শিক্ষক দিবস পালন এবার থেকে বাদই থাক। কথাটি অসংযত শোনাক, ইচ্ছাকৃতভাবেই চাইলাম। কারণ কখনও কখনও কোনো সমাজের গভীর অসংগতিকে বোঝাতে সংযত ভাষা যথেষ্ট উপযুক্ত হয় না। কোনো প্রচলিত আচারকে তার নিজের আয়নার সামনে দাঁড় করিয়ে দিতে হয়। যে সমাজে শিক্ষককে অপমান করা ক্রমশ সহজ হয়ে উঠছে, যে সমাজে শিক্ষকের প্রতি অবমাননা, সন্দেহ, আক্রমণ ও হেনস্থার জন্য খুব বেশি সামাজিক বা নৈতিক মূল্য দিতে হয় না— সেই সমাজ বছরে কোনো বিশেষ দিন ফুল, মালা, উত্তরীয়, বক্তৃতা ও সংবর্ধনার আয়োজন করে শিক্ষককে সম্মান জানালে সেই দৃশ্য আমার কাছে আর মহৎ বলে মনে হয় না; বরং তার ভিতরে এক ধরনের সাংস্কৃতিক অপচয় বা সংস্কৃতির অসংলগ্নতায় এক বিরাট প্রহসন দেখতে পাই। কারণ সম্মান বিষয়টা কোনো উৎসবসুলভ নয়। সম্মান প্রদর্শন হলো সামাজিক অভ্যাস। এবং কোনো সমাজের সত্যিকারের শিক্ষক-সম্মান ৫ সেপ্টেম্বরের মঞ্চে কী বলা হচ্ছে তা দিয়ে বোঝা যায় না। বোঝা যায়— প্রতি ক্যালেন্ডার বর্ষে ৬ সেপ্টেম্বর থেকে পরের ৩৬৪ দিন একজন শিক্ষককে কীভাবে দেখা হচ্ছে, তার ভিত্তিতে।
শিক্ষক সমাজকে আমি কোনো পবিত্র, নিষ্পাপ বা ভুলের ঊর্ধ্বে থাকা সম্প্রদায় বলে মনে করি না। বরং শিক্ষক-সমাজের ভিতরের অবক্ষয় সম্পর্কে যথেষ্ট সচেতন বলেই কথাগুলি বলতে পারছি। এখন শিক্ষকদের শিক্ষাভাবনা কমেছে, পড়াশোনার অভ্যাস কমেছে, নিজের বিষয়কে গভীরভাবে জানার তাগিদ কমেছে, আত্মসমালোচনার ক্ষমতা ক্ষীণ হয়েছে— বেশিরভাগ ক্ষেত্রে তো শিক্ষকদের মধ্যে সম্পদ, প্রোপার্টি, আর্থিক বেনিফিট, চাকরির নিরাপত্তা, উত্তর প্রজন্মের সুযোগ-সুবিধা, স্বার্থভিত্তিক সংগঠন, ভ্রমণশিল্পের পরিবর্তে ট্যুরিজিম ম্যানেজমেন্ট-নির্ভর ফাংশনালিটির এলিট আত্মপ্রসাদ, দুর্নীতির সঙ্গে আপস, দাবি ও সেই সুবিধাজনক দাবির দিবারাত্র ভজনাই শিক্ষাভাবনার তুলনায় বেশি দৃশ্যমান হয়ে উঠছে। আসলে শিক্ষকও তো শেষপর্যন্ত সমাজেরই মানুষ; ফলে বৃহত্তর সমাজে যে ভোগবাদ, নিরাপত্তার আকাঙ্ক্ষা, সম্পত্তিচেতনা ও সুবিধাভোগের সংস্কৃতি কাজ করে, শিক্ষক তার বাইরে কোনো অলৌকিক স্বকীয় অবস্থানে নিজেকে অন্তরীণ রাখতে পারছেন না। অক্ষমতা বা অনিচ্ছাতেই পারছেন না। তাই আগের তুলনায় ক্রমপর্যায়ে তাঁরও লোভ বেড়েছে। দুর্বলতা অনেক দেখা যাচ্ছে। অযোগ্যতাও বেশ দৃশ্যমান। হয়তো অন্যায় করার প্রবণতাও সমানুপাতিক ভাবে বাড়ছে। কিন্তু মানুষের অসম্পূর্ণতা কখনও মানুষের অপমানের লাইসেন্স হতে পারে না। এবং এই সহজ সত্যই কিন্তু আমরা ক্রমশ ভুলে যাচ্ছি। এতদিনে প্রায় ভুলেই গেছি।
