ব্রাজিল ও জোগা বনিতো | পর্ব-১০ | জোগো বনিতোর পরে, জোগা বনিতোর সামনে

জোগো বনিতো ও জোগা বনিতোর এই একাকীত্বের যে চাপ, সেই চাপের প্রথম উত্তর কাকা। তাঁর খেলায় ড্রিবল মানে প্রদর্শন নয়, দূরত্ব ভাঙা। তিনি গতি দিয়ে জায়গা তৈরি করেন। তাঁর ভার্টিকাল ক্যারি, যা আধুনিক ট্রানজিশন ফুটবলের পূর্বাভাস, তা স্বাভাবিকভাবেই ব্যালন ডি’অর প্রাপ্তির যোগ্য বিবেচিত হয়ে যায়। একপ্রকার কাকাকে ভুল বুঝেই। কাকাকে যান্ত্রিক ফুটবলের রূপকার ভেবে ফেলেছিল সকলে। কারণ কাকার ভার্টিকাল ক্যারিতে সৌন্দর্য দ্রুত, প্রায় ক্ষণস্থায়ী। আর এখানেই বিভ্রান্তিটা ভয়ংকর। আসল কথা হলো যে, কাকা রোবোটিক ফুটবলের আগমনী-পর্বেই এমন উন্মূল আধুনিকতার প্রতি-প্রস্তাবে প্রমাণ করে যান— গতি দিয়েও নান্দনিকতা সম্ভব। 

এই দ্রুততার ভেতরেই আসেন নেইমার। নেইমার আধুনিক যুগের সবচেয়ে বিতর্কিত ব্রাজিলীয় দেহ। তিনি স্ট্রিট ফুটবলের স্কিল (রেইনবো ফ্লিক, দ্রুত দিকবদল ইত্যাদি ইত্যাদি) এলিট সিস্টেমে বহন করে আনেন। তাঁর ‘ফ্লেয়ার’ অনেকের চোখে অপ্রয়োজনীয় বলে মনে হয়। কিন্তু এই অপ্রয়োজনীয়তাই তাঁর রাজনৈতিক ও শৈল্পিক অবস্থান। নেইমারের অস্তিত্বই যান্ত্রিকতার বিরুদ্ধে উত্তর। তিনি যেন তাঁর ফুটবল-শিল্প দিয়ে বারবার বলেন— শিল্পিত-ঝুঁকি নেওয়ার অধিকার এখনও আছে; থাকবে। অথচ এই অধিকারই আজ প্রশ্নের মুখে। তাই নেইমার তো একঘরে হবেনই। নেইমার যে জোগা বনিতোর রাজনৈতিক রূপ— ঝুঁকির অধিকার রক্ষার জাগ্রত প্রহরী। (সবাই যখন ঘুমিয়ে থাকে, তখন একজনকে জাগতেই হয়; ভোরের বার্তা সকলের কাছে পৌঁছে দিতে। তরুণ লামিন ইয়ামাল ব্যালন ডি’অর মঞ্চে ও ২০২৬-এর বিশ্বকাপ আসরে দেওয়া সাক্ষাৎকারে জানান, তিনি নেইমারের সেই বার্তা শুনেছেন, কিন্তু বিশ্ব-ফুটবলের আনন্দহীনতার দিনে তিনি রোনালদিনহো, নেইমারদের ক্রমশ হারিয়ে যাওয়া নিয়ে শঙ্কিত)। আসলে একাডেমির ফুটবল শৃঙ্খলা দেয়, কিন্তু একাডেমি গিঙ্গা কেড়ে নেয়। তাই রাস্তার ফুটবল কমে যাচ্ছে। দেহ ক্রমশ একরকম হ‍য়ে যাচ্ছে। এখানেই ব্রাজিলীয় ফুটবলের সবচেয়ে বড়ো সংকট।

তবু ব্রাজিলীয় ফুটবল পুরোপুরি হারায়নি। কারণ তা নিজেকে প্রশ্ন করতে জানে। জোগো বনিতো কোনো স্থির সূত্র নয়। জোগো বনিতো এক চলমান আলোচনা। জোগা বনিতো কোনো ট্রিকের তালিকা নয়; জোগা বনিতো সাহসের নৈতিকতা। আধুনিক যান্ত্রিকতার ভেতরে দাঁড়িয়ে ব্রাজিলীয় ফুটবলই একমাত্র এই প্রশ্ন করতে পারে— আমরা কি এখনও নিজের মতো করে খেলতে পারি? এই প্রশ্নের উত্তর সহজ নয়। কিন্তু প্রশ্নটাই ব্রাজিলীয় ফুটবলের প্রাণ। যা তাকে ইতিহাসের দুই মলাটের নির্ধারিত সীমাবদ্ধতার বাইরে নিজস্ব অধ্যায়ের মুক্ত আকাশ আর প্রান্তরে পৌঁছে দিতে চায় বারবার। কারণ ইতিহাসের লিপিবদ্ধ অধ্যায় একসময় শেষ হয়। কিন্তু দেহের স্মৃতি শেষ হয় না।

