বিশ্বের ভাষা ও ভাষা পরিবার

ভাষা (প্রথম পর্যায়) — প্রথম অধ্যায় : বিশ্বের ভাষা ও ভাষা পরিবার


১। বিশ্বভাষা বা কৃত্রিম সর্বজনীন ভাষার কথা প্রথম কে চিন্তা করেছিলেন?
দার্শনিক দেকার্ত বিশ্বভাষা বা কৃত্রিম সর্বজনীন ভাষার কথা প্রথম চিন্তা করেছিলেন।


২। দেকার্ত কোন সময়ের লোক ছিলেন?
দার্শনিক দেকার্ত ছিলেন খ্রিস্টীয় সপ্তদশ শতকের প্রথমার্ধের লোক।


৩। দেকার্ত ছাড়া আর কে আন্তর্জাতিক ভাষার পরিকল্পনা করেছিলেন?
দার্শনিক দেকার্ত ছাড়া জার্মান মনীষী শ্লেষের আন্তর্জাতিক ভাষার পরিকল্পনা করেছিলেন।


৪। ফোলাপ্যুক্ বা ভোলাপকে কী?
একটি আন্তর্জাতিক সর্বজনীন ভাষা হল ফোলাপ্যুক্ বা ভোলাপকে।


৫। কয়েকটি আন্তর্জাতিক ভাষা পরিকল্পনার নাম লেখো।
কয়েকটি আন্তর্জাতিক ভাষা পরিকল্পনার নাম হল — Idiom neutral, Ido Latino, Sine flexione, Antido, Occidental, Novial ইত্যাদি।


৬। বিশ্বভাষা বা কৃত্রিম আন্তর্জাতিক ভাষার মধ্যে কোন ভাষা প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল?
বিশ্বভাষা বা কৃত্রিম আন্তর্জাতিক ভাষার মধ্যে প্রতিষ্ঠিত ভাষাটি হল ‘এসপেরান্তো’ (Esperanto)।


৭। এসপেরান্তো ভাষার সহজতম দিক কোনগুলি?
এসপেরান্তো ভাষার বানান খুব বিধিবদ্ধ, উচ্চারণ অনুসারী এবং ব্যাকরণ অত্যন্ত সহজ।


৮। পৃথিবীর প্রাচীনতম ভাষাবংশ কাকে বলে?
পৃথিবীর ভাষাসমূহ কয়েকটি আদি উৎস থেকে জন্মলাভ করেছে। এই আদি উৎসগুলিকে পৃথিবীর প্রাচীনতম ভাষাবংশ বলা হয়।


৯। প্রাচীনতম ভাষাবংশের উৎস কীভাবে নির্ণয় করা হয়েছে?
তুলনামূলক ভাষাতত্ত্বের পদ্ধতির সাহায্যে পৃথিবীর ভাষাগুলির উৎস নির্ণয় করা হয়েছে।


১০। ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষাবংশকে আর কোন নামে অভিহিত করা হয়?
ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষাবংশকে ইন্দো-জার্মানিক বা আর্য ভাষাবংশ বলেও অভিহিত করা হয়।


১১। পৃথিবীতে কোন বংশের ভাষা-ভাষীর জনগোষ্ঠীর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রতিপত্তি ঘটেছে?
পৃথিবীতে ইন্দো-ইউরোপীয় বংশের ভাষা-ভাষীর জনগোষ্ঠীর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রতিপত্তি ঘটেছে।


১২। আর্যদের আদি বাসস্থান কোথায় ছিল?
আর্যদের আদি বাসস্থান ছিল এক মতে মধ্য-ইউরোপ এবং অন্য মতে দক্ষিণ রাশিয়ার উরাল পর্বতের পাদদেশে।


১৩। সেমীয়-হামীয় বংশের প্রধান দুটি উপশাখার নাম কী?
সেমীয়-হামীয় বংশের প্রধান দুটি উপশাখা হল — সেমীয় এবং হামীয়।


১৪। মিশরে প্রথম কোন ভাষা প্রচলিত ছিল?
মিশরে প্রথম প্রাচীন মিশরীয় ভাষা প্রচলিত ছিল।


১৫। প্রাচীন মিশরের ভাষা থেকে কোন ভাষার উদ্ভব ঘটে?
প্রাচীন মিশরের ভাষা থেকে কপটিক ভাষা উদ্ভূত হয়েছিল।


১৬। মিশর থেকে কপটিক ভাষা কোন সময়ে বিলুপ্ত হয়ে যায়?
মিশর থেকে কপটিক ভাষা সপ্তদশ শতাব্দীতে বিলুপ্ত হয়ে যায়।


১৭। মিশরে এখন কোন কথ্য ভাষা প্রচলিত?
মিশরে এখন ‘আরবি’ কথ্য ভাষা প্রচলিত।


১৮। ‘বান্টু’ বংশের ভাষা কোন জায়গায় প্রচলিত রয়েছে?
‘বান্টু’ বংশের ভাষা মধ্য ও পশ্চিম আফ্রিকায় প্রচলিত রয়েছে।


১৯। ‘বান্টু’ বংশের অন্তর্গত দুটি ভাষার নাম লেখো।
‘বান্টু’ বংশের অন্তর্গত দুটি ভাষা হল — সোয়াহিলি ও কাফির।


২০। দ্রাবিড় বংশের কয়েকটি ভাষার উল্লেখ করো।
দ্রাবিড় বংশের ভাষার মধ্যে রয়েছে — তামিল, তেলুগু, মালয়ালম, কন্নড় ইত্যাদি।


