ইউরোপ ফুটবলকে দিয়েছে শৃঙ্খলাবদ্ধ কাঠামো; আর্জেন্টিনা দিয়েছে ইউরোপেরই আধুনিক রূপাবয়ব; আর ব্রাজিল দিয়েছে নিজস্ব প্রাণের উত্তাপ ও আত্মার সংবেদ। ব্রাজিল ফুটবলকে পরিণত করেছিল এক সাংস্কৃতিক সভ্যতায়। এই লেখাটি সেই দুই ভিন্ন ঐতিহাসিক পথের কথকতা। যেখানে খেলার আড়ালে লুকিয়ে আছে জাতি, সংস্কৃতি, রাজনীতি, সভ্যতাগত দর্শন এবং মানবিক আত্মপরিচয়ের ইতিকথা
আধুনিক পৃথিবীকে যদি আমরা গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করি, তবে দেখতে পাব যে প্রায় প্রতিটি জাতি তার নিজস্ব অর্থনৈতিক কাঠামো, রাজনৈতিক দর্শন, সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার এবং সামাজিক মূল্যবোধের ভিতর ফুটবলকে একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে স্থান দিয়েছে। ইংল্যান্ড, জার্মানি, ফ্রান্স, ইতালি, স্পেন কিংবা আর্জেন্টিনা—সব দেশেই ফুটবল জনপ্রিয়, আবেগময় এবং সামাজিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। কিন্তু তাদের অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ফুটবল বৃহত্তর রাষ্ট্রিক ও অর্থনৈতিক কাঠামোর একটি অংশমাত্র। রাষ্ট্র, বাজার, কর্পোরেট শক্তি এবং সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলিই সেখানে মূল কেন্দ্র; ফুটবল সেই কেন্দ্রকে ঘিরে আবর্তিত হয়। কিন্তু ব্রাজিলের ক্ষেত্রে এই সমীকরণ যেন উল্টো। এখানে মনে হয়, ফুটবলই কেন্দ্র, আর রাষ্ট্র, সংস্কৃতি, অর্থনীতি, স্মৃতি ও জাতীয় পরিচয় যেন তাকে ঘিরেই নিজেদের অর্থ খুঁজে নেয়।
এই বক্তব্যকে আক্ষরিক সত্য হিসেবে নয়, বরং এক গভীর সাংস্কৃতিক রূপক হিসেবে উপলব্ধি করা প্রয়োজন। কারণ বাস্তবে-বিশ্বে ব্রাজিলও আধুনিক পুঁজিবাদী বিশ্বব্যবস্থার অংশ, সেখানেও বহুজাতিক কর্পোরেশন, টেলিভিশন স্বত্ব, বাজারনীতি এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির শক্তিশালী উপস্থিতি রয়েছে। তবু অন্য যে-কোনো দেশের তুলনায় ব্রাজিলে ফুটবল জাতীয় আত্মপরিচয়ের সঙ্গে এমনভাবে মিশে আছে যে, তাকে শুধু এক খেলা বলে চিহ্নিত করা প্রায় অসম্ভব।
ইউরোপীয় ফুটবলের ইতিহাস মূলত শিল্পবিপ্লবের ইতিহাসের সঙ্গে সম্পর্কিত। ইংল্যান্ডে ফুটবল জন্ম নিয়েছিল শ্রমিক সমাজের বিনোদন হিসেবে। কারখানার শৃঙ্খলা, সময়ানুবর্তিতা, সংগঠিত শ্রম এবং উৎপাদনশীলতার মূল্যবোধ ফুটবলের মধ্যেও প্রবেশ করেছিল। জার্মান ফুটবলে আমরা দেখি সংগঠনের শক্তি, পরিকল্পনার নিখুঁত পরিবেশন এবং সমষ্টিগত দক্ষতার প্রকাশ। ইতালীয় ফুটবলে কৌশলগত বুদ্ধিমত্তা, ফরাসি ফুটবলে রাষ্ট্র-নির্মাণের বহু-সাংস্কৃতিক প্রকল্প এবং স্প্যানিশ ফুটবলে আঞ্চলিক পরিচয়ের সংঘাত ও ঐক্যের সামাজিক কৌশল কাজ করে। এই দেশগুলো ফুটবলকে ভালোবাসে, কিন্তু ফুটবল তাদের রাষ্ট্রিক ও সামাজিক কাঠামোর অধীনেই অবস্থান করে।
