আমির খানের ‘সিতারে জমিন পর’ সিনেমার আলোচনা

                                যখন ‘সিতারে জমির পর’ নেমে আসে

                                                                                                  অনিশ রায়

আমাদের বিশুদ্ধ উদ্ভ্রান্তি, আর ইন্টেরিয়র ডেকরেটিং-নির্ভর  বেলেল্লাপনার উত্তপ্ত এবং পশ্চিমি গন্ধময় ব্যঞ্জনের ঢাকনাটা সরিয়ে যদি কোনো আচম্বিত অবসরে আপনি আবিষ্কার করতে চান যে, এই ব্যঞ্জনকেও কী অতি মানবিক একটা আটপৌরে কৌশলে বিশ্বায়ন-সিক্ত আজকের জাতীয় জীবনের স্বাদে অন্তত রূপান্তরিত করা সম্ভব, তাহলে যেভাবে  অবশ্যম্ভাবী আশ্চর্য হতে হয়, সেইরকমই আশ্চর্য হলাম ২১ ও ২৭ জুন, সান্ধ্য প্রেক্ষাগৃহে, নির্ভার  প্রেক্ষিতে।

সিনেমা মধ্যবিত্ত জীবনে যখন একটা ইন্ডোর আউটিং, একটা মাল্টিপ্লেক্সীয় প্রদর্শন কেবল, তখনও ঘোর-লাগা একটা-দুটো অনাকাঙ্ক্ষিত বিচ্ছিন্ন আনন্দ বা বিস্ময় এসে পড়তে পারে। দুঃসাহসে আমাদের বিলকুল কাৎ করতে পারে। মানে এই সময়েও পারে! এটাই প্রাপ্তি, নাকি অতি প্রাপ্তি, নাকি ভারপ্রাপ্তি, বোঝা মুশকিল হবে বৈকি…হচ্ছেও… কিন্তু আবেশটা কাটানো যাচ্ছে না। তাই মধ্যবিত্ত আশি নব্বই এর দশককেও সিনেমা-হলে কী নিভৃত পদক্ষেপে উত্তরকালের সঙ্গে আসতে দেখলাম।

এই শুরু?

নাকি আবার কোনো না কোনো ডার্ক সিনড্রোম বলিউডি উঞ্ছবৃত্তির নিয়ন্তা হয়ে দাঁড়াবেই! প্রশ্ন এল। এসেছে আগেও। ধারাবাহিক দণ্ডিত হতে হতেও হঠাৎ হঠাৎ ময়লা সরানোর জন্য কুম্ভস্নানের আয়োজন না-করে আত্ম-স্নানের সেলুলডীয় উদ্যোগ দেখে৷ অনেক এই-প্রভাব, সেই দ্বারা প্রভাবিত ইত্যাদি ইত্যাদি পদ-পদান্তর বিশ্লেষণের পরেও এই যাত্রা একটা জ্যান্ত যাত্রা বলেই ভাবতে সাধ জাগল। দীর্ঘ শাস্তি ভোগ করা স্বেচ্ছা-নির্বাসিত দর্শকের পক্ষ থেকেও সেই যাত্রায় সহগমনের বাসনা জেগে উঠবে বলেও মনে হল। তবে সবটাই মনে হওয়া। কারণ, পণ্য-গ্লামার-মুগ্ধ সময়ে সবকিছুই ক্ষণিকের অতিথি। না-হলে আমির খান নামক খর্বাকার মানুষটার প্রতিবারের উদ্ধত দীর্ঘাকার দুঃসাহসকে এত বেঁটে (টিঙ্গু) বানিয়ে দেখাবার রাজনৈতিক প্রাতিষ্ঠানিক স্বতঃস্ফূর্ত তৎপরতা চলে কেন? আমরা রোবটীয় চার্জে আর হাঁপিয়েও উঠি না যে।

সিতারে জমিন পর। না; তারে জমিন পর-এর মতো নয়। ভাবগত সিক্যোয়েলও না। তা আমির যতই ছদ্ম-দাবি করুন না কেন! নামের দিক থেকে ধ্বনিগত রূপগত একটা সংগতি আছে মাত্র। তারে জমিন পর যেখানে ছন্দ-যতি-মাত্রা-লয়ের একটা গাঢ় বন্ধনে বাঁধা, সেখানে সিতারে জমিন পর অনেকটাই আলগা। শিথিল। আটপৌরে।