২১। অস্ট্রো-এশিয়াটিক শাখার কটি উপশাখা ও কী কী?
অস্ট্রো-এশিয়াটিক শাখার দুটি উপশাখা — মোন-খমের এবং কোল।


২২। মোন-খমের ভাষা কোথায় প্রচলিত?
মোন-খমের ভাষা বার্মা-মালয়ের স্থানে স্থানে এবং নিকোবর দ্বীপপুঞ্জে প্রচলিত হয়ে থাকে।


২৩। ‘কোল’ উপশাখার ভাষাগুলি কোথায় প্রচলিত?
‘কোল’ উপশাখার ভাষাগুলি পশ্চিমবঙ্গে, ওড়িশায়, বিহারে, মধ্যপ্রদেশে ও অন্ধ্রপ্রদেশের পূর্ব-উত্তর অঞ্চলে প্রচলিত।


২৪। অস্ট্রো-এশিয়াটিক শাখার প্রধান ভাষাগুলি কী?
অস্ট্রো-এশিয়াটিক শাখার প্রধান ভাষা হল — শবর, সাঁওতালি, খাসি, মুন্ডারি ও নিকোবরী।


২৫। ভোট-চিনীয় বংশের কটি শাখা ও কী কী?
ভোট-চিনীয় বংশের তিনটি শাখা — চিনীয়, থাই ও ভোটবর্মী।


২৬। ‘ভোট-বর্মী’ শাখার কয়টি উপশাখা এবং কী কী?
‘ভোট-বর্মী’ শাখার তিনটি উপশাখা — ভোট বা তিব্বতী, বর্মী এবং বোড়ো বা ভোট।


বড়ো প্রশ্নোত্তর

১। ভাষার রূপতত্ত্ব বা আকৃতি অনুযায়ী শ্রেণীবিভাগ করার পদ্ধতিগত সুবিধা কী? এই পদ্ধতিটি সম্পর্কে সংক্ষেপে আলোচনা করো।

ভাষাবিদগণ পৃথিবীতে প্রচলিত ভাষাগুলিকে বিভিন্ন পদ্ধতিতে শ্রেণীবদ্ধ করার প্রয়াস করেছেন। সেইরকম একটি পদ্ধতি হল রূপতত্ত্ব বা আকৃতি অনুযায়ী ভাষার শ্রেণীবিভাগ। এই পদ্ধতির প্রধান সুবিধা এই যে, ভাষার সাংগঠনিক অবয়বটি স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে। তাই এই পদ্ধতির ফলে নির্দিষ্ট মানদণ্ডের ভিত্তিতে পৃথিবীর সকল ভাষাকে বর্গীভূত করা সম্ভব হয়। ভাষার রূপতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ অনেক বেশি বিজ্ঞানসম্মত।

রূপতত্ত্ব অনুযায়ী ভাষার শ্রেণীবিভাগ

রূপতত্ত্ব বা আকৃতি অনুযায়ী ভাষাগুলিকে দুইটি প্রধান শ্রেণীতে বিভক্ত করা হয়। যথা —

(১) অসমবায়ী ভাষা

যে সকল ভাষায় বিভক্তি, প্রত্যয়, উপসর্গ প্রভৃতির আলাদা কোনো অস্তিত্ব থাকে না, বাক্যের মধ্যে শব্দের অবস্থান দেখে তার ভূমিকা নির্ণয় করা হয়, সেই সব ভাষাকে অসমবায়ী ভাষা বলে।
যেমন — চিনা ভাষা।

(২) সমবায়ী ভাষা

যে সব ভাষাগুলিতে পদগঠনে বিভক্তি, প্রত্যয়, উপসর্গের বিশেষ ভূমিকা রয়েছে, সেই সব ভাষাকে সমবায়ী ভাষা বলে। এই ধরনের ভাষা মূলত তিন প্রকার —

(ক) মুক্তান্বয়ী

যে সমস্ত ভাষায় বিভক্তি, প্রত্যয়, উপসর্গ প্রভৃতির আলাদা অস্তিত্ব বজায় থাকে সেগুলিকে মুক্তান্বয়ী ভাষা বলা হয়।
যেমন — তুর্কি ভাষা।

(খ) অত্যান্বয়ী

যে সমস্ত ভাষায় বাক্যের বাইরে শব্দের কোনো স্বাধীন অস্তিত্ব থাকে না, বাক্যই ভাষার ক্ষুদ্রতম একক — তাদের অত্যান্বয়ী ভাষা বলা হয়।
যেমন — এস্কিমোদের ভাষা।

(গ) সমন্বয়ী

যে সমস্ত ভাষায় বিভক্তি, প্রত্যয়, উপসর্গ প্রভৃতি শব্দের সঙ্গে এমনভাবে মিশে যায় যে তাদের স্বতন্ত্র করার উপায় থাকে না, তাদেরকে সমন্বয়ী ভাষা বলে।
যেমন — বাংলা, হিন্দি, ইংরেজি প্রভৃতি।


২। মিশ্র ভাষা কাকে বলে? এই ভাষার চারটি বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করো।

মিশ্র ভাষা

নানা কারণে একাধিক ভাষা গোষ্ঠীর মানুষ যদি কোনো এক বিশেষ অঞ্চলে সমবেত হয়, তখন সেই দুই বা ততোধিক ভাষার মধ্যে মিশ্রণ ঘটে এবং এক মিশ্র ভাষার জন্ম হয়।

