বাংলা বানানের গুরুত্বপূর্ণ নিয়মাবলি

বাংলা বানান শেখার কতিপয় গুরুত্বপূর্ণ নিয়ম

১. দূরত্ব বোঝায় না এরূপ শব্দে উ-কার যোগে ‘দুর’ (‘দুর’ উপসর্গ) বা ‘দু+রেফ’ হবে

যেমন— দুরবস্থা, দুরন্ত, দুরাকাঙ্ক্ষা, দুরারোগ্য, দুরূহ, দুর্গা, দুর্গতি, দুর্গ, দুর্দান্ত, দুর্নীতি, দুর্যোগ, দুর্ঘটনা, দুর্নাম, দুর্ভোগ, দুর্দিন, দুর্বল, দুর্জয় ইত্যাদি।

 ২. দূরত্ব বোঝায় এমন শব্দে ঊ-কার যোগে ‘দূর’ হবে

যেমন— দূর, দূরবর্তী, দূর-দূরান্ত, দূরীকরণ, অদূর, দূরত্ব, দূরবীক্ষণ ইত্যাদি।

৩. পদের শেষে ‘-জীবী’ ঈ-কার হবে

যেমন— চাকরিজীবী, পেশাজীবী, শ্রমজীবী, কৃষিজীবী, আইনজীবী ইত্যাদি।

৪. পদের শেষে ‘-বলি’ (আবলি) ই-কার হবে

যেমন— কার্যাবলি, শর্তাবলি, ব্যাখ্যাবলি, নিয়মাবলি, তথ্যাবলি ইত্যাদি।

৫. ‘স্ট’ এবং ‘ষ্ট’ ব্যবহার: বিদেশি শব্দে ‘স্ট’ ব্যবহার হবে। বিশেষ করে ইংরেজি st যোগে শব্দগুলোতে ‘স্ট’ ব্যবহার হবে

যেমন—পোস্ট, স্টার, স্টাফ, স্টেশন, বাসস্ট্যান্ড, স্ট্যাটাস, মাস্টার, ডাস্টার, পোস্টার, স্টুডিও, ফাস্ট, লাস্ট, বেস্ট ইত্যাদি। ষত্ব-বিধান অনুযায়ী বাংলা বানানে ট-বর্গীয় বর্ণে ‘ষ্ট’ ব্যবহার হবে।

যেমন— বৃষ্টি, কৃষ্টি, সৃষ্টি, দৃষ্টি, মিষ্টি, নষ্ট, কষ্ট, তুষ্ট, সন্তুষ্ট ইত্যাদি।

৬. ‘পূর্ণ’ এবং ‘পুন’ (পুনঃ/পুন+রেফ/পুনরায়) ব্যবহার ‘পূর্ণ’ (ইংরেজিতে Full/Complete অর্থে) শব্দটিতে ঊ-কার এবং র্ণ যোগে ব্যবহার হবে

যেমন— পূর্ণরূপ, পূর্ণমান, সম্পূর্ণ, পরিপূর্ণ ইত্যাদি।

‘পুন’ (পুনঃ/পুন+রেফ/পুনরায়— ইংরেজিতে Re-অর্থে) শব্দটিতে উ-কার হবে এবং অন্য শব্দটির সাথে যুক্ত হয়ে ব্যবহার হবে।

যেমন— পুনঃপ্রকাশ, পুনঃপরীক্ষা, পুনঃপ্রবেশ, পুনঃপ্রতিষ্ঠা, পুনঃপুন,

পুনর্জীবিত, পুনর্নিয়োগ, পুনর্নির্মাণ, পুনর্মিলন, পুনর্লাভ, পুনর্মুদ্রিত, পুনরুদ্ধার, পুনর্বিচার, পুনর্বিবেচনা, পুনর্গঠন, পুনর্বাসন ইত্যাদি।

৭. পদের শেষে’-গ্রস্থ’ নয় ‘-গ্রস্ত’ হবে

যেমন— বাধাগ্রস্ত, ক্ষতিগ্রস্ত, হতাশাগ্রস্ত, বিপদগ্রস্ত ইত্যাদি।

৮. অঞ্জলি দ্বারা গঠিত সকল শব্দে ই-কার হবে

যেমন— অঞ্জলি, গীতাঞ্জলি, শ্রদ্ধাঞ্জলি ইত্যাদি।

৯. ‘কে’ এবং ‘-কে’ ব্যবহার: প্রশ্নবোধক অর্থে ‘কে’ (ইংরেজিতে Who অর্থে) আলাদা ব্যবহার হয়

যেমন— হৃদয় কে? প্রশ্ন করা বোঝায় না এমন শব্দে ‘-কে’ এক সাথে ব্যবহার হবে।

যেমন—হৃদয়কে আসতে বলো।

১০. বিদেশি শব্দে ণষ ব্যবহার হবে না

যেমন— হর্ন, কর্নার, সমিল (করাতকল), স্টার, আস্সালামু আলাইকুম, ইনসান, বাসস্ট্যান্ড ইত্যাদি।

১১. অ্যাএ ব্যবহার: বিদেশি বাঁকা শব্দের উচ্চারণে ‘অ্যা’ ব্যবহার হয়

যেমন— অ্যান্ড (And), অ্যাড (Ad/Add), অ্যাকাউন্ট (Account), অ্যাম্বুলেন্স(Ambulance), অ্যাসিস্ট্যান্ট(Assistant), অ্যাডভোকেট (Advocate), অ্যাকাডেমিক (Academic), অ্যাডভোকেসি (Advocacy) ইত্যাদি।

অবিকৃত বা সরলভাবে উচ্চারণে ‘এ’ হয়। যেমন—এন্টার (Enter), এন্ড (End), এডিট (Edit) ইত্যাদি।

১২. ইংরেজি বর্ণ S-এর বাংলা প্রতিবর্ণ হবে ‘স’ এবং sh, -sion, -tion শব্দগুচ্ছে ‘শ’ হবে

যেমন— সিট (Seat/Sit), শিট, (Sheet), রেজিস্ট্রেশন (Registration), মিশন (Mission) ইত্যাদি।

১৩. আরবি বর্ণ  ( শিন)-এর বাংলা বর্ণ রূপ হবে ‘শ’ এবং  ( সা )  ( সিন) ও  ( সোয়াদ)-এর বাংলা বর্ণরূপ হবে ‘স’।  (সা)  ( সিন) ও  ( সোয়াদ)-এর উচ্চারিত রূপ মূল শব্দের মতো হবে এবং বাংলা বানানের ক্ষেত্রে ‘স’ ব্যবহার হবে

যেমন— সালাম, শাহাদত, শামস্, ইনসান ইত্যাদি। আরবি, ফারসি, ইংরেজি ও অন্যান্য ভাষা থেকে আগত শব্দসমূহে ছ, ণ ও ষ ব্যবহার হবে না।

১৪. শ ষ স তৎসম শব্দে ষ ব্যবহার হবে। খাঁটি বাংলা ও বিদেশি শব্দে ষ ব্যবহার হবে না। বাংলা বানানে ‘ষ’ ব্যবহারের জন্য অবশ্যই ষত্ব-বিধানউপসর্গসন্ধি সম্পর্কে ধারণা থাকতে হবে। বাংলায় অধিকাংশশব্দের উচ্চারণে ‘শ’ বিদ্যমান। এমনকি ‘স’ দিয়ে গঠিত শব্দেও ‘শ’ উচ্চারণ হয়। ‘স’-এর স্বতন্ত্র উচ্চারণ বাংলায় খুবই কম। ‘স’-এর স্বতন্ত্র উচ্চারণ হচ্ছে— সমীরসাফসাফাই। যুক্ত বর্ণঋ-কার ও র- ফলা যোগে যুক্তধ্বনিতে ‘স’-এর উচ্চারণ পাওয়া যায়

যেমন— সৃষ্টি, স্মৃতি, স্পর্শ, স্রোত, শ্রী,আশ্রম ইত্যাদি।

১৫. সমাসবদ্ধ পদ ও বহুবচনরূপী শব্দগুলোর মাঝে ফাঁক রাখা যাবে না

যেমন— চিঠিপত্র, আবেদনপত্র, ছাড়পত্র (পত্র), বিপদগ্রস্ত, হতাশাগ্রস্ত (গ্রস্ত), গ্রামগুলি/গ্রামগুলো (গুলি/গুলো), রচনামূলক (মূলক), সেবাসমূহ (সমূহ), যত্নসহ, পরিমাপসহ (সহ), ত্রুটিজনিত, (জনিত), আশঙ্কাজনক, বিপজ্জনক (জনক), অনুগ্রহপূর্বক, উল্লেখপূর্বক (পূর্বক), প্রতিষ্ঠানভুক্ত, এমপিওভুক্ত, এমপিওভুক্তি (ভুক্ত/ভুক্তি), গ্রামভিত্তিক, এলাকাভিত্তিক, রোলভিত্তিক (ভিত্তিক), অন্তর্ভুক্তকারণ, এমপিওভুক্তকরণ, প্রতিবর্ণীকরণ (করণ),

আমদানিকারক, রফতানিকারক (কারক), কষ্টদায়ক, আরামদায়ক (দায়ক), স্ত্রীবাচক (বাচক), দেশবাসী, গ্রামবাসী, এলাকাবাসী (বাসী), সুন্দরভাবে, ভালোভাবে (ভাবে), চাকরিজীবী, শ্রমজীবী (জীবী), সদস্যগণ (গণ), সহকারী, আবেদনকারী, ছিনতাইকারী (কারী), সন্ধ্যাকালীন, শীতকালীন (কালীন), জ্ঞানহীন (হীন), দিনব্যাপী, মাসব্যাপী, বছরব্যাপী (ব্যাপী) ইত্যাদি। এ ছাড়া যথাবিহিত, যথাসময়, যথাযথ, যথাক্রমে, পুনঃপুন, পুনঃপ্রকাশ, পুনঃপরীক্ষা, পুনঃপ্রবেশ, পুনঃপ্রতিষ্ঠা, বহিঃপ্রকাশ শব্দগুলো একত্রে ব্যবহার হয়।

১৬. বিদেশি শব্দে ই-কার ব্যবহার হবে।

যেমন— আইসক্রিম, স্টিমার, জানুয়ারি, ফ্রেরুয়ারি, ডিগ্রি, চিফ, শিট, শিপ, নমিনি, কিডনি, ফ্রি, ফি, ফিস, স্কিন, স্ক্রিন, স্কলারশিপ, পার্টনারশিপ, ফ্রেন্ডশিপ, স্টেশনারি, নোটারি, লটারি, সেক্রেটারি, টেরিটরি, ক্যাটাগরি, ট্রেজারি, ব্রিজ, প্রাইমারি, মার্কশিট, গ্রেডশিট ইত্যাদি।

১৭. উঁয়ো (ঙ) ব্যবহার যোগে কিছু শব্দ এক্ষেত্রে অনুস্বার (ং) ব্যবহার করা যাবে না

যেমন— অঙ্ক, অঙ্কন, অঙ্কিত, অঙ্কুর, অঙ্গ, অঙ্গন, আকাঙ্ক্ষা, আঙ্গুল/আঙুল, আশঙ্কা, ইঙ্গিত, উলঙ্গ, কঙ্কর, কঙ্কাল, গঙ্গা, চোঙ্গা/চোঙা, টাঙ্গা, ঠোঙ্গা/ঠোঙা, দাঙ্গা, পঙ্ক্তি, পঙ্কজ, পতঙ্গ, প্রাঙ্গণ, প্রসঙ্গ, বঙ্গ, বাঙালি/বাঙ্গালি, ভঙ্গ, ভঙ্গুর, ভাঙ্গা/ভাঙা, মঙ্গল,            রঙ্গিন/ রঙিন, লঙ্কা, লঙ্গরখানা, লঙ্ঘন, লিঙ্গ, শঙ্কা, শঙ্ক, শঙ্খ, শশাঙ্ক, শৃঙ্খল, শৃঙ্গ, সঙ্গ, সঙ্গী, সঙ্ঘাত, সঙ্গে, হাঙ্গামা, হুঙ্কার।

১৮. অনুস্বার (ং) ব্যবহার যোগে কিছু শব্দ এক্ষেত্রে উঁয়ো (ঙ) ব্যবহার করা যাবে না

যেমন— কিংবদন্তি, সংজ্ঞা, সংক্রামণ, সংক্রান্ত, সংক্ষিপ্ত, সংখ্যা, সংগঠন, সংগ্রাম, সংগ্রহ, সংগৃহীত।

[দ্রষ্টব্য: বাংলা ও বাংলাদেশ শব্দ দুটি অনুস্বার (ং) দিয়ে লিখতে হবে।]

১৯. ‘কোণকোন ও কোনো’-এর ব্যবহার কোণ : ইংরেজিতে Angle/Corner (অর্থে

কোন : উচ্চারণ হবে কোন্। বিশেষত

প্রশ্নবোধক অর্থে ব্যবহার করা হয়।

যেমন— তুমি কোন দিকে যাবে?

