বিজ্ঞানের জয়যাত্রা (৪০০ শব্দে)

                                                                     বিজ্ঞানের জয়যাত্রা 
 
“সুচেতনা, এই পথে আলো জ্বেলে— এ-পথেই পৃথিবীর ক্রমমুক্তি হবে;” 
(জীবনানন্দ দাশ)
 
মানবসভ্যতার ইতিহাস মূলত অন্ধকার থেকে আলোর দিকে মানুষের এক অনন্ত অভিযাত্রার ইতিহাস। সেই অভিযাত্রার সবচেয়ে দীপ্তিমান সহযাত্রী বিজ্ঞান। আগুন আবিষ্কারের মুহূর্ত থেকে শুরু করে মহাকাশে মানুষের পদচিহ্ন—সবখানেই বিজ্ঞানের অবিনাশী উপস্থিতি। বিজ্ঞান কেবল কিছু সূত্র, গবেষণা বা যন্ত্রের নাম নয়; বিজ্ঞান হলো মানুষের জিজ্ঞাসা, যুক্তি এবং অজানাকে জানার অদম্য আকাঙ্ক্ষার আরেক নাম।
 
একসময় মানুষ বজ্রপাতকে দেবতার অভিশাপ ভাবত, মহামারিকে মনে করত অলৌকিক শাস্তি। কিন্তু বিজ্ঞান মানুষের সামনে উন্মোচন করল প্রকৃতির নিয়মের গোপন দ্বার।  গ্যালিলিও গ্যালিলেই দূরবীক্ষণ যন্ত্র হাতে যখন আকাশের দিকে তাকিয়েছিলেন, তখন তিনি শুধু গ্রহ-নক্ষত্র দেখেননি; তিনি মানুষের মুক্তবুদ্ধির নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছিলেন। পরে আইজ্যাক নিউটন মহাকর্ষের সূত্র আবিষ্কার করে যেন প্রমাণ করলেন—প্রকৃতির ভেতরেও আছে গভীর শৃঙ্খলা ও যুক্তি। সেই সত্যই উচ্চারণ করেছিলেন—
“Nature is pleased with simplicity.”
 
বিজ্ঞানের জয়যাত্রা আজ পৃথিবীকে এনে দিয়েছে এক অভূতপূর্ব গতি। চিকিৎসাবিজ্ঞান মানুষের আয়ু বাড়িয়েছে, প্রযুক্তি দূরত্বকে সংকুচিত করেছে, কৃষিবিজ্ঞান খাদ্যসংকট মোকাবিলায় সহায়তা করেছে। পৃথিবীর এক প্রান্তের মানুষ মুহূর্তের মধ্যে অন্য প্রান্তের মানুষের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে। মানুষ এখন শুধু পৃথিবীর ভ্রমণকারী নয়; সে মহাকাশেরও অভিযাত্রী। আলবার্ট আইনস্টাইন যথার্থই বলেছিলেন—
“Imagination is more important than knowledge.”
কারণ কল্পনাই মানুষকে অসম্ভবকে সম্ভব করার সাহস দেয়।
 
তবে বিজ্ঞানের এই দীপ্তির পাশাপাশি রয়েছে ভয়ংকর সম্ভাবনাও। যে বিজ্ঞান জীবনরক্ষাকারী ওষুধ আবিষ্কার করে, সেই বিজ্ঞানই আবার হিরোশিমা-নাগাসাকির ধ্বংস ডেকে আনতে পারে। তাই বিজ্ঞানকে মানবিকতার আলোয় পরিচালিত করা জরুরি। বিজ্ঞান যদি নৈতিকতার স্পর্শ হারায়, তবে সভ্যতা যন্ত্রের উন্নতিতে সমৃদ্ধ হলেও মানবিকতায় দেউলিয়া হয়ে পড়বে।
 
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছিলেন—
“চিত্ত যেথা ভয়শূন্য, উচ্চ যেথা শির।”
বিজ্ঞানের প্রকৃত সার্থকতাও এখানেই—মানুষকে ভয় ও অজ্ঞতার অন্ধকার থেকে মুক্ত করা। বিজ্ঞান কোনো শীতল যান্ত্রিক শক্তি নয়; তা মানুষের মুক্তচিন্তার দীপশিখা। যুগে যুগে সেই আলোই মানুষকে এগিয়ে নিয়ে যাবে নতুন জ্ঞান, নতুন সম্ভাবনা ও নতুন মানবতার দিকে। কারণ বিজ্ঞান যখন বিবেকের সঙ্গে যুক্ত হয়, তখনই তা সভ্যতাকে সত্যিকারের উন্নতির পথে নিয়ে যায়। মানুষের জীবনকে আরও সুন্দর, মুক্ত ও আলোকিত করার মধ্যেই বিজ্ঞানের প্রকৃত জয় নিহিত।
 
 
###ড. অনিশ রায়
 

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!
Scroll to Top