রবীন্দ্রনাথের মানবধর্ম, ভারতীয় নবজাগরণ এবং সভ্যতার আত্মসংকট

ড. অনিশ রায়

মানুষ যখন প্রথম আকাশের দিকে তাকিয়েছিল, তখন সে কেবল নক্ষত্র দেখেনি— সে নিজের নিঃসঙ্গতাও দেখেছিল। অনন্ত মহাবিশ্বের মধ্যে দাঁড়িয়ে মানুষ অনুভব করেছিল, তার অস্তিত্ব ক্ষণস্থায়ী, তার জীবন ভঙ্গুর, তার জ্ঞান সীমিত। সম্ভবত সেই ভয় থেকেই জন্ম নিয়েছিল ধর্ম, পুরাণ, ঈশ্বর ও মুক্তির কল্পনা। কিন্তু সভ্যতার ইতিহাসের এক নির্মম সত্য এই যে, মানুষ যে ধর্ম সৃষ্টি করেছিল আত্মার মুক্তির জন্য, সেই ধর্মই বহু সময় মানুষের শৃঙ্খল হয়ে উঠেছে। যে বিশ্বাস মানুষের অন্তরে করুণা জাগানোর কথা ছিল, সেই বিশ্বাসই কখনও কখনও রক্তপাতের উন্মত্ততায় পরিণত হয়েছে। যে ঈশ্বর মানুষের অহংকার ভাঙার কথা ছিল, তাঁর নামেই মানুষ নির্মাণ করেছে শ্রেণি, বর্ণ, জাতি ও সাম্প্রদায়িকতার দুর্গ।

ভারতবর্ষের ইতিহাস এই দ্বন্দ্বের ইতিহাস। এখানে উপনিষদের “ঈশাবাস্যমিদং সর্বং”-এর সঙ্গে সহাবস্থান করেছে মনুস্মৃতির নির্মম জাতিভেদ; এখানে বৌদ্ধ করুণার পাশে দাঁড়িয়েছে অস্পৃশ্যতার নিষ্ঠুরতা; এখানে ভক্তিবাদের প্রেমসংগীতের পাশাপাশি উচ্চারিত হয়েছে ধর্মীয় বিদ্বেষের মন্ত্র। ভারতীয় সভ্যতা যেন এক অবিরাম অন্তর্দ্বন্দ্ব— মুক্তি ও বন্ধন, উদারতা ও সংকীর্ণতা, মানবতা ও ধর্মতন্ত্রের মধ্যে।

এই দীর্ঘ সাংস্কৃতিক সংঘর্ষের এক গভীরতম শিল্পী ও দার্শনিক হলেন রবীন্দ্রনাথ। তাঁকে তো কেবল কবি বলা যায় না; তিনি ছিলেন ভারতীয় চেতনার অন্তর্লীন সংকটের সর্বাধিক সূক্ষ্ম ও প্রসারিত ব্যাখ্যাতা। রবীন্দ্রনাথ ছিলেন গভীরভাবে জীবনমুখী। আর যদি কবিই হন, তাহলে তিনি কেবল মানবিকতা বা প্রকৃতির কবিও নন; তিনি মানুষের কান্নারও কবি। তিনি কেবল প্রেমের শিল্পী নন; তিনি সভ্যতার সমালোচক-সাধক। তিনি কেবল সৌন্দর্যের স্রষ্টা নন; তিনি অন্ধতার বিরুদ্ধে এক নিরন্তর প্রতিবাদী চেতনা। তাঁর সাহিত্য, দর্শন, শিক্ষা-ভাবনা ও সমাজচিন্তার ভিতর দিয়ে আমরা একদিকে যেমন দেখি উপনিষদীয় বিশ্ববোধের সৌন্দর্য, তেমনি দেখি ধর্মীয় অন্ধতার বিরুদ্ধে এক নিরন্তর বৌদ্ধিক বিদ্রোহ।

