আধুনিকতার গতিময় বাজারেও জোগা বনিতো যে-ভাবে নিজস্ব ভাষা নিয়ে স্থির দাঁড়ায়
১৯৯৪-এর পর ব্রাজিলীয় ফুটবল আর কখনও নির্ভার হয়নি। জয়ের পর যে নিশ্চিন্ত ভাব আসে, তা এখানে আসেনি। বরং এসেছে এক ধরনের সতর্কতা। কারণ এই জয়টি আনন্দ দিয়ে নয়, সংযম দিয়ে অর্জিত। সংযম মানুষকে বাঁচায় ঠিকই, কিন্তু সে মানুষকে সন্দেহপ্রবণও করে তোলে। ব্রাজিলীয় ফুটবল এই সন্দেহ নিয়েই ঢুকে পড়েছিল বিশ্বায়নকালীন একুশ শতকীয় আধুনিকতার যুগে।
আধুনিকতা এখানে তো তারিখ নয়। কোনো নির্দিষ্ট কৌশলও নয়। আধুনিকতা হলো একটি ব্যবস্থা— যেখানে ফুটবল আর শুধু খেলা নয়, এক অর্থনৈতিক-বিশ্ব; আর খেলোয়াড় শুধু দেহ নয়, একপ্রকার সম্পাদিত সম্পদ। এই ব্যবস্থার সঙ্গে ব্রাজিলীয় ফুটবলের সম্পর্ক শুরু থেকেই ছিল অস্বস্তিকর। কারণ ব্রাজিলীয় ফুটবল দেহকে বিশ্বাস করে, আর আধুনিকতা দেহকে পরিমাপ করে। পরিমাপ আর বিশ্বাস করার মধ্যে কিন্তু গভীর ফারাক আছে। বিশ্বাস মানে শৈল্পিক ঝুঁকি নেওয়া। পরিমাপ মানে ঝুঁকি কমানো। আধুনিক ফুটবল সব শিল্প-ঝুঁকি কমাতে চায়। ব্রাজিলীয় ফুটবল শৈল্পিক ঝুঁকি ছাড়া কথা বলতে পারে না। এই দ্বন্দ্বই নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি থেকে ব্রাজিলীয় ফুটবলের মূল সংকট হয়ে যায়।
এই সংকটের প্রথম বড়ো উত্তর জেগে ওঠে একটিমাত্র দেহে— সেই দেহের নাম রোনালদো নাজারিও বা R9। R9-কে প্রায়ই ‘সর্বশ্রেষ্ঠ স্ট্রাইকার’ বলা হয়। কিন্তু এই শব্দটিতে তাঁকে পুরোটা ধরা যায় না। তিনি আসলে এক ‘অভাবিত রূপান্তর’। তাঁর দেহে একত্র হয়েছিল আলাদা আলাদা সময়-পর্বের স্মৃতি— গ্যারিঞ্চার দিকবদল, পেলের ভারসাম্য, রিভেলিনোর নান্দনিক শক্তি, জিকোর নৈপুণ্য, মারাদোনার ড্রিবল, নিজস্ব উদ্ভাবনী দক্ষতা আর আধুনিক ফুটবলের গতিময় বিস্ফোরণ। এইগুলো সাধারণত এক দেহে সম্ভবই নয়। R9 এক্ষেত্রে বিশ্বফুটবলে ব্যতিক্রম ছিল এবং এখনও ব্যতিক্রম হয়েই আছেন।
R9-এর ড্রিবলগুলোতে বাহুল্য কম। তিনি খুব বেশি ছক করেন না। কিন্তু তাঁর প্রথম স্টেপটাই প্রতিপক্ষকে স্থির করে দেয়। এই স্থির করে দেওয়াটাই আধুনিক গিঙ্গা। এখানে ছন্দ ছোটো, কিন্তু তীব্র। এই তীব্রতা আধুনিকতার শর্ত মেনে নেয়, কিন্তু স্মৃতি ভুলে যায় না। R9 আধুনিক যুগের সবচেয়ে বড়ো ব্রাজিলীয় সমন্বয়। তাঁর কৃতিত্ব বিশ্বকাপ জয়, গোল্ডেন বল, গোল্ডেন বুট, ফিফা বর্ষসেরা, ব্যালন ডি’অর ইত্যাদি গুরুত্বপূর্ণ; কিন্তু এসবের তুলনায় তাঁর শিল্প আরও অনেক গভীর ও প্রসারিত। তিনি গতি, শক্তি, ড্রিবল ও ফিনিশিংকে এক দেহে মিলিয়ে দেন। স্টেপ-ওভার বা ডবল স্টেপ-ওভার দিয়ে প্রতিপক্ষকে স্থির করা, তারপর বিস্ফোরণ— এটিই হলো আধুনিক ফুটবলের ভাষায় অনূদিত গিঙ্গা। R9 দেখালেন— জোগা বনিতো মানে শুধু ‘ফ্লেয়ার’ নয়; জোগা বনিতো মানে অলসতার সামান্যতম অবসর খোঁজাও নয়। জোগা বনিতো মানে নিষ্ঠুর, দ্রুত ও আকস্মিক সিদ্ধান্তের স্পষ্টতা। কখন ড্রিবল, কখন শট, কখন থামা, কখন কেবল ওয়ান-টাচ, কখন ক্ষিপ্রতা, কখন চকিত গতি, কখন বল হোল্ড করা— এইসব বাছাইয়ের ভেতরেই সৌন্দর্য। যে সৌন্দর্য আর আগের মতো বিস্তৃত হবে না, হবে সংকুচিত। এবং এই সংকোচনই তাকে অস্বাভাবিক কার্যকর করে তোলে। তিনি প্রমাণ করলেন, সৌন্দর্য আধুনিকতার শত্রু নয়; সৌন্দর্যই আধুনিকতাকে মানবিক করে। R9-র দেহ আধুনিক ফুটবলের দেহ— শক্ত, দ্রুত, প্রস্তুত। অবশ্য তাঁর সিদ্ধান্তগুলো ব্রাজিলীয় কিন্তু অ-ভূতপূর্ব। এই দ্বৈততা তাঁকে সময়ের প্রতীক করে তোলে। তিনি দেখান— আধুনিকতার ভেতরে থেকেই কীভাবে স্মৃতিকে বহন করা যায়। ফলত তিনিই হয়ে ওঠেন নান্দনিক ও কার্যকরী আধুনিক ফুটবলের প্রবক্তা ও প্রতিষ্ঠাতা। তারপর তার দেহের ওপর দীর্ঘ-সময় ধরে চলে ভয়াবহ ধ্বংসলীলা। তা সদ্য অতিক্রম করে এসে, ২০০২ সালের বিশ্বকাপে, তাঁর মহানায়ক হয়ে ওঠা ছিল স্বপ্নের থেকেও বৃহত্তর স্বপ্নের, অসম্ভবের থেকেও সীমাহীন অসম্ভব ঘটনা। যা বাস্তবে সংঘটিত হয়েছিল। আর হয়েছিল বলেই বাস্তব পৃথিবী তাঁকে অভাবিত বিস্ময় বলেই মেনে নিয়েছে। সারা পৃথিবী তাঁকে বলেছে- ‘দ্য ফেনোমেনন’ (অতুলনীয় বিস্ময়)। যাঁর প্রতিভা, দক্ষতা, প্রয়োগ আর প্রত্যাবর্তনের তুলনা একমাত্র তিনি নিজেই, কোনোদিক থেকেই আর কেউ নন। বিশ্ব-ফুটবলে শুধু নয়, অন্য কোনো ক্রীড়াক্ষেত্রে এমন অলৌকিক প্রত্যাবর্তন আর সাধিত হয়েছে কিনা জানা নেই। (*R9-কে নিয়ে সম্পূর্ণ আলাদা একটি অধ্যায়ে বলার প্রয়াস রাখব)