আর আর্জেন্টিনায় ‘ইউরোপীয়করণ’ ছিল উনিশ শতকের একটি রাষ্ট্রনৈতিক প্রকল্প, যার লক্ষ্য ছিল দেশকে সাংস্কৃতিক, জনসংখ্যাগত ও রাজনৈতিকভাবে ইউরোপের আদলে গড়ে তোলা। শাসক অভিজাতরা মনে করতেন যে ইউরোপীয় অভিবাসন অর্থনৈতিক উন্নয়ন, আধুনিক শিক্ষা এবং ‘সভ্যতা’ নিয়ে আসবে। এই চিন্তার পেছনে ছিল সেই সময়ের ইউরোপীয় বর্ণবাদী তত্ত্ব, যেখানে শ্বেতাঙ্গ ইউরোপীয় সভ্যতাকে উন্নত এবং অন্যান্য জনগোষ্ঠীকে অপেক্ষাকৃত নিম্নতর হিসেবে উপস্থাপন করা হতো। ফলে আর্জেন্টিনার রাষ্ট্রনায়ক ও বুদ্ধিজীবীদের একাংশ প্রকাশ্যভাবেই ইউরোপীয় অভিবাসনকে উৎসাহিত করেন। ১৮৮০ থেকে ১৯৩০ সালের মধ্যে ইতালি, স্পেন, জার্মানি এবং অন্যান্য ইউরোপীয় অঞ্চল থেকে লক্ষ লক্ষ অভিবাসী আর্জেন্টিনায় এসে বসতি স্থাপন করেন। এই অভিবাসনের ঢেউ এত বিশাল ছিল যে দেশের জনসংখ্যার গঠন দ্রুত বদলে যায়। একই সঙ্গে জাতীয় পরিচয়কে প্রধানত ইউরোপীয় উত্তরাধিকারভিত্তিক হিসেবে তুলে ধরা হয়। এর ফলে আফ্রিকান ও আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অবদান প্রায়ই উপেক্ষিত হয় এবং আর্জেন্টিনা ধীরে ধীরে লাতিন আমেরিকার সবচেয়ে ইউরোপীয়-প্রভাবিত দেশগুলোর একটিতে পরিণত হয়। তাই বিশ শতকের পরবর্তী আর্জেন্টিনা লাতিন আমেরিকার দেশ হয়েও সেই-অর্থে লাতিন আমেরিকার সাংস্কৃতিক মৃত্তিকাজাত নয়। (অথচ সংগীত, নৃত্য, ভাষা এবং নগর সংস্কৃতির বহু ক্ষেত্রে আফ্রিকান প্রভাব সুস্পষ্ট। বিখ্যাত ‘ট্যাঙ্গো’ সংগীতের উৎপত্তিতেও আফ্রিকান সাংস্কৃতিক উপাদানের ভূমিকা ছিল বলে বহু গবেষক মনে করেন।) আবার দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর, বিশেষত ১৯৪৫ থেকে ১৯৫০-এর দশকে, বহু নাৎসি কর্মকর্তা ও সহযোগী ইউরোপ থেকে পালিয়ে আর্জেন্টিনায় আশ্রয় পায়। আর্জেন্টিনার উনিশ শতকের ইউরোপীয়করণ প্রকল্প এবং এই নাৎসি পলাতকদের আশ্রয় পাওয়ার ঘটনার মধ্যে একটি ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা খুঁজে পাওয়া যায়। উভয় ক্ষেত্রেই ইউরোপকে উন্নত সভ্যতার আদর্শ হিসেবে দেখার প্রবণতা কাজ করেছিল। প্রথম ক্ষেত্রে ইউরোপীয় অভিবাসনকে জাতি-গঠনের উপায় হিসেবে গ্রহণ করা হয়, দ্বিতীয় ক্ষেত্রে সেই ইউরোপীয় সংযোগের বিভিন্ন গোপন নেটওয়ার্ক কিছু নাৎসি কর্মকর্তার পালিয়ে আসার পথ সহজ করে। তবে দুটি ঘটনা এক নয়; তবু উভয়ই আর্জেন্টিনার দীর্ঘকালীন ইউরোপমুখী রাষ্ট্রিক ও সাংস্কৃতিক অভিমুখের ভিন্ন দুই ঐতিহাসিক প্রতিফলন হিসেবে বিবেচিত হয়। ফলে আর্জেন্টাইন ফুটবলেও মূলত ইউরোপীয় মনোভঙ্গিই কার্যকরী হতে থাকে৷ এবং বিংশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে তারা ইউরোপীয় ভঙ্গিতেই সংস্কৃতির মানচিত্র নির্মাণ করে ফেলে। তাদের ফুটবলও টোটাল ট্যাকটিক্যাল হওয়ার বাইরে কোনো সুদীর্ঘ সভ্যতার অনুস্মৃতি হতে পারে না৷ সে-পথ তারাই রুদ্ধ করেছিল।
