প্রাচীন ও মধ্যযুগের সাহিত্যধারা
১. চর্যাপদ
আবিষ্কার: ১৯০৭ খ্রিঃ, বাংলা ১৩১৪ সন। নেপালের রাজদরবার থেকে আরও কতকগুলি সমধর্মী পুথির সঙ্গে মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্ৰী আবিষ্কার করেন।
প্রকাশকাল: ১৯১৬ খ্রিঃ, বাংলা ১৩২৩ সন।
বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ থেকে “হাজার বছরের পুরাণ বাংলা ভাষায় বৌদ্ধগান ও দোহা”–এই নামে হরপ্রসাদ শাস্ত্রী মহাশয় প্রকাশ করেন।
এই “হাজার বছরের পুরাণ বাংলা ভাষায় বৌদ্ধগান ও দোহা”র অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল—চর্যাচর্যবিনিশ্চয়, সরহ ও কৃষ্ণাচার্যের দোহা এবং ডাকার্নব। পরে প্রমাণিত হয়েছিল কেবলমাত্র চর্যাচর্যবিনিশ্চয়-ই প্রাচীনতম বাংলা ভাষায় লেখা।
কাব্য ও কবির নাম:
কাব্য : চর্যাচর্যবিনিশ্চয়, চর্যাগীতিকোষ, সংক্ষেপে চর্যাপদ।
কবি : প্রধান পদকর্তাদের মধ্যে ২৪ জনের নাম পাওয়া যায়।
- সিদ্ধাচার্যরা হলেন: লুইপাদ, ভুসুকুপাদ, কাহ্নপাদ,, সরহপাদ, শান্তিপাদ, শবরপাদ
- আদি সিদ্ধাচার্য : লুইপাদ।
- টীকাকার : মুনি দত্ত। (নির্মলগীরা)
- পদসংখ্যা : উদ্ধারীকৃত ৪৬২ টি। পুরোপদ ছিল ৫০টি।
রচনাকাল : দশম-দ্বাদশ শতাব্দী।
বিষয়বস্তু: চর্যাপদে বজ্রযান ও সহজযানের গূঢ়ধর্ম সাধন প্রণালী ও দর্শনতত্ত্ব নানা ধরণের রূপক-প্রতীকও চিত্রকল্পের দ্বারা আভাস ইঙ্গিতে ব্যঞ্জিত হয়েছে।
ভৌগোলিক সীমা : উত্তর বিহার, কলিঙ্গ, কামরূপ ও বাংলা।
নামকরণ: চর্যাপদের যথার্থ কি নাম ছিল তা নিয়ে কিছু মতদ্বৈত আছে। পণ্ডিত বিধুশেখর শাস্ত্রী এবং প্রবোধচন্দ্ৰ বাগচী একে ‘চর্যাচর্যবিনিশ্চয়’ বলে গ্রহণ করতে চাননি। ইদানীং এই সংকলন ‘চর্যাচর্যবিনিশ্চয়’ (সংক্ষেপে ‘চর্যাপদ’) নামে অভিহিত হয়েছে বলে আমরা একে শাস্ত্রী মহাশয় পরিকল্পিত ‘চর্যাচর্যবিনিশ্চয়’ নামেই উল্লেখ করব। যদিও এর প্রকৃত নাম ‘চর্যাগীতিকোষ’।
বৈশিষ্ট্য:
[i] বৌদ্ধ সহজিয়া ধর্ম সাধনার গূঢ় ও গোপন সাধন ইঙ্গিতে পূর্ণ এই গ্রন্থ।
[ii] আপাত দুর্বোধ্য এই গ্রন্থে লুকিয়ে আছে ধর্মীয় আচরণ-বিধির নির্দেশ।
[iii] সমাজের রূপকতা, দার্শনিকতায় পূর্ণ এই গ্রন্থ বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের আদিমতম সৃষ্টির স্মারকগ্রন্থ।
ঐতিহাসিক গুরুত্ব:
[i] বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের প্রাচীনতম নিদর্শন এটি। তাই প্রাচীন স্তরের বাংলা ভাষার রূপ জানবার ক্ষেত্রে এর গুরুত্ব অপরিসীম।
[ii] বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস রচনার ক্ষেত্রে এই আদি কাব্যটির অসীম গুরুত্ব।
[iii] প্রাচীন বাংলার সমাজ ও জীবনযাত্রার তথা সামাজিক ইতিহাস চর্চার স্বাক্ষ্য আছে এতে।
[iv] হাজার বছর আগেকার ধর্মীয় ইতিহাস জানতে গেলে এর শরণাপন্ন হতে হয়।