আধুনিকতার ভেতরে জমিয়ে তোলা স্মৃতির আরেকটি রূপ রিভালদো। রিভালদোকে বোঝা কঠিন। ফিফা বর্ষসেরা, ব্যালন ডি’অর– এসবের পরেও নয়। কারণ তিনি আনন্দমুখর নন, তাঁর খেলায় হাসি বা আনন্দ কম, ভার অনেক বেশি। তাঁর বাঁ-পায়ের ভলি, দূরপাল্লার শট, হঠাৎ সিদ্ধান্ত— সবকিছুতেই ছিল নাটকীয়তা, কিন্তু তা হাসিমুখে নয়। বাঁ-পায়ের শটগুলো যেন শরীরের ভেতর জমে থাকা কোনো কথার ঘূর্ণিত-বিস্ফোরণ। তিনি দেখান— ব্রাজিলীয় সৌন্দর্য সবসময় উৎসব নয়; কখনো তা গম্ভীর, বিষণ্ণ, প্রায় নাটকীয়। ২০০২-এর ব্রাজিলকে সবাই মনে রাখে R9-এর জন্য। কিন্তু রিভালদো ছাড়া সেই দল অসম্পূর্ণ। ২০০২ বিশ্বকাপে তাঁর অবদান R9-এর প্রায় সমগোত্র। তাঁর সিদ্ধান্তগুলো ছিল কঠিন, প্রায় নিষ্ঠুর। তিনি প্রমাণ করেন— জোগো বনিতো আবেগের একমাত্র রং নয়; এক গভীরতারও নাম। এখানে আবেগ কম, প্রয়োজন বেশি। এই প্রয়োজনই ফুটবলের আধুনিক ভাষা। তবু রিভালদো এই যুগের সবচেয়ে অবমূল্যায়িত প্রতিভা।
ব্রাজিলীয় ফুটবলের সেই নতুন ভাষার নৈতিক মেরুদণ্ড ছিলেন কিন্তু কাফু। কাফু কোনো ট্রিকের মানুষ নন। কাফু আধুনিক সাইড-ব্যাকের প্রোটোটাইপ। তাঁর সৌন্দর্য দৌড়ে। ফুলব্যাক হয়েও তিনি আক্রমণের প্রস্থ তৈরি করেন, আবার ফিরে আসেন। এই আসা-যাওয়া আধুনিক ফুটবলের শর্ত। যার আধুনিক রূপকার হয়েও কিন্তু কাফুর দৌড়ে আধুনিক কোনো যান্ত্রিকতা নেই। এখানে আছে শৈল্পিক দায়িত্ববোধ। আর এখানেই তিনি অনন্য। তিনি জানতেন— এই দলকে ভারসাম্য দিতে হলে কাউকে এইভাবে নিঃশব্দে কাজ করতে হবে। এই নিঃশব্দ কাজটাই আধুনিক জোগা বনিতোর নতুন শিল্প-নৈতিকতা। কাফু একমাত্র খেলোয়াড় যিনি টানা তিনটি বিশ্বকাপ ফাইনাল খেলেছেন। তাঁর নেতৃত্ব প্রমাণ করে— জোগা বনিতো কোনোভাবেই দায়িত্ব-বিভ্রম নয়; তা পেশাদারিত্বের সঙ্গে সৌন্দর্যের সহাবস্থান। তাঁর ভাবনায়, স্কিল মানে শরীরকে শৃঙ্খলার ভেতরেও মুক্ত রাখা। সুন্দরভাবে খেলা মানে শুধু চোখে পড়া নয়; মানে কাজেরও সততা।
রবার্তো কার্লোস আবার সেই সততার ভিন্ন রূপ। রবার্তো কার্লোস যেন বিশ্ব-ফুটবলে এক আকস্মিক বিস্ফোরণ। তাঁর আগমনের আগে কেউ জানতই না, ফুটবল মাঠে লেফট-ব্যাকের কার্যকারিতা সমস্ত মাঠকে নিজস্ব প্রান্ত থেকে এইভাবে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। বিশ্ব-ফুটবলকে এই পাঠ তিনিই প্রথম দান করে গেলেন। তাঁর ফ্রি-কিকগুলো পদার্থবিদ্যার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ বলে মনে হয়। তাঁর বিখ্যাত ফ্রি-কিক দেখায়— বল বাঁকে না, আচরণ বদলায়। কিন্তু আসলে এগুলো তাঁর দেহ-স্মৃতিরই অনুসন্ধান। বল