কবিতা- তিমিরহননের গান
কবি- জীবনানন্দ দাশ
কোনো হ্রদে
কোথাও নদীর ঢেউয়ে
কোনো এক সমুদ্রের জলে
পরস্পরের সাথে দু-দণ্ড জলের মতো মিশে
সেই এক ভোরবেলা শতাব্দীর সূর্যের নিকটে
আমাদের জীবনের আলোড়ন—
হয়তো বা জীবনকে শিখে নিতে চেয়েছিলো।
অন্য এক আকাশের মতো চোখ নিয়ে
আমরা হেসেছি,
আমরা খেলেছি;
স্মরণীয় উত্তরাধিকারে কোনো গ্লানি নেই ভেবে
একদিন ভালোবেসে গেছি।
সেই সব রীতি আজ মৃতের চোখের মতো তবু—
তারার আলোর দিকে চেয়ে নিরালোক।
হেমন্তের প্রান্তরের তারার আলোক।
সেই জের টেনে আজো থেলি।
সূর্যালোক নেই— তবু—
সূর্যালোক মনোরম মনে হ’লে হাসি।
স্বতই বিমর্ষ হ’য়ে ভদ্র সাধারণ
চেয়ে দ্যাখে তবু সেই বিষাদের চেয়ে
আরো বেশি কালো-কালো ছায়া
লঙ্গরখানার অন্ন খেয়ে
মধ্যবিত্ত মাহুষের বেদনার নিরাশার হিসেব ডিঙিয়ে
নর্দমার থেকে শূন্য ওভারব্রিজে উঠে
নর্দমায় নেমে—
ফুটপাত থেকে দূর নিরুত্তর ফুটপাতে গিয়ে
নক্ষত্রের জ্যোৎস্নায় ঘুমাতে বা ম’রে যেতে জানে।
এরা সব এই পথে;
ওরা সব ওই পথে— তবু
মধ্যবিত্তমদির জগতে
আমরা বেদনাহীন— অন্তহীন বেদনার পথে।
কিছু নেই— তবু এই জের টেনে খেলি;
সূর্যালোক প্রজ্ঞাময় মনে হ’লে হাসি;
জীবিত বা মৃত রমণীর মতো ভেবে— অন্ধকারে—
মহানগরীর মৃগনাভি ভালোবাসি।
তিমিরহননে তবু অগ্রসর হ’য়ে
আমরা কি তিমিরবিলাসী?
আমরা তো তিমিরবিনাশী
হ’তে চাই।
আমরা তো তিমিরবিনাশী।
তিমির হননের গান : আলোকিত উত্থানের প্রার্থনা
অনিশ রায়
॥ এক॥
‘কবিতা প্রসঙ্গে’ নামক একটি প্রবন্ধে কবি জীবনানন্দ ব্যক্তিগত উপলব্ধির কেন্দ্র থেকে জানিয়েছেন—
“কখনো কখনো মনকে এই বলে বুঝিয়েছি যে, যাকে আমি শেষ সত্য বলে মনে করতে পারছি না, তা তবুও আমাদের আধুনিক ইতিহাসের দিক-নির্ণয় সত্তা; আজকের প্রয়োজনে চরম ছাড়া হয়তো আর কিছু নয়। কিন্তু তবুও সময়-প্রসূতির পটভূমিকায় জীবনের সম্ভাবনাকে বিচার করে মানুষের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে আস্থা লাভ করতে চেষ্টা করেছি।”
কবির এই উপলব্ধির পরিপূর্ণ শিল্পিত প্রকাশ নিঃসন্দেহে ‘সাতটি তারার তিমির’ কাব্যগ্রন্থ। বলা যায়, কবি-কথিত ‘ইতিহাসের দিক-নির্ণয় সত্তা’ এই কাব্যের কবিতাগুলিকে বিশেষভাবেই নিয়ন্ত্রণ করেছে। এই কাব্যে কবির কাব্যপ্রতিভা সার্বিকভাবেই ভিন্ন পথসন্ধানী। এর প্রতিটি কবিতাতেই লক্ষ করা যায় এক ধরনের বিবৃতিধর্মিতা; যা অনভ্যাসের খোঁচায় পাঠককে প্রায়শই বিভ্রান্ত করে। আসলে জীবনানন্দের এই পর্বের কবিতায় দৈনন্দিন অনুপুঙ্খ এক মুখোশ সমেত ফুটে ওঠে, যার আড়ালে থাকে অবচেতনের বিপুল পরিধি আর পরা-বাস্তবের পরা-উপস্থিতি। তাই সিদ্ধান্ত আকারে না বললেও, বেশ জোরের সঙ্গে বলা যায়, কাব্যে পরিবেশিত প্রতিটি বাস্তবতা যেন রূপকের বাস্তবতা। এবং তার সঙ্গে চিহ্নায়ণ প্রক্রিয়ার প্রভাবে শব্দের বিপর্যয় ঘটে যায়, জন্ম নেয় অনুভববেদ্য অনাস্বাদিতপূর্ব চিত্রকল্প, বস্তু-সঙ্গতির নবমাত্রাও সংযোজিত হয়। কাব্যের এইসব লক্ষণকে বলা যেতে পারে কবির ‘ইন্টেরিয়র মনোলোগ’। অর্থাৎ, যা বিবৃতি-প্রকরণকে প্রতিষ্ঠা করেও তাকে নস্যাৎ করে; এবং গড়ে তোলে শব্দজ অথচ শব্দোত্তর চিহ্নায়িতের শৃঙ্খলা। আর তা থেকে প্রমাণিত হয় কবিতা কেবল বিবরণ দেয় না, কিংবা ভাষ্যের মধ্য দিয়ে বিষয়কে গেঁথেও তোলে না— তা আশ্চর্য বোধের উদ্ভাসন ঘটিয়ে কবি-সত্তার আলোক-চেতনাকেই বাস্তবের ঝাপসা অবয়বের মধ্য দিয়ে বহু-স্বরিক চিহ্ন-প্রকরণে প্রকট করে তোলে।
তাহলে নিশ্চয়ই বলা ভুল হবে না যে, জীবনানন্দের কবি-সত্তার আরেকবার নির্মোক উন্মোচিত হয় ‘সাতটি তারার তিমির’ পর্বে। কাব্যের কবিতাগুলি রচিত হয়েছিল ১৩৩৫ বঙ্গাব্দ থেকে ১৩৫০ বঙ্গাব্দের মধ্যে। গ্রন্থ হিসেবে প্রকাশিত হয় ১৩৫৫ বঙ্গাব্দে। সুতরাং, বুঝে নিতে অসুবিধা হয় না যে, এই দীর্ঘ সময়কার রাজনৈতিক, সামাজিক, মানসিক প্রেক্ষিত ছিল অস্থির, উত্তাল, জটিল। স্থির দিকনির্ণয়ের অমলিন চেতনাগুলি তখন সম্পূর্ণভাবেই উদ্ভ্রান্ত, অনিকেত। অনিশ্চয়তা, সন্দেহ, ঘৃণা, ক্ষয়, ভুল, পাপ, ভয়, মিথ্যার কৃত্রিম আড়ম্বরে তখন পুরোপুরি ভেসে গেছে ব্যক্তি-অস্তিত্ব। বিপ্লব ও রূপান্তরের বিশ্ববোধ ঔপনিবেশিক জীবনের শতবন্ধ জাল-জটিলতায় ক্রমশ বন্দিত্ব প্রাপ্ত হচ্ছে। অন্যদিকে জাতীয় আন্দোলনের উত্তাল তরঙ্গগুলি নিস্ফল ব্যর্থতায় একের পর এক শেষ হয়ে যাচ্ছে। এরই মধ্যে মন্বন্তর, দাঙ্গা পেরিয়ে আসে স্বাধীনতা, বাংলা তথা ভারতকে দ্বিখণ্ডিত করে। বাস্তবের সঙ্গে প্রত্যাশার ব্যবধান ক্রমশ দূরত্ব বাড়িয়ে চলল। অস্তিত্বের অন্তর্লীন দ্বন্দ্ব যখন সামাজিক স্তরেও প্রকট হতে লাগল, তখন কবি বুঝতে পারেন, সচেতন স্তর যথেষ্ট একেবারে তো নয়ই, বরং নির্ভরযোগ্যও নয়; তাকে যেতে হয় অবচেতনার গভীর তলদেশে। বাস্তব যখন অপমৃত্যুর গ্লানি নিয়ে ধুঁকছে, তখন কবি তার প্রয়োজন বিশেষ অনুভব করেন না, এক পুনর্নির্মিত জগতের আকাঙ্ক্ষায় উদ্বেল হয়ে ওঠেন। যা হয়তো রাজনৈতিক চেতনায় বিধৃত পরাবাস্তবের জগৎ। এর নিয়ন্তা-শক্তিকেই কবি সম্ভবত বলতে চেয়েছেন ‘ইতিহাসের দিক-নির্ণয় সত্তা’। সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রণোদনায় জীবনানন্দ যে এই পর্যায়ে সময়ের মানবিক মাত্রা নির্ণয়ে তৎপর হয়ে উঠেছেন, তার জন্য ‘সাতটি তারার তিমির’ কাব্যের ভাষা-প্রকরণ রীতিতেও ধরা পড়ে দুঃসাহসিকতা। কথ্য ও সাধু রীতির বিভিন্নধর্মী শব্দের অবাধ মিশ্রণে অস্তিত্বের বহুমাত্রিকতা আভাসিত হল। তার সঙ্গে কবি-সৃষ্ট বিভ্রম কবিতার পদান্বয়কে যুক্তির শিকল থেকে মুক্তি দিয়ে স্বাধীন করে তুলল। কবি পেতে চাইলেন সার্বভৌমের ব্যঞ্জনা। এভাবে আত্মসৃষ্ট বিভ্রম ও কল্পনাপ্রতিভার শিল্পিত বিবর্তনে কবিতার ভাষা আর শুধু চিন্তার বাহন থাকল না, হয়ে উঠল অবিরাম জায়মান উপলব্ধির সমার্থক। এভাবেই সমসাময়িক মধ্যবিত্তমদির জীবনের যন্ত্রণা, ধূসরতা, খণ্ডতা কবিকে বাস্তবতার মধ্যেই স্বপ্ন-প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্র সন্ধানে প্রাণিত করেছে। স্বভাবত, বলতেই হয়, ঔপনিবেশিক আধুনিকতার স্বরূপ এবং অভিব্যক্তিতে পালাবদলের সূচনাই হল ‘সাতটি তারার তিমির’ কাব্যের হাত ধরে। মানবিক অস্তিত্বের ক্রান্তিলগ্নে কবি এ পথেই আলো জ্বেলে প্রথম অনভ্যস্ত পদক্ষেপে যাত্রার সূচনা করলেন; চেনা সত্য-মিথ্যের কুয়াশা ভেদ করে নতুন সত্য-মিথ্যের মূল্যচেতনাকে প্রসারিত করে দেওয়ার অভিপ্রায়ে।
॥ দুই॥
কেবল জীবনানন্দের কবি-জীবনে নয়, বাংলা কবিতার প্রশস্ত পরিসরেও এই ‘সাতটি তারার তিমির’ কাব্যের গুরুত্ব অপরিসীম। প্রেক্ষিত-চেতনা এই কাব্যে সমগ্রতার আয়তনকে নতুন তাৎপর্যে চিহ্নায়িত করে। লক্ষ করি, কবিতার অভ্যস্ত রীতি-প্রকরণও বিনির্মিত হয়ে চলে। বিবৃতিধর্মিতা থাকছে, কিন্তু তা বক্তব্যকে দৃঢ়তা দেওয়ার নামমাত্র অজুহাতে; আর কখনো কখনো তা আভ্যন্তরীণ ও বহিরাঙ্গিক পরিকল্পিত বিরোধিতার মধ্য দিয়ে বিলীন হয়ে যাচ্ছে পরাভাষার ইঙ্গিতময় অভিব্যক্তিতে। এ কাব্যে শব্দ যতটা প্রকাশ করে, তার চেয়ে বেশি রচিত হয় অনুভূতির নিঃশব্দ আয়তন। আর এই অনুভূতির যে স্তরবিন্যাস, তা শব্দের অন্বয়গত প্রয়োগে জাগিয়ে রাখে দ্বান্দ্বিক অভিঘাত। সামাজিক অবস্থান, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, ব্যক্তিগত প্রবণতা ইত্যাদি শব্দের সঙ্গে অর্থের যোগসূত্রকে নিয়ন্ত্রণ করে— কখনো নতুন সম্পর্ক সৃষ্টি করে, কখনো প্রতিষ্ঠিত সম্পর্ককে ভেঙে দেয় বা শিথিল করে।
