সাম্যের মহাগান ও মানবতার বিশ্বদর্শন :
সভ্যতার ইতিহাস মূলত মানুষের আত্মমুক্তির ইতিহাস। এই ইতিহাসে যেমন রাজদণ্ডের ঝনঝনানি আছে, তেমনি আছে মানুষের হৃদয়ের গভীরতম আর্তনাদও। একদিকে সাম্রাজ্য, শোষণ, ধর্মীয় বিভাজন ও জাতিগত অহংকার; অন্যদিকে মানুষের অবিনাশী মুক্তিচেতনা, ভালোবাসা ও সাম্যের আকাঙ্ক্ষা। মানবসভ্যতা বারবার বিভক্ত হয়েছে বর্ণে, ধর্মে, জাতিতে, ভাষায়, শ্রেণিতে; অথচ মানুষের আত্মা চিরকাল চেয়েছে এক অখণ্ড মানবসমাজ। সেই অখণ্ডতার বাণীই বাংলা সাহিত্যে সর্বাধিক তীব্র, দীপ্ত ও বিপ্লবী উচ্চারণে ব্যক্ত করেছিলেন কাজী নজরুল ইসলাম। তাঁর ‘সাম্যবাদী’ কবিতা কেবল এক সাহিত্যকর্ম নয়; তা এক গভীর মানবতাত্ত্বিক দর্শন, এক সামাজিক বিপ্লবের ম্যানিফেস্টো এবং একই সঙ্গে মানুষের আত্মমর্যাদার মহাগান।
মানবসভ্যতার ইতিহাস মূলত দ্বন্দ্বের ইতিহাস। এই দ্বন্দ্ব কেবল রাষ্ট্রের সঙ্গে রাষ্ট্রের নয়, ধর্মের সঙ্গে ধর্মের নয়, বরং মানুষের সঙ্গে মানুষের; শোষকের সঙ্গে শোষিতের; ক্ষমতার সঙ্গে বঞ্চনার; ঐশ্বর্যের সঙ্গে ক্ষুধার। সভ্যতার উজ্জ্বল অট্টালিকার নিচে যুগে যুগে চাপা পড়ে থেকেছে অসংখ্য মানুষের দীর্ঘশ্বাস। রাজদণ্ড, ধর্মদণ্ড ও অর্থদণ্ডের নির্মম ছায়ায় মানুষ বহুবার হারিয়েছে তার স্বাভাবিক মর্যাদা। অথচ শিল্প, সাহিত্য ও কবিতা বারবার সেই অপমানিত মানুষের পক্ষেই কথা বলেছে। কারণ সাহিত্য শেষপর্যন্ত মানুষেরই সৃষ্টি, এবং তার চূড়ান্ত গন্তব্যও মানুষ। মানুষের আনন্দ, বেদনা, ক্ষুধা, স্বপ্ন, অপমান ও মুক্তির আকাঙ্ক্ষাই সাহিত্যের অন্তঃস্রোত।
এই কারণেই বাংলা কবিতায় সাম্যবাদী চেতনার উদ্ভব কেবল এক রাজনৈতিক মতাদর্শের সাহিত্যিক প্রতিফলন নয়; মানুষের আত্মমর্যাদা পুনরুদ্ধারের এক ঐতিহাসিক ও নৈতিক প্রয়াস। বাংলা কবিতায় সাম্যবাদী চেতনা মানে শুধু মার্কসবাদী স্লোগান নয়; এর গভীরে রয়েছে মানুষের প্রতি গভীর মমত্ববোধ, সামাজিক ন্যায়বিচারের আকাঙ্ক্ষা, শোষণমুক্ত বিশ্বের স্বপ্ন এবং সর্বোপরি এক অখণ্ড মানবসভ্যতার কল্পনা।
সাম্যের ধারণা মানবসভ্যতার প্রাচীনতম স্বপ্নগুলোর মধ্যে একটি। আদিম সমাজে মানুষ যৌথ জীবনযাপনের মধ্য দিয়ে বেঁচে ছিল। উৎপাদন ছিল সমষ্টিগত, ভোগও ছিল সমষ্টিগত। মানুষের মধ্যে সম্পদের বিভাজন তখনো প্রকট হয়ে ওঠেনি। কিন্তু সভ্যতার অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পত্তির উদ্ভব ঘটে, জন্ম নেয় শ্রেণিবিভাজন। একদল মানুষ উৎপাদনের উপায়ের মালিক হয়, অন্যদল পরিণত হয় শ্রমশক্তিতে। এই বিভাজন থেকেই জন্ম নেয় শোষণ। ফ্রেডরিক এঙ্গেলস ইতিহাস বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছিলেন—সভ্যতার ক্রমবিকাশের সঙ্গে সঙ্গে রাষ্ট্র ও ক্ষমতার কাঠামো মূলত শোষকশ্রেণির স্বার্থ রক্ষার হাতিয়ার হয়ে উঠেছে।
কিন্তু মানুষ কখনো সম্পূর্ণভাবে অন্যায় মেনে নেয়নি। প্রতিটি যুগেই কিছু চিন্তক, কবি ও দার্শনিক মানুষের মধ্যে সাম্যের বোধ জাগিয়ে তুলতে চেয়েছেন। ইউটোপীয় সমাজতন্ত্র থেকে শুরু করে মার্কসীয় বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র পর্যন্ত সমস্ত চিন্তাধারার কেন্দ্রে ছিল মানুষের মুক্তি। কার্ল মার্কস ও এঙ্গেলসের ‘কমিউনিস্ট মেনিফেস্টো’ এই চিন্তাকে এক নতুন ঐতিহাসিক ও বৈজ্ঞানিক ভিত্তি দেয়। শ্রেণিসংগ্রামের মধ্য দিয়ে শোষণহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন বিশ্বব্যাপী সাহিত্য ও শিল্পকলাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে।
বাংলা সাহিত্যও এর বাইরে ছিল না। বিশেষত ঔপনিবেশিক ভারতের সামাজিক বাস্তবতা, ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের শোষণ, কৃষক-শ্রমিকের দারিদ্র্য, দুর্ভিক্ষ, সাম্প্রদায়িকতা এবং শ্রেণিবৈষম্য বাংলা কবিতাকে নতুন এক মানবিক ও বিপ্লবী চেতনার দিকে ঠেলে দেয়। ফলে বাংলা কবিতায় সাম্যবাদী চেতনার উদ্ভব ঘটে এক গভীর সামাজিক প্রয়োজন থেকে।
