বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘পুঁইমাচা’ গল্পটি প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল ‘প্রবাসী’ পত্রিকার মাঘ সংখ্যায় ১৩৩১ বঙ্গাব্দে। গল্পটি অন্তর্ভুক্ত হয়েছে ‘মেঘমল্লার’ (১৯৩১) গল্পগ্রন্থে।
পুঁইমাচা: সমাজবাস্তবতা, লোকজীবন, প্রকৃতিচেতনা ও অপূর্ণ জীবন-কাব্য:
ভূমিকা:
বাংলা ছোটোগল্প সাহিত্যে বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় এমন এক শিল্পী, যিনি সামান্য জীবনের মধ্যেও অসামান্য মানবিক সত্য আবিষ্কার করতে পেরেছিলেন। তাঁর গল্পে ঘটনাবহুল নাটকীয়তার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে মানুষের অন্তর্জীবন, তার বেদনা, তার আকাঙ্ক্ষা, তার অপূর্ণতা এবং প্রকৃতির সঙ্গে তার গভীর অস্তিত্বগত সম্পর্ক। তাঁর সাহিত্যজগতে গ্রামবাংলা কেবল পটভূমি নয়; তা এক জীবন্ত সত্তা—যেখানে মানুষ, প্রকৃতি, সমাজ, লোকবিশ্বাস এবং জীবনসংগ্রাম একাকার হয়ে আছে। সেই কারণেই তাঁর গল্পগুলি নিছক বাস্তবচিত্র হয়ে থাকে না; তারা রূপান্তরিত হয় এক গভীর জীবনদর্শনের শিল্পরূপে।
‘পুঁইমাচা’ বিভূতিভূষণের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ছোটোগল্প। প্রথম প্রকাশিত হয় ‘প্রবাসী’ পত্রিকার ১৩৩১ বঙ্গাব্দের মাঘ সংখ্যায়। বহিরঙ্গের দিক থেকে গল্পটির বিষয়বস্তু অত্যন্ত সাধারণ—এক গ্রামীণ কিশোরী ক্ষেন্তির বিয়ে, সামাজিক অপমান, দাম্পত্য-নির্যাতন এবং শেষ পর্যন্ত অকালমৃত্যু। কিন্তু এই সামান্য ঘটনাপুঞ্জের মধ্য দিয়েই লেখক উন্মোচন করেছেন সমাজের নিষ্ঠুরতা, নারীর অসহায়তা, দরিদ্র মানুষের জীবনসংগ্রাম, মাতৃত্বের অন্তর্লীন কোমলতা এবং মৃত্যুর মধ্যেও জীবনের রহস্যময় স্থায়িত্ব।
ক্ষেন্তির বিয়ের সম্বন্ধ হয়েছিল মণিগাঁয়ের শ্রীমন্ত মজুমদারের পুত্রের সঙ্গে। সবকিছু প্রায় স্থির হয়ে যাওয়ার পর সহায়হরি জানতে পারেন যে পাত্রটি চরিত্রহীন। নৈতিক বোধ থেকে তিনি সম্বন্ধ ভেঙে দেন। কিন্তু ব্যক্তিবিবেকের এই মানবিক সিদ্ধান্ত সমাজ মেনে নেয় না। কারণ সমাজের কাছে মানুষ নয়, নিয়মই বড়। “উচ্ছগু” করা মেয়েকে ঘরে রেখে দেওয়া তাই এক সামাজিক অপরাধে পরিণত হয়। এই ঘটনাই গল্পের মূল সংকটকে নির্মাণ করে।
এখানে বিভূতিভূষণ কেবল একটি পরিবারের দুঃখের কাহিনি লেখেননি; তিনি দেখিয়েছেন ব্যক্তি ও সমাজের সংঘাত, বিবেক ও সংস্কারের দ্বন্দ্ব, এবং নারীজীবনের করুণ পরিণতি। তাঁর শিল্পের বিশেষত্ব এখানেই যে তিনি কোথাও উচ্চকণ্ঠ নন। কোনো প্রত্যক্ষ প্রতিবাদ নেই, তীব্র স্লোগান নেই; অথচ নীরবতার মধ্য দিয়েই সমাজের নিষ্ঠুরতা আরও গভীরভাবে উন্মোচিত হয়েছে।
ক্ষেন্তি : প্রকৃতির কন্যা ও অপূর্ণ জীবনের প্রতীক:
ক্ষেন্তি বাংলা কথাসাহিত্যের অন্যতম স্মরণীয় নারীচরিত্র। সে কোনো অসাধারণ নায়িকা নয়, কোনো বিদ্রোহিণীও নয়; বরং গ্রামবাংলার একেবারে সাধারণ মেয়ে। অথচ এই সাধারণতার মধ্যেই তার গভীর মানবিক তাৎপর্য নিহিত।
গল্পে ক্ষেন্তির প্রথম আবির্ভাব ঘটে হাতে পুঁইডাটা নিয়ে। আপাতদৃষ্টিতে দৃশ্যটি খুব সাধারণ, কিন্তু এর মধ্যেই লেখক তার চরিত্রের মূল স্বরটি প্রকাশ করেছেন। পুঁইশাকের প্রতি তার আকর্ষণ আসলে জীবনের প্রতিই তার আকর্ষণ। সে খেতে ভালোবাসে, কারণ সে বাঁচতে ভালোবাসে। তার ভোজনরসিকতা নিছক খাদ্যলোভ নয়; বরং দারিদ্র্যের ভেতরেও জীবনকে উপভোগ করার এক সহজ, স্বতঃস্ফূর্ত মানসিকতা।
মনস্তাত্ত্বিকভাবে ক্ষেন্তির চরিত্র অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। সে প্রতিবাদ করে না, কারণ সমাজ তাকে সেই ভাষা শেখায়নি। সে সহ্য করে, কারণ সহ্য করাই তার সামাজিক নিয়তি। কিন্তু তার নীরবতা দুর্বলতার চিহ্ন নয়; বরং পিতৃতান্ত্রিক সমাজে নারীর দীর্ঘদিনের সামাজিক প্রশিক্ষণের ফল। তার সরলতা, কোমলতা, নীরবতা—সবই সমাজনির্মিত।
তবু ক্ষেন্তির মধ্যে এক সহজ প্রাণশক্তি আছে। সে বনে-বাদাড়ে ঘুরে বেড়ায়, শাকপাতা কুড়িয়ে আনে, পিঠে খেয়ে আনন্দ পায়। প্রকৃতির সঙ্গে তার সম্পর্ক একেবারে অন্তরঙ্গ। যেন প্রকৃতিরই সন্তান সে। তাই মৃত্যুর পরেও তার অস্তিত্ব মিশে যায় প্রকৃতির মধ্যেই—তার নিজের হাতে পোঁতা পুঁইমাচার সবুজ বিস্তারে।
এইখানেই ক্ষেন্তি ব্যক্তি থেকে প্রতীকে উত্তীর্ণ হয়। সে কেবল এক গ্রামের মেয়ে নয়; সে অপূর্ণ যৌবনের প্রতীক, অবদমিত নারীজীবনের প্রতীক, এবং সর্বোপরি অসমাপ্ত মানবসম্ভাবনার প্রতীক।
অন্নপূর্ণা : দারিদ্র্যপীড়িত মাতৃত্বের মনস্তত্ত্ব:
অন্নপূর্ণা চরিত্রটি বাংলা সাহিত্যের অন্যতম বাস্তব ও জটিল মাতৃচরিত্র। প্রথমে তাঁকে রূঢ় ও খিটখিটে মনে হলেও ক্রমে বোঝা যায়—এই কঠোরতার অন্তরালে রয়েছে দারিদ্র্য, অপমান, সামাজিক ভয় এবং অসহায় মাতৃত্বের দীর্ঘ যন্ত্রণা।