কাব্যের নামকরণে এই দ্বান্দ্বিকতার আভাস দিয়েই কবি তাঁর কবিতাগুলির উপলব্ধ কাব্য-সত্যকে ব্যক্ত করতে চেয়েছেন। কাব্যের নাম ‘সাতটি তারার তিমির’; ‘তিমির’ বলতে অন্ধকার। এখন প্রশ্ন হল— সাতটি তারার অন্ধকার কেন হবে? ‘আলো’ শব্দটা যুক্ত হওয়াই কি স্বাভাবিক ছিল না? আমরা জানি, জীবনানন্দের সৃষ্টিপ্রতিভায় এমন মীমাংসাহীন দ্বান্দ্বিকতার প্রবণতা খুব বেশি। আসলে মনে হয়, সাতটি তারা মিলে যে সপ্তর্ষিমণ্ডল, তার কথাই এখানে বলা হয়েছে। ধ্রুবতারা আর এই সপ্তর্ষিমণ্ডল চিরকাল অন্ধকার সমুদ্রে মানুষের দিশারী হয়ে থেকেছে; বিপন্ন পদভ্রান্তকে আলো ও পথনির্দেশ দান করেছে। এই সাতটি তারা তো তবে দিশারী বান্ধব। তাদের আলো যেন মানব-বিশ্বাসেরই প্রতীক। কিন্তু কবি এই দীর্ঘ অভ্যস্ত বিশ্বাসের মূলে আঘাত করলেন ‘তিমির’ শব্দ ব্যবহার করে। আর অভ্যস্তগ্রাহ্যতার বলয় কাটাতে পারলেই বোঝা যায়, আলোর পরিধির কেন্দ্রবিন্দু থেকেই বিচ্ছুরিত হচ্ছে আদিকল্প-প্রণোদিত অন্ধকার; সূচনা-মুহূর্তেই প্রচ্ছন্ন থাকে সমাপনের আভাস। আবার, বিপরীত উপলব্ধিও সত্য; ধ্বংস আর নৈরাজ্যের কেন্দ্রে গোপন স্বভাবে থাকে দুর্ভেয় ও যুক্তিহীন উত্থানের দাম্ভিক প্রতিশ্রুতি। মহাসময়ের প্রতীক সাতটি তারা আসলে সত্যিই লোকপুরাণ, ঐতিহ্যজ্ঞান এবং মনীষার আধার সপ্তর্ষির বিমূর্তায়িত ব্যঞ্জনাকেই প্রকাশ করেছে। ইতিহাস ও সমাজের বহমান ধারায় অন্তঃসলিলার মতো যে বেদনার অন্ধকার থেকে যায়, তাকেই কবি প্রশ্নহীন অভিব্যক্তিতে অথচ প্রশ্নার্ত প্রতিক্রিয়ায় জাগিয়ে রাখতে চেয়েছেন, এমন নামকরণের মধ্য দিয়ে। সভ্যতার সংকটকালে সহস্র যন্ত্রণায় পীড়িত মানুষের কাছে প্রাচীন বিশ্বাস ও সংস্কারের স্থৈর্য-ভাবনা আজ ক্ষুণ্ণ, অচল হয়ে যেতে বসেছে। সেই সব পথ-নির্দেশ, মূল্যবোধের দৈব-আলো নতুন কালের সংশয়ের ভিতর থেকে পথ দেখাতে ব্যর্থ। সেই সব আলো আজকের স্থূল অভ্যাসে অন্ধকারে পরিণত হয়েছে।
তবু কবি এই বিবর্তিত সময়কালেও তিমির-বিলাসী হতে চান না, তিমির-বিনাশী হতে চান। তাই ঘোর তিমিরাচ্ছন্ন সময়ের মধ্যে বাস করেও ‘তিমির হননের গান’ গেয়ে ওঠেন। এদিক থেকে বলা যায়, পৃথিবীর অধিকাংশ কবিই আলোর পূজারী। জীবনানন্দের আগে রবীন্দ্রনাথ তো সমস্ত জীবনব্যাপী ‘তিমির-বিদার উদার অভ্যুদয়’-এর সাধনা করে গেছেন। আর জীবনানন্দের কবিতায় আলোকের সন্ধান ও বিচিত্র উপস্থাপনা দেখে কবি অমিয় চক্রবর্তী মুগ্ধতায় বলেছিলেন— “যখনই জীবনানন্দের কোনো কবিতা পড়েছি, মনে হয়েছে স্নিগ্ধ রোদ্দুরে আপ্লুত।” তবে অন্য কবিদের থেকে এ বিষয়ে কবির স্বাতন্ত্র্য হল, জীবনানন্দ অন্ধকারকে গভীরভাবে চিনে নিয়ে, চিনিয়ে দিয়েই সেই অন্ধকার মোচনের শপথ গ্রহণ করেন। অন্ধকারের অনিবার্য প্রেক্ষাপটকে স্বীকার করে নিয়েই ‘রৌদ্রের অফুরন্ত উৎসবের’ গান গেয়ে ওঠেন। অন্ধকার আর আলোর সঙ্গমেই জেগে ওঠে বিচিত্র উদ্ভাসন। এই বিচিত্র উদ্ভাসনের তাৎপর্যকে ফুটিয়ে তুলতেই কবিতার নাম দেন ‘তিমির হননের গান’।
‘তিমির হননের গান’ কবিতাটি ১৩৫০ বঙ্গাব্দে ‘কবিতা’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল। পরবর্তীকালে ‘সাতটি তারার তিমির’ কাব্যের অন্তর্ভুক্ত হয়। কবিতার নামে ‘গান’ শব্দটির সংযুক্তি বিশেষ মাত্রা তৈরি করেছে নিঃসন্দেহে। তবে এই রীতি জীবনানন্দের অনেক কবিতাতেই দেখা গেছে; যেমন— ‘পিপাসার গান’, ‘ঝরাফসলের গান’, ‘অবসরের গান’, ‘অনুসূর্যের গান’, ‘নবহরিতের গান’ ইত্যাদি। এখানে ‘তিমির হননের গান’। ‘গান’ সংস্কৃতিমান এক শিল্প। কবিতাও শিল্প। আবার নাটকও শিল্প। আর নাটকে কবিতা, কাব্য-সংলাপ এবং গান— সবই ব্যবহৃত হয়। কিন্তু