কোনো : ও-কার যোগে উচ্চারণ হবে।

যেমন— যেকোনো একটি প্রশ্নের উত্তর দাও।

২০. বাংলা ভাষায় চন্দ্রবিন্দু একটি গুরুত্বপূর্ণ বর্ণ। চন্দ্রবিন্দু যোগে শব্দগুলোতে চন্দ্রবিন্দু ব্যবহার করতে হবেনা করলে ভুল হবে। অনেক ক্ষেত্রে চন্দ্রবিন্দু ব্যবহার না করলে শব্দে অর্থের পরিবর্তন ঘটে। এ ছাড়া চন্দ্রবিন্দু সম্মানসূচক বর্ণ হিসেবেও ব্যবহার করা হয়

যেমন— তাহাকে>তাঁহাকে, তাকে>তাঁকে ইত্যাদি।

২১. ও-কার: অনুজ্ঞাবাচক ক্রিয়া পদ এবং বিশেষণ ও অব্যয় পদ বা অন্য শব্দ যার শেষে ও-কার যুক্ত না করলে অর্থ অনুধাবনে ভ্রান্তি বা বিলম্ব সৃষ্টি হতে পারে এমন শব্দে ও-কার ব্যবহার হবে

যেমন— মতো, হতো, হলো, কেনো (ক্রয় করো), ভালো, কালো, আলো ইত্যাদি। বিশেষ ক্ষেত্র ছাড়া ও-কার ব্যবহার করা যাবে না।

যেমন— ছিল, করল,যেন, কেন (কী জন্য), আছ, হইল, রইল, গেল, শত, যত, তত, কত, এত ইত্যাদি।

২২. বিশেষণবাচক আলি প্রত্যয়যুক্ত শব্দে ই-কার হবে

যেমন— সোনালি, রুপালি, বর্ণালি, হেঁয়ালি, খেয়ালি, মিতালি ইত্যাদি।

২৩. জীব, –জীবীজীবিতজীবিকা ব্যবহার

যেমন— সজীব, রাজীব, নির্জীব, চাকরিজীবী, পেশাজীবী, জীবিত, জীবিকা।

২৪. অদ্ভুতভুতুড়ে বানানে উ-কার হবে। এ ছাড়া সকল ভূতে ঊ-কার হবে

যেমন— ভূত, ভস্মীভূত, বহির্ভূত, ভূতপূর্ব ইত্যাদি।

২৫. হীরা ও নীল অর্থে সকল বানানে ঈ-কার হবে

যেমন— হীরা, হীরক, নীল, সুনীল, নীলক, নীলিমা ইত্যাদি।

২৬. নঞর্থক পদগুলো (নাইনেইনানি) আলাদা করে লিখতে হবে

যেমন— বলে নাই, বলে নি, আমার ভয় নাই, আমার ভয় নেই, হবে না, যাবে না।

২৭. অ-তৎসম অর্থাৎ তদ্ভবদেশিবিদেশিমিশ্র শব্দে ই-কার ব্যবহার হবে

যেমন— সরকারি, তরকারি, গাড়ি, বাড়ি, দাড়ি, শাড়ি, চুরি, চাকরি, মাস্টারি, মালি, পাগলামি, পাগলি, বোমাবাজি, দাবি, হাতি, বেশি, খুশি, হিজরি, আরবি, ফারসি, ফরাসি, ইংরেজি, জাপানি, জার্মানি, ইরানি, হিন্দি, সিন্ধি, ফিরিঙ্গি, সিঙ্গি, ছুরি, টুপি, দিঘি, কেরামতি, রেশমি, পশমি, পাখি, ফরিয়াদি, আসামি, বেআইনি, কুমির, নানি, দাদি, বিবি, চাচি, মাসি, পিসি, দিদি, বুড়ি, নিচু।

২৮. ত্বতানীণীসভাপরিষদজগৎবিদ্যাতত্ত্ব শব্দের শেষে যোগ হলে ই-কার হবে

যেমন— দায়িত্ব (দায়ী), প্রতিদ্বন্দ্বিতা (প্রতিদ্বন্দ্বী), প্রার্থিতা (প্রার্থী), দুঃখিনী (দুঃখী), অধিকারিণী (অধিকারী), সহযোগিতা (সহযোগী), মন্ত্রিত্ব, মন্ত্রিসভা, মন্ত্রিপরিষদ (মন্ত্রী), প্রাণিবিদ্যা, প্রাণিতত্ত্ব, প্রাণিজগৎ, প্রাণিসম্পদ (প্রাণী) ইত্যাদি।

২৯. ঈঈয়অনীয় প্রত্যয় যোগ ঈ-কার হবে

যেমন— জাতীয় (জাতি), দেশীয় (দেশি ), পানীয় (পানি), জলীয়, স্থানীয়, স্মরণীয়, বরণীয়, গোপনীয়, ভারতীয়, মাননীয়, বায়বীয়, প্রয়োজনীয়, পালনীয়, তুলনীয়, শোচনীয়, রাজকীয়, লক্ষণীয়, করণীয়।

৩০. রেফের পর ব্যঞ্জনবর্ণের দ্বিত্ব হবে না৷

যেমন— অর্চনা, অর্জন, অর্থ, অর্ধ, কর্দম, কর্তন, কর্ম, কার্য, গর্জন, মূর্ছা, কার্তিক, বার্ধক্য, বার্তা, সূর্য৷

৩১. ভাষা ও জাতিতে ই-কার হবে।

যেমন— বাঙালি/বাঙ্গালি, জাপানি, ইংরেজি, জার্মানি, ইরানি, হিন্দি, আরবি, ফারসি ইত্যাদি।

৩২. ব্যক্তির ‘-কারী’-তে (আরী) ঈ-কার হবে

যেমন— সহকারী, আবেদনকারী, ছিনতাইকারী, পথচারী, কর্মচারী ইত্যাদি। ব্যক্তির ‘-কারী’ নয়, এমন শব্দে ই-কার হবে।

যেমন— সরকারি, দরকারি ইত্যাদি।

৩৩. প্রমিত বানানে শব্দের শেষে ঈ-কার থাকলে –গণ যোগে ই-কার হয়

যেমন— সহকারী>সহকারিগণ, কর্মচারী>কর্মচারিগণ, কর্মী>কর্মিগণ, আবেদনকারী>আবেদনকারিগণ ইত্যাদি।

৩৪. ‘বেশি’ এবং ‘-বেশী’ ব্যবহার: ‘বহু’, ‘অনেক’ অর্থে ব্যবহার হবেবেশি’। শব্দের শেষে যেমন— ছদ্মবেশীপ্রতিবেশী অর্থে ‘-বেশী’ ব্যবহার হবে

৩৫. ‘ৎ’-এর সাথে স্বরচিহ্ন যোগ হলে ‘ত’ হবে

যেমন— জগৎ>জগতে জাগতিক, বিদ্যুৎ>বিদ্যুতে বৈদ্যুতিক, ভবিষ্যৎ>ভবিষ্যতে, আত্মসাৎ>আত্মসাতে, সাক্ষাৎ>সাক্ষাতে ইত্যাদি।

৩৬. ইক প্রত্যয় যুক্ত হলে যদি শব্দের প্রথমে অ-কার থাকে তা পরিবর্তন হয়ে আ-কার হবে

যেমন— অঙ্গ>আঙ্গিক, বর্ষ>বার্ষিক,

পরস্পর>পারস্পরিক, সংস্কৃত>সাংস্কৃতিক, অর্থ>আর্থিক, পরলোক>পারলৌকিক, প্রকৃত>প্রাকৃতিক, প্রসঙ্গ>প্রাসঙ্গিক, সংসার>সাংসারিক, সপ্তাহ>সাপ্তাহিক, সময়>সাময়িক, সংবাদ>সাংবাদিক,প্রদেশ>প্রাদেশিক, সম্প্রদায়>সাম্প্রদায়িক ইত্যাদি।

৩৭. সাধু থেকে চলিত রূপের শব্দসমূহ যথাক্রমে দেখানো হলো:

আঙ্গিনা>আঙিনা, আঙ্গুল>আঙুল, ভাঙ্গা>ভাঙা, রাঙ্গা>রাঙা, রঙ্গিন>রঙিন, বাঙ্গালি>বাঙালি, লাঙ্গল>লাঙল, হউক>হোক, যাউক>যাক, থাউক>থাক, লিখ>লেখ, গুলি>গুলো, শুন>শোন, শুকনা>শুকনো, ভিজা>ভেজা, ভিতর>ভেতর, দিয়া>দিয়ে, গিয়া>গিয়ে, হইল>হলো, হইত> হতো, খাইয়া>খেয়ে, থাকিয়া>থেকে, উল্টা>উল্টো, বুঝা>বোঝা, পূজা>পুজো, বুড়া>বুড়ো, সুতা>সুতো, তুলা>তুলো, নাই>নেই, নহে>নয়, নিয়া>নিয়ে, ইচ্ছা>ইচ্ছে ইত্যাদি।

৩৮. হয়তোনয়তো বাদে সকল তো আলাদা হবে

যেমন— আমি তো যাইনি, সে তো আসেনি ইত্যাদি।

[দ্রষ্টব্য: মূল শব্দের শেষে আলাদা তো ব্যবহারের ক্ষেত্রে এ বিধান প্রযোজ্য হবে।]

৩৯. ঙ, ং বর্ণের পূর্বে ঁ হবে না

যেমন— খান (খাঁ), চান, চন্দ (চাঁদ), পঞ্চ, পঞ্চাশ (পাঁচ) ইত্যাদি।

৪০. -এর, –এ ব্যবহার:

=> চিহ্নিত শব্দ/বাক্য বা উক্তির সাথে সমাসবদ্ধ রূপ।

যেমন— ‘হকি ষ্টেডিয়াম’-এর সাইনবোর্ডে স্টেডিয়াম বানানটি ভুল।

=> শব্দের পরে যেকোনো প্রতীকের সাথে সমাসবদ্ধ রূপ। যেমন— বিসর্গ (ঃ )-এর সঙ্গে স্বরধ্বনি কিংবা ব্যঞ্জনধ্বনির যে সন্ধি হয়, তাকে বিসর্গসন্ধি বলে।

=> বিদেশি শব্দ অর্থাৎ বাংলায় প্রতিবর্ণীকরণ নয় এমন শব্দের সাথে সমাসবদ্ধ রূপ। যেমন— SMS-এর মাধ্যমে টাকা পাঠাতে হবে।

=> গাণিতিক শব্দের সাথে সমাসবদ্ধ রূপ। যেমন— ৫-এর চেয়ে ২ কম।

=> সংক্ষিপ্ত শব্দের সাথে সমাসবদ্ধ রূপ। যেমন— অ্যাগ্রো কোম্পানি লি.-এর সাথে চুক্তি। এ ছাড়া পৃথক রূপে ব্যবহার করা যাবে না।

যেমন— বাংলাদেশ-এর না লিখে বাংলাদেশের, কোম্পানি-এর না লিখে কোম্পানির, শিক্ষক-এর না লিখে শিক্ষকের, স্টেডিয়াম-এ না লিখে স্টেডিয়ামে, অফিস-এ না লিখে অফিসে লিখতে হবে।

ম-ফলা ও ব-ফলার উচ্চারণ:

ম-ফলার উচ্চারণ:

ক. পদের প্রমে ম-ফলা থাকলে সে বর্ণের উচ্চারণে কিছুটা ঝোঁক পড়ে এবং সামান্য নাসিক্যস্বর হয়। যেমন— শ্মশান ( শঁশান্), স্মরণ (শঁরোন্)।

কখনো কখনো ‘ম’ অনুচ্চারিত থাকতে ও পারে

যেমন— স্মৃতি (সৃতি বা সৃঁতি)।

খ. পদের মধ্যে বা শেষে ম-ফলা যুক্ত হলে উচ্চারণে সে বর্ণের দ্বিত্ব হয় এবং সামান্য নাসিক্যস্বর হয়

যেমন— আত্মীয় (আত্তিঁয়), পদ্ম (পদ্দোঁ), বিস্ময় (বিশ্শঁয়), ভস্মস্তূপ (ভশ্শোঁস্তুপ্), ভস্ম (ভশ্শোঁ), রশ্মি (রোশ্শিঁ)।

গ. গবা ল বর্ণের সঙ্গে ম-ফলা যুক্ত হলেম-এর উচ্চারণ বজায় থাকে। যুক্ত ব্যঞ্জনের প্রথম বর্ণের স্বর লুপ্ত হয়

যেমন— বাগ্মী (বাগ্মি), যুগ্ম (যুগ্মো), মৃন্ময় (মৃন্ময়), জন্ম (জন্মো), গুল্ম (গুল্মো)।

ব -ফলার উচ্চারণ:

ক. শব্দের প্রমে ব-ফলা যুক্ত হলে উচ্চারণে শুধু সে বর্ণের উপর অতিরিক্ত ঝোঁক পড়ে। যেমন— ক্বচিৎ (কোচিৎ), দ্বিত্ব (দিত্তো), শ্বাস (শাশ্), স্বজন (শজোন), দ্বন্দ্ব (দন্দো)।

খ. শব্দের মধ্যে বা শেষে ব-ফলা যুক্ত হলে যুক্ত ব্যঞ্জনটির দ্বিত্ব উচ্চারণ হয়। যেমন— বিশ্বাস (বিশ্শাশ্), পক্ব (পক্কো), অশ্ব (অশ্শো)।

গ. সন্ধিজাত শব্দে যুক্ত ব-ফলায় ব-এর উচ্চারণ বজায় থাকে

যেমন— দিগ্বিজয় (দিগ্বিজয়), দিগ্বলয় (দিগ্বলয়)।

ঘ. শব্দের মধ্যে বা শেষে ‘ব’ বা ‘ম’-এর সঙ্গে ব-ফলা যুক্ত হলে ব-এর উচ্চারণ বজায় থাকে

যেমন— তিব্বত (তিব্বত), লম্ব (লম্বো)।

ঙ. উৎ উপসর্গের সঙ্গে ব-ফলা যুক্ত হলে ব-এর উচ্চারণ বহাল থাকে

যেমন— উদ্বাস্তু (উদ্বাস্তু), উদ্বেল (উদ্বেল্)

প্রয়োজনীয় কিছু শুদ্ধ বানান :

১. উজ্জ্বল, জ্বলজ্বলে, জ্বলন্ত, জ্বালানি, প্রাঞ্জল, অঞ্জলি, শ্রদ্ধাঞ্জলি, গীতাঞ্জলি।

২. পেশাজীবী, কর্মজীবী, ক্ষণজীবী, দীর্ঘজীবী, বুদ্ধিজীবী, অভিমানী, প্রতিদ্বন্দ্বী, প্রতিযোগী, মেধাবী, প্রতিরোধী একাকী, দোষী, বৈরী, মনীষী, সঙ্গী।

৩. উন্নয়নশীল, দানশীল, উৎপাদনশীল, ক্ষমাশীল, নির্ভরশীল, দায়িত্বশীল, সুশীল, ধৈর্যশীল।

৪. অধ্যক্ষ, প্রতীক, ব্যাখ্যা,আকস্মিক, মূর্ছা, ক্ষীণ, মুখমণ্ডল, অনুরণন, হাস্যাস্পদ, সালিস, সত্বর, উচ্ছ্বসিত, স্বেচ্ছাচারী, কর্মচারী, বিচি, বাণী, শ্বশুর,শাশুড়ি ।

৫. ইতোমধ্যে, পরিপক্ব, লজ্জাকর, ভাস্কর, দুষ্কর, সুষমা, নিষিদ্ধ, ষোড়শ, নিষ্পাপ, কলুষিত, বিষণ্ণতা, ওষ্ঠ, সম্মুখ, সম্মান, সংজ্ঞা, ব্যাখ্যা, আনুষঙ্গিক, রূদ্ধশ্বাস, দুর্নাম, অন্তঃস্থল, নগণ্য, আতঙ্ক, জটিল, গগণ, তিথি, অতিথি।

#পশ্চিমবঙ্গ বাংলা একাডেমির বানানবিধি অনুযায়ী নির্দিষ্ট সূত্র:

বানান-বিষয়ে সিদ্ধান্ত : তৎসম শব্দ

৩. তৎসম শব্দ

৩.১ সংস্কৃত শব্দভাণ্ডারের যে সব শব্দ বাংলা ভাষায় অবিকৃত লিখিত রূপে (উচ্চারণে নয়) গৃহীত হয়েছে, সেগুলি বাংলার বিশেষ এক ধরণের শব্দঋণ। এগুলিই বাংলায় তৎসম রূপে পরিচিত। তবে বাংলায় তার ব্যবহার অংশত সংস্কৃত ব্যাকরণের সূত্রে এবং প্রধানত বাংলা ব্যাকরণের প্রচলিত সূত্রে সম্পন্ন হয়। সেক্ষেত্রে এই জাতীয় বাংলা শব্দ ও ‘স’ ‘অভিন্নার্থক’। দেশি বা অজ্ঞাতমূল বাংলা শব্দের কৃত্রিম সংস্কৃতায়িত শব্দও তৎসম-রূপে পরিগণিত। যেমন, প্রোথিত শব্দের মূল প্রোথ্ কল্পিত ধাতু, পোঁতা শব্দের পুনর্নির্মাণ মাত্র।