উদাহরণ

প্রাচীন মিশ্র ভাষাগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য — পিজিন-ইংরেজি, বিচ-লা-মার, মরিশাস-ক্রেওল এবং চিনুক।

বৈশিষ্ট্য

১। এই মিশ্র ভাষায় একাধিক ভাষার ভাষিক উপাদান পাশাপাশি বজায় থাকে। তবে উন্নত ভাষার প্রাধান্য দেখা দিতে পারে।

২। এই ধরনের ভাষায় ব্যাকরণের কোনো সুষ্ঠু নিয়ম বজায় থাকে না। কোনো একটি ভাষার নিয়ম সরাসরি ব্যবহৃত হয়।

৩। মিশ্র ভাষার শব্দভাণ্ডার সীমিত। এই ভাষা মূলত প্রয়োজনভিত্তিক, তাই এর স্থায়িত্ব কম।

৪। এই ভাষাগুলি সাধারণত কথ্য রূপেই বেশি ব্যবহৃত হয়, লিখিত সাহিত্যের বিকাশের সম্ভাবনা নামমাত্র থাকে।


৩। অবর্গীভূত ভাষা কাকে বলে? পৃথিবীর উল্লেখযোগ্য কয়েকটি অবর্গীভূত ভাষার পরিচয় দাও।

অবর্গীভূত ভাষা

পৃথিবীর যে সমস্ত ভাষার এমন কোনো ভাষাতাত্ত্বিক প্রমাণ বা সূত্র পাওয়া যায়নি, যার দ্বারা তাকে অন্য একাধিক ভাষার সঙ্গে একই বংশজাত বা কোনো একটি নির্দিষ্ট ভাষাবর্গের অন্তর্ভুক্ত বলে ধরা যায়, তাদের অবর্গীভূত বা অশ্রেণিবদ্ধ ভাষা বলে।

উদাহরণ

জাপানি ও কোরীয়, বাস্ক, বুরুশাসকি এবং আন্দামানি ভাষাশাখার অন্তর্গত ভাষাগুলি এই শ্রেণির অন্তর্গত।

জাপানি ও কোরীয়

কোরীয় ভাষা এবং উপভাষাসহ জাপানি ভাষার সঙ্গে আলতাইক ভাষাবংশের ভাষাগুলির সামান্য মিল আছে। উত্তর কোরিয়া ও দক্ষিণ কোরিয়ায় কোরীয় ভাষা এবং জাপান ও রিযুকিযু দ্বীপে জাপানি ভাষা প্রচলিত। প্রত্যয়, বিভক্তি এবং পদক্রমের দিক দিয়ে এই দুই ভাষার মধ্যে মিল থাকলেও দুই ভাষায় কারকবোধক অনুসর্গের প্রয়োগবিধি সম্পূর্ণ পৃথক। জাপানি ভাষার উপর চিনা ভাষা, লিপি ও সংস্কৃতির প্রভাব যেমন আছে, তেমনি কোরীয় ভাষাতেও একই প্রভাব আছে।

বাস্ক

এই ভাষা ফ্রান্সের পশ্চিমে এবং স্পেনের পূর্বদিকে পিরেনিজ পর্বতমালার চারপাশে প্রচলিত। উত্তর স্পেনের দুই শতাংশ এবং দক্ষিণ ফ্রান্সের কিছু মানুষের মাতৃভাষা বাস্ক। ফিনো-উগ্রীয় অর্থাৎ ইরানীয় ভাষা-পরিবারের ভাষাগুলির সঙ্গে এই ভাষার সামান্য মিল আছে।

বুরুশাসকি

ভারতের উত্তর-পশ্চিম সীমান্তে বুরুশাসকি ভাষা নামে এক বিচ্ছিন্ন ভাষা প্রচলিত রয়েছে।

আন্দামানি

আন্দামান দ্বীপপুঞ্জের বিভিন্ন দ্বীপে প্রচলিত শারি, কোরা, ইয়ারভা প্রভৃতি ভাষা এই বিচ্ছিন্ন ভাষাশাখার অন্তর্গত। কম্বোডিয়ার খমের ভাষাও অশ্রেণিবদ্ধ ভাষা।


৪। বিশ্বভাষা সম্পর্কে ভাষাবিদদের চিন্তা ও প্রকাশ যা ঘটেছে তার সংক্ষিপ্ত পরিচয় দাও।

ভাষা হল মানুষের ভাবপ্রকাশ এবং ভাব অনুভবের মাধ্যম। ভাষা প্রত্যেকটি জাতির নিজস্ব সংস্কৃতির বাহক এবং তার স্বাতন্ত্র্যের দ্যোতক। ভাষা সৃষ্টির মূলে রয়েছে ব্যক্তিমানুষের মন ও চিন্তা, আর সমাজবদ্ধ মানুষের ভাববিনিময়ের ইচ্ছা। মানবসভ্যতার অনাদিকাল থেকে গোষ্ঠীবদ্ধ মানুষ কণ্ঠধ্বনির সাহায্যে পরস্পরের কাছে মনোভাব জানানোর চেষ্টা করেছে। সভ্যতার প্রথম যুগে ভাষা ছিল অস্ফুট এবং অপরিণত। সুদীর্ঘকাল ধরে এক-একটি নির্দিষ্ট জনসমষ্টির মধ্যে ধারাবাহিকভাবে ব্যবহারের মধ্য দিয়ে ভাষা বর্তমান রূপ পেয়েছে।