সিতারে জমিন পর সিনেমার  ফিল্মি মুনশিয়ানায় নির্মাণযোগ্য হওয়ার যে যে ক্ষেত্র ছিল, তা পরিচালক বিশেষ মুনশিয়ানায় এড়িয়ে যেতে পেরেছেন বলেই তার সরলতা অনেকটাই বিরল হতে পেরেছে। আজকের আরবসাগরবাহিত উত্তাল ঢেউ আছড়ে পড়া বলিউডি নোনা সৈকতে। এই সিনেমার প্রচেষ্টায় সাগরকূলস্থিত নোঙর বাঁধন হয়ে ওঠেনি, বাঁধন খুলে ভাসার হাতছানি যেন। পরিচালককে কুর্ণিশ নয় আপাতত, কিন্তু স্বাগত; এটা বলতে অন্তত মন বাধাপ্রাপ্ত হচ্ছে না৷

চিত্রনাট্যের পাতাতেও তরল আবেগ সংশ্লিষ্ট হতে পারত। হওয়াটাই কাঙ্ক্ষিত। তাতে ছায়াচিত্রের কুশীলবের প্রদর্শন আর চোখে মায়াঞ্জনমাখা  দর্শকের মধ্যে আঠালো চলনটাও যুগপৎ আরো ঘনিষ্ঠ হওয়ার সু্যোগ হত। নিঃসন্দেহে। কিন্তু তাতে তৃতীয়পক্ষ যে সমাজদৃষ্টি, তা তৈরি হত বলে মনে হয় না। ডিসলেক্সিয়া যেমন আজ এদেশে অভিভাবক ও শিক্ষকের কাছে একটা প্র‍্যাক্টিস টাস্ক হতে পেরেছে, অটিজম বা ডাউন সিনড্রোমও যে কৃপা-করুণার নয়, তা সম্মানের সম্ভ্রমের, অন্য সবার  মতোই সহযোগিতানির্ভর; এই পথচলার ইচ্ছেটাও নতুন পদক্ষেপের অপেক্ষা পেতে পারল ঠিক এখান থেকেই। মনে হয়৷ (যদি কোনো আত্মীয়তা দুটি সিনেমার মধ্যে থেকে থাকে, তা এখানেই)। কারণ সিনেমায় অভিনীত প্রতিটি চরিত্র নিজেরা নিজেকে কোনো-না-কোনোভাবে ব্যঙ্গ করেছে, সামাজিক কৃপাদৃষ্টির আবর্জনা থেকে নিজেদের পরিচ্ছন্ন রাখার তাগিদে। ফলত সিনেমার মূল চরিত্রাভিনেতা দশজনকে অভিনয়ই করতে হল না, জাস্ট আবর্জনা পরিষ্কার করলেন আবার। ক্যামেরার সামনে। পর্দায়। যা ক্যামেরাহীন পর্দার বাইরে তাদের প্রতিনিয়ত করতে হয়৷ যারা কৃপা চায়ই না, তাদের কৃপা করার ইচ্ছেটাকে মূর্খামি ছাড়া আর কীই-বা বলা যেতে পারে! আর এই কাজটাই, এই কাজটাই, প্রযোজক পরিচালক ও অন্যান্যরা করতে চেয়েছেন৷ চেয়েছেন বলেই পেরেছেন। দর্শক যেন ঠিক সেইভাবেই নিজেকে ‘মূর্খ’ প্রতিপন্ন হতে দেখে, যেভাবে ঠিক গুলশন অরোরা নিজেকে দেখেছেন৷ আসলে সহজ পৃথিবীতে সবকিছুই সরলভাবে প্রকাশিত, শুধু আমরাই হেতুহীনভাবে জটিল, বেমানান। মূর্খ!

এবং আবহ আর গানও তাই  অহেতুক বাণিজ্যিক হয়নি। হয়তো দুর্বলতা থেকেই হতে পারেনি। আবার হয়তো বেশিরকম সিক্যোয়েন্স-নির্ভর হতে পেরেছে বলেই আজকের অভ্যস্ত কানে গ্রাহ্য হতে পারল না। যেমন আন্দাজ আপনা আপনা-র গান। দর্শক মনে পৌঁছাতে বিলম্ব হয়েছে৷ এখানে অবশ্য সেই ভরসা কম।

সিতারেকে জমিন পর নেমে আসতেই হয়। নিজের আলো দেখানোর জন্যই। স্টার সুপারস্টার বলিউডের সিতারে আমির খান তাই যখন সামাজিক রাজনৈতিক কূট-কৌশলী মেঘের আড়ালে নিজেকে আচ্ছন্ন দেখলেন, তখনই মেঘের আড়াল সরিয়ে আবারও নেমে এলেন জমিন পর। জনতার চিন্তা, সচেতনতা, অসচেতনতার ভিতরে। স্টারডামের ছাই সরিয়ে। নগ্নপদে হাঁটলেন। আমাদের ডাকও দিয়ে গেলেন। চোখও। বলিউড আবার দেখল। আবারও ভাবতে চাইল কি কিছু? 

২৮/৬/২০২৫

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!
Scroll to Top