ধ্বনি পরিবর্তন—
যুগ থেকে যুগান্তরে তার প্রকৃতি বদলায়, নদী বদলায় তার গতিপথ, ভাষাও বদলায় তার ধ্বনি। নদীর গতিপথ যেমন বহুমুখী হলে নদীর চরিত্র বদলায়, তেমনি কালের প্রবাহে মূল ভাষার ধ্বনি পরিবর্তিত হতে হতে নতুন ভাষার স্বতন্ত্র রূপ গড়ে ওঠে। এই কারণেই ভাষার ইতিহাসে ধ্বনিপরিবর্তন একটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয়।
ধ্বনিপরিবর্তন বলতে ভাষার কোনো ধ্বনির পরিবর্তনকে বোঝায়। এই পরিবর্তন কখনো স্বরের ক্ষেত্রে, কখনো ব্যঞ্জনের ক্ষেত্রে, আবার কখনো উভয়ের ক্ষেত্রেই ঘটতে পারে। ধ্বনিপরিবর্তন ভাষার স্বাভাবিক বিকাশের একটি অনিবার্য প্রক্রিয়া।
ধ্বনিপরিবর্তনের কারণ:
একটি ভাষার ধ্বনিপরিবর্তনের পেছনে বিভিন্ন কারণ কাজ করে। প্রধান কারণগুলি হল—
১) ভৌগোলিক পরিবেশজনিত কারণ:
ভৌগোলিক পরিবেশ ধ্বনিপরিবর্তনের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ভৌগোলিক অবস্থান, জলবায়ু, ভূমির প্রকৃতি ইত্যাদির উপর নির্ভর করে মানুষের শারীরিক গঠন ও জীবনযাত্রা গড়ে ওঠে। এর ফলে উচ্চারণের ভিন্নতা সৃষ্টি হয়।
যেমন— পাহাড়ি অঞ্চলের মানুষের উচ্চারণ সাধারণত কঠোর ও কণ্ঠগত হয়, আর সমতল অঞ্চলের মানুষের উচ্চারণ তুলনামূলক কোমল ও মসৃণ। এই কারণেই একই ভাষার বিভিন্ন অঞ্চলে ধ্বনিগত পার্থক্য লক্ষ্য করা যায়।
২) সামাজিক কারণ:
সামাজিক পরিবেশও ধ্বনিপরিবর্তনের একটি বড় কারণ। কোনো সমাজ যদি শান্ত ও স্থিতিশীল হয়, তবে ভাষার ধ্বনিগত পরিবর্তন অপেক্ষাকৃত কম হয়। কিন্তু যেসব দেশে বারবার বহিরাগত জাতি, সংস্কৃতি ও ভাষার আগমন ঘটে, সেখানে ধ্বনিপরিবর্তনের সম্ভাবনা অনেক বেশি।
ভারতবর্ষের ইতিহাসে বিভিন্ন সময়ে বিদেশি জাতির আগমন ঘটেছে—এর ফলে বাংলা ভাষায় শ, ষ, স ইত্যাদি ধ্বনির ব্যবহার ও উচ্চারণে পরিবর্তন দেখা যায়।
৩) অন্য ভাষার সাহচর্যজনিত কারণ:
ভাষার সংস্পর্শে ভাষা বদলায়। এক ভাষার সঙ্গে অন্য ভাষার দীর্ঘদিনের সাহচর্যে ধ্বনিগত পরিবর্তন অনিবার্য হয়ে ওঠে। বাংলা ভাষার সঙ্গে ফারসি, আরবি, উর্দু, ইংরেজি প্রভৃতি ভাষার সংস্পর্শের ফলে বহু ধ্বনিগত পরিবর্তন ঘটেছে।
যেমন— বাংলা ‘ব’ ধ্বনিতে ফারসি ভাষার প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। সাধারণ বাংলা বাক্য গঠনের মধ্যেও এই প্রভাব সুস্পষ্ট।
৪) শারীরিক কারণ:
মানুষের ভাববিনিময়ের সবচেয়ে শক্তিশালী মাধ্যম হল ইন্দ্রিয়। ইন্দ্রিয়গুলির গঠন ও কার্যক্ষমতার উপর উচ্চারণ নির্ভর করে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে উচ্চারণের অসুবিধার কারণে ধ্বনিপরিবর্তন ঘটে।
