দাম /নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়
🔴 চরিত্র ও বিভীষিকা (অবশ্যপাঠ্য)
১. স্কুলে কে বিভীষিকা ছিলেন?
উত্তর : অঙ্কে অসাধারণ দক্ষ কিন্তু ভীষণ কঠোর এক অঙ্কের মাস্টারমশাই।
২. মাস্টারমশাই কীভাবে অঙ্ক কষতেন?
উত্তর : একবার দেখে খড়ি দিয়ে ঝড়ের গতিতে ব্ল্যাকবোর্ডে কষে দিতেন।
৩. ‘সব অঙ্ক ওঁর মুখস্থ’ মনে হত কেন?
উত্তর : যে-কোনো অঙ্ক তিনি নিমেষে কষে ফেলতেন বলে।
৪. মাস্টারমশাইয়ের ভয়ে কারা তটস্থ থাকত?
উত্তর : অঙ্কে একশো পাওয়া ছাত্ররাও।
🔴 শাসন, ভয় ও শিক্ষা-পদ্ধতি
৫. খড়ি ভেঙে গেলে মাস্টারমশাই কী করতেন?
উত্তর : বিরক্ত হয়ে টুকরো দুটো ছাত্রদের দিকে ছুঁড়ে দিতেন।
৬. অঙ্কে কাঁচাদের অবস্থা কেমন ছিল?
উত্তর : চড় খেয়ে মাথা ঘুরত, কাঁদারও সাহস পেত না।
৭. ছাত্ররা কাঁদলে কী করতেন?
উত্তর : হুংকার দিয়ে ভয় দেখাতেন।
৮. ‘গাধা পিটিয়ে ঘোড়া করতে গেলে গাধাটাই পঞ্চত্ব পায়’—এর তাৎপর্য কী?
উত্তর : অত্যাচার করে কাউকে শিক্ষা দেওয়া যায় না।
🔴 অঙ্ক–স্বর্গ–প্লেটো অংশ
৯. প্লেটোর দোরগোড়ায় কী লেখা ছিল?
উত্তর : যারা অঙ্ক জানে না, তাদের প্রবেশ নিষেধ।
১০. মাস্টারমশাইয়ের মতে স্বর্গের দরজায় কী লেখা আছে?
উত্তর : একই লেখা—যে অঙ্ক জানে না তার প্রবেশ নিষেধ।
১১. যে স্বর্গে পা দিয়েই জ্যামিতির এক্সট্রা কষতে হয়—বক্তার মত কী?
উত্তর : সেই স্বর্গ থেকে লক্ষ যোজন দূরে থাকাই নিরাপদ।
🔴 কথকের জীবন ও অঙ্কভীতি
১২. ম্যাট্রিকুলেশনের গণ্ডি পার হয়ে সুকুমার কীসের হাত থেকে রেহাই পান?
উত্তর : অঙ্ক ও অঙ্কের মাস্টারমশাইয়ের হাত থেকে।
১৩. কথক নিজেকে ‘অঙ্ক-বিশারদ’ বলেছেন কেন?
উত্তর : ব্যঙ্গ করে, কারণ তিনি অঙ্কে খুবই কাঁচা ছিলেন।
১৪. ‘এখন আর আমাকে স্কুলে অঙ্ক কষতে হয় না’—কেন?
উত্তর : কারণ তিনি কলেজে বাংলা পড়ান।
🔴 লেখা, পত্রিকা ও ‘দাম’
১৫. ছেলেবেলার গল্প লেখার ফরমাশ কোথা থেকে এসেছিল?
উত্তর : একটি অনামি পত্রিকা থেকে।
১৬. ‘লিখলুম তাঁকে নিয়েই’—কাকে?
উত্তর : স্কুলের অঙ্কের মাস্টারমশাইকে।
১৭. ‘ছবিটা যা ফুটল’, তা ছিল কেমন?
উত্তর : খুব উজ্জ্বল নয়।
১৮. পত্রিকা কর্তৃপক্ষ সুকুমারকে কত দক্ষিণা দিয়েছিলেন?
উত্তর : দশ টাকা।
১৯. নগদ লাভ বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
উত্তর : গল্প লিখে পাওয়া দশ টাকা।
🔴 শেষাংশ : মানবিক মোড়
২০. পুরোনো পত্রিকার কথা শুনে সুকুমারের প্রতিক্রিয়া কী হয়েছিল?
উত্তর : তাঁর জিভ শুকিয়ে গিয়েছিল, আত্মগ্লানিতে মাটিতে মিশে যেতে ইচ্ছে হয়েছিল।
২১. মাস্টারমশাইয়ের জামার পকেট থেকে কী বের হয়েছিল?
উত্তর : একটি জীর্ণ পত্রিকা।
২২. মাস্টারমশাইয়ের সুকুমারকে কী পাঠাতে সাহস হয়নি?
উত্তর : সুকুমারের নিজের লেখা।
২৩. আবছা আলোয় অভ্যস্ত হলে সুকুমার কী দেখেছিলেন?
উত্তর : মাস্টারমশাইয়ের দু-চোখে আবেগের অশ্রু।
২৪. বৃদ্ধ মাস্টারমশাই কেন এসেছিলেন?
উত্তর : কথকের বক্তৃতা শুনতে ও আশীর্বাদ করতে।
🔴 গল্পের মূলভাব
২৫. গল্পের মূলকথা কী?
উত্তর : অত্যাচার করে শিক্ষা দেওয়া যায় না।
২৬. ‘তার প্রমাণ আমি নিজেই’—কেন?
উত্তর : মার খেয়েও কথক অঙ্ক শিখতে পারেননি।
২৭. গল্পকথক ‘তাঁকে’ বিক্রি করেছিলেন—কীভাবে?
উত্তর : দশ টাকার বিনিময়ে।
২৮. ‘আমার ছাত্র আমাকে অমর করে দিয়েছে’—কেন?
উত্তর : ছাত্র তাঁকে গল্পে তুলে ধরে অমর করেছে।
২৯. বৃদ্ধ মাস্টারমশাইয়ের সামনে দাঁড়িয়ে সুকুমারের অনুভূতি কী?
উত্তর : মনে হয়েছিল তিনি ক্ষমার এক মহাসমুদ্রের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন।
৩০. শেষ পর্যন্ত গল্পের ‘দাম’ কী?
