জীবনানন্দের কবিতায় নক্ষত্র-প্রেম ও নদী-নারী

                                       নক্ষত্র-প্রেম ও নদী-নারী

                                                                                      ড. অনিশ রায়

ভালোবেসে দেখিয়াছি মেয়েমানুষেরে,

অবহেলা করে আমি দেখিয়াছি মেয়েমানুষেরে,

ঘৃণা করে দেখিয়াছি মেয়েমানুষেরে      (বোধ)

‘ভালোবাসা’, ‘অবহেলা’, ‘ঘৃণা’ যখন এক ‘মেয়েমানুষেরে’ কেন্দ্র করে ব্যক্ত হয়, তখন বুঝে নিতে অসুবিধা হয় না যে, রচয়িতার প্রেম (এ-ক্ষেত্রে নারীপ্রেম) সম্পর্কিত ভাবনায় দ্বান্দ্বিকতার রেখাটি কত সুদূরপ্রসারী। বাঙালি কাব্যপাঠককে নিশ্চয়ই আর ঘটা করে বলার প্রয়োজন নেই যে, রচয়িতা এখানে কবি জীবনানন্দ দাশ-ই। বাংলা কাব্যে প্রেমভাবনা, বলা যাক ‘প্রেমদর্শন’ বহুস্বরী। ভাববাদী বিশ্ববিস্তারী যুগল প্রেমকল্পনা, অস্থি-মাংস-সম্বন্ধ প্রেমানুভূতি, ক্ষণমিলনের স্মৃতিকে স্থায়িত্বদানের আকুতি, দেহসর্বস্ব অথচ রতিবিমুখ প্রেমের হাহাকার, প্রেমকে অস্বীকারের উদ্ধত নির্লিপ্ততা, জৈবিক মিলনের নিঃসঙ্গ উতরোল আনন্দ, সমাজবদ্ধ টুকরো অবসাদের শান্ত বিপন্নতা ইত্যাদি প্রেমদর্শনে বাংলা কবিতাপাঠক নিশ্চয়ই এতদিনে পরিচিত। এসবের বাইরেও জীবনানন্দের প্রেমভাবনা এক বিশেষ দ্বান্দ্বিক অবস্থান তৈরি করে। শুধু তা-ই নয়, নিবিড় প্রেমঘন শরীরী মুহূর্তেও স্বতত অতৃপ্তিবোধে কবির প্রেমদর্শন স্বাতন্ত্র্যের মধ্যেও বিশেষ অভিনিবেশ দাবি করে।

এককথায়, জীবনানন্দের প্রেম এবং প্রেমের আবহ সম্পাদনকারী নারী খুবই জটিল ৷ ‘অতিদূর আকাশের সীমানার কুয়াশায়’ হয়তো তাদের সশব্দ পরিচিত বিচরণ, অথচ প্রত্যক্ষ বাস্তবে তারা অস্পষ্ট, কেবল বিমিশ্র মরমি বোধের দ্যোতক, বিচিত্র অনুভূতির উদ্দীপক। এখন কথা হচ্ছে, যে-কবি কবিতার পর কবিতায় নারীকে স্থানিক ও কালিক মাত্রাগত চিহ্নায়নে তুলে ধরেন, তাঁর কবিতাগুলি পাঠের পরেও এই অস্পষ্টতার দোষ বা গুণ আরোপের পঙ্গু প্রয়াস কতটা গ্রহণযোগ্যতা পেতে পারে। এই আলোচনায় প্রবেশ করার আগে কবির প্রেমস্বভাবী মেজাজটিকে একটু চিনে নিতে হয় ৷ এ-ক্ষেত্রে কবি সঞ্জয় ভট্টাচার্যের অভিমত না-মেনে উপায় থাকে না যে, ‘জীবনানন্দ প্রেমিক কবি, কিন্তু প্রেমের কবি নন’। আসলে প্রেমের প্রতিফলনে প্রেমিক যে অব্যক্ত ব্যথা, বিস্ময় ও অমৃত আস্বাদ অনুভব করে, কবির কবিতায় শুধু তারই উদ্ঘাটন আছে। তাই তাঁর কবিতার নায়ক যেমন একমাত্র তিনি, তেমনি প্রেমিকও একমাত্র তিনিই। আর যেহেতু জীবনানন্দ নামক কবি-ব্যক্তির নির্ভরতা তাঁরই স্বগত অস্তিত্বে, ফলত বাংলা কবিতার আবহমান প্রেমচেতনার বা প্রেমিকসত্তার থেকে তা সম্পূর্ণ ভিন্ন আশ্রয়ভূমি রচনা করে। অবশ্যই তা ব্যক্তির নিজস্ব প্রত্যয়-নির্মাণের ভূমি। যদিও কবি বলেন :

এই ব্যথাএই প্রেম সব দিকে রয়ে গেছে—

কোথাও ফড়িঙে-কীটেমানুষের বুকের ভিতরে,

আমাদের সবের জীবনে (ক্যাম্পে)