তবে বাংলা কবিতার সাম্যবাদী চেতনা কেবল রাজনৈতিক তত্ত্বনির্ভর নয়; এর মধ্যে রয়েছে মানবিক ও আধ্যাত্মিক এক অন্তর্লোকও। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সরাসরি মার্কসবাদী ছিলেন না, কিন্তু তাঁর মানবতাবাদী দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে সাম্যের এক গভীর বোধ ছিল। “আমরা সবাই রাজা আমাদের এই রাজার রাজত্বে”—এই উচ্চারণে যেমন সমষ্টিগত মানবজীবনের কথা আছে, তেমনি “এ জগতে হায় সেই বেশি চায় আছে যার ভূরি ভূরি”—পংক্তিতে ধনবৈষম্যের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদও আছে। রবীন্দ্রনাথ উপলব্ধি করেছিলেন, সভ্যতার প্রকৃত সৌন্দর্য কেবল ধনসম্পদের প্রাচুর্যে নয়, মানুষের মর্যাদায়।
তাঁর ‘দুই বিঘা জমি’, ‘ওরা কাজ করে’, ‘এবার ফিরাও মোরে’ প্রভৃতি কবিতায় বঞ্চিত মানুষের আর্তি এক গভীর মানবিক বোধে প্রকাশিত হয়েছে। রবীন্দ্রনাথের মানবতাবাদ মূলত সাম্যের নৈতিক ভিত্তি নির্মাণ করেছিল। তিনি বিশ্বাস করতেন—মানুষের আত্মমর্যাদা বিনষ্ট হলে সভ্যতার সমস্ত অর্জনই অর্থহীন হয়ে পড়ে।
এই মানবতাবাদী ধারা পরবর্তী সময়ে আরও তীব্র ও বিপ্লবী রূপ লাভ করে কাজী নজরুল ইসলামের কবিতায়। নজরুল বাংলা কবিতায় সাম্যবাদী চেতনার প্রথম মহৎ ও বিস্ফোরক কণ্ঠস্বর। তাঁর সাম্যবাদ নিছক অর্থনৈতিক সমতার তত্ত্ব নয়; এটি এক গভীর মানবমুক্তির দর্শন। নজরুল এমন এক সময়ে আবির্ভূত হন, যখন ভারতবর্ষ ঔপনিবেশিক শাসনের নির্মম অত্যাচারে ক্ষতবিক্ষত। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিভাজননীতি ভারতীয় সমাজকে ধর্মীয় বিদ্বেষে উসকে তুলেছিল। অসহযোগ ও খেলাফত আন্দোলনের ব্যর্থতার পর হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে সন্দেহ, বিভেদ ও সাম্প্রদায়িক সংঘর্ষ ক্রমেই প্রকট হয়ে ওঠে। এই অন্ধকার সময়ে নজরুল মানুষের কাছে ফিরিয়ে আনতে চেয়েছিলেন মানুষের পরিচয়। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন—ধর্মের নামে মানুষকে বিভক্ত করা যায়, কিন্তু মানুষের অন্তর্গত মানবতাকে কখনো ধ্বংস করা যায় না। তাই তাঁর কণ্ঠে উচ্চারিত হয়—
“গাহি সাম্যের গান—
যেখানে আসিয়া এক হয়ে গেছে সব বাধা-ব্যবধান,
যেখানে মিশেছে হিন্দু-বৌদ্ধ-মুসলিম-ক্রীশ্চান।”
এই উচ্চারণ কেবল রাজনৈতিক নয়; সময়ের এক গভীর দার্শনিক উপলব্ধির ফসল। নজরুল বুঝেছিলেন, মানুষের প্রকৃত পরিচয় ধর্মীয় পরিচয়ে সীমাবদ্ধ নয়। মানুষ তার চেয়েও বৃহত্তর—সে এক মহাজাগতিক সত্তা। তাই তাঁর কাছে মানুষই চূড়ান্ত সত্য, ধর্মগ্রন্থ নয়; মানবহৃদয়ই সর্বশ্রেষ্ঠ উপাসনালয়, পাথরের মন্দির বা কাবা নয়—
“মিথ্যা শুনিনি ভাই,
এই হৃদয়ের চেয়ে বড়ো কোনো মন্দির-কাবা নাই।”
এই উপলব্ধির ভিতরেই নিহিত রয়েছে নজরুলের মানবতাবাদের মূল দর্শন। তিনি ধর্মকে অস্বীকার করেননি; বরং ধর্মের অন্তর্নিহিত মানবিক বাণীকেই পুনরাবিষ্কার করতে চেয়েছেন। তাঁর আপত্তি ছিল ধর্মান্ধতার বিরুদ্ধে, সেই সমস্ত ভণ্ড পুরোহিত, মৌলবি ও ধর্মব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে যারা ধর্মকে ব্যবহার করে মানুষের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করে। তাই তাঁর তীব্র ব্যঙ্গ—
“হায় রে ভজনালয়,
তোমার মিনারে চড়িয়া ভণ্ড গাহে স্বার্থের জয়।”
এই পংক্তির মধ্যে শুধু ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ভণ্ডামির সমালোচনা নেই; এখানে সভ্যতার নৈতিক অবক্ষয়ের বিরুদ্ধে এক তীব্র প্রতিবাদও নিহিত। মানুষ যখন ধর্মকে আত্মশুদ্ধির পথ হিসেবে না দেখে ক্ষমতা ও স্বার্থরক্ষার অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে, তখন ধর্ম তার পবিত্রতা হারায়। নজরুল সেই অন্ধকারকেই আঘাত করেছেন।
‘সাম্যবাদী’ কবিতার সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিক হলো—এখানে সাম্য কেবল অর্থনৈতিক সমতা নয়; মানুষের অস্তিত্বগত সাম্য। মানুষে মানুষে কোনো ভেদ নেই—এই উপলব্ধিই কবিতার কেন্দ্রবিন্দু। তিনি বলেছেন—