সতেরো বছরের স্কুল-শিক্ষকতা এবং তার আগে দীর্ঘকাল গৃহশিক্ষকতার অভিজ্ঞতা থেকে বলছি— শিক্ষকতার ভিতরে যত অন্ধকারই থাক, শিক্ষাদানের কাজের ভিতরে এখনও এমন এক মানবিক দায়িত্ব আছে, যার কোনো বিকল্প আজ পর্যন্ত তৈরি হয়নি। কোনো শিশু বা কিশোর-কিশোরী বা তরুণ-তরুণীর সামনে দাঁড়িয়ে তাকে শুধু তথ্য দেওয়া নয়, তার প্রশ্নকে গুরুত্ব দেওয়া, তার ভুলভ্রান্তিকে সহনশীলতায় মানিয়ে নেওয়া, তার ভাষাকে সম্ভাব্য প্রসারিত করা, তার কল্পনার ভিতরে কোনো নতুন দরজা খুলে দেওয়া, তাকে এমন সব প্রশ্নের সামনে দাঁড় করানো যার উত্তর বইতে লেখা নেই, থাকে না, তা ব্যক্তিবিশেষের বৌদ্ধিক উপলব্ধিজাত—এই কাজগুলির কোনোটিই বাজারের সুলভ পণ্য নয়। শিক্ষককে তাই দেবতা করার প্রয়োজন নেই; কিন্তু শিক্ষককে কেবল বেতনভোগী কর্মচারী বানিয়ে ফেলাও সভ্যতার পক্ষে বিপজ্জনক সরলীকরণ।
বাংলার ইতিহাসের দিকে তাকালে বর্তমান অবস্থা আরও অস্বস্তিকর হয়ে ওঠে। বাংলায় আধুনিক শিক্ষার ইতিহাস কেবল বিদ্যালয় স্থাপনের ভিতর সীমায়িত ছিল না, বরং মানুষ ও মনুষ্যত্ব নির্মাণের ইতিহাস হয়ে উঠতে চেয়েছিল; যে বাংলায় বিদ্যাসাগর শিক্ষা, ভাষা, নারী-মুক্তিচেতনা, সামাজিক সংস্কার ও মানবিক মর্যাদাকে একই বৃহত্তর বৌদ্ধিক প্রকল্পের মধ্যে দেখতে পেরেছিলেন; যে বাংলায় শিক্ষার সঙ্গে আত্মমর্যাদা, যুক্তিবোধ ও সামাজিক পরিবর্তনের সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল; যে বাংলায় রবীন্দ্রনাথ বিদ্যালয়কে কেবল পরীক্ষার কারখানা না ভেবে মানুষের সঙ্গে প্রকৃতি, জ্ঞান ও সৃষ্টিশীলতার সম্পর্ক পুনর্গঠনের জায়গা হিসেবে কল্পনা করেছিলেন—সেই বাংলার সাংস্কৃতিক স্মৃতির সঙ্গে আজকের শিক্ষকের আপাত এবং প্রকৃত সামাজিক সংস্ক্রিয়ার যে দৃশ্য প্রকট হয়ে উঠেছে, তার বৈপরীত্য গভীর।
এখানে এই তুলনা কেবল অতীতের সঙ্গে বর্তমানের নয়; বরং সাংস্কৃতিক সভ্যতা-চেতনা ও মানবিক মূল্যবোধের তুলনা। একদিকে এমন এক ধারণা, যেখানে শিক্ষক জ্ঞান-প্রদানের পাশাপাশি সমাজের নৈতিক ও বৌদ্ধিক ভবিষ্যৎ নির্মাণের অংশীদার; অন্যদিকে এমন ধারণা, যেখানে শিক্ষক শেষপর্যন্ত সেবাপ্রদানকারী, অভিযোগ গ্রহণকারী, জনরোষের সহজ লক্ষ্য এবং প্রশাসনিক ব্যবস্থার এক নমনীয় খুঁটি। প্রথম ধারণায় শিক্ষককে প্রশ্ন করা যায়, বিরোধিতা করা যায়, তাঁর ভুল ধরিয়ে দেওয়া যায়—কিন্তু তাঁর নিতান্ত মানুষ হয়ে বাঁচার সাম্মানিক ধারণা অস্বীকার করা যায় না। দ্বিতীয় ধারণায় তাঁর পেশাগত ভূমিকা যত বেশি জনসেবার সঙ্গে যুক্ত, তাঁকে অপমান করার সামাজিক অনুমতিও যেন তত সহজ হয়ে ওঠে।