তাঁর মানবতাবাদও কোনো অলস ভাববিলাস নয়। তা জন্ম নিয়েছিল মানুষের বাস্তব জীবন থেকে— অপমানিত মানুষের মুখ থেকে, নিপীড়িত মানুষের দীর্ঘশ্বাস থেকে, ধর্মের নামে বিভক্ত সমাজের ক্ষতচিহ্ন থেকে, এবং স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষায় উদ্বেল এক দেশের অন্তর্দ্বন্দ্ব থেকে। তিনি বুঝেছিলেন, কেবল রাজনৈতিক স্বাধীনতা কোনো জাতিকে মুক্ত করতে পারে না, যদি তার মন স্বাধীন না হয়।

রবীন্দ্রনাথকে বোঝার সবচেয়ে বড়ো সমস্যা এই যে, তাঁকে আমরা প্রায়শই সাংস্কৃতিক-অলংকারে রূপান্তরিত করি। তাঁর গান আমাদের উৎসবের অংশ, তাঁর কবিতা আমাদের আবেগের ভাষা, তাঁর প্রতিকৃতি আমাদের সাংস্কৃতিক গৌরব— কিন্তু তাঁর চিন্তার বিপ্লবাত্মক তাৎপর্যকে আমরা এড়িয়ে যাই। তাঁকে এমন এক অতীন্দ্রিয় মহিমার আসনে বসানো হয়, যেখানে তিনি আর রক্তমাংসের মানুষ নন, ইতিহাসের ভিতরে সংগ্রামরত এক বেদনাময় আত্মা নন। অথচ তাঁর সমগ্র জীবন ছিল গভীর আত্মসংঘর্ষের ইতিহাস।

রবীন্দ্রনাথের মধ্যে একই সঙ্গে সহাবস্থান করেছিল দুটি প্রবল ধারা— একদিকে উপনিষদীয় আধ্যাত্মবাদ, অন্যদিকে আধুনিক মানবতাবাদ। এই দ্বৈততার কারণেই তাঁর চিন্তা এত জটিল, এত গভীর, এত কালোত্তর, এত বহুমাত্রিক। তিনি একদিকে বিশ্বাস করতেন মানুষের ভিতরে এক চিরন্তন আত্মিক সত্তা আছে; অন্যদিকে তিনি উপলব্ধি করেছিলেন, মানুষকে ধর্মীয় অনুশাসনের মধ্যে বন্দি করলে তার স্বাধীন চেতনা ধ্বংস হয়ে যায়। তিনি ঈশ্বরে আস্থা রেখেছিলেন, কিন্তু ধর্মতন্ত্রকে ভয় করেছিলেন। তিনি ভারতীয় ঐতিহ্যকে ভালোবেসেছিলেন, কিন্তু সেই ঐতিহ্যের অন্ধকার দিকগুলিকে নির্মমভাবে সমালোচনা করেছিলেন। এই দ্বৈততার মধ্যেই রবীন্দ্রনাথের প্রকৃত মহত্ত্ব।

ভারতীয় নবজাগরণের প্রেক্ষাপট ছাড়া তাঁকে বোঝা অসম্ভব। উনিশ শতকের ভারতবর্ষ ছিল এক অদ্ভুত সন্ধিক্ষণ। একদিকে ঔপনিবেশিক আধিপত্য, অন্যদিকে মধ্যযুগীয় কুসংস্কারে আচ্ছন্ন সমাজ। পশ্চিমের যুক্তিবাদ, বিজ্ঞানচেতনা ও ব্যক্তিস্বাধীনতার ধারণা যখন ভারতীয় সমাজে প্রবেশ করল, তখন তা কেবল রাজনৈতিক পরিবর্তন আনেনি; মানুষের আত্মপরিচয়কেও নাড়িয়ে দিয়েছিল।

