“যথাসাধ্য ভালো বলে “ওগো আরও ভালো,
কোন স্বর্ণপুরী তুমি করে থাকো আলো?
আরও ভালো কেঁদে কহে। আমি থাকি, হায়,
অকমণা দান্তিকের অক্ষম ঈর্ষায়।“
সম্প্রসারণ:- ভালো ও আরও ভালোর মাঝের পর্যায় হল যথাসাধ্য ভালো। ভালোতে মন না ভরলে যথাসাধ্য ভালোর চাহিদা জাগে, তাতে মন না ভরলে আরও ভালোর দাবি ওঠে। যথাসাধ্য ভালো বলতে বোঝায় এমন বাস্তবসম্মত ভালো যা ক্ষমতায় করে ওঠা সম্ভব। অর্থাৎ ক্ষমতার বাইরে নয়, অবাস্তবও নয়। আরও ভালো কল্পনাজগতের অধরা সামগ্রী হওয়ায় ক্ষমতার বাইরে ও অবাস্তব। কেউ জানে না এরকম ভালো কতখানি উচ্চমানের। এমন কিছু অকর্মণ্য ও ঈর্ষাকাতর অক্ষম মানুষ আছে যারা অপরের সৃষ্ট ভালো কিছু দেখে প্রশংসা করতে কুণ্ঠিত হয়, যারা নিজেরা অমন ভালো কিছু করতে তো পারেই না, তা ছাড়া তাদের বলা আরও ভালো ঠিক কেমন তারা তা নিজেরাও জানে না, তা তাদের নিছক কল্পনামাত্র। আসলে অকর্মণ্য দান্তিকের অক্ষম ঈর্যায় তার অবস্থিতি আরও ভালো সে-কথা কেঁদে বলে।অকর্মণ্য দাম্ভিকের অক্ষম ঈর্যায়, নিন্দায় ও বিরুদ্ধতায় নিষ্ঠাবান কর্মীরা ভয় পায় না, বিচলিত ও কর্মবিমূখণ্ড হয় না। ক্ষমতাসাধ্য উপায়ে তারা যা কিছু করার চেষ্টা করে। ভালো কি আরও ভালো হল, কি হল না, তা নিয়ে অহেতুক বিব্রত না হয়ে সনিষ্ঠ কর্মপ্রয়াসে ভালো কিছু সুন্দর কিছু করাই তাদের লক্ষ্য।
“বন্যেরা বনে সুন্দর, শিশুরা মাতৃক্রোড়ে”।
সম্প্রসারণ:- আরণ্যক পরিবেশে বন্যজীবজন্তুর অবস্থান যেমন সামঞ্জস্যপূর্ণ তেমনি শোভন ও সুন্দর। বনের শিকারসন্ধানী বাঘ-সিংহের ওঁত পেতে বসে থাকা, হাতির পালের শুঁড় নেড়ে মন্থর গতিতে হেঁটে চলা ত্রস্ত হরিণের চকিতে ঊষাও হয়ে যাওয়া অরণ্যের পটভূমিতে এ দৃশ্য অবর্ণনীয়। চিড়িয়াখানায় কৃত্রিম পরিবেশে কখনই দেখা যেতে পারে না। বন্যপ্রকৃতির সঙ্গে বন্যপ্রাণীর স্বভাব ও আচার-আচরণের স্বাভাবিকতাই নর সৌন্দর্যের প্রকৃত আধার। একই রকম অতুলনীয় সৌন্দর্য লক্ষ করা যায় মাতৃ-অঙ্কে শায়িত শিশুর মধ্যে। মায়ের কোলে শুয়ে শিশুর হাত-পা নেড়ে অঙ্গসঞ্চালন, মুক্তো ঝরানো অনাবিল হাসি, আধো-আধো কথায় সুধা-সিঞন স্বর্গের সৌন্দর্য ও সক্ষমাকে হার মানায়। মাতা মেরির কোলে শিশু যিশুর দিব্যসৌন্দর্য সমগ্র জগতের কাছে অমূল্য সম্পদস্বরূপ।মায়ের কোলই শিশুর নিরাপদ আশ্রয় তথা সৌন্দর্যের যথার্থ আধার। যে পরিবেশে যা স্বাভাবিক, যে সৌন্দর্যের বিকাশ, সেটাই হল তার প্রকৃত ক্ষেত্র। কৃত্রিম পরিবেশ সৌন্দর্যের হানি করে। তাই বন্য পরিবেশে বন্যেরা যেমন সুন্দর, তেমনি শিশু সুন্দর তার মাতৃক্রোড়ে।
“রাজছত্র ভেঙে পড়ে; রণডঙ্কা শব্দ নাহি তোলে;
জয়স্তম্ভ মৃঢ়সম অর্থ তার ভোলে,-
রক্তমাখা অস্ত্র হাতে যত রক্ত–আঁখি
শিশুপাঠ্য কাহিনিতে থাকে মুখ ঢাকি।
ওরা কাজ করে
দেশে দেশান্তরে,
অঙ্গ–বঙ্গ–কলিঙ্গের সমুদ্র–নদীর ঘাটে ঘাটে,
পঞ্জাবে বোম্বাই–গুজরাটে।“
সম্প্রসারণ ;- কালের প্রবাহে ক্ষমতাগর্বী রাজশক্তির অবলোপ যেখানে নিশ্চিত, সেখানে শ্রমজীবী মানুষের ধারা কালপরম্পরায় থাকে অব্যাহত। রাজছত্র ভেঙে পড়ে, রণডঙ্কা স্তব্ধ হয়, জয়স্তম্ভ ধূলিশয্যা নেয়, অত্যাচারী রাজকাহিনি শিশুপাঠ্য গ্রন্থে আত্মগোপন করে, এভাবে অত্যাচার আর সাম্রাজ্যলিপ্সার পরিণাম অবলুপ্তির মধ্য দিয়ে দুঃখবহ হয়। কিন্তু খেতেখামারে, কলকারখানায় শ্রমজীবী মানুষের অস্তিত্ব যুগযুগান্তরের, তাদের কর্মরথের চাকা দেশদেশান্তরে সতত চলমান। রাজার মতো তাদের উত্থানপতন নেই, যেহেতু শাসক ও শোষক হওয়ার স্বপ্ন তারা দেখে না, সাম্রাজ্যের লোভ ও যশের লালসা তাদের নেই। তারা জোগায় ভোগের সামগ্রী, ক্ষুধার অন্ন। তাদের শ্রমের ওপর নির্ভর।করে গড়িয়ে চলে সভ্যতার রথের চাকা। নিরলস শ্রমদান হল মানুষের কল্যাণসাধনে তাদের মহতী ইচ্ছা।সেজন্য তারা শোষিত হয়েও ধ্বংস হয় না, সৃষ্টি থেকে মুছে যায় না, বংশপরম্পরায় থাকে অস্তিত্বের ধারক হয়ে। সেজন্য সারা ভারতব্যাপী তাদের কর্মক্ষেত্র প্রসারিত। অঙ্গ-বঙ্গ-কলিঙ্গ-পাঞ্জাব-মুম্বাই গুজরাত সব জায়গায় তাদের অস্তিত্ব চিরস্থায়ী ও অক্ষয়।
“পথ ভাবে ‘আমি দেব’, রথ ভাবে ‘আমি’,
মূর্তি ভাবে আমি দেব, হাসে অন্তর্যামী।”
সম্প্ৰসাৰণ :- ভক্তসমাগমের সঙ্গে বাদ্যধ্বনি, নাম-সংকীর্তন ও উদ্বেল জনতার কলকোলাহলে রথযাত্রার মেলা জমজমাট। রজ্জুর আকর্ষণে রথ চলেছে। ভক্তেরা পথের ধুলোয় লুটিয়ে পড়ে প্রণাম করছে পথ, রথ মূর্তিকে। প্রণাম পেয়ে পথ, রথ ও মূর্তির প্রত্যেকেই ভাবছে সেই ভক্তের আরাধ্য দেবতা, আর তাতেই অন্তর্যামী ঈশ্বর হাসছেন। কারণ পথ, রথ ও মূর্তি কেউই দেবতা নয়, দেব-আরাধনার উপকরণ বিশেষ, সেজন্য বলা যায়, ওগুলো উপলক্ষ্যমাত্র, দেবতাই হলেন লক্ষ। পরিতাপের বিষয় কিছু ভ্রান্ত মানুষ আরাধ্য দেবতাকে ভুলে তার পুজো-উপচার নিয়ে বড্ড বেশি মাতামাতি করে। তাদের ধারণা পুজোর উপকরণই দেবতা, সেজন্য উপলক্ষ্যকে বেশি করে আঁকড়ে ধরে তাদের। অবশ্য তাতে লক্ষের কিছু যায় আসে না। কিন্তু উপলক্ষ্য নিয়ে বাড়াবাড়ি হাস্যকর হয়ে ওঠে।