তার নির্দিষ্ট শিল্প-প্রেক্ষিত আছে। নাটকে সংলাপ যখন কেজো হতে হতে ভাবগত উদ্দেশ্যকে প্রকাশে অক্ষম হয়ে পড়ে, তখন সংলাপে জুড়ে দেওয়া হয় কাব্য-ব্যঞ্জনা; আবার সেই কাব্য-সংলাপ যখন সার্বিক হৃদয়কে স্পর্শ করতে ব্যর্থ হয়, তখনই গানের আশ্রয় নিতে হয়। তাতে আবহমানের এক অনুভূতি সঞ্চারিত হয়; অতীত-বর্তমান-ভবিষ্যতের বার্তাও সহজে প্রবাহিত হয়। গানের মধ্যে থাকা সুরের দোলা সেই অতীন্দ্রিয় ভাবনাকে ব্যাপ্তি দান করে। কবিতা যেখানে মেধাবী চিন্তন দাবি করে, গান সেখানে সুরে-ছন্দে ভাবনার মুক্ত পরিসর এনে দেয়। কিন্তু মনে রাখতে হবে, কবিতার নামে ‘গান’ শব্দ জুড়ে দিলেও, কবি শেষপর্যন্ত রচনা করেন কবিতাই। সুতরাং, বোঝা যায়, তিমির হননের বার্তা গানের মতো সহজ ব্যাপ্তিতে সকল হৃদয়ে প্রবেশ করিয়ে কবি শেষপর্যন্ত মেধাবী গভীরতা, মানুষের দৃঢ় প্রত্যয়কেই উজ্জীবিত করতে চেয়েছেন।
।।তিন।।
আগেই জানিয়েছি যে, কবিতাটি প্রকাশিত হয়েছে ১৩৫০ বঙ্গাব্দে, ‘কবিতা’ পত্রিকায়। সময়প্রেক্ষিত অনুভব করতে বাঙালির নিশ্চয়ই সময় ব্যয় হবে না। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের করাল আঘাত, বন্যার বন্য হিংস্রতা, মহাযুদ্ধের পরোক্ষ ফলস্বরূপ প্রাপ্ত দুর্ভিক্ষ, লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবনের নিদারুণ পরিণতি, রাজনৈতিক গোপন আঁতাত, ঘৃণ্য স্বার্থপরতা তখন বাংলার মানচিত্রে ঢেলে দিয়েছে ঘোর তমসার রঙ। সেই তমসাবৃত ছায়া-ভূমিতে দাঁড়িয়ে তমসার স্বরূপ উপলব্ধি করার মতো সজ্ঞানতা তখন অনেকেই হারিয়েছিলেন; তাই তমসাকে কাটিয়ে তোলার ব্যস্ততায় অনেক সৃষ্টিশীল কবিত্বের অধিকারী প্রতিভাও সেদিন জনমনোহারী স্লোগান শুনিয়েই কর্তব্য সমাধা করতে পেরেছিলেন। কিন্তু তমসা বা অন্ধকারের নিবিড়তা অনুধাবন না করে প্রবল উচ্ছ্বলতায় উত্তরণের উত্তপ্ত বাণী শেষপর্যন্ত যেমন বিক্ষিপ্ত, দিশাভ্রষ্ট হয়, তেমনি যথোচিত সময়-নির্ণায়কও হতে পারে না। কিন্তু এখানেই জীবনানন্দ এবং তাঁর ‘তিমির হননের গান’ বিশেষ অভিব্যক্তিতেই ব্যতিক্রমী হয়ে ওঠে। বস্তুত, মন্বন্তরকালীন প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে এমন অনন্যসাধারণ কবিতার নিদর্শন বাংলাভাষায় খুব একটা চোখে পড়ে না। তবে মন্বন্তরের অতি স্পষ্ট চিহ্নগুলির দ্বারা এই কবিতার শরীরকে সাজানো হয়নি বলেই কবিতাটি মন্বন্তরের নির্দিষ্ট ইতিহাস ছাপিয়ে আজকের মানবিক দৈন্যের চালচিত্রকেও সজীবতায় ধারণ করতে পেরেছে।
কবিতাটির সূচনা সাম্প্রতের সীমা ছাড়িয়ে পৃথিবীর আদিম লগ্নকে স্মরণ করে; অনেক পূর্বজাতকের উপলব্ধির বিচিত্র পথ ঘুরে—
“কোনো হ্রদে কোথাও নদীর ঢেউয়ে
কোনো এক সমুদ্রের জলে
পরস্পরের সাথে দু-দণ্ড জলের মতো মিশে
সেই এক ভোরবেলা
শতাব্দীর সূর্যের নিকটে।
আমাদের জীবনের আলোড়ন—
হয়তো বা জীবনকে শিখে নিতে চেয়েছিল।”
মনে পড়তে পারে রবীন্দ্রনাথের ‘ছিন্নপত্রাবলী’র কথা; তার একটি বিশেষ পত্রের সঙ্গে ভাবসাদৃশ্যের কথা— “… বহুযুগ পূর্বে যখন তরুণী পৃথিবী সমুদ্রস্নান থেকে সবে মাথা তুলে উঠে তখনকার নবীন সূর্যকে বন্দনা করছেন, তখন আমি এই পৃথিবীর নতুন মাটিতে কোথা থেকে এক প্রথম জীবনের উচ্ছ্বাসে গাছ হয়ে পল্লবিত হয়ে উঠেছিলুম…”। এ যেন এক ‘সর্বানুভূতি’; বিশ্বাত্মবোধের এক নিরবচ্ছিন্ন সাধনা। সেই সাধনার সিদ্ধ অভ্যাসে কবি সেই আদিম ভোরের প্রাণ-ভূমিতে পৌঁছোতে চেয়েছেন। দেখতে চেয়েছেন প্রাণ-উৎসারণের সেই জলীয় বেলায় জীবনের আলোড়ন কীভাবে জীবনের অর্থকে শিখে নিতে চেয়েছিল। হ্রদ–নদী–সমুদ্রের ক্রমউল্লেখে সেই জীবনের গভীরতা–গতি–ব্যাপ্তি যেন পর্ব-পর্বান্তরের অধ্যায়গুলি লিপিবদ্ধ করে নিতে