ব্রাজিলের গল্প সম্পূর্ণ ভিন্ন। ব্রাজিল একটি মহাদেশসম বিস্তৃত দেশ। যার ইতিহাসে রয়েছে উপনিবেশবাদ, দাসপ্রথা, জাতিগত ভেদ ও মিশ্রণ, অর্থনৈতিক বৈষম্য এবং সাংস্কৃতিক বহুত্ব। এমন এক সমাজে একটিমাত্র সাধারণ জাতীয় পরিচয় গড়ে তোলা সহজ ছিল না। ভাষা ছিল এক, কিন্তু জীবনযাত্রা ছিল বহুবিচিত্র। রাজনীতি ছিল অস্থির, অর্থনীতি ছিল অনিয়মিত ওঠা-নামার অনিশ্চয়তায় ভরা। এই প্রেক্ষাপটে ফুটবল এমন এক ভাষায় পরিণত হয়েছিল, যা সমাজের সব স্তরের মানুষকে একত্র করতে সক্ষম হয়।
ব্রাজিলীয় ফুটবলের আত্মা গড়ে উঠেছে ইউরোপীয় নিয়মের আড়ালে আফ্রিকান ছন্দের দোলায়। ফুটবল সেখানে ইংরেজদের হাত ধরে পৌঁছেছিল ঠিকই, কিন্তু তার প্রাণ পেয়েছিল সুপ্রাচীন আফ্রিকান সভ্যতার ঐতিহ্য, সাম্বার ছন্দ, ক্যাপোইরার দেহভাষা এবং রাস্তার জীবনের স্বতঃস্ফূর্ত সৃজনশীলতা থেকে। ফলে ফুটবল আর শুধু প্রতিযোগিতা থাকে না; হয়ে ওঠে নৃত্য, শিল্প এবং আত্মপ্রকাশের এক নতুন মাধ্যম হিসেবে। ইউরোপ যেখানে ফুটবলকে সংগঠনের মাধ্যমে উন্নত করেছে, ব্রাজিল সেখানে ফুটবলকে কল্পনার মাধ্যমে পুনর্জন্ম দিয়েছে।
এই কারণেই ব্রাজিলীয় ফুটবলে ড্রিবল কেবল এক কৌশল নয়; তা আসলে স্বাধীনতার ভাষা। প্রতিপক্ষকে কাটিয়ে ওঠা মানে শুধু এগিয়ে যাওয়া নয়, বরং নিজের সৃষ্টিশীলতার প্রকাশ। বল নিয়ন্ত্রণ মানে শুধু দক্ষতা নয়, বরং নব-সৌন্দর্যের নির্মাণ। ব্রাজিলীয় দর্শকের কাছে একটি অসাধারণ ড্রিবল অনেক সময় একটি গোলের সমান মূল্যবান হয়ে উঠতে পারে। কারণ সেখানে ফুটবল ফলাফলের পাশাপাশি নন্দনতত্ত্বেরও বিষয়।
আধুনিক কর্পোরেট সভ্যতার মূল দর্শন হলো দক্ষতা, মুনাফা এবং ঝুঁকি-নিয়ন্ত্রণ। কর্পোরেট যুক্তি বলে, সবচেয়ে কার্যকর পথই সবচেয়ে ভালো পথ। ইউরোপীয় ও অন্যান্য দেশের ফুটবল এ-পথেরই যাত্রী। কিন্তু ঐতিহ্যগত ব্রাজিলীয় ফুটবল এই দর্শনের সম্পূর্ণ বিপরীত এক মানবিক কল্পনার প্রতিনিধিত্ব করে। সেখানে আনন্দ, সৃজনশীলতা, সৌন্দর্য এবং ব্যক্তিগত স্বাধীনতা প্রায়শই ফলাফলের সমান গুরুত্ব পায়। এই কারণেই ব্রাজিল বিশ্বকে শুধু মহান খেলোয়াড় দেয়নি; দিয়েছে শিল্পী। পেলে, গারিঞ্চা, জিকো, সক্রেটিস, রোমারিও, রোনালদো কিংবা রোনালদিনিয়োকে শুধুমাত্র ফুটবলার হিসেবে বিচার করলে তাদের প্রকৃত গুরুত্ব বোঝা যায় না। তাঁরা প্রত্যেকেই আসলে এক এক ভিন্ন সাংস্কৃতিক ধারণার প্রতীক।