“যুগের ধর্ম এই—–
পীড়ন করিলে সে পীড়ন এসে পীড়া দেবে তোমাকেই।”
সম্প্রসারণ– ‘ঢিল ছুড়লেই পাটকেল খেতে হয়। এই চিরন্তন সত্য ভুলে কিছু মানুষ অত্যাচার আর উৎপীড়নের স্টিম রোলার চালিয়ে যায়। তাদের শক্তি ও অহমিকা চরিতার্থ করে অসহায় দুর্বলকে পীড়ন করে। কেউ নিজের ভোগসুখের জন্য, কেউ রাজ্যবিস্তারের জন্য, কেড দিগ্বিজয়ে যায় শক্তি ও অহমিকা প্রকাশের জন্য, কতভাবেই না অত্যাচার ও উৎপীড়নের নজির তৈরি হয় তার ঠিক-ঠিকানা নেই। এমনকি মানুষকে হাটেবাজারের পণ্যসামগ্রী করে কিছু মানুষ অত্যাচারের জঘন্য দৃষ্টান্তও রেখেছে। কিন্তু কালের অমোঘ বিধানে প্রত্যেক অত্যাচারী ও উৎপীড়ককে প্রতিফল পেতে হয়েছে, কঠিন প্রায়শ্চিত্তের মুখোমুখি হতে বাধ্য হয়েছে। ফরাসি বিপ্লব ও রুশ বিপ্লবের পরিণাম একই অমোঘ বিধানকে ইঙ্গিত করে। বস্তুত এরই নাম যুগধর্ম। পরিতাপের বিষয়, মানুষ এত দৃষ্টান্ত দেখেও ইতিহাসের শিক্ষা নিতে ব্যর্থ। মানুষ এখন শিক্ষাদীক্ষায়, জ্ঞান-বিজ্ঞানে সমৃদ্ধ সভ্যতার চরম শিখরে আসীন, তা সত্ত্বেও অত্যাচার-অবিচার ও উৎপীড়নের অবসান হয়েছে কেউই এ কথা বলতে পারবে না। আর সেজন্যই যুগধর্মের অমোঘ বিধানকে লঙ্ঘন করাও সম্ভব হবে না, এ সত্যও দিনমানের মতো স্পষ্ট।
“যা রাখি আমার তরে মিছে তারে রাখি, আমিও রব না যবে সেও হবে ফাঁকি,
যা রাখি সবার তরে সেই শুধু রবে
মোর সাথে ডোবে না সে, রাখে তারে সবে।”
সম্প্রসারণ:- ভোগসর্বস্ব মানুষের চাওয়াপাওয়ার শেষ নেই। তার চারদিকে জমে ভোগ্যবস্তুর পাহাড়। ওই মানুষটি যখন মারা যায়, তখন তার প্রিয় পার্থিব বস্তু অর্থহীন হয়ে ধূলিশয্যায় আশ্রয় নেয়। এই পরিণামের কথা ভেবে মানুষ মরুপথিকের মতো ভোগসর্বস্ব মায়ামরীচিকার পেছনে অন্ধ হয়ে দৌড়োয়। পরিশেষে মর্মান্তিক ব্যর্থতা নিয়ে পরিতাপে ও অনুশোচনার আগুনে তিলে তিলে দগ্ধ হয়। অন্যদিকে চিন্তায় ও কর্মে যারা নিঃস্বার্থ, পরহিত চিন্তায় উৎসর্গিত প্রাণ, তারা আপন ভোগ-সুখের জন্য ভোগ্য বস্তুর প্রতি লালায়িত না হয়ে নিজের যা কিছু তা পরার্থে দান করে। তাদের কাছে বস্তু নয় মানুষ সম্পদ তুল্য মহার্থ, তারা মানুষের কল্যাণসাধনকে জীবনের মহাব্রত বলে মনে করে। তারা যা করে তা দেশকালের সীমারেখার বাঁধা থাকে না, তা দেশকালের ঊর্ধ্বে—সর্বকালীন ও সর্বজনীন, এভাবে অমরত্বের অধিকার লাভ করে। মানুষের প্রয়াণে তাদের কর্মকাণ্ড অবলুপ্ত হয় না। মহাপ্রাণতার জন্য তারা হয় মৃত্যুঞ্জয়ী।
“উত্তম নিশ্চিন্তে চলে অধমের সাথে
তিনিই মধ্যম যিনি চলেন তফাতে।”
সম্প্রসারণ :- সাধুপ্রকৃতির ও আদর্শ চরিত্রের মানুষ যাঁরা, তাঁরা মানুষের মধ্যে সেরা, তাঁরা উত্তম, আর অসৎ প্রবৃত্তি ও অসাধ্য চরিত্রের যারা, তারা নিকৃষ্ট, তারাই নরাধম। উত্তম আর অধমের মাঝে আছে আর-এক শ্রেণীর মানুষ যাদের বলা হয় মধ্যম। মধ্যম নিজের অবস্থায় কখনই সুখী ও নিশ্চিন্ত নয়। ভয়, ভাবনা ও আশঙ্কা তাদের তারা ঘরে ওই কারণে যে, উত্তমের পর্যায়ে উঠতে না পারলে হয়তো নেমে যাবে অধমের স্থানে তখন লোক লজ্জা শোকতাপমানের শেষ থাকবে না। সেজন্য মধ্যম নিজেকে অধমের কাছ থেকে দূরে সরিয়ে রাখে আবার উত্তমেরমতো বড়ো হওয়ার আকাঙ্ক্ষাও মনে মনে পোষণ করে মধ্যম।কিন্তু নিজের ক্ষমতার পরিমাপ বোঝে বলে মধ্যম আত্মসম্মান রক্ষার জন্য উত্তমের কাছ থেকে নিজেকে একইভাবে সরিয়ে রাখে। উত্তম বিবেকবুদ্ধিসম্পন্ন ও উদারমনের হওয়ায় মধ্যমের মতো ভয়-ভাবনা, আশঙ্কা তাকে বিচলিত করেনা,নিজেকে নির্দিষ্ট সীমানার ঘেরাটোপে বেঁধেও রাখে না। সে ভালো-মন্দ নির্বিশেষে সব শ্রেণির মানুষের সঙ্গে অবাধে ও অসংকোচে মিশতে পারে। তার মহত্ত্ব ও উদারতায় প্রতিটি মানুষের হৃদয় স্বর্ণদীপ্ত হয়ে ওঠে।কাজেই ওই মহাপ্রাণতার গুণে মানুষের হৃদয়ের আসনে তার প্রতিষ্ঠা হয়।
“যত বড়ো হোক ইন্দ্ৰধনু সে
সুদূর আকাশে আঁকা,
আমি ভালোবাসি মোর ধরণির
প্রজাপতিটির পাখা।”