চায়। আমরা বুঝতে পারি, সেই ফার্ণ উদ্ভিদ থেকে এককোষী অ্যামিবা হয়ে, সুদীর্ঘ বিবর্তনের চড়াই-উতরাই পেরিয়ে বিশ্বের অধীশ্বর মানুষের আগমন। বন্যতায় ভরা গুহার অন্ধকার কাটিয়ে একদিন মানুষ বেরিয়ে পড়ল যাযাবর বৃত্তিতে। প্রস্তর অবলম্বন ছেড়ে ধাতুকে বর্ম করে তুলল। রচনা করল সভ্যতার কথাশিল্প। কিন্তু তারপর গোষ্ঠীচেতনা, স্বার্থরক্ষা, সম্পদ সংরক্ষণ, জনপদ জয়, রাজ্যবিস্তার, ক্ষমতা নির্মাণ, ক্ষমাহীন আগ্রাসন, উত্থান–পতন— মানবজীবন আলোড়িত হয়ে চলল এক শতাব্দীর পর নতুন নতুন শতাব্দীর ভবিষ্যৎ গঠনের স্বপ্নে, চক্রান্তে, সফলতায় অথবা নিস্ফলতায়। জীবনের অর্থ বা উদ্দেশ্যকে বুঝে বা না-বুঝে, মানুষ জীবনকে শিখে নিতে চেয়েছিল, বা হয়তো শিখে নিয়েছে এ পথেরই অভ্যস্ত উত্তরাধিকারে। লক্ষণীয়, কবিতার এই অংশে ‘পরস্পরের সাথে দু-দণ্ড জলের মতো মিশে’, ‘ভোরবেলা’, ‘শতাব্দীর সূর্য’, ‘আমাদের জীবনের আলোড়ন’, ‘জীবনকে শিখে নেওয়া’— ইত্যাদি পদবন্ধগুলি যেমন সেই আদিম ভোর থেকে আজকের নবসভ্যতায় উত্তরণের ভাবনির্দেশক হয়ে ওঠে, তেমনই তা একই সঙ্গে আশার কথা, ভবিষ্যতের কথা, মহত্ত্বের কথা— আবার আশাভঙ্গের কথা, রূঢ় বর্তমানের কথা, স্বার্থাবৃত সংকীর্ণতার কথাকেও যেন ইঙ্গিত করে যায়। কবিতার পরবর্তী শাব্দিক অভিব্যক্তিতে তা-ই তো স্পষ্ট হতে চায়—
“অন্য এক আকাশের মতো চোখ নিয়ে
আমরা হেসেছি,
আমরা খেলেছি;
স্মরণীয় উত্তরাধিকারে কোনো গ্লানি নেই ভেবে
একদিন ভালোবেসে গেছি
সেই সব রীতি আজ মৃতের চোখের মতো তবু—
তারার আলোর দিকে চেয়ে নিরালোক—
হেমন্তের প্রান্তরের তারার আলোক।”
বুঝতে পারি, আদিম ইতিহাসের দূর প্রসারিত সীমা থেকে কবি খুব দ্রুতগতিতে পৌঁছে গেলেন সীমায়িত বলয়ে; চেনা আকাশের অসীমতা থেকে ‘অন্য এক আকাশের’ খণ্ডিত পরিসরে। দেখেন, যে সুবিদিত আশার আলো একদা ছড়িয়ে পড়েছিল, তা স্খলিত হতে হতে নিষ্প্রভ হয়ে গেছে। তবু স্বার্থমাখা সেই মলিন অন্ধকারের জাল-জটিলতার মধ্যেও হাসি–খেলায় মেতে থাকে জনসাধারণ; কেননা, তারা জেনেছে ‘স্মরণীয় উত্তরাধিকারে কোনো গ্লানি নেই’। কিন্তু ‘স্মরণীয় উত্তরাধিকার’ যে হাসি–খেলার উৎসবময় বিলাসী ঐতিহ্যই নয় কেবল, তা যে কত-শত মনীষীর অদম্য সাধনার দ্বারা নির্মিত আলোকবর্তিকা— সে-কথা উপলব্ধিতে অক্ষম এই অগভীর আত্মসুখকামী মানুষগুলো। তার জন্য উন্মুক্ত, উদার আকাশের মতো দৃষ্টি চাই। কিন্তু চলমান সময় এবং আগন্তুক সময়ও যেন ‘অন্য এক আকাশের মতো’ খণ্ডিত চোখ নিয়ে স্মরণীয় ঐতিহ্যকে খর্ব করে তুলেছে। গৌরবময় ভালোবাসার রীতি, অধ্যায়কে পরিণত করেছে ‘মৃতের চোখের মতো তবু’। যে চোখ নিথর, ভাবলেশহীন, নিস্পন্দ অথচ উন্মুক্ত। তারার আলো চোখে পড়ে, কিন্তু নিরালোক আকাশের শূন্যতাও দৃষ্টিকে আচ্ছন্ন করে দেয়। বক্তব্যের যুগ্মসম্পাতে আমাদের যুগ ও জীবন, সময়ের বিমূর্ত পরিপ্রেক্ষিত নিয়ে অদ্ভুত আঁধারই আপতিত হয়ে চলে যেন।
বিংশ শতাব্দী, সুসভ্যতার স্মরণীয় উত্তরাধিকার বহন করে সমুন্নতির গৌরব-লিপি রচনা করার আগেই মহাযুদ্ধের সর্বনাশী ঝড় এসে সব উড়িয়ে নিয়ে গেল। কুহেলি-বিলীন হেমন্তের প্রান্তরে যেমন তারার আলো প্রহেলিকা হয়ে যায়, তেমনই চৈতন্যের আলো হারিয়ে অচেতন নিরালোকে ডুবে যেতে হয় কেবলই।
পৃথিবীর এই অদ্ভুত আঁধারের দিনে, মনুষ্যত্বের এই নিদারুণ অথচ সচেতন অপচয়ের দিনে, আঞ্চলিকতার মাত্রাও বৃহত্তর কালো ছায়াকে চিনিয়ে দেয়। বাংলার নদী–মাঠ–আকাশ জুড়ে তখন মন্বন্তর আর মহামারীর হাহাকার। ঐতিহ্যমান্য স্মরণীয় আশাবাদের শিষ্ট-ভাষণ ক্রমশ যেন ভণ্ড, স্বার্থবাদীদের কূটনৈতিক পরাসন্দর্ভ হয়ে উঠল। সেই মানস-তিমিরের জটিল ছবি ভাষা পেল কবির উচ্চারণে—