ভাষা জাতিগত নিজস্ব সংস্কৃতির ও স্বাতন্ত্র্যের দ্যোতক হওয়ায় ভাষাগত ভেদাভেদ খুবই প্রকট। মাতৃভাষার প্রতি টান, আকর্ষণ ও আকুতির মধ্যে রয়েছে এক চিরকালীন আবেদন। ভাবপ্রকাশের এই মাধ্যম প্রত্যেকেরই অর্জিত অধিকারের মতো। আবার মাতৃভাষা ও একটি-দুটি ভাষা আয়ত্ত করে সব জাতির সব দেশের মানুষের সঙ্গে ভাব-বিনিময় করা যায় না। সাধারণ মানুষের জ্ঞান, প্রজ্ঞাও তো সীমিত। সে ক্ষেত্রে এমন কোনো একটি ভাষা যদি থাকত যা শিখে সব দেশের সব জাতির মানুষের সঙ্গে ভাব-বিনিময় করা যেত, তাহলে আমাদের পরিশ্রম ও সময় অনেক বেঁচে যেত।

এক সময় ফরাসি ভাষা প্রায় আন্তর্জাতিক ভাষার স্বীকৃতি লাভ করেছিল, পরে আবার ইংরেজি ভাষা আন্তর্জাতিক প্রসার লাভ করে। কিন্তু পরবর্তীকালে ইংরেজি ভাষার ক্ষেত্রও অনেকটা সংকুচিত হয়ে পড়ে। অথচ পৃথিবীর অনেক মনীষী, দার্শনিকদের চিন্তায় বিশ্ব-ঐক্য এবং এক বিশ্বের কথা মাথায় দানা বেঁধেছিল। তবে এই ভাবনা কিন্তু ভাষা জিজ্ঞাসুদের মনে অনেক আগে থেকেই দানা বেঁধে উঠেছিল। তাঁরা জাতির মধ্যে ভাষাগত ব্যবধান দূর করার জন্য আন্তর্জাতিক ভাষা গড়ে তোলার চেষ্টা করেছেন।

খ্রিস্টীয় সতেরো শতকের প্রথমার্ধে দার্শনিক দেকার্ত প্রথম কৃত্রিম আন্তর্জাতিক ভাষার পরিকল্পনা করেছিলেন। এরপর জার্মান মনীষী শেয়ের (Schleyer) একটি আন্তর্জাতিক ভাষার পরিকল্পনা করেছিলেন, যার নাম ফোলাপ্যুক বা ভোলাপ্যুক। এরপর আরও কিছু আন্তর্জাতিক ভাষার পরিকল্পনা করা হয়েছিল, যেমন — Idiom neutral, Ido Latino sine flexione, Antido, Occidental, Novial ইত্যাদি।

যে কৃত্রিম আন্তর্জাতিক ভাষাটি সমর্থন লাভ করেছিল সেটি হল এসপেরান্তো (Esperanto)। এটি একটি সহজ ভাষা, বানান খুব বিধিবদ্ধ ও উচ্চারণ অনুসারী। এখানে বানানে ও উচ্চারণে কোনো বৈষম্য রাখা হয়নি, ব্যাকরণও খুব সোজা ও সংক্ষিপ্ত; কেবল ১৬টি নিয়মেই বেঁধে রাখা হয়েছে। এর একটি নিয়ম হল পুরুষ ও বচন অনুযায়ী ক্রিয়ার রূপের কোনো পরিবর্তন হবে না। যেমন —

Mi dormas nokte = আমি রাত্রে ঘুমাই।
Li dormas nokte = সে রাত্রে ঘুমায়।

দেখা যায় বাংলায় পুরুষানুযায়ী ক্রিয়াপদের পরিবর্তন হলেও এসপেরান্তো ভাষায় dormas একই রয়েছে। এই ভাষার শব্দভাণ্ডারও কম। ভাষাটি প্রচারের জন্য Esperanto Associations গড়ে তোলা হয়েছে। ভাষাবিজ্ঞানীরা এই ভাষা শেখেন কিন্তু জনসাধারণের মধ্যে এই ভাষা বিশেষ প্রচার লাভ করেনি। আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে এই ভাষাকে ভাব-বিনিময়ের মাধ্যমরূপে গ্রহণ না-করলে এই ভাষার ব্যাপক স্বীকৃতি সম্ভব নয়। অবশ্য এই কথাও মনে রাখতে হবে যে, শুধু একটি ভাষার সাহায্যে আন্তর্জাতিক ভাব-বিনিময় বর্ধিত করা যায় না।


৫। সাংকেতিক ভাষা বলতে কী বোঝো?

কোনোরকম ভাষা ব্যবহার না করেও কেবলমাত্র শারীরিক অঙ্গভঙ্গি ও ইশারা-ইঙ্গিতের মাধ্যমে ভাব আদানপ্রদানের প্রক্রিয়াকে ভাষাবিজ্ঞানীরা নাম দিয়েছেন — Para Language। এই ধরনের ভাষার দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়েই মূক এবং বধিরদের জন্য তৈরি হল এক বিশেষ সাংকেতিক ভাষা — Sign Language। বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ এবং ভাষাতাত্ত্বিকদের প্রচেষ্টায় এই Sign Language এখন সমগ্র বিশ্বজুড়ে একটি স্বতন্ত্র ভাষার মর্যাদা লাভ করেছে। সাংকেতিক ভাষার বহুল প্রচলন পিজিনের সম্ভাবনার পথ খুলে দিতে পারে।