“মানুষেরে ঘৃণা করিও কারা
কোরান, বেদ, বাইবেল চুম্বিছে মরি মরি।”
এখানে কবি এক গভীর দ্বিচারিতার দিকে আঙুল তুলেছেন। মানুষ ধর্মগ্রন্থকে শ্রদ্ধা করে, কিন্তু মানুষকেই ঘৃণা করে। অথচ সমস্ত ধর্মের মূল শিক্ষা তো মানুষের মঙ্গল, প্রেম ও সহমর্মিতা। তাই তিনি প্রশ্ন তোলেন—যদি মানুষই অপমানিত হয়, তবে ধর্মপালনের অর্থ কী? এই প্রশ্ন সাহিত্য-পরিসর ছাড়িয়ে হয়ে যায় নৈতিক, সামাজিক ও দার্শনিক প্রশ্নও।
নজরুলের এই দৃষ্টিভঙ্গি বিশ্বমানবতাবাদের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। রবীন্দ্রনাথ যেমন “যেথায় থাকে সবার অধম দীনের হতে দীন” বলে মানুষের মধ্যে ঈশ্বরকে খুঁজেছিলেন, নজরুলও তেমনি মানুষের মধ্যেই দেবত্ব আবিষ্কার করেছেন। তবে তাঁর ভাষা আরও তীব্র, আরও শাণিত। কারণ তিনি প্রেমের কবি, সংকল্পিত প্রেমিক-কবি; তাই তিনি প্রতিবাদের কবি, বিপ্লবের কবি। তাঁর মানবতাবাদ নিছক কোমল আবেগ নয়; তাঁর মানবতাবাদ সংগ্রামী মানবতাবাদ।
ঔপনিবেশিক সমাজে মানুষ কেবল বিদেশি শাসকের দ্বারাই শোষিত হচ্ছিল না; সমাজের অভ্যন্তরেও ছিল অসংখ্য বৈষম্য—জাতপাত, বর্ণভেদ, ধর্মীয় সংকীর্ণতা, শ্রেণিগত শোষণ। নজরুল এই সমস্ত ব্যবস্থার বিরুদ্ধেই বিদ্রোহ ঘোষণা করেছিলেন। তিনি চেয়েছিলেন এমন এক সমাজ, যেখানে মানুষ তার মানবিক মর্যাদা নিয়ে বাঁচবে। তাঁর স্বপ্নের সমাজে ধনী-দরিদ্রের বিভেদ থাকবে না, ধর্মের নামে হিংসা থাকবে না, জাতপাতের অহংকার থাকবে না। এই স্বপ্ন কোনো ইউটোপীয় কল্পনা নয়; তা মানুষের আত্মিক মুক্তির আকাঙ্ক্ষা।
নজরুলের সাম্যচেতনা শুধু রাজনৈতিক মতাদর্শের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। পাশ্চাত্যের মার্কসীয় সাম্যবাদ মূলত অর্থনৈতিক শোষণ ও শ্রেণিসংগ্রামের ওপর গুরুত্ব দেয়; কিন্তু নজরুলের সাম্যবাদ তার চেয়েও ব্যাপক। তাঁর সাম্যবাদে অর্থনৈতিক সমতার পাশাপাশি আছে আত্মিক ও নৈতিক সমতা। তিনি মানুষের ভেতরের আত্মমর্যাদাকে জাগিয়ে তুলতে চেয়েছেন। তাই তিনি বলেন—
“মূর্খরা সব শোনো,
মানুষ এনেছে গ্রন্থ; গ্রন্থ আনেনি মানুষ কোনো!”
এই পংক্তির মধ্যেই সেই গভীর দার্শনিক সত্য নিহিত আছে। মানুষই সভ্যতা নির্মাণ করেছে, ধর্মগ্রন্থ রচনা করেছে, সংস্কৃতি সৃষ্টি করেছে। তাই মানুষ কোনো গ্রন্থের চেয়ে ছোটো হতে পারে না। এই চিন্তা মানবকেন্দ্রিক দর্শনের সঙ্গে সম্পর্কিত, যেখানে মানুষের স্বাধীন বুদ্ধি ও সৃজনশীলতাকেই সর্বোচ্চ মর্যাদা দেওয়া হয়।
নজরুলের সাহিত্যিক শক্তির অন্য আরেক বিস্ময়কর দিক হলো—তিনি ভারতীয় উপমহাদেশের বহুমাত্রিক সংস্কৃতিকে এক অভিন্ন মানবিক চেতনায় রূপ দিতে পেরেছিলেন। তাঁর কবিতায় একই সঙ্গে এসেছে কোরান, বেদ, বাইবেল, ত্রিপিটক; এসেছে কৃষ্ণ, মুসা, ঈসা, মুহাম্মদ, বুদ্ধ। তিনি কোনো ধর্মকে প্রতিষ্ঠা, বা অন্য ধর্মের বিরুদ্ধে নিজস্ব অবস্থানকে দাঁড় করাননি; তিনি বরং দেখিয়েছেন, সব ধর্মের অন্তর্নিহিত সত্য একই। তাঁর কাছে ধর্ম ছিল মানুষের আত্মার মুক্তির পথ, বিভেদের প্রাচীর নয়।
এই কারণেই নজরুল ছিলেন প্রকৃত অর্থে ধর্মনিরপেক্ষ মুক্ত-চেতনার কবি। তবে তাঁর ধর্মনিরপেক্ষতা পাশ্চাত্য ধাঁচের নিছক রাষ্ট্রনৈতিক ধারণা নয়; আরও গভীর মানবিক সহাবস্থানের দর্শন। তিনি বিশ্বাস করতেন, মানুষের হৃদয়ের চেয়ে বড়ো কোনো তীর্থ নেই। তাই তাঁর কাছে কাশী, কাবা, বৃন্দাবন, বুদ্ধগয়া—সব মিলেমিশেই অনুভূত হয় এক মানবসভ্যতার ঐক্যচিহ্ন।
নজরুলের এই চেতনা আজও বিস্ময়করভাবে প্রাসঙ্গিক। বর্তমান পৃথিবীতে ধর্মীয় মৌলবাদ, জাতিগত বিদ্বেষ, বর্ণবাদ ও সাম্প্রদায়িক রাজনীতি আবারও মানবসভ্যতাকে বিভক্ত করছে। মানুষ প্রযুক্তিতে উন্নত হয়েছে, কিন্তু হৃদয়ে অনেক ক্ষেত্রেই সংকীর্ণ হয়েছে। এই সময়ে নজরুলের কণ্ঠ আবার নতুন করে ধ্বনিত হয়—
“হিন্দু না ওরা মুসলিম ওই জিজ্ঞাসে কোন জন?