(৫) বাকযন্ত্রজনিত কারণ:
বাকযন্ত্রের কোনো অংশে অসুবিধা থাকলে উচ্চারণে পরিবর্তন ঘটে। যেমন— জিহ্বার অবস্থান, ঠোঁটের নড়াচড়া বা কণ্ঠনালির কার্যকারিতার কারণে কোনো ধ্বনি পরিবর্তিত হতে পারে।
উদাহরণ— “সেই দিন দুনিয়ার হাল বদলে গেছে”—এই বাক্যে চলিত উচ্চারণে ধ্বনির পরিবর্তন লক্ষ করা যায়।
#ধ্বনি পরিবর্তনের ধারা ও সূত্র—
স্বরধ্বনি ঘটিত ধ্বনি পরিবর্তন:
১। অপিনিহিতি: বিশেষ ক্ষেত্রে উচ্চারণের সময় শব্দের মধ্যে থাকা ব্যঞ্জন ধ্বনির পরবর্তী ‘ই’ বা ‘উ’ যদি ওই ব্যঞ্জনের অব্যবহিত পূর্বে (ঠিক সেই ব্যঞ্জনের আগে) উচ্চারিত হয়ে যায়, তবে সেই রীতিকে অপিনিহিতি বলে।
যেমন – রাতি >রাইত, আজি>আইজ, সাধু>সাউধ।
এছাড়াও ভাষাচার্য সুকুমার সেনের মতে, বাংলায় অনেকক্ষেত্রে সংযুক্ত ব্যঞ্জনের আগে একটি ‘ই’ চলে আসে, এই রীতিকেও অপিনিহিতি বলে।
যেমন- বাক্য> বাইক্ক, কাব্য> কাইব্য, রাক্ষস> রাইক্খস, যক্ষ> যইখ্য ইত্যাদি
২। অভিশ্রুতি : অপিনিহিতি থেকে আসা ‘ই’ বা ‘উ’ যদি আগের স্বরধ্বনির সঙ্গে বিশেষ সন্ধির নিয়মে মিলিত হয়ে ওই শব্দের রূপের পরিবর্তন ঘটায়, তবে সেই রীতিকে অভিশ্রুতি বলে।
যেমন – রাতি>রাইত>রাত,
আজি>আইজ>আজ,
আসিয়া>আইস্যা >এসে
৩। স্বরভক্তি/ বিপ্রকর্ষ: উচ্চারণের সুবিধার জন্য বা ছন্দের প্রয়োজনে কোনো শব্দের যুক্তব্যঞ্জন ভেঙে গিয়ে যদি তার মধ্যে একটি স্বরধ্বনি প্রবেশ করে, তবে সেই রীতিকে স্বরভক্তি বা বিপ্রকর্ষ বলে।
যেমন- ভক্তি> ভকতি, গ্লাস> গেলাস, স্নান>সিনান, ধর্ম>ধরম,কর্ম>করম,ভ্রম>ভরম।
৪। স্বরসংগতি: উচ্চারণের সুবিধার জন্য অনেক সময় শব্দের মধ্যে থাকা একটি স্বরধ্বনি অন্য স্বরধ্বনির প্রভাবে, সংগতি লাভের জন্য যদি বদলে যায়, তবে সেই রীতিকে স্বরসংগতি বলে।
স্বরসংগতি তিন প্রকার—
ক. প্রগত স্বরসংগতি: ইচ্ছা> ইচ্ছে, মূলা> মূলো, জুতা>জুতো
খ. পরাগত সংগতি: বিলাতি>বিলিতি/বিলেতি, দেশি>দিশি
গ. অনোন্য স্বরসংগতি : ঝোলা> ঝুলি, মোজা> মুজো
৫। স্বরাগম: উচ্চারণের সুবিধার জন্য বা অন্য কোনো কারণে, শব্দের আদিতে, মধ্যে, অন্তে একটি স্বরধ্বনির আগমন ঘটে, এই রীতিকে স্বরাগম বলে।
স্বরাগম তিন প্রকার—
ক. আদি স্বরাগম— স্কুল>ইস্কুল, স্টেশন >ইস্টেশন, স্পর্ধা>আস্পর্ধা।
খ. মধ্য স্বরাগম— স্বপ্ন> স্বপন, রত্ন>রতন, প্রীতি>পীরিতি
গ. অন্ত স্বরাগম— মিষ্ট>মিষ্টি, দুষ্ট >দুষ্টু, বেঞ্চ>বেঞ্চি
৬। স্বরলোপ: উচ্চারণের সুবিধার জন্য অনেক সময় শব্দের আদি, মধ্য, অন্ত থেকে একটি স্বরধ্বনি লোপ পায়, এই রীতিকে স্বরলোপ বলে।