Sign Language-গুলির মধ্যে Paget Gorman অন্যতম।

এই ভাষায় ‘ক্লিয়া’, ‘পশু’, ‘রং’, ‘আধার’, ‘খাদ্য’ প্রভৃতি মৌলিক বিষয়ভিত্তিক প্রায় ৩,০০০ সংকেত রয়েছে। এক-একটি মৌলিক সংকেতের সঙ্গে অন্য আরও একটি চিহ্ন জুড়ে শব্দ নির্মাণ করা হয় বা বোঝানো হয়। উত্তর আমেরিকার আদিবাসীদের মধ্যে প্রচলিত ‘আমের-ইন্দ’ এই ধরনের একটি ভাষা।

তবে এই ধরনের ভাষার মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় হল আঙুল দিয়ে বানান করে শব্দ বোঝানোর পদ্ধতি। একে Finger spelling বা Dactylology বলে। এই পদ্ধতিতে সাধারণ বর্ণমালার প্রতিটি বর্ণের জন্য আলাদা আলাদা চিহ্ন বা হাতের মুদ্রা ব্যবহৃত হয়। Paget Gorman পদ্ধতিতে যেখানে অনেক শব্দ বোঝানো সম্ভব হয় না সেখানে Finger spelling পদ্ধতিতে তা সহজেই বোঝানো সম্ভব হয়। তবে ভাষা-নিরক্ষর মানুষ ও শিশুদের বোঝার পক্ষে বেশ অসুবিধাজনক।

এই সমস্যা থেকে মুক্ত হতে একই সঙ্গে মৌখিক ভাষা এবং আঙুল দিয়ে বানান করা — উভয় পদ্ধতির মিশ্রণে এক অভিনব পদ্ধতি উদ্ভাবিত হয়েছে। ভাষাবিজ্ঞানীরা পদ্ধতিটির নামকরণ করেছেন — Rochester পদ্ধতি। যা Paget Gorman পদ্ধতির সীমাবদ্ধতাকে অনেকটাই দূর করতে সক্ষম হয়েছে।

মিশ্র ভাষা কাকে বলে? এই ভাষার চারটি বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করো।

উত্তর-

দুই বা তার বেশি ভাষাগোষ্ঠীর মানুষ একই এলাকায় বসবাস করলে তাদের ভাষাগুলির মিশ্রণে যে নতুন ভাষার জন্ম হয় তাকে মিশ্র ভাষা বলে। যেমন, বিচ-লা-মার, পিজিন-ইংরেজি প্রভৃতি।

মিশ্র ভাষার বৈশিষ্ট্য

১) মিশ্র ভাষাতে উভয় ভাষারই ভাষাগত বৈশিষ্ট্য বজায় থাকে কিন্তু ক্ষেত্রবিশেষে উন্নত ভাষাটির প্রাধান্য লক্ষ্য করা যায়।

২) মিশ্রভাষার ব্যবহার কথ্য ভাষা হিসাবেই সীমাবদ্ধ থাকে। এই ভাষায় সাহিত্য সৃষ্টির সম্ভাবনা থাকে না।

৩) মিশ্রভাষার কোনো নির্দিষ্ট ব্যাকরণ থাকে না, কথা বলার সময় যে কোনো একটি ভাষার নিয়ম প্রযোজ্য হয়।

৪) মিশ্রভাষার শব্দভাণ্ডারও অত্যন্ত সীমিত।

পরিশেষে, মিশ্রভাষার আরেকটি বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করা প্রয়োজন। মিশ্র ভাষা মূলত প্রয়োজনভিত্তিক, এইজন্য এর স্থায়িত্ব কম। তবে কোনো কারণে মিশ্রভাষার স্থায়িত্বকাল বেশি হলে তার বৈশিষ্ট্যগত কিছু পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়। তখন এর শব্দভাণ্ডার সমৃদ্ধ হয় এবং নির্দিষ্ট ভাষারীতি গড়ে ওঠে। মিশ্রভাষা যদি দীর্ঘস্থায়ী হয়ে কোনো প্রজন্মের মাতৃভাষায় পরিণত হয়, তবে তাকে বলা হয় ক্রেওল। এবং এই পদ্ধতিটিকে বলা হয় ক্রেওলাইজেশন।

প্রশ্ন- অবর্গীভূত ভাষা কাকে বলে? পৃথিবীর উল্লেখযোগ্য কয়েকটি অবর্গীভূত ভাষার পরিচয় দাও। 

উত্তর-

ভাষাবিজ্ঞানীগণ বিভিন্ন ভাষার মধ্যে বৈশিষ্ট্যগত সাদৃশ্য নিরূপণ করে ভাষাগুলিকে বর্গীভূত করেন। কিন্তু পৃথিবীতে এমন বেশ কিছু ভাষা রয়েছে, যেগুলিকে কোনো বর্গেই অন্তর্ভুক্ত করা সম্ভব নয়। এই সকল ভাষাকে অবর্গীভূত (Unclassified) ভাষা বলা হয়।

কয়েকটি অবর্গীভূত ভাষা

পৃথিবীতে বহুসংখ্যক অবর্গীভূত ভাষা রয়েছে। সেগুলির মধ্যে বেশিরভাগই ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীর ভাষা। তবে দু-একটি সমৃদ্ধ ভাষাও রয়েছে যেগুলি ভাষাবিজ্ঞানীদের মতে অবর্গীভূত ভাষার পর্যায়ে পড়ে।