এই নবজাগরণের ভিতরে দুটি প্রধান ধারা ছিল। একটি ধারা যুক্তিবাদী, সংশয়বাদী, মানবকেন্দ্রিক— যার প্রতিনিধিত্ব করেছিলেন রাজা রামমোহন ও বিদ্যাসাগর। অন্য ধারা ভারতীয় আধ্যাত্মিক ঐতিহ্যের সঙ্গে আধুনিক মানবতাবাদকে মিলিয়ে দেখতে চেয়েছিল— যার সর্বশ্রেষ্ঠ প্রতিনিধি রবীন্দ্রনাথ। এই কারণেই রবীন্দ্রনাথ কখনও সম্পূর্ণ ধর্মবিরোধী হননি। কিন্তু তিনি ধর্মকে মানুষের উপর প্রতিষ্ঠিত করতে চাননি। তাঁর কাছে মানুষই ছিল চূড়ান্ত সত্য। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন, ধর্ম যদি মানুষকে বিভক্ত করে, তবে তা আর ধর্ম থাকে না— তা ক্ষমতার ভাষায় পরিণত হয়।

এই উপলব্ধি তাঁর সাহিত্যের গভীরে প্রবাহিত। গোরা উপন্যাসটি আসলে ভারতীয় জাতীয়তাবাদের আত্মসংকটের এক মহাকাব্যিক বিশ্লেষণ। গোরা প্রথমে মনে করেছিল, ভারতবর্ষ মানেই হিন্দু সভ্যতা। কিন্তু শেষপর্যন্ত সে আবিষ্কার করে— তার নিজের পরিচয়ই অনিশ্চিত। সে হিন্দু নয়, ব্রাহ্ম নয়, ইংরেজও নয়— সে কেবল মানুষ। এই আবিষ্কার কেবল ব্যক্তিগত নয়; তা ভারতীয় জাতীয়তাবাদের সীমাবদ্ধতারও উন্মোচন। গোরার চূড়ান্ত উপলব্ধি— “আজ আমি ভারতবর্ষীয়”— আসলে ধর্মীয় পরিচয় অতিক্রম করে মানবিক পরিচয়ের দিকেই সেই উত্তরণ। এই উত্তরণ রবীন্দ্রনাথের নিজস্ব জীবনদর্শনেরও কেন্দ্রবিন্দু। কারণ তিনি বুঝেছিলেন, ভারতবর্ষের সবচেয়ে বড়ো সংকট রাজনৈতিক নয়; সাংস্কৃতিক। ইংরেজের বিরুদ্ধে সংগ্রাম মানুষকে সাময়িকভাবে একত্রিত করতে পারে, কিন্তু সমাজের ভিতরে যদি জাতপাত, ধর্মীয় বিদ্বেষ ও সাংস্কৃতিক বিচ্ছিন্নতা থেকে যায়, তবে স্বাধীনতাও অসম্পূর্ণ থেকে যাবে।