সংসারের অভাব মানুষকে কোমল থাকতে দেয় না। অন্নপূর্ণা প্রতিনিয়ত লড়াই করছেন দারিদ্র্যের সঙ্গে, সমাজের চোখরাঙানির সঙ্গে এবং স্বামীর উদাসীনতার সঙ্গে। ফলে তাঁর স্নেহও প্রকাশ পায় বিরক্তি ও তিরস্কারের আড়ালে। ক্ষেন্তিকে বকেন, কিন্তু আবার সেই তিনিই পুঁইডাটা কুড়িয়ে এনে রান্না করেন। পিঠে খাওয়ার সময়ে বিরক্ত হন, অথচ শেষে আরও পিঠে তুলে দেন।
এই দ্বৈততাই চরিত্রটিকে গভীর বাস্তবতা দিয়েছে। তিনি কোনো আদর্শায়িত মা নন; তিনি রক্তমাংসের মানুষ। তাঁর মধ্যে যেমন রাগ আছে, তেমনি গভীর স্নেহও আছে। তাঁর সমস্ত উদ্বেগের কেন্দ্র ক্ষেন্তির ভবিষ্যৎ। কারণ তিনি জানেন—এই সমাজে মেয়ের বিয়ে ভেঙে যাওয়া মানে তার জীবন প্রায় শেষ হয়ে যাওয়া।
অন্নপূর্ণার চরিত্রে গ্রামীণ নারীমনের এক বৃহত্তর সমাজতাত্ত্বিক সত্যও ধরা পড়েছে। পিতৃতান্ত্রিক সমাজ নারীকেই আবার সেই সমাজব্যবস্থার রক্ষক করে তোলে। ফলে অন্নপূর্ণা যেমন সমাজের শিকার, তেমনি সমাজের নিয়মকেও মেনে চলতে বাধ্য।
সহায়হরি : ব্যক্তি-বিবেক বনাম সমাজ:
সহায়হরি আপাতদৃষ্টিতে সংসারবিমুখ, উদাসীন এবং কিছুটা বাস্তবজ্ঞানহীন মানুষ। কিন্তু গল্পের গভীরে তিনিই মানবিক বিবেকের প্রতিনিধি।
চরিত্রহীন পাত্রের হাতে মেয়েকে তুলে দিতে তিনি অস্বীকার করেন। এই সিদ্ধান্ত সমাজের বিরুদ্ধে ব্যক্তিবিবেকের প্রতিবাদ। কিন্তু সমাজ ব্যক্তি-নৈতিকতাকে নয়, সামাজিক রীতিকেই বেশি গুরুত্ব দেয়। ফলে সহায়হরি “অপরাধী” হয়ে ওঠেন।
তাঁর চরিত্রে দ্বৈততা আছে। একদিকে তিনি নৈতিকভাবে সাহসী, অন্যদিকে সংসারের বাস্তব সংকট সম্পর্কে উদাসীন। কিন্তু এই অসম্পূর্ণতাই তাঁকে বাস্তব করে তুলেছে।
সহায়হরি প্রকৃতিপ্রেমী। সংসারের সংকীর্ণতার চেয়ে প্রকৃতির মুক্ত জগৎ তাঁকে বেশি টানে। এই স্বভাব ক্ষেন্তির মধ্যেও উত্তরাধিকারসূত্রে এসেছে। ফলে পিতা ও কন্যার সম্পর্ক কেবল রক্তের নয়; মানসিক ও অস্তিত্বগতও।
নামকরণের শিল্পসার্থকতা:
‘পুঁইমাচা’ নামটি বাংলা সাহিত্যের অন্যতম সার্থক নামকরণ। যদি গল্পটির নাম “ক্ষেন্তি” হতো, তবে তা কেবল চরিত্রকেন্দ্রিক হয়ে থাকত। কিন্তু “পুঁইমাচা” নামের মধ্যে রয়েছে প্রতীকী গভীরতা।
পুঁইমাচা মানেই বিস্তারমান সবুজ সজীবতা, মাচা ছাড়িয়ে দুলে ওঠা প্রাণশক্তি, লাবণ্যময় বিকাশ। এই প্রাণোচ্ছলতার বিপরীতে ক্ষেন্তির অকালমৃত্যু আরও করুণ হয়ে ওঠে।
গল্পের শেষে পুঁইগাছটির বর্ণনা—“সুস্পষ্ট নধর, প্রবর্ধমান জীবনের লাবণ্যে ভরপুর”—আসলে ক্ষেন্তির অপূর্ণ জীবনের প্রতীক। ক্ষেন্তি বেঁচে থাকলে তার জীবনও এমনই লাবণ্যময় হয়ে উঠতে পারত।
দার্শনিক অর্থে পুঁইমাচা জীবনের চিরন্তনতার প্রতীক। মানুষ মরে যায়, কিন্তু প্রাণশক্তি মরে না। ব্যক্তি হারিয়ে যায়, কিন্তু তার স্মৃতি ও আকাঙ্ক্ষা প্রকৃতির মধ্যে থেকে যায়।
লোকসংস্কৃতি : গ্রামবাংলার প্রাণস্পন্দন:
‘পুঁইমাচা’ গল্পের অন্যতম বড় শক্তি এর লোকজ পরিবেশ। বিভূতিভূষণ লোকজ উপাদানকে নিছক অলংকার হিসেবে ব্যবহার করেননি; বরং এগুলির মাধ্যমেই তিনি চরিত্র, সমাজ ও আবহ নির্মাণ করেছেন।
খেজুর রস, নবান্ন, পৌষপার্বণ, পিঠেপুলি, ইতুর ঘট, ষষ্ঠীপুজো, চণ্ডীমণ্ডপ, পালকি—এসবের মধ্য দিয়ে গ্রামবাংলার এক জীবন্ত সাংস্কৃতিক মানচিত্র ফুটে উঠেছে।
পৌষপার্বণের পিঠে এখানে নিছক খাদ্য নয়; তা পারিবারিক উষ্ণতা, সামান্য সুখ এবং দারিদ্র্যের মধ্যেও আনন্দ খুঁজে নেওয়ার প্রতীক।
চণ্ডীমণ্ডপ গ্রামীণ ক্ষমতার কেন্দ্র। সেখানে সমাজের বিচার হয়, সম্মান নির্ধারিত হয়। কালীময় ঠাকুর সেই সমাজক্ষমতার প্রতিনিধি।
লোকভাষার ব্যবহার গল্পটিকে আরও বাস্তব করে তুলেছে। অন্নপূর্ণার সংলাপে গ্রামীণ নারীমনের স্বর যেন সরাসরি ধরা পড়ে।
সমাজবাস্তবতা ও পণপ্রথার নির্মমতা:
গল্পটির কেন্দ্রে রয়েছে সমাজবাস্তবতা। পণপ্রথা, সামাজিক কুসংস্কার, নারী-অবদমন এবং গ্রামীণ ক্ষমতার নির্মমতা এখানে অত্যন্ত বাস্তবভাবে চিত্রিত হয়েছে।
ক্ষেন্তির শ্বশুরবাড়ির লোকেরা তাকে মানুষ হিসেবে নয়, অর্থনৈতিক লেনদেনের বস্তু হিসেবে দেখে। আড়াইশ টাকা বাকি থাকার জন্য তাকে অপমান করা হয়, বাপের বাড়ি আসতে দেওয়া হয় না।
সবচেয়ে নির্মম বিষয় হলো—তার অসুস্থতার খবর পর্যন্ত গোপন রাখা হয়। বসন্তে আক্রান্ত ক্ষেন্তিকে শেষ পর্যন্ত আত্মীয়ের বাড়িতে ফেলে রেখে যাওয়া হয়, এমনকি মৃত্যুর আগে তার গহনাও খুলে নেওয়া হয়।
এই নিষ্ঠুরতা কেবল ব্যক্তিগত নয়; এটি এক অসুস্থ সমাজব্যবস্থার লক্ষণ।
এই প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর-এর ‘দেনাপাওনা’-র কথা মনে পড়ে। সেখানে নিরুপমা যেমন পণপ্রথার বলি, তেমনি ক্ষেন্তিও সমাজের নিষ্ঠুরতার শিকার। তবে বিভূতিভূষণের ভঙ্গি বেশি সংযত, নীরব এবং অন্তর্মুখী।
প্রকৃতিচেতনা : মৃত্যু পেরিয়ে জীবনের স্থায়িত্ব:
বিভূতিভূষণের সাহিত্যে প্রকৃতি কখনো নিছক পটভূমি নয়; তা এক জীবন্ত সত্তা। ‘পুঁইমাচা’-তেও প্রকৃতি গল্পের অন্যতম কেন্দ্রীয় শক্তি।
ক্ষেন্তি প্রকৃতির সন্তান। তার স্বভাব, খাদ্যাভ্যাস, চলাফেরা—সবকিছুতেই প্রকৃতির সহজতা আছে।