১) জাপানি ভাষা

জাপানের প্রধান ভাষা হল জাপানি ভাষা। এটি একটি সমৃদ্ধ ভাষা। অনেকে এই ভাষাকে আলতাই শ্রেণিভুক্ত বলে মনে করেন। কিন্তু আলতাই শ্রেণিভুক্ত ভাষাগুলির সঙ্গে জাপানি ভাষার যেমন কিছু সাদৃশ্য রয়েছে, তেমনি বেশ কিছু বৈসাদৃশ্যও রয়েছে। তাছাড়া জাপানি ভাষা ও লিপিতে চিনা ভাষার প্রভাব রয়েছে। এসব কারণে ভাষাতাত্ত্বিকগণ জাপানি ভাষাকে একটি অবর্গীভাষা বলে অভিহিত করেন।

২) কোরীয় ভাষা

কোরীয় ভাষাও একটি সমৃদ্ধ অবর্গীভূত ভাষা। অনেকেই এই ভাষাকে আলতাই শ্রেণিভুক্ত করার চেষ্টা করেন। কিন্তু এই অভিমত গ্রহণযোগ্য নয়। তাছাড়া কোরীয় ভাষাতেও মোঙ্গল-মাঞ্চু এবং চীনা ভাষার সুস্পষ্ট প্রভাব রয়েছে। এজন্য এটিকে অবর্গীভূত ভাষা বলে গণ্য করা হয়।

৩) বাস্ক ভাষা

বাস্ক ভাষা পিরেনিজ পর্বতমালার পশ্চিমে স্পেন ও ফ্রান্সে প্রচলিত রয়েছে। এই ভাষার সঙ্গে ফিনো-উগ্রীয় ভাষা-পরিবারের সাদৃশ্য থাকলেও এটি একটি অবর্গীভূত ভাষা।

অন্যান্য

ভারতের উত্তর-পশ্চিম সীমান্তে প্রচলিত বুরুশাসকি, আন্দামানের ভাষা আন্দামানি, মায়ানমারের করে ও মন্ অবর্গীভূত ভাষার উদাহরণ।


প্রশ্ন- ভাষার রূপতত্ত্ব বা আকৃতি অনুযায়ী শ্রেণিবিভাগ করার পদ্ধতিগত সুবিধা কী? এই পদ্ধতি সম্পর্কে সংক্ষেপে আলোচনা করো। 

উত্তর-

ভাষাতাত্ত্বিকগণ পৃথিবীতে প্রচলিত ভাষাগুলিকে বিভিন্ন পদ্ধতিতে শ্রেণিবদ্ধ করার চেষ্টা করেছেন। তেমনই একটি পদ্ধতি হলো রূপতত্ত্ব বা আকৃতি অনুযায়ী ভাষার শ্রেণিবিভাগ।

এই পদ্ধতির প্রধান সুবিধা হল এই যে, ভাষার সাংগঠনিক অবয়বটি স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে। এর ফলে, নির্দিষ্ট মানদণ্ডের ভিত্তিতে পৃথিবীর সকল ভাষাকে বর্গীভূত করা সম্ভব হয়। ভাষার রূপতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ অনেক বিজ্ঞানসম্মত।

রূপতত্ত্ব অনুযায়ী ভাষার শ্রেণিবিভাগ

এই পদ্ধতি অনুযায়ী ভাষাগুলিকে দুইটি প্রধান শ্রেণিতে বিভক্ত করা হয়ে থাকে, যথা—

১) অসমবায়ী ভাষা

যে সকল ভাষাতে বিভক্তি, প্রত্যয়, উপসর্গ প্রভৃতির আলাদা কোনো অস্তিত্ব থাকে না এবং বাক্যের মধ্যে শব্দের অবস্থান দেখে তার ভূমিকা নির্ধারিত হয়, সেইসব ভাষাকে অসমবায়ী ভাষা বলে।
যেমন — চিনা ভাষা।

২) সমবায়ী ভাষা

এই শ্রেণির ভাষাগুলিতে পদগঠনে বিভক্তি, প্রত্যয়, উপসর্গের বিশেষ ভূমিকা রয়েছে। সমবায়ী ভাষা মূলত তিন রকম—

ক) মুক্তান্বয়ী

যেসব ভাষায় বিভক্তি, প্রত্যয়, উপসর্গ প্রভৃতির স্বতন্ত্র অস্তিত্ব বজায় থাকে সেগুলিকে মুক্তান্বয়ী ভাষা বলে।
যেমন — তুর্কি ভাষা।

খ) অত্যান্বয়ী

যে সকল ভাষায় বাক্যের বাইরে শব্দের কোনো স্বাধীন সত্তা থাকে না, এবং বাক্যই ভাষার ক্ষুদ্রতম একক হয়, তাদেরকে অত্যান্বয়ী ভাষা বলে।
যেমন — এস্কিমোদের ভাষা।

গ) সমন্বয়ী

যে সকল ভাষায় বিভক্তি, প্রত্যয়, উপসর্গ প্রভৃতি শব্দের সঙ্গে এমনভাবে মিশে যায় (বা সমন্বিত হয়) যে তাদের পৃথক করার উপায় থাকে না, তাদেরকে সমন্বয়ী ভাষা বলে।
যেমন — বাংলা, হিন্দি, ইংরেজি প্রভৃতি।


প্রশ্ন- বাংলা ভাষার উৎপত্তি ইতিহাস সংক্ষেপে আলোচনা কর। 

অথবা, সংস্কৃত ভাষাকে কি বাংলা ভাষার জননী বলা যায়? 