এ-কথা ঠিক, ‘প্রত্যয়’ ব্যক্তির নিজস্ব অর্জন হলেও, জীবনের গভীর বাস্তবকে তা অভিজ্ঞতায় লালন করে। যে-অভিজ্ঞতা আংশিকতায় ব্যক্তিক, সার্বিকতায় নৈর্ব্যক্তিক। ফলত কবির ব্যক্তিগত বোধের একাকিত্ব (‘তাদের মতন নই আমিও কি?’) হঠাৎই ‘আমাদের সবের’, ‘সবদিকে’র ভিতরে সঙ্গাতুর হয়ে ওঠে। তাই কবির প্রেমভাবনা যেমন ব্যক্তি-পরিসর ছাড়ায়, তেমনই হয়তো বিশ্ব-পরিসরকেও অতিক্রম করতে চায়। তাঁর প্রেমদৃষ্টি দ্রষ্টব্যের উপর তীব্র, সংলগ্ন, নিবদ্ধ হয়েও যেন চলে যায় দ্রষ্টব্যের অগোচরে। অন্ধকার যেখানে সমাসন্ন, কুয়াশায় কাঁপতে থাকা নক্ষত্রই যেখানে আশ্রয়-ভরসা। এই নক্ষত্রই জীবনানন্দের প্রেমের প্রতীক, এই নক্ষত্রই আবহমান জীবনের প্রতীক, এই নক্ষত্রই ব্যর্থ মানবকের শিশির-সন্ধ্যায় নীড়ে ফিরে আসার প্রতীক। বোঝাই যায়, এর সঙ্গে একদিকে জড়িয়ে আছে আবেগ হারানো প্রত্যয়বিচ্যুত আত্মবিপর্যয় থেকে সার্বিক নিষ্ক্রমণের প্রয়াস; অন্যদিকে জৈবিক সত্তার প্রতিও মুগ্ধতার আবেশ ৷ অবশ্য তা জৈবিক নিয়তিকে বিস্মৃত করে জীবনের প্রবাহকেই অঙ্গীকৃত করে তোলে। সুতরাং জীবনানন্দের প্রেমচেতনা যে পঞ্চেন্দ্রিয়-সম্ভূত, এ-কথা বলতে দ্বিধা থাকা উচিৎ নয়। তবে এই পঞ্চেন্দ্রিয়তা কিন্তু শারীরিকতা বা যৌনতাতেই সীমাবদ্ধ নয়, এর মধ্যে আছে অতীতকে বর্তমানের প্রেক্ষিতে উপলব্ধি করার মতো গাঢ় স্মৃতি-সচেতনতা। বরণীয় সমালোচক প্রদ্যুম্ন মিত্রকে স্মরণ করা যাক:

তিনি (জীবনানন্দ) প্রেমের ব্যক্তিগত প্রসঙ্গের উত্তাপ কবিতায় সঞ্চারিত করে দিতে পারেননিপরিবর্তে নিয়ে এসেছেন এক অস্পষ্টঅনির্দেশ্য প্রেমব্যাকুলতা যা ইপ্সিতকে খুঁজে ফিরেছে অতীতের লুপ্ত গরিমাবিষাদ ও মৃত্যুস্পৃষ্ট এমন এক অলীক জগতে যা বাস্তব থেকে দূরস্থিত অথচ কল্পনার যথার্থ উজ্জীবনে স্বপ্নেও আশ্বস্ত নয়

আসলে জীবনানন্দের প্রেমভাষ্য ধাবিত হয় প্রেমের জন্য কাঙাল এক হৃদয়ের স্বপ্নপ্রান্তরে, তাঁর প্রেমপ্রয়াস সব সুস্থতার দিকে, শান্তির দিকে, হয়তো-বা পরিপূর্ণতার দিকে। আবার তাঁর প্রেমই নাগরিক যন্ত্রণায় ক্ষত-বিক্ষত, এক ব্যর্থ উপেক্ষিত, ঘৃণার আক্রোশে ম্রিয়মাণ আত্মার উন্মোচন। তা যেন এক করুণ স্বপ্ন আর স্বপ্নভঙ্গের দ্বিরালাপ। অর্থাৎ স্বপ্ন নয়, শান্তি নয়, ভালোবাসা নয়— জীবনানন্দের চেতনায় প্রেম আরও মহান কোনো প্রত্যয়, যার আসন শাশ্বত কালের মানবহৃদয়ের গভীরে– জৈব ইন্দ্রিয়তার রূপজ আবেশ ছাড়িয়ে যা ‘অন্য কোনো সাধনার ফল’ লাভের কামনায় জ্বালায় নক্ষত্রস্বভাবী প্রেম-পূজাদীপ। এইভাবেই প্রেম কবির চেতনায় ‘সব কামনার শিয়রে’ জেগে থেকে স্থিত এক অপরিবর্তিত প্রেম-প্রজ্ঞায় মূর্ত হয়ে ওঠে। তাই চরম শরীর-ছোঁয়া প্রেম-মিলনের মধ্যেও কবির চেতনায় জেগে ওঠে গভীর ব্যাকুলতা –‘আরও ব্যথা-বিহ্বলতা তুমি এসে দিয়ে গেলে তারে’। কারণ, কবি যে জৈব-প্রেমের মধ্যেও পেতে চেয়েছিলেন চির-আকাঙ্ক্ষিতাকে। এই অপরিতৃপ্ত বাসনার প্রহারে আত্মদীর্ণ কবি নারীকে ঘৃণা করতে শুরু করেন, তাদের মনে হতে থাকে নিতান্তই শরীরসর্বস্ব ‘নোনা মেয়েমানুষ’, দেহবদ্ধ বাসনার উজ্জ্বল প্রতিমা, কিংবা ‘বধির নিশ্চল সোনার পিত্তল মূর্তি’। অবহেলায় তাদের প্রতি উচ্চারণ করেন:

কখনো সম্রাট শনি শিয়াল ও ভাঁড়

সে নারীর রাং দেখে হো হো করে হাসে  (হংসীশ্বেত)

নারী সম্পর্কে এই শ্রদ্ধাহীন উচ্চারণের পরেও কিন্তু কবির প্রেম-প্রজ্ঞাদীপ্ত কণ্ঠে শোনা গেছে নারীর জ্যোতির্ময়ী অস্তিত্বের উপাসনার গান:

তবু তোমায় জেনেছিনারিইতিহাসের শেষে এসেমানবপ্রতিভায়

রূঢ়তা ও নিষ্ফলতার অধম অন্ধকারে মা

নবকে নয়নারিশুধু তোমাকে ভালোবেসে

বুঝেছি নিখিল বিষ কীরকম মধুর হতে পারে     (তোমাকে)

শেষপর্যন্ত নারীর প্রতি অপরিমেয় দাবিতে প্রত্যয়দীপ্ত কণ্ঠে কবি বলেন:

মহাবিশ্ব একদিন তমিস্রার মতো হয়ে গেলে

মুখে যা বলনিনারিমনে যা ভেবেছ তার প্রতি

লক্ষ্য রেখে অন্ধকার শক্তি অগ্নি সুবর্ণের মতো

দেহ হবে মন হবে— তুমি হবে সে-সবের জ্যোতি    (মাঘসংক্রান্তির রাতে)

এইভাবেই চেতনার ক্রমোত্তরণে জীবনানন্দের প্রেমভাবনায় নারী হয়ে উঠেছে ইতিহাস-মথিত নিসর্গ পৃথিবীর সঙ্গে অন্বিত সুচেতনার আধার, ‘সূর্যকরোজ্জ্বল মানুষের প্রেমচেতনার ভূমি’।

                                                                                                     [২]

তাহলে জীবনানন্দের প্রেমভাবনায় নারী কি কেবলই ভাবসর্বস্ব এক উপলব্ধ সত্য, কেবলই কি ‘আইডিয়া’? তাদের কি আদৌ কোনো বাস্তব ভিত্তি নেই? তাহলে অরুণিমা সান্যাল, মৃণালিনী ঘোষাল, বনলতা সেন, শেফালিকা বোস, অমিতা সেন প্রভৃতি নারী কারা? সুচেতনা, সুরঞ্জনা, সবিতা, শ্যামলীদের ভাবগম্ভীর অভিব্যঞ্জনাটি না-হয় বোঝা গেল, বোঝা গেল শঙ্খমালাদেরও, যারা রূপকথা-রাজ্যের অধিবাসিনী। এই সপ্রশ্ন কৌতূহলই আমাদের পৌঁছে দেয় জীবনানন্দের প্রেমচেতনার মর্মমূলে। আর এ-প্রসঙ্গে কবিতা ব্যতীত জীবনানন্দের অন্য রচনাগুলিও পুনর্পাঠ-আগ্রহ জাগায়। তাঁর ডায়েরি, দিনলিপিতে আমরা কিন্তু বারেবারেই শুনেছি বাস্তব রক্ত-মাংসের নারীর জন্য কবির অসহায় আর্তস্বর। এবং সেগুলি যেন নারীপ্রেমে ব্যর্থতারই করুণ আলেখ্য। এমনকী তাঁর বেশ কিছু গল্প-উপন্যাসের নায়ক-নায়িকার স্থানে কবিকে এবং তাঁর ডায়েরি বা দিনলিপির পাতায় ফুটে-ওঠা সাংকেতিক নারীদের বসিয়ে দেখলেও বোঝা যায় যে, বিবাহ বা বিবাহ-বহির্ভূত জীবনে একাধিক নারীপ্রেমে ব্যর্থতা কবিকে কতখানি শারীরিক ও মানসিকভাবে ব্যস্ত করে তুলেছিল। ফলত ব্যক্তি-উপলব্ধির ঘনসারেই কবি তাঁর কাব্যে বহু-ক্ষেত্রেই নারীকে উপস্থাপন করেছেন অন্তঃসারশূন্য, আত্মকেন্দ্ৰিক ও হৃদয়হীন দৈন্যের প্রতিমূর্তিতে। তাদের সাথে যেন কবির সংবেদী হার্দ্যতা তো দূরের কথা, কোনো ক্ষণলগ্নতাও থাকতে পারে না। সত্যিই বিস্ময় জাগায় এই কবিই নাকি উচ্চারণ করেছেন:

মনে পড়ে কবে এক তারাভরা রাতের বাতাসে

ধর্মাশোকের ছেলে মহেন্দ্রের সাথে

উতরোল বড়ো সাগরের পথে অন্তিম আকাঙ্ক্ষা নিয়ে প্রাণে

তবু কাউকে আমি পারিনি বোঝাতে

সেই ইচ্ছা সংঘ নয়শক্তি নয়কর্মীদের সুধীদের বিবর্ণতা নয়,

আরো আলো: মানুষের তরে এক মানুষীর গভীর হৃদয়     (সুরঞ্জনা)

আর এই মানুষীর জন্যই নাকি কবির নক্ষত্রস্বভাবী প্রেম অসীম অপার সময়ের স্রোতের তীরে অপেক্ষাতুর।