পশ্চিমবঙ্গের গত দেড়-দুই দশকের অভিজ্ঞতা এই পরিবর্তনকে খুব কাছ থেকে দেখিয়েছে। শিক্ষক নিয়োগের দুর্নীতি, নিয়োগ-প্রক্রিয়ার অসংগতি, আদালতের রায়, চাকরি হারানো, আন্দোলন, প্রশাসনিক সংঘাত—সবকিছুর বিচার হওয়া প্রয়োজন। দুর্নীতি হয়ে থাকলে তার বিচার হবে, অন্যায় নিয়োগ হয়ে থাকলে তা বাতিল হবে, অপরাধ প্রমাণিত হলে শাস্তি হবে—আইনের জায়গায় কোনো আপস নেই। কিন্তু ন্যায়বিচারের সঙ্গে শিক্ষকবিদ্বেষকে এক করে ফেলা যায় না। একজন শিক্ষক অন্যায় করেছেন বলে শিক্ষক নামের সমগ্র পেশাকে অপমানযোগ্য করে তোলা যেমন যুক্তিহীন, তেমনই শিক্ষক বলে কোনো ব্যক্তিকে আইনের ঊর্ধ্বে রাখা আরও অযৌক্তিক। সভ্যতার লক্ষণ এখানেই—সে অপরাধ ও অপরাধীকে বিচার করে, কিন্তু কোনো পেশার মানুষকে তার মানুষ হয়ে বাঁচার সাধারণ সামাজিক সম্মান থেকে বঞ্চিত করে না।
এই পার্থক্য আজ বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ শিক্ষকের বিরুদ্ধে অভিযোগ এখন কেবল প্রশাসনিক বা প্রাতিষ্ঠানিক পরিসরে সীমাবদ্ধ থাকে না; তা খুব দ্রুত সামাজিক অপমানের উপাদানে পরিণত হয়। একজন শিক্ষক ভুল করলেন—তাঁকে প্রশ্ন করা যেত। তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠল—তদন্ত হতে পারত। তিনি অপরাধ করলেন—আইন বিচার করতে পারত। কিন্তু তার বদলে ক্রমশ এমন এক জনমনস্তত্ত্ব তৈরি হচ্ছে যেখানে শিক্ষককে আক্রমণ করা তুলনামূলকভাবে নিরাপদ। যে মানুষ পুলিশকে আক্রমণ করার আগে দুবার ভাববে, বিচারব্যবস্থার সামনে দাঁড়িয়ে সংযত হবে, প্রশাসনিক ক্ষমতার সঙ্গে সংঘাতে নিজের সীমা বুঝে কেটে পড়বে— সেই মানুষই কখনও কখনও শিক্ষকের সামনে এসে নিজের সমস্ত ক্ষোভের অধিকার আবিষ্কার করে ফেলে। আর উলটো দিকে যেন শিক্ষক হওয়ার অর্থই হল—তোমার ওপর অন্যায় হলেও তুমি প্রতিবাদ করবে না; কারণ প্রতিবাদ করলে তোমার ‘শিক্ষকসুলভ মর্যাদাপূর্ণ আচরণ’ নষ্ট হবে। এই জায়গাই সবচেয়ে ভয়ংকর।
কারণ তখন সমাজের ভিতরে এক অদ্ভুত নৈতিক চুক্তি তৈরি হয়—আক্রমণকারীর স্বাধীনতা থাকবে, আক্রান্তের থাকবে নীরবতার কর্তব্য। শিক্ষক বলে তিনি পালটা অপমান করতে পারবেন না, শিক্ষক বলে তাঁকে সহ্য করতে হবে, শিক্ষক বলে তাঁকে ক্ষমা করতে হবে, শিক্ষক বলে তাঁকে উচ্চতর নৈতিকতার প্রমাণ দিতে হবে। অর্থাৎ যে মানুষ অপমানিত হলেন, তাঁর কাছ থেকেই আবার মহত্ত্বের পরীক্ষাও নেওয়া হল।