উত্তর-

নব্য ভারতীয় আর্য ভাষাগুলির মধ্যে অন্যতম হল বাংলা ভাষা। অনেকে সংস্কৃত ভাষাকে বাংলা ভাষার জননী বলে মনে করেন। কিন্তু বাংলা ভাষার প্রকৃত জন্ম-ইতিহাসটি লুকিয়ে আছে ভারতীয় আর্যভাষার বিবর্তনের ইতিহাসে।

১৫০০ খ্রিঃ পূঃ ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষাবংশের একটি শাখা ভারতীয় আর্য নামে ভারতে প্রবেশ করে। এই ভারতীয় আর্য ভাষার বিবর্তনের তিনটি স্তর—

প্রাচীন ভারতীয় আর্য (১৫০০ খ্রিঃ পূঃ থেকে ৬০০ খ্রিঃ পূঃ)

এই স্তরের প্রধান ভাষাটি হল বৈদিক, যা বেদের ভাষা। পরে বৈদিক ভাষার সংস্কার সাধন করা হয়, নাম হয় সংস্কৃত ভাষা।

মধ্য ভারতীয় আর্য (৬০০ খ্রিঃ পূঃ থেকে ৯০০ খ্রিঃ)

এই দেড় হাজার বছরে সংস্কৃত ভাষার আমূল পরিবর্তন ঘটে। প্রথমে সংস্কৃত ভাষার ‘প্রকৃতি’ (মূলরূপ) নিয়ে নতুন ভাষার জন্ম হল যার নাম প্রাকৃত। ভারতের বিভিন্ন স্থানে পাঁচ রকমের প্রাকৃত প্রচলিত ছিল। যথা— মহারাষ্ট্রী প্রাকৃত, শৌরসেনী প্রাকৃত, পৈশাচী প্রাকৃত, মাগধী প্রাকৃত ও অর্ধমাগধী প্রাকৃত। প্রাকৃতের পরবর্তী পর্যায়টি হল অপভ্রংশ। একেকটি প্রাকৃত থেকে একেকটি অপভ্রংশ জন্ম নেয়।

নব্য ভারতীয় আর্যভাষা

এই স্তরে বিভিন্ন অপভ্রংশ থেকে নব্যভারতীয় আর্যভাষাগুলির জন্ম হয়। ভাষাবিজ্ঞানীদের মতে, আনুমানিক ৯০০ খ্রিঃ নাগাদ মাগধী প্রাকৃতের অপভ্রংশের পূর্বী শাখা থেকে অহমিয়া, ওড়িয়া এবং বাংলা ভাষা জন্মলাভ করে।

পরিশেষে বলা যায়, বাংলা ভাষার জননী সংস্কৃত ভাষা নয়। পণ্ডিত হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর মতে, সংস্কৃত বাংলা ভাষার “অতি-অতি-অতি-অতি-অতিবৃদ্ধ পিতামহী”।


প্রশ্ন- প্রাকৃত ভাষার এইরূপ নামকরণের কারণ কী? এই ভাষার তিনটি আঞ্চলিক রূপের নাম লেখো।

উত্তর-

ভাষাতাত্ত্বিকদের মতে, ভারতীয় আর্য ভাষার বিবর্তনের মধ্য দিয়েই বাংলা, হিন্দি, ওড়িয়া, অসমীয়া প্রভৃতি ভারতের আধুনিক ভাষাগুলির জন্ম হয়েছে। ভারতীয় আর্য ভাষার সাড়ে তিন হাজার বছরের ইতিহাসকে তিনটি যুগে বিভক্ত করা হয়। যথা—

১) প্রাচীন ভারতীয় আর্য (আনুঃ খ্রিঃপূঃ ১৫০০ – খ্রিঃপূঃ ৬০০)
২) মধ্য ভারতীয় আর্য (আনুঃ খ্রিঃপূঃ ৬০০ – ৯০০ খ্রিঃ)
৩) নব্য ভারতীয় আর্য (আনুঃ ৯০০ খ্রিঃ – বর্তমান)

মধ্য ভারতীয় আর্য ভাষার প্রধান কথ্যরূপটি হল প্রাকৃত ভাষা, যা সংস্কৃত ব্যাকরণের অনুশাসন থেকে বেরিয়ে এসে সাধারণ জনগণের ভাষা হয়ে উঠেছিল। এই ভাষাটিকে প্রাকৃত ভাষা বলা হয় দুটি কারণে—

১) ব্যাকরণের আলোচনায় ‘প্রকৃতি’ শব্দের অর্থ হল মূল উপাদান। বৈদিক-সংস্কৃত ভাষার মূল উপাদান নিয়ে এই ভাষার জন্ম, তাই একে বলা হয় প্রাকৃত ভাষা।

২) প্রাকৃত ভাষা বলতে প্রাকৃত জনের বা সাধারণ জনগণের মুখের ভাষাকেও বোঝায়। উল্লেখ্য যে, সংস্কৃত ছিল শিক্ষিত মানুষের ভাষা; এবং ব্যাকরণের বেড়াজাল থাকায় সাধারণ মানুষের পক্ষে সংস্কৃত আয়ত্ত করা সম্ভব হতো না। এইজন্য সাধারণ মানুষ সংস্কৃত ভাষার মূল উপাদান গ্রহণ করে যে ভাষায় কথাবার্তা বলতো, তাকেই প্রাকৃত ভাষা বলা হয়।