অথচ, বাস্তবের পটে সেই নারীকে নিয়েই চলে তাঁর ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ, শ্লেষ-অনাস্থাজ্ঞাপন; অনেকসময় তা আরও খানিকটা দাঁত-নখ বের করে ঘৃণা-আক্রোশকেই উচ্চকিত করে তোলে। সরাসরি নারী বা প্রেমিকা সম্বন্ধে কবির বিরূপ মনোভাবের ছবি তাঁর নানা লেখায় চিত্রিত হয়েছে। কবির বিখ্যাত ‘ক্যাম্পে’ কবিতাটি পাঠ করলেই বোঝা যায় কবি বলতে চেয়েছেন যে, নারীই পুরুষের ঘাতক; কেননা হরিণেরা ঘাই-হরিণীর ডাক শুনে ছুটে আসে সুন্দরী গাছের নীচে, সংগমের পিপাসার্ত সান্ত্বনায়— আঘ্রাণে-আস্বাদে, আর তখনই বন্দুকের উদ্যত স্বভাবে বাসনাদীপ্ত মৃগ পরিণত হয় মৃত শবে। কবি অনুভব করেন, ‘মৃত পশুদের মতো আমাদের মাংস লয়ে আমরাও পড়ে থাকি’। অর্থাৎ ঘাই-হরিণীর ডাক গূঢ়-চক্রান্তেরই সূচক; সুতরাং নারীই আসক্তি, নারীই নিশ্চল আত্মবৃত্ততা, বোধ-সংবেদহীন জড়তা। তাই পুরুষের রক্তাক্ত হৃদয় এবং মৃত আকাঙ্ক্ষার শবের পাশ দিয়ে নারী (মৃগী) সকালের আলোয় কত নিরাবেগ নির্বচন হেঁটে যেতে পারে। তাদের হৃদয়ে প্রেম, প্রীতি, করুণার আলোড়ন পর্যন্ত জাগে না:

কাল মৃগী আসিবে ফিরিয়া

সকালে— আলোয় তারে দেখা যাবে—

পাশে তার মৃত সব প্রেমিকেরা পড়ে আছে।

এইসব মৃগী-নারী ক্ষমতার হাতে ‘ব্যবহৃত হতে হতে, ব্যবহৃত হতে হতে শুয়োরের মাংসে’ পরিণত হয়ে যায়; ‘মানুষ শিখায়ে দিয়েছে তাকে এইসব’— বাক্যবন্ধটি নারীর ব্যবহৃত হতে-চাওয়া আত্মসুখের বাসনাকেই যেন চরিতার্থ করে। তাদের চেতনাজগৎও হয়ে যায় শৌখিন আসবাব। ‘নগ্ন নির্জন হাত’ কবিতায় কবি বলেন:

মূল্যবান আসবাবে ভরা এক প্রাসাদ:

পারস্য গালিচা, কাশ্মীরি শাল, বেরিন তরঙ্গের নিটোল মুক্তা প্রবাল,

আমার বিলুপ্ত হৃদয়, আমার মৃত চোখ, আমার বিলীন স্বপ্ন আকাঙ্ক্ষা,

আর তুমি নারী—

‘বিলুপ্ত হৃদয়’, ‘মৃত চোখ’ আর ‘বিলীন স্বপ্নের’ সাথে ‘মূল্যবান আসবাবে ভরা’ ‘প্রাসাদে’ নারীর অবস্থান স্থূল সমান্তরালতার কূটাভাসকেই দ্যোতিত করে ।

বস্তুত, প্রাথমিক পর্বে জীবনানন্দের নারী সম্পর্কিত প্রেমভাবনায় ছিল এক গভীর নশ্বরতার বোধ। এই বোধই তাঁকে কামগন্ধহীন প্রেমের প্রতি আকর্ষিত করেনি। কিন্তু কামনার শীর্ষে পৌঁছে দেহজ লৌকিক প্রেমই বাসনাসংরাগে মথিত মৃত্যু-আহত সৌন্দর্যানুভূতির বিষণ্ণ আবহ রচনা করতে চেয়েছে। ধূসর, ম্লান, হিমার্ত প্রকৃতির ক্ষয়-বিলয়ের পটভূমিতে আবির্ভূত সেই প্রেম তাই বহন করে এনেছে ‘বঞ্চনা, হতাশা, ক্ষোভ, যন্ত্রণার বিষ’। আর নারীই হয়েছে কবির যন্ত্রণাহত হৃদয়ের একমাত্র হেতু। আসলে জীবনানন্দ ভীষণভাবেই নারীর দেহজ উষ্ণতা আকাঙ্ক্ষা করেন, কিন্তু যখনই তিনি তাঁর নারীর সঙ্গে জৈবদেহবদ্ধ বাসনায় লিপ্ত হন, তখনই দেহসম্ভোগের ক্ষণিক উল্লাস থেকে তিনি প্রেমের আনন্দকে উত্তরিত করে দিতে চান চিরকালীন সম্পদে। ব্যক্তি-পরিসর থেকে বিশ্ব-পরিসরে। আপাত-সময় থেকে মহাসময়ের মধ্যে। কিন্তু এখানে নারীর স্বভাবজ ধর্মের মধ্যে তিনি এক ধরনের স্থূলতাই আবিষ্কার করেন। আর তখনই নারীর থেকে তৈরি হয় এক মানসিক বিবিক্তি— ‘দেহ ঝরে— তার আগে আমাদের ঝরে যায় মন’। তাঁর ‘মন’-ই তাঁকে দেহ-অতিরিক্ত এক সংবেদের শিক্ষা দিতে চেয়েছে। ফলে প্রত্যাশিত নারী হয়েছে অপ্রাপণীয়া। তার জন্য সবেগ আর্তি আর বাস্তব নারী থেকে বঞ্চিত হওয়ার সংক্ষোভ তাই কবিকে করেছে অস্থিরচিত্ত, নারীর প্রতি বিশ্রদ্ধ। এখান থেকেই কবির প্রেম ও নারী সম্পর্কিত ভাবনা এক স্বতন্ত্র পথ তৈরি করে নিতে চেয়েছে। বিষয়টি মেধাবী সমালোচক আলোক সরকার-কৃত জীবনানন্দের প্রেমকাব্য মূল্যায়িত বাক্যবন্ধে যথেষ্ট পরিচ্ছন্নতায় ধরা পড়েছে:

… প্রেমের ভিতরে যে অপরিমাণ দীপ্তি থাকে তা বাস্তব যৌথ জীবনে অলভ্যতারো বেশি অলভ্য হওয়াটাই নিয়তিতাকে অতিক্রমণের প্রচেষ্টা বার বার ব্যর্থ হবেইআর ব্যর্থ হওয়াটাই শুভ। যৌথ জীবনপ্রয়াসসব ভেঙে শেষপর্যন্ত ক্লেদগ্লানিযুক্ত একক জীবনকেই পছন্দ করবেএই বিচ্ছিন্নতাএই অসংযোগএই সূর্যের রশ্মির মতো বিকীর্ণতাএই নদী স্বভাবতা পুরুষকে যে অবলম্বন করেছে তা ব্যক্তিজীবনেরই আস্বাদনের জন্য অবলম্বন অর্থাৎ সেখানে কোনো হার্দ্য চুক্তি নেই। এই মিলনএই আসক্তিব্যক্তিজীবনকে উপভোগের এই মিলনপ্রয়াসকখনো শুভ নয়কাম্যও নয়

এইপর্বে কবি এমন অভিজ্ঞতা লাভ করেছিলেন বলেই নারীর হৃদয়জাত কোনো প্রাপ্তির বাণী তিনি উচ্চারণ করতে পারেননি। তবু বলব, এই অতৃপ্তি বা অপ্রাপ্তিই কবিকে নিয়ে যেতে চায় প্রেমপূর্ণ হৃদয়ের এক মহৎ স্বপ্ন-প্রান্তরে। যেখানে নারী ও পেয়ে যাবে প্রতীকী ব্যঞ্জনার নবীন বিস্তার। তখন নারীই অপ্রাপ্তির পাথরবুকে বয়ে আনবে মহৎ প্রাপ্তির নির্ঝরিণী। তাপিত-শুষ্ক হৃদয় স্নিগ্ধ শুশ্রূষার জলে হবে সঞ্জীবিত। এরপর থেকেই কবির প্রেমচেতনা এক ভাবাদর্শমণ্ডিত ইতিহাসমথিত ‘প্রকৃতির শোভাভূমিতে’ এসে উপনীত হয়। তবু এরই মধ্যে ক্বচিৎ শোনা যায় সহজ মানবিক উচ্চারণ, যেমন— ‘আকাশলীনা’ বা ‘লোকেন বোসের জার্নাল’-এর মতো কবিতাগুলি। যেখানে চরম আইডিয়া-সর্বস্ব প্রেমদৃষ্টির মধ্যেও কবি-মানুষটি কখনও কখনও সম্পূর্ণ বাস্তব প্রেমের অপরিতৃপ্তিতে ছিঁড়ে যান ফেঁড়ে যান, যেখানে লৌকিক প্রেমকে হারিয়ে অধিকতর মানসিক দুর্বলতায় ঈর্ষার বশ হন, আর হৃদয়ে অনুভব করেন ‘গভীর গভীরতর অসুখ’। তাই প্রৌঢ় কবির প্রেমিকা যখন যুবকের সাথে চলে যায়, তখন আর্ত অথচ উত্তপ্ত আহ্বানে কবি তাকে নিবৃত্ত করতে চান:

ফিরে এসো হৃদয়ে আমার;

দূর থেকে দূরে— আরো দূরে

যুবকের সাথে তুমি যেয়ো নাকো আর   (আকাশলীনা)

অথবা ‘লোকেন বোসের জার্নাল’ কবিতায় প্রৌঢ় কবির স্মৃতিচেতনায় হঠাৎই ধরা পড়ে পূর্বজীবনের প্রেমের তরুণ ব্যর্থতার চিত্র। ‘সুজাতা’ বা ‘অমিতা সেন’-রা তখন কবির প্রৌঢ় অভিজ্ঞতায় প্রতিভাত হয় ‘মৃগতৃষ্ণার মতো’ কিংবা ‘মরীচিকা’-স্বভাবী । তাই তরুণ বয়সের প্রেম ‘ইলেকট্রনের নিজ দোষ গুণে বলয়িত হয়ে’ আজ রচনা করে ‘বালির সৎ নীরবতা ধূ ধূ’।

