জনতাগভীর নির্জনতা : তিমির, নগর ও ইতিহাসের অন্তর্লিখন

১৫/০২/২৬ তারিখে রবিবাসরীয়তে সঞ্জয় মুখোপাধ্যায়-এর ‘জনতাগভীর নির্জনতা’ নাম-চিহ্নিত লেখার প্রতি বিশেষ নিবেদন

নিবেদনে- অনিশ রায়

জনতাগভীর নির্জনতা : তিমির, নগর ও ইতিহাসের অন্তর্লিখন

জীবনানন্দ দাশকে আমরা দীর্ঘকাল এক ধরনের নরম আলোর মধ্যে বসিয়ে রেখেছি। হেমন্তসন্ধ্যার অবসাদ, শালিকের ডানায় ভেজা জল, কলমিলতার নিঃশব্দ সঞ্চার, দূরবর্তী কেশবতী কন্যার মুখ— এইসব ইমেজে তাঁকে অলংকৃত করে আমরা নিশ্চিত হয়েছি যে তিনি বিপজ্জনক নন। তিনি নির্জন। নির্জন, অতএব নিরাপদ। ইতিহাসের রক্তপাত থেকে অব্যাহতি। তিনি বড়োজোর  লিরিকের শত জলঝর্ণার উপলভূমি।

এই পাঠ আমাদের আত্মরক্ষা। এবং একই সঙ্গে সংস্কারাচ্ছন্ন অলসতা।

বস্তুত জীবনানন্দ আধুনিকতার শল্যচিকিৎসক— যিনি অন্ধকারের স্তনচ্ছায়া সরিয়ে নগরের ক্ষতচিহ্ন দেখাতে চান। সঞ্জয়বাবু এ পথেই  সমালোচনা-সুলভ সিদ্ধান্তের পাহাড়া ভাঙেন৷ তিনি জীবনানন্দকে পড়েন নির্জনতার এক অন্তর্গত পাঠ হিসেবে।
কারণ জীবনানন্দের নির্জনতা কোনও অবকাশ নয়; তা সংক্রমণ। জনতার গভীরে দাঁড়িয়ে নিজের সত্তাকে প্রত্যাহার করার এক কঠিন অনুশীলন। নিজেরই মুদ্রাদোষ। তিনি ভিড়ের অংশ, কিন্তু ভিড়ের অন্তর্গত নন। তিনি দৃশ্যমানতার মধ্যে আড়াল নিয়ে থাকেন— অথচ ভিড়কে নিবন্ধন করেন। জনতার মাঝখানে নির্জনতার এই প্র‍্যাক্টিস পলায়ন নয় একেবারেই, বরং বিপজ্জনকভাবে জড়িয়ে থাকা। অধিক সংযোগের স্বতন্ত্র অবস্থান, সক্রিয় নির্বাচন করার মতো কালিক ও স্থানিক ব্যবধান।   তাঁর কবিতা প্রকৃতপক্ষে এক নথি— রাতের গ্যাসলাইটের নিচে, চায়ের ক্যান্টিনের টেবিলে, রাজাবাজারের ঘামে, নিমতলার ছাইয়ে, ফিয়ার্স লেনের অনিশ্চয়তায়। নির্জনতা এখানে সামাজিক প্রত্যাহার নয়; এক বিশেষ দৃষ্টি-প্রযুক্তি।

দেশপ্রিয় পার্কের ট্রামলাইনকে যদি আমরা কেবল দুর্ঘটনার রেখা ভাবি, তবে জীবনানন্দকে অর্ধেক পড়ি। সেই ট্রাম নিয়তির যন্ত্র নয় মাত্র; ইতিহাসের যান। আধুনিকতার আত্মঘাতী গতি সেখানে এক মুহূর্তে দৃশ্যমান। ব্যক্তিগত মৃত্যু, সাংস্কৃতিক নিরাশ্রয়, সভ্যতার ক্লান্তি— একই বিন্দুতে এসে মিলিত হয়। জীবনানন্দ দুর্ঘটনার ছলনায় মর্ত্যের পাহারাদারদের ফাঁকি দিলেন; কিন্তু আমাদের দিয়ে গেলেন এক ভয়াবহ আয়না— এই সভ্যতার অন্তর্গত গতি কোথায় গিয়ে থামবে? অর্থাৎ এই সময়-ঘন জিজ্ঞাসার গভীরে, সময়ের তরঙ্গে নিজেকে মন্থন করতে করতে কবি ভবিষ্যতের জন্য একইসঙ্গে রেখে গেলেন যন্ত্রণা ও জয়মন্ত্র। দৃশ্যমাত্রা ও ভাবনার স্তরান্তর দেখিয়ে সঞ্জয়বাবু এ-ভাবেই জীবনানন্দের পাঠযোগ্য স্থানান্তর ঘটান৷