৩.২ সংস্কৃত ভাষার যে সব শব্দ যা তৎসম ঋণশব্দ রূপে বাংলা ভাষায় ব্যবহৃত হয়ে আসছে তার বানান সংস্কৃত ব্যাকরণ সূত্রানুযায়ী পূর্বনির্ধারিত, সেগুলির ইচ্ছাকৃত পরিবর্তনের কোনো প্রশ্নই ওঠে না। কিন্তু সংস্কৃত অভিধান ব্যাকরণেই বহু শব্দের বিকল্প বানান থাকার বাংলা ভাষার ধ্বনি ও উচ্চারণরীতির কারণে তার একটিকে সর্বদা ব্যবহার্যরূপে গ্রহণ করা যেতে পারে। তা ছাড়া বাংলা ব্যাকরণসম্মত প্রত্যয় ব্যবহারে, সমাস-ব্যবহারে বা সন্ধি-সূত্রানুসারে কোনো কোনো বানান বাংলায় দীর্ঘকাল যাবৎ ঈষৎ স্বতন্ত্রতা লাভ করেছে। সেগুলিকেও তৎসম শব্দের মতো মান্যতা দেওয়া যেতে পারে। উল্লেখযোগ্য যে, বাংলা আকাদেমি প্রকাশিত সর্বশেষ সংস্করণ বানান অভিধানে তৎসম শব্দগুলি স্বাতন্ত্র্যচিহ্নিত করা হয়েছে। এইসব বিষয়ে বহু আলোচনা, পর্যালোচনা ও বিবেচনার পর নিম্নলিখিত সিদ্ধান্তগুলি পর্যায়ক্রমে সূত্রবদ্ধ করা হল।

৪. হ্রস্ব-দীর্ঘ স্বরচিহ্ন

৪.১ তৎসম শব্দের ক্ষেত্রে যেখানে হ্রস্ব ই উ / ই-কার উ-কার এবং দীর্ঘ ঈ ঊ / ঈ-কার ঊ-কার দুটি রূপই প্রচলিত ও গৃহীত, সেখানে সাধারণভাবে হ্রস্ব বিকল্পটিকেই গ্রহণ করা পূর্বোক্ত কারণেই যুক্তিসংগত। তাই  অঙ্গুরি অঙ্গুরী, অন্তরিক্ষ-অন্তরীক্ষ, উষা-ঊষা, উর্ণনাভ-ঊর্ণনাভ, কুটির-কুটীর ইত্যাদি উদাহরণ-যুগ্মকের প্রথম বিকল্পটি বাংলা লেখা ও মুদ্রণে একমাত্ররূপে গৃহীত হতে পারে। এইরকম একটি তালিকা নীচে দেওয়া হল :

অঙ্গুরি, অঙ্গুলি, অবনি, আকুতি, আবলি, দীপাবলি, উষসী, উষা, ক্ষেণি, চিৎকার, তুলিকা, ত্রুটি, দরি, দ্রোণি, ধমনি, ধরণি, ধূলি, নাড়ি, পঞ্জি, পদবি, পল্লি, পাটি, পুত্তলি, পুরদ্ধি, পেশি, বেণি, বেদি, ভৃঙ্গি, ভেরি, রজনি, শ্রেণি, সরণি, সারণি, সুরভি, সূচি ইত্যাদি।

পূর্বেই বলা হয়েছে বাংলা আকাদেমি প্রকাশিত সর্বশেষ সংস্করণ বানান অভিধানে এইজাতীয় শব্দ তারকাচিহ্নিত করা আছে। উল্লেখ্য, হ্রস্ব বিকল্প না থাকলে তালিকা-বহির্ভূত তৎসম শব্দের বানানে দীর্ঘ স্বরচিহ্নই লিখতে হবে।

৪.২ সংস্কৃত ইন্-প্রত্যয়ান্ত শব্দগুলি (অধিকারি, অধিবাসিন্, অভিমুখিন্, আততায়িন্, একাকিন্, কৃতিন্, গুণিন্, জ্ঞানিন্, তন্ত্রিন্, দ্বেষিন্, ধনিন্, পক্ষিন্, বিদ্রোহিন্, মন্ত্রিন্, রোগিন্, শশিন্, সহযোগিন্ ইত্যাদি) কর্তৃকারকের একবচনে দীর্ঘ ঈ-কারান্ত হয় এবং এই দীর্ঘ ঈ-কারান্ত রূপেই এগুলি বাংলা শব্দে পরিণত—অধিকারী, অধিবাসী, অভিমুখী, আততায়ী, একাকী, কৃতী, গুণী, জ্ঞানী, তন্ত্রী, দ্বেষী, ধনী, পক্ষী, বিদ্রোহী, মন্ত্রী, রোগী, শশী, সহযোগী ইত্যাদি।

সংস্কৃত ব্যাকরণের নিয়মে সমাসবদ্ধ কিংবা সংস্কৃতপ্রত্যয়যুক্ত হলে এইসব শব্দের দীর্ঘ ঈ-কার আবার হ্রস্ব ই-কারে ফিরে যায়। যেমন : গুণিজন, পক্ষিকুল, মন্ত্রিসভা, শশিভূষণ, বা একাকিত্ব, কৃতিত্ব, সহযোগিতা ইত্যাদি। কিন্তু বাংলা বানান ব্যবহারে এই নিয়মেরও প্রচুর ব্যতিক্রম দেখা যায়। যেমন আগামীকাল, আততায়ীদ্বয়, ধনীসমাজ, পরবর্তীকাল, প্রাণীবিদ্যা, যন্ত্রীদল, হস্তীদল ইত্যাদি।

এইজাতীয় অসামঞ্জস্য দূর করা প্রায় অসম্ভব। তবু বাংলা বানানে অনুরূপ শব্দে সমতাবিধানের জন্য বিধিসম্মত সিদ্ধান্ত হল :

সমাসবদ্ধ শব্দের ক্ষেত্রে সংস্কৃত মূল শব্দটিকে দীর্ঘ ঈ-কারান্ত ‘বাংলা শব্দ’ ধরে নেওয়া হোক। অর্থাৎ, সমাস হলেও তার দীর্ঘ ঈ-কারের ব্যত্যয় ঘটানো না হোক। তাই অনুগামীবৃন্দ, আগামীকাল, পরবর্তীকাল, মন্ত্রীগণ, মন্ত্রীসভা, শশীভূষণ, যশস্বীগণ ইত্যাদি রূপই গ্রহণযোগ্য হবে।

অবশ্য অ-তৎসম প্রত্যয় যুক্ত হলেও উপরের ‘মন্ত্রীগণ’-সংক্রান্ত বিধি প্রযোজ্য হবে। যেমন, মন্ত্রীগিরি।

তবে সংস্কৃত ব্যাকরণের নিয়মের অভ্যাসবশত মন্ত্রিসভা, শশিভূষণ ইত্যাদি লেখা চলতে পারে। সেক্ষেত্রে সমাসবদ্ধ সম্পূর্ণ শব্দটি তৎসমরূপে গণ্য।

তৎসম -ত্ব ও -তা প্রত্যয় যোগ করা হলে এইসব শব্দের হ্রস্ব ই-কারান্ত (অর্থাৎ ইন্ বিন্-এর ন্ লোপের পর যা থাকে) মূল প্রাতিপদিক রূপেই লেখা হবে। যেমন, তেজস্বিতা, প্রতিদ্বন্দ্বিতা, প্রতিযোগিতা, মন্ত্রিত্ব, মেধাবিত্ব, সহমর্মিতা, স্থায়িত্ব ইত্যাদি।

একই কারণে লিঙ্গান্তরের ক্ষেত্রেও (-ইন্ + ঈ >) নী-যোগের আগে ইন্-প্রত্যয়ান্ত শব্দে তেজস্বিনী, প্রতিদ্বন্দ্বিনী, প্রতিযোগিনী। এর উদ্দেশ্য, সংস্কৃত ‘বাংলা শব্দ’ রূপে অজস্র তৎসম শব্দকে স্বীকৃতি দেওয়া; এই নিয়ম পালিত হবে, যেমন : সংস্কৃত ব্যাকরণের সূত্রে ভিন্নতা ঘটানো নয়, ব্যাকরণসূত্রকেও মান্যতা দেওয়া।

৪.৩ কোনো কোনো তৎসম শব্দে বাংলা প্রত্যয় -ই লাগিয়ে বিশেষণ করা যায়, আবার বিশেষ্যরূপেও তা ব্যবহৃত হতে পারে। যেমন : উত্তরপ্রদেশি, উদয়পুরি, কৃত্তিবাসি, জনকপুরি, জনসংঘি, তৃণমূলি, দক্ষিণি, দেশি, প্রণামি, পশ্চিমি, প্রসাদি (-ফুল), বয়সি, বিদেশি, বিহারি, মণিপুরি, রামপ্রসাদি, স্বদেশি, হিন্দুস্থানি ইত্যাদি। (পণ্ডিত থেকে বিশেষ্য পণ্ডিতি-তেও হ্রস্ব ই-কার প্রযোজ্য।)

এই প্রত্যয় অর্থ বা প্রয়োগের দিক থেকে সংস্কৃত ইন্ বা বিন্ প্রত্যয়ের সমতুল্য নয়। তাই এ ধরনের নানা শব্দে দীর্ঘ ঈ-কার দেবার প্রয়োজন নেই। বিশেষ্য রূপে প্রযুক্ত হলে এইজাতীয় শব্দে লিঙ্গান্তরের ক্ষেত্রে বাংলা -নি প্রত্যয় ব্যবহৃত হতে পারে। যেমন : স্বদেশিনি।

৪.৪ ‘পূর্বে ছিল না পরে হয়েছে’ এই অর্থে সংস্কৃত নিয়মে অভূত তদ্ভাবে -চি প্রত্যয় যোগ করলে হয় : যথা লঘুকরণ। এবং পূর্বপদে হ্রস্ব উ থাকলে দীর্ঘ ঊ-কার যুক্ত হয়। যেমন : সমীকরণ, বশীকরণ ইত্যাদি।

বর্তমানে প্রচলিত বাংলা লেখায় এই নিয়ম সর্বত্র ও সর্বদা অনুসৃত হয় না। সুতরাং এইধরনের নতুন শব্দ তৈরির ক্ষেত্রে পদ্ধতি হবে :

মূল শব্দ + -করণ / -ভবন

এসব ক্ষেত্রে প্রথম পদের শেষ স্বর অপরিবর্তিত থাকবে। উদাহরণ : অন্ধকরণ, আর্দ্রভবন (hydration), চারুকরণ (beautification), নগদকরণ (encashment), বন্ধ্যাকরণ, বহুকরণ (multiplication), বিরাষ্ট্রীয়করণ, মেরুকরণ (polarisation), রাষ্ট্রায়ত্তকরণ, রাষ্ট্রীয়করণ, শুদ্ধকরণ ইত্যাদি। সেইভাবে লঘুকরণও গ্রাহ্য হবে।

৫. বিসর্গ (ঃ) চিহ্নের রক্ষা/বর্জন

৫.১ বিসর্গান্ত বাংলা তৎসম শব্দের অন্ত্যবিসর্গ প্রায়শই উচ্চারিত হয় না বলে দীর্ঘকাল ধরে বাংলা লেখায় মুদ্রিত শব্দেও অন্ত্যবিসর্গের প্রয়োগ প্রায় দেখাই যায় না। সংস্কৃত -তস্ বা -শস্ প্রত্যয়ান্ত শব্দগুলিতে অন্ত্যবিসর্গের প্রয়োগ তাই কালক্রমে বর্জিত হতে বসেছে। সেই কারণে সেই জাতীয় শব্দে বর্তমানে অন্ত্যবিসর্গের প্রয়োগ সম্পূর্ণ বর্জিত হতে পারে। যেমন :

অন্ততঃ, উভয়তঃ, ক্রমশঃ, প্রথমতঃ, প্রায়শঃ, ফলতঃ, বস্তুতঃ, বহুশঃ, সর্বতঃ শব্দগুলি বিসর্গহীন রূপে যথাক্রমে অন্তত, উভয়ত, ক্রমশ, প্রথমত, প্রায়শ, ফলত, বস্তুত, বহুশ, সর্বত লেখা বিধেয়।

এই একই সূত্রানুসারে বিসর্গান্ত দুটি শব্দের বিসর্গসন্ধির ক্ষেত্রে দ্বিতীয় পদটির অন্ত্যবিসর্গ বর্জিত হবে :

অহঃ + অহঃ > অহরহ
ইতঃ + ততঃ > ইতস্তত
পুনঃ + পুনঃ > পুনঃপুন
মুহুঃ + মুহুঃ > মুহুর্মুহু

তবে বিসর্গসন্ধির প্রথম শব্দের বাংলায় তা যথাযথ রক্ষিত হবে। যথা : অহরহ (অহরহঃ নয়), ইতস্তত (ইতস্ততঃ নয়), পুনঃপুন (পুনঃপুনঃ নয়), মুহুর্মুহু (মুহুর্মুহুঃ নয়)।

অন্ত্যবিসর্গ যেখানে সংস্কৃত সন্ধিসূত্রে অবিকৃত থাকে :

অতঃ + পর > অতঃপর
অধঃ + পাত > অধঃপাত

মনঃ + কষ্ট > মনঃকষ্ট
মনঃ + পূত > মনঃপূত
যশঃ + প্রার্থী > যশঃপ্রার্থী
শিরঃ + পীড়া > শিরঃপীড়া

৫.২ সন্ধি-সমাস নিষ্পন্নরূপেই গৃহীত ও প্রচলিত শব্দের ক্ষেত্রে বিসর্গসন্ধিজাত ও-কারের প্রচলিত ও দীর্ঘকাল-গৃহীত রূপগুলি রক্ষণীয়। যেমন : অকুতোভয়, ততোধিক, বয়োজ্যেষ্ঠ, মনোযোগ, মনোরঞ্জন, মনোরম।

‘মনমোহন’ কোনো কোনো নামে, বিশেষত অবাঙালি নামে, দেখা গেলেও ওই ধরনের বাংলা বিশেষণ ও নাম শব্দ হিসেবে তৎসম মনোমোহন-ই গ্রহণীয়।

তবে ‘মন’ শব্দটিকে বাংলা শব্দ ধরে তাকে পূর্বপদ হিসেবে রেখে সমাস করলে ও-কার যোগ হবে না। যেমন : মনপছন্দ, মনপবন, মনভোমরা, মনমাঝি, মনমেজাজ ইত্যাদি। ক্বচিৎ সন্ধির ক্ষেত্রেও এই নিয়ম প্রযোজ্য। যেমন, মনান্তর।