ব্রাজিলীয় ফুটবল নিয়ে কথা বলতে গেলে আজ আমরা প্রায়ই অতীতের দিকে ফিরে তাকাই। যা স্বাভাবিক। কারণ ব্রাজিলের ফুটবল নিজেই তো জন্মসূত্রে স্মৃতির উপর দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু স্মৃতি যদি শুধু নস্টালজিয়া হয়ে ওঠে, তবে তা উত্তরাধিকার থাকবে না; তা হয়ে যাবে ভার। আজ ব্রাজিলীয় ফুটবল ঠিক এই সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে— স্মৃতি কি পথ দেখাবে, নাকি পিঠে বোঝা হয়ে ঝুলে থাকবে? প্রশ্নটি কেবল ফুটবল খেলার নয়। তা দেহের প্রশ্ন। দেহ কি এখনও নিজের ভাষা তৈরি করতে পারবে, নাকি তাকে শেখানো ভাষাতেই কথা বলতে হবে?

আধুনিক রোবোটিক ফুটবল দেহকে শেখায়: কীভাবে দৌড়াতে হবে, কতটা দৌড়াতে হবে, কখন থামতে হবে। এই শেখানো দেহ দক্ষ, কিন্তু স্মৃতিহীন। ব্রাজিলীয় ফুটবল বরাবরই স্মৃতিসম্পন্ন দেহের উপর নির্ভর করেছে। সাম্বা, ক্যাপোইরা, কার্নিভাল, রাস্তার খেলা— এ-সব কোনো কোচিং ম্যানুয়াল নয়। এগুলো পরিবেশ। পরিবেশ কিছু শেখায় না, সে স্বতত গড়ে তোলে। এই ‘গড়ে ওঠাটা’ই যে আজ সবচেয়ে বিপন্ন।

সব দেশের মতো আজকের ব্রাজিলেও ফুটবলার তৈরি হয় একাডেমিতে। মাঠ সমান, জার্সি পরিষ্কার, ড্রিবল নির্দিষ্ট। তাতে সমস্যা নেই। সমস্যা তখনই, যখন এই প্রক্রিয়া কোনো দেহের অপ্রত্যাশিতকেই ভয় পায়। কারণ অপ্রত্যাশিতকে মাপা যায় না। আর যা মাপা যায় না, আধুনিক ব্যবস্থার চোখে তা ঝুঁকি। কিন্তু ব্রাজিলীয় ফুটবলের জন্মই হয়েছিল ‘ঝুঁকি’ থেকে। ঝুঁকি না-থাকলে গিঙ্গা জন্মাত না। ঝুঁকি না-থাকলে গ্যারিঞ্চা মাঠে নামতেই পারতেন না। ঝুঁকি না-থাকলে পেলে নিজেকে সংযত করার প্রয়োজন বুঝতেন না। ঝুঁকি না-থাকলে ১৯৮২-র সৌন্দর্য ‘প্রশ্ন’ হয়ে উঠত না। ঝুঁকি না-থাকলে ১৯৯৪-এর সংযম অর্থ পেত না।

এই ঝুঁকিই জোগা বনিতোর মূল শিল্প-নৈতিকতা। জোগা বনিতো কখনোই ‘ট্রিক করো’— এমন নির্দেশযোগ্য বিধান ছিল না। ছিল এক অনুমতি। ঝুঁকি নেওয়ার অনুমতি। নিজের দেহকে বিশ্বাস করার অনুমতি। অথচ এই অনুমতিই আজ প্রশ্নের মুখে। কারণ আজকের ফুটবলে বিশ্বাসের জায়গা ছোটো। কোচ বিশ্বাস করেন ডেটায়। ক্লাব বিশ্বাস করে বিনিয়োগে। খেলোয়াড় বিশ্বাস করে ক্যারিয়ারের স্থায়িত্বে। এই বিশ্বাসগুলো বাস্তব, অস্বীকার করা যায় না। কিন্তু এই বাস্তবতার ভেতরে দেহ আর দেহের শিল্প-দোলা কোথায় কথা বলবে? এই প্রশ্নের উত্তর আজ নেই।

নেইমারের ক্যারিয়ার এই প্রশ্নের সবচেয়ে দৃশ্যমান রূপ। তিনি প্রায় একা, কিন্তু প্রতীক, হয়তো-বা বিতর্কিত প্রতীক। তাঁর স্কিল আধুনিকতার সঙ্গে খাপ খায় না— এই অভিযোগ ওঠে। কিন্তু আসলে অভিযোগটা স্কিলের বিরুদ্ধে নয়; অভিযোগটা অজানা অপ্রত্যাশিতের বিরুদ্ধে। নেইমার মাঠে এমন কিছু করেন, যা আটকানোর বা শেখানোর জন্য কোনো মডেল নেই। এই ‘মডেল না-থাকা’ই আধুনিক ব্যবস্থার ভয়।