স্বরলোপ তিন প্রকার—
ক. আদি স্বরলোপ— অলাবু>লাউ, এহেন>হেন, উদ্ধার>ধার
খ. মধ্য স্বরলোপ— গামোছা> গামছা, জানালা>জানলা
গ. অন্ত স্বরলোপ— বসতি>বসত,
জোনাকি>জোনাক
ব্যঞ্জনধ্বনি ঘটিত পরিবর্তন—
১। সমীভবন বা সমীকরণ বা ব্যঞ্জনসংগতি [Assimilation]— শব্দমধ্যস্থ পাশাপাশি অবস্থিত দুটি পৃথক পৃথক ব্যঞ্জন উচ্চারণের সময়ে যখন একে অন্যের প্রভাবে বা উভয়ে উভয়ের প্রভাবে পরিবর্তিত হয়ে দুটি একই ব্যঞ্জনে বা প্রায় সমব্যঞ্জনে বা সমবর্গের ধ্বনিতে পরিণত হয়, তখন সেই প্রক্রিয়াকে বলা হয় সমীভবন বা ব্যঞ্জনসংগতি ।
ব্যঞ্জনসংগতিও তিন প্রকারের—
যথা—(i) প্রগত ব্যঞ্জনসংগতি, (ii) পরাগত ব্যঞ্জনসংগতি ও (iii) অন্যোন্য সমীভবন ।
(i) প্রগত ব্যঞ্জন সংগতি বা সমীভবন — যেমন পদ্ম> পদ্দ, চন্দন> চন্নন, গলদা> গল্লা প্রভৃতি।
(ii) পরাগত ব্যঞ্জনসংগতি— গল্প> গপ্প, ধর্ম> ধম্ম, কর্ম> কম্ম , সুত্র> সুত্ত প্রভৃতি।
(iii) অন্যোন্য সমীভবন — উৎশ্বাস> উচ্ছ্বাস, কুৎসা> কুচ্ছা, মহোৎসব> মোচ্ছব প্রভৃতি ।
২। ধ্বনিবিপর্যয় বা বিপর্যাস [Metathesis]— উচ্চারণের সময় অসাবধানতাবশত বা অক্ষমতার কারণে শব্দমধ্যস্থ সংযুক্ত বা পাশাপাশি বা কাছাকাছি থাকা দুটি ব্যঞ্জনধ্বনির স্থান পরিবর্তন করার ঘটনাকে ধ্বনিবিপর্যয় বলে।
যেমন- বাক্স> বাস্ক, পিশাচ> পিচাস, বাতাসা> বাসাতা, তলোয়ার> তরোয়াল, দহ> হ্রদ, রিকশা> রিশকা প্রভৃতি।
৩। ব্যঞ্জনাগম (Consonant Addition)— শব্দ মধ্যে যখন ব্যঞ্জনধ্বনির আগমন ঘটে তখন সেই প্রক্রিয়াকে বলে ব্যঞ্জনাগম। ব্যঞ্জনাগম ও তিন প্রকার— (ক) আদি, (খ) মধ্য ও (গ) অন্ত ব্যঞ্জনাগম।
(ক) আদি ব্যঞ্জনাগম (Consonant Prothesis)—উজু > রুজু, ওঝা > রোজা, এখানে শব্দের আদিতে ‘র’ এর আগমন ঘটেছে।
(খ) মধ্য ব্যঞ্জনাগম (Glide Insertion)— অম্ল > অম্বল, বানর > বান্দর, পোড়ামুখী > পোড়ারমুখী প্রভৃতি। এখানে ব, দ, র ব্যঞ্জনধ্বনিগুলি শব্দের মধ্যে এসেছে।
(গ) অন্ত ব্যঞ্জনাগম (Consonant Catathesis)— সীমা > সীমানা , ধনু > ধনুক, নানা > নানান – শব্দের শেষে ‘না’, ‘ক’, ‘ন’ বর্ণের আগমন ঘটিয়ে শব্দগুলিকে সরলীকরণ করা হয়েছে।
৪। ব্যঞ্জনলোপ: শব্দের মধ্য ও অন্তে ব্যঞ্জনধ্বনির লোপ ঘটিয়ে শব্দের কাঠিন্য ভেঙে সরলীকরণ ও সংক্ষিপ্তকরণ করা হয়েছে, এই রীতিকে ব্যঞ্জনলোপ বলে।
আদি ব্যঞ্জনালোপের ব্যবহার বাংলা ভাষায় তেমন প্রচলন নেই। তবু কিছু কিছু নিশ্চয়ই আছে।
আদ্যব্যঞ্জন লোপ :
