ইলিয়াস
লেখক পরিচিতি: লিও তলস্তয়
১৮২৮ খ্রিস্টাব্দে লিও তলস্তয় রাশিয়ায় জন্মগ্রহণ করেন। তিনি একজন বিখ্যাত লেখক ছিলেন। মাতৃভাষা রুশ ছাড়াও তিনি জার্মান, ফরাসি, গ্রিক, আরবি, লাতিন ও ইংরেজি প্রভৃতি বহু ভাষায় দক্ষতা অর্জন করেছিলেন। এমনকি চিত্রকলা ও সংগীতেও তলস্তয়ের বিশেষ দক্ষতা ছিল।
তিনি বাস্তব জীবনের অভিজ্ঞতাকেই তাঁর লেখার মধ্যে অত্যন্ত সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। জীবনের প্রকৃত অর্থের সন্ধান করা এবং সহজ ও সংক্ষিপ্ত ভাষায় জীবনের প্রকৃত রূপ তুলে ধরা তাঁর ছোটোগল্পগুলির প্রধান উদ্দেশ্য।
তলস্তয় বহু উপন্যাস, অসংখ্য ছোটোগল্প, প্রবন্ধ ও নাটক রচনা করেছেন। তিনি রাশিয়ার জার শাসনতন্ত্রের স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে সরব হয়েছিলেন। দরিদ্র চাষিদের সন্তানদের জন্য তিনি বিদ্যালয় স্থাপন করেন এবং সেখানে নিজেই শিক্ষকতা করতেন।
জীবনের শেষ পর্যায়ে প্রচণ্ড শীতের মধ্যে নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে ১৯১০ খ্রিস্টাব্দে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।
গল্পটির উৎস
লিও তলস্তয় রচিত ‘ইলিয়াস’ গল্পটি Twenty Three Tales নামক গল্পসংকলনে প্রকাশিত হয়।
পাঠ্য গল্পটি বাংলায় অনুবাদ করেছেন মণীন্দ্র দত্ত।
গল্পটির পূর্বকথা
বাসকির হল তুর্কি জাতিগোষ্ঠীর একটি জনগোষ্ঠী। ইউরোপ ও এশিয়ার সংযোগস্থলে পর্বতমালার দু’পাশের এলাকায় এই জনগোষ্ঠীর বসবাস। ত্রয়োদশ থেকে পঞ্চদশ শতাব্দী পর্যন্ত এদের বসতির মূল এলাকা ছিল বাসকোরতোস্তান (যার রাজধানী ছিল উফা প্রদেশ)। এখানে রুশ দেশের মানুষের সংখ্যা বেশি ছিল। ফলে ১৫৫২ খ্রিস্টাব্দে ওই এলাকা রুশদের দখলে চলে যায় এবং বাসকিররা রুশ সাম্রাজ্যের অধীনস্থ হয়।
এরা মূলত মুসলিম সম্প্রদায়ভুক্ত। ঘোড়া, ভেড়া, গরু, মোষ প্রভৃতি গৃহপালিত পশু থেকে উৎপন্ন দুধ, চামড়া, কুমিস ও মাংস প্রভৃতি বিক্রি করাই ছিল এদের প্রধান পেশা।
ইলিয়াস গল্পটির সারাংশ
পশ্চিম রাশিয়ার উফা প্রদেশে মুসলিম সম্প্রদায়ভুক্ত ইলিয়াস নামে এক ব্যক্তি বাস করত।
ইলিয়াসের বিয়ের এক বছর পর যখন তার বাবা মারা যান, তখন তিনি খুব বেশি সম্পত্তি রেখে যেতে পারেননি। ইলিয়াস তার বুদ্ধি ও স্বামী-স্ত্রীর কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে ধীরে ধীরে নিজের অবস্থার উন্নতি করতে থাকে। পঁয়ত্রিশ বছরের পরিশ্রমে ইলিয়াস দুশো ঘোড়া, দেড়শো গরু-মোষ এবং বারোশো ভেড়ার মালিক হয়ে ওঠে। দূর-দূরান্ত থেকে আগত অতিথিদের আগমনে ইলিয়াসের বাড়ি সবসময়ই গমগম করত।
ইলিয়াসের এত সম্পত্তি বৃদ্ধির ফলে প্রতিবেশীরা তাকে হিংসা করতে শুরু করে।
ইলিয়াসের দুই ছেলে ও এক মেয়ে ছিল এবং তাদের সকলেরই বিয়ে হয়ে গিয়েছিল। ইলিয়াস বড়োলোক হওয়ার পর ধনসম্পদের অহংকারে তার ছেলেরা বিলাসী ও অলস হয়ে ওঠে। এই সময় তার বড়ো ছেলে এক মারামারির ঘটনায় মারা যায়। ছোটো ছেলের বউ খুব ঝগড়াটে হওয়ায় ইলিয়াস তাদের সম্পত্তির অংশ দিয়ে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেয়।
পরবর্তীকালে মড়ক, দুর্ভিক্ষ এবং কিরবিজ (চোরদের) অত্যাচারে ইলিয়াসের সম্পত্তি ক্রমশ কমতে থাকে। সত্তর বছর বয়সে ইলিয়াস বাধ্য হয়ে তার শেষ সম্বল—পশমের কোট, কম্বল, ঘোড়ার জিন, তাঁবু এবং গৃহপালিত পশুগুলি বিক্রি করে সর্বহারা হয়ে পড়ে।
ইলিয়াসের বিতাড়িত পুত্র অনেক দূর দেশে চলে যায়। আবার তাদের মেয়েটিও মারা যাওয়ায় বৃদ্ধ দম্পতিকে সাহায্য করার মতো আর কেউ থাকে না। তাই শেষ সম্বলটুকু নিয়ে ইলিয়াস ও তার স্ত্রী শাম-শেমাগি অচেনা এক ব্যক্তি মহম্মদ শা-র বাড়িতে আশ্রয় নেয়। সেখানে তারা মজুর হিসেবে কাজ করে কোনো রকমে দিন কাটাতে থাকে।
একদিন মহম্মদ শা-র বাড়িতে এক ধর্মপ্রাণ মোল্লা সাহেবসহ বেশ কিছু অতিথি আসেন। মহম্মদ শা তাদের আপ্যায়নের ফাঁকে বৃদ্ধ ইলিয়াসকে দেখিয়ে অতিথিদের জানান যে, ইলিয়াস এক সময় এই এলাকার ধনী ও অতিথিপরায়ণ ব্যক্তি ছিলেন। সেই সময় তার খ্যাতি দূর-দূরান্তে ছড়িয়ে পড়েছিল। বর্তমানে ইলিয়াস ও তার স্ত্রী সর্বহারা হয়ে তার বাড়িতেই মজুরের কাজ করছেন।
এই কথা শুনে অতিথিরা খুব অবাক হয়ে তাদের দুরবস্থার কথা জানতে চান। উত্তরে শাম-শেমাগি বলেন, তারা পঞ্চাশ বছর ধনী জীবন কাটালেও তখন কখনো প্রকৃত সুখের সন্ধান পাননি। কিন্তু বর্তমানে সর্বহারা ভাড়াটে মজুর হয়েও তারা যে সুখ পেয়েছেন, তার পরে জীবনে আর কিছুই চাওয়ার নেই।