এই কারণেই তাঁর সঙ্গে গান্ধীজি-র মতভেদ এত তাৎপর্যপূর্ণ। গান্ধীজি ধর্মীয় প্রতীক ও আধ্যাত্মিক ভাষার মাধ্যমে জাতীয়তাবাদকে শক্তিশালী করতে চেয়েছিলেন। রবীন্দ্রনাথ সেখানে বিপদের আভাস দেখেছিলেন। গান্ধীজি রাজনৈতিক ঐক্যের ভিতর দিয়ে ভারতকে দেখতে চেয়েছিলেন; রবীন্দ্রনাথ খুঁজছিলেন সাংস্কৃতিক ও মানবিক ঐক্যের ভিত্তি। তিনি প্রশ্ন করেছিলেন— ইংরেজ চলে গেলে এই ঐক্য কোন ভিত্তির উপর দাঁড়াবে? মানুষ যদি অন্তরে অন্তরে বিভক্তই থাকে, তবে স্বাধীনতা কেবল বাহ্যিক পরিবর্তন ছাড়া আর কী? আজকের ভারতবর্ষে দাঁড়িয়ে এই প্রশ্ন আরও তীব্র হয়ে ওঠে। কারণ স্বাধীনতার এত দশক পরেও আমরা প্রকৃত অর্থে ‘একজাতি একপ্রাণ’ হতে পারিনি। ধর্মীয় পরিচয় এখনও রাজনৈতিক শক্তির প্রধান অস্ত্র। জাতপাত আজও সমাজের গভীরে বিষের মতো প্রবাহিত। মানুষের খাদ্যাভ্যাস পর্যন্ত রাজনৈতিক হয়ে উঠেছে। কারও নাম, পোশাক কিংবা উপাসনার ধরন তার নিরাপত্তা নির্ধারণ করছে। মানুষের খাদ্যাভ্যাস, পোশাক, ভাষা, প্রেম, ইতিহাস— সবকিছু ধর্মীয় পরিচয়ের দ্বারা নির্ধারিত হতে শুরু করেছে। নাগরিকের চেয়ে ‘বিশ্বাসী’ পরিচয় বড়ো হয়ে উঠছে। রবীন্দ্রনাথ এই বিপদ বহু আগেই বুঝেছিলেন। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন— ধর্ম যখন মানুষের আত্মিক মুক্তির পথ না-হয়ে ক্ষমতার হাতিয়ার হয়ে ওঠে, তখন তা সভ্যতার জন্য ভয়ংকর। তাই তিনি ধর্মকে কখনও ধর্মতন্ত্রের সঙ্গে মিলিয়ে দেখেননি। তাঁর কাছে ধর্ম ছিল মানুষের অন্তরের সত্য, মানুষের মধ্যে বিশ্বমানবের অনুভব। আর ধর্মতন্ত্র ছিল ভয়, নিষেধ, অন্ধ আনুগত্য এবং স্বাধীন চিন্তার শত্রু। আজ ধর্ম কেবল ব্যক্তিগত বিশ্বাস নয়; তা রাজনৈতিক শক্তি। ইতিহাসকে পুনর্লিখন করা হচ্ছে এমনভাবে, যেন ভারতবর্ষ কেবল এক ধর্মের সভ্যতা। তাই তিনি লিখেছিলেন— “ধর্ম মুক্তির মন্ত্র পড়ে, ধর্মতন্ত্র দাসত্বের।”

এই উচ্চারণ ভারতীয় সমাজব্যবস্থার বিরুদ্ধে এক গভীর দার্শনিক প্রতিবাদ। কারণ ভারতবর্ষে ধর্মের নামে মানুষকে শতাব্দীর পর শতাব্দী বিভক্ত করা হয়েছে। ব্রাহ্মণ্যতন্ত্র মানুষকে জন্মের ভিত্তিতে উচ্চ-নীচে ভাগ করেছে। শাস্ত্রের নামে অসংখ্য মানুষকে শিক্ষা, সম্মান ও সামাজিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে। রবীন্দ্রনাথ এই অন্যায়কে উপলব্ধি করেছিলেন। যদিও তাঁর জীবনের প্রথম পর্যায়ে তিনি সম্পূর্ণ মুক্ত ছিলেন না ঐতিহ্যের প্রভাব থেকে। ঠাকুরবাড়ির ব্রাহ্ম সংস্কৃতি, হিন্দু ঐতিহ্যের গৌরববোধ, সমাজের প্রচলিত সংস্কার— সবই তাঁর চেতনায় প্রভাব ফেলেছিল। কিন্তু তাঁর সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল আত্মসমালোচনার ক্ষমতা। তিনি নিজেকে সংশোধন করতে পেরেছিলেন। এই আত্মসমালোচনার কারণেই তাঁর চিন্তার বিবর্তন ঘটেছিল।