স্বরধ্বনির মতো, কোনো কোনো শব্দের উচ্চারণে সূচনার ব্যান ধ্বনিও লুপ্ত হয়ে যেতে পারে। তখন সেই প্রক্রিয়াকে বলা হয় আদ্যব্যঞ্জন লোপ। সাধারণত, শব্দের আদিতে দুরুচ্চার্য যুক্ত ব্যঞ্জন থাকলে তাদের একটি ধ্বনি উচ্চারণে লোপ পায়।
যেমন: হৃষিকেশ > রিষিকেশ, হৃদয় > রিদয়, শ্মশান > মশান (শশান ও হয়েছে), ক্ষেত্র > খেত্র, স্খালন > খালন, স্ফূর্তি > ফুর্তি ইত্যাদি।
মধ্য ও অন্ত ব্যঞ্জনলোপ:
শব্দের মধ্য ও অন্ত থেকে ব্যঞ্জন লুপ্ত হয়ে যায়।
মধ্য ও অন্ত ব্যঞ্জনলোপের উদাহরণ বহু রয়েছে । যেমন— মরছে > মচ্ছে, নবধর > নধর , গোষ্ঠ > গোঠ, শৃগাল> শিয়াল, আলোক > আলো প্রভৃতি শব্দে মধ্যে ও শেষে অবস্থিত ব্যঞ্জনধ্বনি লুপ্ত হয়েছে।
হ-ধ্বনি লোপ: কোনো শব্দ থেকে হ-ধ্বনি লুপ্ত হয়ে যাওয়া বাংলা ভাষায় একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য, একেই হ-ধ্বনি লোপ বলে।
মালদহ > মালদা, আল্লাহ > আল্লা, ব্যবহারী> ব্যাভারী, ফলাহার> ফলার, শিয়ালদহ> শিয়ালদা, কহিল> কইল, গাহিল> গাইল, চাহে> চায়
৫। সমাক্ষরলোপঃসমাক্ষরলোপ: কোনো শব্দের মধ্যে পাশাপাশি অথবা কাছাকাছি দুই বা ততোধিক সমধ্বনি থাকলে কখনো কখনো এদের এক বা একাধিক ধ্বনি লোপ পেতে দেখা যায় একে বলা হয় সমাক্ষরলোপ।
যেমন-বড়দাদা>বড়দা, মেজদিদি>মেজদি, ছোটকাকা > ছোটকা, কৃষ্ণনগর> কৃষ্নগর, পটললতা> পলতা ইত্যাদি।)
৬। নাসিক্যীভবন: কোনো শব্দে নাসিক্যধ্বনি লুপ্ত হলে, তার ক্ষতিপূরণ হিসেবে পূর্ববর্তী স্বরধ্বনি দীর্ঘ ও অনুনাসিক হয়, এই প্রক্রিয়াকে নাসিক্যীভবন বলে।
যেমন—বন্ধ>বাঁধ, হংস>হাঁস, দন্ত>দাঁত, অংক> আঁক, পঙ্ক>পাঁক, শঙ্খ> শাঁখ ইত্যাদি।
৭। মূর্ধন্যীভবন: মূর্ধন্যধ্বনির প্রভাবে কাছাকাছি অবস্থিত কোনো দন্ত্যধ্বনি যদি মূর্ধন্য ধ্বনিতে পরিণত হয়ে যায়, তবে সেই প্রক্রিয়াকে মূর্ধন্যীভবন বলে।
যেমন–বৃদ্ধ>বুড়া, বিকৃত>বিকট ইত্যাদি।
৮। উষ্মীভবন: স্পর্শধ্বনি উচ্চারণ করতে গিয়ে এমন হয় যে, শ্বাসবায়ু আংশিক বাধা পাচ্ছে, তবে সেই স্পর্শধ্বনি উষ্মধ্বনিতে পরিণত হয়ে যায়, এই প্রক্রিয়ার নাম উষ্মীভবন।
যেমন–কালীপূজা>খালীপূজা, মহাসুখ>মহাসুহ ইত্যাদি।
৯। ক্ষতিপূরক দীর্ঘীভবন: শব্দের কোনো ব্যঞ্জনধ্বনি লোপ পেলে অনেক সময় সেই লোপের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার জন্য তার পূর্ববর্তী হ্রস্বস্বর দীর্ঘস্বরে রূপান্তরিত হয়, এই প্রক্রিয়াকে ক্ষতিপূরণ বা ক্ষতিপূরক দীর্ঘীভবন বলে।
যেমন– ধর্ম>ধর্ম্ম>ধাম, ভক্ত>ভত্ত>ভাত ইত্যাদি।
### ড. অনিশ রায়