“সেই জের টেনে আজো খেলি
সূর্যালোক নেই— তবু—
সূর্যালোক মনোরম মনে হলে হাসি।”
‘সূর্যালোক’ কিসের জের? কেন টানতে হচ্ছে কবিকে? আসলে মানবিক অধঃপতনের বিলাসিতাকে শাণিত ব্যঙ্গে বিদ্ধ করার জন্যই কবি ‘জের টানার’ কথা বলেন। এই বেলা–অবেলা–কালবেলায় সপ্তভূমিতে যখন ‘হলোম্যানদের’ দাপাদাপি, তখন আশাবাদের নাম করে স্বচ্ছ জীবনদৃষ্টির খাতিরে মানবিকতা, শুদ্ধ চেতনার মতো ‘সূর্যালোক’ সন্ধান তো হেরে যাওয়ারই অভ্যস্ত খেলা চালিয়ে যাওয়া। ‘সূর্যালোক নেই— তবু— / সূর্যালোক মনোরম মনে হলে হাসি’; অর্থাৎ, আশাবাদী অনস্তিত্বের মিথ্যে জের টেনে টেনে, এখনো তাকে ‘মনোরম’ বলে প্রচার করলে কৌতুক জাগে বৈকি! বাংলার ইতিহাসের শরীরে কালশিটের মতো জেগে থাকা তেতাল্লিশের মন্বন্তর কোনো প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের পরিণাম ছিল না, এর জন্য দায়ী ছিল না কোনো কৃষি–উৎপাদনগত কারণও। তবু মৃত্যুর সংখ্যা অর্ধকোটি ছাড়িয়ে গেল মাত্র কিছু মানুষের সীমাহীন লোভ আর লাভের লম্বা গুণিতক হিসেবে। অর্থাৎ, আশাবাদ হয়ে গেল মুনাফাবাদের সমার্থক। অতএব, সেই সময়ে অন্নহীন লাশগুলির বুকের ওপর দাঁড়িয়ে মানবিকতার জের টেনে ললিত বাণী শোনা এবং শোনানোর মনোরম খেলা বেদনার্ত পরিহাস ছাড়া আর কী-ই বা হতে পারে?
পৃথিবীর এই অদ্ভুত আঁধারের দিনে, মনুষ্যত্বের এই নিদারুণ অথচ সচেতন অপচয়ের দিনে, আঞ্চলিকতার মাত্রাও বৃহত্তর কালো ছায়াকে চিনিয়ে দেয়।
এরপরেই কবি আধ্যাত্মিক ব্যাকুলতা কাটিয়ে বাস্তবের আধিভৌতিক স্তরে নেমে নিপুণ হাতে মন্বন্তরের ডক্যুমেন্টেশনধর্মী ছবি এঁকে দিলেন—
“স্বতই বিমর্ষ হয়ে ভদ্র সাধারণ চেয়ে দ্যাখে তবু
সেই বিষাদের চেয়ে আরো বেশি কালো কালো ছায়া
লঙ্গরখানার অন্ন খেয়ে
মধ্যবিত্ত মানুষের বেদনার নিরাশার হিসেব ডিঙিয়ে
নর্দমার থেকে শূন্য ওভারব্রিজে উঠে
নর্দমায় নেমে—
ফুটপাত থেকে দূর নিরুত্তর ফুটপাতে গিয়ে
নক্ষত্রের জ্যোৎস্নায় ঘুমাতে
বা মরে যেতে জানে।”
বোঝা যাচ্ছে, কবি এবার সরাসরি মন্বন্তরের নির্মম বাস্তবতার মুখোমুখি— বুভুক্ষিত মানুষের সারির সামনে; হেমন্তের প্রান্তরের তারার চেয়েও আরো কালো ছায়ায় আবৃত লঙ্গরখানার অন্দরে। যে কালোর ভিতরে কোনো আলোর আশা নেই; সেই অন্ধকার থেকে উত্তরণের নেই কোনো দিশা। মনে পড়তে বাধ্য বিজন ভট্টাচার্যের ‘নবান্ন’ নাটক, কিংবা প্রেমেন্দ্র মিত্রের ‘ফ্যান’ কবিতা, কিংবা চিত্তপ্রসাদ বা জয়নুল আবেদিন বা সোমনাথ হোরের আঁকা মন্বন্তর-চিত্রগুলির কথা। স্মরণে আসতে পারে তেতাল্লিশের মন্বন্তরের ইতিহাসগত কারণগুলি— দেশীয় অর্থনীতির মুখ থুবড়ে পড়া, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ব্রিটিশদের পতন, দেশবাসীর উপর অতিরিক্ত করভার চাপিয়ে দেওয়া, সিঙ্গাপুর ও রেঙ্গুন থেকে চাল আমদানিতে নিষেধাজ্ঞা, সেনাবাহিনীর জন্য চাল সংরক্ষণ, নিদারুণ কালোবাজারি। ফলত, অনতিবিলম্বে “বাংলার লক্ষ গ্রাম আলোকহীনতায় ডুবে নিস্তব্ধ, নিস্তেল” হয়ে পড়ে। সেই শ্মশানভূমি থেকে কোনো রকম অর্ধমৃত অবস্থায় মানুষ পা বাড়ায় শহরের পথে; বেঁচে থাকার গভীর আকাঙ্ক্ষায়। কিন্তু সেখানে তাদের জন্য অপেক্ষা করছিল নরকতুল্য জীবনের অভিজ্ঞতা। সেই গ্রাম থেকে আসা উপোসী মানুষগুলো তাদের জীর্ণ শরীর নিয়ে পড়ে থাকে ফুটপাতে, রাস্তায়, নর্দমার পাশে, ডাস্টবিনের ধারে, অথবা স্টেশনের ওভারব্রিজের ধাপে ধাপে। তারপর লঙ্গরখানায় জীবনকে বাজি রেখে চলে জীবনের অন্নপ্রাপ্তির লড়াই। অতঃপর ভয়াবহ জান্তবতায় ধুঁকতে ধুঁকতে জঞ্জালের মতো মরে যাওয়া। তবুও শহুরে মধ্যবিত্ত সভ্যতার হৃদয়হীন নির্বিবেক ঘুম ভাঙে না; তাদের নিস্পৃহ পলাতক প্রবৃত্তি কেবলই কৃত্রিম