জমিদারি পরিদর্শনে গিয়ে তিনি প্রত্যক্ষ করেছিলেন মুসলমান প্রজাদের অপমান। দেখেছিলেন কীভাবে একই সমাজে পাশাপাশি বসেও মানুষ পরস্পরের থেকে বিচ্ছিন্ন। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন— রাজনৈতিক স্লোগানে ঐক্য গড়া যায়, কিন্তু হৃদয়ের ভিতরে বিভাজন থাকলে তা স্থায়ী হয় না। এই উপলব্ধিরই সাহিত্যিক প্রকাশ আমরা পাই উপন্যাসে। গোরা প্রথমে নিজেকে হিন্দু জাতীয়তাবাদের প্রতিনিধি বলে মনে করেছিল। কিন্তু শেষপর্যন্ত সে আবিষ্কার করে— মানুষ কোনও ধর্মীয় পরিচয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তার চূড়ান্ত উপলব্ধি ছিল, ভারতবর্ষ কোনও একক ধর্মের দেশ নয়; এই দেশ বহুস্বরের মিলনভূমি। গোরার সেই আকুল উচ্চারণ— “আমাকে আজ সেই দেবতার মন্ত্র দিন, যিনি হিন্দু মুসলমান খ্রিস্টান সকলেরই”— আসলে রবীন্দ্রনাথের নিজের ভারতচিন্তারই এক গভীরতম প্রকাশ। এই ভারতচেতনার ভিতরেই ছিল তাঁর বিশ্ববোধ। তিনি সংকীর্ণ জাতীয়তাবাদে বিশ্বাস করতেন না। তাঁর কাছে জাতীয়তা তখনই মূল্যবান, যখন তা মানবতার পরিপূরক হয়। যে জাতীয়তা মানুষকে ঘৃণা শেখায়, অন্য সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ তৈরি করে, তা তাঁর কাছে বিপজ্জনক।

রবীন্দ্রনাথ এই চিন্তার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিলেন। তিনি জানতেন, ভারতবর্ষ কোনও একক সত্তা নয়; বহু সংস্কৃতি, বহু ভাষা, বহু ধর্মের দীর্ঘ সহাবস্থানের ফল। তিনি দেখেছিলেন, ভারতীয় সংগীত, চিত্রকলা, স্থাপত্য, পোশাক, খাদ্য— সবকিছুর ভিতরে হিন্দু-মুসলমানের যুগ্ম সৃজনশীলতার ইতিহাস লুকিয়ে আছে। এই কারণেই তিনি মুসলমানকে ‘বহিরাগত’ হিসেবে দেখার প্রবণতাকে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। তাঁর কাছে মুসলমানও ভারতবর্ষেরই সন্তান। ভারতীয় সভ্যতার নির্মাণে তাদের অবদান অনস্বীকার্য। এই দৃষ্টিভঙ্গির ভিতরেই তাঁর বিশ্বমানবতাবাদ।

কিন্তু তাঁর মানবতাবাদ কোনও সরল আশাবাদ ছিল না। তিনি মানুষের অন্ধকারও দেখেছিলেন। তিনি জানতেন, মানুষ কেবল প্রেমের সত্তা নয়; তার ভিতরে ক্ষমতার লোভ, ভয়, হিংসা ও আধিপত্যের আকাঙ্ক্ষাও আছে। এই কারণেই তিনি ফ্যাসিবাদের উত্থানে আতঙ্কিত হয়েছিলেন। ফ্যাসিবাদ সম্পর্কে তাঁর উপলব্ধি গভীরভাবে দার্শনিক। তিনি বুঝেছিলেন, ফ্যাসিবাদ কেবল রাজনৈতিক শাসনব্যবস্থা নয়; তা মানুষের স্বাধীন চিন্তার বিরুদ্ধে এক সাংস্কৃতিক বিদ্রোহ। ফ্যাসিবাদ মানুষের বিচারবুদ্ধিকে আবেগে ডুবিয়ে দেয়; ইতিহাসকে মিথে পরিণত করে; ব্যক্তিকে ভিড়ের উন্মাদনায় বিলীন করে দেয়।

আজকের পৃথিবীতে দাঁড়িয়ে তাঁর এই বিশ্লেষণ ভয়ংকরভাবে প্রাসঙ্গিক। কারণ বর্তমান সময়ের সবচেয়ে বড়ো সংকট সম্ভবত তথ্যের অভাব নয়, চিন্তার অবসান। মানুষ ক্রমশ প্রশ্নহীন হয়ে উঠছে। মতাদর্শ তার কাছে যুক্তির চেয়ে বড়ো। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের দ্রুততা মানুষের ধৈর্য, বিশ্লেষণক্ষমতা ও আত্মসমালোচনার অভ্যাসকে ক্ষীণ করে দিচ্ছে। মানুষ জটিল সত্যের চেয়ে সরল ঘৃণাকে বেশি সহজে গ্রহণ করছে।