৫.৩ ‘ছন্দ’ শব্দটিকে অনুরূপ বাংলা শব্দ ধরে নিয়ে সমাসের পূর্বপদে বিসর্গসন্ধিজাত ও-কার বর্জনীয় হতে পারে।

যেমন : ছন্দগুরু, ছন্দবিজ্ঞান, ছন্দমুক্তি, ছন্দলিপি, ছন্দস্পন্দ।

অনুরূপভাবে, ‘চক্ষু’ শব্দটিকে বাংলা শব্দ ধরে নিয়ে সমাসে সংস্কৃত ব্যাকরণসিদ্ধ চক্ষুরোগ-এর বদলে ‘চক্ষুরোগ’ বানান বিধেয়। তবে বহুপ্রচলিত ঐকিক শব্দ হিসাবে ‘চক্ষুষ্মান’ বানান পরিবর্তনের প্রশ্ন ওঠে না। অনুরূপভাবে, জ্যোতির্ময়, জ্যোতিষ্মান ইত্যাদি।

৫.৪ দুঃস্থ, নিঃস্তব্ধ, নিঃস্পৃহ, বয়ঃস্থ, মনঃস্থ ইত্যাদি শব্দের সংস্কৃত ব্যাকরণসম্মত বিকল্প রূপ প্রচলিত আছে : দুস্থ, নিস্তব্ধ, নিস্পৃহ, বয়স্থ, মনস্থ। বিসর্গহীন এই বিকল্প রূপগুলিই বাংলায় সর্বদা ব্যবহার্য হবে।

এখানে অবশ্য স্মরণীয় যে, অন্তঃস্থ আর অন্তস্থ দুটি ভিন্নার্থক শব্দ। প্রথমটির অর্থ ‘ভিতরকার’ (অন্তঃ + স্থ) এবং দ্বিতীয়টির অর্থ ‘শেষের’ (অন্ত + স্থ)। তাই ‘ভিতরকার’ অর্থে অন্তঃস্থ শব্দটির বিসর্গ রক্ষিত হবে।

৬. হস্ চিহ্ন

৬.১ ব্যঞ্জনে হস্ চিহ্নকে তার পরস্বরহীন অর্থাৎ ব্যঞ্জনান্ত বা হলন্ত-উচ্চারণ বোঝানোর চিহ্ন বা ধ্বনিমাত্রাচিহ্ন (diacritical mark) হিসেবে গণ্য করা হয়। বাংলায় কয়েকটি নির্দিষ্ট ক্ষেত্র ছাড়া সংস্কৃত অ-কারান্ত শব্দ প্রায় সর্বত্র ব্যঞ্জনান্ত উচ্চারিত হয়। এই কারণে পদের শেষে হস্ চিহ্নের ব্যবহার বাহুল্যসূচক। এজন্য নিম্নলিখিত শব্দগুলিতে পদান্ত হস্ বর্জিত হবে :

অবাক, আপদ, আশিস, দিক, ধিক, নিরাপদ, পরিষদ, পৃথক, বণিক, বিপদ, বিরাট, ভিষক, সভাসদ, সম্পদ, সম্রাট ইত্যাদি।

তবে আপৎ শব্দের ক্ষেত্রে সমাসে পূর্বপদের শেষে হসন্তযুক্ত ত (ৎ) ব্যবহৃত হতে পারে। যেমন : আপদ, নিরাপদ; কিন্তু, আপৎকালীন।

হস্ চিহ্নের ফলে সন্ধির নিয়মে বর্ণ পরিবর্তিত হতে পারে। যথা : পৃথক্ + অন্ন > পৃথগন্ন ,বাক্ + অর্থ > বাগর্থ

৬.২ তদ্ধিত মতুপ্ প্রত্যয়ের হসন্ত মান্ আর কৃৎ শানচ্ প্রত্যয়ের হস্ চিহ্নহীন ‘মান’ নিয়ে বিভ্রমের অবকাশ থাকলেও উভয় ক্ষেত্রেই হস্-বিহীন ‘মান’ ব্যবহৃত হবে। যেমন : কৃৎ : বর্তমান, বিদ্যমান, সৃজ্যমান ,তদ্ধিত : রুচিমান, শক্তিমান, শ্রীমান, সংস্কৃতিমান ইত্যাদি।

তদ্ধিত মান-এর স্ত্রীলিঙ্গে -মতী, যেমন : শ্রীমতী। স্ত্রী-নামের আগে শ্রীমতী-তে হ্রস্ব ই-কার হবে না।

৬.৩ অনুরূপভাবে, তদ্ধিত বতুপ্ প্রত্যয়জাত বান্ ‘বান’ রূপে লেখা হবে। যেমন : জ্ঞানবান, ধনবান, ভগবান ইত্যাদি। স্ত্রীলিঙ্গে -বতী, যেমন ভগবতী, রূপবতী ইত্যাদি।

৬.৪ তবে সংস্কৃত ব্যঞ্জনসন্ধি-নিষ্পন্ন কিছু শব্দে পূর্বপদের শেষে হস্ চিহ্ন থাকবে। যেমন : দিগ্ভ্রান্ত, পৃথক্করণ, প্রাগজ্যোতিষ, বাকসিদ্ধ, বাগধারা, বাগ্পটুত্ব ইত্যাদি।

৬.৫ ষড়যন্ত্র শব্দটি ষড়যন্ত্র হিসাবেই প্রচলিত হয়ে গেছে; তেমনই ষড়দর্শন ষড়দর্শন রূপে, ষড়রিপু ষড়রিপু রূপে। এ প্রচলন মান্য করা যেতে পারে।

৭. রেফের নীচে অর্থাৎ রেফযুক্ত বর্ণে ব্যঞ্জনের দ্বিত্ব

৭.১ বাংলা মুদ্রণের প্রায় প্রথম যুগ থেকে প্রচলিত যাবতীয় রেফযুক্ত ব্যঞ্জনে উক্ত ব্যঞ্জনটির দ্বিত্ব প্রয়োগের সংস্কার ছিল। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়-অনুমোদিত বানান-পদ্ধতির প্রচলনের সময় থেকে দ্বিত্ববর্জিত রেফের ব্যবহার বিকল্পরূপে স্বীকৃত হয়। এখন, রেফের নীচে ব্যঞ্জনের দ্বিত্ব সর্বত্রই বর্জনীয়।

দ্বিত্বহীন রেফযুক্ত শব্দগুলির বানান লক্ষণীয়, যেমন : অর্ক, অর্চনা, অর্জন, অর্ধ, আচার্য, আর্য, কর্ম, চর্চা, তর্য, পূর্ব, বর্জন, ভট্টাচার্য, মূর্ছনা, সূর্য, স্বর্গ, হার্দিক ইত্যাদি তো বটেই; এমনকি কৃত্তিকা থেকে উৎপন্ন কার্তিক, বৃদ্ধ থেকে বার্ধক্য ইত্যাদি।

৭.২ রেফের নীচে যয > র্য্য স্থলে র্য হবে। কিন্তু র্ঘ্য (র্ঘ + য), র্ত্য (র্ত + য), র্দ্য (র্দ + য) ক্ষেত্রে য-ফলা স্বতন্ত্র ব্যঞ্জন, সুতরাং সেটি বর্জিত হওয়ার প্রশ্ন ওঠে না। যেমন : অর্ঘ্য, মর্ত্য, হার্দ্য ইত্যাদি।

৮. ঙ

৮.১ ঙ-যুক্ত ব্যঞ্জনস্থলে বিকল্পে ং ব্যবহার নির্বিচারে শুদ্ধ নয় (প্রসঙ্গত ২.১ সূত্র দ্রষ্টব্য)। তৎসম শব্দে সংস্কৃত ব্যাকরণমতে সন্ধি-পরিণামে শব্দের পূর্বপদের শেষ বর্ণ ম্ হলে, পরবর্তী বর্ণ ঙ্ এবং ং উভয়ই শুদ্ধ। অর্থাৎ—

অলম্ + কার > অলঙ্কার / অলংকার
অহম্ + কার > অহঙ্কার / অহংকার
ভয়ম্ + কর > ভয়ঙ্কর / ভয়ংকর
শম্ + কর > শঙ্কর / শংকর
শুভম্ + কর > শুভঙ্কর / শুভংকর
সম্ + কর > সঙ্কর / সংকর
সম্ + গত > সঙ্গত / সংগত
সম্ + গীত > সঙ্গীত / সংগীত

এক্ষেত্রে কেবল ং-যুক্ত বানান ব্যবহারই বাঞ্ছনীয়।

৮.২ তবে যেসব শব্দে ম্-এর সন্ধি-পরিণাম হিসাবে ং আসেনি, সেখানে ং ব্যবহার অশুদ্ধ, তাই সম্পূর্ণরূপে পরিহার্য। সুতরাং অঙ্ক (< অক্ + অ) কখনোই অংক নয়। তাই বঙ্গ নয়, বংগ নয়; শঙ্কা নয়, শংকা নয়; সঙ্গে, সংগে নয়—লেখাই বিধেয়।

অনুরূপ শুদ্ধ বানান :

অঙ্কুশ (< অক্ বা অঙ্ক + উশ)
আকাঙ্ক্ষা (< আ-কাঙ্ক্ষ + টাপ)
আতঙ্ক (< আ-তক্ বা তক্ + ঘঞ)
কঙ্কাল (< কক্ বা কঙ্ক + আলন)
পঙ্ক (< পক্ বা পঙ্ক + ঘঞ)
ভঙ্গ (< ভজ্ + ঘঞ)
রঙ্গ (< রজ্ + ঘঞ)
সঙ্গ (< সজ্ + ঘঞ)

ইত্যাদি লেখা বিধেয়।

৮.৩ সম্ + গীত > সংগীত হলেও সম্ + বোধন কিন্তু সংবোধন নয়, সম্বোধন। ম্-এর পরে বর্গীয় ব থাকলে তা ম্-ই থাকবে, ং হবে না; ম্-এর পরে অন্তঃস্থ ব থাকলে তবেই সেটা ং হবে। তাই :

কিংবদন্তি, প্রিয়ংবদা, সংবর্ধনা, সংবাদ ইত্যাদি;
কিন্তু সম্বন্ধ, সম্বুদ্ধ, সম্বোধন, সম্বোধি ইত্যাদি।

৯. কিছু বিশেষ্য শব্দের য-ফলা

দারিদ্র্য, বৈচিত্র্য ইত্যাদি কোনো কোনো তৎসম শব্দে য-ফলাহীন বিকল্প বানান সংস্কৃতেই লক্ষ করা যায়। কিন্তু কোনো কোনোটির ক্ষেত্রে য-ফলাহীন বানান Monier-Williams wrong reading হিসেবে দেখিয়েছেন। বিভ্রমহীন সমতার জন্য, এ-জাতীয় সমস্ত শব্দই য-ফলা দিয়ে লেখা হবে।

যেমন : চারিত্র্য, দারিদ্র্য, বৈচিত্র্য, বৈদগ্ধ্য, সৌগন্ধ্য, সৌহার্দ্য ইত্যাদি।

১০. শ ষ স

কোনও কোনও তৎসম শব্দের বানানের ক্ষেত্রে শ-ষ বা শ-স দুটোই সংস্কৃত অভিধানে স্বীকৃত। যথা : কোশ-কোষ, উশীর-উষীর, কিশলয়-কিসলয়, শায়ক-সায়ক ইত্যাদি। সেগুলির ক্ষেত্রে শুধু শ ব্যবহার করা যেতে পারে।

১১. অ-তৎসম শব্দে

বানান-বিষয়ে সিদ্ধান্ত : অতৎসম শব্দ

১১.১ বাংলা অ-তৎসম শব্দ বলতে, সংস্কৃত তৎসম শব্দের ধ্বনি-পরিবর্তনে জাত অর্ধতৎসম/ভগ্নতৎসম শব্দ, ধারাবাহিক পরিবর্তনে রূপান্তরিত তদ্ভব, অস্ট্রিক বা দ্রাবিড়মূল শব্দ, অজ্ঞাতমূল অথবা দেশি শব্দ অথবা অ-ভারতীয় বিদেশি অথবা ঋণশব্দ ইত্যাদি বিবিধ শব্দশ্রেণিকেই বোঝায়। এগুলির মধ্যে উত্তরাধিকার-সূত্রে আগত তদ্ভব শব্দে মূলের ধ্বনি, স্বর বা ব্যঞ্জন, উভয়ক্ষেত্রেই পরিবর্তন ঘটে গেছে। সুতরাং সেইসব শব্দের বানানে মূলের বর্ণরূপের প্রতি বিশ্বস্ত থাকার বা সারূপ্য রক্ষার প্রশ্নটি অধিকাংশ স্থলে নিছক সংস্কার মাত্র। সেই জাতীয় শব্দের বানানকে উচ্চারণের সমীপবর্তী বা অনুকূল করাই বানান-সংস্কারের তথা সমতাবিধানের মূলসূত্র হওয়া উচিত। তবে ব্যতিক্রম ঘটলে সেই সেই ক্ষেত্রে ব্যতিক্রমের স্বতন্ত্র কারণ বা ব্যাখ্যা থাকতে পারে।

১১.২ — হ্রস্ব ই-কার ও দীর্ঘ ঈ-কার

একদা কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের বানান-সমিতি অ-তৎসম শব্দের দীর্ঘ ঈ-কারের পরিবর্তিত রূপ হ্রস্ব ই-কারকে স্বীকার করে হ্রস্ব-দীর্ঘ দুটি বানানই বিকল্পে ব্যবহারযোগ্য বলে বিবেচনা করেছিলেন। তদবধি কুমীর-কুমির, পাখী-পাখি প্রভৃতি দুটি রূপই প্রচলিত। এখন, অ-তৎসম শব্দে দীর্ঘ ঈ-কারযুক্ত বিকল্প রূপটি সম্পূর্ণভাবে বর্জনীয়।

এই অনুসারে প্রায় সর্বপ্রকার অ-তৎসম শব্দে বিকল্প দীর্ঘ ঈ পরিহার করে কেবল হ্রস্ব ই-কার ব্যবহৃত হবে।

যথা:কুমির, গাড়ি, চাঁদনি, ছেনি, দিঘল, দিঘি, দিয়াশলাই, নিলা, পশমি, পাখি, পারানি, পিরিতি, বাড়ি, বাঁশরি, বাঁশি, রাখি, সুপারি, সেঁউতি, হাতি, হিরে ইত্যাদি।

১১.৩ কাহিনি তদ্ভব শব্দ (কথনিকা > কহণিআ > কহানী/কাহিনি), ফলে এতে ন-এ দীর্ঘ ঈ-কার রাখার কোনো যুক্তি নেই। চিন, চিনা-ও প্রাচীন বাংলায় চিনা (কঙ্গুচিনা) হিসেবেই পাই। ‘চিনাবাদাম’-ও প্রচলিত। ফলে এই দেশনামটিকে তৎসম হিসাবে গণ্য করা অসংগত। তবু চিন ও চীন বিকল্প রাখা হল।