উত্তর : স্নেহ, মমতা ও ক্ষমা—যার দাম টাকা দিয়ে মাপা যায় না।
৩ মানের প্রশ্নোত্তর
১। ‘কী বিভীষিকাই যে ছিলেন ভদ্রলোক’—ভদ্রলোকটি কে? কাকে বিভীষিকা বলা হয়েছে কেন?
গল্প: দাম | লেখক: নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়
ব্যাখ্যা: গল্পে ভদ্রলোকটি হলেন কথক সুকুমারের স্কুলজীবনের অঙ্কের মাস্টারমশাই। তিনি অঙ্কে অসাধারণ দক্ষ হলেও স্বভাবতই কঠোর ও রাগী ছিলেন। অঙ্ক না পারলে ছাত্রদের উপর নেমে আসত শাসন ও শাস্তি। চোখের জলকে তিনি দুর্বলতা মনে করতেন। এই ভীতিকর আচরণ ও নির্মম শাসনের জন্য ছাত্রদের মনে তিনি বিভীষিকার প্রতিমূর্তি হয়ে উঠেছিলেন।
২। “দু-চোখ দিয়ে তার আগুন ঝরছে”—কার কথা বলা হয়েছে? কেন?
গল্প: দাম | লেখক: নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়
কারণ: এখানে অঙ্কের মাস্টারমশাইয়ের কথাই বলা হয়েছে। ছাত্ররা অঙ্ক না বুঝতে পারলে তাঁর রাগ চরমে উঠত। সেই তীব্র ক্রোধ ও কঠোর দৃষ্টিভঙ্গি যেন তাঁর চোখ দিয়ে আগুনের মতো ঝরত। এই ভীতিকর অভিজ্ঞতা সুকুমারের মনে এত গভীর ছাপ ফেলেছিল যে, পরবর্তীকালে বড় হয়েও তিনি সেই আগুনঝরা চোখের স্মৃতি ভুলতে পারেননি।
৩। মাস্টারমশাইয়ের মতে স্বর্গের দরজায় কী লেখা আছে? কেন সেই কথার উল্লেখ করেছেন?
গল্প: দাম | লেখক: নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়
কারণ ব্যাখ্যা: মাস্টারমশাইয়ের মতে স্বর্গের দরজাতেও নাকি প্লেটোর দোরগোড়ার মতো লেখা আছে—“সে অঙ্ক জানে না, তার প্রবেশ নিষেধ।” এই বক্তব্যের মাধ্যমে তিনি অঙ্কবিদ্যার অপরিসীম গুরুত্ব বোঝাতে চেয়েছেন। তাঁর ধারণায়, অঙ্ক না জানলে মানুষ জ্ঞানী হতে পারে না, এমনকি স্বর্গেও তার স্থান নেই—এই কঠোর বিশ্বাসই এখানে প্রকাশ পেয়েছে।
৪। যে স্বর্গে পা দিয়েই জ্যামিতির এক্সট্রা কষতে হয়, তার সম্পর্কে বক্তার মত কী?
গল্প: দাম | লেখক: নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়
মতের ব্যাখ্যা: বক্তার মতে, যে স্বর্গে প্রবেশ করামাত্র জ্যামিতির এক্সট্রা কষতে হয়, সেই স্বর্গ আসলে কোনো সুখের জায়গা নয়। বরং এমন স্বর্গ ভীতিকর ও যন্ত্রণাদায়ক। তাই ব্যঙ্গাত্মক ভঙ্গিতে তিনি বলেন, এমন স্বর্গ থেকে লক্ষ যোজন দূরে থাকাই শ্রেয়। এই মন্তব্যে তাঁর শৈশবের অঙ্কভীতির রসাত্মক প্রকাশ ঘটেছে।
৫। ম্যাট্রিকুলেশনের গণ্ডি পার হয়ে সুকুমার কীসের হাত থেকে রেহাই পেয়েছিলেন? কীভাবে?
গল্প: দাম | লেখক: নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়
ব্যাখ্যা: ম্যাট্রিকুলেশনের গণ্ডি পার হয়ে সুকুমার অঙ্ক এবং বিভীষিকাস্বরূপ অঙ্কের মাস্টারমশাইয়ের হাত থেকে রেহাই পেয়েছিলেন। স্কুলজীবনের সেই ভয়াবহ অঙ্কযন্ত্রণা তাঁর জীবনে আর প্রত্যক্ষভাবে ফিরে আসেনি। যদিও স্মৃতির গভীরে সেই ভয় রয়ে গিয়েছিল, তবু শিক্ষাজীবনের এক অধ্যায় শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তিনি বাস্তব জীবনে মুক্তি অনুভব করেন।
৬। সুকুমার কলেজে কী পড়ান? তার কৃতিত্ব কী?
গল্প: দাম | লেখক: নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়
ব্যাখ্যা: ‘দাম’ গল্পে সুকুমার কলেজে বাংলা পড়ান। স্কুলজীবনে অঙ্কে চরমভাবে দুর্বল হলেও পরবর্তীকালে তিনি বাংলা ভাষা ও সাহিত্যকে নিজের জীবিকার ক্ষেত্র হিসেবে গ্রহণ করেন। অঙ্কের বিভীষিকা থেকে মুক্ত হয়ে সাহিত্যই তাঁর আশ্রয় হয়ে ওঠে। এই পরিবর্তনের মধ্য দিয়েই সুকুমারের জীবনযাত্রার দিকবদল ও আত্মপ্রতিষ্ঠার পরিচয় পাওয়া যায়।
৭। সুকুমারের কাছে ছেলেবেলার গল্প লেখার ফরমাশ কোথা থেকে এসেছিল? সুকুমার সাড়া দেয় কীভাবে?
গল্প: দাম | লেখক: নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়
ব্যাখ্যা: সুকুমারের কাছে তাঁর ছেলেবেলার গল্প লেখার ফরমাশ এসেছিল একটি অনামি পত্রিকার পক্ষ থেকে।
পত্রিকার কর্তৃপক্ষ তাঁর কাছে শৈশবের কোনো অভিজ্ঞতা নিয়ে গল্প লিখতে অনুরোধ করে। সেই অনুরোধে সাড়া দিয়েই সুকুমার নিজের স্কুলজীবনের স্মৃতি, বিশেষত অঙ্কের মাস্টারমশাইকে কেন্দ্র করে গল্পটি রচনা করেন।
৮। ‘সাহিত্যের ইন্দ্র চন্দ্র মিত্র বরুণ’ কাদের বলা হয়েছে? কেন?