জীবনানন্দের কবিতায় আলো ও তিমিরের সম্পর্ক রৈখিক নয়। অন্ধকার আলোকে গ্রাস করে না; আলোও অন্ধকারকে বাতিল করে না। তারা সহবিন্যস্ত। ‘সাতটি তারার তিমির’ তাই কেবল বিষণ্নতার কাব্য নয়; রাত্রির উপনিষদ। তিমির এখানে গর্ভ— যেখানে আলোর জন্মও সম্ভব, আবার বিনাশও। আধুনিকতা অগ্রগতির সরল রেখা নয়; তা ভাঙনের ভিতর দিয়ে অধিগমন।জীবনানন্দ এই ভাঙনকে আড়াল করেন না; বরং তাকে নান্দনিক সহাবস্থানে স্থাপন করেন।

নগর তাঁর কবিতার ভূগোল নয়; মানসিক স্তর। রাজাবাজার, বাদুড়বাগান, নিমতলা, ফিয়ার্স লেন— এইসব স্থাননাম চেতনার ছায়াপথে রূপান্তরিত হয়। তিনি সেখানে হাঁটেন— যেন এক অদৃশ্য গোয়েন্দা। ফলত তাঁর দৃষ্টি ট্যুরিস্টের নয়; প্রায় তদন্তকারী গুপ্তচরের। নুলো হাত, উচ্ছিষ্ট মানুষ, সন্দেহভাজন মুখ— ভদ্রলোকের সুশীল কেন্দ্র থেকে সরে গিয়ে তিনি প্রান্তের দিকে তাকান। কারণ আধুনিকতার আসল ভাষা প্রান্তে জন্মায়।

এই হাঁটা উদ্দেশ্যহীন নয়। এক নাগরিক পরিব্রাজনা— এক ফ্লান্যোরি— কিন্তু প্রাচ্য ছায়ায় পুনর্নির্মিত। বোদলেয়ারের প্যারিস যেমন দ্বিতীয় সাম্রাজ্যের ভিড়ে কবিকে অদৃশ্য করে দিয়েছিল, জীবনানন্দের কলকাতা তেমনি ঔপনিবেশিক ভাঙনের ভিতর তাঁকে গোপন রাখে। তিনি জনতার অংশ, তবু জনতান্তর্গত নন। ভিড়ের হৃদয় থেকে নিজেকে সরিয়ে রেখে ভিড়কে দৃশ্যমান করা— এই পরস্পরবিরোধী সাধনাই তাঁর নির্জনতার নন্দনতত্ত্ব।

“এইখানে সরোজিনী শুয়ে আছে; জানি না সে শুয়ে আছে কিনা।” এই দ্বৈত উচ্চারণ কেবল কাব্যিক ধ্বন্যালোক নয়; জ্ঞানের সংকট। সত্য এখানে সম্ভাব্য। জানা ও না-জানার অন্তর্বর্তী অবতলে কবি দাঁড়িয়ে থাকেন। আধুনিকতার গভীরতম সংকট— নিশ্চয়তার যে ভাঙন— তা তাঁর ভাষায় নীরব কম্পন হয়ে ওঠে।

সমকাল তাঁকে ভুল বুঝেছিল। কারণ তিনি কেবল বনলতা সেনের মৃদু মুখ লিখছিলেন না। তিনি বুর্জোয়া সভ্যতার অন্দরমহলে গুপ্তঘাতকের মতো প্রবেশ করছিলেন। গ্যাসলাইটের সবুজ-লাল আলোয় মানুষের বাসনা যেমন ভ্যান গখের নৈশ-কাফেতে জ্বলে ওঠে, তেমনই জীবনানন্দের ক্যান্টিনে। আত্মধ্বংস, অপরাধ, পাগলামির সম্ভাবনা— এইসব আধুনিক উপসর্গ তাঁর কবিতায় এক উন্মাদাশ্রমের আবহ তৈরি করে। তিনি নাম নেন না, কিন্তু রূপক ও প্রদাহ নির্মাণ করেন। তিনি তত্ত্ব দেন না, কিন্তু অভিজ্ঞতার তাপকে অক্ষরে ধারণ করেন।

তাঁকে ‘অরাজনৈতিক’ বলা হয়েছে। অথচ দুর্ভিক্ষের হাড়, যুদ্ধের ছায়া, নগরায়ণের ছিন্নমূল প্রসব— সব তাঁর ভাষার ভিতরে নিম্নচাপের মতো জমাট। তিনি স্লোগান লেখেননি; কিন্তু সভ্যতার ললাট নির্ণীত অন্তর্লিখনকে ভাষা দিতে চেয়েছেন। ইতিহাস কখনও কখনও কবিকেই আগে নির্বাচন করে— কারণ কবি অবচেতনে শুনতে পান সেই শব্দ, যা সমাজ তখনও শুনতে প্রস্তুত নয়।