সম্প্রসারণ :- যার নাগাল পাওয়া যায় না সেই অধরা বস্তুকে নিয়ে মানুষের না পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা ও কল্পনার শেষ নেই। তাই মানুষের কাছে আকাশের অধরা চাঁদ অত মোহময়, সৌন্দর্যের আধার, কল্পনার সামগ্রী। মেঘের বুকে ইন্দ্রধনুর বর্ণালি শোভা একই রকম চিত্তাকর্ষক, মোহময় ও কল্পনার সামগ্রী। কল্পনার বিপরীতে আছে কঠিন ও রূঢ় বাস্তব, সেখানে বর্ণালি ইন্দ্রধনুর অস্তিত্ব নেই। মানুষের জীবন চলে বাস্তবের কঠিন মাটিতে, যেখানে কল্পনা দিবাস্বপ্নের মতো অলীক ও বিলাসমাত্র। মানুষের কাছে কল্পনার চেয়ে বাস্তব অনেক বেশি অস্তিত্বসম্পন্ন সত্য। আকাশের ইন্দ্রধনু নয়, মাটির গন্ধমাখা প্রজাপতি তার কাছে বাস্তব অস্তিত্বসম্পন্ন। সেজন্য ইন্দ্রধনুর চেয়ে প্রজাপতি অনেক বেশি গ্রহণীয়। কল্পনার ভাবালুতায় হয়তো রোমান্টিকতার কিছু খোরাক জোটে; কিন্তু বাস্তব জীবনে তার প্রয়োজনীয়তা কতটুকু ? অমন সুখস্বপ্নে বিভোর হয়ে বাস্তব জীবনের সমস্যাদির সুরাহা হয় না। কল্পনা বা ভাবালুতায় নয় বাস্তবের রূঢ় কাঠিন্যে মেলে জীবনের তাৎপর্য। সৌন্দর্যপ্রেমিক মানুষ বাস্তবকে স্বীকার করে নিয়ে প্রজাপতির সাতরঙা পাখায় ইন্দ্রধনুর প্রতিফলন দেখে সান্ত্বনা পেতে পারেন।
“পরের কাছে হইব বড়ো
এ কথা গিয়ে ভুলে
বৃহৎ যেন হইতে পারি নিজের প্রাণমূলে।“
সম্প্রসারণ :সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের চেষ্টাই হল নিজেকে বড়ো বলে প্রতিপন্ন করে নিজের শ্রেষ্ঠত্বকে জাহির করা। তাদের মনোগত অভিপ্রায় একটাই, কর্মী, স্রষ্টা, শিল্পী, বিজ্ঞানী যে-কোনো পেশার মানুষ হন না কেন নিজেকে দেখান যে আমি কত বড়ো, আমার শ্রেষ্ঠত্ব হেলাফেলার নয়। আত্মপ্রচারের ওই ঢক্কানিনাদের খামতি নেই। এভাবে নিজের ঢাক নিজে পিটিয়ে কি বড়ো বলে প্রতিপন্ন করা যায় ? লোকে যারে বড়ো বলে বড়ো হয়—এ কথা তো সত্য। কাজেই বড়োত্ব প্রতিষ্ঠার চেষ্টা ভ্রান্তিমাত্র। বৃহতের ভাবনা অহমিকাশূন্য, পরের জন্য আত্মোৎসর্গে তার মহিমার প্রকাশ, নিজের জন্য নয় চলে তার সাধনা। সংকীর্ণতা নয়, মুক্তপ্রাণের অবাধলীলা গড়ে বৃহত্তের আরাধনা। খ্যাতি ও যশের কমনা না করে নিঃস্বার্থ কর্মে আত্মনিয়োগ হল মহত্ত্ব লাভের সোপান মহৎ ও বৃহৎ হৃদয় তো শ্রেষ্ঠত্বের অধিকারী যা নিজেকে জাহির করা বা প্রচারের অবশিষ্ট রাখেনা ।
“হাস্যমুখে অদৃষ্টেরে করব মোরা পরিহাস।“
সম্প্রসারণ :- জীবনযুদ্ধে পরাজিত ও ভাগ্যহত কিছু মানুষের ধারণা তাদের পরাজয় ও ভাগ্যবিপর্যয়ের কারণ হল অদৃশ্য দৈবশক্তি, যা অদৃষ্ট বা নিয়তি নামে অভিহিত। এ শক্তি নাকি মানুষের করায়ত্তের বাইরে, নিয়ন্ত্রণের অতীত। সাধ্য নেই তাকে বাধ্য করার, তাই বলা হয় ‘নিয়তি কেন বাধ্যতে’। মানুষ অদৃষ্টের হাতের পুতুল।মানুষের ভাগ্য তার খেয়ালখুশি ও মর্জি অনুযায়ী নিয়ন্ত্রিত হয়। অদৃষ্টবিড়ম্বিত চরিত্র হিসাবে মহাবীর কর্ণের নাম উল্লেখ্য।
যুক্তিবাদী প্রগতিশীল সমাজে যুক্তিবাদের সম্পূর্ণ অবসান হয়েছে এ কথা বলা যায় না। বিপন্ন মানুষ আজও অদৃষ্টের দোহাই দিয়ে নিশ্চেষ্ট হতে চায়। অদৃষ্টের অলীক হাতে আজও বিপর্যস্ত মানুষকে নিজেকে সঁপে দিতে দেখা যায়। যারা যৌবনশক্তিতে দুর্বার সংগ্রামী, তারা অদৃষ্টনামের অদৃশ্য শক্তিতে বিশ্বাসী নয়, নিরন্তর যুদ্ধের মধ্য দিয়ে জীবনের সেরা ফসলটি তুলে নিতে চায়। তাদের দৃঢ়বিশ্বাস ভাগ্য মানুষকে চালনা করে না,ভাগ্য মানুষই গড়ে।
“যুদ্ধ মানে শত্রু শত্রু খেলা,
যুদ্ধ মানে আমার প্রতি তোমার অবহেলা।“
সম্প্রসারণ:- যুদ্ধবাজ মানুষ অবিবেকী শত্রুতার খেলায় মাতে। শত্রুতার ফলশ্রুতিই হল যুদ্ধ। যুদ্ধের পরিণাম হল রক্তক্ষয়, প্রাণহানি, ধ্বংস, অবক্ষয়। বিশ্ববাসীর স্মৃতিতে দু-দুটি ভয়ংকর বিশ্বযুদ্ধের স্মৃতি দুঃস্বপ্নের মতোআজও রোমহর্ষক। হিরোসিমা-নাগাসাকির পারমাণবিক হত্যালীলা আজও বিশ্ববাসীর কাছে বিভীষিকাময় ত্রাস যুদ্ধ শুধু শত্রুতার খেলা নয়, একের প্রতি অপরের পৈশাচিকতার প্রকাশ, যেখানে স্নেহ-ভালোবাসা-মমত্ত্বের সামান্যতম স্থান নেই। জিঘাংসায়, অত্যাচারে ও উৎপীড়নে মনুষ্যত্ব ও মানবধর্মের অবমাননা হতে থাকে পদেপদে। জনপদের পর জনপদ যুদ্ধবিধ্বস্ত শ্মশানপুরীতে পরিণত হয়। কিন্তু যুদ্ধের বিপরীতে শান্তি দেয় সুখসমৃদ্ধি সর্বাঙ্গীণ আত্মবিকাশের অনুকূল পরিবেশ। শিক্ষা-সংস্কৃতি, সাহিত্য-শিল্পকলার সম্যক উৎকর্ষ ঘটে, শাক্তির নিরুদবিগ্ন পরিমণ্ডল গড়ে ওঠে। ‘যুদ্ধ নয় শান্তি চাই’ শান্তিকামী বিশ্ববাসীর তাই একান্ত কামনা।
“আলো বলে, অন্ধকার তুই বড়ো কালো,
অন্ধকার বলে, ভাই, তাই তুমি আলো।”