গল্পের শেষে পুঁইমাচার বিস্তার কেবল প্রকৃতিচিত্র নয়; তা জীবনদর্শনের প্রকাশ। মানুষ মরে যায়, কিন্তু জীবন থেমে থাকে না। প্রকৃতি নিরাসক্ত, অথচ চিরজীবন্ত।
এই দৃষ্টিভঙ্গি অনেকাংশে ভারতীয় দার্শনিক চিন্তার সঙ্গে সম্পর্কিত। সৃষ্টি ও বিনাশ এখানে বিরোধী নয়; বরং একই চক্রের অংশ।
আবার তুলনামূলক সাহিত্যিক দৃষ্টিতে দেখলে আন্তন চেখভ-এর গল্পের মতোই এখানে সামান্য জীবনের মধ্যে গভীর মানবিক ট্র্যাজেডি প্রকাশিত হয়েছে। আর থমাস হার্ডি-র মতোই প্রকৃতি এখানে মানুষের নিয়তির নীরব সাক্ষী।
গল্পের রস, গোত্র ও শিল্পমূল্য:
গোত্রবিচারের দিক থেকে ‘পুঁইমাচা’ সমাজসমস্যামূলক গল্প হলেও এর তাৎপর্য কেবল সামাজিক নয়; তা অস্তিত্ববাদী ও দার্শনিকও।
গল্পটির কাহিনি অত্যন্ত সরল। কিন্তু বিভূতিভূষণের শিল্পশক্তি সেই সরলতাকেই গভীরতায় উন্নীত করেছে। তাঁর ভাষা অনাড়ম্বর, সংযত এবং জীবনঘনিষ্ঠ।
গল্পটির প্রধান রস করুণরস। কিন্তু এই করুণতা নিছক আবেগসর্বস্ব নয়; তা জীবনপ্রীতির সঙ্গে যুক্ত। ক্ষেন্তির মৃত্যু আমাদের কষ্ট দেয়, কারণ সে বাঁচতে চেয়েছিল।
প্রয়াত আচার্য সুকুমার সেন যথার্থই বলেছিলেন যে, ‘পথের পাঁচালি’-র ছায়া এ গল্পে সুপ্ত রয়েছে। গ্রামীণ জীবন, দারিদ্র্য, প্রকৃতি ও অপূর্ণ মানবজীবনের যে করুণ সৌন্দর্য ‘পথের পাঁচালি’-তে আছে, তারই এক সংক্ষিপ্ত অথচ তীব্র রূপ যেন ‘পুঁইমাচা’।
উপসংহার:
‘পুঁইমাচা’ নিছক একটি ছোটোগল্প নয়; বাংলা সাহিত্যে জীবন, সমাজ, প্রকৃতি ও মৃত্যুর সম্পর্ক নিয়ে রচিত এক অনবদ্য শিল্পরূপ।
ক্ষেন্তি মারা যায়, কিন্তু তার পোঁতা পুঁইমাচা বেঁচে থাকে। সেই সবুজ বিস্তার যেন জীবনেরই প্রতীক—অদম্য, প্রবহমান, চিরন্তন।
বিভূতিভূষণ যেন বলতে চেয়েছেন—মানুষ ক্ষণিক, কিন্তু জীবনের আকাঙ্ক্ষা অনন্ত। ব্যক্তি হারিয়ে যায়, কিন্তু তার ভালোবাসা, স্বপ্ন ও স্মৃতি প্রকৃতির কোথাও না কোথাও বেঁচে থাকে।
এই কারণেই ‘পুঁইমাচা’ কেবল করুণ গল্প নয়; জীবনমুগ্ধতার গল্পও। মৃত্যুর অন্ধকারের মধ্য দিয়েও এখানে জীবনের সবুজ আলো জ্বলে থাকে। আর সেই আলোই গল্পটিকে বাংলা ছোটোগল্প সাহিত্যে এক চিরকালীন শিল্পমহিমায় প্রতিষ্ঠিত করেছে।
বিষয়-সংক্ষেপ :
গ্রামবাংলার দারিদ্র্যপীড়িত এক নিম্নবিত্ত ব্রাহ্মণ পরিবারকে কেন্দ্র করে রচিত বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘পুঁইমাচা’ গল্পটি মূলত জীবনের ক্ষুদ্র সুখ, অভাবের বেদনা, মাতৃত্বের মমতা এবং এক কিশোরী মেয়ের অপূর্ণ জীবনের করুণ উপাখ্যান। গল্পের কেন্দ্রে রয়েছে সহায়হরি চাটুজ্যে, তাঁর স্ত্রী অন্নপূর্ণা এবং তাঁদের বড়ো মেয়ে ক্ষেন্তি।
সহায়হরি সংসারের বাস্তব দায়িত্ব সম্পর্কে উদাসীন ও সহজসরল প্রকৃতির মানুষ। শীতের সকালে তিনি তারক খুড়োর খেজুরগাছের রস আনার জন্য স্ত্রীর কাছে একটি বাটি বা ঘটি চাইলে অন্নপূর্ণা ক্ষোভে ও উদ্বেগে তাঁকে তিরস্কার করেন। কারণ, বড়ো মেয়ে ক্ষেন্তির বয়স বেড়ে চলেছে, অথচ তার বিয়ের কোনো উদ্যোগ সহায়হরির নেই। গ্রামের সমাজপতিরা ইতিমধ্যে নানা গুজব রটাতে শুরু করেছে—এই নিয়ে অন্নপূর্ণার মনে অস্থিরতা।
এই সময় ক্ষেন্তি ও তার দুই বোন এক বোঝা পাকা পুঁইডাঁটা এবং কুচো চিংড়ি নিয়ে বাড়ি ফেরে। ক্ষেন্তির সরল আনন্দ—পুঁইশাক-চিংড়ির চচ্চড়ি রান্না করে খাওয়ার স্বপ্ন—দারিদ্র্যের কঠোর বাস্তবতায় মায়ের কাছে হয়ে ওঠে লজ্জা ও উদ্বেগের কারণ। অন্নপূর্ণা রাগে সেই পুঁইডাঁটা ফেলে দিতে বললেও, মাতৃহৃদয়ের গোপন কোমলতা শেষ পর্যন্ত জয়ী হয়। পরে পথের ধারে পড়ে থাকা ডাঁটাগুলি কুড়িয়ে এনে তিনি নিজেই চচ্চড়ি রান্না করে মেয়ের পাতে তুলে দেন। এই সামান্য ঘটনাতেই ফুটে ওঠে দারিদ্র্যপীড়িত সংসারের গভীর স্নেহ, অভিমান ও ভালোবাসার অনির্বচনীয় সৌন্দর্য।
গ্রামের মাতব্বর কালীময় সমাজরক্ষার দোহাই দিয়ে সহায়হরিকে চণ্ডীমণ্ডপে ডেকে পাঠান এবং ক্ষেন্তির বিয়ের জন্য শ্রীমন্ত মজুমদারের ছেলের সঙ্গে সম্বন্ধ স্থির করতে চান। কিন্তু পাত্রের চরিত্র ভালো না হওয়ায় সহায়হরি সেই সম্বন্ধ ভেঙে দেন। তাঁর উদাসীনতার আড়ালে যে এক নীরব আত্মমর্যাদা ও পিতৃস্নেহ লুকিয়ে আছে, এই ঘটনায় তা স্পষ্ট হয়।
অভাবের সংসারে সহায়হরি ও ক্ষেন্তির সম্পর্ক যেন বন্ধুর মতো। একদিন স্ত্রী ঘাটে গেলে বাবা-মেয়ে মিলে বরোজপোতার বন থেকে মেটে আলু তুলে আনে। ঘটনাটি জানতে পেরে অন্নপূর্ণা অত্যন্ত রেগে যান, কারণ তাঁর আশঙ্কা—এই অবাধ স্বভাব ভবিষ্যতে ক্ষেন্তির জীবনে বিপদ ডেকে আনবে। অথচ ক্ষেন্তির মন ছিল সামান্য সুখেই তৃপ্ত। ভাঙা পাঁচিলের ধারে পুঁইচারা পুঁতে সে ভবিষ্যতের এক ছোট্ট সবুজ স্বপ্ন লালন করতে থাকে।
পৌষসংক্রান্তির পিঠেপুলি উৎসবে দরিদ্র সংসারের সামান্য আয়োজনও এক গভীর মানবিক উষ্ণতায় ভরে ওঠে। ক্ষেন্তি পরম তৃপ্তিতে অনেকগুলো পিঠে খায়। মেয়ের এই খাদ্যরসিকতা দেখে অন্নপূর্ণার মনে আনন্দের পাশাপাশি এক অজানা আশঙ্কাও জন্ম নেয়—এমন সহজ, লোভী অথচ নিষ্পাপ মেয়েকে ভবিষ্যতের কঠিন সংসার কতটা আপন করে নেবে?