বৃদ্ধা আরও বলেন, যখন তারা ধনী ছিলেন তখন তাদের মনে এক মুহূর্তের জন্যও শান্তি ছিল না। মনের কথা বলার বা ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করার সময়ও ছিল না। কিন্তু এখন স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে অন্তরের কথা আলোচনা করার সুযোগ রয়েছে এবং ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করারও সময় রয়েছে। দীর্ঘ পঞ্চাশ বছর জীবন কাটানোর পর এখন তারা প্রকৃত সুখের সন্ধান পেয়েছেন।
এই কথা শুনে অতিথিরা হেসে উঠলে ইলিয়াস বলেন, এটাই জীবনের সারসত্য। সম্পত্তির মোহে অন্ধ ছিল বলেই তারা সম্পত্তি হারিয়ে কেঁদেছিল। কিন্তু ঈশ্বর তাদের সম্পত্তিহীন করলেও জীবনের প্রকৃত সত্য ও সুখের মূল্য যে কত বড়ো, সেই উপলব্ধি তাদের দিয়েছেন।
এ কথা শুনে মোল্লা সাহেব বলেন, ইলিয়াসের সব কথাই সত্য এবং জ্ঞানের কথা। এই কথাগুলি পবিত্র গ্রন্থেও লেখা আছে। মোল্লা সাহেবের কথা শুনে অতিথিরা চিন্তামগ্ন হয়ে পড়েন।
MCQ (সঠিক উত্তরসহ)
১। ইলিয়াস গল্পটির তরজমা করেছেন—
ক) লিও তলস্তয় খ) মণীন্দ্র দত্ত গ) মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় ঘ) সুবীর গাঙ্গুলী
উত্তর: খ) মণীন্দ্র দত্ত
২। ইলিয়াস বসবাস করত—
ক) উত্তর প্রদেশ খ) অন্ধ্রপ্রদেশ গ) মধ্যপ্রদেশ ঘ) উফা প্রদেশ
উত্তর: ঘ) উফা প্রদেশ
৩। ইলিয়াস ছিল একজন—
ক) মোল্লা খ) উকিল গ) হাকিম ঘ) বাসকির
উত্তর: ঘ) বাসকির
৪। কত বছরের পরিশ্রমে ইলিয়াস প্রচুর সম্পত্তি বানিয়েছিল—
ক) ৩০ বছর খ) ২০ বছর গ) ৪০ বছর ঘ) ৩৫ বছর
উত্তর: ঘ) ৩৫ বছর
৫। ইলিয়াসের সন্তান বলতে ছিল—
ক) দুই ছেলে দুই মেয়ে খ) দুই ছেলে এক মেয়ে গ) এক ছেলে এক মেয়ে ঘ) এক ছেলে দুই মেয়ে
উত্তর: খ) দুই ছেলে এক মেয়ে
৬। ইলিয়াসের বড়ো ছেলে মারা গিয়েছিল—
ক) দুর্ভিক্ষে খ) মড়কে গ) জ্বরে ঘ) মারামারিতে
উত্তর: ঘ) মারামারিতে
৭। ইলিয়াসের কোন বৌমা ঝগড়াটে ছিল—
ক) বড়ো বৌমা খ) মেজ বৌমা গ) সেজো বৌমা ঘ) ছোটো বৌমা
উত্তর: ঘ) ছোটো বৌমা
৮। ইলিয়াস বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দিয়েছিল—
ক) ছোটো ছেলেকে খ) বড়ো ছেলেকে গ) মেয়েকে ঘ) স্ত্রীকে
উত্তর: ক) ছোটো ছেলেকে
৯। ইলিয়াসের অনেকগুলি ভেড়া মরে গিয়েছিল—
ক) মড়কে খ) দুর্ভিক্ষে গ) বন্যায় ঘ) খরাতে
উত্তর: ক) মড়কে
১০। ইলিয়াসের ভালো ঘোড়াগুলি চুরি করেছিল—
ক) হারমাদরা খ) পাঠানরা গ) আততরা ঘ) কিরবিজরা
উত্তর: ঘ) কিরবিজরা
১১। ইলিয়াস কত বছর বয়সে সর্বহারা হয়ে পড়েছিল—
ক) ৭২ বছর খ) ৭৫ বছর গ) ৭৪ বছর ঘ) ৭০ বছর
উত্তর: ঘ) ৭০ বছর
অতিরিক্ত MCQ
১২। ‘একদল আত্মীয় অনেক দূর থেকে এসে তার বাড়িতে অতিথি হলে।’— আত্মীয় এসেছিল—
(A) ইলিয়াসের কাছে (B) মোল্লার কাছে (C) ইলিয়াসের মেয়ের কাছে (D) মহম্মদ শার কাছে
উত্তর: (D) মহম্মদ শার কাছে
১৩। ‘এই সম্পন্ন মানুষ দুটির দূরবস্থা দেখে মহম্মদ শার দুঃখ হতো’— সম্পন্ন মানুষ দুটি হল—
(A) ইলিয়াসের দুই ছেলে (B) ইলিয়াস ও তার স্ত্রী (C) মোল্লা ও তার স্ত্রী (D) মহম্মদ শা ও তার স্ত্রী
উত্তর: (B) ইলিয়াস ও তার স্ত্রী
১৪। ‘আমাদের সঙ্গে একটু কুমিস পান করবে’— একথা বলেছিল—
(A) মহম্মদ শা ইলিয়াসকে (B) মহম্মদ শা অতিথিকে (C) মহম্মদ শা মোল্লাকে (D) মহম্মদ শা শাম-শেমাগিকে
উত্তর: (A)
১৫। ‘অতিথিরা বিস্মিত’— অতিথিদের বিস্মিত হবার কারণ—
(A) ইলিয়াস ও তার স্ত্রী সর্বহারা হয়েও সুখে আছে
(B) তাদের কল্যাণের জন্য এ কথা বলেছে তারা
(C) অর্ধশতাব্দী ধরে তারা সুখ খুঁজেছে
(D) আজ তারা সুখের সন্ধান পেয়েছে
উত্তর: (A)
১৬। ‘যখন তার বাবা মারা গেল সে না ধনী, না দরিদ্র’— কার কথা বলা হয়েছে—
(A) অতিথিরা (B) শাম-শেমাগি (C) মোল্লা (D) ইলিয়াস
উত্তর: (D)
১৭। ‘ইলিয়াস প্রতিবেশীকে ধন্যবাদ দিল’— ইলিয়াসের প্রতিবেশী ছিল—
(A) মোল্লা (B) মহম্মদ শা (C) অতিথিরা (D) শাম-শেমাগি
উত্তর: (B)
১৮। ‘তার সবচাইতে ভালো ঘোড়াগুলো চুরি করে নিয়ে গেল’— ঘোড়াগুলি চুরি করেছিল—
(A) কিরবিজরা (B) ইলিয়াসের বিতাড়িত পুত্র (C) ইলিয়াস (D) অতিথিরা
উত্তর: (A)
১৯। ‘সম্বলের মধ্যে রইল শুধু কাঁধে একটা বোঁচকা’— বোঁচকায় ছিল—
(A) কম্বল, ঘোড়ার জিন, তাবু
(B) লোমের তৈরি কোট, জুতো আর বুট
(C) চা, কুমিস, মাংস, শরবত
(D) অনেক মূল্যবান জিনিস
উত্তর: (B)
২০। ‘সে একেবারে সর্বহারা হয়ে পড়ল’— সর্বহারা হয়েছিল—
(A) মেয়েটি মারা যাওয়ার পর
(B) আসল অবস্থা বুঝে ওঠবার আগেই
(C) শরীরের জোর কমে গেলে
(D) বড়ো ছেলে মারা যাওয়ার পর
উত্তর: (B)
২১। “এছাড়াও যদি কখনো কিছু লাগে, বলবে তাও দেবে”— কথাটি কে বলেছিল?
(A) ইলিয়াস (B) মোল্লা (C) মহম্মদ শা (D) অতিথি
উত্তর: (C)
২২। “আগেকার সুখ আর এখনকার দুঃখ সম্পর্কে তোমার মনের কথা বলতো”— একথা বলেছে—
(A) শাম-শেমাগি (B) অতিথি (C) মহম্মদ শা (D) ইলিয়াস
উত্তর: (B)
২৩। “কখনো সুখ পাইনি”— সুখ পায়নি কখন?