গল্প: দাম | লেখক: নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়
কারণ ব্যাখ্যা: ‘সাহিত্যের ইন্দ্র চন্দ্র মিত্র বরুণ’ বলতে সাহিত্যজগতের প্রতিষ্ঠিত ও খ্যাতনামা সাহিত্যিকদের বোঝানো হয়েছে।
এটি এক প্রতীকী উক্তি, যার মাধ্যমে সাহিত্যক্ষেত্রে উচ্চাসনে অধিষ্ঠিত রথী-মহারথীদের ইঙ্গিত করা হয়েছে। এই উপমার মাধ্যমে সাহিত্যজগতের ক্ষমতা, মর্যাদা ও ঐশ্বর্যের ধারণা প্রকাশ পেয়েছে।
৯। সুকুমার কাকে নিয়ে তার ছেলেবেলার গল্প লিখেছিলেন? কেন?
গল্প: দাম | লেখক: নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়
কারণ ব্যাখ্যা: সুকুমার তাঁর স্কুলজীবনের অঙ্কের মাস্টারমশাইকে নিয়েই ছেলেবেলার গল্প লিখেছিলেন। সেই গল্পে মাস্টারমশাইয়ের কঠোরতা, শাসন এবং নিজের শৈশবের ভীত অভিজ্ঞতা ব্যঙ্গ ও স্মৃতিচারণের ভঙ্গিতে উঠে এসেছে। এই চরিত্রের মধ্য দিয়েই সুকুমার নিজের অতীতের ভয় ও প্রতিক্রিয়াকে সাহিত্যের ভাষায় প্রকাশ করেন।
১০। পত্রিকা কর্তৃপক্ষ সুকুমারকে কত দক্ষিণা দিয়েছিলেন? এর মধ্য দিয়ে কোন ইঙ্গিত প্রকাশ পায়?
গল্প: দাম | লেখক: নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়
ব্যাখ্যা: পত্রিকা কর্তৃপক্ষ সুকুমারের লেখা পড়ে সন্তুষ্ট হয়ে তাঁকে দশ টাকা দক্ষিণা দিয়েছিলেন। এই সামান্য দামই গল্পের কেন্দ্রীয় তাৎপর্য বহন করে। কারণ এই দশ টাকার বিনিময়েই সুকুমার অজান্তে শিক্ষকের স্নেহ, মমতা ও মহত্ত্বকে ‘বিক্রি’ করেছিলেন। এই ‘দাম’-ই পরে তাঁর তীব্র আত্মগ্লানির কারণ হয়ে ওঠে।
✪পরবর্তী প্রতিটি উত্তরের আগে লিখে নেবে ➤[গল্প: দাম | লেখক: নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়]
✪তারপর উত্তরের আগে পয়েন্ট করবে➤ [ব্যাখ্যা/কারণ/প্রসঙ্গ— যখন যেটার প্রয়োজন হবে]
১। ‘কী বিভীষিকাই যে ছিলেন ভদ্রলোক’—ভদ্রলোকটি কে? কেন বিভীষিকা?
- ভদ্রলোকটি হলেন কথক সুকুমারের স্কুলজীবনের অঙ্কের মাস্টারমশাই। অঙ্কে তাঁর অসাধারণ দক্ষতা ও আত্মবিশ্বাস থাকলেও স্বভাবে তিনি ছিলেন অত্যন্ত কঠোর ও রূঢ়। অঙ্ক না পারলে ছাত্রদের উপর নেমে আসত প্রচণ্ড শাসন ও শারীরিক শাস্তি। কান্নাকে তিনি দুর্বলতার লক্ষণ বলে মনে করতেন। এই ভয়ংকর শাসনপ্রবণ আচরণ ও আতঙ্কসৃষ্টিকারী উপস্থিতির কারণেই ছাত্রদের কাছে তিনি বিভীষিকার প্রতিমূর্তি হয়ে উঠেছিলেন।
২। “দু-চোখ দিয়ে তার আগুন ঝরছে”—কার কথা বলা হয়েছে? কেন?
- এখানে অঙ্কের মাস্টারমশাইয়ের কথাই বলা হয়েছে। ছাত্ররা অঙ্ক না বুঝলে বা ভুল করলে তাঁর ক্রোধ চরমে পৌঁছত। সেই ক্রোধের তীব্রতা তাঁর চোখের দৃষ্টিতেই প্রকাশ পেত—যেন দু-চোখ দিয়ে আগুন ঝরছে। এই ভয়াবহ অভিজ্ঞতা সুকুমারের মনে এত গভীর ছাপ ফেলেছিল যে, প্রাপ্তবয়স্ক হয়েও সে দুঃস্বপ্নে সেই আগুনঝরা চোখের আতঙ্ক অনুভব করত।
৩। মাস্টারমশাইয়ের মতে স্বর্গের দরজায় কী লেখা আছে?