ভীত ও নীচ-এর সঙ্গে সমতার জন্য ভীতু ও নীচু বানান সুপারিশ করা হল।

গাভী-ও তৎসম নয়। ফলে এ শব্দটি ‘গাভি’ হিসেবে লেখাই সংগত।

১১.৪ সংস্কৃত স্ত্রীবাচক প্রত্যয়ের নীতি অনুসারে অ-তৎসম শব্দেও দীর্ঘ ঈ-কার (বা -নী কার) দিয়ে স্ত্রীলিঙ্গ বোঝানোর রীতি এখনও কমবেশি চলছে। ব্যাপকতর সমতার জন্য তাই সিদ্ধান্ত : এ ক্ষেত্রেও হ্রস্ব ই-কারের (নি-কারের) ব্যবহার হবে। তাই লেখা হবে :

কাকি(-মা), কামারনি, খান্দারনি, খুকি, খুড়ি, খেঁদি, গয়লানি, চাকরানি, চাচি, ছুঁড়ি, ছুকরি, জেঠি(-মা), ঝি, ঠাকুরানি, দিদি(মা), নেকি, পাগলি, পিসি(-মা), পেঁচি, বাঘিনি, বামনি, বেটি, ভেড়ি, মামি(-মা), মানি(-মা), মুদিনি, মেথরানি, রানি, সাপিনি, সোহাগিনি, স্যাঙাতনি ইত্যাদি।

১১.৫ জীবিকা, ভাষা, সম্প্রদায়, গোষ্ঠী, জাতি ইত্যাদি বোঝানোর জন্য যে ই-কারান্ত প্রত্যয় ব্যবহার করা হয় তা দীর্ঘ ঈ-কার হবে না; সবসময় হ্রস্ব ই-কার হবে। যেমন :

উজিরি, ওকালতি, জজিয়তি, জমিদারি, ডাকাতি, ডাক্তারি, নবাবি, ফকিরি, বরকন্দাজি, ব্যারিস্টারি, মাতব্বরি, মাস্টারি, মোক্তারি, হাকিমি ইত্যাদি।

আরবি, ইংরেজি, কাশ্মীরি, গুজরাতি, পাঞ্জাবি, ফরাসি, ফারসি, ভিয়েতনামি, মারাঠি, মালয়ালি, মৈথিলি, সিন্ধি, হিন্দি ইত্যাদি।

অকালি, কংগ্রেসি, ঝাড়খণ্ডি ইত্যাদি।

ইরাকি, ইরানি, ওড়িশি, কাবুলি, জাপানি, পশ্চিমি, পাকিস্তানি, বর্মি, বাংলাদেশি, বাঙালি, বিহারি, লাডাকি, হানাফি ইত্যাদি।

১১.৬ কিছু অ-তৎসম, মিশ্র ও বিদেশি বিশেষণ শব্দে যে ই-প্রত্যয় যুক্ত হয় তা হ্রস্ব ই-কার দিয়েই লিখতে হবে। যেমন :

আন্দাজি, আসামি, কাবরারি, কয়েদি, কুদরতি, খানদানি, খুনি, গায়েবি, জঙ্গি, জরুরি, জাহাজি, তুফানি, তেজারতি, দরকারি, দরদি, দেশি, ধানি(-রং), নজরবন্দি, নাকি(-স্বর), ফরায়েজি, বন্দি (= কয়েদি), ভিনদেশি, মজলিশি, মরমি, মরশুমি, মুলতুবি, মৌসুমি, রাজি, শরবতি, সরকারি, হজমি, হিসাবি/হিসেবি ইত্যাদি।

১১.৭ কিছু দেশি-বিদেশি সাধারণ বিশেষ্য শব্দেও হ্রস্ব ই-কার লেখা হবে।

যেমন:কবুলতি, কাঁসারি, কেরামতি, কোরবানি, ক্যারদানি, খবরদারি, গোলামি, চালাকি, চালিয়াতি, জবানবন্দি, জালিয়াতি, টিটকিরি, ঠগি, ঠুংরি, ডুগডুগি, ঢাকি (যারা ঢাক বাজায়), থানকুনি, দেহলি, পড়শি, ফরিয়াদি, সরফরাজি, সালিশি, হম্বিতম্বি, হালালি, হুজ্জতি ইত্যাদি।

১১.৮ সংস্কৃত -ঈয় প্রত্যয় যদি বিশেষণার্থে বিদেশি শব্দ বা অ-তৎসম শব্দ বা শব্দাংশের সঙ্গে যুক্ত হয় সে ক্ষেত্রে দীর্ঘ ঈ-কার বজায় রাখতে হবে। যেমন:অস্ট্রেলীয়, আর্টেজীয়, আলজিরীয়, ইউরোপীয়, ইতালীয়, এশীয়, কানাডীয়, ক্যারিবীয়, ক্যালাডোনীয়, জর্জীয়, পোলিনেশীয়, লাইবিরীয়, সাইবেরীয় ইত্যাদি।

১২. হ্রস্ব-দীর্ঘ ই-কার : কী/কি

১২.১ ‘কী’-র অর্থগত প্রয়োগ কখনও কর্মবাচক সর্বনাম, কখনও প্রশ্নমূলক সর্বনাম, কখনও বিশেষণের বিশেষণ :

“তুমি কী দেখেছ বলবে তো!”
বা “কী চমকার!”
“কী শোভা, কী ছায়া গো!”

বিকল্পাত্মক বিশেষণ হিসেবেও কী ব্যবহৃত হবে :

“কী রাম কী শ্যাম, দুটোই সমান পাজি!”

এইসঙ্গে সমজাতীয় ব্যাকরণসূত্রে কীসে এবং কীসের দীর্ঘ ঈ-কার দিয়ে লেখা উচিত এবং তার প্রচলন বাড়ছে।

“তুমি কী দেখেছ?”—এর উত্তর হবে শ্রোতা যা দেখেছে তার নাম বা বর্ণনা।

এরকম আরও প্রয়োগ—

“কী চাই?”
“কী ভেবেছ?”
“ওরে কী শুনেছিস ঘুমের ঘোরে।”

কীরকম, কী জন্য, কী রে, কী হে—এগুলিতেও কী হবে।

কীভাবে, যেমন হবে ‘কেমন করে’ অর্থে—

“খাব কী—সে খাবার খাওয়া আমার একার সাধ্য নয়।”
“কী শুনব ওর গান—ভয়ংকর বেসুরো!”

১২.২ কিন্তু, যে-প্রশ্নের উত্তর ‘হ্যাঁ’ হবে কিংবা ‘না’ হবে (Yes/No question), সেক্ষেত্রেই শুধু হ্রস্ব ই-কারযুক্ত ‘কি’ ব্যবহৃত হবে।

“তুমি কি বইটা দেখেছ?”—এর উত্তর হবে ‘হ্যাঁ’ কিংবা ‘না’।

উচ্চারণে হ্যাঁ-না প্রশ্নের ‘কি’-তে বল (stress) নেই, কিন্তু অন্য ‘কী’-তে আছে। তাতেও এ দুটি পৃথক হয়ে যায়।

চাই-কি, বই-কি, এমনকি-তেও ‘কি’-তে হ্রস্ব ই-কার এই যুক্তিতেই গ্রহণীয়।

১২.৩ এই প্রসঙ্গে একসঙ্গে লেখা ‘এমনকি’ (“এমনকি আমিও কথাটা বলে ফেলেছি”) এবং পৃথক ‘এমন কী’ (“এমন কী [= কী এমন] ভালো খেলল অস্ট্রেলিয়া”)—এ দুয়ের তফাত খেয়াল করা দরকার।

প্রথম ‘এমনকি’-তে উচ্চারণের বল বা শ্বাসাঘাত নেই। দ্বিতীয়টিতে আছে, তাই বানানেও পার্থক্য বজায় থাকে।

১২.৪ এইভাবেই প্রভেদ করতে হবে ‘সে কী’ (বিস্ময়বাচক উচ্ছ্বাস) আর ‘সে কি’ (সাধারণ হ্যাঁ-না প্রশ্নের কি)-এর মধ্যে :

“ও এর মধ্যেই চলে গেছে? সে কী?”

“সে কি কাজটা শেষ করেছে?”
“সে কি আসে?”

১২.৫ বাংলায় দু-রকম ‘কিনা’ প্রচলিত—বিচ্ছিন্ন ও সংযুক্ত। যেমন :

“তুমি যাবে কি না?”
(= তুমি যাবে কি যাবে না?)

এখানে ‘কি’ ও ‘না’ পৃথক থাকবে।

কিন্তু,

“তুমি যাবে কিনা তাই উশখুশ করছ।”

এখানে ‘কিনা’ সংযুক্ত। দুটিতেই ক-এ হ্রস্ব ই-কার।

১২.৬ বিনির্দেশক (exclusive) ই-প্রত্যয় অন্তত গদ্যে পৃথকভাবে লেখাই সংগত। তাই,

“আজিই”, “কেবলি”, “তোমারি”, “সকলি”—এই বানান নয়; সঠিক বানান হবে—

আজই, কেবলই, তোমারই, সকলই।

গদ্যের ক্ষেত্রে এমনি (বনাম এমনই = অ্যামোনই), তেমনি (বনাম তেমনই), যেমনি (বনাম যেমনই)—বানানগুলিও উচ্চারণানুসারে ব্যবহৃত হবে।

পদ্যে মিল বা ছন্দের প্রয়োজনে অথবা প্রথাবশত এর ব্যতিক্রম হয়ে থাকে। যথা :

“যৌবনেরি ঝড় উঠেছে”
“এমনি করে ঘুরিব দূরে বাহিরে”

১৩. হ্রস্ব উ-কার, দীর্ঘ ঊ-কার

১৩.১ অ-তৎসম শব্দে বিকল্পহীনভাবে হ্রস্ব উ-কার ব্যবহার সর্বতোভাবে সমর্থনযোগ্য। সুতরাং ‘ধূলো’, ‘পূজো’ না-লিখে লিখতে হবে ‘ধুলো’, ‘পুজো’। এ-রকমভাবেই : উনিশ, চুন, চুনি, চুল, জুয়া, পুব ইত্যাদি।

১৩.২ দীর্ঘ ঊ-কারযুক্ত তৎসম শব্দ কিংবা উপসর্গের সঙ্গে বাংলা প্রত্যয় কিংবা শব্দ যুক্ত হলেও দ্রুত অর্থবোধের সহায়ক বলে মূলের দীর্ঘ উ/ঊ-কার বজায় রাখাই বিধেয়। তাই : ধূর্তামি, মূর্খামি, পূজারি।

১৩.৩ কিন্তু শব্দগুলি অর্ধতৎসম রূপ গ্রহণ করলে দীর্ঘ ঊ-কারের বদলে হ্রস্ব উ-কারই গৃহীত হবে। যেমন:ঊনতিরিশ, উনচল্লিশ, উনপঞ্চাশ, উনপাঁজুরে, ধুতুমি, মুখুমি, পুজুরি ইত্যাদি।

অর্থাৎ তদ্ভব ও অর্ধতৎসম কথ্যরূপে যে শব্দগুলি পাই, সে-সবের বানানে ব্যুৎপত্তি থেকে উচ্চারণের দিকে কিছুটা সরে আসা বাঞ্ছনীয়।

১৪. ও-কার

১৪.১ ও-ধ্বনির উচ্চারণ বোঝানোর জন্য কোনো কোনো শব্দের বানানে ও-কার যোগ করা সংগত কি না—এই সমস্যার নিরসনে সিদ্ধান্ত হল, এইসব শব্দে ও-কারান্ত রূপ থাকুক। যেমন :

কালো, খাটো, ছোটো, ছোটোগল্প, বড়ো, বড়োদিন, ভালো, ভালোবাসা, মতো ইত্যাদি।

এগারো, বারো, তেরো, চোদ্দো, পনেরো, ষোলো, সতেরো, আঠারো ইত্যাদি।

কিন্তু, এত, কত, তত, যত ইত্যাদি শব্দে ও-কার অপ্রয়োজন।

ক্রিয়াপদে ও-কার কোথায় হবে তার জন্য ১৪.৭ দ্রষ্টব্য।

আজকাল “তা-বড়ো তা-বড়ো” কথাটি সম্প্রচারকদের মুখে “তা-বড় তা-বড়” হিসাবে শোনা যাচ্ছে। “তা-বড়ো” লিখলে এই ভ্রম ঘটবে না।

১৪.২ কোন্—কোন—কোনো—কোনও—এই বানানগুলির মধ্যে দুটি ভিন্ন অর্থে ‘কোন্’ (বিশেষ-বোধক প্রশ্নবাচক সর্বনাম, particularising which) আর ‘কোনো’ (অনিশ্চয়সূচক সর্বনাম, some/any) বোঝাতে ব্যবহার করা হবে।

অনেকগুলির মধ্যে কয়েকটি বোঝানোর জন্য লেখা হবে “কোনো কোনো”।

তেমনিভাবে : কখনও, কখনোই; আরও, কিন্তু আরোই।

১৪.৩ too অর্থে ‘ও’ অর্থাৎ সংযোগাত্মক (inclusive) প্রত্যয় ও-কে ও দিয়ে (ও-কার শব্দের সঙ্গে যোগ না করে) লেখাই উচিত। তাই:আজও, আরও, এখনও, তোমারও, রামেরও লেখা হবে; “আজো”, “আরো”, “এখনো”, “তোমারো”, “রামেরো” নয়।

পদ্যের স্বাভাবিক অভ্যাসে কিংবা ছন্দবিচারে সম্ভাব্য বিভ্রমের আশঙ্কায় বানানে ও-কার থাকতে পারে। যেমন : “আরো আরো প্রভু, আরো আরো”

১৪.৪ আদি দল বা অক্ষরে (syllable-এ) স্বরধ্বনি অ-যুক্ত মূল শব্দের সঙ্গে -উয়া প্রত্যয় জুড়ে যে-রূপ হয় (জল + উয়া > জলুয়া), তার আধুনিক রূপে দুটো ও-কার দেওয়াই সংগত হবে। তাই :

জলুয়া > জোলো
পড়ুয়া > পোড়ো
পটুয়া > পোটো

এইভাবে : খোলো (হুঁকো), ঝোড়ো, টোকো (-ফল) ইত্যাদি।

১৪.৫ কোনো কোনো ক্ষেত্রে বিশেষণের “-লো” প্রত্যয় ও-কার ছাড়া লেখার প্রবণতা দেখা যায়। যেমন :

ঘোরাল, ছুঁচোল, জোরাল, ধারাল, টিকোল, প্যাচাল।

এতে উচ্চারণ-বিভ্রান্তির আশঙ্কা থাকে বলে শব্দগুলির বানানে ল-প্রত্যয়ের ও-কারান্ত উচ্চারণ বজায় রাখা বাঞ্ছনীয়।