অবশেষে এক দূরসম্পর্কীয় আত্মীয়ের ঘটকালিতে ক্ষেন্তির বিয়ে হয় এক বয়স্ক, অবস্থাপন্ন ব্যবসায়ীর সঙ্গে। বিদায়ের সময় ক্ষেন্তির কান্না, আষাঢ় মাসে তাকে আনতে যাওয়ার আকুল অনুরোধ—সবকিছুতেই ধরা পড়ে তার শিশুসুলভ নির্ভরতা। কিন্তু পণের বাকি টাকার কারণে সহায়হরি মেয়েকে আনতে পারেন না। শ্বশুরবাড়ির অবহেলা ও নির্মমতার মধ্যেই বসন্ত রোগে আক্রান্ত ক্ষেন্তিকে দূর সম্পর্কের আত্মীয়ের বাড়িতে ফেলে রেখে যাওয়া হয়। সেখানেই নিঃসঙ্গ অবস্থায় তার মৃত্যু ঘটে। ক্ষেন্তির মৃত্যু যেন শুধু একটি কিশোরী জীবনের অবসান নয়; বরং দারিদ্র্য, সমাজব্যবস্থা ও নিষ্ঠুর বাস্তবতার কাছে এক নিষ্পাপ প্রাণের মর্মান্তিক পরাজয়।
কয়েক মাস পরে আবার পৌষপার্বণ ফিরে আসে। রান্নাঘরে পিঠের গন্ধ, উনুনের আগুন, ছোটো দুই বোনের ব্যস্ততা—সবই আগের মতো, অথচ ক্ষেন্তি আর নেই। পুঁটি হঠাৎ বলে ওঠে—“দিদি বড় ভালবাসত…”। মুহূর্তে নেমে আসে গভীর নীরবতা। অন্যদিকে ক্ষেন্তির নিজের হাতে পোঁতা পুঁইগাছটি মাচা জুড়ে সবুজ হয়ে বেড়ে উঠেছে। যেন জীবনের সমস্ত ক্ষয়, মৃত্যু ও বিচ্ছেদের মাঝেও প্রকৃতি আপন ছন্দে বলে চলে—জীবন থেমে থাকে না। এই পুঁইমাচাই তাই গল্পে হয়ে ওঠে স্মৃতি, মমতা ও চিরপ্রবহমান জীবনের এক অনুপম প্রতীক।
শব্দার্থ, ব্যাখ্যা ও টীকাটিপ্পনি
(ক) অনুচ্ছেদ:১-২১
“সহায়হরি চাটুজ্যে উঠানে পা দিয়াই.. লঙ্কা পাড়িতে লাগিলেন।” শুকনা
শব্দার্থ
উঠানে— আঙিনায়, অঙ্গনে। * বাটি – – ধাতুর পাত্র। * ঘটি— ধাতুর পাত্র, ছোটো কলশি। খুড়ো – বাবার ভাই বা আত্মীয় সম্পর্কে বাবার চেয়ে বয়সে ছোটো ব্যক্তি। * রসখেজুর গাছের নির্যাস। * দাওয়ায়— রোয়াকে, বারান্দায় । ← ঝাঁটার কাটি— নারিকেল গাছের কাটি দিয়ে তৈরি ঝাড়ু বা খ্যাংরার কাটি। * কাটিলগ্ন— কাটির গায়ে লেগে থাকা অংশ ৷ * বিন্দুমাত্র— কণামাত্র, লেশমাত্র। * আগ্রহ-ইচ্ছা, ঝোঁক অগ্রবর্তী— সম্মুখস্থ। খানিকক্ষণ— কিছুক্ষণ। শান্ত-ধীরস্থির। * ঠাউরেছ— অনুমান করেছ। * অতিরিক্ত—প্রয়োজনের তুলনায় বেশি। সজ্ঞার – উত্তেজনা, উদ্রেক। * অব্যবহিত – খুব কাছাকাছি, ব্যবধানহীন। * মরীয়া— মরতে প্রস্তুত, বেপরোয়া * প্রতীক্ষায়—অপেক্ষায়। আমতা আমতা—ইতস্তত করা বা স্পষ্ট করে না বলা। * পূর্বাপেক্ষা— আগের চেয়ে। * রঙ্গ—কৌতুক, তামাশা।* ন্যাকামি— আদিখ্যেতা, ভণ্ডামি। * গুজব—জনরব, রটনা। আশ্চর্য—বিস্ময়কর, অদ্ভুত। ভদ্দরলোক-সজ্জন ব্যক্তি। গাঁয়ে—গ্রামে। সমাজ-এক জায়গায় বসবাসকারী মানবগোষ্ঠী। বিস্মিত—অবাক হওয়া। পূর্ববৎ-আগের মতো । * পুনর্বার-আবারও। চণ্ডীমণ্ডপ-ঠাকুরদালান। ছোঁয়া-স্পর্শ। উচ্ছ্বগগু—উৎসর্গ।* তাচ্ছিল্য—অবজ্ঞা, অবহেলা, তুচ্ছ জ্ঞান। *প্রকাশ—মনেরভাব উন্মোচন। মাতব্বর— পল্লির মোড়ল, সর্দার, গ্রামের প্রধান ব্যক্তি। একঘরে—সমাজচ্যুত, জাতিচ্যুত। ধাড়ী মেয়ে— বয়স্ক মেয়ে। * পাত্তর—বর। * সশরীরে—শরীরসহ । * সম্মুখে—মুখের সামনা-সামনি। সম্ভাবনা – কিছু ঘটতে পারার মতো অবস্থা। খিড়কী – বাড়ির পিছনের দ্বার । * যাত্রা—রওনা, গমন। কাঁসার বাটি—রাং ও তামা মিশ্রিত ধাতুর পাত্র।* আনন্দপূর্ণস্বর, হর্ষপূর্ণ, তৃপ্তিপূর্ণ ধ্বনি। কৃয়—কালো । জঞ্জাল- আবর্জনা। * প্রাণপণে কঠোর পরিশ্রমে। অগোছালো—এলোমেলো, অবিন্যস্ত। ডাগর ডাগর—বড়ো বড়ো।* সেফটিপিন – সুরক্ষা আবদ্ধক। * প্রাগৈতিহাসিক যুগ—ইতিহাসের পূর্বের যুগ। পশ্চাদ্বর্তিনী — পিছনের দিক। দাওয়া—বারান্দা। * অমতই—‘অমৃত’ কথার চলিত রূপ। * আগাছা-অপ্রয়োজনীয় লতাগুল্মের গাছ। * পাথুরে— প্রস্তরতুল্য। জ্ঞান-বিবেচনা। ছাইপাঁশ—তুচ্ছ ও অসার বস্তু। * ভয়মিশ্রিত— ভয়ের সহিত। খোঁড়া—চলতে অক্ষম, পায়ে দোষ আছে এমন। অভিমুখে- সম্মুখে, সামনে বা কোনো বিশেষ দিকে । – – – ছেলেমানুষ—অল্পবয়সি, কমবয়সি। ফিরিয়া দাঁড়াইয়া-ঘুরে – – দাঁড়িয়ে। * নোলা — লোভ, জিহ্বা। সাধের জিনিস শখের জিনিস। আদৌ- মোটেই, কখনোই। নিঃশব্দে- নীরবে। * কাতর দৃষ্টি—আগ্রহ সচেতন নজর। * স্মরণ-অতীতের কথা মনে আসা। * বিস্ময়- আশ্চর্য। * আনন্দপূর্ণ-আনন্দের সহিত । * ডাগর চোখে—বড়ো বড়ো চোখে। অরন্ধন – রান্না পুজো, দিনে রন্ধন নিষিদ্ধ। * আবদার – বায়না, অন্যায় দাবি। খিড়কী— অন্দর দরজা, পশ্চাদ্বার, খড়খড়ি। কুচো চিংড়ি— ছোটো চিংড়ি। * তৎক্ষণাৎ—তৎকালীন, তখনই, সেই মুহূর্ত। আনন্দজনক আনন্দের সহিত। প্রস্তাব—প্রসঙ্গ। সমর্থন—সম্মতি। প্রস্তার সমর্থন—কোনো বিষয়ের প্রতি মত পোষণ করা। গোঁজা-ঢুকিয়ে রাখা, গুঁজে রাখা।
ব্যাখ্যা:
শীতের সকালের স্তব্ধতা ভেঙে সহায়হরি চাটুজ্যে যখন উঠানে এসে দাঁড়ান, তখন অন্নপূর্ণা রান্নাঘরের দাওয়ায় বসে চুলে তেল মাখছিলেন। তারক খুড়োর খেজুরগাছের রস আনার জন্য সহায়হরি স্ত্রীর কাছে একটি বাটি বা ঘটি চান। কিন্তু সংসারের বাস্তব চিন্তায় নিমগ্ন অন্নপূর্ণার মনে তখন অন্য দুশ্চিন্তা—বড়ো মেয়ে ক্ষেন্তির বিয়ে। আশীর্বাদ হয়ে গিয়েও বিয়ে না হওয়ায় গ্রামের সমাজপতিরা একঘরে করার কথা ভাবছে—এই গুজব তাঁর মনে অশান্তির সঞ্চার করেছে। সহায়হরি অবশ্য এসব সামাজিক সংকটকে যেন গুরুত্বই দিতে চান না; তাঁর স্বভাবের সহজ উদাসীনতা তাঁকে সংসারের কঠিন বাস্তবতা থেকে দূরে সরিয়ে রাখে।
ঠিক সেই সময় ক্ষেন্তি ও তার দুই বোন এক বোঝা পাকা হলুদ পুঁইডাঁটা এবং পাতায় মোড়া কুচো চিংড়ি নিয়ে বাড়ি ফিরে আসে। ক্ষেন্তির চোখেমুখে ছিল সামান্য খাবার জোগাড় করার এক সরল উচ্ছ্বাস। কিন্তু অন্নপূর্ণার চোখে সেই উচ্ছ্বাস হয়ে ওঠে দরিদ্র সংসারের অপমান, ভবিষ্যৎ বিবাহযোগ্যা মেয়ের অনভিপ্রেত লোভের চিহ্ন। তিনি কঠোর কণ্ঠে পুঁইডাঁটা ফেলে দিতে আদেশ করেন। ছোটো মেয়ে রাধী মায়ের নির্দেশ পালন করলেও ক্ষেন্তির চোখে জমে ওঠা জল নিঃশব্দে সমস্ত বেদনাকে প্রকাশ করে। সহায়হরি মেয়ের কষ্ট অনুভব করলেও স্ত্রীর রাগ প্রশমিত করতে পারেন না; নিঃশব্দে বেরিয়ে যান।