বেদনা আর দায়হীন দোষারোপের নিরাশা-ক্লান্ত হিসেব কষে চলে। কোনোরকম মানবিক তাগিদ বা অনুতাপও এদের মধ্যে জাগে না। ফলত, তাদের পরিপূর্ণ উপস্থিতিতেই ‘নিরুত্তর’ ফুটপাতে উত্তরণের সব আশা হারিয়ে অন্নহীন কালো কালো ছায়াগুলি নক্ষত্রের জ্যোৎস্নায় বা মৃত্যুর বৃহত্তর ছায়ায় মিশে যায়। ওভারব্রিজ থেকে নর্দমায়, ফুটপাত থেকে অন্য ফুটপাতে— এদের পরিণতির কোনো রূপান্তর ঘটে না। মধ্যবিত্তের এই নিরাপদ নিস্পৃহতা বা বিষণ্ণতার ভান-সর্বস্বতা কবিকে আত্মসমালোচনায় বিদ্ধ করে; করে তোলে তীক্ষ্ণ তিরস্কারপ্রবণ—
“এরা সব এই পথে
ওরা সব ওই পথে
মধ্যবিত্তমদির জগতে আমরা বেদনাহীন—
অন্তহীন বেদনার পথে।”
‘এরা’— বুঝতে অসুবিধা হয় না— লঙ্গরখানায় ধুঁকতে থাকা আর ফুটপাতে মরে যাওয়া মানুষগুলো। ‘এইসব দিনরাত্রি’ কবিতায় যাদের পরিচয় আরো স্পষ্ট—
“… অন্তবিহীন কাল মৃতবৎ ঘোরে। নামগুলো কুশ্রী নয়, পৃথিবীর চেনা জানা নাম এই সব। আমরা অনেকদিন এ-সব নামের সাথে পরিচিত; তবু, গৃহনীড় নির্দেশ সকলি হারায়ে ফেলে ওরা জানে না কোথায় গেলে মানুষের সমাজের পারিশ্রমিকের মতন নির্দিষ্ট কোনো শ্রমের বিধান পাওয়া যাবে; জানে না কোথায় গেলে জল তেল খাদ্য পাওয়া যাবে;”
অথবা—
“তাদের আকাশ
সর্বদাই ফুটপাতে।”
অর্থাৎ, ‘এরা’ সব এই অন্নহীন মৃত্যুর দিকচিহ্নহীন পথে ক্রমাগত ঝাপসা হয়ে যায়। কিন্তু কবিতায় ‘ওরা’ কারা? নিঃসন্দেহে সেই লালসামত্ত, শঠ, ক্ষমতালোভীর দল; যারা অকাতরে মানুষকে বলি দিয়ে নবতর সিংহাসনের দখল নিতে ব্যস্ত। আর এই ‘এরা’ এবং ‘ওরা’র মাঝখানে রয়ে গেছে মধ্যবিত্ত জীবনের মধ্য–যাপন। যারা সমস্ত বিপদ–ঝঞ্ঝা থেকে গা-বাঁচিয়ে আত্মসুরক্ষার নিরাপদ বলয়ে থাকতে অভ্যস্ত। আত্মকেন্দ্রিকতা আর স্বার্থপরতাই তাদের জীবনীমন্ত্র। সেই অভ্যাসের দাসত্বকে অক্ষত রাখতেই তারা কখনো কল্যাণের ভঙ্গিতে কৃত্রিম বিষণ্ণতা প্রদর্শন করে, কখনো ছদ্ম প্রতিবাদ করে, আবার সময় বুঝে নিরুত্তাপ উদাসীনতার ভান করে, কখনো বা মনগড়া প্রতিপক্ষ তৈরি করে দায়হীন দোষারোপে নিজেদের সুবিধাবাদী অবস্থানকে সুনিশ্চিত করে। কবি এমন নির্লজ্জ স্বার্থপরতার স্বরূপকে উপলব্ধি করেছিলেন স্ব-শ্রেণির মধ্যেই।
যখন চারপাশে মৃত্যুর কলরোল, বুভুক্ষ মানুষের কাতর হাহাকার— তখন সেই ‘অন্তহীন বেদনার পথে’ চোখ রেখেও মধ্যবিত্ত ভদ্র সাধারণ এক স্বপ্ন–মদির জগতের নিরাপত্তা অনুভব করতে চায়; আত্মসুখের ‘বেদনাহীন’ চৌকাঠের ভিতরে দাঁড়িয়ে। কবি তাদের এই পলায়নী স্বভাবকে, এই সংবেদনহীন মতলবকে সমালোচনায়, ধিক্কারে যেমন জর্জরিত করেছেন, তেমনই বিদ্রূপে–ব্যঙ্গে করে তুলতে চেয়েছেন অস্থির—
“কিছু নেই— তবু এই জের টেনে খেলি;
সূর্যালোক প্রজ্ঞাময় মনে হলে হাসি;
জীবিত বা মৃত রমণীর মতো ভেবে— অন্ধকারে
মহানগরীর মৃগনাভি ভালোবাসি।”
কবিতায় আবারও ‘জের টেনে খেলার’ কথা আসে নিস্ফল অভ্যাসের পৌনঃপুনিকতা বোঝাতে। আসে দ্বিতীয়বারের জন্য ‘সূর্যালোকের’ কথা— একইরকম কৌতুকের আবহে। তবে প্রথমবার ‘সূর্যালোক’কে ‘মনোরম’ মনে হয়েছিল, এবার মনে হল ‘প্রজ্ঞাময়’। অর্থাৎ, উপলব্ধির সীমাকে কয়েক যোজন বাড়িয়ে দেওয়া হল। আদিম ইতিহাসের জঙ্গল-অন্ধকারে মানুষের জীবনে সূর্যালোক মনোরম বলে মনে হয়েছিল। তারপর দীর্ঘ মানবিক সাধনায় সূর্য হয়ে উঠল চৈতন্যের আলোকিত উৎস— প্রজ্ঞার আধার। অর্থাৎ, জ্ঞান ও বোধির সমন্বয়ে মানুষ সূর্যালোকের মতো প্রজ্ঞাদৃষ্টিতে অন্ধকারের অতল রহস্য উন্মোচন করল। অজ্ঞানতার সব অন্ধকার দূরীভূত হল। কিন্তু সে-সব দৃষ্টি এই কালবেলায় যে মৃত চোখের মতো— যখন সমস্ত জ্ঞান, বোধ, অনুভূতি, সহমর্মিতা, সব মানবিক প্রতিজ্ঞা অসাড় এবং অচল হয়ে গেছে। তবু যদি কোনো