- মাস্টারমশাইয়ের মতে স্বর্গের দরজাতেও লেখা আছে—“সে অঙ্ক জানে না, তার প্রবেশ নিষেধ।” এই উক্তির মাধ্যমে তিনি অঙ্কবিদ্যার সর্বোচ্চ গুরুত্ব বোঝাতে চেয়েছেন। তাঁর বিশ্বাস ছিল, অঙ্ক না জানলে মানুষ প্রকৃত জ্ঞানী হতে পারে না। এই অঙ্ক-অন্তপ্রাণ মানসিকতাই তাঁকে অতিমাত্রায় কঠোর করে তুলেছিল এবং ছাত্রদের উপর শাসনের বৈধতা এনে দিয়েছিল।
৪। “গাধা পিটিয়ে ঘোড়া করতে গেলে গাধাটাই পঞ্চত্ব পায়”—তাৎপর্য লেখো।
- এই উক্তির অর্থ হলো—জোর করে কাউকে তার স্বভাববিরুদ্ধ কিছু বানাতে গেলে উন্নতি নয়, বরং সর্বনাশ ঘটে। সুকুমার এই উক্তির মাধ্যমে বোঝাতে চেয়েছেন, মারধর ও ভয় দেখিয়ে অঙ্ক শেখানো যায় না। মাস্টারমশাইয়ের অতিরিক্ত শাসনে তিনি অঙ্ক শিখতে পারেননি; বরং সারাজীবনের জন্য তাঁর মনে অঙ্কভীতি স্থায়ী হয়ে গেছে।
৫। “এইটুকুই আমার নগদ লাভ”—‘নগদ লাভ’ বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
- অঙ্কের মাস্টারমশাইকে নিয়ে লেখা বাল্যস্মৃতির জন্য পত্রিকা থেকে পাওয়া দশ টাকাকেই সুকুমার ‘নগদ লাভ’ বলেছেন। শৈশব থেকে তিনি মাস্টারমশাইয়ের কাছ থেকে পেয়েছিলেন কেবল ভয়, মার ও মানসিক যন্ত্রণা। তার বিনিময়ে হাতে পাওয়া একমাত্র প্রত্যক্ষ প্রাপ্তি ছিল এই দশ টাকা। এই উক্তির মধ্য দিয়ে সুকুমারের তীব্র ব্যঙ্গ ও আত্মগ্লানি প্রকাশ পেয়েছে।
৬। “পড়ে আনন্দে আমার চোখে জল এল”—কোন লেখার কথা? কেন?
- এখানে সুকুমারের লেখা সেই বাল্যস্মৃতির কথাই বলা হয়েছে, যা একটি অনামি পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল। মাস্টারমশাই সেই লেখায় নিজের কঠোর আচরণের সমালোচনা থাকা সত্ত্বেও ক্ষুব্ধ হননি। বরং ছাত্রের স্মৃতিতে ও লেখায় নিজের অস্তিত্বের স্বীকৃতি পেয়ে তিনি গভীর আবেগে আপ্লুত হন। এই আত্মীয়তাবোধ ও গর্বের অনুভূতিতেই তাঁর চোখ আনন্দে জলে ভরে ওঠে।
৭। “মুহূর্তে আমার জিভ শুকিয়ে গেল”—কেন?
- কলেজের অনুষ্ঠানে মাস্টারমশাই যখন আনন্দের সঙ্গে সুকুমারের সেই পুরোনো লেখার কথা উল্লেখ করেন, তখন সুকুমারের মনে তীব্র লজ্জা ও অপরাধবোধ জেগে ওঠে। তিনি উপলব্ধি করেন—যাঁর স্নেহ, মমতা ও মহত্ত্ব আজ প্রকাশ পাচ্ছে, তাঁকেই তিনি একদিন ব্যঙ্গ করেছিলেন। এই আত্মগ্লানি ও মানসিক সংকোচে তাঁর জিভ মুহূর্তে শুকিয়ে যায়।
৮। “সেই ভয়টার কঙ্কাল লুকিয়ে চোরাকুঠুরিতে”—তাৎপর্য কী?
- এই উক্তির মাধ্যমে শৈশবের অঙ্কভীতি ও মাস্টারমশাইয়ের মার খাওয়ার স্মৃতিকে বোঝানো হয়েছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সুকুমার সেই ভয় ভুলে গেছেন বলে মনে হলেও বাস্তবে তা অবচেতনে লুকিয়ে ছিল। বহু বছর পরে পরিচিত কণ্ঠস্বর শুনে সেই পুরোনো আতঙ্ক আবার জেগে ওঠে। এটি তাঁর মানসিক ট্রমার প্রতীকী প্রকাশ।
৯। “মাস্টারমশাই আমাকে বলতে দিলেন না”—তিনি কী বলেছিলেন?
- সুকুমার লজ্জায় কিছু বলতে চাইলে মাস্টারমশাই তাঁকে থামিয়ে দেন। তিনি বলেন, ছাত্ররাই শিক্ষকের প্রকৃত পরিচয় ও গর্ব। শিক্ষক হিসেবে তিনি কেবল শাসনই দিয়েছেন—এ কথা অকপটে স্বীকার করেন। এরপর পকেট থেকে পুরোনো পত্রিকা বের করে জানান, ছাত্র তাঁকে নিয়ে গল্প লিখে তাঁকে অমর করে দিয়েছে। এতে তাঁর নিরহঙ্কারতা ও মহত্ত্ব প্রকাশ পায়।
১০। “একটা ভয়ের মৃদু শিহরণ”—এর প্রকৃত কারণ কী?
- অন্ধকার মাঠে এক বৃদ্ধ যখন সুকুমারকে নাম ধরে ডাকেন, তখন প্রথমে তাঁর মনে ভয় জাগে। মুহূর্ত পরেই তিনি কণ্ঠস্বর চিনতে পারেন—এটি তাঁর স্কুলজীবনের অঙ্কের মাস্টারমশাইয়ের। সেই গম্ভীর স্বর শৈশবের মার, অপমান ও অঙ্কভীতির স্মৃতি জাগিয়ে তোলে। এই স্মৃতিবাহী কণ্ঠই তাঁর ভয়ের প্রকৃত কারণ।
১১। “লিখলুম তাঁকে নিয়েই”—কাকে নিয়ে কী লেখা হয়েছিল?
- একটি অনামি পত্রিকার অনুরোধে সুকুমার তাঁর ছেলেবেলার স্মৃতি লিখেছিলেন। বিষয় হিসেবে তিনি বেছে নেন স্কুলজীবনের বিভীষিকাস্বরূপ অঙ্কের মাস্টারমশাইকে। লেখাটিতে মাস্টারমশাইয়ের কঠোর শাসন, মারধর ও ভয় দেখিয়ে অঙ্ক শেখানোর পদ্ধতির সমালোচনা করা হয়। তাঁর মতে, ভয় দিয়ে কোনো বিষয়কে ভালোবাসতে শেখানো যায় না।
১২। “মাস্টারমশাই আমাকে বলতে দিলেন না”—তিনি কী বলেছিলেন?