তাই : ঘোরালো, ছুঁচোলো, জোরালো, টিকোলো, ধারালো, প্যাঁচালো ইত্যাদি। এভাবেই : ভয়াল।

কিন্তু দাঁতাল (হাতি), দাঁতালো নয় (এখানে প্রত্যয়টি -আল)।

১৪.৬ ‘তো’ এবং সেই সূত্রে ‘হয়তো’, ‘নয়তো’ ও-কারযুক্ত করার প্রস্তাবও উচ্চারণসংগত। রূপে নিম্নবর্ণিত পার্থক্যগুলি বজায় থাকা বিধেয়।

১৪.৭ ক্রিয়াপদের বিভিন্ন নিত্যবর্তমানকালে নিয়মিত অভ্যস্ত ঘটনা বোঝাতে ক্রিয়ায় অ-কারান্ত রূপ হবে।

যেমন : তুমি কোন্ কাগজ পড়?
এইরকম শোন, ভাব, কাট।

বর্তমান অনুজ্ঞা বোঝাতে ক্রিয়ায় ও-কারান্ত রূপ হবে : এটা পড়ো / শোনো / ভাবো / কাটো তো দেখি।

তুচ্ছার্থক বর্তমান অনুজ্ঞা বোঝাতে ক্রিয়ায় শেষ ব্যঞ্জনে হস্‌ চিহ্ন : তুই পড়্ / শোন্ / ভাব্ / কাট্।

ভবিষ্যৎ অনুজ্ঞায় অর্থাৎ আদেশে, অনুরোধে ক্রিয়ায় একাধিক ও-কার : এ বইটা অবশ্যই পড়ো।
এইরকম : শুনো, ভেবো, কেটো, দেখিয়ো।

ক্রিয়াটি তুচ্ছার্থ হলে : পড়িস, শুনিস, ভাবিস, কাটিস, দেখাস।

‘বস্’ ধাতুর ক্ষেত্রে বর্তমান ও ভবিষ্যৎ উভয় ক্ষেত্রেই অনুজ্ঞার রূপ হবে “বোসো”। তুচ্ছার্থক: বসিস।

আরও দ্রষ্টব্য : এই অংশের শেষে অনুজ্ঞা ও ভবিষ্যৎ অনুজ্ঞার বানান বিষয়ে প্রস্তাব (১৪.১২, ১৪.১৩)।

১৪.৮ তবে ক্রিয়াপদের অতীত ও ভবিষ্যৎ রূপে শেষ বর্ণে ও-কার বর্জনীয়; অর্থাৎ :বলল, বলত, বলব

লেখা হবে; “বললো”, “বলতো”, “বলবো” ইত্যাদি নয়।

হল (< হইল), হত (< হইত) ও-কার ছাড়াই লিখতে হবে। সাধুভাষায় এসব প্রয়োগে বিভক্তিতে ও-কার ছিল না। চলিত ক্রিয়ারূপেও ও-কার দেবার প্রয়োজন নেই।

১৪.৯ সাধিত ধাতু থেকে নিষ্পন্ন ক্রিয়াবাচক বিশেষ্যের শেষে “-নো” থাকবে। যেমন :

করানো (করান নয়)।

এইভাবে : খাওয়ানো, চালানো, দেখানো, পাঠানো, বলানো, লাগানো, শোনানো ইত্যাদি।

১৪.১০ কোথাও কোথাও দ্বি-দল (bisyllabic) ধাতুর দ্বিতীয় ব্যঞ্জনে ও-কার বর্জন করা হয়। যেমন:এগবে, জুড়ল, পিছবে, পৌঁছল, ফুরল, লুকবে।

এই বানানরীতি যুক্তিহীন; তাই লিখতে হবে:এগোবে, জুড়োল, পিছোবে, পৌঁছোল, ফুরোল, ভিড়োবে, লুকোবে ইত্যাদি।

এর পক্ষে যুক্তি দু-রকম।

এক, ধ্বনিতত্ত্বের যুক্তি: লুকা-, জুতা-, ফুরা- প্রভৃতি ধাতু স্বরসংগতিগত ধ্বনিপরিবর্তনে লুকো-, জুতো-, ফুরো- হয়েছে; যে নিয়মে মুলা থেকে মুলো, সুতা থেকে সুতো হয় সেই একই নিয়মে। আমরা “মুল”, “সুত” শিখি না। সুতরাং লুকো-, ফুরো- ইত্যাদির সঙ্গেই বিভক্তি যোগ হবে।

দুই, সমরূপতার সম্ভাবনা এড়ানোর যুক্তি :

“ভিড়বে” আর “ভিড়োবে”-র প্রথমটি প্রযোজক নয়, দ্বিতীয়টি প্রযোজক ক্রিয়া। বানান এক (ভিড়বে) হলে “নৌকো ভিড়বে”, আর মাঝি “নৌকো ভিড়োবে”—এ দুয়ের মধ্যে তফাত রাখা যাবে না; যেমন যাবে না “ভিজবে” আর “ভিজোবে”-র মধ্যে।

এইরকমভাবে তফাত রাখা দরকার :

জুড়ল (ছেঁড়া পাতা জুড়ল),
জুড়োল (ঠান্ডায় শরীর জুড়োল)

—ইত্যাদির মধ্যে।

এই যুক্তিতে লেখা উচিত :

দৌড়োনো, পুরোনো, পৌঁছোনো

—“দৌড়নো”, “পুরনো”, “পৌঁছনো” নয়।

এমনকি বিশেষণ শব্দ “পুরানো”-র মৌখিক রূপ হবে “পুরোনো”, “পুরনো” নয়।

১৪.১১ সমাপিকা এবং অসমাপিকা ক্রিয়ার কোনো রূপেই অভিশ্রুতি বা স্বরসংগতিতে ও-কার বা ঊর্ধ্বকমার প্রয়োজন নেই।

সুতরাং “ব’লছে”, “ক’রছে” নয়; লিখব :

বলছে, করছে।

“বোলে” বা “ব’লে” নয়, লিখতে হবে :

বলে।

তেমনই :

করে, হয়ে, সয়ে, পড়ে, চলে।

তবে বিশেষ ক্ষেত্রে অর্থবোধে সংশয় দেখা দিলে অসমাপিকায় ঊর্ধ্বকমার প্রয়োগ চলতে পারে। যথা :

“এমনি ক’রে কেউ ভুল করে?”

১৪.১২ এই কয়েকটি ক্রিয়াপদের অনুজ্ঞা-রূপে ও-উচ্চারণ বোঝানোর জন্য ও-কার প্রয়োগ সংগত। যেমন :

বোসো (কিন্তু : বোস্‌, বসুন),
হোয়ো (কিন্তু : হও, হল, হত)।

১৪.১৩ সাধিত প্রযোজক ধাতুর ভবিষ্যৎ অনুজ্ঞায় “-ইও”-র বদলে “-ইয়ো” লেখাই সংগত। অর্থাৎ—

করিয়ো, দিয়ো, দেখিয়ো, শুনিয়ো ইত্যাদি।

সিদ্ধ স্বরান্ত ধাতুর মধ্যম পুরুষের অনুজ্ঞার ক্ষেত্রেও ওইভাবে “-য়ো” হবে। যেমন :

খেয়ো, দিয়ো, যেয়ো ইত্যাদি।

১৫. ঐ-কার, ঔ-কারের বিশ্লেষ

১৫.১ সাধারণভাবে অ-তৎসম শব্দে ঐ-কার বা ঔ-কারের বদলে অই বা অউ ব্যবহার প্রয়োজনমতো করা যেতে পারে। যেমন :

কই, দই, বই (বই-কি), হইচই, পইতে, রইরই, পইপই, চইচই (হাঁসকে ডাকার শব্দ)

ইত্যাদি শব্দ ঐ-কার ছাড়া লেখা হতে পারে।

তেমনই :

বউ, মউ

—কে ঔ-কার ছাড়া।

১৫.২ তবে, কৈফিয়ত, চৌবাচ্চা, চৌরঙ্গি, তৈরি, বৈঠক, মৌমাছি, মৌরলা, মৌরি, মৌলবি, মৌলানা, মৌলালি, মৌসুমি, সৈয়দ ইত্যাদি বানান প্রচলন মেনে লেখা হবে।

১৬. ঙ এবং ঙ্গ, ত এবং ৎ

১৬.১ কিছু কিছু অ-তৎসম শব্দে ঙ এবং ঙ্গ—দুই বানানই নির্বিচারে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। যেমন :

ভাঙা-ভাঙ্গা, বাঙালি-বাঙ্গালি।

এসব ক্ষেত্রে মান্য উচ্চারণের ভিত্তিতে ঙ-ই লেখা হবে। যেমন :

আঙুর, আঙুল, কাঙাল, গোঙানি, চাঙড়, টাঙানো, ডাঙশ, ডাঙা, ডিঙি, ডোঙা, ঢ্যাঙা, ধাঙড়, নোঙর, পাঙাশ, বাঙালি, ভাঙা, ভেঙে, রাঙা, রঙিন, লাঙল, হাঙর ইত্যাদি।

১৬.২

যেখানে সাধারণত ঙ্গ উচ্চারণ হয়, সেখানে গ্-যুক্ত ঙ অর্থাৎ ঙ্গ-ই লিখতে হবে। যেমন :

চুঙ্গি, জঙ্গল, জঙ্গি, দাঙ্গা, লুঙ্গি, হাঙ্গামা ইত্যাদি।

প্রসঙ্গত ২.১ এবং ৮.১ সূত্র দ্রষ্টব্য।

১৭. জ এবং য

১৭.১ কিছু কিছু অর্ধতৎসম ও তদ্ভব শব্দে জ-এর বদলে য ব্যবহার করলে মূল শব্দটির কথা স্মরণ করে দ্রুত অর্থবোধের সহায়তা হতে পারে। এজন্য নিম্নলিখিত ক্ষেত্রগুলিতে জ-এর বদলে মূলের য রাখা হবে। যেমন :

যখন, যত, যদ্দিন, যত্তন্না, যন্তর, যবে, যাওয়া, যিনি, যে, যোঝা ইত্যাদি।

১৭.২ তবে প্রচলিত কয়েকটি ক্ষেত্রে য-এর বদলে জ হবে। যেমন : কাজ, জাঁতা, জাউ, জাদু, জুঁই, জুতসই, জো, জোগাড়, জোগান, জোড়, জোড়া, জোত, জোয়াল, হজরত ইত্যাদি।

১৭.৩ উচ্চারণ অনুসারে “জিশু” (Jesus) লেখা সংগত।

১৮. ণ এবং ন

১৮.১ সংস্কৃত ণত্ব-বিধান কেবল তৎসম শব্দের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। তৎসম নয়, ব্যাকরণের নিয়মে পরিবর্তিত অথবা বাংলা শব্দে দন্ত্য ন হবে। যেমন :

অঘ্রান, কান, কোনাকুনি, ঘরানা, চিরুনি, চুন, ঠাকরুন, দরুন, নরুন, পুরানো/পুরোনো, মানিক, রানি, সোনা ইত্যাদি।

১৮.২ অ-তৎসম শব্দে মূর্ধন্য বর্গের বর্ণের সঙ্গে যুক্ত ণ-এর বদলে দন্ত্য ন গ্রাহ্য হবে। যেমন :

গন্ডার, ঝন্টু, ঝান্ডা, ঠান্ডা, প্যান্ট, প্যান্টালুন, ফ্যান্টা, মুন্ডা, মুন্ডারি, লন্ঠন, লন্ডভন্ড ইত্যাদি।

কিন্তু কয়েকটি প্রচলিত অর্ধতৎসম শব্দে ণ ব্যবহার করাই যায়। ফলে :

কুণ্ডু, মুণ্ডু

লেখা যেতেই পারে।

১৮.৩ পুণ্য, গণ্য ইত্যাদি শব্দের কথ্য বানানে :

পুণ্যি, গণ্যি

—এই রূপভেদ চলবে।

১৯. য-ফলা

১৯.১ অ-তৎসম শব্দে য-ফলা ব্যঞ্জনদ্বিত্বের মতো উচ্চারিত হলেও সবক্ষেত্রে নয়। তাই বিশেষত অর্ধতৎসম শব্দে য-ফলা রাখা হয়েছে। তাই :

কাব্বি, জন্নে, দিব্বি, নসি, ভুঞ্জি, সান্ধি, সুজ্জি

ইত্যাদি না-লিখে :

কাব্যি, জন্যে, দিব্যি, নস্যি, ভুজ্যি, সাধ্যি, সুয্যি

হিসাবে লেখা হোক।

তবে বিদেশি শব্দ :

হিস্যা লেখা হোক হিস্সা,
লস্যি হোক লসি।

প্রসঙ্গত, “মফঃস্বল” বর্জন করা সম্ভব নয়; লেখা হোক “মফস্সল”।

২০. শ ষ স

অ-তৎসম, বিশেষত তদ্ভব শব্দে শব্দবিশেষের ক্ষেত্রে স্বতন্ত্র নির্দেশ না থাকলে শ-ষ-স তিনটিরই স্থানোচিত ব্যবহার হবে। যেমন :

পিসি, পিসশাশুড়ি, ভাশুর, মাসি, মোষ, ষাঁড়, ষোলো।

প্রচলন অনুযায়ী আকাদেমি বানান অভিধানে যথাস্থানে সংশ্লিষ্ট বানান পাওয়া যাবে।

২১. ক্ষ এবং খ

ক্ষিদে, ক্ষুদ, ক্ষেত, ক্ষ্যাপা ইত্যাদি তদ্ভব শব্দে ক্ষ-এর বদলে খ ব্যবহারই সংগত। লিখতে হবে :

খিদে, খুদ, খেত, খ্যাপা।

এভাবেই লেখা হবে :

খিরাই।

কিন্তু “ক্ষীর” তৎসম শব্দ বলে “ক্ষীর”ই থাকবে।

২২. বিদেশি শব্দ-বিষয়ে

২২.১

১১.১ সূত্রের ব্যাখ্যায় প্রসঙ্গত বলা যায়, বাংলা শব্দভাণ্ডারে আরবি-ফারসি-তুর্কি ইত্যাদি মধ্যপ্রাচ্যীয় ভাষার শব্দ, ইংরেজি-ফরাসি-জার্মান-পোর্তুগিজ প্রভৃতি ইউরোপীয় ভাষার শব্দ, জাপানি-বর্মি ইত্যাদি বহির্ভারতীয় যে-কোনো ভাষার শব্দ, ঋণশব্দরূপে কিংবা ধ্বনিপরিবর্তনের মধ্য দিয়ে ব্যবহৃত হলেও তা বিদেশি শব্দ রূপেই গণ্য হয়ে থাকে। এইজাতীয় শব্দের বানান বাংলা-উচ্চারণের কাছাকাছি আনাই বানান-সমতার উদ্দেশ্য, যা পরবর্তী সূত্রগুলিতে বিবৃত হয়েছে।