কী করতে পারে— এই প্রশ্নের সুদীর্ঘকালীন পরীক্ষা। এখানে তাঁর স্কিল আর লোকজ নয় ততটা, যতটা প্রায় বৈজ্ঞানিক। তবু এই বিজ্ঞান শুষ্ক যুক্তিভিত্তিক নয় একেবারেই, কারণ এর ভেতরে আছে স্মৃতি ও কল্পনা। তিনি আর ইতালির মালদিনিই প্রথম দেখালেন— ডিফেন্ডারও শিল্পী হতে পারে, এবং সৌন্দর্য কেবল সামনের লাইনের সম্পত্তি নয়।
রোনালদিনহো আধুনিক ফুটবলে আনন্দ ফিরিয়ে আনেন। যখন ফুটবল ক্রমশ হিসেবি, ডেটা-নির্ভর হয়ে উঠছে, তিনি তখন হাসেন। তাঁর এলাস্টিকো, নো-লুক পাস, ফ্রি-স্টাইল কন্ট্রোল— এসব আবার দর্শককে মনে করিয়ে দেয়, ফুটবল আসলে খেলাই; আনন্দময় এক শিল্প-উদযাপন।(*ফুটবলের স্কিল-কে বিষয় করে সম্পূর্ণ আলাদা একটা অধ্যায়ে রোনালদো, রোনালদিনহো ও অন্যান্যদের দক্ষতা নিয়ে বলার প্রয়াস রাখব)। স্কিলের সমস্তরকম ফুলঝুড়ি দেখিয়ে রোনালদিনহো হয়ে ওঠেন রূপকথার নায়ক। রোনালদিনহোর খেলায় জোগা বনিতো আবার জনপ্রিয় সংস্কৃতিতে ফিরে আসে। কিন্তু জোগা বনিতোর এই প্রত্যাবর্তন স্থায়ী হয়নি; বলা ভালো স্থায়ী হতে দেয়নি। কারণ আধুনিক যান্ত্রিকতার চাপ তখন প্রবল। আনন্দকে এখন সংগ্রাম করে নিজের জায়গা করে নিতে হচ্ছে। সেই সংগ্রামের মধ্যে দিয়েই তাঁর অর্জন— বিশ্বকাপ, ব্যালন ডি’অর ইত্যাদি গুরুত্বপূর্ণ; কিন্তু তাঁর শিল্প আরও বৃহৎ ও মহৎ। আসলে তিনি দর্শককে আবার ফুটবলের প্রেমে পড়তে শেখালেন। রোনালদিনহো প্রমাণ করে দিয়ে গেছেন— ডেটা-যুগেও কীভাবে পরিসংখ্যানকে বুড়ো-আঙুল দেখিয়ে প্রেমিক হয়ে উঠতে হয়। কিন্তু হায়, বিশ্ব-ফুটবলে একমাত্র নেইমার ছাড়া আর কেউ সেই রূপকথার প্রেমিকের ভাষা বোঝেনি; শিখতে পারেনি। তার জন্য যে শিল্প-বিশ্বের সব-হারানোর অচিনপুরে উদাসীন চরণচিহ্ন রাখতে হয়। বিশ্ব-ফুটবলে আর কেউ-ই নেই, যার এই দুঃসাহসে পদযুগল দুলে উঠতে দেখলাম–
যাইহোক, ২০০২ ছিল এককথায় সবকিছুর সমন্বয়। সৌন্দর্য, সংযম, আধুনিকতা— সব একসঙ্গে। এই কারণেই ২০০২-এর পর ব্রাজিলীয় ফুটবল একটু একা হয়ে যায়। কারণ এই সমন্বয় আবার তৈরি করা যে-কোনো ক্ষেত্রেই কঠিন। জোগো বনিতো ও জোগা বনিতোর এই একাকীত্বের মাঝেই সংগ্রাম করে চলে, এবং চলেছে, এবং হয়তো চলবে– রোনালদিনহো থেকে কাকা, কাকা থেকে নেইমার, নেইমার থেকে ভিনি… হয়তো এন্ড্রিক, হয়তো এস্তেভাও …
শেষকথা পরের পর্বে।
(চলবে…)
### ড. অনিশ রায়