তবু মাতৃহৃদয়ের গভীরে স্নেহের যে অনিঃশেষ স্রোত, তা ক্রোধের আড়ালে দীর্ঘক্ষণ আবদ্ধ থাকে না। রান্নার সময় ক্ষেন্তির আবদারের কথা মনে পড়তেই অন্নপূর্ণা পথের ধারে ছড়িয়ে থাকা পুঁইডাঁটা কুড়িয়ে এনে কুচো চিংড়ি দিয়ে যত্ন করে চচ্চড়ি রাঁধেন। দুপুরবেলা সেই চচ্চড়ি মেয়ের পাতে তুলে দিয়ে যখন আরও একটু খেতে বলেন, তখন ক্ষেন্তির আনন্দমাখা মুখের দিকে তাকিয়ে তাঁর নিজের চোখ অশ্রুসজল হয়ে ওঠে। এই মুহূর্তে মাতৃত্ব তার সমস্ত কঠোরতা অতিক্রম করে এক গভীর মানবিক মমতায় দীপ্ত হয়ে ওঠে।
* (খ) অনুচ্ছেদ:২২-২৫
কালীমায়ের চণ্ডীমণ্ডপে সেদিন বৈকাল বেলা সহায়হরির…………………… প্রস্তাব মনঃপূত না হওয়ায় সহায়হরি সে সম্বন্ধ ভাঙ্গিয়া দেন।
শব্দার্থ:
চণ্ডীমণ্ডপ- যে মণ্ডপে চণ্ডীপাঠ করা হয় ৷ ভূমিকা- প্রস্তাবনা। * ফাঁদিবার — বিপদে ফেলবার গুপ্ত কৌশল । * উত্তেজিত সুরে—উদ্দীপিত কণ্ঠস্বর। কাণ্ড-বিচারবুদ্ধি। শ্রোত্রিয় – বেদজ্ঞ বিপ্র, সৎচরিত্র ব্রাহ্মণ। শাসন—দণ্ডদান । বাধা দিয়া-কথা থামাইয়া (এক্ষেত্রে)। * বেঁকে-অসম্মতি জ্ঞাপন। * সাতপাক—হিন্দুদের বিবাহ অনুষ্ঠানের একটি নিয়ম। বন্দোবস্ত –আয়োজন । রাজপুত্তুর-রাজপুত্র (রাজার পুত্র)। * জজ–বিচার পতি । মেজেস্টার –শাসনকর্তা (ম্যাজিস্ট্রেটের অপভ্রংশ রূপ)। * দিব্যি–উত্তম, ভালো । চাট্টি—চারটির সমীকরণজাত প্রাদেশিক রূপ হাল–রাজার মতো। রাজার ইতিহাস –বর্ণনা (এক্ষেত্রে)। মাথাব্যথা—উদ্যোগ (এক্ষেত্রে)। * সম্বন্ধ-যোগাযোগ ** সুদধার নেওয়া টাকার জন্য প্রদেয় অনুরূপ অর্থ। * অবান্তর— মূল প্রসঙ্গের সঙ্গে সম্পর্কহীন। ভিত্তি—অমূলক কথাবার্তা । * দুষ্ট—মতলববাজ (এক্ষেত্রে)। * পাত্রপক্ষ হবু বরের বাড়ির লোকজন। আত্মীয়স্বজন—আপনজন। * প্রহার—আঘাত, মার । > শয্যাগত—শয্যায় শায়িত। * প্রস্তাব-আলোচনা স্তরে উত্থাপিত মত। মনঃপূত—পছন্দসই। > সম্বন্ধ—আত্মীয়তা।
ব্যাখ্যা:
গ্রামের চণ্ডীমণ্ডপে বিকেলের সভায় সহায়হরিকে ডেকে পাঠানো হয়। গ্রামের মাতব্বর কালীময় সমাজের প্রতিনিধি হয়ে তাঁর সামনে উপস্থিত হন। প্রথমে কঠোর ভর্ৎসনার ভঙ্গিতে, পরে কৌশলী সুরে তিনি সহায়হরিকে বোঝাতে চান যে, বিবাহযোগ্য মেয়েকে ঘরে রেখে দেওয়া সমাজস্বীকৃত নয়। তাঁর বক্তব্যে সামাজিক নিয়মের কঠোরতা যেমন আছে, তেমনি আছে ক্ষমতার দম্ভও।
অবশেষে কালীময় শ্রীমন্ত মজুমদারের ছেলের সঙ্গে ক্ষেন্তির বিয়ের সম্বন্ধ স্থির করেন। কিন্তু সেই পাত্রের চরিত্র সম্পর্কে সহায়হরির মনে গভীর আপত্তি জন্মায়। গ্রামের এক কুম্ভকারবধূর আত্মীয়দের হাতে মার খাওয়া, দুর্নামের ভারে জর্জরিত সেই যুবককে তিনি মেয়ের উপযুক্ত মনে করতে পারেন না। নিজের সহজ-সরল স্বভাব সত্ত্বেও সহায়হরি শেষ পর্যন্ত আত্মসম্মান ও পিতৃস্নেহের জোরে সেই সম্বন্ধ ভেঙে দেন। এই ঘটনায় তাঁর চরিত্রের এক নীরব দৃঢ়তা প্রকাশ পায়।
(গ) অনুচ্ছেদ:২৬-৫০
দিন দুই পরের কথা।.. ..ক্ষেন্তির নিজস্ব ভাঙ্গা টিনের তোরঙ্গের মধ্যে উহা থাকিত।
শব্দার্থ
নিতান্ত –খুবই কম (এক্ষেত্রে)। কচি রাঙা রৌদ্র— প্রভাতের রঙিন সূর্যের আলো। * আতপে বসিয়া — রৌদ্রে বসে। * নিম্নস্বর-নীচু পর্দায় কথা বলা। • শাবল—লোহার খন্তা জাতীয় অস্ত্র (মাটি খোঁড়ার কাজে ব্যবহৃত)। * উৎকণ্ঠা— অশাক্ত, উদ্বেগ। * তামাক–মাদক রসযুক্ত গাছের পাতাবিশেষ। সতর্ক-সজাগ। * দৃষ্টি নিক্ষেপ-বিশেষভাবে অবলোকন করা। * সন্তর্পণে—অতি সাবধানে, সর্তকতার সঙ্গে। * সিঁধ-চুরি করার উদ্দেশ্যে ঘরের দেওয়ালে কৃত গর্ত। * নবান্ন—হেমন্তের নতুন ধানের চালের সংযোগে অন্যান্য উপকরণাদি। * ইতু—পশ্চিমবঙ্গ বা পূর্ববঙ্গে প্রচলিত লৌকিক সূর্য পূজা। শেওড়া—হারবা বা পেত্নী গাছ (Sand Paper Tree)। * বনভাট—একপ্রকার পাকুড় জাতীয় গাছ। রাংচিতা—বেড়াচিতা গাছ, গুল্মজাতীয় ছোটো গাছ। বনচালতা—বনচাড়াল। লেজঝোলা হলদে পাখি হাঁড়িচাচা বা ডাকাত পাখি, বেনেবউ জাতীয় পাখি। খুপ্ খুপ্–এক ধরনের শব্দ। * থমকানো—হঠাৎ থেমে যাওয়া। * খানিকদূর—কিছু দূর। বিলম্ব-দেরী। তীক্ষ্ণ-প্রখর। নাইতে—স্নান করতে। মেটে আলু—এক ধরনের বড়ো আলু। * আপদ—অনাহুত ব্যক্তিবিশেষ (গল্পানুসারে)। * প্রমাণ-বিশ্বাস জন্মায় এমন নিদর্শন । উত্থাপন—প্রসঙ্গের অবতারণা। * দৃষ্টি—দর্শন, অবলোকন । পৌর্বাপর্য—আনুপূর্বিকতা, আগের ও পরের ঘটনাবলির ক্রম। * নিরীহমুখে—শান্তশিষ্ট মুখে • আলনা–বস্ত্র রাখার আসবাব। মনোযোগ—মন দিয়ে । ইতস্তত-সংকোচ * ক্ষিপ্রদৃষ্টিতে—সত্বর দৃষ্টি নিক্ষেপে। * বিন্দু বিন্দু ঘাম— ফোটা আকারে লোমকূপ থেকে বেরিয়ে আসা শরীরের জল। * আক্ত –খণ্ডিত নয় এমন, অখণ্ড, অভগ্ন । আমড়া— অম্ল ফলবিশেষ। সোৎসাহে—উৎসাহের সঙ্গে। খোঁপা—কবরী, কুণ্ডলীকৃত চুল । সের—পরিমাপের একক, প্রায় ৯৩৩.১ গ্রাম ৷ ১ মন = ৪০ সের । বিপন্ন—বিপদগ্রস্ত। নিক্ষিপ্ত। যৌবনবিশিষ্টা, যৌবনবতী। ভূপতিত—পৃথিবীপৃষ্ঠে সোমত্ত মেয়ে —পূৰ্ণ বিয়ের যুগ্যি—বিয়ের উপযুক্তা। বিজন বন–জনহীন * দিনদুপুর-দিবালোক, দিনেরবেলা। বা নির্জন বন। গোঁসাই—প্রভু বা ঠাকুর। আওলাত—–বাগান, বেড় বাগিচা। ও শীর্ণকায়—রোগা। ও গ্রন্থিবন্ধ–দেহসন্ধি, গাঁট। * গোবর —গোরুর বিষ্ঠা। ও সুশ্রী —সুন্দরী, রূপসৌন্দর্য। সার্জের জামা—পিরান, কোট। চৌকিদারপাহারাদার, প্রহরী । পাথরকুচি– মোটা পাতার একরকম ছোটো গুল্ম। ও কণ্টিকারী–এক ধরনের জংলা গাছ । ভবিষ্যসম্ভাবী–ভবিষ্যতের সম্ভাবনায়। অবাস্তব, অমূলক। কাল্পনিক– অগ্রদূত-পথপ্রদর্শকের ন্যায়। আসামীঅভিযুক্ত ব্যক্তি। মস্তিষ্ক-মাথা। অবস্থিতি—বিদ্যমানতা, স্থিতি। প্রত্যাশা—আকাঙ্ক্ষা, প্রতীক্ষা। রাসের মেলা-রাধাকৃষ্ণের রাসলীলা উৎসবের যে মেলা। সম্প্রতি—অধুনা,ইদানিং, বর্তমান । স্বাস্থ্যোন্নতি—শারীরিক সুস্থতার উন্নতি। অবস্থা—দশা। নিজস্ব-নিজের ধন বা নিজের সম্পত্তি। রিফু—ছুঁচ-সুতো দিয়ে সূক্ষ্ম মেরামত। তোরঙ্গ—প্যাটরা, লোহার তৈরি বড়ো বাক্স ।