(A) যখন দুশ্চিন্তা করেছেন (B) যখন ধনী ছিলেন (C) শীতকালে (D) যখন সম্পত্তি হারিয়েছিলেন
উত্তর: (B)
২৪। “এখনকার দুরাবস্থার কথা ভাবে কি খুব কষ্ট হচ্ছে?”— এ কথা কে বলেছিলেন?
(A) মোল্লা অতিথিদের (B) ইলিয়াস বড়ো ছেলেকে (C) মহম্মদ শা ইলিয়াসকে (D) অতিথি ইলিয়াসের স্ত্রীকে
উত্তর: (D)
২৫। ‘ইলিয়াস নামে একজন বাসকির বাস করত’— ইলিয়াস বাস করত—
(A) ব্রিটেনে (B) উফা প্রদেশ (C) রাশিয়ায় (D) মস্কোয়
উত্তর: (B)
২৬। ‘বুড়ো বুড়ি কে রেখে মহম্মদ শার লাভ হল’— কারণ—
(A) সব কাজই তারা ভালোভাবে করতে পারত
(B) নিজেরা একদিন মনিব ছিল
(C) তারা সাধ্যমত কাজকর্ম করত
(D) তারা অলস নয়
উত্তর: (A)
২৭। ইলিয়াসের বিয়ের এক বছর পরে যখন তার বাবা মারা গেল তখন সে ছিল—
(A) খুব ধনী (B) না ধনী, না দরিদ্র (C) খুব গরিব (D) খুব ক্ষমতাসম্পন্ন
উত্তর: (B)
২৮। ইলিয়াসের সবচাইতে ভালো ঘোড়াগুলি চুরি করে নিয়ে গিয়েছিল—
(A) কিরবিজরা (B) কজারিকা (C) প্রতিবেশীরা (D) মহম্মদ শা
উত্তর: (A)
২৯। “ইলিয়াস তাকে একটা বাড়ি দিল, কিছু গোরু-ঘোড়াও দিল।” — ইলিয়াস এসব দিয়েছিল—
(A) তার একমাত্র মেয়েকে (B) তার বড়ো ছেলেকে (C) তার ছোটো ছেলেকে (D) মহম্মদ শাকে
উত্তর: (C)
৩০। “সেও তো পাপ”— কোন কাজের প্রসঙ্গে বলা হয়েছে?
(A) মজুরদের ওপর কড়া নজরদারি
(B) পশুপালনে তদারকি
(C) পশুহত্যা
(D) অতিথিদের সেবা না করা
উত্তর: (A)
৩১। “বন্ধুগণ হাসবেন না। এটা তামাশা নয়।” — এটি কার উক্তি?
(A) ইলিয়াস (B) মোল্লা (C) শাম-শেমাগি (D) মহম্মদ শা
উত্তর: (A)
৩২। ‘এই তার যা কিছুই বিষয়-সম্পত্তি’ — কার কথা বলা হয়েছে?
(A) অতিথি (B) মহম্মদ শা (C) ইলিয়াস (D) শামশেমাগি
উত্তর: (C)
অতি সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর (SAQ)
২০টি শব্দের মধ্যে। প্রতিটি প্রশ্নের মান–১
১। ইলিয়াস কোন জনগোষ্ঠীর মানুষ ছিল?
উত্তর: লিও তলস্তয়ের রচিত ‘ইলিয়াস’ গল্পে উফা প্রদেশে বসবাসকারী বাসকির জনগোষ্ঠীর একজন মানুষ ছিল ইলিয়াস।
২। বাবা মারা যাওয়ার সময় ইলিয়াসের সম্পত্তির পরিমাণ কী ছিল?
উত্তর: লিও তলস্তয়ের রচিত ‘ইলিয়াস’ গল্পে বাবা মারা যাওয়ার সময় ইলিয়াস সাতটি ঘোটকি, দুটি গোরু ও কুড়িটি ভেড়ার মালিক ছিল।
৩। পঁয়ত্রিশ বছর পরে ইলিয়াসের বিষয়-সম্পত্তির পরিমাণ কী দাঁড়িয়েছিল?
উত্তর: কঠোর পরিশ্রমে ইলিয়াস দুশো ঘোড়া, দেড়শো গোরু-মোষ ও বারোশো ভেড়ার মালিক হয়েছিল; এছাড়া ভাড়াটে মজুরের অভাব ছিল না।
৪। কুমিস কী?
উত্তর: ‘ইলিয়াস’ গল্পে ঘোটকীর দুধ থেকে তৈরি এক ধরনের পানীয়কে কুমিস বলা হয়েছে।
৫। “কিন্তু বড়োলোক হওয়ার পরে তারা আয়েসি হয়ে উঠল”—কারা, কেন আয়েসি হয়ে উঠল?
উত্তর: ইলিয়াসের ছেলেরা বড়োলোক হওয়ার পর আয়েসি হয়ে উঠেছিল, কারণ বাবার আর্থিক প্রাচুর্য দেখে তারা পরিশ্রম করতে ভুলে গিয়েছিল।
অতি সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর (SAQ)
১। “বাড়ি থেকে তাদের তাড়িয়ে দেওয়া হল”—কাদের কেন?
উত্তর: ইলিয়াসের ছোটো ছেলে একটি মুখরা মেয়েকে বিয়ে করে বাবার আদেশ অমান্য করায় তাকে ও তার স্ত্রীকে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেওয়া হয়।
২। ইলিয়াসের সম্পত্তিতে টান পড়ল কেন?
উত্তর: ছোটো ছেলেকে একটি বাড়ি ও কিছু গোরু-ঘোড়া দিয়ে আলাদা করে দেওয়ায় তার সম্পত্তিতে টান পড়ে।
৩। ইলিয়াসের অনেক ভেড়ার মৃত্যু হলো কীভাবে?
উত্তর: ভেড়ার পালে মড়ক লেগে ইলিয়াসের অনেক ভেড়া মারা যায়।
৪। কারা ইলিয়াসের সবচেয়ে ভালো ঘোড়াগুলি চুরি করেছিল?
উত্তর: কিরবিজরা ইলিয়াসের সবচেয়ে ভালো ঘোড়াগুলি চুরি করেছিল।
৫। সত্তর বছর বয়সে দুর্দশার চরমে নেমে ইলিয়াস কী কী বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছিল?
উত্তর: পশমের কোট, কম্বল, ঘোড়ার জিন, তাঁবু এবং গৃহপালিত পশুগুলি বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছিল।
৬। বৃদ্ধ বয়সে ইলিয়াস ও তার স্ত্রী কোথায় বাস করত?
উত্তর: প্রতিবেশী মহম্মদ শার বাড়িতে ভাড়াটে মজুর হিসেবে বাস করত।
৭। ইলিয়াসের স্ত্রীর নাম কী?
উত্তর: শাম-শেমাগি।
৮। বৃদ্ধ বয়সে ইলিয়াসের সম্বল কী ছিল?
উত্তর: লোমের তৈরি কোট, টুপি, জুতো-বুটসহ একটি বোঁচকা এবং স্ত্রী শাম-শেমাগি।
৯। বৃদ্ধ ইলিয়াসকে দেখে কার তার প্রতি করুণা হয়েছিল?
উত্তর: প্রতিবেশী মহম্মদ শার।
১০। মহম্মদ শা ইলিয়াসকে কী কাজ দিয়েছিল?
উত্তর: গ্রীষ্মে তরমুজের খেত পাহারা ও শীতে গোরু-ঘোড়া দেখাশোনা করার কাজ।
১১। ইলিয়াসের স্ত্রীকে মহম্মদ শা কী কাজ দিয়েছিল?
উত্তর: ঘোটকীর দুধ দোয়ানো ও কুমিস তৈরির কাজ।
১২। ইলিয়াস ও তার স্ত্রী মহম্মদ শার বাড়িতে কীসের মতো কাজ করত?