কাণ্ডারী! বল ডুবিছে মানুষ, সন্তান মোর মায়ের।”
এই উচ্চারণ মানবতার সর্বজনীন আর্তি। এখানে ধর্মীয় পরিচয়ের চেয়ে মানুষের জীবন বড়ো হয়ে ওঠে। এই বোধই নজরুলকে মানবিক-কবির মর্যাদায় উন্নীত করে।
সাহিত্যিক দিক থেকেও ‘সাম্যবাদী’ এক অনন্য সৃষ্টি। এর ভাষা তীব্র, উদ্দাম, গীতিময় এবং একই সঙ্গে দার্শনিক। নজরুল আরবি-ফারসি শব্দের সঙ্গে সংস্কৃত শব্দভাণ্ডারকে এমনভাবে মিশিয়েছেন যে বাংলা ভাষা এক নতুন শক্তি ও ব্যাপ্তি লাভ করেছে। তাঁর কাব্যভাষা যেমন বিদ্রোহের, তেমনি ভালোবাসারও। তাঁর অলংকার, চিত্রকল্প ও ছন্দের ভেতর দিয়ে মানবমুক্তির এক প্রবল আবেগ সৃষ্টি হয়।
নজরুলের মানবতাবাদ যেহেতু বৌদ্ধিক তত্ত্ব ছিল না; তাই তা হয়ে যায় তাঁর জীবনেরও অংশ। তিনি ব্যক্তিগত জীবনেও সাম্প্রদায়িক সংকীর্ণতাকে অস্বীকার করেছিলেন। তাঁর পরিবার, বন্ধুত্ব, সাহিত্যচর্চা—সবকিছুতেই ছিল এক অসাম্প্রদায়িক চেতনা। তিনি কেবল কবিতায় নয়, জীবনেও সাম্যের সাধক ছিলেন।
সবচেয়ে বিশেষ কথা, নজরুল মানুষকে নিষ্ক্রিয় সহনশীলতার শিক্ষা দেননি; তিনি মানুষকে আত্মমর্যাদার শিক্ষা দিয়েছেন। তাঁর সাম্যবাদ দুর্বল আপসের সাম্যবাদ নয়; সংগ্রামী সাম্যবাদ। এখানে মানুষ মাথা নত করে বাঁচবে না; সে তার মর্যাদা নিয়ে বাঁচবে। তাঁর কবিতায় সাম্য মানে কেবল সমতা নয়, মুক্তিও। এই দিক থেকে ‘সাম্যবাদী’ কবিতা কেবল বাংলা সাহিত্যের সম্পদ নয়; মানবসভ্যতারও এক মূল্যবান অক্ষর-সম্পদ। যা আমাদের বলে যায়—মানুষের চেয়ে বড়ো কোনো ধর্ম নেই, ভালোবাসার চেয়ে বড়ো কোনো সত্য নেই, মানবতার চেয়ে বড়ো কোনো পরিচয় নেই।
নজরুলের কাব্যচেতনার গভীরে ছিল মানুষের প্রতি এক অসীম আস্থা। তিনি বিশ্বাস করতেন, সমস্ত বিভেদের পরেও মানুষ একদিন তার প্রকৃত পরিচয় খুঁজে পাবে। সেই পরিচয় ধর্মের নয়, জাতির নয়, বর্ণের নয়—মানবতার। তাই তাঁর কণ্ঠে শেষ পর্যন্ত ধ্বনিত হয় সাম্যের মহাগান—এক এমন পৃথিবীর স্বপ্ন, যেখানে মানুষ মানুষকে ঘৃণা করবে না; যেখানে ভণ্ডামির মিনার ভেঙে পড়বে; যেখানে রাজমুকুট লুটিয়ে পড়বে মানবমর্যাদার সামনে; যেখানে হৃদয়ই হবে বিশ্ব-দেউল।
এই কারণেই কাজী নজরুল ইসলামের ‘সাম্যবাদী’ কেবল এক কবিতা নয়; মানবমুক্তির শাশ্বত ঘোষণাপত্র। তাঁর কণ্ঠ আজও আমাদের শেখায়—সভ্যতার চূড়ান্ত সত্য কোনো ধর্মীয় পরিচয়ে নয়, কোনো জাতিগত অহংকারে নয়, বরং মানুষের ভেতরের সেই অনন্ত আলোয়, ‘যেখানে এসে এক হয়ে যায় সব বাধা-ব্যবধান’।
[‘সাম্যবাদী’ কাজী নজরুল ইসলামের রচিত একটি কাব্যগ্রন্থ। বইটি ১৯২৫ সালের ডিসেম্বরে (পৌষ,১৩৩২) প্রকাশিত হয়। কাব্যগ্রন্থের কবিতাগুলোয় বেশিরভাগই মানবিক বিষয়গুলো তুলে ধরা হয়েছে। ‘
‘সাম্যবাদী’ কবিতাটি এই কাব্যেরই নাম-কবিতা।]
শব্দার্থ ও টীকাভাষ্য:
সাম্যবাদী
কাজী নজরুল ইসলাম
উৎস : ‘সাম্যবাদী’ কাব্য, ১৯২৫ খ্রিস্টাব্দ
টীকা ভাষ্য—
সাম্য : সমদর্শিতা, সমতা অথবা সমান অধিকার।
সাম্যবাদ : জাতি, ধর্ম, বর্ণ, শ্রেণি ইত্যাদি নির্বিশেষে দেশের বা বিশ্বের সমস্ত মানুষের সম অধিকারের দর্শন।
পার্সি : পারস্যের অধিবাসী (বর্তমান ইরানের)। জেন্দ-আবেস্তা প্রতিষ্ঠিত ধর্মমতের অবলম্বনকারী গোষ্ঠী বা সম্প্রদায়।
ইহুদি : হিব্রু জাতির অধিবাসী।
সাঁওতাল, ভিল : ভারতবর্ষের অস্ট্রিক ভাষাগোষ্ঠীর অন্তর্গত আদিম জনজাতির মানুষ। ভারতের প্রাচীন অধিবাসী।
গারো : উত্তর-পূর্ব ভারতের গারো পার্বত্য অঞ্চলের পরিশ্রমী ও কৃষিকাজনির্ভর সম্প্রদায়।
কনফুসিয়াস : চৈনিক বা চিনা সভ্যতার একজন মহান দার্শনিক।
চার্বাক : ভারতবর্ষের একজন প্রাচীন বস্তুবাদী দার্শনিক ও ঋষি। তিনি সাম্যবাদী দর্শনের প্রতিনিধি ছিলেন। তিনি মর্ত্য জীবনের বাইরে বেদ, স্বর্গ, নরক ইত্যাদি অগ্রাহ্য করেন।
জেন্দাবেস্তা : পারস্যের (বর্তমান ইরানের) প্রাচীন অগ্নি-উপাসকদের ধর্মগ্রন্থ ‘জেন্দাবেস্তা’। এই গ্রন্থের ভাষা হল জেন্দ।
কোরান : ইসলামপন্থীদের বা মুসলমানদের পবিত্র ধর্মগ্রন্থ।