ব্যাখ্যা:
শীতের সকালের কোমল রৌদ্রে বসে সহায়হরি তামাক খাচ্ছিলেন। সুযোগ বুঝে ক্ষেন্তি জানায় যে মা ঘাটে গিয়েছেন। সঙ্গে সঙ্গে সহায়হরির মনে যেন এক শিশুসুলভ অভিযানের উচ্ছ্বাস জেগে ওঠে। তিনি ক্ষেন্তিকে শাবল আনতে বলেন, আর বাবা-মেয়ে নিঃশব্দে বেরিয়ে পড়ে। তাদের চলাফেরায় এমন গোপন উত্তেজনা যেন তারা কোনো গুপ্তধনের সন্ধানে চলেছে।
অন্যদিকে অন্নপূর্ণা ঘাট সেরে ফেরার পথে বনভূমির ভিতর থেকে ভেসে আসা ‘খুপ্ খুপ্’ শব্দে চমকে ওঠেন। পরে বাড়িতে ফিরে যখন জানতে পারেন যে সহায়হরি ও ক্ষেন্তি বরোজপোতার বন থেকে বিশাল মেটে আলু তুলে এনেছে, তখন তাঁর মনে ক্ষোভের আগুন জ্বলে ওঠে। শুধু চুরিই নয়, বিবাহযোগ্যা মেয়েকে এই কাজে সঙ্গী করাও তাঁর কাছে অসহনীয়। সংসারের দারিদ্র্য তাঁকে কঠোর বাস্তববাদী করে তুলেছে; তাই স্বামীর এই ছেলেমানুষি তাঁর কাছে দায়িত্বজ্ঞানহীনতার পরিচয়।
এরই মধ্যে ক্ষেন্তি বাড়ির ভাঙা পাঁচিলের ধারে একটি রোগা পুঁইচারা পুঁতে মাকে উৎসাহভরে দেখায়। ক্ষুদ্র এই চারা যেন ক্ষেন্তির স্বপ্ন, তার ছোটো ছোটো আনন্দের প্রতীক। প্রচণ্ড শীতেও সে অন্যের বাড়ি থেকে গোবর কুড়িয়ে এনে গাছটির যত্ন করে। সহায়হরির চোখে তখন মেয়ের মুখের লাবণ্য ধরা পড়ে—সময়ের সঙ্গে সে আর শিশু নেই, ধীরে ধীরে যৌবনের দোরগোড়ায় এসে দাঁড়িয়েছে। হরিপুরের মেলা থেকে কেনা সার্জের জামাটিও আর তার গায়ে হয় না। এই ছোট্ট পর্যবেক্ষণের মধ্য দিয়েই বিভূতিভূষণ জীবনের স্বাভাবিক পরিবর্তনের এক গভীর বেদনাময় সত্যকে প্রকাশ করেছেন।
(ঘ) অনুচ্ছেদ:৫১-৬৬
পৌষ সংক্রান্তি। সন্ধ্যাবেলা অন্নপূর্ণা একটি কাঁসিতে চালের গুঁড়া, ময়দা ও গুড় দিয়া চটকাইতেছিলেন .উঁচু কথা কখনো কেউ শোনেনি….
শব্দার্থ
পৌষ-সংক্রান্তি—পৌষ মাসের শেষ দিনে পালিত উৎসব বা পার্বণ। * কাঁসিতে—(উচ্চ প্রান্ত বিশিষ্ট) কাঁসার থালায় । কুরুণি—নারিকেল কোরার যন্ত্রবিশেষ। ও স্বীকৃত-স্বীকার করা হয়েছে এমন। * বনেবাদাড়ে—বনেজঙ্গলে। শাস্ত্রসম্মত-শাস্ত্রস্বীকৃত। * শুচি-শুদ্ধ, পবিত্ৰ, নিৰ্মল । অবশেষে—শেষকালে, সবকিছুর পরে। নিযুক্ত—নিয়োগ । বিশেষ মুদ্রা রচনা–বিশেষ আকৃতির (গল্পানুসারে)। প্রসারিত—ছড়ানো, বিস্তারিত। গামলা—ডাবা, মধ্যে গর্তবিশিষ্ট পাত্র। * শুচিৰস্ত্ৰ—শুদ্ধ বস্ত্র বা জামাকাপড়। * ক্ষীর-চিনির সঙ্গে পাক করা ঘন দুধ। লুব্ধনেত্রে- লোভী, লোলুপ চোখে। * ক্ষিপ্রহস্তে—দ্রুত হাতে। * মুগতক্তি—মুগডালের তৈরি মিষ্টি। * পাটিসাপটা—ময়দা, চালের গুঁড়ো ও ক্ষীর সহযোগে তৈরি একপ্রকার পিঠে। সদুত্তর –সঠিক উত্তর। খোলায়—পিঠা তৈরির মাটির পাত্রে। * থাবা—করতল দর্পণ—আয়না। * মনঃপূত—মনের মতো। * সম্মতি সূচক—সূচনাকারী,হ্যাঁ-সূচক। ফেনিয়ে—ফেনাযুক্ত, গাঁজলাযুক্ত। * খুস্তী—রান্না করবার যন্ত্র। চুলী—উনান, ভাটি। * ভোজনপটু— খাদ্যরসিক, ভোজনে অধিক সমর্থ ।
ব্যাখ্যা:
পৌষসংক্রান্তির সন্ধ্যায় দরিদ্র গৃহের রান্নাঘরটি এক অপূর্ব উষ্ণতায় ভরে ওঠে। অন্নপূর্ণা কাঁসার থালায় চালের গুঁড়ো, ময়দা ও গুড় মিশিয়ে পিঠের গোলা তৈরি করছেন। চারদিকে শীতের আবহ, অথচ উনুনের আগুনের পাশে বসে তিন মেয়ের চোখে-মুখে উৎসবের আলো। ছোটোদের উৎসাহের মধ্যেও ক্ষেন্তির লোভাতুর অথচ নিষ্পাপ দৃষ্টি মায়ের চোখ এড়ায় না। তাই তিনি গোপনে তার জন্য একটু বেশি গোলা তুলে রাখেন।
নারিকেল কোরা, ক্ষীর, পাটিসাপটা নিয়ে বোনদের কথোপকথনে গ্রামীণ জীবনের সহজ আনন্দ ফুটে ওঠে। ক্ষেন্তি মায়ের কাছে নারিকেল কোরা নেওয়ার আবদার করলে অন্নপূর্ণা অনুমতি দেন, আর সেই সামান্য অনুমতিতেই ক্ষেন্তির মুখ আনন্দে উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। পরে গরম গরম পিঠে খেতে বসে সে পরম তৃপ্তিতে একের পর এক পিঠে খেতে থাকে। তার খাওয়ার আনন্দে শিশুসুলভ সরলতা আছে, আবার ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তার বিরুদ্ধে ক্ষণিকের সুখও আছে।
মেয়ের এই খাদ্যরসিকতা দেখে অন্নপূর্ণার মনে অজানা আশঙ্কা জাগে—এমন সহজ-সরল, লোভী অথচ নিষ্পাপ মেয়েকে ভবিষ্যতের কঠিন সংসার কতটা আপন করে নেবে? মাতৃত্বের এই নিঃশব্দ উদ্বেগ গল্পটিকে গভীর মানবিক আবেগে পূর্ণ করে তোলে।
(ঙ) অনুচ্ছেদ: ৬৭-৮৪
বৈশাখ মাসের প্রথমে সহায়হরির এক দূরসম্পৰ্কীয় . পিঁপড়ের টোপে মুড়ির চার তো সুবিধে হবে না।…
শব্দার্থ:
ঘটকালি — ঘট কের কাজ, বিবাহ সংঘটনকারী। সঙ্গতিপন্ন—অবস্থাপন্ন। সিলেট—সিমেন্ট বা বিলাতি মাটি বা গৃহনির্মাণ দ্রব্য। দুর্ঘট—কঠিন, যা অতি কষ্টে ঘটে এরূপ। বেহারারা—পাল্কি বা শিবিকা বাহকরা। পাল্কী–শিবিকা; মানুষের কাঁধ ব্যবহারকারী যানবাহন। বালুচরের—মুর্শিদাবাদের প্রাচীন রেশম শিল্প কেন্দ্র বালুচরী। বেপরোয়া—কাউকে পরোয়া বা গ্রাহ্য করে না এমন। সান্ত্বনা — আশ্বাসবাক্য। তত্ত্ব-আত্মীয় বাড়িতে প্রেরিত উপহার। আভিজাত্য—বংশমর্যাদা। গৌরব–সম্মান, মর্যাদা। লাবণ্য–সৌন্দর্য, কান্তি । রাঙাচেলী—শাড়ির রাঙা আঁচল। উদ্বেল—সীমাতি ক্রান্ত, উথলিত। অনাচারী – সমাজ বিরুদ্ধ, অভদ্র বা গর্হিত আচার। লোভী—কোনো কিছু পাওয়ার জন্য যে খুবই ইচ্ছুক। চামার—কৃপণ। হুঁকা—তামাকের ধূম সেবনেরনারিকেল খোলের যন্ত্র। হাভাতে—পেটুক, দরিদ্র,কঞ্জুস, নিরন্ন দশা। * কুটুম্বিতে— আত্মীয়তায়। বসন্ত—জলবসন্ত বা চিকেন পক্স; ভাইরাস ঘটিত সংক্রামক রোগ।