যাই হোক, নারীপ্রেমের বাস্তব অতৃপ্তিই কবিকে উত্তরিত করে দেয় প্রেমচেতনার লোকোত্তর জগতে। এই উত্তরণ-পর্বে কবির প্রেমচেতনায় নারী আসে বিচিত্র মূল্যবোধের আধারিকরূপে। এখানে নারী যেন প্রকৃতির প্রশান্ত স্নিগ্ধতার সম্ভার নিয়ে অন্বেষা-ক্লান্ত মানবের জন্য চির-অপেক্ষমানা। সমালোচক প্রদ্যুম্ন মিত্রের ভাষায় :

প্রেম ‘বনলতা সেন‘ গ্রন্থে ও পরবর্তী পর্যায়ের বহু কবিতাতেই মৃত্যুর বৈনাশিক বিষাদকে অতিক্রম করে এক মরণজয়িতার শক্তিতে আবির্ভূত। আবহমান মানবচেতনার এক মৌল অপরাহতবোধের স্বরূপেই যেন তার প্রকাশ। প্রেমের মরণজয়িতার বোধ পরিপুষ্ট হয়েছে কবির ইতিহাসচেতনায়— জীবনানন্দের একালের কাব্যেই যার একটি সুনির্দিষ্ট ও মননঋদ্ধ বিগ্রহ পাওয়া যায়। প্রকৃতি সংযুক্তি করেছেন মানবচিত্ত গহনবাসী এই মৃত্যুত্তীর্ণ প্রেমবোধে তাঁর প্রশান্তির সম্পদ। এইভাবেই জীবনানন্দের মধ্যপর্যায়ের কাব্যে ‘প্রেম’ হয়ে উঠেছে প্ৰেয় অন্বিষ্টের এক গরিয়সী প্রতিমাযাকে আমরা আবিষ্কার করি দীর্ঘক্লান্ত সহস্রবর্ষব্যাপী অন্বেষার পরে ‘সবুজ ঘাসের দেশে’ বনলতা সেনের ইতিহাসমণ্ডিত অবয়বেতার ‘পাখির নীড়ের মত চোখের প্রত্যাশিত প্রশান্তির আশ্রয়ে 

এইপর্বেই কবি আবিষ্কার করেন ব্যক্তিগত প্রেমের মূল্য বঞ্চনাময় পরিণতি লাভ করলেও ব্যষ্টিপ্রেমে সেই ব্যক্তি-অবসন্নতা থাকে না। তিনি অনুভব করেন বিঘ্নলঙ্ঘী মৃত্যুত্তীর্ণ প্রেমের গম্ভীর রূপ অনন্ত কালপ্রবাহের মধ্যেই নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করে দিতে চায়। তাই ‘আয়ুহীন স্তব্ধতা ও বিস্ময়ের’ দ্যোতনা নিয়ে অন্তবিহীন পথ পার হয়ে চলে তাঁর শাশ্বত প্রেমের অভিযাত্রা। একটিই ভাবচেতনা তখন হয়ে ওঠে কবির মানসপথের মরমি সহচর— ‘মানুষের তরে এক মানুষীর গভীর হৃদয়’। লক্ষ করার বিষয়, ‘মেয়েমানুষ’ এই পর্বে এসে ‘মানুষী’ হয়ে উঠল। কবির প্রেমও মুক্তি লাভ করল প্রারম্ভিক শারীরিকতার নিয়তিতাড়িত কবন্ধ বাহুপাশ থেকে। কবির একান্ত মনোসৃষ্ট শব্দকল্প ‘মানুষী’ হয়ে উঠল এক কল্প-আশ্রয়ও, যে-নারী কবি-চৈতন্যের লাবণ্যসাগর মথিত করে স্বয়ং উঠে এসে কবিচিত্তকে জাগিয়ে তুলেছিল ‘অনাদির সূর্য নীলিমায়’:

আমি সেই মহাতরু— লাবণ্য সাগর থেকে নিজে

উঠে তুমি জাগিয়েছো অনাদির সূর্য নীলিমায়—

এই নারীকে বাস্তবের মাটিতে অন্বেষণ বৃথা। এই নারী কবির মানস-নির্ভরতার চরমতম অবলম্বন। ফলে এইপর্বে নারীরা জীবন্ত ও স্বতন্ত্র ব্যক্তিত্বসম্পন্না হয়ে ওঠেনি। জীবনানন্দ প্রথমাবধি প্রেমকে ‘প্রকৃতির শোভা ভূমিকায়’ দেখতে ও দেখাতে চেয়েছেন। এখানে এসে সেই প্রেমই পেল গভীরতা এবং সেই ইন্দ্রিয়সংবেদনার সঙ্গে যুক্ত হল মননের দীপ্তি। এমন মননোদ্ভাসিত প্রকৃতিচেতনার আলোকে প্রেম বা নারী পেয়ে গেল সীমা-অতিক্রমী মহিমা। তারই ফলে স্থান-কালচিহ্নিত বা বিশেষ নাম-শোভিত বনলতা, অরুণিমা, মৃণালিনী, শেফালিকা কিংবা সুদর্শনা, সুচেতনা, শ্যামলী, সবিতা প্রভৃতি নারী মুহূর্তেই বাস্তবের নির্মোক ছেড়ে ‘আইডিয়া’-র প্রতীক হয়ে উঠল। তারা প্রত্যেকেই যেন ‘পৃথিবীর বয়সিনী কোন এক মেয়ের মতন’। নামগুলির শব্দগত বা আভিধানিক অর্থও সেই ইঙ্গিতই দেয়, বনলতা যেমন নৈসর্গিক সৌন্দর্যের রূপক, শ্যামলী বাংলা দেশের প্রতিরূপ, সুরঞ্জনা-সুচেতনা-সুদর্শনা-সবিতা প্রভৃতি তেমনি বিভিন্ন ভাব বা বৃত্তির রূপক, কোনো নৈতিক শুভ চেতনার প্রতিমূর্তিমাত্র ৷

