বিজ্ঞান ও কুসংস্কার : 

যুক্তির দীপশিখা ও অন্ধবিশ্বাসের অন্ধকার

মানবসভ্যতার ইতিহাস মূলত অজ্ঞতার অন্ধকার ভেদ করে জ্ঞানের আলোর দিকে এগিয়ে যাওয়ার ইতিহাস। আদিম মানুষ প্রকৃতির রহস্যময় শক্তির সামনে অসহায় ছিল; বজ্রপাত, ঝড়, ভূমিকম্প কিংবা সূর্যগ্রহণের মতো ঘটনাকে দেবতার অভিশাপ বা অলৌকিক শক্তির প্রকাশ বলে মনে করত। কিন্তু মানুষের অনুসন্ধিৎসা, চিন্তাশক্তি ও যুক্তিবোধের বিকাশের ফলে ধীরে ধীরে উন্মোচিত হয়েছে প্রকৃতির গোপন রহস্য। বিজ্ঞানের আবির্ভাব মানুষকে শিখিয়েছে—বিশ্বব্রহ্মাণ্ড কোনো অদৃশ্য শক্তির খেয়ালখুশিতে পরিচালিত হয় না; প্রত্যেক ঘটনার পেছনে কার্যকারণ সম্পর্ক ও নির্দিষ্ট নিয়ম কাজ করে। তাই বিজ্ঞান মুক্তির প্রতীক, আর কুসংস্কার মানুষের চিন্তার শৃঙ্খল।

প্রখ্যাত চিন্তাবিদ বার্ট্রান্ড রাসেল বলেছিলেন, “Fear is the main source of superstition.” অর্থাৎ, “ভয়ই কুসংস্কারের প্রধান উৎস।” মানুষ যখন অজানাকে বুঝতে পারে না, তখন কল্পনা ও ভ্রান্ত বিশ্বাসের আশ্রয় গ্রহণ করে। অন্যদিকে বিজ্ঞান মানুষকে ভয়ের কাছে আত্মসমর্পণ করতে শেখায় না; বিজ্ঞান প্রশ্ন করতে শেখায়, অনুসন্ধান করতে শেখায় এবং সত্যকে যুক্তির আলোয় যাচাই করতে শেখায়। সেই কারণেই বিজ্ঞান কেবল আবিষ্কারের সমষ্টি নয়, এক গভীর জীবনদর্শন।

বিজ্ঞানচেতনার মূল ভিত্তি যুক্তিবাদ। পর্যবেক্ষণ, পরীক্ষা ও প্রমাণের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত সত্যের উপর নির্ভর করেই মানুষের চিন্তার জগৎ সমৃদ্ধ হয়। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, বহু সময়ে কুসংস্কার ও গোঁড়ামি জ্ঞানের অগ্রযাত্রাকে বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা করেছে। একসময় ধর্মীয় যাজকতন্ত্র বিশ্বাস করত পৃথিবী স্থির এবং সূর্য তার চারদিকে আবর্তিত হয়। কিন্তু গ্যালিলিও গ্যালিলেই অকুতোভয়ে সত্যের পক্ষে দাঁড়িয়েছিলেন। তাঁর বিখ্যাত উক্তি— “And yet it moves.” অর্থাৎ, “তবুও পৃথিবী ঘুরছে”—মানবসভ্যতার ইতিহাসে যুক্তির এক অমর উচ্চারণ হয়ে আছে।

অথচ আধুনিক সমাজেও কুসংস্কারের প্রভাব সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হয়নি। প্রযুক্তির উৎকর্ষ ও শিক্ষার প্রসার সত্ত্বেও বহু মানুষ আজও কালো বিড়াল রাস্তা পার হলে অশুভ লক্ষণ মনে করেন, জ্যোতিষ বা করকোষ্ঠীর উপর ভাগ্য নির্ভর করেন, অলৌকিক শক্তির দ্বারা রোগ নিরাময়ের আশা করেন। বাহ্যিক আধুনিকতা অর্জিত হলেও অনেক ক্ষেত্রে মানসিক আধুনিকতা অপূর্ণ থেকে যায়। ফলে বৈজ্ঞানিক অগ্রগতি ও অন্ধবিশ্বাস একই সমাজে পাশাপাশি অবস্থান করে।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর অচলায়তন নাটকে সমাজের গোঁড়ামি ও অচল বিশ্বাসের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ উচ্চারণ করেছিলেন। কারণ মুক্তচিন্তা ছাড়া কোনো সমাজ প্রকৃত অর্থে এগিয়ে যেতে পারে না। বিজ্ঞান মানুষের সামনে মুক্তির জানালা খুলে দেয়, আর কুসংস্কার সেই জানালায় অন্ধকারের পর্দা টানতে চায়।

পরিশেষে বলা যায়, বিজ্ঞান ও কুসংস্কারের সংঘর্ষ আসলে আলোক ও অন্ধকারের চিরন্তন সংঘর্ষ। কার্ল সেগান যথার্থই বলেছিলেন, “Science is a candle in the dark.” অর্থাৎ, “বিজ্ঞান অন্ধকারের মধ্যে একটি প্রদীপশিখা।” জ্ঞানের সেই প্রদীপ যত উজ্জ্বল হবে, কুসংস্কারের ছায়া তত ক্ষীণ হয়ে যাবে। যুক্তি, শিক্ষা ও মানবিক সচেতনতার সমন্বয়ে নির্মিত সমাজই মানবসভ্যতাকে সত্যিকারের প্রগতির পথে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে।

 
### ড. অনিশ রায়
 

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!
Scroll to Top