বিশেষত পেলের আবির্ভাব ব্রাজিলীয় জাতীয় চেতনার ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ মোড়। ১৯৫৮ সালের বিশ্বকাপ জয় শুধু ক্রীড়া সাফল্য ছিল না; ছিল একটি জাতির আত্মবিশ্বাসের জন্মমুহূর্ত। দীর্ঘদিন ধরে ইউরোপীয় শ্রেষ্ঠত্বের ধারণার মধ্যে বসবাস করা এক দেশ প্রথমবারের মতো বিশ্বের সামনে ঘোষণা করেছিল যে তার নিজস্ব পথ, নিজস্ব সৌন্দর্য এবং নিজস্ব প্রতিভাও বিশ্বজয়ের ক্ষমতা রাখে। সেই মুহূর্ত থেকে বিশ্বকাপ ব্রাজিলের কাছে কেবল ট্রফি হিসেবে নয়; জাতীয় আত্মমর্যাদার প্রতীক হয়ে ওঠে।
১৯৭০ সালের দল এই ধারণাকে আরও গভীর করে। ফুটবল ইতিহাসের বহু বিশেষজ্ঞ আজও সেই দলকে সর্বকালের অন্যতম সেরা দল বলে মনে করেন। কিন্তু তাদের শ্রেষ্ঠত্ব শুধু জয়ের জন্য ছিল না; তাদের শ্রেষ্ঠত্ব ছিল সৌন্দর্য এবং সাফল্যকে একসঙ্গে ধারণ করার মধ্যে। তারা যেন পৃথিবীকে মনে করিয়ে দিয়েছিল যে মানুষ কেবল উৎপাদনের যন্ত্র নয়, সে একজন স্রষ্টাও। আধুনিকতার কঠোর দক্ষতার বিপরীতে তারা কল্পনা, শিল্প এবং আনন্দের পক্ষে এক নীরব দার্শনিক অবস্থান গ্রহণ করেছিল।
ব্রাজিলীয় ফুটবলের আরেকটি অনন্য মাত্রা হলো তার রাজনৈতিক তাৎপর্য। সক্রেটিসের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা ‘ডেমোক্রাসিয়া কোরিন্থিয়ানা’ আন্দোলন দেখিয়েছিল যে ফুটবল শুধু বিনোদনের ক্ষেত্র নয়; ফুটবল গণতন্ত্র, স্বাধীনতা এবং নাগরিক চেতনারও বাহক হতে পারে। সামরিক শাসনের সময় ফুটবল মাঠ রাজনৈতিক মুক্তির শপথ-ময়দান হয়ে উঠেছিল। বিশ্বের অন্য অনেক দেশে ফুটবল রাজনীতির দ্বারা ব্যবহৃত হয়েছে; কিন্তু ব্রাজিলে বহু সময় ফুটবল নিজেই রাজনৈতিক প্রতিরোধের ভাষা হয়ে উঠেছে।
ব্রাজিলীয় ফুটবলকে বোঝার জন্য তার পরাজয়গুলোকেও বুঝতে হয়। অনেক দেশে ইতিহাস শুধু বিজয়ীদের স্মরণ করে। কিন্তু ব্রাজিলে ১৯৮২ সালের দল আজও কিংবদন্তি, যদিও তারা বিশ্বকাপ জেতেনি। কারণ তারা মানুষের কল্পনাকে জয় করেছিল। তারা দেখিয়েছিল যে সৌন্দর্যেরও নিজস্ব সত্য আছে, যা কখনও কখনও ফলাফলের চেয়েও দীর্ঘস্থায়ী। কর্পোরেট বিশ্ব যেখানে কেবল সাফল্যের পরিসংখ্যান সংরক্ষণ করে, সেখানে ব্রাজিলীয় সাংস্কৃতিক স্মৃতি আনন্দ এবং সৌন্দর্যকেও অমরত্ব দেয়।
তবে বিশ্বায়নের যুগে এই ঐতিহ্য নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছে। ইউরোপীয় ক্লাব অর্থনীতির শক্তি, বিপুল টেলিভিশন আয়, ডেটা-নির্ভর বিশ্লেষণ এবং বৈশ্বিক বাজার ফুটবলকে ক্রমশ আরও কর্পোরেট করে তুলেছে। আজ ব্রাজিলের প্রতিভাবান ফুটবলাররা খুব অল্প বয়সেই ইউরোপে চলে যায়। রাস্তার ফুটবল, পাড়ার খেলা এবং স্বতঃস্ফূর্ত সৃজনশীলতার পরিবেশ আগের মতো শক্তিশালী নেই। ফলে এক গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এসেছে—ব্রাজিল কি তার ফুটবলীয় আত্মাকে ধরে রাখতে পারবে?