তাই কবির প্রাথমিক পর্বের প্রেম ও নারীর প্রতি বিশ্রদ্ধ ভাব চরম সংঘাতমুখরতা লাভ করেনি, এমনকী শরীরী সংরক্তিম আবহ রচনা করেও শরীরী স্থূলতা মুক্ত হয়েছে (এর পশ্চাতে অবশ্য আছে কবির অধীত বিদ্যা ও বোধের রোমান্টিক প্ররোচনা)। কবির ‘জীবন উপলব্ধির সারাৎসার এবং অস্তিত্ববোধের বহুবাচনিকতা এইসব প্রতীকায়িত নারীসত্তাকে উপলক্ষ করে কবিতার নিজস্ব বাচনে নানাভাবে প্রকাশ পেয়েছে’। এখন আর বুঝতে অসুবিধা হয় না যে, কবি তাঁর অমেয় প্রেমকে অস্তিত্বের বিচিত্র দর্পণেই বিম্বিত করে দেখতে চেয়েছেন।

যদিও জীবনানন্দের অণুবিশ্বে প্রেম বা নারী এই প্রতীকতার বিন্দুতে এসেই থেমে থাকেনি। কারণ বিদ্যা বা বোধের জ্ঞানতাত্ত্বিক সন্ধানে নদীর জলের মতো স্বচ্ছ প্রত্যাশার মোহনায় পৌঁছোনো যায় না। তাই কবির বহুস্বরিক ও বহুরৈখিক প্রেমবয়ানেরও সঞ্চরণশীলতা অব্যাহত থাকে। মানুষীর গভীর হৃদয়ে মানুষের জন্য যে-প্রেম, তারই দিকে শেষহীন, নির্নিমেষ অন্বেষণ চলতে থাকে। এই প্রেম, প্রেমের অমৃত শুশ্রূষা প্রাপ্তির জন্যই যেন কবির চির-অপেক্ষা :

একটি আলোক নিয়ে বসে থাকা চিরদিন;

নদীর জলের মতো স্বচ্ছ এক প্রত্যাশাকে নিয়ে

‘পৃথিবীর গভীর গভীরতর অসুখ’ বুকে নিয়ে বা সময়ের ‘অপব্যয়ী অক্লান্ত আগুনে’ ঝলসে যেতে-যেতেও ক্লান্ত ক্লান্তিহীন নাবিক-কবি এমন প্রত্যাশাময় প্রেমেরই স্নিগ্ধ শুশ্রূষার জল কামনা করেন। তাঁর প্রেম যেন পূর্ণতা পায় শুভ ও সুন্দরের সুচেতনার উপলব্ধিতে। এই উপলব্ধিই কবির শাশ্বত প্রেমবোধের উদ্দীপ্তি বা প্রেরণার ভাষ্য হয়ে ওঠে। আবারও লক্ষ করতে হয়, কবির প্রেমিকা-নারী আর ‘মেয়েমানুষ’ কিংবা ‘মানুষী’ হয়ে থাকে না, সে হয়ে ওঠে ‘মহিলা’। এই ‘মহিলা’ যিনি মননলোক স্পর্শ করেন, যিনি গ্লানি-অবলীন সাম্প্রতের ভূখণ্ডে দাঁড়িয়েও মানুষের মানব-অস্তিত্বে এক দীপ্তি রচনা করেন। সমালোচক তাই যথার্থই বলেন, অন্ধ যুগতমসা ও বীতবিশ্বাস উদ্ভ্রান্তি থেকে মানবের অন্তর্লোকের প্রেমবোধই যে মুক্তির পথ দেখাতে পারে একথা বারংবার উচ্চারিত হয়েছে জীবনানন্দের শেষপর্যায়ের কাব্যরচনায়।” আর এই ‘প্রেমবোধ’ তো আকাশিসত্তার মতো মহিলা-নারীকে আশ্রয় করেই নাক্ষত্রিক স্বভাবে দ্যুতিময় হয়ে উঠতে চেয়েছে। ফলত এই পর্বে জীবনানন্দ নারীকে দেখলেন সময়ের জ্বলন্ত তিমিরের মধ্যে প্রেম-প্রতিমার আলোক-আভায়:

চোখ না এড়ায়ে তবু অকস্মাৎ কখনও ভোরের জনান্তিকে

চোখে থেকে যায়

আরো এক আভা:

আমাদের এই পৃথিবীর এই ধৃষ্ট শতাব্দীর

হৃদয়ের নয়— তবু হৃদয়ের নিজের জিনিস

হয়ে তুমি রয়ে গেছ   (জনান্তিকে)

কিংবা-

জ্বলন্ত তিমিরের ভিতর তোমাকে পেয়েছি।

শুনেছি বিরাট শ্বেতপক্ষীসূর্যের

ডানার উড্ডীন কলরোল;

আগুনের মহান পরিধি গান করে উঠছে    (সময়ের তীরে)