- লজ্জায় সুকুমার কথা বলতে চাইলে মাস্টারমশাই তাঁকে থামিয়ে দেন। তিনি বলেন, ছাত্ররাই শিক্ষকের প্রকৃত পরিচয়। শিক্ষক হিসেবে তিনি ছাত্রদের কেবল শাসনই দিয়েছেন—এ কথা তিনি নির্দ্বিধায় স্বীকার করেন। পরে পুরোনো পত্রিকা দেখিয়ে বলেন, ছাত্র তাঁকে নিয়ে গল্প লিখে তাঁকে অমর করে দিয়েছে। এই উক্তিতে তাঁর উদারতা ও আত্মসমালোচনার পরিচয় মেলে।
১৩। “একটা ভয়ের মৃদু শিহরণ আমার বুকের ভিতর দিয়ে বয়ে গেল”— কারণ কী?
- বাংলাদেশের কলেজের অন্ধকার মাঠে এক বৃদ্ধ সুকুমারকে নাম ধরে ডাকলে তিনি প্রথমে ভীত হন। কিছুক্ষণের মধ্যেই কণ্ঠস্বর চিনতে পারেন—এটি তাঁর স্কুলজীবনের অঙ্কের মাস্টারমশাইয়ের। সেই পরিচিত গম্ভীর স্বর শৈশবের মার খাওয়া ও অঙ্কভীতির স্মৃতিকে আবার জাগিয়ে তোলে। এই আকস্মিক স্মৃতিই তাঁর মনে ভয়ের শিহরণ সৃষ্টি করে।
১৪। “আমাদের মতো নগণ্যদের পক্ষে ততই সুখাবহ”—কারা? কেন সুখাবহ?
- এখানে ‘আমাদের’ বলতে সুকুমারের মতো তুলনামূলকভাবে অনামী লেখকদের বোঝানো হয়েছে। মফস্সলে কলকাতার লেখকদের অযথা বড় করে দেখা হয়। ফলে সাধারণ মানের লেখকরাও সেখানে বিশিষ্ট সাহিত্যিকের মর্যাদা, সংবর্ধনা ও গুরুত্ব পান। এই অতিরঞ্জিত সম্মান ও রাজোচিত আতিথেয়তাই নগণ্য লেখকদের কাছে সুখকর ও লাভজনক বলে মনে হয়েছে।
১৫। “এখানকার চড়ুই পাখিও সেখানে রাজহংসের সম্মান পায়”—তাৎপর্য কী?
- এই উক্তির মাধ্যমে মফস্সলে শহুরে লেখকদের প্রতি অতিরিক্ত শ্রদ্ধা ও মোহের কথা বলা হয়েছে। কলকাতা থেকে আসা সাধারণ মানের লেখকরাও সেখানে খ্যাতনামা সাহিত্যিকের মর্যাদা পান। এই ভৌগোলিক দূরত্বজনিত বিভ্রম ও সামাজিক মানসিকতার ব্যঙ্গাত্মক প্রকাশই এখানে ফুটে উঠেছে। চড়ুই পাখির রাজহংসে পরিণত হওয়া এই অতিরঞ্জনেরই প্রতীক।
১৬। “কিন্তু আমি খুশি হতে পারলাম না”—কেন?
- মাস্টারমশাই সুকুমারের বক্তৃতার প্রশংসা করলেও তিনি খুশি হতে পারেননি। তাঁর মনে পড়ে যায়—একসময় তিনি এই মানুষটিকেই ব্যঙ্গ করে লিখেছিলেন। আজ সেই মানুষটির উদারতা, ক্ষমাশীলতা ও স্নেহের সামনে দাঁড়িয়ে নিজের সংকীর্ণতা উপলব্ধি করেন তিনি। এই আত্মগ্লানি ও লজ্জার অনুভূতিই তাঁর আনন্দকে সম্পূর্ণভাবে ঢেকে দেয়।
১৭। “স্নেহ–মমতা–ক্ষমার এক মহাসমুদ্র”—কোন পরিপ্রেক্ষিতে?
- যখন জানতে পারেন, মাস্টারমশাই তাঁর সমালোচনামূলক লেখা সযত্নে রেখে দিয়েছেন এবং একে ছাত্রের অধিকার বলে মেনে নিয়েছেন, তখনই এই উপলব্ধি আসে। কঠোরতার আড়ালে যে মানুষটি গভীর স্নেহ, মমতা ও ক্ষমার প্রতীক—এই বোধে তিনি নিজেকে সেই মহাসমুদ্রের তীরে দাঁড়ানো ক্ষুদ্র মানুষ বলে অনুভব করেন।
১৮। “লক্ষ যোজন দূরে থাকাই আমরা নিরাপদ বোধ করতুম”—কেন?
- মাস্টারমশাই বলতেন, অংক না জানলে স্বর্গেও প্রবেশ নিষেধ। ফলে সুকুমার ও তাঁর সহপাঠীদের মনে হতো—যে স্বর্গে ঢুকেই জ্যামিতির অঙ্ক কষতে হয়, তা আদৌ সুখের স্থান নয়। অঙ্কভীতিতে আক্রান্ত ছাত্রদের কাছে সেই স্বর্গ ভয় ও শাস্তির প্রতীক হয়ে উঠেছিল। তাই তারা এমন স্বর্গ থেকে দূরে থাকাই নিরাপদ মনে করত।
১৯। “ছবিটা যা ফুটল তা খুব উজ্জ্বল নয়”—কোন ছবি? কেন?
- এখানে সুকুমারের লেখায় ফুটে ওঠা মাস্টারমশাইয়ের চরিত্রচিত্রের কথাই বলা হয়েছে। সেই লেখায় শিক্ষকের কঠোরতা ও শাসনের দিকটিই বেশি গুরুত্ব পেয়েছিল। অহেতুক তাড়নায় শিক্ষা দেওয়া যায় না—এই বক্তব্যের ফলে তাঁর মানবিক মহত্ত্ব ও স্নেহের দিকটি তখন সম্পূর্ণভাবে উজ্জ্বল হয়ে ওঠেনি।
২০। “একদিন একটি পত্রিকার পক্ষ থেকে ফরমাস এলো”—কার কাছে? কীভাবে পূরণ?
- এই ফরমাশটি এসেছিল সুকুমারের কাছে। প্রথমে তিনি নিজের জীবনকে তুচ্ছ ভেবে অনীহা প্রকাশ করেন। পরে পত্রিকার অনুরোধে রাজি হয়ে তিনি নিজের ছেলেবেলার স্মৃতি লিখে দেন। বিষয় হিসেবে বেছে নেন স্কুলজীবনের অঙ্কের মাস্টারমশাইকে। এইভাবেই তিনি পত্রিকার ফরমাশ পূরণ করেছিলেন।
২১। “ওঁর চড়ের জোর থেকেই আমরা তা আন্দাজ করে নিয়েছিলুম”—কী আন্দাজ?