২২.২ বাংলা শব্দভাণ্ডারে গৃহীত বিদেশি শব্দে দীর্ঘ স্বরচিহ্নের বদলে হ্রস্ব স্বরচিহ্ন ব্যবহৃত হবে। নীচে সেসব শব্দের একটি সংক্ষিপ্ত তালিকা দেওয়া হল :

ইগল, ইদ, ইঞ্জিনিয়ার, ইভ, ইস্ট, ইস্টার, কমিটি, কাজি, কিডনি, ফ্রিজ, ক্রিম, ক্লিন, খ্রিস্টান, গির্জা, টিপ (cheap), জানুয়ারি, টিক (teak), টিন, টিম, ডিগ্রি, থ্রি, নবিশ, নেভি, পিল, প্লিডার, ফি, ফিরিঙ্গি, ফ্রি, বিচ (beach), বিন (bean), ব্রিজ, ব্রিফ, মিটিং, মিলিটারি, মুভি, রিডার, রিম, রিল, রেফারি, লিগ, লিড, লিডার, লেডি, শেলি, সিজার, সিড, সেক্রেটারি, স্টিম, স্টিল, স্ট্রিট, হাজি, হিজরি ইত্যাদি।

২৩. বিদেশি শব্দে মূর্ধন্য ণ নয়

২৩.১ বিদেশি শব্দের ক্ষেত্রে সংস্কৃত ণত্ববিধিসম্মত মূর্ধন্য ণ ব্যবহৃত হবে না; সর্বত্রই দন্ত্য ন ব্যবহার করা হবে। অর্থাৎ এখানে উচ্চারণের সংস্কৃত ধ্বনি-সূত্র প্রযোজ্য নয়। যেমন :

আয়রন, ইরান, কনসার্ন, কন্ট্রাকটর, কন্ট্রোলার, কর্নওয়ালিশ, কার্নিশ, কার্নেশন, কার্বন, কুর্নিশ, কোরান, কেন, গভর্নর, টার্নিং, টার্মিনাল, ট্রেন, পরগনা, ফার্ন, বায়রন, বোর্নিয়ো, ব্যারন, ব্রেবোর্ন, মেলবোর্ন, রান, রোমান, লন্ঠন, লন্ডন, হর্ন ইত্যাদি।

২৪. বিদেশি শব্দে শ-স

২৪.১ নীচের আরবি-ফারসি-তুর্কি প্রভৃতি শব্দে স ব্যবহারই চলবে :

ইসলাম, তসবির, ফারসি, মুসলিম, মুসলমান, সাদা, সালাম, সাবান, সাহেব, সিতারা, সুলতান, সোফিয়া ইত্যাদি।

২৪.২ আমাদের অভ্যাসের মধ্যে এসে গেছে বলে এই জাতীয় কিছু কিছু শব্দ তালব্য শ দিয়ে লেখা হবে। যেমন :

আপশোশ, আয়েশ, উশুল, ওয়াশিল, কিশমিশ, কুরুশ, কোশিশ, চাপরাশি, তপশিল, তহশিল, পোশাক, বকশিশ, বাদশাহি, বালিশ, মজলিশ, শিশমহল, হুঁশিয়ার ইত্যাদি।

২৪.৩ নিম্নবর্ণিত ইংরেজি ও বিদেশি শব্দগুলির বাংলা রূপে তালব্য শ ব্যবহৃত হবে :

অ্যাশট্রে, কার্নিশ, ক্রুশ (-বিদ্ধ), ক্লেশ, নোটিশ, বার্নিশ, পালিশ, পুলিশ, মেশিন, রাবিশ, শপ, শিয়োর, মুগার, শুটিং (shooting), শ্যালো, হাশিশ ইত্যাদি।

২৪.৪ ইংরেজি S-এর উচ্চারণ বাংলা শব্দে বজায় থাকলে তা দন্ত্য স দিয়েই লেখা উচিত হবে।

যেমন : কেস, ক্রস (ক্রশ নয়), ক্রসিং, জুস (juice), নার্স, নার্সারি (নার্শারি নয়), পাস (pass), পার্স, প্র্যাকটিস (প্র্যাকটিশ নয়), মিস, মেস, সুট, সুটকেস (সুটকেশ নয়), সুটিং (suiting) ইত্যাদি।

২৪.৫ st বর্ণগুচ্ছ-বিশিষ্ট ইংরেজি শব্দে স্ট ব্যবহার করতে হবে। যেমন :

খ্রিস্ট, পোস্ট, পোস্টার, মাস্টার, স্টেশন, স্টোর, স্ট্রিট ইত্যাদি।

২৪.৬ ভারতীয় বাংলায় য দিয়ে Z-উচ্চারণ বোঝানোর রীতি মান্যতা পায়নি। তাই :

অযু বা ওযু নয়, অজু বা ওজু;
আযাদি নয়, আজাদি;
নামায নয়, নামাজ;
হযরত নয়, হজরত ইত্যাদি।

২৫. র-ফলা বাংলায় সংস্কৃত ঋ-ধ্বনির মূলানুগ উচ্চারণ হয় না। তাই বিদেশি শব্দের ক্ষেত্রে বানানে ঋ-কার ব্যবহার না-করে উচ্চারণে র-ফলা ই-কার ব্যবহার করাই উচিৎ।

তাই : খৃস্ট নয়, খ্রিস্ট;
বৃটিশ নয়, ব্রিটিশ।

এইভাবে : ব্রিটেন, ব্রিস্টল ইত্যাদি।

২৬. ব্যঞ্জনপূর্ব র্-রেফ

২৬.১ হলন্ত র-এর পর ব্যঞ্জন থাকলে সাধারণভাবে র রেফ হয়ে পরবর্তী ব্যঞ্জনের মাথায় বসবে। এমন কয়েকটি অ-তৎসম শব্দের দৃষ্টান্ত :

উর্দি, উর্দু, কার্তুজ, গর্দান, গির্জা, জর্দা, পর্দা, বৰ্মা, বর্মি, তুর্কি, মার্কেট, সর্দার ইত্যাদি।

২৬.২ তবে সমাসবদ্ধ বা বিদেশি উপসর্গযুক্ত বা প্রত্যয়নিষ্পন্ন শব্দে অর্থবোধের সুবিধার জন্য রেফ না দিয়ে মূলের র বজায় থাকবে। যেমন :

কারচুপি, কারসাজি, খবরদার, গরমি, গরহাজির, জোরদার, তরতাজা, দরদাম, নজরদারি, বরকন্দাজ, বরখাস্ত, শোরগোল, হরতাল, হরদম, হরবোলা ইত্যাদি।

২৬.৩ এ ছাড়া তদ্ভব ধাতুর শেষ উপাদান র্ হলে তার পরবর্তী সংযোজনে ওই র-ফলা হিসাবে না লিখে পূর্ণ রূপেই লিখতে হবে। যেমন :

ঝরনা (ঝর্ + অন + আ),
ধরনা, ধরতাই, ভরতি, ভরতুকি ইত্যাদি।

২৭. ব্যক্তিনাম, পদবি, গ্রন্থনাম, স্থাননাম

২৭.১ ব্যক্তিনামের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি যে নাম লেখেন, আধুনিক বানানবিধি অনুযায়ী তা পুনর্লিখনযোগ্য হলে সেই পুনর্লিখন প্রত্যাশিত। পদবির ক্ষেত্রে পদবিধারী যদি আধুনিক বানান গ্রহণ করেন (যেমন, অমিতাভ চৌধুরি) তাঁকে মান্য করা উচিত। যাঁরা প্রচলন অনুসরণ করবেন তাঁদের বানানও গ্রাহ্য। কেবল রেফের পরে দ্বিত্বের প্রয়োগ না করাই উচিত।

২৭.২ ব্যক্তিনামের সংক্ষেপিত বা খণ্ডিত রূপের ক্ষেত্রে মূল তৎসম শব্দের ঈ-কার ঊ-কার রক্ষণীয়। যেমন:ধীরেনবাবু, শচীনকাকা, ভূপেনদা, রূপেন, রবীন, ফণীকাকা, শশীবাবু ইত্যাদি।

অন্য বিদেশি নামের বাংলা বানানে অবশ্য ই-কার ব্যবহার্য : Robin → রবিন Shelley → শেলি

তবে অর্ধতৎসম বা খণ্ডিত নামের ক্ষেত্রে ণত্ববিধি অবাঞ্ছিত। যেমন : বরেন, বারীন।

২৭.৩ সুপরিচিত বা প্রাচীন গ্রন্থনামে মূল বানান মান্য। অর্থাৎ : ‘পথের পাঁচালী’-কে ‘পথের পাঁচালি’ বা ‘রাজা ও রানী’-কে ‘রাজা ও রানি’ লেখা বাঞ্ছনীয় নয়।

তবে গ্রন্থনামের সংরক্ষিত এলাকার বাইরে শব্দগুলি সাধারণভাবে ব্যবহৃত হলে অ-তৎসম শব্দের বানান-সংক্রান্ত সাধারণ নিয়ম অনুসরণ করতে হবে। যেমন : পরিচিত গ্রন্থনামে ‘কাহিনী’, ‘পূরবী’, ‘রূপসী’ (বাংলা), (পথের) ‘পাঁচালী’ রক্ষণীয়।

কিন্তু সাধারণ ক্ষেত্রে শব্দগুলির ব্যবহার্য বানান হবে :কাহিনি, পাঁচালি, পুরবি, রানি, রূপসি ইত্যাদি।

২৭.৪ বাঙালিদের পদবির ইংরেজি ধরনের বানানে—ব্যানার্জি, চ্যাটার্জি, গাঙ্গুলি ইত্যাদিতে হ্রস্ব ই-কার দিতে হবে, দীর্ঘ ঈ-কার নয়।

২৭.৫ অ-তৎসম শব্দের বানান পরিবর্তনের সূত্রে স্থাননামের বানানেও কিছু কিছু পরিবর্তন ঘটছে। যেমন :

নদীয়া → নদিয়া
নৈহাটী → নৈহাটি
দীঘা → দিঘা
মেমারী → মেমারি
রাণাঘাট → রানাঘাট

এই প্রবণতা সংগত ও মান্য।

২৮. লিখনরীতি-বিষয়ে সিদ্ধান্ত

সমাসে শব্দবন্ধন ও হাইফেন-প্রয়োগ

২৮.০ বাংলা বানানের পরিপূরক বা পরোক্ষভাবে সংশ্লিষ্ট, সমাসবদ্ধ তথা যৌগিক শব্দ বিন্যাসের পদ্ধতি নিয়েও বিশৃঙ্খলা-নিবারণের ও একরূপতা-আনয়নের কারণে কিছু সিদ্ধান্ত নেওয়া দরকার। কোন্ শব্দগুচ্ছ একসঙ্গে লেখা হবে, কোন্‌গুলিকে পৃথক রাখা হবে বা হাইফেন দিয়ে যুক্ত করা হবে, সে সম্বন্ধেও সংশয়-নিবারক ও সর্বজনগ্রাহ্য কতকগুলি সাধারণ নিয়ম পরবর্তী সূত্রগুলিতে দ্রষ্টব্য

২৮.১ যেসব ক্রিয়াসূচক বা ক্রিয়াজাত বিশেষ্য বা বিশেষণ পদ একাধিক অংশে বিভক্ত এবং সাধারণভাবে দুটি ক্রিয়াযুক্ত বাক্যাংশ-সমাস (Syntactical Compound) বলে মনে হয়, সেগুলিতে হাইফেন ব্যবহার করা হয়ে থাকে। সুতরাং সেটি অনুসরণ বাঞ্ছনীয় :

খসে-পড়া (“মালা হতে খসে পড়া ফুলের একটি দল”)

চোখে-চাওয়া (“চোখে-চাওয়ার সকল বাঁধন”)

ভুলে-যাওয়া (“ভুলে-যাওয়ার বোঝাই ভরি”)

২৮.২ দুই বা দুইয়ের বেশি শব্দ নিয়ে তৈরি অনুরূপ বাক্যাংশমূলক সমাসবদ্ধ বিশেষণ জাতীয় শব্দের ক্ষেত্রেও হাইফেন ব্যবহার বাঞ্ছনীয়।

যেমন : নাম-না-জানা, সদ্য-ভরতি-হওয়া, না-বলা, না-দেখা, কত-না ইত্যাদি।

২৮.৩ সংস্কৃত সূত্রে সন্ধি করা হয় কিন্তু বাংলায় ব্যবহারে বহুক্ষেত্রে সন্ধি করা হয় না— এমন সমাসবদ্ধ পদে হাইফেন দেওয়াই সংগত।

যেমন : ঘন-আড়ম্বর, প্রয়োজন-উদ্ভূত, বিদ্যুৎ-আলোক, বেলা-অবেলা, ভবিষ্যৎ-ভাবনা, স্বেচ্ছা-অবসর ইত্যাদি।

২৮.৪ পূর্বতন ৪.২ সূত্রে বর্ণিত তৎসম উদাহরণ-ক্ষেত্র-বহির্ভূত প্রয়োগে প্রাতিপদিকের সঙ্গে সন্ধি না-করে কর্তৃকারকের একবচনের রূপের সঙ্গে অন্য শব্দের সমাস করলে বিকল্পে হাইফেন ব্যবহার সংগত।

যেমন : যশ-ইচ্ছা,
কৃতী-সংবর্ধনা, ছন্দ-প্রকরণ ইত্যাদি।

শেষ উদাহরণটি বিষয়ে বক্তব্য : সংস্কৃত ‘ছন্দস্’-এর কর্তৃকারক একবচনের রূপ ‘ছন্দঃ’ হলেও বাংলায় তার অর্ধতৎসম রূপ ‘ছন্দ’ই মূলশব্দ হিসেবে দীর্ঘদিন প্রচলিত। তাই আধুনিক প্রয়োগে সমাসের পূর্বপদ হিসেবে ‘ছন্দ’ লেখা বিধিসম্মত। (৫.৩ সূত্র দ্রষ্টব্য)

২৮.৫ নতুন সমাসবদ্ধ বা যৌগিক শব্দের ক্ষেত্রে বিশেষত আধুনিককালে ব্যবহার্য কোনো বিষয় নির্দেশে অর্থবোধের সুবিধার জন্য সমস্যমান বা যোজ্যমান শব্দগুলির মধ্যে ফাঁক না-রেখে হাইফেন দেওয়াই বাঞ্ছনীয়।

যেমন : ই-মেল, উপগ্রহ-মাধ্যম-সংযোগ-ব্যবস্থা, এক-জানালা-বন্দোবস্ত, দূরদর্শন-উপস্থাপনা, টেলি-যোগাযোগ ইত্যাদি।