কিন্তু ইতিহাস বলে— যেখানে মডেল নেই, সেখানেই নতুন ভাষা জন্মায়। ব্রাজিলীয় ফুটবল কি আবার সেই জায়গায় যেতে পারবে? যেখানে ভাষা তৈরি হয়, কেবল অনুসরণ করে না। এই প্রশ্নের উত্তর ভবিষ্যৎ দেবে। কিন্তু কিছু লক্ষণ এখনই দেখা যাচ্ছে। আজ ব্রাজিলে অনেক তরুণ ফুটবলার আবার ছোটো মাঠে খেলছে। ফুটসল, পাঁচজনের খেলা— এগুলো আবার গুরুত্ব পাচ্ছে। কারণ এই খেলাগুলো দেহকে সিদ্ধান্ত নিতে শেখায়। এখানে সময় কম, জায়গা কম, ভুলের সুযোগ কম। এই সীমাবদ্ধতার ভেতরেই দেহ স্মৃতি তৈরি করে। এই স্মৃতি কোনো কোচিং নোট নয়; তা জায়মান স্মৃতির অভিজ্ঞতা। সেই অভিজ্ঞতা যদি আবার বড়ো মাঠে নিজের জায়গা করে নিতে পারে, তবে ব্রাজিলীয় ফুটবল আবার নিজের ভাষায় কথা বলতে পারবে।

কিন্তু কথা আগের মতো হবে না। হওয়া সম্ভবও নয়। ইতিহাস ফিরে আসে না। সে রূপ বদলায়। আজকের জোগা বনিতো হয়তো গ্যারিঞ্চার মতো উচ্ছল হবে না, রোনালদিনহোর মতো নির্ভার হবে না। কিন্তু তার ভেতরে থাকতে পারে সেই শিল্প-নৈতিক কেন্দ্র— ঝুঁকি নেওয়ার সাহস। এই সাহস কেবল ফুটবলের নয়। এই সাহস সামাজিক, আস্তিত্বিক। দাসত্ব-উত্তর দেহ প্রথম যেদিন দুলেছিল, সেদিন সে জানত না সে কী বানাচ্ছে। সে শুধু জানত— স্থির থাকলে মরে যাবে। আজকের দেহও সেই একই জায়গায়। স্থির থাকলে সে অপ্রাসঙ্গিক হয়ে যাবে। এই কারণেই ব্রাজিলীয় ফুটবলের বারবার নিজেকে প্রশ্ন করতে হয়। এই প্রশ্ন তাকে দুর্বল করে না; বরং তাকে জীবিত রাখে। উজ্জীবিত করে। ইতিহাস সে-কথাই জানায়।

জোগো বনিতো আজ আর কোনো মানদণ্ড নয়। যন্ত্র-ব্যবস্থায় কেউ আর ব্রাজিলকে নকল করছে না। বিশ্ব-ফুটবল যন্ত্র আর প্রযুক্তির দৌরাত্ম্যে প্রচণ্ড ট্যাকটিক্স-নির্ভর। এর ভেতরে ব্রাজিলের জায়গা আলাদা হতে পারে কেবল তখনই, যখন সে নিজের প্রশ্নগুলো ভুলে যাবে না। এই প্রশ্নগুলো, যেগুলো উত্তর দাবি করে না। যেগুলো চলমান। আর চলমানতাই ব্রাজিলীয় ফুটবলের আসল উত্তরাধিকার। কারণ উত্তরাধিকার মানে ট্রফি নয়। উত্তরাধিকার মানে এক বিশেষ ভঙ্গি, নিজস্ব মেজাজ— খেলার, হাঁটার, চলার, নড়ে ওঠার, দুলে ওঠার, ভাবার। দেহকে বিশ্বাস করার ভঙ্গি। যে ভঙ্গি কিছুদিন অজ্ঞাতবাসে যেতে পারে। কিন্তু ইতিহাস বলে— তা পুরোপুরি হারিয়ে যায় না। কারণ দেহ ভুলে গেলেও স্মৃতি কোথাও-না-কোথাও জমে থাকে। কোনো মাঠে, কোনো রাস্তায়, কোনো অচেনা অজানা শৈশবের পায়ে। যে পা আবার একদিন বলের উপর দাঁড়াবে। হয়তো একটু থামবে। তারপর ঝুঁকি নেবে। সেই মুহূর্তেই ব্রাজিলীয় ফুটবলের অভিযাত্রা শুরু হবে। নতুন নামে, নতুন ছন্দে, নতুন শিল্প-বিভঙ্গে। সেই পুরোনো সাহস সঙ্গে নিয়ে। নবায়মান সূর্যোদয়ের অভিলক্ষ্যে।

(সমাপ্ত)

### ড. অনিশ রায়

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!
Scroll to Top