উত্তর: ভাড়াটে মজুরের মতো কাজ করত।
১৩। “ক্রমে ক্রমে সব সয়ে গেল”—কার কী সয়ে গেল?
উত্তর: বৃদ্ধ ইলিয়াস ও তার স্ত্রীর ভাড়াটে মজুরের মতো কঠোর পরিশ্রমের জীবন ধীরে ধীরে সয়ে যায়।
১৪। “তা ছাড়া তারা অলস নয়”—কারা অলস নয়?
উত্তর: বৃদ্ধ ইলিয়াস ও তার স্ত্রী শাম-শেমাগি।
১৫। মহম্মদ শার বাড়িতে আসা আত্মীয়দের মধ্যে একজন কে ছিলেন?
উত্তর: একজন মুসলিম পণ্ডিত বা মোল্লাসাহেব।
১৬। “এ তল্লাটের সবচেয়ে ধনী ছিল”—কে সবচেয়ে ধনী ছিল?
উত্তর: ইলিয়াস একসময় এ তল্লাটের সবচেয়ে ধনী ব্যক্তি ছিল।
১৭। অতিথিরা ইলিয়াসের স্ত্রীর কাছে কী জানতে চেয়েছিলেন?
উত্তর: আগেকার সুখী জীবন ও বর্তমান কষ্টের জীবন সম্পর্কে তার মনের কথা জানতে চেয়েছিলেন।
১৮। “এই তার যা কিছু বিষয়-সম্পত্তি”—কী কী সম্পত্তির কথা বলা হয়েছে?
উত্তর: সাতটি ঘোটকী, দুটি গোরু এবং কুড়িটি ভেড়া।
১৯। কত বছর পরিশ্রম করে ইলিয়াস প্রচুর সম্পত্তি বানিয়েছিল?
উত্তর: পঁয়ত্রিশ বছর পরিশ্রম করে।
২০। “ওর তো মরবারই দরকার নেই”—কার, কেন মরবার দরকার নেই?
উত্তর: ইলিয়াসের কোনো কিছুর অভাব ছিল না বলে প্রতিবেশীরা এ কথা বলেছিল।
২১। দূরদূরান্ত থেকে অতিথিরা কার সঙ্গে দেখা করতে আসত?
উত্তর: ধনী ও অতিথিপরায়ণ ইলিয়াসের সঙ্গে।
২২। ইলিয়াস অতিথিদের কী দিয়ে সেবা করত?
উত্তর: কুমিস, শরবত, মাংস প্রভৃতি খাবার ও পানীয় দিয়ে।
২৩। ইলিয়াসের কয়টি সন্তান ছিল?
উত্তর: দুই ছেলে ও এক মেয়ে—মোট তিনটি সন্তান।
২৪। ইলিয়াস যখন গরিব ছিল তখন ছেলেরা তাকে কীভাবে সাহায্য করত?
উত্তর: গোরু-ভেড়া চরিয়ে তার কাজে সাহায্য করত।
২৫। “তারা আয়েশি হয়ে উঠল”—কারা, কখন আয়েশি হয়ে উঠল?
উত্তর: ইলিয়াস ধনী হওয়ার পর তার ছেলেরা আয়েশি হয়ে ওঠে।
২৬। ইলিয়াসের বড়ো ছেলে কীভাবে মারা গিয়েছিল?
উত্তর: এক মারামারির ঘটনায় মারা গিয়েছিল।
২৭। “অতিথিরা বিস্মিত”—কেন?
উত্তর: ধনী জীবনে সুখ না পেয়ে সর্বহারা জীবনে প্রকৃত সুখ পাওয়ার কথা শুনে।
২৮। “অন্যদিকে দুশ্চিন্তা”—কোন দুশ্চিন্তার কথা বলা হয়েছে?
উত্তর: নেকড়ে পশু নিয়ে যাবে বা চোর ঘোড়া চুরি করবে—এই দুশ্চিন্তা।
২৯। ইলিয়াস কোথায় বসবাস করত?
উত্তর: উফা প্রদেশে।
৩০। ইলিয়াস কোন জনগোষ্ঠীর মানুষ ছিল?
উত্তর: বাসকির জনগোষ্ঠীর মানুষ।
৩১। “কথা বলবার সময় নেই”—কখন কথা বলবার সময় ছিল না?
উত্তর: ইলিয়াস ও তার স্ত্রী যখন ধনী ছিলেন তখন।
৩২। “ফলে সারারাত ঘুমই ছিল না”—কেন?
উত্তর: গৃহপালিত পশু হারানোর ভয়ে দুশ্চিন্তায় ঘুম হতো না।
৩৩। ‘ইলিয়াস’ গল্পটি কার লেখা?
উত্তর: লিও তলস্তয়ের।
৩৪। ‘ইলিয়াস’ গল্পটি কে বাংলায় অনুবাদ করেছেন?
উত্তর: মণীন্দ্র দত্ত।
ব্যাখ্যাভিত্তিক সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর
(৬০টি শব্দের মধ্যে, প্রতিটি প্রশ্নের মান–৩)
১। “পাশাপাশি সকলেই তাকে ঈর্ষা করে”—‘তাকে’ বলতে কার কথা বলা হয়েছে? সেই ব্যক্তিকে ঈর্ষার কারণ কী?
উৎস ; ‘ইলিয়াস’ নামক গদ্য। লেখক ; লিও তলস্তয়।
এখানে ‘তাকে’ বলতে বাসকির জনগোষ্ঠীর মানুষ ইলিয়াসকে বোঝানো হয়েছে। পঁয়ত্রিশ বছরের অক্লান্ত পরিশ্রমে ইলিয়াস বিপুল সম্পত্তির মালিক হয়। তার ছিল দুশো ঘোড়া, দেড়শো গোরু-মোষ ও বারোশো ভেড়া। এই বিপুল ধনসম্পদ ও সমৃদ্ধি দেখে প্রতিবেশীরা তাকে ঈর্ষা করতে শুরু করে।
২। “ইলিয়াসের তখন খুব বোলবোলাও”—‘বোলবোলাও’ শব্দের অর্থ ও তাৎপর্য লেখো।
উৎস ; ‘ইলিয়াস’ নামক গদ্য। লেখক ; লিও তলস্তয়।
‘বোলবোলাও’ শব্দের অর্থ নামডাক, খ্যাতি বা প্রতিপত্তি। পঁয়ত্রিশ বছরের কঠোর পরিশ্রমে ইলিয়াস বিপুল সম্পত্তির মালিক হয়। তার গৃহপালিত পশুর সংখ্যা বৃদ্ধি পায় এবং বহু মজুর তার অধীনে কাজ করত। ফলে সমাজে তার বিশেষ মর্যাদা ও খ্যাতি প্রতিষ্ঠিত হয়।
৩। “দূর দূরান্ত থেকে অতিথিরা তার সঙ্গে দেখা করতে আসে”—অতিথিরা কার সঙ্গে দেখা করতে আসত? সে কীভাবে অতিথিদের সেবা করত?
উৎস ; ‘ইলিয়াস’ নামক গদ্য। লেখক ; লিও তলস্তয়।
অতিথিরা ধনী ও অতিথিপরায়ণ ইলিয়াসের সঙ্গে দেখা করতে আসত। ইলিয়াস তাদের অত্যন্ত সম্মান ও যত্নের সঙ্গে আপ্যায়ন করত। অতিথির সংখ্যা অনুযায়ী ভেড়া বা ঘোটকী জবাই করা হত এবং কুমিস, চা, শরবত ও মাংস পরিবেশন করে তাদের তৃপ্ত করা হত।
৪। “ইলিয়াস তাদের বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দিল”—কে, কাদের, কেন তাড়িয়ে দিল?