কাতর মুহূর্তের বেখেয়ালে স্মরণীয় অবভাসেও সূর্যালোককে ‘প্রজ্ঞাময়’ মনে হয়, তখনও বাস্তব মন এক অনাবিল কৌতুকে হেসে ওঠে। কেননা, মধ্যবিত্ত চেতনার সীমায়িত আকাশে সূর্যালোকই তো নেই, সেখানে শুধুই আত্মরতির অন্ধকার। তাই সেই অন্ধকারের ভিতর তাদের জৈবিক অভ্যাস অনুশীলিত হয়ে চলে— জীবিত বা মৃত যে কোনো রমণীর সাথে। অর্থাৎ, ‘জীবিত’ শব্দ বোঝায় সাংসারিক প্রেমের বৈধতা এবং ‘মৃত’ শব্দ নিষিদ্ধ যৌন চাহিদার অবৈধতাকে ফুটিয়ে তোলে। বোঝা যায়, উভয় রমণীই নাগরিক মেজাজে শুধুই শরীরী বিলাসের আমিষাষী স্বাদ; প্রেম নয়, স্থূল ভোগই তাদের কাছে একমাত্র সত্য। এমন রুচিহীন, হৃদয়হীন, অনুভূতিহীন, বিকারগ্রস্ততা নিয়েই তারা মহানগরীর ‘মৃগনাভি’ ভালোবাসে। ‘মৃগনাভি’ হল কস্তুরী; যার গন্ধে পুরুষ-হরিণ যৌন উত্তেজনায় মাতোয়ারা হয়। এভাবেই নাগরিক মধ্যবিত্ত আত্মদরপরায়ণশীল হয়ে আত্মসুখের বাসর রচনা করে বেঁচে থাকে। অন্ধকারই তাই তাদের চির আকাঙ্ক্ষিত অবসর। সূর্যালোকহীন এই অন্ধকার তো বাইরের নয়, এই অন্ধকার চৈতন্যের, এই অন্ধকার অভ্যাসের, এই অন্ধকার নাগরিক মধ্যবিত্ত স্বভাবের। দুর্ভিক্ষ তাই বাংলার মানচিত্রকে কেবল নয়, তা আমাদের সমগ্র সত্তাকেই গ্রাস করেছিল।
বিনাশের গহ্বর থেকেই যেমন জেগে ওঠে এগিয়ে চলার মহাবেগ, তেমনই কবিতার অক্ষরমালায় এতক্ষণ ধরে যে নিকষ তমসার ভাব জমিয়ে তোলেন কবি, সেই অন্ধকারেই মানবিক সত্যের ইতিহাসস্বীকৃত বাঁকবদল ঘটান তিনি। ‘সকলেই ঘুমিয়ে নেই, কেউ কেউ আছে জেগে এখনো’— এই মরমী বিশ্বাসকে সুচেতনার আলোকদীপ্তিতে উচ্চারণ করতে চান কবি। নিজের মনের অন্ধকার থেকে বেরিয়ে বিশ্বব্যাপী গড়ে ওঠা অন্ধকারের প্রাচীরকে ভেঙে দিতে চান তিনি। ‘চরৈবেতি’ মন্ত্রে উজ্জীবিত হয়ে মানুষকে করে তুলতে চান চিরপথের পথিক; আর নিজে হয়ে ওঠেন ক্রান্তদর্শী—
“তিমির হননে তবু অগ্রসর হ’য়ে
আমরা কি তিমির-বিলাসী?
আমরা তো তিমির-বিনাশী হতে চাই;
আমরা তো তিমির-বিনাশী।”
‘তিমির হননের গান’ কবিতায় এভাবেই কবি গেয়ে ওঠেন আলোর গান। আসলে কবি জানেন, অন্ধকার সত্য; কিন্তু শেষ সত্য নয়। মানবসভ্যতার আলোকিত ইতিহাস এত সহজে নিবে যেতে পারে না। হয়তো মানুষ কখনো হেরে যায়, পিছিয়েও যায়, কিন্তু চিরদিনের জন্য পর্যুদস্ত হয় না। তার সততা, আদর্শ, নীতিবোধ, বিবেকবোধ, প্রত্যয় কয়েকটা দশকে ম্লান হয়েছে ঠিকই, কিন্তু মুছে যায়নি। তার রক্তের মধ্যেই তো প্রবাহিত বিশ্বজয়ের ইতিবৃত্ত, আলোকময় উত্থানের স্মরণীয় উত্তরাধিকার। তাই আর দ্বিধা নেই, সংশয় নেই কোনো; শ্লাঘাজড়িত মীমাংসাযোগ্য বাক্যে কবি বলেন—
“আমরা তো তিমির-বিনাশী
হতে চাই
আমরা তো তিমির-বিনাশী।”
হ্যাঁ; আমরা মানুষ— আমরাই যুগে যুগে অন্ধকারের উৎস থেকে উৎসারিত আলোর বাহক। আমরাই অন্ধকারের বন্ধ দরজা ভেঙে জয়ের উৎসব করেছি। তাই কবি বলতে চান, সময়ের এই তিমির-বাধা ইতিহাসের ক্ষুদ্র অধ্যায় মাত্র, তা অমোঘ বিধান হতে পারে না। এই অন্ধযুগের অন্তিমকালে মানুষই জয়ী হবে; সে জয় ছিনিয়ে আনা কঠিন, কিন্তু অসাধ্য নয়। তাই সমোচ্চারিত দুটি কাব্য-পঙ্ক্তির গভীরে কান পাতলে শোনা যায় এক প্রত্যয়ী সঙ্গীতের সুর—
“আমরা করবো জয়
আমরা করবো জয় নিশ্চয় …”
এই প্রত্যয়ী সুর শাশ্বত কাল ধরে আলোকিত মনুষ্যত্বের বিকাশে প্রার্থনা-মন্ত্রের মতো উচ্চারিত হয়ে চলেছে—
“অসতো মা সদ্গময়ঃ,
তমসো মা জ্যোতির্গময়ঃ …”
তিমিরাবৃত বিশ্বপ্রাণে এই আলোর সুর ধ্বনিত করে দিতে চেয়েছেন বলেই তো কবিতার নাম ‘তিমির হননের গান’ রেখেছেন কবি।
****
# গ্রন্থবদ্ধ- জীবনানন্দ দাশ-এর শ্রেষ্ঠ কবিতা / জিজ্ঞাসায়, অন্বেষায় / অনিশ রায় / নিউ বইপত্র ( প্রকাশ – এপ্রিল, ২০১৯)