- মাস্টারমশাইয়ের প্রকাণ্ড চড়ের জোর থেকেই ছাত্ররা আন্দাজ করেছিল—তিনি সত্যিই পা ধরে স্কুলের পুকুরে ছুঁড়ে ফেলতে পারেন। এই ভয় দেখানো ও শারীরিক শক্তির প্রদর্শন তাঁর বিভীষিকাময় রূপকে আরও ভয়ংকর করে তুলেছিল। ছাত্রদের মনে তাঁর সম্পর্কে স্থায়ী আতঙ্ক গড়ে ওঠে এই আচরণের ফলেই।
২২। “কিন্তু কাঁদবার জো ছিল না”— কাদের? কেন?
- সুকুমার ও তাঁর সহপাঠীদের কাঁদবার জো ছিল না।
কারণ মাস্টারমশাই কাঁদাকে দুর্বলতার লক্ষণ মনে করতেন। মার খেয়ে কাঁদলে তিনি আরও রেগে যেতেন। ফলে ভয়, অপমান ও শাস্তির চাপে ছাত্ররা চোখের জল সংযত রাখতে বাধ্য হতো। এই নিষ্ঠুর পরিবেশেই তাদের শৈশব কেটেছিল।
২৩। “ওঁর ভয়ে তারাই তটস্থ হয়ে থাকত”—কারা, কেন?
- এখানে অঙ্কে ভালো ছাত্রদের কথাও বলা হয়েছে। মাস্টারমশাই নিখুঁত ফলাফল আশা করতেন। সামান্য ভুলেও তিনি রেগে যেতেন। তাই একশোতে একশো পাওয়া ছাত্ররাও তাঁর সামনে ভয়ে তটস্থ থাকত। এই ঘটনাই তাঁর কর্তৃত্ব, ভয় ও মানসিক প্রভাবের তীব্রতা প্রকাশ করে।
২৪। “সব যেন ওঁর মুখস্থ”—কার কথা? কেন এমন মনে হতো?
- এখানে অঙ্কের মাস্টারমশাইয়ের কথাই বলা হয়েছে। ছাত্রদের মনে হতো পৃথিবীর সব অঙ্ক যেন তাঁর মুখস্থ। কারণ যেসব জটিল অঙ্ক তারা বুঝতে পারত না, তিনি সেগুলো একবার দেখেই বোর্ডে অনায়াসে সমাধান করে দিতেন। এমন দক্ষতায় খড়ি চলত যে মনে হতো অঙ্ক আগেই লেখা ছিল।
২৫। “পুরুষ মানুষ হয়ে অঙ্ক পারিস না”—উক্তিটির তাৎপর্য।
- এই উক্তির মাধ্যমে মাস্টারমশাই অঙ্ক ও পৌরুষকে এক করে দেখিয়েছেন। তাঁর মতে, অঙ্ক না পারা মানেই অক্ষমতা ও অপূর্ণতা। অঙ্ক না পেরে ছাত্ররা কাঁদলে তিনি তাদের পৌরুষ নিয়েই বিদ্রুপ করতেন। এতে তাঁর সংকীর্ণ মানসিকতা, অঙ্ককেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি ও মানবিক সংবেদনশীলতার অভাব স্পষ্টভাবে প্রকাশ পেয়েছে।
৫ মানের উত্তর
গল্পকার: নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়
১। ‘দাম’ গল্প অবলম্বনে সুকুমার চরিত্র বিশ্লেষণ
উত্তর: সাহিত্য ক্ষেত্রে ছোটগল্প এক অভিনব শিল্প আঙ্গিক। আর ছোটগল্পের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো চরিত্র। কোনো বিশেষ চরিত্রের মধ্য দিয়েই গল্পকারের বিশেষ ভাব ও দার্শনিক চেতনা মূর্ত হয়ে ওঠে। আবার কোনো কোনো চরিত্র বাহ্যদ্বন্দ্ব ও অন্তর্দ্বন্দ্বের মধ্য দিয়ে যাত্রা করে নিজের সত্য-সত্তাকে আবিষ্কার করে। ‘দাম’ গল্পে সুকুমার তেমনই এক চরিত্র।
সুকুমারের উপলব্ধি ও অনুভূতির নির্যাসেই মাস্টারমশাইয়ের চারিত্রিক মহত্ত্ব উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। দোষে–গুণে, মানসিক ক্রিয়া–প্রতিক্রিয়ায় তিনি রক্তমাংসের জীবন্ত মানুষ। তাঁর চরিত্রে তিনটি স্তর স্পষ্ট।
প্রথমত, কৌতূহল ও পর্যবেক্ষণশক্তি
কৈশোর স্মৃতিকথনের মধ্য দিয়ে তাঁর অসাধারণ বর্ণনাশক্তির পরিচয় পাওয়া যায়। অঙ্ক স্যারের কঠিন ব্যক্তিত্ব, তীব্র মেজাজ, দাপট, অহংবোধ ও মেধাকে তিনি সুচারুভাবে তুলে ধরেছেন।
দ্বিতীয়ত, কৌতুকপ্রবণতা ও প্রতিক্রিয়াশীলতা
অঙ্ক শিক্ষায় ব্যর্থ হয়ে তিনি নিজেকে ‘ঘোড়া’ না হয়ে ‘গাধা’ বলে ব্যঙ্গ করেন। কৈশোরের ভীত দিনগুলোর প্রতিক্রিয়ায় তিনি অঙ্ক স্যারকে আক্রমণ ও উপদেশ দিয়ে গল্প লেখেন। এতে তাঁর প্রতিক্রিয়াশীল ও আড়ম্বরপূর্ণ বিচারশীল মানসিকতা প্রকাশ পায়।
তৃতীয়ত, অনুভূতিশীল বিবেকবোধ