প্রাকৃত ভাষার তিনটি আঞ্চলিক রূপ হল—

১) মহারাষ্ট্রী প্রাকৃত
২) শৌরসেনী প্রাকৃত
৩) মাগধী প্রাকৃত


প্রশ্ন- “ভারত চার ভাষাবংশের দেশ” — এই চার ভাষাবংশের পরিচয় দাও। 

উত্তর-

ভাষাবিজ্ঞানীগণ ভারতকে “চার ভাষাবংশের দেশ” বলে অভিহিত করে থাকেন। বস্তুতপক্ষে, ভারতে কতগুলি ভাষা প্রচলিত রয়েছে, সে বিষয়ে ভাষাবিজ্ঞানীদের মধ্যে মতপার্থক্য থাকলেও ভারতে প্রচলিত অধিকাংশ ভাষা যে চারটি ভাষাবংশ থেকেই উদ্ভূত হয়েছে, এ বিষয়ে সকলেই একমত। এই চারটি ভাষাবংশ হল—

১) ইন্দো-ইউরোপীয়

খ্রিস্টপূর্ব পঞ্চদশ শতকে ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষাবংশের একটি শাখা ‘ভারতীয় আর্য’ নামে ভারতে প্রবেশ করে। কালক্রমে, ভারতীয় আর্যভাষার বিবর্তনের মধ্য দিয়ে নব্য-ভারতীয় ভাষাগুলির জন্ম হয়েছে। বাংলা, হিন্দি, অসমীয়া, ওড়িয়া প্রভৃতি ভাষাগুলি এই ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষাবংশের অন্তর্গত।

২) দ্রাবিড়

দক্ষিণ ভারতের প্রধান ভাষাগুলি যথা — তামিল, তেলেগু, কন্নড়, মালায়ালাম প্রভৃতি দ্রাবিড় ভাষাবংশ থেকে এসেছে। ভাষাভাষীর সংখ্যার বিচারে, দ্রাবিড় হল ভারতের দ্বিতীয় বৃহত্তম ভাষাবংশ।

৩) অস্ট্রিক

কালের বিচারে অস্ট্রিক ভাষাবংশ হল ভারতের প্রাচীনতম ভাষাবংশ। অস্ট্রিক ভাষাবংশের অস্ট্রো-এশিয়াটিক শাখার ৬৫টি ভাষা ভারতে প্রচলিত রয়েছে। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল — সাঁওতালি, মুন্ডারি, হো প্রভৃতি।

৪) ভোট-চিনা

উত্তর-পূর্ব ভারতে এবং হিমালয় পার্বত্য অঞ্চলে ভোট-চিনা ভাষাবংশের ভাষাগুলি প্রচলিত রয়েছে। এই ভাষাবংশের উল্লেখযোগ্য ভাষাগুলি হল — গারো, কোচ, মিসমি, মেইতেই, মিজো, অঙ্গামি প্রভৃতি।


প্রশ্ন- ভোটচিনা ভাষাবংশের সংক্ষিপ্ত পরিচয় দাও। 

উত্তর-

ভাষাবিজ্ঞানীদের মতে, ভারতবর্ষে প্রচলিত ভাষাগুলি চারটি ভাষাবংশ থেকে উদ্ভূত হয়েছে। এই চারটি ভাষাবংশের একটি হলো ভোটচিনা ভাষাবংশ।

সাধারণ পরিচয়

ভারতে আর্যদের আগমনের পূর্বে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন নৃ-গোষ্ঠীর মানুষ এসেছিল। উত্তর-পূর্ব ভারতে বসবাস করত মঙ্গোলয়েডরা। তারা যে ভাষায় কথা বলতেন সেই ভাষাই হল ভোটচিনা ভাষা।

ভৌগোলিক অবস্থান

ভোটচিনা ভাষাগোষ্ঠীর অবস্থান মূলত উত্তর-পূর্ব ভারতে। আসাম, ত্রিপুরা, মনিপুর, নাগাল্যান্ড, অরুণাচল প্রদেশে ভোটচিনা ভাষাবংশের বিভিন্ন ভাষা প্রচলিত রয়েছে।

শাখা-প্রশাখা

ভোটচিনা ভাষাবংশের প্রধান শাখা দুটি— ১) ভোটবর্মী
২) তাইচিনা

এই দুটি শাখার মধ্যে ভারতে ভোটবর্মী শাখার ভাষার সংখ্যা বেশি।

১) ভোটবর্মী

এই শাখার ভাষাগুলিকে আবার চারটি শ্রেণীতে ভাগ করা যেতে পারে—

ক) বোডো বা বোরো

এই শ্রেণীর উল্লেখযোগ্য ভাষাগুলি হল — গারো, কোচ, রাভা, কাছারি প্রভৃতি।

খ) নাগা

এই শাখার ভাষাগুলি মূলত নাগাল্যান্ড এবং মণিপুরে প্রচলিত। উল্লেখযোগ্য ভাষাগুলি হল — আও, অঙ্গামি, সেমা প্রভৃতি।

গ) কুকিচিন

মণিপুরের ঐতিহ্যবাহী মেইতেই ভাষা, মিজো, কুকি প্রভৃতি এই শাখার উল্লেখযোগ্য ভাষা।

ঘ) বর্মী

চট্টগ্রামের পার্বত্য অঞ্চলে প্রচলিত মোঘ, ভ্রু প্রভৃতি বর্মী শাখার অন্যতম ভাষা।

২) তাইচিনা

ভারতে প্রচলিত তাইচিনা শাখার ভাষা হল — খামতি, অহোম প্রভৃতি।

 
### ড. অনিশ রায়
 

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!
Scroll to Top