উৎস ; ‘ইলিয়াস’ নামক গদ্য। লেখক ; লিও তলস্তয়।
ইলিয়াস তার ছোটো ছেলে ও পুত্রবধূকে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেয়। ছোটো ছেলের স্ত্রী ছিল অত্যন্ত ঝগড়াটে এবং তারা ইলিয়াসের আদেশ অমান্য করত। এই অবাধ্য আচরণে ক্ষুব্ধ হয়ে ইলিয়াস তাদের একটি বাড়ি ও কিছু গোরু-ঘোড়া দিয়ে আলাদা করে দেয়।
৫। “ইলিয়াসের অবস্থা খারাপ হয়ে পড়ল”—ইলিয়াসের অবস্থা কীভাবে খারাপ হয়ে পড়ল?
উৎস ; ‘ইলিয়াস’ নামক গদ্য। লেখক ; লিও তলস্তয়।
ছোটো ছেলেকে বাড়ি ও গোরু-ঘোড়া দিয়ে আলাদা করায় ইলিয়াসের সম্পত্তিতে টান পড়ে। পরে ভেড়ার পালে মড়ক লাগে এবং দুর্ভিক্ষে অনেক গোরু-মোষ মারা যায়। উপরন্তু কিরবিজরা তার ভালো ঘোড়াগুলি চুরি করে নিয়ে যায়। ফলে তার আর্থিক অবস্থা দ্রুত অবনতি ঘটে।
৬। “সে একেবারে সর্বহারা হয়ে পড়ল”—এখানে ‘সে’ বলতে কাকে বোঝানো হয়েছে? সে কীভাবে সর্বহারা হয়ে পড়ল?
উৎস ; ‘ইলিয়াস’ নামক গদ্য। লেখক ; লিও তলস্তয়।
এখানে ‘সে’ বলতে ইলিয়াসকে বোঝানো হয়েছে। মড়ক, দুর্ভিক্ষ ও চুরির ফলে তার গৃহপালিত পশু নষ্ট হয়ে যায়। ক্রমে সম্পত্তি হারিয়ে সে নিঃস্ব হয়ে পড়ে। শেষে সত্তর বছর বয়সে পশমের কোট, কম্বল, ঘোড়ার জিন, তাঁবু ও পশু বিক্রি করে সে সর্বহারা হয়ে পড়ে।
৭। “বৃদ্ধ দম্পতিকে সাহায্য করবার তখন কেউ নেই”—বৃদ্ধ দম্পতি কারা এবং কেন তাদের সাহায্য করার কেউ ছিল না?
উৎস ; ‘ইলিয়াস’ নামক গদ্য। লেখক ; লিও তলস্তয়।
বৃদ্ধ দম্পতি বলতে ইলিয়াস ও তার স্ত্রী শাম-শেমাগিকে বোঝানো হয়েছে। তাদের বড়ো ছেলে মারা যায় এবং ছোটো ছেলে দূর দেশে চলে যায়। একমাত্র মেয়েটিও মারা যাওয়ায় বৃদ্ধ বয়সে তাদের পাশে সাহায্য করার মতো আপনজন আর কেউ ছিল না।
৮। “তাকে দেখতে পেয়ে মহম্মদ শা অতিথিদের বলল”—‘তাকে’ বলতে কাকে বোঝানো হয়েছে? মহম্মদ শা কী বলেছিলেন?
উৎস ; ‘ইলিয়াস’ নামক গদ্য। লেখক ; লিও তলস্তয়।
‘তাকে’ বলতে এখানে ইলিয়াসকে বোঝানো হয়েছে। মহম্মদ শা অতিথিদের জানান যে ইলিয়াস একসময় এ তল্লাটের সবচেয়ে ধনী ও অতিথিপরায়ণ ব্যক্তি ছিলেন। কিন্তু ভাগ্যের পরিণতিতে এখন তিনি তার বাড়িতে ভাড়াটে মজুরের মতো কাজ করে জীবনযাপন করছেন।
৯। “এ বিষয়ে তিনিই পুরো সত্য বলতে পারবেন”—‘তিনি’ কে? কেন?
উৎস ; ‘ইলিয়াস’ নামক গদ্য। লেখক ; লিও তলস্তয়।
‘তিনি’ বলতে ইলিয়াসের স্ত্রী শাম-শেমাগিকে বোঝানো হয়েছে। কারণ তিনি সরল ও সত্যবাদী মানুষ। তার মনে যা থাকে তিনি তা স্পষ্টভাবে প্রকাশ করেন। তাই জীবনের সত্য অভিজ্ঞতা সম্পর্কে তিনি নির্ভয়ে ও অকপটে কথা বলতে পারেন।
১০। “পঞ্চাশ বছর ধরে সুখ খুঁজে খুঁজে এতদিনে পেয়েছি”—এই সুখের পরিচয় দাও।
উৎস ; ‘ইলিয়াস’ নামক গদ্য। লেখক ; লিও তলস্তয়।
ধনী অবস্থায় ইলিয়াস ও তার স্ত্রীর জীবনে শান্তি ছিল না। সম্পত্তি রক্ষা, কাজের চাপ ও নানা দুশ্চিন্তায় তারা সর্বদা ব্যস্ত থাকত। কিন্তু সর্বহারা হয়ে সরল শ্রমজীবনে তারা মানসিক শান্তি, ঈশ্বরচিন্তার সময় এবং পারস্পরিক কথাবার্তার সুযোগ পায়—এই শান্ত জীবনই তাদের প্রকৃত সুখ।
১১। “এটা খুবই জ্ঞানের কথা”—কার, কোন কথাকে ‘জ্ঞানের কথা’ বলা হয়েছে?
উৎস ; ‘ইলিয়াস’ নামক গদ্য। লেখক ; লিও তলস্তয়।
ইলিয়াস ও তার স্ত্রী শাম-শেমাগির জীবনদর্শনমূলক কথাগুলিকে মোল্লাসাহেব ‘জ্ঞানের কথা’ বলেছেন। তারা জানান, ধনী জীবনে অর্থসম্পদ থাকলেও শান্তি ছিল না। সর্বহারা হয়ে সরল শ্রমজীবনে তারা প্রকৃত সুখ ও মানসিক শান্তির সন্ধান পেয়েছেন।
১২। “অতিথিরা বিস্মিত”—কেন?
উৎস ; ‘ইলিয়াস’ নামক গদ্য। লেখক ; লিও তলস্তয়।
ইলিয়াসের স্ত্রী অতিথিদের জানান যে ধনী অবস্থায় তারা কখনো প্রকৃত সুখ পাননি। কিন্তু সব সম্পত্তি হারিয়ে ভাড়াটে মজুরের জীবন গ্রহণ করার পর তারা প্রকৃত সুখের সন্ধান পেয়েছেন। এই বিপরীত অভিজ্ঞতার কথা শুনে অতিথিরা বিস্মিত হন।
১৩। “প্রতি বছরই তার অবস্থার উন্নতি হতে লাগল”—কার অবস্থার, কীভাবে উন্নতি হয়েছিল?
উৎস ; ‘ইলিয়াস’ নামক গদ্য। লেখক ; লিও তলস্তয়।
এখানে ইলিয়াসের অবস্থার কথা বলা হয়েছে। পিতার মৃত্যুর সময় সে না ধনী, না দরিদ্র ছিল। পরে কঠোর পরিশ্রম, বিচক্ষণতা ও পশুপালনের সঠিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে ধীরে ধীরে তার সম্পত্তি বৃদ্ধি পায় এবং প্রতি বছর তার অবস্থার উন্নতি হতে থাকে।
১৪। “ইলিয়াসের অতিথিবৎসলতার কথা স্মরণ করে তার খুব দুঃখ হল”—কার কথা বলা হয়েছে? তার কাজ ও প্রভাব লেখো।
উৎস ; ‘ইলিয়াস’ নামক গদ্য। লেখক ; লিও তলস্তয়।
এখানে প্রতিবেশী মহম্মদ শার কথা বলা হয়েছে। তিনি ইলিয়াসের দুর্দশা দেখে দুঃখিত হয়ে তাকে নিজের বাড়িতে আশ্রয় দেন। কাজের বিনিময়ে থাকা ও খাওয়ার ব্যবস্থা করে দেন এবং মানবিক সহানুভূতির মাধ্যমে তাকে নতুন জীবনের সুযোগ করে দেন।
১৫। মহম্মদ শা ইলিয়াসকে কীভাবে সাহায্য করেছিলেন?