সম্প্রসারণ;- আলো হল উজ্জ্বল দীপ্তিময়, অন্ধকার হল আলোহীন তমসা। আলোর বিপরীত রূপ হল অন্ধকার আলোর প্রতি আকর্ষণ যতখানি, অন্ধকারের প্রতি ততখানিই অনাগ্রহ। তবু মেনে নিতে হবে, অন্ধকার আছে বলেই আলো অত দীপ্তময়, আলোর গৌরব বৃদ্ধি। আলো ও অন্ধকারের মতো মানুষের সমাজেও বিপরীতধর্মী কত কিছুই আছে—ভালোমন্দ, পাপপুণ্য, সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনা, আশানিরাশা, উত্থানপতন, বলে শেষ করা যায় না। ওই বিপরীতধর্মিতা সৃষ্টিকে করেছে বৈচিত্র্যময়, সুন্দরতর ও মধুময়। দুঃখ নেই শুধুই সুখ, সে তো ‘হ্যাপি প্রিন্স’-এর মতো বিড়ম্বিত জীবন। পতনের হতাশাময় জীবনের মাঝে উত্থানের আনন্দঘন মুহূর্তের মুহূর্তের তুলনা হয় না। কাজেই আমাদের কাছে অন্ধকারের মতো মন্দ, পাপ, দুঃখ, বেদনা নিরাশা পতন ইত্যাদি যতই অনভিপ্রেত হোক ওগুলি প্রয়োজনে তাকে অস্বীকার করা যায় না এ কথা তো ঠিক যে ব্যর্থতা ও অসাফল্যের মাঝে লুকিয়ে থাকে সাফল্যের চাবিকাঠি। সেজন্য সৃষ্টিতে বিপরীতধর্মী সহবাস্থান অপরিহার্য।
“ভাবের ললিত ক্রোড়ে না রাখি নিলীন
কর্মক্ষেত্রে করি দাও সক্ষম স্বাধীন।”
সম্প্রসারণ;- মানুষের মনোভূমি ভাবনা ও ভাবাবেগের উদ্ভবক্ষেত্র। জন্মসূত্রে ভাবনা ও ভাবাবেগ সহজাত হলেও প্রকৃতিগত দিক থেকে উভয়ের পার্থক্য দুস্তর। সেজন্য ভাবনা ও ভাবাবেগ এক নয়। ভাবনা ভাবজাত ও মননশীল। আর ভাবাবেগ আবেগে ও উচ্ছ্বাসে ভরা। ভাবনার চেয়ে ভাবাবেগ প্রবল হলে তাতে কর্মীর মন সহজে দুর্বল হয়, একটি কাজ সুচারুভাবে সম্পন্ন হওয়ার জন্য যে একাগ্রতা, নিষ্ঠা, সংযম, যুক্তিধর্মিতা, অধ্যবসায় প্রভৃতি গুণের প্রয়োজন হয়, তা ব্যাহত হয়। অর্থাৎ ভাববিলাস কাজের অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়।
বাঙালি স্বভাবের ভাববিলাস বা ভাবাবেগের অপবাদ আছে। ওই স্বভাবজ ত্রুটির জন্য বাঙালি কাজের ক্ষেত্রে প্রায়শ বাস্তবনিষ্ঠার পরিচয় রাখতে ব্যর্থ হয়। তাই ভাবাবেগ নয়, বস্তুনিষ্ঠ ভাবসংযম কাজের ব্যাপারে একান্ত অপরিহার্য। ভাবাবেগের স্রোতে নিজেকে ভাসিয়ে না দিয়ে নিষ্ঠায় সংযমে অথচ খুশিভরা মুক্তমনে কাজে অগ্রণী হতে পারলে, সে-কাজে সার্থকতা অর্জন অবধারিত।
“পাখিরা আকাশে উড়ে দেখিয়া হিংসায়
পিপীলিকা বিধাতার কাছে পাখা চায়,
বিধাতা দিলেন পাখা, দেখো তার ফল,
আগুনে পুড়িয়া মরে পিপীলিকার দল।”
সম্প্রসারণ:- অপরের ভালো কিছু দেখে ঈর্ষাকাতর না হয়ে নিজের স্বভাবধর্ম ও ক্ষমতা অনুযায়ী চলা বাঞ্ছনীয়।পাখির ডানা আছে বলে সে আকাশে উড়তে পারে, পিপীলিকার ডানা না থাকায় সে ওই ক্ষমতার অধিকারী নয়। অথচ সৃষ্টিকর্তা ঈশ্বরের কাছে সে চাইল পাখা, বিধাতা তার ইচ্ছা পূর্ণ করায় উড়তে গিয়ে আগুনে পড়ে তার মৃত্যু হল। স্বভাব ও ক্ষমতাবিরুদ্ধ কাজ করতে গিয়ে পরিণামে এল অকালমৃত্যু।
উপরের দৃষ্টান্ত থেকে মানুষের এই শিক্ষা নেওয়া দরকার যে, নিজের স্বভাবধর্ম অনুযায়ী আচরণ করাই হল তার জীবনের লক্ষ্য ও অভিপ্রায়। নিজের স্বভাবধর্ম ত্যাগ করে অপরের স্বভাবধর্ম গ্রহণের ফল ভালো হয় না। একইভাবে অপরের সুখসমৃদ্ধির প্রতি ঈর্ষাকাতর হয়ে নিজের যোগ্যতা ও ক্ষমতার অতিরিক্ত কিছু করতে গেলে তার পরিণাম হয় দুঃখবহ। ওই সত্যতা ভুললে হবে না। মনে রাখতে হবে আপন শক্তিসামর্থ্যে সন্তুষ্ট থেকে নিজের স্বভাবধর্ম রক্ষা করা মানুষমাত্রেরই পালনীয় কর্তব্য।
“মেঘ দেখে কেউ করিসনে ভয়,
আড়ালে তার সূর্য হাসে।
হারা শশীর হারা হাসি
অন্ধকারেই ফিরে আসে।”
সম্প্রসারণ :- বিপদের সংকেত নিয়ে জীবনে চলার পথে কালো মেঘ ঘনিয়ে এলে, তাতে ভয় না রাখা দরকার, মেঘের আড়ালে আছে অংশুমান সূর্য তার চিরহাস্যময় মুখ নিয়ে। মেঘ সরে গেলেই তার দীপ্তিময় উজ্জ্বল হাসিতে ভরে যাবে বিশ্ব চরাচর। প্রকৃতপক্ষে মেঘ আর সূর্যের দীপ্ত রশ্মিচ্ছাটা বিপদ আর বিপদমুক্তির প্রতীক। বিপদের তামসীছায়া মাঝে মাঝে জীবনপথকে ঢেকে ফেলে, কিন্তু তার অবস্থিতি সাময়িককালের। এই কথা মনে রেখে বাধাবিপত্তির কাঁটা দলে নির্ভয়ে নিৰ্ভীক চিত্তে এগিয়ে চলতে হয়। বিপদ মানুষের শত্রু নয়, বিপদে বিরুদ্ধে লড়াই করে অস্তিত্ব রক্ষার জন্য মানুষ হয় সংগ্রামী, সেদিক থেকে বিপদ মিত্রতুল্য। দুর্যোগরাত্রি কেটে যাওয়ার পর নতুনদিনের আলোয় কি চারদিক জ্যোতিষ্মান হয় না? অমাবস্যার অন্ধকারে হারিয়ে-যাওয়া চাঁদের হাসি অমাবস্যা পরবর্তী রাত্রিতে কি ঝরে পড়ে না ? সেজন্য বাধাবিপত্তিতে ভয় পেতে নেই। যে বাধাবিপত্তিকে নির্ভয়ে জয় করতে পারে, সে হয় ভীষণ দুঃখ দুর্গতির মধ্যেও পরমসুখের অধিকারী। তার জীবন সাফল্য ও সার্থকতায় হয়ে ওঠে ধন্য।
“বিরাম কাজের অঙ্গ এক সঙ্গে গাঁথা,
নয়নের অংশ যেন নয়নের পাতা।“