রবীন্দ্রনাথের সংশয়, বুদ্ধদেবের তির্যক মন্তব্য, সুধীন্দ্রনাথের দূরত্ব— এইসব প্রতিক্রিয়া জীবনানন্দকে ছোটো করেনি; বরং তাঁর অবস্থানকে স্পষ্ট করেছে। তাঁকে ‘নির্জনতম’ বলে স্থির করার চেষ্টা ছিল মধ্যবিত্ত রুচির আত্মরক্ষা। জীবনানন্দ সেই নিরাপত্তাকে ভেঙেছেন। তাঁর নির্জনতা জনতার গভীরতম স্পন্দনের শ্রবণ।

সঞ্জয় মুখোপাধ্যায়-এর এই জীবনানন্দ-পাঠ— যা কবিকে পুনঃস্থাপন করে— সচেতনভাবে অসম্পূর্ণ। এই লেখা কোনও চূড়ান্ত রায় দেয় না। রূপক ছুঁড়ে দেয়, প্রতিসরণ তৈরি করে, তত্ত্বকে ইমেজে গলিয়ে দেয়। এই অসম্পূর্ণতা দুর্বলতা নয়, শক্তি-ও নয়, আধুনিকতার শর্ত; আধুনিকতার শিল্প-স্বাস্থ্য।  জীবনানন্দকে সম্পূর্ণ বয়ানযোগ্য করার প্রচেষ্টা মানে সমালোচনাকে নিরাপদ করা মাত্র। সঞ্জয়বাবুর এই লেখার প্রতিটি বয়ান সেই নিরাপত্তাকে অস্বীকার করে।
আধুনিকতার রূপান্তর স্বভাবতই সংঘর্ষ সৃষ্টি করে। নতুন ভাষা পুরনো ছাঁদে মানায় না। জীবনানন্দ সেই অস্বস্তির নাম। সঞ্জয়বাবু সেই অস্বস্তিকে মর্যাদা দেন। সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ— তিনি জীবনানন্দকে মিথে পরিণত করেন না।

সঞ্জয় মুখোপাধ্যায়-এর ভাষা নিজেই এক প্রকার নির্মাণ। তা কাব্যময়, কিন্তু আবেশিত নয়। সেখানে যুক্তি আছে, কিন্তু তা কেবল বিশ্লেষণাত্মক নয়— অভিজ্ঞতালব্ধ। দার্শনিকতা ঘেঁষা ইতিহাস-নির্ভর। তাঁর বাক্যে ঝলক আছে, তবে তা কোনোভাবেই প্রদর্শন নয়; নিশ্চিতভাবেই প্রসারিত ইঙ্গিতময়তা। আসলে জীবনানন্দের তিমিরকে বুঝতে গেলে সমালোচনাকেও তিমিরে প্রবেশ করতে হয়— বর্তমান বঙ্গ-সংস্কৃতিতে সঞ্জয় মুখোপাধ্যায়-ই একমাত্র সেই ঝুঁকির নিঃসংশয় নাম।
এই লেখার অর্জন তার সংহত দৃষ্টিতে। তা জীবনানন্দকে নতুন করে ব্যাখ্যা করে না; নতুন আলোয় স্থাপন করে। নির্জনতা থেকে জনতার কেন্দ্রে, লিরিক থেকে ইতিহাসে, প্রাদেশিকতা থেকে বৈশ্বিক আধুনিকতায়— এই ধারাবাহিক স্থানান্তরই সঞ্জয়বাবুর নির্মাণ।

জীবনানন্দ নক্ষত্র— কিন্তু মুদ্রাদোষ নিয়েই। তাঁর আলো ও তিমির একসঙ্গে জ্বলে। তাঁর মৃত্যু ব্যক্তিগত নয়; সাংস্কৃতিক। তাঁর হাঁটা উদ্দেশ্যহীন নয়; ইতিহাস-চেতনার ধারাবাহিক উত্তরণ। এবং সেই কারণেই তিনি কেবল অতীতের কবি নন। তিনি সমকালীন— সমকালেরও অধিক। জীবনানন্দকে নতুন করে পড়া মানে নিজের সময়ের দিকে তাকানো। কারণ আধুনিকতার নানামাত্রিক নিম্নচাপ আজও ঘনীভূত। নগরের ভিড়ে আমরা আজও আড়াল হতে শিখিনি; নির্জনতাকে জনতার গভীরে রূপান্তর করতে পারিনি। জীবনানন্দ পেরেছিলেন। তিনি দৃশ্যের গর্ভস্থানের দৃশ্যহীনতা থেকে সময়কে দৃশ্যমান করার শিল্প আয়ত্ত করেছিলেন।জীবনানন্দের তিমিরও তাই অন্ধকার নয়— পরীক্ষাগার। সেখানে আলো জন্ম নেয়, নিভে যায়, আবার ফিরে আসে। সঞ্জয় মুখোপাধ্যায় সেই পরীক্ষাগারের দরজা খুলে দেন। পাঠককে ভেতরে নিয়ে যান। এবং সেখানেই এই লেখার প্রকৃত উৎকর্ষ— সেখানেই সাংস্কৃতিক অন্তঃস্রোতকে দৃশ্যমান করার ঔচিত্য-নির্ভর দুঃসাহস।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!
Scroll to Top