উৎস ; ‘ইলিয়াস’ নামক গদ্য। লেখক ; লিও তলস্তয়।
মহম্মদ শা ইলিয়াস ও তার স্ত্রীকে নিজের বাড়িতে আশ্রয় দেন। তিনি ইলিয়াসকে তরমুজের খেত পাহারা দেওয়া এবং গোরু-ঘোড়া দেখাশোনার কাজ দেন। তার স্ত্রীকে ঘোটকীর দুধ দোয়ানো ও কুমিস তৈরির কাজ দেন।
১৬। ইলিয়াসের সমৃদ্ধির প্রধান কারণ কী ছিল?
উৎস ; ‘ইলিয়াস’ নামক গদ্য। লেখক ; লিও তলস্তয়।
ইলিয়াসের সমৃদ্ধির প্রধান কারণ ছিল কঠোর পরিশ্রম, ধৈর্য ও সঠিক পরিকল্পনা। তিনি নিজে এবং তার স্ত্রী অক্লান্ত পরিশ্রম করতেন এবং গৃহপালিত পশুর সঠিক যত্ন ও ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে ধীরে ধীরে সম্পদ বৃদ্ধি করেছিলেন।
১৭। ইলিয়াস ধনী হওয়ার পর তার ছেলেদের আচরণ কেমন হয়েছিল?
উৎস ; ‘ইলিয়াস’ নামক গদ্য। লেখক ; লিও তলস্তয়।
ইলিয়াস ধনী হওয়ার পর তার ছেলেরা অলস ও বিলাসী হয়ে পড়ে। তারা আর পরিশ্রম করতে চাইত না এবং বাবার সম্পদের উপর নির্ভর করে আয়েশি জীবনযাপন করতে শুরু করে। ফলে তাদের চরিত্রের অবনতি ঘটে।
১৮। ইলিয়াসের বড়ো ছেলে কীভাবে মারা গিয়েছিল?
উৎস ; ‘ইলিয়াস’ নামক গদ্য। লেখক ; লিও তলস্তয়।
এক মারামারির ঘটনায় ইলিয়াসের বড়ো ছেলে মারা যায়। এই ঘটনাটি ইলিয়াসের জীবনে বড়ো আঘাত হিসেবে আসে এবং তার পারিবারিক সুখ-শান্তি নষ্ট হয়ে যায়।
১৯। ইলিয়াসের সম্পত্তি ধ্বংস হওয়ার প্রধান কারণগুলি কী?
উৎস ; ‘ইলিয়াস’ নামক গদ্য। লেখক ; লিও তলস্তয়।
ইলিয়াসের সম্পত্তি ধ্বংস হওয়ার প্রধান কারণ ছিল পুত্রকে সম্পত্তি দিয়ে আলাদা করা, ভেড়ার পালে মড়ক লাগা, দুর্ভিক্ষে গোরু-মোষ মারা যাওয়া এবং কিরবিজদের দ্বারা ঘোড়া চুরি হওয়া।
২০। গল্পটির মূল বক্তব্য কী?
উৎস ; ‘ইলিয়াস’ নামক গদ্য। লেখক ; লিও তলস্তয়।
এই গল্পের মূল বক্তব্য হল— প্রকৃত সুখ ধনসম্পদে নয়। ধনসম্পদ মানুষের মনে দুশ্চিন্তা ও অশান্তি সৃষ্টি করে। সরল জীবন, শ্রম ও মানসিক শান্তিই মানুষের প্রকৃত সুখ এনে দেয়।
বিশ্লেষণধর্মী ও রচনাধর্মী বা বড়ো প্রশ্নোত্তর
১৫০টি শব্দের মধ্যে। প্রতিটি প্রশ্নের মান–৫
প্রশ্ন: ‘সে একেবারে সর্বহারা হয়ে পড়ল’—সে বলতে কাকে বোঝানো হয়েছে? কে, কিভাবে সর্বহারা হয়েছিল।
উত্তর:
লিও তলস্তয় এর রচিত ইলিয়াস গল্পে সে বলতে বৃদ্ধ ইলিয়াসের কথা বলা হয়েছে। ইলিয়াস উফা প্রদেশের একজন বাসুকির ছিলেন। ইলিয়াস দম্পতির দীর্ঘ পঁয়ত্রিশ বছরের কঠিন পরিশ্রমের কারণে তারা বিপুল সম্পত্তির অধিকারী হয়েছিল। কিন্তু বিভিন্ন কারণে ইলিয়াসের সম্পত্তির পতন ঘটে।
ইলিয়াস দম্পতির সম্পত্তির পতনের কারণগুলি হল—
১। ইলিয়াসদের অবস্থা যখন ভালো ছিল না, তখন ইলিয়াসের ছেলেরাও তার সঙ্গে কাজ করতো গরু ভেড়া ঘোড়া ইত্যাদি নিয়ে। কিন্তু আস্তে আস্তে বড়োলোক হয়ে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে ছেলেদের বিলাসিতা বেড়ে যায়।
২। বড়ো ছেলেটি মারামারি করে মারা যায়। ছোটো ছেলে এমন এক ঝগড়াটে বউ বিয়ে করে আনে, বাবার কথা অমান্য করে। তাই ইলিয়াস বউ ছেলেকে তার বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দিয়েছিল। তবে ইলিয়াস ছেলেকে একটি বাড়ি ও কিছু গরু ঘোড়াও দিয়েছিল এর ফলে তার সম্পত্তিতে টান পড়েছিল।
৩। ইলিয়াসের ভেড়ার পালে মোড়ক লেগে যাওয়ার কারণে অনেকগুলি ভেড়ার মৃত্যু ঘটে। ঠিক তারপরের বছরই দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়, ফলে খর বা বিচুলির অভাবে বহু গরু মারা যায় ফলে ইলিয়াসের সম্পত্তিতে টান পড়েছিল।
৪। ইলিয়াসের ভালো ভালো ঘোড়াগুলিকে কিরবিজ বা চোররা চুরি করে নেয় ফলে ইলিয়াসের অবস্থা আরো খারাপ হয়ে ওঠে।
পরিশেষে সত্তর বছর বয়সে ইলিয়াস দম্পতির সংসারে অভাব দেখা দেয়। ইলিয়াসের শেষ সম্বল টুকু পর্যন্ত বিক্রি করে সর্বশ্রান্ত হয়ে অন্যের বাড়িতে মজুর হিসেবে কাজে নিযুক্ত হল। এইভাবে ইলিয়াস দম্পতির ভাগ্যজীবনে মুখে সম্মুখীন হয়েছিল।
প্রশ্ন: ‘ইলিয়াস যা বলল সবই সত্য এবং পবিত্র গ্রন্থে লেখা আছে’—এই উক্তিটির প্রসঙ্গে ইলিয়াস সম্পর্কে যা জানো নিজের ভাষায় লেখ।
উত্তর:
লিও তলস্তয় রচিত ইলিয়াস গল্পে সত্তর বছর বয়সে ইলিয়াস দম্পতি সংসারের সবকিছু শেষ হয়ে গিয়ে প্রতিবেশী মহম্মদ শাহের বাড়িতে মজুরের কাজ করছে। মোহাম্মদ শাহের বাড়িতে মোল্লাসাহেব এবং তার অনুগামীরা প্রবেশ করেন, সেখানে ইলিয়াসের পরিচয় হয়।
অতিথিরা জানতে চান ইলিয়াসের এই করুন অবস্থার কথা। ইলিয়াসের পিতার মৃত্যুর সময় তাদের সামান্য সম্পত্তি ছিল। ইলিয়াস দম্পতি পঁয়ত্রিশ বছর সম্পত্তির মালিক হয়েছিলেন।
যখন ইলিয়াসের নাম ডাক বৃদ্ধি পায় তখন অনেক দূর থেকেও ভালো ভালো লোক তাদের বাড়িতে আসতেন। ইলিয়াস তাদের খেতে দিতেন শরবত চা কুমিস মাংস ইত্যাদির ব্যবস্থা থাকত।
ইলিয়াস ছোটো ছেলে বউকে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দিলেও তাদের একটি বাড়ি ও কিছু গরু ঘোড়াও দেয়। ইলিয়াসের চরিত্রের মহৎ গুণ হলো সে নির্লোভ।
প্রশ্ন: ‘বৃদ্ধ দম্পতিকে সাহায্য করবার তখন কেউ নেই’—বৃদ্ধ দম্পত্তি বলতে কারা? তাদের কোন পরিস্থিতিতে সাহায্য করার কেউ ছিল না?