সম্প্রসারণ :- গাঁইতি চালিয়ে যে মানুষটি পাথর ভাঙে মাথার ঘাম পায়ে ফেলে, সে দু-দণ্ড জিরোয় হাতের গাঁইতি ফেলে। এই যে ক্ষণিক বিশ্রাম, এ কি শুধু ক্লান্তি আর অবসাদ দূর করার জন্য ? অবশ্যই, কিন্তু সেই সঙ্গে নতুন উদ্যমে, নতুন উৎসাহে ও নতুন কর্মপ্রেরণায় উজ্জীবিত হয়ে পরবর্তী কাজের জন্য তৈরি হওয়াও। বিশ্রাম বা বিরতি বা অবকাশ আপাতভাবে কাজের বিরোধী মনে হলেও প্রকৃতপক্ষে তা কাজেরই অঙ্গ, যেমন চোখের পাতা চোখেরই অঙ্গবিশেষ। কর্মজীবনের অপরিহার্য অঙ্গ হল বিশ্রাম। বিরামহীন কাজে আসে ক্লান্তি, অবসাদ, একঘেয়েমি, বৈচিত্র্যহীনতা বিপরীতপক্ষে বিশ্রাম কাজে আনে নতুন উদ্যোগ ও প্রেরণা, আনে একঘেয়েমির নাগপাশ থেকে মুক্তি, নব আস্বাদন, প্রাণের স্ফূর্তি, জীবনের মধুময় ছন্দ ও চলার উদ্দাম গতি। যেন মুক্তির অবাধ উল্লাসে পাখির আকাশে পাখা মেলে দেওয়া। যে-মানুষটি গুটিয়ে থাকে কর্মব্যস্ততার ঘেরাটোপে, সে নিজেকে নানা আনন্দ অনুষ্ঠানে মেলে ধরে পরিপূর্ণভাবে। কাজের মাঝে বিশ্রাম যেন মুক্ত বাতায়ন, পথে বহমান প্রাণদ বাতাস মুছে দেয় রুদ্ধশ্বাস শ্রমশ্রান্তিকে। কর্মীর কর্মক্ষমতাকে বাড়ায় বিশ্রাম, সেই জন্য কাজের সঙ্গে বিশ্রামের বিরোধ তো নেই-ই বরং জীবনকে নব কর্মশক্তিতে প্রাণবন্ত করে বিশ্রাম।
“হৃদয়ে কৃপণ হয়ে ধনী হতে চায়—
সুখ তারা দেয় নাকো, তাই দুঃখ পায়।“
সংখ্যাগরিষ্ঠ গরিবের শ্রমার্জিত সম্পদ শোষণ করে ধনীর ধনবৃদ্ধি ঘটে। অর্থকৃচ্ছ মন ও সংকীর্ণ মানসিকতা ধনীর ধনবৃদ্ধির পেছনে কাজ করে। কৃপণ ধনীর চরিত্রের বৈশিষ্ট্য শুধু ব্যয়কুণ্ঠতাই নয়, মনের দিক থেকেও নিঃস্বতাও বিনিময়ের মাধ্যমে অর্থ উপযোগ সৃষ্টি করে বলেই তার মূল্য। অর্থকে বিনিময়ের কাজে কৃপণ ধনী লাগায় না
না বলে অর্থ উল্লিখিত উপযোগ সৃষ্টি করতে ব্যর্থ হয়। সমাজে এরকম ধনী নিন্দনীয়। এদের
এবং মন হয় ক্ষুদ্র ও সংকীর্ণ। মহত্ত্ব ও উদারতার সঙ্গে বস্তুগত মূল্য হল দানের মাধ্যমে গরিবের হাতে অর্থ এলে, সে-টাকার দান-করা অর্থের মূল্যবৃদ্ধি ঘটে। তাই ব্যয়কুণ্ঠতায় কিংবা কৃপণতায় গৌরব নেই, আনন্দ নেই বরং ক্রাশিত হয়। বিপরীতপক্ষে দানে আছে অপার আনন্দ, সুখ ও পরম তৃপ্তি, আছে মহানুভবতা ও মহাপ্রাণতা।লোকহিতে সর্বস্ব দিয়ে সর্বরিক্ত হয়ে মহীয়ান হয়েছে এমন দৃষ্টান্ত মানব ইতিহাসে দুর্লভ নয়।
“রাত্রে যদি সূর্য শোকে ঝড়ে অশ্রু ধারা
সূর্য নাহি ফিরে শুধু ব্যর্থ হয় তারা“।
সম্প্রসারণ :- অতীত বর্তমান ও ভবিষ্যৎ এই তিন কাল নিয়ে মহাকালের অন্তহীন প্রবাহধারা ভবিষ্যৎ নিয়ে মানুষের তবেশি ব্যাকুলতা নেই যেহেতু অনাগত ভবিষ্যৎ অধরা বর্তমান প্রত্যক্ষ বাস্তব সে জন্য অতি রূঢ় ও কঠিন। অতীত দূরে চলে-যাওয়া স্মৃতির সামগ্রী, দূর থেকে দেখা ধূসর পাহাড়ের মতো মনে অতীতের কথা উঠলেই মন তাই আবেগে-আগ্রহে চঞ্চল হয়, হারানোর ব্যাকুলতায় বেদনাবিধুর হয়, স্মৃতিচারণের মধুর আবেশে বিভোর হয়। মনের আকাশে অতীত স্মৃতির মায়াঞ্জন স্পর্শে রামধনুর মতো বর্ণমন প্রতিভাত হয়। রাত্রির বর্তমান দৃশ্য আকাশের নক্ষত্রখচিত শোভা ও সৌন্দর্যের কথা ভুলে অতীত হয়ে সূর্যাস্তের স্বর্ণশোভার জন্য ব্যাকুল চিত্তে চোখের জল ফেলাই সার, কারণ অতীতকে ফিরে পাওয়া কখনই সম্ভব নয়। মহার্ঘ সম্পদের বিনিময়ে সমগ্র ধরিত্রী, এমনকি শতঅশ্রুবর্ষণেও অতীত ফেরে না। অথচ মূর্খ মানুষ বিগতকে নিয়ে মর্মবেদনায় ভোগে, স্মৃতিচারণে উদ্ভ্রান্ত হয়। কাজেই অতীত নিয়ে বৃথা মর্মপীড়িত না হয়ে বর্তমানে মগ্ন থেকে সন্তুষ্ট হওয়াই বিধেয়।
“অত্যাচারীর বিজয় তোরণ
ভেঙেছে ধূলার ‘পর
শিশুরা তাহারই পাথরে আপন
গড়িছে খেলা ঘর।”
সম্প্রসারণ :- রাজ্যজয়ের স্মারক চিহ্ন হল বিজয়তোরণ। তাতে আগ্রাসী সাম্রাজ্যলোভী শাসকের শক্তি ও অহমিকার যেমন প্রকাশ থাকে, তেমনি জড়িয়ে থাকে রক্তক্ষয়, প্রাণহানি আর অমানবিক নৃশংসতার বীভৎস পরিচয়। সবচেয়ে পরিহাসের ব্যাপার হল ওই বিজয়ী রাজশক্তি ভাবে তার নির্মিত বিজয়তোরণ অমরত্বের বাহক হবে, কিন্তু তা কি সম্ভব? ইতিহাসের অমোঘ বিধানই হল ক্রমাগত অত্যাচার ও উৎপীড়নের ফলে সমাজে বিদ্রোহ ও বিপ্লবের আগুন একদিন জ্বলে ওঠে, যা থেকে অত্যাচারী শাসকদল ও পরিত্রাণ পায় না, তখন কৃতকর্মের প্রায়শ্চিত্ত করতে হয় তাদের।
কালক্রমে বিজয়তোরণের উদ্ধত আকাশচুম্বী মিনার ভেঙে ধূলিশয্যা গ্রহণ করে। তার টুকরো শিলাখণ্ড শিশুদের খেলার উপকরণে পরিণত হয়। তারা পাথরের পর পাথর সাজিয়ে খেলাঘর বানায়। অত্যাচার আর সাম্রাজ্যলিপ্সার কাহিনি ইতিহাসের কলঙ্কিত অধ্যায়রূপে গণ্য হয়। জনগণের স্মৃতিতে তার ঠাঁই হয় না বলে, অত্যাচারী শাসকের অমরত্বের আকাঙ্ক্ষা থাকে অপূর্ণ, অথচ মানুষ ওই পরিণামের কথা
ভাবে না।
“কে লইবে মোর কার্য, কহে সন্ধ্যা রবি
শুনিয়া জগৎ রহে নিরুত্তর ছবি।
মাটির প্রদীপ ছিল ; সে কহিল, স্বামী,
আমার যেটুকু সাধ্য করিব তা আমি।”
সম্প্রসারণ :- সূর্য অস্ত যাওয়ার আগে তার কর্তব্যভার গ্রহণের জন্য আহ্বান জানায়। আহ্বানে পৃথিবী থাকে, কিন্তু মাটির প্রদীপ, ক্ষীণশিখা তার, তা সত্ত্বেও কার্যভারের দায়িত্ব নেয় সে।