চর্যায় আচরিত সহজ-তত্ত্ব:
চর্যাপদ হল বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের প্রাচীনতম নিদর্শন। চব্বিশজন বৌদ্ধ সহজিয়া সাধক সন্ধ্যাভাষার মাধ্যমে বৌদ্ধধর্মের নিগূঢ় তত্ত্বকথা তুলে ধরেছেন। একদিকে সমাজভাবনা এবং সমাজচিত্র অন্যদিকে এক বিশেষ শ্রেণির বিশিষ্ট সাধনকথা। এই দুই বৈশিষ্ট্যে চর্যাপদ বাংলা ভাষার এক উজ্জ্বল উদ্ধার। মূলত দেহকে কেন্দ্র করে সহজিয়া সাধনার পথে কবি সাধকেরা পথ হেঁটেছেন। এবং অন্যধর্মের মানুষের কাছে যাতে মূল তত্ত্ব পৌঁছে না যায় তার জন্য সন্ধ্যা ভাষায় এটি লেখা। বামগা নাড়ি বা ললনা, দক্ষিণগা নাড়ি বা রসনা এই দুয়ের কোনোটিতেই মনকে নিবিষ্ট করলে হবে না, মধ্যম অবস্থানে অবস্থিত অবধূতিকা মার্গে মনকে স্থির করতে হবে। এবং এই পথে যে ক্ষণ সৃষ্টি হয় তা বিভিন্ন স্তর পরম্পরায় বিভিন্ন চক্র ও আনন্দের জন্ম দেয়। নাভিতে বিচিত্র ক্ষণে শূন্যতার স্তরে নির্মানচক্রে অনুভূত হয় প্রথমানন্দ। কণ্ঠে বিপাক ক্ষণে অতিশূন্যতার স্তরে সম্ভোগচক্রে অনুভূত হয় পরমানন্দ, হৃদয়ে বিমর্দ ক্ষণে মহাশূন্যতার স্তরে ধর্মচক্রে অনুভূত হয় বিরমানন্দ। মস্তিষ্কে বিলক্ষণ ক্ষণে প্রভাশ্বর শূন্যতার স্তরে মহাসুখচক্রে অনুভূত হয় সহজানন্দ। এই সহজানন্দের অন্য নাম তুরীয়আনন্দ। যা লাভ করাই চর্যাকাব্যের একমাত্র মুখ্য।
> “বিচিত্রে প্রথমানন্দ পরমানন্দ বিপাককে বিরমানন্দ বিমর্দে চ সহজানন্দ বিলক্ষণে।”
২. শ্রীকৃষ্ণকীর্তন
আবিষ্কার- ১৯০৯ খ্রিঃ (১৩১৬ বঙ্গাব্দ) বাঁকুড়া জেলার বিষ্ণুপুরের কাঁকিল্যা গ্রামের দেবেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়ের বাড়ির গোয়ালঘরের মাচা থেকে এটি আবিষ্কৃত হয়।
প্রকাশকাল- ১৯১৬ খ্রিঃ (১৩২৩ বঙ্গাব্দ) বসন্তরঞ্জন রায় বিদ্বদ্বল্লভ মহাশয় বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ থেকে এটি প্রকাশ করেন।
প্রকৃত নাম- প্রকাশকালে ‘শ্রীকৃষ্ণকীর্তন’ নাম দেন। পরে গ্রন্থ মধ্যে একটি চিরকুট মেলে যাতে লেখা ছিল ‘শ্রীকৃষ্ণসন্দর্ব’ (মতান্তরে শ্রীকৃষ্ণসন্দর্ভ)। ফলে মতদ্বৈত ঘটে। তবে ‘শ্রীকৃষ্ণকীর্তন’ নামটিই সর্বজন মান্য ও বহুল প্রচলিত।
কবি- কবি বড়ু চণ্ডীদাস।
জন্মস্থান : বীরভূমের নানুর গ্রাম। কবি ছিলেন দেবী বাশুলীর সেবক।
উৎস: পদ্মপুরাণ, বিষ্ণুপুরাণ, হরিবংশ, ব্রহ্মবৈবর্তপুরাণ
বিষয়: ভূ-ভার হরণের জন্য গোলোকের বিষ্ণু কৃষ্ণরূপে এবং লক্ষ্মী রাধা-চন্দ্রাবলী রূপে মর্ত্যে আবির্ভূত হন। এঁদের লীলা মাহাত্ম্যই বর্ণিত হয়েছে এই গ্রন্থে।
চরিত্র- কৃষ্ণ, রাধা এবং বড়াই। এই তিনটি প্রধান চরিত্র। এছাড়াও আইহন, আইহনের মাতা, যশোদা, বলভদ্ৰ এবং লক্ষ্মী নাম্নী এক রাজকুমারীরও পরিচয় পাওয়া যায়।
