বিজ্ঞান আশীর্বাদ না অভিশাপ

সূচনা

আধুনিক সভ্যতার আকাশে বিজ্ঞান এক উজ্জ্বল নক্ষত্রের মতো দীপ্তিমান। মানুষের জীবনকে সহজ, গতিশীল এবং সমৃদ্ধ করে তোলার পেছনে বিজ্ঞানের অবদান অনস্বীকার্য। গুহাবাসী মানুষের সীমাবদ্ধ জীবন থেকে মহাকাশযুগের বিস্ময়কর অগ্রগতি পর্যন্ত প্রতিটি স্তরে বিজ্ঞানের জয়ধ্বনি প্রতিধ্বনিত হয়েছে। বিদ্যুৎ, যোগাযোগব্যবস্থা, চিকিৎসাবিজ্ঞান, কম্পিউটার কিংবা মহাকাশ গবেষণা—মানবজীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রেই বিজ্ঞানের প্রভাব সুস্পষ্ট। তবু মানবমনে দীর্ঘদিন ধরে এক প্রশ্ন ঘুরে বেড়াচ্ছে—বিজ্ঞান কি আশীর্বাদ, নাকি অভিশাপ?

(আলবার্ট আইনস্টাইন) বলেছিলেন, “It has become appallingly obvious that our technology has exceeded our humanity.” অর্থাৎ, “প্রযুক্তির অগ্রগতি অনেক ক্ষেত্রে মানবিকতার সীমাকে অতিক্রম করছে।” সেই উক্তির মধ্যেই বিজ্ঞানের দ্বৈত চরিত্রের ইঙ্গিত নিহিত রয়েছে।

বিজ্ঞানের আশীর্বাদস্বরূপ অবদান

মানবসভ্যতার অগ্রগতিতে বিজ্ঞানের ভূমিকা অপরিসীম। মানুষের নিত্যদিনের জীবন বিজ্ঞানের স্পর্শে সুশোভিত ও গতিশীল হয়ে উঠেছে। বিদ্যুতের আবিষ্কার অন্ধকার দূর করেছে, যোগাযোগ প্রযুক্তি পৃথিবীকে ক্ষুদ্র করে তুলেছে, পরিবহন ব্যবস্থার উন্নতি মানুষের গতি বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।

চিকিৎসাক্ষেত্রে বিজ্ঞানের অবদান বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। একসময় দুরারোগ্য বলে বিবেচিত বহু ব্যাধির চিকিৎসা আজ সম্ভব হয়েছে। অঙ্গপ্রত্যঙ্গ প্রতিস্থাপন, লেজার প্রযুক্তি, উন্নত অস্ত্রোপচার এবং জিন গবেষণা চিকিৎসাজগতে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে।

কৃষিক্ষেত্রেও বিজ্ঞান এনেছে বৈপ্লবিক পরিবর্তন। উন্নত বীজ, আধুনিক সেচব্যবস্থা এবং যান্ত্রিক কৃষিপদ্ধতি খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি করেছে। শিক্ষা, শিল্প, যোগাযোগ এবং মহাকাশ গবেষণার মতো ক্ষেত্রেও বিজ্ঞানের অবদান বিস্ময়কর।

বিজ্ঞানের অভিশাপস্বরূপ দিক

মানবকল্যাণের পাশাপাশি বিজ্ঞানের অপব্যবহার বহু সমস্যার জন্ম দিয়েছে। পারমাণবিক অস্ত্র, রাসায়নিক বোমা এবং যুদ্ধপ্রযুক্তির বিকাশ মানবসভ্যতার জন্য গভীর হুমকি সৃষ্টি করেছে। প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ মানুষের সামনে বিজ্ঞানের ধ্বংসাত্মক শক্তির ভয়াবহ রূপ তুলে ধরেছিল। হিরোশিমা ও নাগাসাকির ধ্বংসযজ্ঞ ইতিহাসের এক মর্মান্তিক অধ্যায়।

অতিরিক্ত প্রযুক্তিনির্ভরতা মানুষের জীবনকে অনেক ক্ষেত্রে যান্ত্রিক করে তুলছে। পরিবেশ দূষণ, বনভূমি ধ্বংস, বৈশ্বিক উষ্ণায়ন এবং মানসিক বিচ্ছিন্নতা আধুনিক যুগের গুরুত্বপূর্ণ সংকট হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।

(আইজ্যাক আসিমভ) বলেছিলেন, “Science gathers knowledge faster than society gathers wisdom.” অর্থাৎ, “বিজ্ঞান জ্ঞান অর্জন করছে দ্রুত, কিন্তু সমাজ প্রজ্ঞা অর্জন করছে ধীরগতিতে।”

উপসংহার

বিজ্ঞান নিজে কল্যাণকর বা অকল্যাণকর নয়; তার ব্যবহারই প্রকৃত ফল নির্ধারণ করে। আগুন যেমন মানুষের খাদ্য প্রস্তুত করতে পারে, তেমনি অসতর্ক ব্যবহারে ধ্বংসও ডেকে আনতে পারে। বিজ্ঞানও একই সত্যের অনুসারী। মানবকল্যাণ, শান্তি এবং উন্নয়নের উদ্দেশ্যে বিজ্ঞানকে পরিচালিত করতে পারলে ভবিষ্যৎ পৃথিবী আরও সুন্দর, সমৃদ্ধ এবং মানবিক হয়ে উঠবে।

### ড. অনিশ রায়
 
 

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!
Scroll to Top