পুরাণ : পুরাণ ভারতীয় কবি-দার্শনিকদের দ্বারা সৃষ্ট সৃষ্টিতত্ত্বের আখ্যানমূলক ব্যাখ্যা। ভারতে অষ্টাদশ পুরাণ ও ৩৬টি উপপুরাণ রচিত হয়েছে।
বেদ : প্রাচীন ভারতীয় সভ্যতার দার্শনিক চেতনাসম্পন্ন প্রাচীন গ্রন্থ। মানবসভ্যতার ইতিহাসেও এই গ্রন্থ প্রাচীন রূপেই বিবেচ্য।
বেদান্ত : চারটি বেদের শেষ অংশগুলি বেদান্ত হিসেবে চিহ্নিত। এগুলি মিলেই বেদের দার্শনিক মীমাংসা হিসেবে উপনিষদে স্বীকৃত।
ত্রিপিটক : গৌতম বুদ্ধের ভাবাদর্শপুষ্ট বৌদ্ধদের ধর্ম-দর্শনের গ্রন্থ হল ত্রিপিটক। এই গ্রন্থ অধিকাংশই পালি ভাষায় রচিত।
বাইবেল : খ্রিস্টের ভাবদর্শন অনুযায়ী ক্যাথলিক খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বীদের ধর্মপালনের জন্য যে ধর্মগ্রন্থ রচিত হয়েছে, তাই বাইবেল। বাইবেলের দুটি ভাগ— ১) ওল্ড টেস্টামেন্ট
২) নিউ টেস্টামেন্ট
জেরুজালেম :
ফিলিস্তিনে অবস্থিত এই স্থানটি মুসলমান, ইহুদি ও খ্রিস্টানদের কাছে সমভাবে মহাপবিত্র স্থান।
যুগাবতার :
যুগের অবতার; জাতি, গোষ্ঠী বা দেশের মহান প্রাণসত্তা।
দেউল : মন্দির অথবা দেবালয়।
অমৃত-হিয়া : অমৃত হৃদয়।
নীলাচল : জগন্নাথ ক্ষেত্র বা নীলবর্ণযুক্ত পাহাড়। যে বিশাল পাহাড়ের পরিসীমা নির্ধারণ করা যায় না বলে মনে হয়।
“বাঁশির কিশোর গাহিলেন মহাগীতা” : ‘বাঁশির কিশোর’ বলতে মহাভারতের তথা চিরকালীন ভারতের নায়ক বা অবতার শ্রীকৃষ্ণকে বোঝানো হয়েছে। কুরুক্ষেত্রের প্রান্তরে যুদ্ধবিমুখ অর্জুনকে মানবিক অস্তিত্ব সম্পর্কে যে বাণী প্রদান করেছিলেন, তাই ‘শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা’।
শাক্যমুনি : শাক্য বংশে জন্ম নেওয়া সিদ্ধার্থ, যিনি উত্তরকালে গৌতম বুদ্ধ রূপে পরিচিত।
কন্দরে : গুহায় বা গিরিগুহায়। এখানে হৃদয়ের গোপন অন্তঃপুরকে বোঝানো হয়েছে।
আরব-দুলাল : আরবের সন্তান। এখানে ইসলামের সামাজিক প্রতিষ্ঠাতা হজরত মহম্মদের কথা বলা হয়েছে, যাঁকে সর্বশেষ নবী বলে মান্যতা দেওয়া হয়।
ঈসা-মুসা : মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপে প্রচলিত ধর্মভাবনাগুলির আদিম প্রতিনিধি হিসেবে এঁরা স্বীকৃত।
কবিতার ছন্দবিশ্লেষণ:
মাত্রাবৃত্ত ছন্দ : ৬+২ / ৬+৬+২ / ৬+৬+৬+২ / ৬+২ / ৬+৬+৬+২ / ৬+২
মূলভাব:
মানবতাবাদী কবি এই কবিতায় সাম্যবাদের জয়গান করেছেন। এখানে ধর্ম-বর্ণ-জাত নির্বিশেষে মানুষকে মনুষ্যত্বের মহিমায় উন্নীত করতে চেয়েছেন। মানুষের মধ্যেই তিনি সর্বধর্মের সার খুঁজে পেয়েছেন। মানুষই সৃষ্টি করেছে ধর্মগ্রন্থ; ধর্মগ্রন্থ মানুষকে জন্ম দেয়নি। যুগে যুগে যাঁরা যুগাবতার রূপে এসেছেন, তাঁরা বিশ্বদেবালয়ে মানুষের অমৃত হৃদয়কেই প্রতিষ্ঠা দিতে চেয়েছেন। পৃথিবীর সকল ধর্ম ও ধর্মগ্রন্থ মিলিয়ে যা পাওয়া যায়, তা হল মানুষ এবং একমাত্র মানুষ। সেই মানুষের কোনো ভেদাভেদ, কোনো বৈষম্য কোনোদিন থাকতে পারে না। সাম্যবাদই তাই প্রকৃত মানবধর্ম। সাম্যবাদ পৃথিবীর একমাত্র জীবন্ত পরিপূর্ণতার বাণী।
বহু-বিকল্পভিত্তিক প্রশ্নোত্তর—
১. “যেখানে আসিয়া এক হয়ে গেছে সব বাধা-ব্যবধান,”- “যেখানে” বলতে কি বোঝানো হয়েছে?
ক) সাম্যের ভাবনায়
খ) স্বাধীনতার ভাবনায়
গ) বন্ধুত্বের ভাবনায়
ঘ) সহানুভূতির ভাবনায়
উত্তর- (ক) সাম্যের ভাবনায়
২. ‘পার্সি’ বলতে বোঝানো হয়েছে—
ক) আফগানিস্তানের বাসিন্দাদের
খ) ইরানের বাসিন্দাদের
গ) পাকিস্তানের বাসিন্দাদের
ঘ) ইন্দোনেশিয়ার বাসিন্দাদের
উত্তর- (খ) ইরানের বাসিন্দাদের
৩. কাকে জৈনধর্মের প্রবর্তক বলে মনে করা হয়?
ক) জরাথুস্ট
খ) গুরুগোবিন্দ সিং
গ) মহাবীর
ঘ) গৌতম বুদ্ধ
উত্তর- (গ) মহাবীর
৪. কনফুসিয়াস কোন্ দেশের চিন্তাবিদ?
ক) তিব্বত
খ) ভারত
গ) চিন
ঘ) ইরান
উত্তর- (গ) চিন
৫. চার্বাক-চেলারা কার শিষ্য ছিলেন?
ক) বৃহস্পতির
খ) জমদগ্নির
গ) দুর্বাসার
ঘ) কপিল মুনির
উত্তর- (ক) বৃহস্পতির
৬. ‘চার্বাক-চেলা’ বলতে কাদের বোঝানো হয়েছে?