উত্তর:
নিও তলস্তয় রচিত ইলিয়াস গল্পে, বৃদ্ধ দম্পতি বলতে ইলিয়াস ও তার স্ত্রী শামশেমাগিকে বোঝানো হয়েছে।
ইলিয়াস দম্পতি দীর্ঘ পঁয়ত্রিশ বছরের অক্লান্ত পরিশ্রমে বিপুল সম্পত্তির অধিকারী হয়ে ওঠে। দু-শো ঘোড়া, দেড়-শো গরু-মোষ, বারো-শো ভেড়া এবং অসংখ্য চাকর বাকর ইলিয়াসের চারিদিকে খুব নাম ছড়িয়ে পড়ে। ইলিয়াসের বাড়িতে দূরদূরান্ত থেকে লোক আসতে থাকে।
এরপর হঠাৎ একদিন ইলিয়াসের বড়ো ছেলে মারামারির ঘটনায় মারা যায়। তারপর ছোটো ছেলে এবং তার ঝগড়াটে স্ত্রী ইলিয়াসের কথা অমান্য করতে শুরু করে। ইলিয়াস তখন তাদের বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেয় এবং একটি বাড়ি ও কিছু গরু ঘোড়া দেয়।
এরপর থেকে ইলিয়াসের ভাগ্য খারাপ হতে থাকে। মড়কে ইলিয়াসের অনেকগুলি ভেড়া মারা যায়। দুর্ভিক্ষের ফলে ঘরের অভাবে শীতকালে অনেক গরু-মোষ না খেতে পেয়ে মারা যায়।
কিরবিজরা তার ভালো ঘোড়া গুলি চুরি করে নিয়ে যায়, ইলিয়াসের অবস্থা ক্রমশ খারাপ হতে থাকে। ৭০ বছর বয়সে ইলিয়াস বাধ্য হয়ে তার পশমের কোট, কম্বল, ঘোড়ার জিন, তাঁবু এবং অবশিষ্ট পশুগুলিকে বিক্রি করে দেয়।
বৃদ্ধ দম্পতি সর্বস্ব হারিয়ে অসহায় হয়ে পড়েন। ছোটো ছেলে দূরে থাকে, মেয়েটিও আগে মারা গিয়েছিল তাই বৃদ্ধ দম্পতিকে সাহায্য করার নিজের বলতে কেউ ছিল না।
প্রশ্ন: ইলিয়াস চরিত্রটি ‘ইলিয়াস’ রচনা অবলম্বনে বর্ণনা করো।
লিও তলস্তয়-এর ‘ইলিয়াস’ গল্পে ইলিয়াস কোনো বীরোচিত নায়ক নন। তিনি এক সাধারণ শ্রমজীবী মানুষ। কিন্তু মানবসভ্যতার ইতিহাসে যে নীরব মানুষগুলো সভ্যতাকে বাঁচিয়ে রাখে, ইলিয়াস তাঁদেরই একজন। উফা প্রদেশের এক বাসকির কৃষক হিসেবে তাঁর জীবন শুরু। পিতৃহারা হয়ে সামান্য সম্পত্তি নিয়েও তিনি ভেঙে পড়েননি। কারণ তিনি জানতেন—শ্রমই মানুষের প্রথম ও শেষ আশ্রয়। দীর্ঘদিনের কঠোর পরিশ্রম, সুবুদ্ধি ও শৃঙ্খলার ফলে তিনি ধীরে ধীরে বিত্তবান হন। অথচ ঐশ্বর্য তাঁর চরিত্রকে বিকৃত করতে পারে না। অতিথিপরায়ণতা ও সহমর্মিতা তাঁর স্বভাব হয়ে ওঠে। আশ্রয়প্রার্থী মানুষ তাঁর দরজা থেকে ফিরতে জানে না। এই মানবিকতা মনে করিয়ে দেয় আন্তন চেখভ-এর নীরব অথচ গভীর মানবিক চরিত্রদের। ইলিয়াস একই সঙ্গে আত্মমর্যাদাবোধসম্পন্ন। ছোটো ছেলে ও তার স্ত্রীর অবাধ্যতা তিনি মেনে নেননি। ন্যায্য ভাগ দিয়ে আলাদা করেছেন। এখানেই তাঁর নৈতিক দৃঢ়তা। কিন্তু ভাগ্য যখন উল্টে যায়, তখনও তিনি অভিযোগ করেন না। সর্বস্বান্ত হয়েও তিনি শ্রমের মধ্যে শান্তি খুঁজে পান। এই দার্শনিক স্থিতিই ইলিয়াসকে কেবল একটি চরিত্র নয়, মানবসভ্যতার চিরন্তন প্রতিনিধিতে পরিণত করে।
প্রশ্ন: ইলিয়াস কীভাবে সর্বস্বান্ত হলো তা ‘ইলিয়াস’ রচনা অবলম্বনে লেখো।
ইলিয়াসের সর্বস্বান্ত হওয়া কোনো আকস্মিক দুর্ঘটনা নয়। এটি এক দীর্ঘ ঐতিহাসিক প্রক্রিয়া। মানবসভ্যতার উত্থান ও পতনের মতোই ধীরে, নীরবে ঘটে। পিতার মৃত্যুর পর সামান্য সম্পত্তি নিয়ে শুরু হয়েছিল তাঁর জীবনযাত্রা। দীর্ঘ পঁয়ত্রিশ বছরের কঠোর পরিশ্রমে তিনি বিপুল ঐশ্বর্যের অধিকারী হন। কিন্তু এই সমৃদ্ধির মধ্যেই পতনের বীজ রোপিত ছিল। সন্তানদের চরিত্রে অবক্ষয় দেখা দেয়। বড়ো ছেলে অসৎ সঙ্গের বলি হয়ে প্রাণ হারায়। ছোটো ছেলে অবাধ্য হয়ে ওঠে। তার স্ত্রীর আচরণ পারিবারিক শৃঙ্খলাকে ভেঙে দেয়। আত্মমর্যাদাবোধসম্পন্ন ইলিয়াস ন্যায্য সম্পত্তির ভাগ দিয়ে ছেলেকে আলাদা করেন। এতে তাঁর অর্থনৈতিক ভিত দুর্বল হয়ে পড়ে। এরপর প্রকৃতি ও সমাজ একযোগে আঘাত হানে। ভেড়ার পালে মড়ক লাগে। দুর্ভিক্ষ আসে। শীতে পশুখাদ্যের অভাবে গবাদিপশু মারা যায়। কিরবিজরা তাঁর ভালো ঘোড়াগুলি লুট করে নেয়। একে একে বিক্রি হয় পশমের কোট, কম্বল, ঘোড়ার জিন। শেষে পশুগুলিও। এই পতন মনে করিয়ে দেয় থমাস হার্ডি-র ট্র্যাজিক নায়কদের, যাঁরা ভাগ্যের বিরুদ্ধে লড়াই করেও নীরবে হার মানেন। কিন্তু ইলিয়াস হার মানেন না। তিনি গ্রহণ করেন। শান্তভাবে।
প্রশ্ন: ‘ইলিয়াস’ রচনার নামকরণের সার্থকতা বিচার করো।
