দৈনন্দিন জীবনে বিজ্ঞান
“বিজ্ঞান আমাদের যে শক্তি দিয়েছে, তাকে মানবকল্যাণের পথে ব্যবহার করাই সভ্যতার শ্রেষ্ঠ কর্তব্য।” — সত্যেন্দ্রনাথ বসু
মানুষের দৈনন্দিন জীবন আজ এমনভাবে বিজ্ঞানের সঙ্গে জড়িয়ে গেছে যে বিজ্ঞানকে বাদ দিয়ে আধুনিক জীবন কল্পনাই করা যায় না। ভোরের অ্যালার্ম ঘড়ি থেকে রাতের বৈদ্যুতিক বাতি নিভিয়ে ঘুমিয়ে পড়া পর্যন্ত প্রতিটি মুহূর্তে বিজ্ঞান নীরবে মানুষের সহচর হয়ে থাকে। মানুষের জীবনকে সহজ, দ্রুত ও আরামদায়ক করে তোলার পেছনে বিজ্ঞানের অবদান অপরিসীম।
সকালে ঘুম ভাঙে মোবাইল ফোনের অ্যালার্মে, বিদ্যুতের আলোয় শুরু হয় দিনের কাজ। রান্নাঘরে গ্যাসের চুলা, প্রেসার কুকার, ফ্রিজ কিংবা মাইক্রোওভেন—সবই বিজ্ঞানের দান। একসময় যে কাজ করতে মানুষের ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় লাগত, প্রযুক্তির সাহায্যে আজ তা কয়েক মিনিটেই সম্পন্ন হয়। বিজ্ঞান যেন মানুষের শ্রমকে হালকা করে জীবনে এনে দিয়েছে গতি ও স্বাচ্ছন্দ্য।
যোগাযোগ ব্যবস্থায় বিজ্ঞানের অবদান সবচেয়ে বিস্ময়কর। পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে মুহূর্তের মধ্যে খবর পৌঁছে যাচ্ছে। মোবাইল ফোন, ইন্টারনেট, ভিডিও কল—এসব আজ মানুষের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। আলেকজান্ডার গ্রাহাম বেলের টেলিফোন আবিষ্কার মানুষের দূরত্বকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করেছিল; আজ সেই আবিষ্কারের ধারাবাহিকতায় পৃথিবী যেন একটি ক্ষুদ্র গ্রামে পরিণত হয়েছে।
চিকিৎসাক্ষেত্রে বিজ্ঞানের অবদান মানবসভ্যতার এক মহান আশীর্বাদ। একসময় যে রোগে লক্ষ লক্ষ মানুষ প্রাণ হারাত, আজ সেই রোগের প্রতিষেধক আবিষ্কৃত হয়েছে। এক্স-রে, আল্ট্রাসোনোগ্রাফি, এমআরআই কিংবা আধুনিক অস্ত্রোপচার—এসব মানুষের জীবনরক্ষায় নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে। লুই পাস্তুরের জীবাণুতত্ত্ব মানবজাতিকে রোগ প্রতিরোধের নতুন পথ দেখিয়েছিল।
কৃষিক্ষেত্রেও বিজ্ঞানের অবদান অনস্বীকার্য। উন্নত বীজ, সেচব্যবস্থা ও আধুনিক কৃষিযন্ত্র কৃষিকে করেছে অধিক ফলনশীল। ফলে খাদ্যসংকট অনেকাংশে কমেছে। শিল্প ও পরিবহন ব্যবস্থায় বিজ্ঞান মানুষের সময় ও শক্তি সাশ্রয় করেছে। ট্রেন, বিমান, মোটরগাড়ি আজ মানুষের জীবনকে গতিশীল করে তুলেছে।
তবে বিজ্ঞানের অপব্যবহার মানবসভ্যতার জন্য বিপজ্জনক হতে পারে। পারমাণবিক অস্ত্র, দূষণ কিংবা প্রযুক্তিনির্ভর মানসিক বিচ্ছিন্নতা আজ মানুষের সামনে নতুন সংকট সৃষ্টি করছে। তাই বিজ্ঞানের সঙ্গে মানবিক মূল্যবোধের সমন্বয় জরুরি।
রবীন্দ্রনাথের কথায়— “মানুষের মাঝে আমি বাঁচিবারে চাই”।
বিজ্ঞানের প্রকৃত সার্থকতাও এখানেই—মানুষের জীবনকে আরও সুন্দর, নিরাপদ ও অর্থবহ করে তোলা। বিজ্ঞান কেবল যন্ত্রের উৎকর্ষ নয়; এটি মানুষের বুদ্ধি, কল্পনা ও সভ্যতার ক্রমবিকাশের প্রতীক। প্রতিদিনের জীবনে তার নীরব উপস্থিতি আমাদের চলার পথকে সহজতর করে, চিন্তাকে প্রসারিত করে এবং ভবিষ্যতের প্রতি নতুন আশাবাদ জাগিয়ে তোলে। তাই মানবকল্যাণের আলোয় পরিচালিত বিজ্ঞানই পারে পৃথিবীকে আরও উন্নত ও মানবিক করে তুলতে।
###ড. অনিশ রায়