ব্যাখ্যা:
অবশেষে বৈশাখ মাসে এক দূরসম্পর্কীয় আত্মীয়ের ঘটকালিতে ক্ষেন্তির বিয়ে হয়। পাত্র অবস্থাপন্ন, ব্যবসায়ী, কিন্তু বয়সে অনেক বড়ো। দরিদ্র পিতামাতার কাছে এই সম্বন্ধ যেন এক অনিবার্য নিয়তির মতো। বিদায়ের সময় ক্ষেন্তির চোখের জল, আষাঢ়ে তাকে আনতে যাওয়ার আবদার—সবকিছুতেই শৈশবসুলভ নির্ভরতার সুর মিশে থাকে। ঠানদিদির ঠাট্টায় তার মুখ লজ্জায় রাঙা হয়ে ওঠে; কিন্তু সেই লজ্জার আড়ালেও রয়েছে অজানা ভবিষ্যতের ভয়।
মেয়েকে বিদায় দেওয়ার পর অন্নপূর্ণার মন বারবার ক্ষেন্তির স্মৃতিতে ভরে ওঠে। আমসত্ত্ব তুলতে গিয়েও তাঁর মনে পড়ে সেই লোভী অথচ স্নেহময়ী মেয়েটির কথা। সহায়হরি পণের বাকি টাকা দিতে না পারায় মেয়েকে আনতে পারেন না; অপমান নিয়ে ফিরে আসেন। এই আর্থিক অসহায়ত্ব যেন তাঁদের পিতৃত্ব-মাতৃত্বকে ক্রমাগত অপমানিত করে।
অবশেষে বসন্ত রোগে আক্রান্ত ক্ষেন্তিকে শ্বশুরবাড়ির লোকেরা দূর সম্পর্কের আত্মীয়ের বাড়িতে ফেলে রেখে যায়। গায়ের গহনা খুলে নেওয়া সেই নির্মম ঘটনায় মানবিকতার চরম অবক্ষয় প্রকাশ পায়। সেখানেই নিঃসঙ্গ অবস্থায় ক্ষেন্তির মৃত্যু ঘটে। তার মৃত্যু কেবল এক কিশোরীর জীবনাবসান নয়; দারিদ্র্য, সমাজব্যবস্থা ও নিষ্ঠুর বাস্তবতার কাছে এক নিষ্পাপ প্রাণের পরাজয়।
(চ)অনুচ্ছেদ:৮৫-৯৮
তারপর কয়েক মাস কাটিয়া গিয়াছে। প্রবর্ধমান জীবনের লাবণ্যে ভরপুর।
শব্দার্থ:
পৌষ-পার্বণ— পৌষসংক্রান্তি বা মকরসংক্রান্তিতে পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশে পালিত লোক উৎসব, পিঠে পার্বণ। সরুচাকলি —বিউলির ডাল ও চালের গুঁড়ো সহযোগে বাংলার জনপ্রিয় পিঠে। দোলাই—দুই পাট কাপড়ের তৈরি শীত বস্ত্রবিশেষ । মুচি— মাটির তৈরি কড়াইয়ের ঢাকনা। * টোপরের মতন— দুই পাশে ফোলা। ষাঁড়া ষষ্ঠী—সন্তানের রক্ষয়িত্ৰী হিন্দু দেবী, শিশুর কল্যাণদাত্রী। তেলাকুচা লতা—দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার লতানো গাছ, কচি ডগা খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত হয়। জ্যোৎস্না-চাঁদের আলো। তন্দ্রালু —ঘুমের আবেশ। স্মৃতি— অতীতের কোনো বিষয় মনের মাঝে গ্রথিত থাকা। * সুপুষ্ট—পরিপুষ্ট। * নধর—গোলগাল, সুডৌল। প্রবর্ধমান ক্রমশ বৃদ্ধি হওয়া।
ব্যাখ্যা:
কয়েক মাস পরে আবার পৌষপার্বণ ফিরে আসে। শীতের সন্ধ্যায় অন্নপূর্ণা রান্নাঘরে বসে সরুচাকলির গোলা তৈরি করছেন। উনুনের আগুনে পিঠে ফুলে উঠছে, আর পাশে বসে পুঁটি ও রাধী আগুন পোহাচ্ছে। সংসারের কাজ আগের মতোই চলছে, কিন্তু কোথাও যেন এক গভীর শূন্যতা নীরবে ছায়া ফেলে আছে।
প্রথম পিঠে ষাঁড়া ষষ্ঠীর উদ্দেশে উৎসর্গ করার পর অনেকক্ষণ বাদে পুঁটি হঠাৎ অন্যমনস্ক হয়ে বলে ওঠে—“দিদি বড়ো ভালবাসত…”। মুহূর্তে চারদিক নিস্তব্ধ হয়ে যায়। অন্নপূর্ণা, পুঁটি, রাধী—তিনজনের মনেই ক্ষেন্তির স্মৃতি বেদনাময় হয়ে জেগে ওঠে। অনুপস্থিতির এই নীরব অনুভূতি গল্পটিকে এক গভীর করুণ সৌন্দর্যে আবৃত করে।
অন্যদিকে ক্ষেন্তির নিজের হাতে পোঁতা পুঁইগাছটি মাচা জুড়ে বেড়ে উঠেছে। বর্ষার জল আর শিশিরে তার কচি সবুজ ডগাগুলি প্রাণে ভরপুর। যেন মৃত্যুর মধ্যেও জীবন থেমে থাকে না; মানুষের চলে যাওয়ার পরও তার স্পর্শ, তার স্মৃতি, তার স্নেহ প্রকৃতির মধ্যে বেঁচে থাকে। বিভূতিভূষণ এই পুঁইমাচাকে তাই কেবল একটি গাছের মাচা হিসেবে নয়, প্রবহমান জীবনের চিরন্তন প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছেন।
পুঁইমাচা : টীকা প্রসঙ্গ
ইতুর ঘট
বাংলার কৃষিনির্ভর লোকজ সংস্কৃতির এক প্রাচীন আচার হল ইতু পূজা। অগ্রহায়ণ মাসের প্রতি রবিবারে শস্যসমৃদ্ধি, পারিবারিক মঙ্গল ও আর্থিক স্বচ্ছলতার কামনায় নারীরা ছোটো মাটির ঘটে ধান, ছোলা, মটর, শস্যবীজ প্রভৃতি স্থাপন করে এই পূজা সম্পন্ন করেন। এই ঘটই ‘ইতুর ঘট’ নামে পরিচিত। সংক্রান্তির দিনে ঘট বিসর্জনের মধ্য দিয়ে পূজার সমাপ্তি ঘটে। ‘ইতু’ শব্দটি ‘মিত্র’ বা সূর্যদেবতার এক লোকায়ত রূপ বলে মনে করা হয়। ফলে এই পূজার ভিতরে কৃষিজীবনের সঙ্গে সূর্যচেতনার নিবিড় সম্পর্ক প্রতিফলিত হয়েছে। গ্রামীণ বাংলার নারীকেন্দ্রিক ধর্মাচরণে এই পূজা শুধু আধ্যাত্মিক নয়, জীবনধারণের সংগ্রাম ও ভবিষ্যৎ নিরাপত্তারও প্রতীক।
অরন্ধন
‘অরন্ধন’ শব্দের আক্ষরিক অর্থ— যে দিনে রান্না করা নিষিদ্ধ। ভাদ্র সংক্রান্তিকে কেন্দ্র করে বাংলার বহু অঞ্চলে পালিত এই লোকাচার মূলত ঋতুচক্র, কৃষিজীবন ও পারিবারিক বিশ্বাসের সঙ্গে যুক্ত। পূজোর আগের দিন রাত্রে রান্না করে পরদিন সেই বাসি খাবার গ্রহণের রীতিই অরন্ধন। এর ভিতরে একদিকে যেমন ধর্মীয় সংস্কার রয়েছে, তেমনই রয়েছে প্রকৃতির প্রতি মানুষের এক ধরনের বিনয় ও সংযমবোধ। সমাজতাত্ত্বিক দৃষ্টিতে এটি শ্রমবিরতিরও এক প্রতীকী আয়োজন, যেখানে গৃহস্থালি পরিশ্রম থেকে নারীরা সাময়িক অবকাশ লাভ করতেন। বাংলার লোকসংস্কৃতিতে এই উৎসব পারিবারিক ঐক্য ও প্রজন্মান্তরে বহমান ঐতিহ্যের ধারক।
আমড়া
‘আমড়া’ বাংলা দেশের এক সুপরিচিত টকজাতীয় ফল। শব্দটির উৎস সংস্কৃত আম্রাতক। ধ্বনিগত বিবর্তনের ধারায় আম্রাতক > আম্বাড > আমড়া রূপটি গড়ে উঠেছে। এখানে আংশিক সমীভবন, ধ্বনির ঘোষীভবন এবং অন্ত্যধ্বনির লোপ— বাংলা ভাষার স্বাভাবিক ধ্বনিবিকাশের লক্ষণ। গ্রামীণ জীবনে আমড়া শুধু খাদ্য নয়; বর্ষা ও শরৎকালের লোকস্মৃতি, গাছকেন্দ্রিক গ্রামীণ পরিবেশ এবং সহজ জীবনরসেরও প্রতীক। বিভূতিভূষণের গল্পে এই ধরনের ফলের উল্লেখ গ্রামবাংলার বাস্তব ও প্রাণময় পরিবেশ নির্মাণে বিশেষ ভূমিকা পালন করেছে।