তবে দূরভাষ, চলভাষও মান্য।

আদ্যবর্ণমাত্রিক (acrostic) শব্দের ক্ষেত্রে হাইফেন বা ফুলস্টপ বা ফাঁক বর্জনীয়।

যেমন:এসটিডি, টিভি, বিবিসি, ভাজপা, লসাগু ইত্যাদি।

দুয়ের বেশি শব্দের দ্বন্দ্বসমাসের ক্ষেত্রে সংযোগচিহ্ন অর্থবোধে সহায়তা করে।

যেমন : আজকাল-পরশু, তেল-নুন-লকড়ি, বাপ-মা-ভাই-বোন, রাম-শ্যাম-যদু, রূপ-রস-শব্দ-গন্ধ-স্পর্শ, হাত-পা-নাক-কান।

২৮.৬ সমার্থক বা সমপর্যায়ের দুটি শব্দের সমাস হলে তা জুড়ে লেখাই সংগত।

যেমন : কাগজপত্তর, ঘরবাড়ি, টাকাপয়সা,ভেবেচিন্তে, বেঁচেবর্তে, বিদেশবিভুঁই, বন্ধুবান্ধব, রাজাবাদশা।

প্রতিধ্বন্যাত্মক যুগ্মশব্দও হাইফেনহীনই হয় (জলটল); ক্বচিৎ হাইফেন যুক্ত হয়, যেমন : চা-টা।

২৮.৭ তবে এ ক্ষেত্রে পরবর্তী শব্দটির গোড়ায় স্বরবর্ণ থাকলে হাইফেন দেওয়া বাঞ্ছনীয়।

যেমন : আশা-আকাঙ্ক্ষা, আমির-ওমরা, জ্যৈষ্ঠ-আষাঢ়, বিষয়-আশয়, ভাদ্র-আশ্বিন, রাজা-উজির ইত্যাদি।

২৯. না-নি-নে : কীভাবে লিখব

২৯.১ নঞর্থক বা নিষেধাত্মক ‘না’ যদি ক্রিয়াপদে ব্যবহৃত হয় তবে ‘না’-কে পৃথক লিখতে হবে।

যেমন : দেব না, বলি না, কোরো না, শুনল না, যেয়ো না।

২৯.২ কিন্তু, নিষেধাত্মক ও অতীতবাচক ‘নি’ যদি ক্রিয়াপদে যুক্ত হয় তবে তাকে ক্রিয়ারূপের সঙ্গে জুড়ে লেখাই সংগত; কারণ পূর্বপদের ধ্বনিপ্রবাহের ধারাবাহিকতার সঙ্গে পরবর্তী ‘নি’ যুক্ত এবং ‘নি’-র কোনো পৃথক ও স্বাধীন প্রয়োগ নেই।

তাই লিখব : হয়নি, করিনি, দেখিনি, শুনিনি, ধরেনি, ভাবেনি।

একই যুক্তিতে ‘নে’-ও ক্রিয়ারূপের সঙ্গে যুক্তভাবে লেখা হবে : করিনে, যাইনে, ভাবিনে।

সমাপিকা ও অসমাপিকার পূর্বে না-যোগ করার ক্ষেত্রে হাইফেন বাঞ্ছনীয়।

যেমন : না-এলে, না-খাবে।

২৯.৩ ‘না’ যখন বিশেষ অনুরোধের চিহ্ন, তখন তা ক্রিয়ার সঙ্গে জুড়ে অথবা হাইফেন বসিয়ে লিখতে হবে:

যাওনা / যাও-না,
বলোনা / বলো-না,
দেখোনা / দেখো-না।

কারণ এই ‘না’ পূর্ব ক্রিয়াপদকে নাকচ করছে না, বরং তারই একটা ধরন বোঝাচ্ছে; সেদিক থেকে এই ‘না’ সংশ্লিষ্ট ক্রিয়ার অর্থের অংশ।

৩০. যতিচিহ্ন-বিষয়ে

৩০.১ বাক্য যদি রোমক হরফে লেখা ইংরেজি বা অন্য বিদেশি শব্দ দিয়ে শেষ হয় তবে যতিচিহ্ন হিসাবে ফুলস্টপ (.) নয়, বাংলা বাক্যের সাধারণ রীতি অনুসারে দাঁড়ি (।) দেওয়া বিধেয়।

যেমন :

“গল্পটা খুব interesting ।”
“লোকটা dangerous ।”
“জার্মানির অন্য নাম Deutschland ।”

৩০.২ বিলিতি আদ্যবর্ণমাত্রিক (acrostic) শব্দ বাংলায় লিখতে ফুলস্টপ দেওয়ার দরকার নেই; এখন মূলেও দেওয়া হয় না।

তাই :

এম এ,
বি এ,
ডি লিট,
ডি ফিল,
পিএইচ ডি,
বি এসসি

ইত্যাদি।

ফাঁক সম্বন্ধে প্রয়োজন বুঝে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। (দ্রষ্টব্য ২৮.৫)

৩০.৩ বাক্যসমাপ্তিবাচক যতি না বুঝিয়ে কোনো শীর্ষনাম বা সূচি-নির্দেশক বা পঞ্জিকরণের প্রয়োজনে এক দাঁড়ি (।) অথবা দুই দাঁড়ি (॥) অথবা প্রথম বন্ধনী “( )” ব্যবহার্য।

৩০.৪ মূল রচনায় ব্যবহৃত হয়নি অথচ সম্পাদক-কর্তৃক সংযুক্ত, এমন শব্দের ক্ষেত্রে তৃতীয় বন্ধনী [ ] ব্যবহার্য

৩১. উদ্ধৃতিচিহ্ন-বিষয়ে

৩১.১ রচনার মধ্যে গ্রন্থ, পত্রিকা, নথি ইত্যাদির নাম দু-পাশে একটি করে ঊর্ধ্বকমার মধ্যে দেওয়া যায়; ছাপায় কেউ কেউ বিকল্পে ইটালিক্সও পছন্দ করেন।

যেমন : ‘গীতবিতান’ অথবা গীতবিতান

৩১.২ উদ্ধৃত অংশ দুটি ঊর্ধ্বকমার মধ্যে (“ ”), আবার তার মধ্যে উদ্ধৃত অংশে একটি করে ঊর্ধ্বকমা (‘ ’) ব্যবহার করা যেতে পারে। অবশ্য এর উলটোটাও ব্যবহৃত হতে দেখা যায়। অর্থাৎ মূল উদ্ধৃতি একটি ঊর্ধ্বকমার মধ্যে (‘ ’), আবার তার মধ্যে উদ্ধৃত অংশ দুটি ঊর্ধ্বকমার মধ্যে (“ ”)

দুটি রীতিই গ্রাহ্য। তবে বাংলা বানানবিধি প্রথম রীতিটিরই পক্ষপাতী।

৩১.৩ গ্রন্থনামের সঙ্গে সম্বন্ধ ও অন্যান্য বিভক্তিচিহ্ন ব্যবহারের প্রয়োজনে চিহ্নটির পূর্বে হাইফেন ব্যবহার করা সংগত।

যেমন : ‘গীতাঞ্জলি’-র কবি
‘বিসর্জন’-এর নাট্যকার
(‘বিসর্জনে’র নয়)

৩১.৪ যতিচিহ্ন ও উদ্ধৃতিচিহ্ন-সংক্রান্ত সূত্রগুলি ভাষাব্যবহারে বা লিখন-ব্যাপারে বাধ্যতামূলক মনে করার কারণ নেই। কেবল বানানের অনুষঙ্গে, ভাষায় মান্যতাদানের প্রয়োজনে এবং সর্বাঙ্গীণ সৌষ্ঠব ও শৃঙ্খলা-প্রবর্তনের উদ্দেশ্যেই এগুলি ক্রমশ সর্বজনগ্রাহ্য হবে ও ব্যবহারগৌরব অর্জন করবে—বানানবিধির পক্ষ থেকে এইমাত্র প্রত্যাশা

৩১.৫

১৪.১১ সূত্রে ক্রিয়াপদের কোন্ কোন্ ক্ষেত্রে ঊর্ধ্বকমা প্রয়োগ নিষ্প্রয়োজন, তা নির্দেশিত হয়েছে। এছাড়া লুপ্তস্বর বোঝাতে বা অনুরূপ প্রয়োগে অভ্যাসবশত ঊর্ধ্বকমা ব্যবহৃত হয়। ঊর্ধ্বকমার বদলে সেগুলি এভাবে লেখা সংগত :

দু’দুটো বছর → দু-দুটো বছর

দুশ’ তিনশ’ → দুশো-তিনশো

পরিশিষ্ট ২

বাংলা ক্রিয়াপদের বানান

বাংলা ক্রিয়াপদের সেই রূপগুলিই এখানে দেওয়া হয়েছে যেগুলি আকাদেমির বানান-নীতির সঙ্গে সম্পর্কিত। বাংলা ক্রিয়াপদের রূপের সব ক-টি রূপ এখানে দেওয়া প্রাসঙ্গিক নয়। কিছু কিছু ক্রিয়ার (যেমন ‘আংশানো’) সব রূপও নেই; সেগুলি বর্জিত হল

আউলানো, আওটানো, আওড়ানো, আঁকড়ানো।

আউলাচ্ছ, আউলাত, আউলাব, আউলাল, আউলিয়ে/আউলে, আউলিয়েছ, আউলিয়ো।

আওটাচ্ছ, আওটাত, আওটাব, আওটাল, আওটিয়ে/আওটে, আওটিয়েছ, আওটিয়ো।

আওড়াচ্ছ, আওড়াত, আওড়াব, আওড়াল, আওড়িয়ে/আওড়ে, আওড়িয়েছ, আওড়িয়ো।

পরিশিষ্ট ২

বাংলা ক্রিয়াপদের বানান (ক্রমশ)

আঁকড়াচ্ছ, আঁকড়াত, আঁকড়াব, আঁকড়াল, আঁকড়িয়ে/আঁকড়ে, আঁকড়িয়েছ, আঁকড়িয়ো।

আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রমিত বানান-রীতি

১. তৎসম শব্দে দীর্ঘ ঈ-কার বজায় থাকবে

যেমন :

গরীয়সী, মহীয়সী, শ্রেয়সী, মাননীয়, স্মরণীয়, বরণীয়, পূজনীয়, করণীয়, দর্শনীয় ইত্যাদি।

২. ‘ত্ব’ প্রত্যয়ে সাধারণত হ্রস্ব ই-কার

যেমন :

বন্ধুত্ব, মানবত্ব, গুরুত্ব, নেতৃত্ব, সদস্যত্ব, নাগরিকত্ব ইত্যাদি।

৩. ‘তা’ প্রত্যয়ে হ্রস্ব ই-কার

যেমন :

প্রার্থিতা, সহযোগিতা, প্রতিদ্বন্দ্বিতা, প্রতিযোগিতা, সহমর্মিতা ইত্যাদি।

৪. সমাসে রূপভেদ

যেমন :

মন্ত্রীসভা,
মন্ত্রীগণ,
প্রাণিবিদ্যা,
প্রাণিতত্ত্ব,
প্রাণিজগৎ,
প্রাণিসম্পদ।

৫. তৎসম শব্দে শুদ্ধ বিসর্গ-প্রয়োগ

যেমন :

অন্তঃপুর,
অন্তঃস্থ,
দুঃখ,
দুঃসময়,
মনঃপূত,
যশঃপ্রার্থী,
শিরঃপীড়া।

৬. বিসর্গ-বর্জিত রূপ

যেমন :

অন্তত,
ক্রমশ,
প্রথমত,
প্রায়শ,
ফলত,
বস্তুত,
সর্বত।

৭. সমাসে বিসর্গ-সন্ধি

যেমন :

অহরহ,
ইতস্তত,
পুনঃপুন,
মুহুর্মুহু।

৮. মন-শব্দের ব্যবহার

তৎসম রূপে :

মনোরম,
মনোযোগ,
মনোমোহন।

বাংলা রূপে :

মনপছন্দ,
মনমাঝি,
মনভোমরা,
মনমেজাজ।

৯. ছন্দ-শব্দের ব্যবহার

যেমন :

ছন্দগুরু,
ছন্দবিজ্ঞান,
ছন্দমুক্তি,
ছন্দলিপি,
ছন্দস্পন্দ।

১০. বিসর্গহীন বিকল্প রূপ

যেমন :

দুস্থ,
নিস্তব্ধ,
নিস্পৃহ,
বয়স্থ,
মনস্থ।

কিন্তু :

অন্তঃস্থ
(কারণ এর অর্থ ‘ভিতরকার’)

প্রয়োজনীয় কিছু শুদ্ধ বানান

ক. জীবী/জীবন-সম্পর্কিত

পেশাজীবী,
কর্মজীবী,
ক্ষণজীবী,
দীর্ঘজীবী,
বুদ্ধিজীবী।

খ. বিশেষণধর্মী

অভিমানী,
প্রতিদ্বন্দ্বী,
প্রতিযোগী,
মেধাবী,
প্রতিরোধী,
একাকী,
দোষী,
বৈরী,
মনীষী,
সঙ্গী।

গ. শীল-যুক্ত

উন্নয়নশীল,
দানশীল,
উৎপাদনশীল,
ক্ষমাশীল,
নির্ভরশীল,
দায়িত্বশীল,
সুশীল,
ধৈর্যশীল।

ঘ. অন্যান্য শুদ্ধ বানান

অধ্যক্ষ,
প্রতীক,
ব্যাখ্যা,
আকস্মিক,
মূর্ছা,
ক্ষীণ,
মুখমণ্ডল,
অনুরণন,
হাস্যাস্পদ,
সালিস,
সত্বর,
উচ্ছ্বসিত,
স্বেচ্ছাচারী,
কর্মচারী,
বিচি,
বাণী,
শ্বশুর,
শাশুড়ি।

ঙ. আরও কিছু শুদ্ধ বানান

ইতোমধ্যে,
পরিপক্ব,
লজ্জাকর,
ভাস্কর,
দুষ্কর,
সুষমা,
নিষিদ্ধ,
ষোড়শ,
নিষ্পাপ,
কলুষিত,
বিষণ্নতা,
ওষ্ঠ,
সম্মুখ,
সম্মান,
সংজ্ঞা,
আনুষঙ্গিক,
রুদ্ধশ্বাস,
দুর্নাম,
অন্তঃস্থল,
নগণ্য,
আতঙ্ক,
জটিল,
গগন,
তিথি,
অতিথি।

উপসংহার

পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমির বানানবিধি বাংলা ভাষার প্রমিত রূপ নির্ধারণে একটি সুসংহত ও যুক্তিনির্ভর প্রয়াস। এই বিধিগুলির মূল লক্ষ্য—

  • উচ্চারণ ও বানানের সামঞ্জস্য রক্ষা,
  • অপ্রয়োজনীয় সংস্কৃতঘেঁষা জটিলতা দূর করা,
  • বাংলা ভাষার নিজস্ব স্বরূপ বজায় রাখা,
  • এবং সর্বোপরি একরূপ ও শৃঙ্খলাবদ্ধ বানানরীতি প্রতিষ্ঠা করা।

বাংলা ভাষার শুদ্ধ ও প্রমিত চর্চার জন্য এই নিয়মগুলির অনুশীলন অপরিহার্য।

 

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!
Scroll to Top