তারপর আসে ক্ষমার অভিনয়। একটি ঘটনা ঘটে। শিক্ষক অপমানিত হন। প্রতিবাদ হয়। কদাচ জনরোষ তৈরি হয়। তারপর অভিযুক্ত ব্যক্তি ক্ষমা চান। আবেগপূর্ণ কিছু অতি ব্যবহৃত বাক্য উচ্চারিত হয়—‘ভুল হয়ে গেছে’, ‘শিক্ষকদের আমরা সম্মান করি’, ‘ক্ষমা মহান গুণ’, ‘শিক্ষকরা জাতির নির্মাতা’। তারপর পর্দা নামে। শিক্ষককে বলা হয়, এবার ক্ষমা করে দিন। তিনি ক্ষমা করেন। কারণ তিনি শিক্ষক। তাঁর কাছ থেকে সমাজ যেন ক্ষমার একটি অতিরিক্ত ট্যাক্স আদায় করে নেয়। খুব সুচারু কৌশলে৷
কিন্তু ক্ষমা কি সবসময় মহত্ত্ব? ক্ষমা তখনই নৈতিক শক্তি হয়, যখন তার ভিতরে স্বাধীনতা থাকে—অর্থাৎ আমি চাইলে ক্ষমা না-ও করতে পারতাম, তবু ক্ষমা করলাম। কিন্তু যদি সামাজিক চাপ, পেশাগত অবস্থান, নৈতিকতার অভিনয় এবং ‘শিক্ষকের মতো আচরণ করার’ বাধ্যবাধকতা আমাকে ক্ষমা করতে বাধ্য করে, তবে সেখানে ক্ষমা কতখানি স্বাধীন? এবং যে অপরাধী নিজের আচরণের নৈতিক পরিণতি অনুভব না-করেই কেবল অভ্যস্ত নাটকীয় ক্ষমাপ্রার্থনার মাধ্যমে সামাজিক মুক্তি পেয়ে যায়, সেখানে ক্ষমা কি অপরাধের পুনরাবৃত্তিকে আরও সহজ করে দেয় না?
একটি ঘটনা আরেকটি ঘটনাকে ভুলিয়ে দেয়। তারপর তৃতীয় ঘটনা দ্বিতীয়টিকে। ক্রমে আমরা ঘটনাগুলিকে আর ধারাক্রম হিসেবে দেখি না; দেখি বিচ্ছিন্ন সংবাদ হিসেবে। আজকের অপমান আগামিকালের খবরের নিচে চাপা পড়ে যায়। আর পরশুদিন নতুন কোনো অপমান এসে গতকালের খবরকে সরিয়ে দেয়। এইভাবে সমাজের স্মৃতি ক্ষীণ হয়, কিন্তু অপমানের সংস্কৃতি শক্তিশালী ও বিস্তৃত হতে থাকে।
অপমানের সবচেয়ে ভয়ংকর রূপ অপমানের তীব্রতা কিন্তু নয়— অপমানের ব্যবস্থাপনার-ই স্বাভাবিক হয়ে যাওয়া। দু-দশক আগে যে দৃশ্য কল্পনাও করা যেত না, আজ তা নিয়ে আমরা খুব বেশি বিস্মিত হই না। ‘আবার একজন শিক্ষক আক্রান্ত’—এই বাক্য ধীরে ধীরে সংবাদ নয়, প্রায় এক জাতীয় সংবাদ-প্রকরণ হয়ে উঠতে পারে। আর যেদিন কোনো অন্যায় আমাদের বিস্মিত করে না বা করবে না, সেদিন ‘অন্যায়’ আর অন্যায়কারী তার সবচেয়ে বড়ো সামাজিক বিজয় অর্জন করে ফেলবে। ইতিমধ্যে সেই বিজয় অর্জন করে ফেলেছে।
পশ্চিমবঙ্গের শিক্ষা-সংস্কৃতির দীর্ঘ ইতিহাসের সঙ্গে এই পরিবর্তন তাই কেবল কোনো প্রশাসনিক বা পেশাগত সমস্যা হয়ে নেই; তা সম্পূর্ণত সাংস্কৃতিক বিপর্যয়কে ঘনীভূত করে ফেলেছে। কারণ কোনো সমাজ তার শিক্ষককে কীভাবে দেখে, তার ভিতর দিয়ে সমাজ নিজের জ্ঞান, ভবিষ্যৎ এবং মানবিকতার ধারণাকেই প্রকাশ করে। শিক্ষককে যদি আমরা ক্রমাগত সন্দেহের, উপহাসের, অপমানের ও আক্রমণের সহজ লক্ষ্য বানাই, তবে আসলে আমরা জ্ঞানকে নয়, জ্ঞানবাহক মানুষকেই অবমূল্যায়ন করছি— সেই ধারণাকে ধারণ করার ক্ষমতাই যেন আর থাকছে না। আর জ্ঞানকে অবমূল্যায়ন করা কোনো সমাজ দীর্ঘদিন তার সভ্যতার ভিত অক্ষুণ্ণ রাখতে পারে না। ইতিহাস সে কথাই জানায়।