এই সেই চিরদীপ্তিময়ী নারী, যাকে ঘিরে থাকে ‘অপার আলোকবর্ষ’, ‘তিমিরপিপাসী’ অগ্নি-পরিধির মধ্যে যার দৈবী আবির্ভাব কবির মনে জাগায় ‘অমৃত সূর্যের আহ্বান’। অথচ কবির অভিজ্ঞতা এ-কালের ‘জানিবার গাঢ় বেদনার অবিরাম অবিরাম ভার’-বাহী বিপন্ন বিস্ময়াবহ এক ক্লান্ত পথিকেরও। তাঁর অনুভূতিলোকে এ-জ্ঞানও মুছে যাবার নয় যে, ‘মানুষকে স্থির-স্থিরতর হতে দেবে না সময়’। তাই ঘুম ও জাগরণের অন্তহীন দ্বিরালাপেই কবি বিধৃত-জীবন থেকে খুঁজে নিতে চেয়েছেন চিরন্তনী নারীকে; গভীর প্রত্যয়ী কণ্ঠে বলতে চেয়েছেন: 

সকল সময় স্থান অনুভবলোক অধিকার করে সে তো থাকবে

এইখানেই,

আজ আমাদের এই কঠিন পৃথিবীতে       (সময়ের তীরে)

এভাবেই জীবনানন্দের শিল্প-মীমাংসায় নারী জ্ঞানতাত্ত্বিক সীমা অতিক্রম করে অস্তিত্ববাচনিক বোধির বহুস্তর জগতে পৌঁছে গেছে। অস্তিত্ববাচনিকতায় বলতে গেলে বলতে হয়, নারী এখান থেকেই হয়ে ওঠে প্রেরণাদাত্রী, কল্যাণব্রতী পুরুষের মর্মসঙ্গিনী। তাই চূড়ান্ত বিপর্যয়ের মধ্যেও নারী-পুরুষের প্রেমই কবির দৃষ্টিতে ভবিষ্যৎ পৃথিবীর একমাত্র ভরসাকেন্দ্ররূপে স্বীকৃতি পায়। এ-সময়কার কাব্যভাষ্যে চিত্রকল্প ও প্রতীকের বিষয়গুলিও এই ভাবদর্শনের সংগতিসাধক হয়ে উঠেছে; যেমন— নদী ও নীলিমা, সূর্য, বৃক্ষ, পাখি— যা জল, আলো, নিসর্গ-শ্যামলিমারই উজ্জ্বল প্রেক্ষাপট ।

এই অতিপরিচিত চিত্রকল্পগুলি কিন্তু নবীন সম্বন্ধের অর্থদ্যোতনায় কবির সুচেতনার উদ্বর্তনটিকেই পরিস্ফুটিত করে দেয়। যে-সুচেতনায় আলো-পৃথিবীর শুভ সংকল্পায়নই অভিব্যক্ত। সুতরাং এ-কথা মেনে নিতে হয় যে, কবির নারীকল্প এমন এক ভাবের আধেয়, যা নানা রূপে নানা ভঙ্গিতে মহাসময় থেকে খণ্ডসময়ে, আবার খণ্ডসময় থেকে মহাসময়ে চক্ৰমণ করে চলে। ফলত অজস্র সংকেতে সময় ও পরিসরের গ্রন্থনা যেভাবে গড়ে উঠেছে, তাতে রক্ত-মাংসের বাস্তব নারীকে খুঁজতে যাওয়া যেমন বৃথা, তেমনি তার প্রকৃতি-নির্ণায়ক নির্দিষ্ট ভাষ্যনির্মাণ করতে যাওয়াও মূঢ়তারই নামান্তর । তবু বলব, জীবনানন্দের কবিতায় নারী পেয়েছে নদীর স্বভাব (‘এখনো নদীর মানে নারী’); কেননা নদী যেমন উৎসের বন্ধুরতাকে অতিক্রম করে সমতটে ব্যাপ্তি পেলেও দুর্বার আকাঙ্ক্ষায় ধাবিত হয় মহাসমুদ্রের অভিমুখে কিংবা আপন গতির প্রবাহ থেকে বিচ্যুত না হয়েও জীবনের কল্যাণে আত্মনিয়োজিত থাকে— ঠিক তেমনি জীবনানন্দের নারী বাস্তব শরীরী নশ্বরতা বা স্থূল বন্ধুরতা কাটিয়ে প্রতীকী ব্যাপ্তি পেলেও শেষপর্যন্ত মহিয়সী আত্মোৎসর্জনের বাসনায় পৌঁছে গেছে কল্যাণশ্রী বোধির অমেয় পরিসরে। নারীর এই সহজ স্বকীয় প্রাণচ্ছন্দ মহৎ উদ্দেশ্যে যুগান্তরব্যাপী অব্যাহত থেকে যাবে বলেই কবি বিশ্বাস করেন; তাই এমন স্থিত প্রজ্ঞায় উপনীত কবি নারীর আবহমানতার প্রতি অন্তর্দৃষ্টি নিক্ষেপে বলেন:

তোমার পায়ের শব্দ গেল কবে থামি

আমার এ নক্ষত্রের তলে

জানি তবু –

নদীর জলের মত পা তোমার চলে;-

### লেখাটি ‘নারীর পৃথিবী ও বাংলা কবিতা’, শেখ কামাল উদ্দীন সম্পাদিত (গ্রন্থবিকাশ, প্রকাশ- ২০১৩) গ্রন্থে প্রকাশিত।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!
Scroll to Top