সূর্যের বিশাল আলোকসম্ভারের তুলনায় প্রদীপশিখার আলো শুধু তুচ্ছ নয়, তুচ্ছাতিতুচ্ছ। মহাশক্তিধর সূর্য তার বিশাল আলোর বন্যায় পৃথিবীর অন্ধকার দূর করে আলোকোজ্জ্বল করে। সে জায়গায় মাটির প্রদীপের ক্ষমতা হল ঘরের একটি কোণ আলোকিত করা। তা সত্ত্বেও ক্ষুদ্র শক্তির প্রদীপ এগিয়ে আসে এই বিশ্বাসে যে, অস্তিত্ত্বে ক্ষুদ্র হলেও কর্ম সাধনে তার মনোবল বিশাল। কর্মব্যসাধনে মনোবলের সঙ্গে আত্মবিশ্বাস ও আন্তরিকতা একান্ত প্রয়োজন। গুণের অধিকারী হলে কর্তব্য সাধনে কোনো কিছুই বাধা হতে পারে না। কাজে নিষ্ঠা ও আন্তরিকতা থাকলে ক্ষুদ্রশক্তি ও বিশাল কর্তব্য সাধনে সফল হয় ।শক্তি ক্ষুদ্র তা সত্বেও বড় বড় কাজের দায়িত্ব সুচারুভাবে পালন করেছে এমন দৃষ্টান্ত অনেক আছে।
“পেঁচা রাষ্ট্র করি দেয় পেলে কোনো ছুতা,
জান না আমার সাথে সূর্যের শত্রুতা।“
সম্প্রসারণ;- দিবাভাগে গাছের কোটরে আত্মগোপনকারী প্যাচার শত্রু হল সূর্য। সে অন্ধকারের জীব বলে তার মনটা অন্ধকারের মতো অতি সংকীর্ণ ও তমসাবৃত। কাজেই প্যাচা সূর্যের নিন্দা ও অপযশ প্রচার করে বেড়াবে ও ঈর্ষার আগুনে জ্বলবে এটাই স্বাভাবিক।
সমাজে এরকম পেচকবৃত্তির মানুষের অভাব নেই। হীনমনা ওইসব মানুষের স্বভাবই হল পরশ্রীকাতর হয়ে ঈর্ষাপরায়ণ হওয়া এবং পরনিন্দায় মুখর হওয়া। কিন্তু যাঁরা সূর্যের মতো মহাপ্রাণ, তাঁদের প্রতি নিন্দা ও অপযশের কালিমা ছিটিয়ে তাঁদের মহত্ত্বকে কালিমালিপ্ত করা কি সম্ভব ? আসলে ভালো কিছু করার ও ভালো কিছু দেখার মন পেচকবৃত্তিধারী সংকীর্ণচেতা মানুষের নেই। সেই কারণে তারা মহতের মহত্ত্বকে মেনে নিতে ব্যর্থ হয়। ওই প্রকৃতির মানুষ যতই শিক্ষা-সংস্কৃতির আলোতে আসুক, তাদের স্বভাবধর্মের ক্ষুদ্রতা ও নীচতা মুছে যায় না। কয়লাকে যতই ধোয়া হোক তার কালিমা কি মুছে যায় ? অজ্ঞতা, নীচতা ও সংকীর্ণতার অন্ধকারে নিমজ্জিত যারা, তাদের দৃষ্টিতে মহতের মহত্ত্ব ও সত্য-সুন্দর মূর্তি ধরা পড়বে কেন, অথচ ধরা পড়া একান্ত প্রয়োজন, তাতেই মানুষ হয়ে জন্মানোর সার্থকতা।
“বিরাম কাজের অঙ্গ…”
ভাবসম্প্রসারণ: সুন্দর পৃথিবীতে কর্মমুখর জীবনের জন্যে পরিশ্রম ও বিশ্রাম দুটোই অপরিহার্য। এ যেন চোখ আর চোখের পাতার মতাে একটি অন্যটির সাথে নিবিড়ভাবে জড়িত। পরিশ্রমের মাধ্যমেই জীবনে সফলতা আসে আর বিশ্রাম কাজের শক্তি জোগায়। জীবনে সাফল্য পেতে হলে মানুষকে বহুবিধ কাজ করতে হয়। কঠোর পরিশ্রম ও কর্মসাধনাই একমাত্র পথ, যা মানুষের জীবনকে সার্থক করে তুলতে পারে। আর পরিশ্রম করার শক্তি ও প্রেরণা আসে বিশ্রামের অবকাশ থেকে। জীবনকে সার্থক করে তুলতে পারে। ফুলের পাপড়ি ছুঁয়ে উড়ে বেড়ায় যে প্রজাপতি, সে এক সময় ডানা গুটিয়ে নিশ্চল হয়ে বসে। অন্তহীন নীলিমায় উড়ে বেড়ানাে অবাধ বিহঙ্গা নেমে আসে মাটির বুকে, খানিকটা জিরিয়ে নেয়। যে মানুষটি মাথার ঘাম পায়ে ফেলে গাঁইতি চালিয়ে পাথর ভাঙে, সে হাতিয়ার ফেলে দু দণ্ড দাঁড়ায়। এ যে ক্ষণিক বিরতি। এ যে এতটুকু বিশ্রাম, এ তাে শুধু ক্লান্তি উপশম নয়, নতুন কর্মপ্রেরণায়, নবউদ্যমে উজ্জীবিত হয়ে পরবর্তী কাজের জন্যে প্রস্তুত হওয়া। পরিশ্রম ব্যতীত সময়টুকু হলাে অবকাশ । কাজ জীবনে আনে সমৃদ্ধি। আর বিশ্রাম আনে কাজে উদ্যম, শক্তি ও প্রেরণা। পরিশ্রমের পর শ্রান্ত ও ক্লান্ত দেহকে সুস্থ করে মৃত উদ্যম ফিরিয়ে আনার জন্যে যেমন বিশ্রামের প্রয়ােজন, তেমনি বিশ্রামের পর দেহের কর্মস্পৃহাকে সচল সজীব রাখার জন্যে নিয়মিত শ্রমেরও প্রয়োজন। দেহের পক্ষে একটানা পরিশ্রম যেমন ক্ষতিকর তেমনি একটানা বিশ্রাম মােটেও সুখকর নয়। একটানা বিশ্রাম জীবনকে করে তােলে অলস, অচল ও কর্মবিমুখ। পক্ষান্তরে, একটানা পরিশ্রমের ফলে দেহমনে ভর করে অবসাদ, লুপ্ত হয় দেহের কর্মক্ষমতা বিশ্রাম কোনাে বিলাসিতা কিংবা কর্মঘণ্টার অপচয় নয়। চোখের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ যেমন চোখের পাতা তেমনি কাজের অবিচ্ছেদ্য অংশ বিশ্রাম । পরিশ্রম ছাড়া বিশ্রামের কোনাে সার্থকতা নেই। কাজে আত্মনিবেদিত থাকার অজুহাতে বিশ্রামকে অস্বীকার করাও বিবেচনাপ্রসূত নয়।
“বৈরাগ্য সাধনে মুক্তি সে আমার নয়…”
মূলভাব: বৈরাগ্য সাধনে মানুষের মুক্তি সম্পাদিত হয় না ।মানুষের আসল অর্থে মুক্তি সম্পাদিত হয় মানুষের মাঝে থেকে আনন্দ লাভের মধ্য দিয়ে ।