বিশ্বের নানা সমাজে শিক্ষকের মর্যাদা নিয়ে ধারণা এক নয়। জাপানে শিক্ষকতা দীর্ঘদিন সামাজিক দায়িত্ব ও পেশাগত মর্যাদার এক বিশেষ অবস্থান ধরে রেখেছে; ফিনল্যান্ডে শিক্ষক হওয়ার জন্য উচ্চমাত্রার একাডেমিক প্রস্তুতি ও পেশাগত স্বাধীনতার ওপর জোর দেওয়া হয়; ফ্রান্সে শিক্ষক রাষ্ট্রীয় শিক্ষাব্যবস্থার সর্বোচ্চ গুরুত্বপূর্ণ বৌদ্ধিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিবেচিত; আবার আমেরিকান শিক্ষাব্যবস্থায় শিক্ষককে একইসঙ্গে সম্মান, বাজারচাপ, প্রশাসনিক মূল্যায়ন এবং জনমতের প্রবল চাপের মধ্যে কাজ করতে হয়। কোথাও শিক্ষক দেবতা নন, কোথাও শিক্ষককে প্রশ্নের ঊর্ধ্বে রাখা হয় না। কিন্তু সুস্থ শিক্ষাব্যবস্থা অন্তত এই কথা বোঝে—শিক্ষককে জবাবদিহির মধ্যে রাখা এবং শিক্ষককে অপমান করা এক জিনিস নয়। এই পার্থক্যই আমাদের নতুন করে শিখতে হবে। কারণ প্রশ্নহীন সম্মান যেমন শিক্ষার শত্রু, তেমনই সম্মানহীন প্রশ্নও শিক্ষার শত্রু।
একজন শিক্ষককে প্রশ্ন করা মানে তাঁর মর্যাদা নষ্ট করা নয়। বরং প্রকৃত শিক্ষকতাকে সম্মান করার সবচেয়ে বড়ো উপায় হল তাঁকে প্রশ্ন করার অধিকার বজায় রাখা। কিন্তু প্রশ্নের সঙ্গে অবমাননা মিশে গেলে জ্ঞানচর্চা ধ্বংস হয়। যে ছাত্র শিক্ষককে প্রশ্ন করতে পারে, কিন্তু শিক্ষককে অপমান করার অধিকার নিজের বলে মনে করে না, সেই ছাত্রই শিক্ষার অর্থ বুঝতে শুরু করেছে। যে অভিভাবক শিক্ষকের ভুল নিয়ে দৃঢ়ভাবে কথা বলতে পারেন, কিন্তু তাঁকে জনসমক্ষে অপমান করেন না, তিনিই প্রকৃত অর্থে নিজের সন্তানের শিক্ষার পরিবেশ রক্ষা করেন।
এই জায়গাতেই আমার নিজের শিক্ষকতার অভিজ্ঞতা থেকে আরেকটি কথা বলার আছে। আমার ছাত্রছাত্রীদের আমি প্রণাম করতে দিই না। কারণ পড়ালেই সবাই শিক্ষক হয় না। আর গুরুজন মানেই শ্রদ্ধাভাজন নয়। প্রণাম কোনো সামাজিক কর্তব্য নয়, কোনো প্রতিষ্ঠানের পদমর্যাদার আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতিও নয়। প্রণাম এমন একজন মানুষকে করতে হয়, যার সামনে নিজের মাথা নিজের ভিতরের কোনো অজ্ঞাত স্রোতে নত হয়ে আসে।