এই পরিস্থিতিতে রবীন্দ্রনাথের বিজ্ঞানচেতনা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। তিনি বিজ্ঞানের মধ্যে কেবল প্রযুক্তিগত অগ্রগতি দেখেননি; তিনি দেখেছিলেন মুক্তবুদ্ধির সম্ভাবনা। তাঁর কাছে বিজ্ঞান মানে ছিল প্রশ্ন করার সাহস। এই কারণেই তিনি বলেছিলেন— “বিজ্ঞানের সঙ্গে শাস্ত্রের বিরোধ যেখানে, সেখানে শাস্ত্র পরাভূত”। এই উক্তির ভিতরে কেবল যুক্তিবাদ নয়, গভীর নৈতিক সাহসও আছে। কারণ ভারতীয় সমাজে শাস্ত্রকে প্রশ্ন করা মানে ছিল ক্ষমতার কাঠামোকেই প্রশ্ন করা। তবু রবীন্দ্রনাথ তা করেছিলেন। তিনি পুরাণকে ইতিহাসে রূপান্তরিত করতে চাননি। তিনি জানতেন, যে সভ্যতা কল্পকথাকে জ্ঞানের বিকল্প করে তোলে, তার সৃজনশীল শক্তি ক্ষয়প্রাপ্ত হয়। যখন প্রতিটি আধুনিক আবিষ্কারকে ‘প্রাচীন বৈদিক বিজ্ঞান’-এর নামে দাবি করা হয়, তখন রবীন্দ্রনাথের ব্যঙ্গ আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে। তিনি বুঝেছিলেন, অতীতকে ভালোবাসা আর অতীতকে পূজা করা এক জিনিস নয়। অতীতের প্রতি অন্ধ মোহ বর্তমানের সৃজনশীলতাকে হত্যা করে।

তবে এখানেই রবীন্দ্রনাথের জটিলতা। তিনি সম্পূর্ণ আধুনিক পাশ্চাত্য বস্তুবাদকেও গ্রহণ করেননি। তিনি বিশ্বাস করতেন, কেবল বিজ্ঞান মানুষকে সম্পূর্ণতা দিতে পারে না। মানুষের প্রয়োজন সৌন্দর্য, সংগীত, প্রেম, কল্পনা ও আধ্যাত্মিক বিস্ময়।

এই কারণেই তাঁর মানবতাবাদ এত নান্দনিক। তাঁর কাছে মানুষ কেবল রাজনৈতিক প্রাণি নয়; সে সৃষ্টিশীল সত্তা। মানুষের মুক্তি কেবল অর্থনৈতিক মুক্তি নয়; তা অনুভূতিরও মুক্তি।