সম্প্রসারিত ভাব: বৈরাগ্য হলো হৃদয়ের এক অভ্যন্তরীণ গভীর অনুভূতি যা মানুষকে সকল প্রকার বাহ্যিক বন্ধন থেকে মুক্ত করে। তবে সব সময় বৈরাগ্যের পথ অনুসরণ করতে হবে তা নয়। যদি সংসারের থেকে কামনা বাসনা অকাতর ভাবে ত্যাগ করতে পারা যায় তবে মুক্তি পাওয়া সম্ভব। সাধনার দ্বারা মনস্থিরতা সন্তুষ্টি খুঁজে পেলে মানুষের মুক্তি সম্ভব। কামনার জন্য অত্যাধিক ব্যয় না করে সার্থকভাবে জীবন যাপন করা উচিত এবং সঠিক সাধনার দ্বারা মনস্থিরতা ও আনন্দপ্রাপ্তি তখনই সম্ভব। সর্বাগ্রে মানুষকে ইন্দ্রের প্রতি সংযমতা গ্রহণ করতে হবে। লোভ এবং সার্থমুক্ত হয়ে প্রত্যেক মানুষকে সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়াতে হবে এই লৌহ মুক্তির স্বাদ পেলে মানুষ সম্পূর্ণ আনন্দময়তা লাভ করবে এবং বন্ধন মুক্ত হবে। বৈরাগ্য অর্জন কারী মানুষ প্রাকৃতিক বন্ধন মুক্ত হয়। এবং আনন্দময় জীবনের সন্ধান প্রাপ্ত হয় কিন্তু এ খুব কঠিন ব্যাপার যা সাংসারিক মানুষের সেই স্বাদ গ্রহণ করা অসম্ভবকর হয়ে ওঠে। তাই আসল মুক্তির স্বাদ সংসার ধর্ম পালনের মধ্য দিয়েই পূর্ণ করতে হবে কারণ সংসারী মানুষ কখনো সঠিক অর্থে বৈরাগ্য ধারণ করতে সক্ষম হন না। সংসার ধর্ম পালন করে বৈরাগ্য ধর্ম পালন করা প্রায় অসম্ভব সংসারে থাকতে গেলে লোভ মায়া মোহ র স্বার্থ এই সমস্ত কিছু বেষ্টন করে থাকে। এগুলি একমাত্র ইন্দ্রিয় সংযম দ্বারা অভ্যাস এর মাধ্যমে পরিবর্তন করা সম্ভব। মানুষের মাঝে থেকে মানুষের স্বার্থে নিজেদের জীবনকে কাজে লাগানো এবং তার মাধ্যমে সঠিক মুক্তি লাভ করা সম্ভব। এবং এর মাধ্যমে একটি সংগঠিত সংলগ্ন ও সমৃদ্ধ জীবনের পথে এগিয়ে যেতে আমরা সক্ষম হব। মানব রূপে পৃথিবীতে জন্মগ্রহণ করার পর এই পৃথিবীর রূপ রস গন্ধ অনুভব করতে না পারলে জনম বৃথা। আসল অর্থেই যদি মুক্ত হতে চাও ,মুক্তির স্বাদ গ্রহণ করতে চাও, তবে মানবের মাঝে থেকেই নিরন্তন কর্ম সাধনের মধ্য দিয়ে সেই মুক্তি লাভ সম্ভব ।তার জন্য আলাদা করে বৈরাগ্য ধর্ম পালন করতে হয় না।
“স্বার্থমগ্ন যে জন বিমুখ বৃহৎ জগৎ থেকে…”
সম্প্রসারিত ভাব: সার্থকতা মানুষের সবচাইতে নিম্নমানের মানব বৈশিষ্ট্যের মধ্যে একটি। এই সুন্দর পৃথিবীতে রূপ-রস বন্ধ আর আলোর মাধুর্য চারিদিকে ।ঈশ্বর নিজের শক্তির মহিমায় সমগ্র পৃথিবীতে নিজের সৃষ্টির রূপকে ঢেলে সাজিয়েছেন। কিন্তু তার সৃষ্টির মধ্যে ব্যতিক্রম মানুষের স্বার্থমগ্নতা। নিজের স্বার্থসিদ্ধির মধ্য দিয়ে কিছু বেঁচে থাকতে চায়। আর এই ভয়ঙ্কর চাওয়ার মধ্যে দিয়ে সে আত্মমগ্ন হয়ে ওঠে। মানুষের জীবনের সঠিক সার্থকতা তার কর্মের মধ্যে প্রতিফলিত হয়। কর্ম গুণে মানুষের জীবন পথের জমির প্রকৃতি নির্ধারণ হয়। সর্বদা নিজের কথা ভাবলে লোভ ভোগ বিলাসের জীবন যাপন করার রাস্তা প্রস্তুত করলে জীবনটাকে উপভোগ করা যায় না। জীবনকে উপভোগ করতে হলে উদার উদ্দাম অনিবার হতে হবে আকন্ঠ পান করতে হবে পৃথিবীর সকল সৌন্দর্যের মোহসুধা। যে মানুষ শুধুমাত্র নিজের কথা চিন্তা করে আর সকল মানুষকে উপেক্ষা করেছে তার দুর্দশার সীমা থাকে না। এ পৃথিবী বৃহৎ তার বিশালতার কাছে আমরা অতি নগণ্য। তাই সকলকে সকলের পাশে স্বার্থহীন ভাবে বেঁচে থাকতে হবে। এতেই মানব জন্মের সার্থকতা গরিবের মাঝে নিজের স্বার্থকে ত্যাগ দিয়ে বেঁচে থাকার অর্থই জীবন। দুঃখে দুর্দশায় অপরের পাশে দাঁড়ানো অপরের উপকার গরিবকে সাহায্য করার মধ্যে দিয়ে মানুষের জীবন যথার্থ হয়ে ওঠে। মানুষ হয়ে আপন মানুষের পাশে যদি না দাঁড়ানো যায় তবে সেই মানুষের মান আর হুঁশের বিষয় নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ থেকে যায়। মানুষকে সর্বদা আত্মত্যাগী হতে হয় একজন আত্মত্যাগী মানুষ সমগ্র সমাজের আশীর্বাদ স্বরূপ। সঠিক মানবিক বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন মানুষই পারে সমাজের অন্ধকারাচ্ছন্ন কুসংস্কার গুলিকে দূরে সরিয়ে দিয়ে সঠিক সমাজ গড়তে।
শুধু নিজেকে নিয়ে বাঁচলেই হবে না নিজের বাঁচার উর্ধ্বে গিয়ে সকলকে নিয়ে একসাথে বাঁচার স্বপ্ন দেখতে হবে তবেই একটি সুন্দর পৃথিবী জন্ম নেবে। একজন সঠিক মানুষই পারে তার স্নেহ মায়া মমতা ভালবাসা দিয়ে অপর একটি মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে তার সকল সংকীর্ণতাকে দূর করতে। সে মানুষই মহৎ মানুষ সেই মানুষই মহান মানুষ যে জগতের সকল প্রাণী তথা মানুষের কথা চিন্তা করে নিজের স্বার্থ লোভ মোহ মায়া কে বিসর্জন দিয়ে জন সেবায় আত্মমগ্ন হয়।
“সকলের তরে সকলে আমরা…”