নামের শিল্প-ইঙ্গিত: সাহিত্যে নামকরণ কেবল পরিচয় নয়, তা রচনার আত্মা, দার্শনিক সারাৎসার। [‘ইলিয়াস’ নামটি তাই গভীরভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। ‘ইলিয়াস’ নামটি বাইবেলের ভাববাদী এলিজা (Elijah) এবং কোরআনের নবী ইলিয়াস (Elias) থেকে এসেছে। এই নামে, একটা মিথিক্যাল শুদ্ধতার অনুভূতি আছে]। যাই হোক, এই রচনার প্রতিটি স্তরেই ইলিয়াস কেন্দ্রে অবস্থান করেন। তাঁর শ্রমে গড়ে ওঠা সমৃদ্ধি, তাঁর পতন, এবং তাঁর জীবনবোধ—সবই আখ্যানের মূল স্রোত।
জীবনবৃত্ত: উপকথাধর্মী এই রচনার শুরুতে আমরা দেখি এক সংগ্রামী মানুষকে। মাঝখানে দেখি এক বিত্তবান অথচ মানবিক গৃহস্থকে। শেষে দেখি এক সর্বস্বান্ত বৃদ্ধকে। কিন্তু চূড়ান্তভাবে দেখি এক দার্শনিক মানুষকে, যিনি শ্রমের মধ্যেই শান্তি খুঁজে পেয়েছেন। মহম্মদ শা-র গৃহে ইলিয়াস ও তাঁর স্ত্রীর জীবনকথা আসলে মানবসভ্যতার দীর্ঘ অভিজ্ঞতার সংক্ষিপ্ত ভাষ্য।
চিরন্তন জীবন-প্রতীক: রচনায় ইলিয়াস চরিত্র মনে করিয়ে দেয় আর্নেস্ট হেমিংওয়ে রচিত ‘The Old Man and the Sea’-এর সান্তিয়াগোকে—যিনি পরাজিত হলেও অন্তরে থেকে যান অটল। আবার ইলিয়াস একইসঙ্গে স্মরণ করায় লিও তলস্তয়ের আরেক চরিত্র প্লাতন কারাতায়েভকে, যাঁর জীবনের মূল শক্তিই ছিল মানসিক ধৈর্য ও শান্তচিত্ততা। ইলিয়াস তাই কোনো একক মানুষের নাম নয়। ইলিয়াস এক দর্শন। ইলিয়াস যেন মানবজীবনের চির প্রবহমান ইতিহাস। সেই কারণেই রচনার নাম ‘ইলিয়াস’—সম্পূর্ণ সার্থক, অনিবার্য এবং চিরন্তন।
প্রশ্ন: শাম শেমাগি চরিত্রটি বিশদভাবে আলোচনা করো।
উত্তর: শাম শেমাগি ‘ইলিয়াস’ গল্পের একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ চরিত্র। তিনি কেবল ইলিয়াসের স্ত্রী নন, বরং তার জীবনের উত্থান–পতনের সহযাত্রী এবং গল্পের দার্শনিক বক্তব্যের প্রধান বাহক।
ধনী অবস্থায় যেমন তিনি স্বামীর সঙ্গে পরিশ্রম করে সম্পদ গড়ে তুলেছেন, তেমনি সর্বহারা অবস্থাতেও ধৈর্য ও সংযম বজায় রেখেছেন। তার চরিত্রের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো সত্যভাষণ ও আত্মবিশ্বাস। মহম্মদ শার বাড়িতে অতিথিদের প্রশ্নের উত্তরে তিনি নির্ভীকভাবে স্বীকার করেন যে ধনী জীবনে তারা কখনো প্রকৃত সুখ পাননি। তখন তাদের জীবন ছিল দুশ্চিন্তা, ভয় ও ব্যস্ততায় পূর্ণ। কিন্তু সর্বহারা হয়ে ভাড়াটে মজুরের জীবন গ্রহণ করার পর তারা মানসিক শান্তি ও ঈশ্বরচিন্তার সময় পেয়েছেন। এই উপলব্ধির কথাই তিনি স্পষ্টভাবে প্রকাশ করেন।
শাম শেমাগি সহনশীল ও আত্মনির্ভরশীল নারী। জীবনের কঠিন পরিস্থিতিতে তিনি ভেঙে পড়েননি। বরং দুঃখের মধ্যেও তিনি শান্তি খুঁজে পেয়েছেন। তার চরিত্রে একদিকে রয়েছে গৃহিণীর কর্তব্যপরায়ণতা, অন্যদিকে রয়েছে গভীর জীবনবোধ। তার কথার মধ্য দিয়েই লেখক দেখিয়েছেন—প্রকৃত সুখ অর্থে নয়, আত্মিক শান্তিতে নিহিত। এই কারণেই শাম–শেমাগি চরিত্রটি গল্পের নৈতিক ও দার্শনিক কেন্দ্রবিন্দু।
প্রশ্ন: মহম্মদ শা চরিত্রটি বিশদভাবে আলোচনা করো।
উত্তর: মহম্মদ শা ‘ইলিয়াস’ গল্পের এক মানবিক ও মূল্যবোধসম্পন্ন চরিত্র। তিনি কেবল ইলিয়াসের প্রতিবেশী নন, বরং সামাজিক সাম্য ও নৈতিক দায়িত্ববোধের প্রতীক।
একসময়ের ধনী ও অতিথিপরায়ণ ইলিয়াস যখন জীবনের নির্মম আঘাতে সর্বহারা হয়ে পড়েন, তখন সমাজের অনেকেই তাকে ভুলে গেলেও মহম্মদ শা তাকে আশ্রয় দেন। তবে এই আশ্রয় দয়া প্রদর্শনের ভঙ্গিতে নয়; বরং তিনি ইলিয়াস ও তার স্ত্রীকে কাজের মাধ্যমে মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপনের সুযোগ দেন। এতে তার সাম্যবাদী ও আত্মসম্মানবোধস্মপন্ন মনোভঙ্গি প্রকাশ পায়।
মহম্মদ শা অতীতকে স্মরণ করেন—ইলিয়াস একসময় অতিথিদের আন্তরিকভাবে আপ্যায়ন করতেন। সেই স্মৃতির প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে তিনি মানবিক আচরণ করেন। তার এই মনোভাব প্রমাণ করে যে প্রকৃত মূল্যবোধ সম্পদের উপর নির্ভরশীল নয়, বরং মানুষে মানুষে পারস্পরিক সম্মান ও সহমর্মিতার উপর প্রতিষ্ঠিত। অতিথিদের সামনে তিনি ইলিয়াসের জীবনের উত্থান-পতনের কথা তুলে ধরেন। এর ফলে গল্পের দার্শনিক বক্তব্য প্রকাশের ক্ষেত্র তৈরি হয়। মহম্মদ শার চরিত্রে মুক্ত জীবনদৃষ্টি লক্ষ করা যায়—তিনি ধনসম্পদকে মানুষের আসল পরিচয় বলে মানেন না। মানুষের প্রকৃত মর্যাদা তার মানবিকতা ও কর্মে নিহিত—এই উপলব্ধিই তার চরিত্রকে উজ্জ্বল করে তোলে।
###ড. অনিশ রায়