আবার রাশিয়ার চিঠি-তে আমরা দেখি এক অন্য রবীন্দ্রনাথকে। সোভিয়েত সমাজব্যবস্থা দেখে তিনি বিস্মিত হয়েছিলেন— কারণ সেখানে তিনি দেখেছিলেন শিক্ষার প্রসার, কুসংস্কারের বিরুদ্ধে সংগ্রাম, এবং মানুষের মধ্যে মর্যাদাবোধ জাগানোর চেষ্টা। যদিও তিনি সম্পূর্ণ রাজনৈতিকভাবে সমাজতন্ত্রী ছিলেন না, তবু তিনি বুঝেছিলেন— ধর্মীয় অন্ধতা ও সামাজিক বৈষম্য থেকে মুক্তি ছাড়া মানুষের প্রকৃত উন্নতি অসম্ভব। এই দৃষ্টিভঙ্গিই তাঁকে ভারতীয় নবজাগরণের অন্যতম শ্রেষ্ঠ মনীষী করে তোলে। ভারতীয় নবজাগরণ কেবল সাহিত্যিক আন্দোলন ছিল না; তা ছিল মধ্যযুগীয় অন্ধতার বিরুদ্ধে মানুষের আত্মমুক্তির সংগ্রাম। রামমোহন, বিদ্যাসাগর — প্রত্যেকে তাঁদের নিজস্ব উপায়ে সমাজকে নতুন করে ভাবতে শিখিয়েছিলেন। রবীন্দ্রনাথ এই ধারারই উত্তরসূরি। তিনি বিদ্যাসাগরের মধ্যে দেখেছিলেন ‘অপার মনুষ্যত্ব’। কারণ বিদ্যাসাগর কেবল সংস্কারক ছিলেন না; তিনি ছিলেন মানুষের মর্যাদার যোদ্ধা। তিনি সমাজের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে বিধবা বিবাহের পক্ষে লড়েছিলেন। তিনি ধর্মীয় নিষেধের চেয়ে মানবিকতাকে বড় বলে মনে করেছিলেন। আবার রামমোহনের মধ্যে রবীন্দ্রনাথ দেখেছিলেন আধুনিক ভারতের প্রথম মুক্তবুদ্ধির দীপশিখা। যখন অনেকেই ইংরেজি শিক্ষা ও পাশ্চাত্য যুক্তিবাদকে ‘বিদেশি’ বলে প্রত্যাখ্যান করতে চাইছিলেন, তখন রবীন্দ্রনাথ বুঝেছিলেন— জ্ঞান কখনও জাতিগত হয় না। সত্যের কোনও ধর্ম নেই। এই কারণেই অন্তরে শ্রদ্ধা রেখেও তিনি গান্ধীর সঙ্গে মতভেদে পৌঁছেছিলেন।

এই দৃষ্টিভঙ্গি তাঁকে মার্কসবাদী বস্তুবাদের থেকে পৃথক করেছে, আবার ধর্মীয় রক্ষণশীলতার থেকেও দূরে সরিয়েছে। তিনি দুই প্রান্তের মাঝখানে দাঁড়িয়ে মানুষের পূর্ণতার সন্ধান করেছেন। এই সন্ধানের সবচেয়ে গভীর প্রকাশ তাঁর কবিতায়। তাঁর কবিতায় প্রকৃতি কেবল দৃশ্য নয়; তা মানুষের আত্মবিস্তারের ভাষা। নদী, আকাশ, বৃক্ষ, বর্ষা— সবকিছু যেন মানুষের অস্তিত্বকে বৃহত্তর বিশ্বসত্তার সঙ্গে যুক্ত করে। তাঁর বিশ্ববোধের উৎস এখানেই। তিনি মানুষকে কোনও সংকীর্ণ জাতিগত পরিচয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে চাননি। তাঁর কাছে মানুষ ছিল মহাবিশ্বের সন্তান। এই কারণেই তাঁর আন্তর্জাতিকতাবাদ এত গভীর। তিনি জাতীয়তাবাদকে অস্বীকার করেননি, কিন্তু জাতীয়তাবাদকে মানবতার উপরে স্থান দেননি।

আজকের পৃথিবীতে এই শিক্ষা নতুন করে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ আমরা আবার এমন এক সময়ের মধ্যে বাস করছি, যখন মানুষ নিজের পরিচয়কে রক্ষা করতে গিয়ে অন্যের অস্তিত্বকে অস্বীকার করছে। ধর্ম রাষ্ট্রকে গ্রাস করছে, রাষ্ট্র মানুষের বিবেককে নিয়ন্ত্রণ করতে চাইছে, আর মানুষ ধীরে ধীরে ভিড়ে পরিণত হচ্ছে। এই অন্ধকারের মধ্যেই রবীন্দ্রনাথ আমাদের সামনে এক কঠিন প্রশ্ন রেখে যান— মানুষ কি নিজেকে অতিক্রম করতে পারবে? সে কি ভয়, ঘৃণা ও সংকীর্ণতার বাইরে গিয়ে সত্যিই বিশ্বমানব হয়ে উঠতে পারবে?