ছাত্র বড়ো হবে। তার জীবনে আরও অনেক শিক্ষক আসবেন। কেউ তাকে ভাষা শেখাবেন, কেউ অঙ্ক, কেউ বিজ্ঞান, কেউ ইতিহাস; কেউ হয়তো কোনো বিকেলে তার বিশেষ প্রশ্নকে এত গুরুত্ব দিয়ে শুনবেন যে সেই মুহূর্তটি বহুবছর পরে তার মনে থাকবে। জীবনের আরও অনেক পরে, যখন সে নিজের চিন্তার ঘরবাড়ি চৌকাঠের দিকে ফিরে তাকাবে, তখন যদি মনে হয়—এই মানুষটি আমার চেতনার জগৎ নির্মাণে কোথাও সেই বন্ধ দরজা খুলে দিয়েছিলেন, তখন যদি সেই মানুষটির জন্য তার ভিতর থেকে শ্রদ্ধা জেগে ওঠে, এবং সে নিজের ইচ্ছায় এসে প্রণাম করতে চায়—সেই প্রণামই শিক্ষকতার প্রকৃত পুরস্কার। তার জন্য কোনো শিক্ষক দিবসের প্রয়োজন নেই।
আবার শিক্ষক দিবসের সবচেয়ে অস্বস্তিকর দৃশ্যগুলির একটি হলো শিক্ষকদের দ্বারা শিক্ষকদের সংবর্ধনা। কখনও কখনও সেখানে এমন এক আত্মপ্রচারী মনস্তত্ত্ব কাজ করে যে মনে হয়—‘দ্যাখো, আমি গুণবান; দ্যাখো, আমি মহান; আমাকে মূল্য দাও।’ কিন্তু সত্যিকারের শিক্ষকতা তো নিজের মহত্ত্বের বিজ্ঞাপন নয়। একজন শিক্ষক যত সত্যিকারের শিক্ষক হন, তাঁর সবচেয়ে বড়ো সাফল্য ততই তাঁর নিজের আড়াল হয়ে যাওয়ার মধ্য দিয়ে সংঘটিত হয়। তিনি ছাত্রের ভিতরে এমন কিছু জ্বেলে দেন, যা পরে ছাত্র নিজের আলো বলে চিনতে শেখে। শিক্ষক আসলে প্রদীপ নন, প্রদীপ জ্বালানোর মানুষ। আলো জ্বলে উঠলে প্রদীপের দিকে বা প্রজ্জ্বলকারী ব্যক্তির দিকে আর তাকিয়ে থাকতে হয় না। আলোটুকুই তখন সম্পদ।
এই কারণেই শিক্ষক দিবসের আড়ম্বর আমাকে কখনও কখনও অস্বস্তিতে ফেলে। যে সমাজে শিক্ষককে সারা বছর অবমাননার জন্য সহজলভ্য মনে করা হয়, সেই সমাজের একদিনের সংবর্ধনা যেন অনেক সময় হয়ে ওঠে অপমানের ওপর বেমানান পালিশ মাত্র। যে মানুষকে আমরা প্রতিদিন সম্মান করি না, তাকে নির্দিষ্ট দিনে সম্মান করার আয়োজন আসলে আমাদের নিজের বিবেককেই কৃত্রিম সাজে অচেনা করে তোলে। এ বড়োই বিড়ম্বনা। সম্মান দেখানোর চেয়ে সম্মানযোগ্য আচরণ করা কঠিন। মালা পরানো সহজ; অপমানের মুহূর্তে পাশে দাঁড়ানো কঠিন। ‘শিক্ষক জাতির নির্মাতা’ বলা সহজ; শিক্ষকের ন্যায্য মর্যাদা রক্ষা করা কঠিন। ‘গুরুজনকে শ্রদ্ধা করো’ বলা সহজ; গুরুজনের ভুল হলে ন্যায়সংগতভাবে তাঁর সমালোচনা করা এবং একইসঙ্গে তাঁর মানবিক মর্যাদা অক্ষুণ্ণ রাখা কঠিন। আর জাতীয় সংস্কৃতি আসলে সেই কঠিন কাজেরই প্রতিবিম্ব।
তাই আমার আপত্তি শিক্ষক দিবসের অস্তিত্বগত পালনে যত না, তার চেয়ে অনেক বেশি সেই সামাজিক বাস্তবতায়— যে বাস্তবতা শিক্ষক দিবসকে একদিকে প্রয়োজনীয় করে তোলে, অন্যদিকে তার প্রয়োজনীয়তাকেই ব্যঙ্গ করে। আমি এমন এক সমাজ চাই না যেখানে শিক্ষককে সারা বছর অপমান করা যাবে, তাঁর আত্মসম্মানকে ক্ষতবিক্ষত করা যাবে, তাঁর পেশাকে অবিশ্বাসের মধ্যে ঠেলে দেওয়া যাবে, আর ৫ সেপ্টেম্বর তাঁকে মঞ্চে বসিয়ে বলা হবে—‘আপনারাই জাতির ভবিষ্যৎ নির্মাতা।’ বরং এমন সমাজ চাই যেখানে শিক্ষককে মহান বলার প্রয়োজনই নেই। তাঁকে কেবল একজন মর্যাদাসম্পন্ন মানুষ হিসেবে দেখলেই হবে। তিনি ভুল করলে তাঁকে প্রশ্ন করা হবে। অন্যায় করলে শাস্তি হবে। অযোগ্য হলে জবাবদিহি হবে। কিন্তু তাঁকে অপমান করার অধিকার কারও থাকবে না। তাই শিক্ষককে দেবতা না বানিয়েও তাঁকে সম্মান করা যায়। বরং দেবত্বের বোঝা থেকে শিক্ষককে মুক্ত করেই তাঁর প্রকৃত মানবিক মর্যাদা ফিরিয়ে দেওয়া সম্ভব।
আর শিক্ষক নিজেও যেন মনে রাখেন—ক্ষমা আত্মশক্তির লক্ষণ হতে পারে, কিন্তু আত্মসমর্পণ যেন না হয়; বিনয় মহত্ত্ব হতে পারে, কিন্তু আত্মবিলোপ যেন না ঘটে; নীরবতা কখনও প্রজ্ঞা হতে পারে, কিন্তু সব নীরবতা মর্যাদা নয়। কোনো কোনো মুহূর্তে নিজের অপমানের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোই হয়তো শিক্ষকের শেষ ও সর্বোচ্চ দায়—নিজের ছাত্রছাত্রীদের উদ্দেশে, নিজের সমাজের উদ্দেশে, এমনকি নিজের কাছেও। কারণ যে শিক্ষক নিজের আত্মমর্যাদা রক্ষা করতে পারেন না, তিনি শেষপর্যন্ত আত্মসত্তাও হারিয়ে ফেলতে বাধ্য হবেন। শিক্ষা তো শেষপর্যন্ত মানুষকে মাথা নত করা শেখায় না; কোথায় মাথা নত করতে হয় এবং কোথায় মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে হয়, সেই পার্থক্যই শেখায়। সেই জন্যই হয়তো শিক্ষক দিবসে ফুলের চেয়ে একটু নীরব উপলব্ধি বেশি প্রয়োজন।
মঞ্চের চেয়ে, সংবর্ধনার চেয়ে তাই সম্ভবত সামাজিক সংকোচ বেশি প্রয়োজন—আমি কি একজন শিক্ষককে অপমান করার অধিকার সত্যিই অর্জন করেছি? যে সমাজ এই প্রশ্ন করতে শেখে, সেই সমাজের শিক্ষক দিবস অর্থপূর্ণ হতে পারে। যে সমাজ এই প্রশ্ন করতে ভুলে যায়, তার শিক্ষক দিবস যত জাঁকজমকপূর্ণ হয়, প্রহসনও তত জমকালো হয়ে ওঠে। কারণ সম্মান কোনো দিনের অর্ঘ্য নয়। সম্মান হল মানুষের প্রতি মানুষের বিশেষ ভাবগত ও আদর্শনির্ভর সীমারেখা—আমি তোমার সঙ্গে মতবিরোধ করব, তোমার ভুল ধরব, তোমার অন্যায়ের বিচার চাইব, প্রয়োজনে তোমার বিরুদ্ধে দাঁড়াব; কিন্তু তোমাকে মানুষ হিসেবে অপমান করার অধিকার আমি নিজের হাতে তুলে নেব না। শিক্ষকের জন্য এর চেয়ে বড়ো শিক্ষক দিবস আর কিছু হতে পারে বলে মনে করি না।
আর যদি সেই ন্যূনতম সভ্যতার পাঠটুকুও আমাদের সমাজে অবশিষ্ট না-থাকে, তবে সত্যিই—শিক্ষক দিবস পালন না-হয় এবার থেকে বাদই থাক। ফুলের বদলে সেদিন অন্তত আমাদের সর্বাঙ্গে লজ্জার ভূষণ উজ্জ্বল হয়ে উঠুক। সভ্য জাতির অসভ্যতার লজ্জা।
অনিশ রায়