সম্প্রসারিত ভাব: মানুষ একে অন্যের সাহায্য ছাড়া বাঁচতে ও চলতে পারে না। সৃষ্টির শুরুতেই মানুষ একথা বুঝতে পেরেছিল। পারস্পরিক সাহায্যের নিশ্চয়তা বিধানের জন্য সেদিন মানুষ সমাজ গড়ে তুলেছিল। মানুষ এখন সমাজ ছাড়া বাঁচতে পারে না। সমাজের প্রতিটি মানুষকে একে অন্যের সাহায্যের ওপর নির্ভর করতে হয়। সেজন্য সমাজে একের মঙ্গলের জন্য অন্যের চিন্তা করার বিশেষ প্রয়োজন রয়েছে। এতে গোটা সমাজের মঙ্গল নিহিত। সবাই যদি শুধু নিজের সুখ-সুবিধার জন্য সব শক্তি নিয়োগ করে, তাহলে কারো মঙ্গল হতে পারে না। অপরের মজালসাধন করতে হলে ত্যাগ স্বীকার করতে হয়। এ ত্যাগই আজ পৃথিবীকে এমন সুন্দর ও সুখের করে তুলেছে। তাই নিজের স্বার্থের কথা না ভেবে সমাজের প্রতিটি লোকের কথা চিন্তা করা প্রত্যেকের একান্ত কর্তব্য। এতে কারো সুখ-সুবিধা নষ্ট হয় না, বরং প্রতিটি মানুষের সুখ-সুবিধা সুনিশ্চিত হয়। আত্মস্বার্থ ও আত্মসুখে মত্ত না হয়ে পরস্পরের মঙ্গলসাধনে নিযুক্ত হলে সামগ্রিকভাবে মানবজাতির মঙ্গল সাধিত হয়। বস্তুত অন্যের মঙ্গল কামনার মধ্যে নিজেরও কল্যাণ নিহিত। আমি যদি অন্যের মঙ্গল চাই, অন্যরাও আমার মঙ্গল চাইবে। এভাবে পারস্পরিক সহমর্মিতা দ্বারা আমরা শান্তির পৃথিবী গড়তে পারি। অপরের হাসি-কান্না, আনন্দ-বেদনায় শরীক হওয়াই তো মনুষ্যত্বের পরিচয় এবং এতেই পাওয়া যায় নিবিড় আনন্দ। তাই বলা হয় সকলের তরে সকলে আমরা প্রত্যেকে আমরা পরের তরে। তাই আমাদের মনে রাখা উচিত, “জনম বিশ্বের তরে পরার্থে কামনা।”
“কোথায় স্বর্গ, কোথায় নরক, কে বলে তা বহুদূর মানুষের মাঝে স্বর্গ নরক, মানুষেতে সুরাসুর”
সম্প্রসারিত ভাব: মানুষ পার্থিব জগতের বাইরেও মৃত্যুর পরে এক নতুন জগৎ কল্পনা করে। যা স্বর্গ ও নরকের সমন্বয়ে গঠিত। ধর্মীয় চিন্তা থেকে মানুষ পাপ-পুণ্য, ন্যায়-অন্যায়ের হিসাব করে থাকে। আর এই অনুভূতি থেকেই স্বর্গ ও নরক লাভের কথা ভাবে। নরক একটি ভয়ংকর জায়গা যেখানে শাস্তি দেয়া হয়। আর স্বর্গ হচ্ছে অনাবিল সুখ-শান্তির জায়গা। মানুষ পৃথিবীতে কৃতকর্ম অনুসারে স্বর্গ ও নরকে জায়গা করে নিবে। যারা ভালো কাজ করবে তারা স্বর্গে বাস করবে। আর যারা খারাপ কাজ করবে তারা নরকে বাস করবে। মূলত এই স্বর্গ-নরক আর কিছুই নয়, এটা মানুষের কর্মফলের উপর নির্ভর করে। মানুষের প্রতিদিনকার কাজের মাঝেই স্বর্গ-নরক বিরাজমান। লোভ-লালসা, ঝগড়া-বিবাদ, হিংসা মানুষকে পশুতে পরিণত করে। ফলে সে ন্যায় অন্যায়ের সীমারেখা ভুলে যায়। নিজেকে নানা রকম খারাপ কাজে জড়িয়ে ফেলে। আর এসব কারণেই সমাজে বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়। পৃথিবীতে নেমে আসে এক নরক যন্ত্রণা। এ সকল যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পেতে মানুষকে অন্যায় ছেড়ে ন্যায়ের পথে আসতে হবে। মানুষে মানুষে ভ্রাতৃত্ব, ভালোবাসা, সৌহার্দ্য গড়ে তুলতে হবে। একে অন্যের বিপদে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিতে হবে। অন্যের কল্যাণ সাধনের জন্য সর্বদা চেষ্টা করতে হবে। এমন কোনো কাজ করা যাবে না যাতে অন্যের ক্ষতি হয়। সকলে যদি সৎ ও ন্যায়ের পথ অবলম্বন করে, তাহলেই কেবল এ পৃথিবীতে স্বর্গীয় সুখ লাভ করা সম্ভব।
মন্তব্য: স্বর্গ ও নরক পৃথিবীর বাইরের কিছু নয়। মানুষের ভালো কাজ এবং আচরণের মাঝেই স্বর্গ থাকে এবং খারাপ কাজের মাঝে থাকে নরক।
“আপনারে লয়ে বিব্রত রহিতে আসে নাই কেহ অবনী পরে” অথবা,
“সকলের তরে সকলে আমরা প্রত্যেকে আমরা পরের তরে।“
মূলভাব: সামাজিক জীব হিসেবে মানুষ এককভাবে জীবনযাপন করতে পারে না। পারস্পরিক নির্ভরশীলতার মাধ্যমে সমাজে মানুষ সুখী ও নিরাপদ জীবনযাপন করতে পারে।
সম্প্রসারিত ভাব: মানুষ একে অন্যের সাহায্য ছাড়া বাঁচতে ও চলতে পারে না। পারস্পরিক সাহায্যের নিশ্চয়তা বিধানের জন্য সেদিন মানুষ সমাজ গড়ে তুলেছিল। সমাজের প্রতিটি মানুষকে একে অন্যের সাহায্যের ওপর নির্ভর করতে হয়। সেজন্য সমাজে একের মঙ্গলের জন অন্যের চিন্তা করার বিশেষ প্রয়োজন রয়েছে। এতে গোটা সমাজের মঙ্গল নিহিত। সবাই যদি শুধু নিজের সুখ-সুবিধার জন্য সব শক্তি নিয়োগ করে, তাহলে কারো মঙ্গল হতে পারে না। অপরের মঙ্গল সাধন করতে হলে ত্যাগ স্বীকার করতে হয়। এ ত্যাগই আজ পৃথিবীকে এমন সুন্দর ও সুখের করে তুলেছে। তাই নিজের স্বার্থের কথা না ভেবে সমাজের প্রতিটি লোকের কথা চিন্তা করা প্রত্যেকের একান্ত কর্তব্য। এতে কারো সুখ-সুবিধা নষ্ট হয় না, বরং প্রতিটি মানুষের সুখ-সুবিধা সুনিশ্চিত হয়। আত্মস্বার্থ ও আত্মসুখে মত্ত না হয়ে পরস্পরের মঙ্গল সাধনে নিযুক্ত হলে সামগ্রিকভাবে মানবজাতির মঙ্গল সাধিত হয়। বস্তুত অন্যের মঙ্গল কামনার মধ্যে নিজেরও কল্যাণ নিহিত। আমি যদি অন্যের মঙ্গল চাই, অন্যরাও আমার মঙ্গল চাইবে। এভাবে পারস্পরিক সহমর্মিতা দ্বারা আমরা শান্তির পৃথিবী গড়তে পারি। অপরের হাসি-কান্না, আনন্দ-বেদনায় শরিক হওয়াই তো মনুষ্যত্বের পরিচয় এবং এতেই পাওয়া যায় অনাবিল আনন্দ।

