিনি চিনেছিলেন প্রত্যক্ষ উপলব্ধিতেই।

এবং সেই অভিজ্ঞতাকেই করে তুলেছিলেন কাব্য-রচনার শর্ত।

যার ফলে যুগের যাবতীয় রূপান্তরপ্রবণ অভিযাত্রার চিহ্নগুলিকে তিনি তাঁর কাব্যে শিল্পিত অবয়বে ফুটিয়ে তুলতে পেরেছেন।


৩) ‘নৌতনমঙ্গল’ :

“নূতন মঙ্গল আশে / ভারত সরস ভাষে / রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের আজ্ঞায়”।

ভারতচন্দ্রের বক্তব্যেই ধরা পড়ে যে, কাব্য রচনার ক্ষেত্রে তিনি যতখানি অন্নদার প্রতি কৃতজ্ঞ, তার তুলনায় অনেক বেশি অন্নদাতার প্রতি।

ফলত, প্রচলিত মঙ্গলকাব্যের রূপ ও আঙ্গিক গ্রহণ করলেও তিনি অভিনব বিষয়-বৈচিত্রের সৃষ্টি করেছেন।

সেগুলি হলো—

ক) চরিত্র নির্মাণে দেবমহিমার ভাবনা ম্লান করে দিয়েছেন।

খ) বীররস এবং করুণরসের পরিবর্তে তিনি প্রসন্ন হাস্যরসকে প্রধান করে তুলেছেন।

গ) আধুনিক যুক্তিবাদী প্রবণতায় জীবনজিজ্ঞাসার ক্ষেত্রকে প্রশস্ত করে দিয়েছেন। অর্থাৎ কবি এই কাব্যে “রিয়েলিটিস অব লাইফ” কেই প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছেন।

ঘ) এ কাব্যে বাস্তববোধ, সমাজচেতনা, নির্মোহ দৃষ্টিভঙ্গি, জিজ্ঞাসু মানসিকতাকে গুরুত্ব দিয়ে ফুটিয়ে তুলেছেন কবি।

ঙ) শব্দ চয়ন, কাব্যিক চমৎকারিত্ব সৃষ্টি, ছন্দ-অলংকারের অভিনব বিন্যাসে ভারতচন্দ্র ‘অন্নদামঙ্গল’ কে যথার্থই ‘নৌতন মঙ্গল’ করে তুলতে পেরেছেন।


৪ ) দেবতার আড়ালে মানুষের চিত্র অঙ্কন :

কবি তাঁর কাব্যে যে দেবতার কথা বলেছেন, সে দেবতা আসলে অতি সাধারণ মর্ত্য মানুষেরই যুগ-লক্ষণ ধারণ করে আছে তাঁদের স্বভাবে।

যেমন—

ক) শিব অলস, সংসার সম্পর্কে উদাসীন, প্রতিপত্তিহীন নিম্নবিত্ত গৃহস্থ।

খ) অন্নদা প্রসন্নময়ী, নির্মল কৌতুকপরায়ণ।

গ) গঙ্গা মুখরা সতীন।

ঘ) ব্যাস আদর্শভ্রষ্ট, আপসপন্থী।

ঙ) ঈশ্বরী জীবনমুখী, বস্তুবাদী অথচ নির্লোভী।

চরম অভাবের মধ্যেও সে পার্থিব পরমার্থ প্রার্থনা করে না। সে চায় উত্তর পুরুষের জন্য উজ্জ্বল স্বাস্থ্য এবং সুস্থ জীবন—

“আমার সন্তান যেন থাকে দুধে-ভাতে”।

এই প্রার্থনাই তো চিরকালীন মানবীয় ধর্ম।

তাই তো আধুনিক পর্বে এসেও কবির কণ্ঠে ধ্বনিত হতে শুনি—

“আমার সন্ততি স্বপ্নে থাক” — (শঙ্খ ঘোষ)

আধুনিক কবির বক্তব্যের গভীরতা সুদূরপ্রসারী হলেও, দুই কবির অভিব্যক্তির সমধর্মিতা অস্বীকার করার উপায় বোধহয় নেই।


ভারতচন্দ্রের কাব্যশিল্প : সমালোচনামূলক আলোচনা

ভারতচন্দ্র বাংলা সাহিত্যে আধুনিকতার সূচনাকারী কবিদের অন্যতম।

তাঁর কাব্যের প্রধান বৈশিষ্ট্য—

  • মানবিকতা
  • বাস্তবধর্মিতা
  • কৌতুকরস
  • সমাজসমালোচনা
  • ভাষার সুরমাধুর্য
  • নাটকীয়তা
  • এবং গভীর জীবনবোধ।

তিনি দেবমাহাত্ম্যের আড়ালে সাধারণ মানুষের হাসি-কান্না, অভাব-অভিমান, প্রেম-সংঘাতকে তুলে ধরেছেন।


অন্নদামঙ্গলের সাহিত্যিক গুরুত্ব

১. মধ্যযুগ থেকে আধুনিক যুগে উত্তরণের দলিল

এ কাব্যে আধুনিক জীবনবোধের সূচনা দেখা যায়।

২. মানবকেন্দ্রিকতা

দেবতার চেয়ে মানুষ এখানে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

৩. ভাষার সৌন্দর্য

ছন্দ, অলংকার ও শব্দচয়নে অপূর্ব কৃতিত্ব।

৪. কৌতুকরসের সার্থক ব্যবহার

ভারতচন্দ্র বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ হাস্যরসিক কবি।

৫. সমাজবাস্তবতার প্রকাশ

সমকালীন সমাজ ও রাজনৈতিক সংকটের প্রতিফলন ঘটেছে।


উপসংহার

অন্নদামঙ্গল বাংলা সাহিত্যের এক যুগান্তকারী সৃষ্টি। এটি শুধু দেবীমাহাত্ম্যের কাব্য নয়; বরং মধ্যযুগীয় বাঙালির জীবন, সমাজ, সংকট, হাসি-কান্না ও মানবিক চেতনার এক অসাধারণ দলিল।

ভারতচন্দ্র তাঁর অসামান্য কাব্যপ্রতিভা দিয়ে মঙ্গলকাব্য ধারাকে এক নতুন উচ্চতায় উন্নীত করেছিলেন। তাই তিনি শুধু মধ্যযুগের কবি নন; বাংলা সাহিত্যের আধুনিকতারও অন্যতম অগ্রদূত।

 
###ড.অনিশ রায়
 

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!
Scroll to Top