খ্যাতি ও সংবর্ধনার মাঝেও তিনি নিজের সারশূন্যতা উপলব্ধি করেন। দীর্ঘ ব্যবধানে অঙ্ক স্যারের মুখোমুখি হয়ে শিক্ষকের স্নেহ–মমতা–ক্ষমার সামনে দাঁড়িয়ে তিনি আত্মগ্লানিতে মুষড়ে পড়েন। এই বিবেকবোধই সুকুমার চরিত্রকে গভীর ও স্মরণীয় করে তোলে।
২। ‘দাম’ গল্প অবলম্বনে মাস্টারমশাই চরিত্র আলোচনা
উত্তর: ছোটগল্পে ‘ছোট প্রাণ’ কখন যে বৃহৎ ও মহৎ প্রাণ হয়ে ওঠে—তা বোঝার অবকাশ খুব কম থাকে। এখানেই ছোটগল্পের শিল্পিত গৌরব। ‘দাম’ গল্পে মাস্টারমশাই তেমনই এক আলোকিত চরিত্র। গল্পে তাঁর উপস্থিতি পারস্পরিক বিপরীত ভাব–পরিমণ্ডলে বিন্যস্ত।
প্রথম পর্বে মাস্টারমশাই রীতিমতো এক বিভীষিকা। কথকের সারা জীবনের অঙ্ক–ভীতির পশ্চাতে তাঁর ভূমিকা স্পষ্ট। শ্রেণিকক্ষে তাঁর আবির্ভাবে উচ্ছ্বল ছাত্রসমাজ মুহূর্তে ভয়ে স্তব্ধ হয়ে যেত। ভীত পরিবেশে শুরু হতো অঙ্কযজ্ঞ। জটিল অঙ্কে তাঁর অসামান্য মেধা প্রকাশ পেলেও অঙ্ক না বুঝলেই নেমে আসত বজ্রপাতসম শাসন। চোখের জল তাঁর কাছে দুর্বলতার লক্ষণ।
তবে এই কঠোরতার আড়ালে ছিল গভীর অঙ্ক–প্রীতি ও নিবিড় ছাত্রপ্রেম। নিষ্ঠার সঙ্গে তিনি ছাত্রদের অঙ্ক শেখাতে চাইতেন। নিজেকে উজাড় করে ছাত্রদের সমৃদ্ধ করতে চাইতেন। কিন্তু এই আন্তরিকতা প্রকাশ পেত আপাত গাম্ভীর্যের আড়ালে।
গল্পের শেষ পর্বে করুণাময় ও ক্ষমাশীল মাস্টারমশাই নতুন রূপে ধরা দেন। দীর্ঘ ব্যবধানে সুকুমারের সামনে এসে তিনি ছাত্রের সাফল্যে গর্বিত হন। অকপটে নিজের শিখন–পদ্ধতির ভুল স্বীকার করেন। ছাত্র বড়ো হয়ে শিক্ষকের ভুল সংশোধন করবে—এই অধিকারও তিনি সহজভাবে মেনে নেন।
নিরহঙ্কারী ব্যক্তিত্ব, মুক্ত চেতনা, সারল্য ও ক্ষমাশীলতায় তিনি সত্যিই এক আদর্শ শিক্ষক। এখানেই তাঁর সত্য শিক্ষাব্রতীর পরিচয়।
৩। ‘দাম’ গল্পের নামকরণের সার্থকতা
উত্তর: সাহিত্যে নামকরণ লেখকের বক্তব্য বিষয়ের ও ভাবগত উদ্দেশ্যের এক নিরবচ্ছিন্ন পূর্বাভাস। ‘দাম’ গল্পটির নাম তেমনই ব্যঞ্জনাধর্মী ও অর্থবহ।
গল্পের শুরুতেই মাস্টারমশাই কথকের কৈশোরে এক বিভীষিকাময় স্মৃতি হয়ে ওঠেন। অঙ্ক বিষয়ে তাঁর অহংবোধ ও দাপটের দাম দিতে গিয়ে কথকের জীবনে অঙ্ক কখনোই ভালোবাসার দাবি রাখেনি। প্লেটোর দরজা বা স্বর্গের সিঁড়িতে পৌঁছনোর মতো দামি সে কোনোদিনও হতে পারেনি।
পরিণত জীবনে কথক অধ্যাপক ও সাহিত্যিক। পত্রিকায় তাঁর লেখার একটি নির্দিষ্ট দাম আছে। সেই দামের গুণেই তিনি অঙ্ক মাস্টারকে নিয়ে গল্প লিখে দশ টাকা লাভ করেন। যা ছিল কথকের জীবিকার সঙ্গে যুক্ত এক বাস্তব দাম।
পরবর্তীতে বিশিষ্ট অতিথি হিসেবে তিনি কলেজে আমন্ত্রিত হন। রাজোচিত আতিথেয়তা, বক্তৃতা, হাততালি ও মুগ্ধতার আবহে তাঁর প্রাতিষ্ঠানিক দাম আরও বেড়ে যায়। নিজেকে দামি ভাবতে ভাবতেই তিনি অন্ধকার পথে যাত্রা করেন।
কিন্তু গল্পের ক্লাইম্যাক্সে মানবিক মূল্যবোধের প্রকৃত দাম প্রকাশ পায়। অঙ্ক মাস্টার নিজেই সমস্ত ভুল স্বীকার করেন। তাঁর স্নেহ, মমতা ও ক্ষমার সামনে কথকের আত্মগর্বের ফানুস চুপসে যায়। তিনি উপলব্ধি করেন— মাস্টারমশাইয়ের এই মহত্ত্ব কোনো দাম দিয়ে শোধ করা যায় না। অজ্ঞানতাবশত তিনি শিক্ষকের সেই মহত্ত্বকে মাত্র দশ টাকা দামে বিক্রি করেছিলেন।
এই উপলব্ধিতেই ‘দাম’ গল্পের নামকরণ সম্পূর্ণ সার্থক হয়ে ওঠে।
৪। “আমার ছাত্র আমাকে অমর করে দিয়েছে”—তাৎপর্য
উত্তর: ছোটগল্পে ‘ছোট প্রাণ’ কখন যে বৃহৎ ও মহৎ প্রাণ হয়ে ওঠে—তা বোঝার অবকাশ খুব কম থাকে। এখানেই ছোটগল্পের শিল্পিত গৌরব। ‘দাম’ গল্পে মাস্টারমশাই তেমনই এক আলোকিত চরিত্র। গল্পে তাঁর উপস্থিতি পারস্পরিক বিপরীত ভাব–পরিমণ্ডলে বিন্যস্ত।