ক) চার্বাকের সন্তানদের
খ) চার্বাক দর্শনের অনুগামীদের
গ) চার্বাকের সতীর্থদের
ঘ) চার্বাকের স্বজনদের
উত্তর- (খ) চার্বাক দর্শনের অনুগামীদের
৭. ‘গ্রন্থসাহেব’ কাদের পবিত্র ধর্মগ্রন্থ?
ক) শিখদের
খ) বৌদ্ধদের
গ) জৈনদের
ঘ) সাঁওতালদের
উত্তর- (ক) শিখদের
৮. ‘গ্রন্থসাহেব’ গ্রন্থটি কোন্ লিপিতে লেখা হয়েছে?
ক) ব্রাহ্মীলিপি
খ) খরোষ্ঠী লিপি
গ) প্রাচীন নেপালি লিপি
ঘ) গুরুমুখী লিপি
উত্তর- (ঘ) গুরুমুখী লিপি
৯. ‘পড়ে যাও যত শখ,’- কবি কী পড়ে যাওয়ার কথা বলেছেন?
ক) জাতীয় মহাকাব্য
খ) গীতিকবিতা
গ) উপন্যাস
ঘ) বিভিন্ন ধর্মগ্রন্থ
উত্তর- (ঘ) বিভিন্ন ধর্মগ্রন্থ
১০. মুসলিম ধর্ম সম্প্রদায়ের পবিত্র গ্রন্থ কোন্টি?
ক) কোরান
খ) গ্রন্থসাহেব
গ) ত্রিপিটক
ঘ) উপনিষদ
উত্তর- (ক) কোরান
১১. কোরান কোন্ ভাষায় লিখিত?
ক) ফারসি
খ) হিব্রু
গ) উর্দু
ঘ) আরবি
উত্তর- (ঘ) আরবি
১২. কনফুসিয়াস চিনের কোন্ শহরে জন্মগ্রহণ করেন?
ক) সাংহাই শহরে
খ) ছুফু শহরে
গ) নানচিং শহরে
ঘ) শেনজেন শহরে
উত্তর- (খ) ছুফু শহরে
১৩. কবিতায় উল্লিখিত একটি আদিবাসী জনগোষ্ঠী হল—
ক) পারসি
খ) জৈন
গ) সাঁওতাল
ঘ) ইহুদি
উত্তর- (গ) সাঁওতাল
১৪. মহাপুরাণের সংখ্যা ক-টি?
ক) ১৮টি
খ) ১৯টি
গ) ১৩টি
ঘ) ১৫টি
উত্তর- (ক) ১৮টি
১৫. ‘মগজে হানিছ’—
ক) পাথর
খ) লাঠি
গ) কুঠার
ঘ) শূল
উত্তর- (ঘ) শূল
১৬. বৃথা দরকষাকষি কোথায় চলছে?
ক) দোকানে
খ) বাজারে
গ) বাড়িতে
ঘ) ধর্মীয় স্থানে
উত্তর- (ক) দোকানে
১৭. ‘তাজা ফুল’ কোথায় ফুটেছে?
ক) বাগানে
খ) পথে
গ) মাঠে
ঘ) টবে
উত্তর- (খ) পথে
১৮. ‘ত্রিপিটক’ গ্রন্থটি কোন্ ভাষায় লিখিত?
ক) সংস্কৃত
খ) পালি
গ) হিন্দি
ঘ) বাংলা
উত্তর- (খ) পালি
১৯. পেটে-পিঠে-কাঁধে-মগজে কী বওয়ার কথা বলা হয়েছে?
ক) ইট-পাথর
খ) পুথি ও কেতাব
গ) আসবাবপত্র
ঘ) রাজমুকুট
উত্তর- (খ) পুথি ও কেতাব
২০. সকল কেতাব ও সব কালের জ্ঞান কোথায় আছে?
ক) মানবহৃদয়ে
খ) ধর্মপুস্তকে
গ) দেবালয়ে
ঘ) মহামানবের কাছে
উত্তর- (ক) মানবহৃদয়ে
২১. ‘খুলে দেখ নিজ প্রাণ!’- এখানে কী খুঁজে পাওয়া যাবে?
ক) স্বাধীনতা
খ) সাম্য
গ) অহিংসা
ঘ) সকল শাস্ত্রের নির্যাসজাত বাণী
উত্তর- (ঘ) সকল শাস্ত্রের নির্যাসজাত বাণী
২২. ‘সাম্যবাদী’ কবিতায় দেবতা-ঠাকুরকে কোথায় খুঁজে ফেরা হয় বলে জানানো হয়েছে?
ক) দেবালয়ে
খ) লোকসমাজে
গ) ধর্মীয় স্থানে
ঘ) মৃত পুথির কঙ্কালে
উত্তর- (ঘ) মৃত পুথির কঙ্কালে
২৩. “বন্ধু, বলিনি ঝুট”— কোন্ কথাকে ঝুট নয় বলে বলা হয়েছে?
ক) অমৃত হৃদয়ে ঈশ্বর হাসছেন
খ) ধর্মপুস্তকে ঈশ্বরের অধিষ্ঠান
গ) জীর্ণ পুথিতে সর্বশক্তিমানকে খুঁজে পাওয়া যাবে
ঘ) মানবহৃদয় অপেক্ষা আচার-অনুষ্ঠানই শ্রেষ্ঠ
উত্তর- (ক) অমৃত হৃদয়ে ঈশ্বর হাসছেন
২৪. ‘এইখানে এসে লুটাইয়া পড়ে’— কী লুটিয়ে পড়ে?
ক) মানবহৃদয়
খ) আত্মসম্মান
গ) রাজমুকুট
ঘ) তাজা ফুল
উত্তর- (গ) রাজমুকুট
২৫. ‘এইখানে বসে ঈসা মুসা পেল’— ঈসা-মুসা কী পেয়েছেন?
ক) পুথির জ্ঞান
খ) রাজমুকুট
গ) সকল ধর্ম
ঘ) সত্যের পরিচয়
উত্তর- (ঘ) সত্যের পরিচয়
২৬. সকল শাস্ত্রের সারমর্ম কোথায় খুঁজে পাওয়া যাবে?
ক) নিজ প্রাণে
খ) ধর্মপুস্তকে
গ) দেবালয়ে
ঘ) জীবনচরিতে
উত্তর- (ক) নিজ প্রাণে
২৭. বৃন্দাবন কোন্ ধর্মাবলম্বী মানুষের তীর্থক্ষেত্র?
ক) বৈষ্ণবদের
খ) মুসলিমদের
গ) বৌদ্ধদের
ঘ) খ্রিস্টানদের
উত্তর- (ক) বৈষ্ণবদের
২৮. মথুরা কোন্ নদীর তীরে অবস্থিত তীর্থক্ষেত্র?