এই প্রশ্নের উত্তর এখনও ভবিষ্যতের হাতে। কিন্তু ইতিহাস আমাদের বলে, ব্রাজিলীয় ফুটবলের শক্তি কখনও কেবল কৌশলে ছিল না; ছিল তার সাংস্কৃতিক গভীরতায়। যতদিন ব্রাজিলের কোনো বস্তির শিশু খালি পায়ে বল নিয়ে স্বপ্ন দেখতে থাকবে, যতদিন সাম্বার ছন্দে ফুটবল নতুন অর্থ খুঁজে পাবে, ততদিন এই ঐতিহ্য সম্পূর্ণ বিলীন হবে না।
অতএব, যখন বলতে চাই যে— অন্য দেশগুলো কর্পোরেট, রাষ্ট্রিক এবং সামাজিক কাঠামো বজায় রেখে ফুটবল খেলে; আর ব্রাজিল ফুটবলকে কেন্দ্র করে তার সংস্কৃতি, ঐতিহ্য এবং জাতীয় কল্পনাকে লালন করে— তখন সেই কথা কেবল ক্রীড়া-সংক্রান্ত মন্তব্য হিসেবে বলতে চাইছি না, এ-কথা নিশ্চয়ই বোঝা যাচ্ছে। আসলে এক্ষেত্রে এই বক্তব্যের মূল উদ্দেশ্যই হলো, দুটি ভিন্ন সভ্যতাগত দর্শনের তুলনা করে দেখানো যে, ব্রাজিল আর ফুটবল আত্মিকভাবে কতখানি সমার্থক। একদিকে রয়েছে দক্ষতা, সংগঠন ও মুনাফার আধুনিক যুক্তি; অন্যদিকে রয়েছে আনন্দ, কল্পনা, সৌন্দর্য এবং মানবিক মুক্তির এক সাংস্কৃতিক স্বপ্ন। ব্রাজিলের ফুটবল সেই স্বপ্নেরই ছায়াছবি— যেখানে খেলা খেলার সব সীমা অতিক্রম করে একটি জাতির আত্মার প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠেছে। তাই বিশ্বায়নের যুগে ব্রাজিল অর্থাৎ ফুটবল নামক শিল্পটা যতই যান্ত্রিকতার কবলে পড়ুক না কেন, যান্ত্রিকতার বাঁধা-নিয়মে ইউরোপীয় সিস্টেম যতই প্রভুত্ব করুক না কেন, তাকে একদিন নতুন ছন্দে, নতুন দোলায়, নতুন প্রাণশক্তিতে বিবশ করবে ব্রাজিলই। একমাত্র ব্রাজিলই। কারণ তাদের রক্তের গভীরেই উচ্চারিত হয়েছিল ফুটবল খেলার প্রতিমেরু হিসেবে ফুটবল-সভ্যতা গড়ে তোলার নান্দীপাঠ। ফুটবলের ও বিশ্ব-সংস্কৃতির ইতিহাসে এই বিপ্লবের অধ্যায় একমাত্র তাদেরই রচনা। আসলে তাদের দেহে, দেহের দোলায়, আত্মার নিজস্ব প্রাকৃতিক প্রকরণে যে সুদীর্ঘ প্রাক-সভ্যতার ধারা বহমান। আর যান্ত্রিক সভ্যতার কোনো যন্ত্র কোনোদিনই সেই অন্তর্গত রক্তের ভিতরে খেলা করা আদিম আরণ্যক রহস্যের নাগালই পাবে না। তাই এখন শুধু সেই রহস্যের জাদু-দোলাকে পুনর্জাগরিত করার সাধনায় নিবিড় স্থিরতাটুকুই (পড়তে পারেন স্থবিরতাটুকু) কাম্য। কারণ, তারপর হয়তো হঠাৎ কোনো এক ‘৫৮’ এসে নিশ্চয়-ই বিশ্ব-ফুটবলকে বহুমাত্রায় দুলিয়ে দিয়ে যাবে। যন্ত্র শাসনও বিধ্বস্ত হয়ে শিল্পের ভাষায় চিন্তার সীমানা নির্ধারণ করতে চাইবে খুব অচিরেই। ইতিহাসের কিন্তু এমন কথাতেই সায় দেওয়ার দীর্ঘ ইতিহাস আছে। তাই আপাতত যে স্বল্প-সংখ্যক শিল্প-ফুটবল দেখার প্রত্যাশী মানুষ আছি, তারা যন্ত্রের ঘরানার ভিতর বসে সেই মন্ত্রই না-হয় মনে মনে পাঠ করি।
# ড. অনিশ রায়


Great content! Keep up the good work!