উনুন
‘উনুন’ শব্দটির উৎপত্তি সংস্কৃত উষ্ণাপন বা উনাপন ধাতুগোষ্ঠীর সঙ্গে সম্পর্কিত বলে ভাষাতাত্ত্বিকেরা মনে করেন। ধ্বনির রূপান্তরে উনান > উনুন রূপটি বাংলায় প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। মাটির তৈরি এই চুল্লিতে কাঠ, খড়, ঘুঁটে ইত্যাদি জ্বালিয়ে রান্না করা হত। গ্রামীণ বাংলার পারিবারিক জীবনে উনুন ছিল গৃহস্থ অস্তিত্বের কেন্দ্রবিন্দু— যেখানে রান্না, গল্প, শীতের আগুন পোহানো, পারিবারিক আলাপ— সবকিছুর মিলন ঘটত। ‘পুঁইমাচা’ গল্পে উনুনের পাশে বসা পুঁটি ও রাধীর দৃশ্যটি শুধু একটি পারিবারিক মুহূর্ত নয়; তা গ্রামীণ দারিদ্র্য, উষ্ণতা ও অন্তরঙ্গতারও চিত্ররূপ।
বর
‘বর’ শব্দটি সংস্কৃত বর (বৃ + অপ) থেকে আগত। বৈদিক যুগে এর অর্থ ছিল ‘কন্যা-নির্বাচনকারী’। পরবর্তীকালে অর্থবিবর্তনের মধ্য দিয়ে শব্দটি ‘বিবাহার্থী’, ‘সদ্য বিবাহিত ব্যক্তি’ এবং শেষে ‘স্বামী’ অর্থে প্রতিষ্ঠা পায়। ভাষাতত্ত্বে এই পরিবর্তনকে অর্থসংক্রম ও অর্থবিস্তার বলা হয়। সমাজতাত্ত্বিক দৃষ্টিতে শব্দটির বিবর্তনের মধ্য দিয়ে প্রাচীন পিতৃতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা ও বিবাহপ্রথার রূপান্তরের ইতিহাসও প্রতিফলিত। গল্পে ক্ষেন্তির বিবাহ প্রসঙ্গে শব্দটির ব্যবহার গ্রামীণ বিবাহপ্রথার সামাজিক বাস্তবতাকে তুলে ধরে।
বিবাহ
‘বিবাহ’ শব্দটির উৎস সংস্কৃত বি + বহ + ঘঞ— যার আদি অর্থ ‘বিশেষরূপে বহন করা’। আদিম সমাজে নারীদের অপহরণ বা বহন করে নিয়ে যাওয়ার রীতির সঙ্গে এই শব্দের প্রাচীন অর্থগত সম্পর্ক রয়েছে। ক্রমে তা ‘পরিণয়’ বা সামাজিক দাম্পত্যবন্ধনের অর্থে ব্যবহৃত হতে শুরু করে। বাংলা ভাষায় বিবাহ > বিআহ > বিয়া > বিয়ে— এই ধ্বনিগত বিবর্তন লক্ষ করা যায়। বিভূতিভূষণের গল্পে ক্ষেন্তির বিয়ের প্রসঙ্গ শুধু পারিবারিক ঘটনা নয়; তা গ্রামীণ সমাজের আর্থসামাজিক কাঠামো, নারীর অবস্থান ও অভিভাবকসুলভ উদ্বেগেরও পরিচায়ক।
ভাত
বাংলা জীবনের সঙ্গে ‘ভাত’ শব্দটির সম্পর্ক অস্তিত্বমূলক। সংস্কৃত ভক্ত বা ভত্ত থেকে প্রাকৃত ও অপভ্রংশের স্তর অতিক্রম করে বাংলায় ‘ভাত’ শব্দটির উদ্ভব। মূল সংস্কৃতে ‘ভক্ত’ শব্দে ‘অন্ন’ ও ‘ভক্তি’— উভয় অর্থ নিহিত ছিল। পরবর্তীকালে তা বিশেষভাবে সিদ্ধ চালজাত খাদ্যকে বোঝাতে ব্যবহৃত হয়। বাঙালির খাদ্যসংস্কৃতি, অর্থনীতি ও আবেগ— সবকিছুর কেন্দ্রেই রয়েছে ভাত। ‘জল-দেওয়া ভাত’-এর প্রসঙ্গে গল্পে যে দারিদ্র্যের ইঙ্গিত পাওয়া যায়, তা গ্রামীণ জীবনের অভাব ও মমতার এক অনবদ্য দলিল।
ময়দা
‘ময়দা’ শব্দটির উৎস গ্রিক Semidalis। বিদেশি শব্দটি সংস্কৃত ও প্রাকৃত স্তর অতিক্রম করে বাংলায় ‘ময়দা’ রূপে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। এটি একটি বিদেশি তদ্ভব শব্দের উৎকৃষ্ট উদাহরণ। বাংলার খাদ্যসংস্কৃতিতে ময়দা বিশেষত উৎসব, পিঠেপুলি ও মিষ্টান্ন প্রস্তুতির সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। ‘পুঁইমাচা’ গল্পে পৌষসংক্রান্তির পিঠে তৈরির প্রসঙ্গে ময়দার উল্লেখ গ্রামীণ উৎসবজীবনের রস ও উষ্ণতাকে জীবন্ত করে তোলে।
শাশুড়ি
‘শাশুড়ি’ শব্দটির মূল সংস্কৃত শ্বশ্রূ। প্রাকৃত ও অপভ্রংশ স্তর অতিক্রম করে বাংলায় এর বর্তমান রূপ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। শব্দটির ধ্বনিগত বিবর্তনে সরলীকরণ, ধ্বনিলোপ ও স্বরসঙ্গতির প্রভাব স্পষ্ট। বাঙালি পারিবারিক কাঠামোয় শাশুড়ি কেবল আত্মীয়তার পরিচয় নয়; তিনি গৃহস্থ সংস্কৃতির এক প্রভাবশালী কেন্দ্র। গল্পে ক্ষেন্তির শাশুড়ির মন্তব্য গ্রামীণ সমাজের মূল্যবোধ, বিচারপ্রবণতা এবং নারীর অবস্থান সম্পর্কে তাৎপর্যপূর্ণ ইঙ্গিত বহন করে।
চণ্ডীমণ্ডপ
মধ্যযুগীয় বাংলার সম্ভ্রান্ত পরিবারে দেবীপূজা, বিশেষত চণ্ডীপাঠের জন্য নির্মিত স্থাপত্যকে ‘চণ্ডীমণ্ডপ’ বলা হত। ষোড়শ শতাব্দী থেকে এটি কেবল ধর্মীয় আচারস্থল নয়, গ্রামের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র হিসেবেও ব্যবহৃত হতে থাকে। জমিদার, মাতব্বর ও গ্রামবাসীদের বৈঠক, বিচারসভা, উৎসব— সবকিছুরই কেন্দ্র হয়ে ওঠে চণ্ডীমণ্ডপ। ‘পুঁইমাচা’ গল্পে চণ্ডীমণ্ডপের উল্লেখ গ্রামীণ সমাজজীবনের সামষ্টিক চেতনাকে উন্মোচিত করে।
নবান্ন
‘নবান্ন’ অর্থ নতুন অন্ন। নতুন ধানের চাল, গাভির দুধ, খেজুরের রসের নলেন গুড় প্রভৃতি দিয়ে প্রস্তুত পায়েস বা মিষ্টান্ন লক্ষ্মীদেবীর উদ্দেশ্যে নিবেদন করার মধ্য দিয়ে এই উৎসব পালিত হয়। কৃষিভিত্তিক বাংলার জীবনে নবান্ন কেবল খাদ্যের উৎসব নয়; এটি প্রকৃতি, শ্রম ও সমবায়জীবনের আনন্দোৎসব। শস্যগৃহে নতুন ধান তোলার সময় শাঁখ, উলুধ্বনি, ঢোল ও করতালের যে সমারোহ দেখা যায়, তা বাংলার কৃষিসভ্যতার প্রাণস্পন্দন। গল্পে অন্নপূর্ণাকে নবান্ন মাখার জন্য ডেকে নেওয়ার প্রসঙ্গ গ্রামীণ পারস্পরিকতা ও উৎসবমুখর মানবিক সম্পর্ককে প্রকাশ করে।
পৌষসংক্রান্তি
বাংলা মাস পৌষের অন্তিম দিনকে কেন্দ্র করে পালিত অন্যতম প্রধান লোকোৎসব হল পৌষসংক্রান্তি। মকরসংক্রান্তির সঙ্গে যুক্ত এই দিনটি কৃষিজীবনের এক আনন্দময় পরিণতি— নতুন ধান ঘরে তোলার উল্লাস। চালের গুঁড়ো, খেজুরের গুড়, নারিকেল, দুধ ও ময়দা দিয়ে পিঠে, পুলি, পায়েস, সরুচাকলি প্রভৃতি তৈরির মধ্য দিয়ে উৎসব উদ্যাপিত হয়। এই উৎসব বাঙালির খাদ্যসংস্কৃতি, পারিবারিক ঐক্য ও ঋতুচেতনার এক উজ্জ্বল নিদর্শন। ‘পুঁইমাচা’ গল্পে পৌষসংক্রান্তির প্রসঙ্গ গ্রামীণ জীবনের উৎসব-আবেগ ও দারিদ্র্যের মধ্যে লুকিয়ে থাকা সুখবোধকে গভীরভাবে তুলে ধরেছে।
### ড. অনিশ রায়