কথকের সারা জীবনের অঙ্ক–ভীতির পশ্চাতে নিঃসন্দেহে এই মাস্টারমশাইয়ের কিছুটা ভূমিকা আছে। স্কুলের শ্রেণিকক্ষে তিনি বিভীষিকা মূর্তিতে আবির্ভূত হতেন। তাঁর উপস্থিতিতে উচ্ছ্বল ছাত্রসমাজ মুহূর্তে ভয়ে জমে যেত। এই বিভীষিকাময় অভিজ্ঞতার ফলেই পরবর্তীকালে জীবনে সফল ও প্রতিষ্ঠিত সুকুমার সুযোগ পেয়ে মাস্টারমশাইয়ের আচরণকে ব্যঙ্গ করে, তাঁকে জ্ঞান ও উপদেশ দিয়ে গল্প লিখে অর্থ উপার্জন করে।
তবে প্রাথমিক মূল্যায়নে বোঝা যায়—এই কঠিন শাসনের আড়ালে ছিল গভীর অঙ্ক–প্রীতি এবং নিবিড় ছাত্রপ্রেম। তিনি নিষ্ঠার সঙ্গে ছাত্রদের অঙ্ক শেখাতে চাইতেন। চাইতেন নিজেকে উজাড় করে ছাত্রদের সমৃদ্ধ করতে। কিন্তু এই আন্তরিকতা প্রকাশ পেত আপাত গাম্ভীর্যের আড়ালে।
গল্পের শেষ পর্বে করুণাময় ও ক্ষমাশীল মাস্টারমশাই নতুন আলোয় উদ্ভাসিত হন। দীর্ঘ ব্যবধানে সুকুমারের মুখোমুখি হয়ে তিনি অকপটে নিজের শিখন–পদ্ধতির ভুল স্বীকার করেন। অন্যেরা ছাত্রের গল্পের ব্যঙ্গাত্মক ভঙ্গি স্মরণ করালে তিনি তার বিরোধিতা করেন। বরং বলেন—“আমার ছাত্র আমাকে অমর করে দিয়েছে।”
এই উক্তির তাৎপর্য গভীর। কারণ মাস্টারমশাই উপলব্ধি করেন—সাহিত্য শাশ্বত কালের সত্যকে ধারণ করে। সেই শাশ্বত সত্যের জগতে তিনি ছাত্রের সৃষ্টির মধ্য দিয়েই চরিত্র হয়ে প্রতিষ্ঠা পেয়েছেন। নিরহঙ্কারী ব্যক্তিত্ব, মুক্ত চেতনা, উদারতা ও ক্ষমাশীলতার এই স্বীকৃতিতেই তাঁর প্রকৃত মহত্ত্ব প্রকাশ পায়। এখানেই তাঁর সত্য শিক্ষাব্রতীর প্রশস্ত পরিচয়।
৫. “আমি তাকে দশ টাকায় বিক্রি করেছিলুম”—কে, কাকে, কী বিক্রি করেছিলেন? এরপর বক্তার মনে যে আত্মগ্লানি সৃষ্টি হয়েছিল তা নিজের ভাষায় লেখো।
উত্তর: নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘দাম’ ছোটগল্পে এই উক্তিটির বক্তা কথক সুকুমার। এখানে ‘আমি’ বলতে সুকুমার নিজেকেই বোঝানো হয়েছে, ‘তাকে’ বলতে তাঁর স্কুলজীবনের অঙ্কের মাস্টারমশাইকে এবং ‘বিক্রি’ করা বস্তুটি হলো শিক্ষকের স্মৃতি, স্নেহ, মমতা ও চারিত্রিক মহত্ত্বকে ব্যঙ্গের ভাষায় রূপান্তরিত করে লেখা একটি গল্প।
কৈশোরে অঙ্ক মাস্টারমশাই সুকুমারের কাছে ছিলেন বিভীষিকার প্রতিমূর্তি। কঠোর শাসন ও অঙ্কের দাপটে তাঁর মনে দীর্ঘস্থায়ী ভয় তৈরি হয়েছিল। ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষার পর অঙ্ক ও অঙ্ক মাস্টারমশাইয়ের হাত থেকে রেহাই পেলেও সেই ভয় চেতনার গভীরে রয়ে যায়। পরবর্তীকালে সাহিত্যিক হিসেবে সুযোগ পেয়ে সুকুমার সেই ভীতির অভিজ্ঞতাকেই গল্পে রূপ দেন। অঙ্ক মাস্টারমশাইয়ের আচরণকে ব্যঙ্গ ও উপদেশের ভঙ্গিতে উপস্থাপন করে তিনি একটি নামহীন পত্রিকায় তা প্রকাশ করেন এবং তার বিনিময়ে সেই সময়ে দশ টাকা পারিশ্রমিক গ্রহণ করেন। তখন তাঁর ধারণা ছিল—এই লেখা কেউ পড়বে না। কিন্তু মাস্টারমশাইয়ের মাধ্যমে এই দশ টাকাই তার জীবনের প্রাপ্তি।
কিন্তু বহু বছর পরে যখন তিনি জানতে পারেন যে অঙ্ক মাস্টারমশাই স্বয়ং সেই লেখা পড়েছেন এবং তাতে কোনো ক্ষোভ প্রকাশ না করে বরং গর্ব অনুভব করেছেন, তখন সুকুমারের আত্মগর্ব ভেঙে পড়ে। দীর্ঘ ব্যবধানে শিক্ষকের মুখোমুখি হয়ে তিনি উপলব্ধি করেন—ভয়ের আড়ালে ছিল গভীর স্নেহ, মমতা ও ক্ষমার মানবিক মহত্ত্ব। সেই অমূল্য মহত্ত্বকে দশ টাকায় ‘বিক্রি’ করেছেন—এই উপলব্ধিতে সুকুমার তীব্র আত্মগ্লানিতে মুষড়ে পড়েন। শিক্ষকের এমন স্নেহশীল, মমতামাখা ও মহান ক্ষমাশীলতার সামনে দাঁড়িয়ে তিনি নিজের অবোধ তুচ্ছতা, সংকীর্ণতা ও অপরাধবোধ গভীরভাবে অনুভব করেন।
ড. অনিশ রায়