ক) গঙ্গা
খ) গোদাবরী
গ) নর্মদা
ঘ) যমুনা
উত্তর- (ঘ) যমুনা
২৯. বুদ্ধ-গয়া স্থানটি কেন প্রসিদ্ধ?
ক) বুদ্ধের জন্মস্থান হিসেবে
খ) বুদ্ধদেবের সিদ্ধিলাভের ক্ষেত্র হিসেবে
গ) এখানে বসে বুদ্ধদেব উপদেশ দিয়েছেন
ঘ) এখানে বুদ্ধদেবের মহানিষ্ক্রমণ ঘটে
উত্তর- (খ) বুদ্ধদেবের সিদ্ধিলাভের ক্ষেত্র হিসেবে
৩০. বর্তমানে মথুরা ও বৃন্দাবন কোন্ রাজ্যে অবস্থিত?
ক) মধ্যপ্রদেশ
খ) বিহার
গ) ওড়িশা
ঘ) উত্তরপ্রদেশ
উত্তর- (ঘ) উত্তরপ্রদেশ
৩১. প্রসিদ্ধ কাবা-ভবন কোথায় অবস্থিত?
ক) মক্কায়
খ) জেরুজালেমে
গ) ইন্দোনেশিয়ায়
ঘ) পাকিস্তানে
উত্তর- (ক) মক্কায়
৩২. ‘নীলাচল’ বলতে কোন্ স্থানকে বোঝানো হয়েছে?
ক) পুরি
খ) মাদ্রাজ
গ) মুম্বাই
ঘ) কলকাতা
উত্তর- (ক) পুরি
ব্যাখ্যা: নীলাদ্রি নামক পার্বত্যভূমির প্রান্তদেশে জগন্নাথক্ষেত্র পুরি অবস্থিত। তাই এর অপর নাম নীলাচল।
৩৩. কাশী কোন্ ধর্মসম্প্রদায়ভুক্ত মানুষের পবিত্র তীর্থক্ষেত্র?
ক) বৌদ্ধ
খ) জৈন
গ) শিখ
ঘ) হিন্দু
উত্তর- (ঘ) হিন্দু
৩৪. দেবতা-ঠাকুর অমৃত হৃদয়ের কোথায় বসে হাসছেন?
ক) নিভৃত অন্তরালে
খ) অসীম প্রকাশ্যে
গ) সম্মুখভাগে
ঘ) গোপন কোণে
উত্তর- (ক) নিভৃত অন্তরালে
৩৫. মুসা কোন্ ধর্মের প্রচারক ছিলেন?
ক) খ্রিস্টান
খ) ইহুদি
গ) বৌদ্ধ
ঘ) হিন্দু
উত্তর- (খ) ইহুদি
৩৬. “এইখানে এসে লুটাইয়া পড়ে সকল রাজমুকুট”— ‘রাজমুকুট’ বলতে বোঝানো হয়েছে—
ক) রাজার শিরোস্ত্রাণ
খ) রাজ-ঐশ্বর্য ও ক্ষমতা
গ) রাজার সম্মান
ঘ) রাজার রাজত্ব
উত্তর- (খ) রাজ-ঐশ্বর্য ও ক্ষমতা
৩৭. ঈসা কে?
ক) জিশুখ্রিস্ট
খ) বুদ্ধদেব
গ) মহাবীর
ঘ) হজরত মোহম্মদ
উত্তর- (ক) জিশুখ্রিস্ট
৩৮. ‘দেউল’ শব্দটি এসেছে—
ক) সংস্কৃত ‘দেবকুল’ থেকে
খ) ‘দেবতা’ থেকে
গ) ‘দেবদেবী’ থেকে
ঘ) ‘দেবত্ব’ থেকে
উত্তর- (ক) সংস্কৃত ‘দেবকুল’ থেকে
৩৯. ‘বাঁশির কিশোর’ কোথায় ‘মহা-গীতা’ গেয়েছিলেন?
ক) রণ-ভূমে
খ) ধর্মপুস্তকে
গ) ধর্মীয় অনুষ্ঠানে
ঘ) স্বাভাবিক আলাপচারিতায়
উত্তর- (ক) রণ-ভূমে
৪০. ‘বাঁশির কিশোর’ বলতে কাকে বোঝানো হয়েছে?
ক) হজরত মহম্মদকে
খ) গৌতম বুদ্ধকে
গ) শ্রীকৃষ্ণকে
ঘ) মুসাকে
উত্তর- (গ) শ্রীকৃষ্ণকে
৪১. ‘গীতা’-র অংশটি মহাভারতের কোন্ পর্বের অন্তর্গত?
ক) অশ্বমেধ পর্ব
খ) আদিপর্ব
গ) বিরাটপর্ব
ঘ) ভীষ্মপর্ব
উত্তর- (ঘ) ভীষ্মপর্ব
৪২. ‘গীতা’-র অপর নাম কী?
ক) অষ্টশতী
খ) সপ্তশতী
গ) ষষ্ঠশতী
ঘ) দশশতী
উত্তর- (খ) সপ্তশতী
ব্যাখ্যা: গীতা সাতশত শ্লোকের সংকলন গ্রন্থ। তাই একে ‘সপ্তশতী’ বলা হয়।
৪৩. ‘গীতা’ প্রকৃতপক্ষে—
ক) অর্জুনের প্রতি শ্রীকৃষ্ণের উপদেশ
খ) শ্রীকৃষ্ণের প্রতি অর্জুনের উপদেশ
গ) বিশ্ববাসীর প্রতি কৃষ্ণার্জুনের উপদেশ
ঘ) বিশ্ববাসীর প্রতি ভগবানের উপদেশ
উত্তর- (ক) অর্জুনের প্রতি শ্রীকৃষ্ণের উপদেশ
৪৪. রণভূমিতে দাঁড়িয়ে বাঁশির কিশোর কী গেয়েছিলেন?
ক) গান
খ) স্তোত্র
গ) মন্ত্র
ঘ) মহা-গীতা
উত্তর- (ঘ) মহা-গীতা
৪৫. কারা খোদার মিতা হয়ে উঠেছিলেন?
ক) শিষ্যরা
খ) নবিরা
গ) অনুগামীরা
ঘ) ভক্তেরা
উত্তর- (খ) নবিরা
৪৬. ‘শাক্যমুনি’ বলতে কাকে বোঝানো হয়েছে?