এই প্রশ্নের উত্তর তিনি সরলভাবে দেননি। কারণ তিনি জানতেন, সভ্যতার অগ্রগতি সরলরৈখিক নয়। মানুষ যেমন সৃষ্টি করে, তেমনি ধ্বংসও করে। তবু তিনি শেষ পর্যন্ত মানুষের উপর আস্থা হারাননি। তাঁর সমগ্র সাহিত্য, সংগীত ও দর্শনের ভিতরে এক গভীর বিশ্বাস কাজ করে— মানুষের ভিতরে এখনও আলো আছে। তিনি আমাদের শেখান— সভ্যতার প্রকৃত শক্তি সহাবস্থানে, বহুত্বে, মুক্তবুদ্ধিতে। তিনি শেখান— প্রশ্ন করার সাহসই মানুষের সবচেয়ে বড় স্বাধীনতা। তিনি শেখান— দেশপ্রেম মানে অন্যকে ঘৃণা করা নয়; বরং মানুষের মর্যাদাকে রক্ষা করা। তাঁর দেওয়া সবচেয়ে বড়ো শিক্ষা সম্ভবত এই যে— মানুষ কোনও চূড়ান্ত পরিচয়ের মধ্যে আবদ্ধ নয়। মানুষের পরিচয় ক্রমাগত প্রসারিত হয়। পরিবার থেকে সমাজ, সমাজ থেকে দেশ, দেশ থেকে বিশ্ব— মানুষ তার আত্মাকে বিস্তৃত করতে শেখে। এই কারণেই তাঁর মানবতাবাদ বিশ্বমানবতার দিকে এগিয়ে যায়। তিনি তাই বলেছিলেন – “মনুষ্যত্বের শিক্ষাটাই চরম শিক্ষা আর সমস্তই তার অধীন”। তিনি কেবল ভারতবর্ষকে ভালোবাসেননি; তিনি সমগ্র মানবসভ্যতার মুক্তি চেয়েছিলেন। তাঁর ‘বিশ্বভারতী’ কেবল এক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নয়; তা ছিল তাঁর স্বপ্ন— যেখানে পূর্ব ও পশ্চিম, বিজ্ঞান, সাহিত্য ও মানবিকতা, দেশীয় ও বিশ্বজনীন চেতনার মিলন ঘটবে। মানুষই একদিন মহামানবের সাগরতীরে বিশ্ব-হৃদয়ের জয়গান গাইবে – এই বিশ্বাস শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত রবীন্দ্রনাথ হারাননি।

কারণ তাঁর সমগ্র জীবনের, সমগ্র কর্মের, সমগ্র শিল্পের, সব সাধনার শেষ আশ্রয় ছিল মানুষ। না-রাষ্ট্র। না-ধর্ম। না-শাস্ত্র। না-জাতি। মানুষ। কেবল মানুষ। মানুষকেই তিনি তাঁর সমস্ত সৃষ্টি ও চিন্তার কেন্দ্রস্থলে স্থাপন করেছিলেন। এই কারণেই আজও তিনি আমাদের বিবেককে নাড়া দেন। এই কারণেই তাঁর কণ্ঠস্বর এখনও ইতিহাসের অন্ধকার ভেদ করে ভেসে আসে— “. . . একদিন অপরাজিত মানুষ নিজের জয়যাত্রার অভিযানে সকল বাধা অতিক্রম করে অগ্রসর হবে তার মহৎ মর্যাদা ফিরে পাবার পথে। মনুষ্যত্বের অন্তহীন প্রতিকারহীন পরাভবকে চরম বলে বিশ্বাস করাকে আমি অপরাধ মনে করি।” কারণ চিরকালের সাধনালব্ধ সত্য উপলব্ধি ও পরিণত গাঢ় উচ্চারণে তিনি-ই বলেছেন– “মানুষের উপর বিশ্বাস হারানো পাপ”।

### [চিন্তাসূত্র: পথিকৃৎ পত্রিকা, ২০০৩]

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!
Scroll to Top