ক) গৌতম বুদ্ধকে
খ) মুসাকে
গ) ঈসাকে
ঘ) জিশুকে
উত্তর- (ক) গৌতম বুদ্ধকে
ব্যাখ্যা: শাক্য বংশে জন্ম বলে গৌতম বুদ্ধের অপর নাম শাক্যমুনি।
৪৭. শাক্যমুনি মানবের মহাবেদনার ডাক শুনেছিলেন—
ক) অরণ্যমাঝে
খ) পর্বতমাঝে
গ) হৃদয়ের ধ্যান-গুহা মাঝে
ঘ) নদীতটে বসে
উত্তর- (গ) হৃদয়ের ধ্যান-গুহা মাঝে
৪৮. শাক্যমুনি রাজ্য ত্যাগ করেছিলেন কেন?
ক) ভ্রমণের নেশায়
খ) মানবের মহাবেদনার ডাক শুনে
গ) গৃহযুদ্ধের কারণে
ঘ) অন্যান্য নানাবিধ কারণে
উত্তর- (খ) মানবের মহাবেদনার ডাক শুনে
৪৯. ‘মিতা’ শব্দের অর্থ হল—
ক) পিতা
খ) সঙ্গীসাথি
গ) ভাই
ঘ) স্বজন
উত্তর- (খ) সঙ্গীসাথি
৫০. ‘গীতা’ কয়টি অধ্যায়ে বিভক্ত?
ক) ১৫টি
খ) ১৮টি
গ) ১৬টি
ঘ) ১৯টি
উত্তর- (খ) ১৮টি
৫১. শাক্যমুনি মহামানবের ডাক শুনে কী ত্যাগ করেছিলেন?
ক) নিজ সম্মান
খ) রাজ্য
গ) নিজ গৌরব
ঘ) নিজ বিশ্বাস
উত্তর- (খ) রাজ্য
৫২. ‘আরব-দুলাল’ কে?
ক) হজরত মহম্মদ
খ) মুসা
গ) ঈসা
ঘ) গৌতম বুদ্ধ
উত্তর- (ক) হজরত মহম্মদ
৫৩. হৃদয় কন্দরে বসে ‘আরব-দুলাল’ কী গেয়েছিলেন?
ক) কোরানের সামগান
খ) মানবতার বাণী
গ) ঈশ্বরের গৌরবগাথা
ঘ) স্বাধীনতার গান
উত্তর- (ক) কোরানের সামগান
৫৪. ‘সাম্যবাদী’ কবিতায় ‘ধ্যান-গুহা’ বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
ক) পর্বতের গুহা
খ) মাটির গুহা
গ) হৃদয়ের শুদ্ধতম প্রদেশ
ঘ) ধ্যানের নিমিত্ত নির্মিত গুহা
উত্তর- (গ) হৃদয়ের শুদ্ধতম প্রদেশ
৫৫. ‘কন্দর’ শব্দের অর্থ কী?
ক) অরণ্য
খ) হৃদয়
গ) গুহা
ঘ) নদী
উত্তর- (গ) গুহা
৫৬. হৃদয়াসনে বসে ‘আরব-দুলাল’ কী শুনেছিলেন?
ক) বেদনা
খ) আহ্বান
গ) ইশারা
ঘ) আর্তনাদ
উত্তর- (খ) আহ্বান
৫৭. “মিথ্যা শুনিনি ভাই”— কী মিথ্যা নয়?
ক) হৃদয়ের চেয়ে ধর্মীয় স্থান বড়ো
খ) হৃদয়ের চেয়ে ধর্মপুস্তকের স্থান উচ্চে
গ) মানবহৃদয়ই সর্বশ্রেষ্ঠ
ঘ) মানবহৃদয়ই সর্বনিম্নে
উত্তর- (গ) মানবহৃদয়ই সর্বশ্রেষ্ঠ
ব্যাখ্যা: হৃদয় গৌরবে মানুষই শ্রেষ্ঠ। হজরত মহম্মদ থেকে গৌতম বুদ্ধ পর্যন্ত সবাই এই হৃদয়াসনে বসেই মানুষের যন্ত্রণা দূর করতে উদ্যোগী হয়েছেন। তাই কবি হৃদয়কেই সর্বোচ্চ আসনে বসিয়েছেন।
৫৮. ‘সাম্যের গান’ বলতে কবি কী বুঝিয়েছেন?
ক) স্বাধীনতার গীতিকবিতা
খ) সামাজিক, আর্থিক, ধর্মীয় সমতার বাণী
গ) সৌভ্রাতৃত্বের গান
ঘ) মৈত্রীর গান
উত্তর- (খ) সামাজিক, আর্থিক, ধর্মীয় সমতার বাণী
৫৯. চার্বাক দর্শন একটি—
ক) আধ্যাত্মিকতা বিরোধী বস্তুবাদী দর্শন
খ) আধ্যাত্মিক দর্শন
গ) নিয়তিবাদী দর্শন
ঘ) অনুভূতিশীল দর্শন
উত্তর- (ক) আধ্যাত্মিকতা বিরোধী বস্তুবাদী দর্শন
৬০. ‘কেতাব’ শব্দটি এসেছে—
ক) ‘কাতার’ থেকে
খ) ‘কিতাব’ থেকে
গ) ‘ক্যাতাব’ থেকে
ঘ) ‘কাইতাব’ থেকে
উত্তর- (খ) ‘কিতাব’ থেকে
৬১. কবি কাকে ‘বিশ্ব-দেউলের’ মর্যাদা দিয়েছেন?
ক) ধর্মগ্রন্থকে
খ) উপাসনার গৃহকে
গ) মানবহৃদয়কে
ঘ) ধর্মীয় স্থানকে
উত্তর- (গ) মানবহৃদয়কে
৬২. কোন্ রণভূমির কথা ‘সাম্যবাদী’ কবিতায় বলা হয়েছে?
ক) পলাশির যুদ্ধের রণভূমি
খ) সিপাহি বিদ্রোহের রণভূমি
গ) কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের রণভূমি
ঘ) পানিপথের যুদ্ধের রণভূমি
উত্তর- (গ) কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের রণভূমি
৬৩. ‘মেষের রাখাল’ বলতে কাকে বোঝানো হয়েছে?
ক) সাধারণ মেষপালককে
খ) হজরত মহম্মদকে
গ) ধর্মগ্রন্থের রচয়িতাকে
ঘ) শ্রীকৃষ্ণকে
উত্তর- (খ) হজরত মহম্মদকে
৬৪. ‘মহা-বেদনার ডাক শুনি’— কাদের ডাক শুনেছিলেন?
ক) অসহায় সাধারণ মানুষের
খ) যুগাবতারের
গ) মহামানবের
ঘ) ধর্মান্ধ মানুষের
উত্তর- (ক) অসহায় সাধারণ মানুষের