খণ্ড- তেরোটি খণ্ড— জন্মখণ্ড, তাম্বুল খণ্ড, দানখণ্ড, নৌকাখণ্ড, ভারখণ্ড, ছত্রখণ্ড, বৃন্দাবন খণ্ড, কালীয়দমন খণ্ড, যমুনা খণ্ড, হারখণ্ড, বাণখণ্ড, বংশীখণ্ড এবং রাধাবিরহ।
বৈশিষ্ট্য
[i] এটি বর্ণনামূলক আখ্যানকাব্য হলেও এতে ঘটনা, বিবৃতি, নাট্যরস ও গীতিরসের অপূর্ব মেলবন্ধন ঘটেছে।
[ii] গ্রামীণ প্রেক্ষাপটে রচিত হওয়ায় তৎকালীন গ্রামীন জীবনযাত্রা ও জীবনচর্যার এক আনুপুঙ্খ ছবি পাওয়া যায়।
[iii] মধ্যযুগীয় বৈশিষ্ট্যকে অঙ্গীকার করে আদিরসের বাড়াবাড়ি এ কাব্যের একটি লক্ষ্যণীয় বৈশিষ্ট্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ঐতিহাসিক গুরুত্ব
[i] আদি মধ্যযুগীয় বাংলা ভাষার প্রথম নিদর্শন এটি। চর্যাপদ থেকে বাংলা ভাষার বিবর্তনের ইতিহাস জানার জন্য এ গ্রন্থের গুরুত্ব অপরিসীম।
[ii] লৌকিক জনজীবনের চলমান-জীবনপ্রবাহের ছবি এতে থাকায় পরবর্তীকালে এ গ্রন্থ থেকে তৎকালীন যুগের অনেক তথ্য পাওয়া যায়।
কাব্যটির বিশেষত্ব
১৯০৯ খ্রিঃ বাঁকুড়া জেলার কাকিল্যা গ্রাম থেকে উদ্ধারিকৃত আদি মধ্যযুগের শ্রেষ্ঠ কাব্য শ্রীকৃষ্ণকীর্তন ১৯১৬ খ্রিঃ বসন্ত রঞ্জন রায় বিদ্বদ্বল্লভ কর্তৃক বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ থেকে প্রকাশিত হয়। গ্রন্থের ভিতরে শ্রীকৃষ্ণসন্দর্ব নামে একটি চিরকুট মেলে তার থেকে নামকরণ বিষয়ে গোলযোগ বাধে। যেহেতু শ্রীকৃষ্ণকীর্তন নামটি সর্বাধিক প্রচলিত হয়ে পড়ে তাই সমস্যা যাই থাক এই নামটিই সর্ব সম্মতিক্রমে গৃহীত হয়। তেরটি খণ্ডে বিভক্ত এই নাট্যকাব্যটিতে রাধা এবং কৃষ্ণের মনস্তত্বের যে অদ্ভুত বিশ্লেষণ আছে সমগ্র মধ্যযুগীয় এমনকি আধুনিক কাব্যেও তা বিরল। প্রেমের ক্ষেত্রে যেটি সর্বজন স্বীকৃত পথ সেটি হল দর্শন, অনুরাগ এবং প্রেম। কিন্তু শ্রীকৃষ্ণকীর্তনে প্রেম এসেছে ভিন্নমার্গ থেকে। অনিচ্ছাকৃত দেহমন্থন, কাম জাগরণ, পুনরাবৃত্তি এবং পুনরাবৃত্তি শেষে প্রেমের আবির্ভাব। মনস্তত্ত্ববিদ্রা বলেন অনিচ্ছায় দেহমন্থন হলে হয় প্রেম নয় বিরাগ জন্মে। রাধার ক্ষেত্রে প্রেমই এসেছিল—সমাজসংস্কার বহির্ভূত দুকুলপ্লাবী প্রেম। কাব্যটির বিশেষত্ব আরো একটি ক্ষেত্রে কৃষ্ণ এখানে অবতার নন রাধিকাও ভক্তের প্রতীক নন। শ্রীকৃষ্ণকীর্তন নিতান্তই গ্রাম্য নরনারীর উদ্দাম যৌবনের উন্মাদ লীলাকাব্য। যা ঐ ধর্মীয় প্রেক্ষাপটে বসে গ্রাম্য কবি বড়ুর পক্ষে রচনা করা অত্যন্ত দুঃসাধ্য কাজ ছিল।
৩. বৈয়ব পদাবলি ও চৈতন্যজীবনীকাব্য
চৈতন্যদেব
জন্ম: ১৪৮৬ খ্রিঃ, ৮৯২ বঙ্গাব্দ (১৪০৭ শক, ২৩ ফাল্গুন)।
মৃত্যু: ১৫৩৩ খ্রিঃ, আষাঢ় মাসের রথযাত্রার দিন।
চৈতন্যদেবের প্রভাব –
গৌরচন্দ্রিকা নামক নতুন ধারার প্রবর্তন
রাগানুগা রাগাত্মিকা সাধনার সৃষ্টি
জীবনী সাহিত্যের ধারার সূচনা
গৌড়ীয় বৈয়ব দর্শনের সূত্রপাত
ষড়গোস্বামী – রূপ গোস্বামী, সনাতন গোস্বামী, জীব গোস্বামী, রঘুনাথ ভট্ট, রঘুনাথ দাস, গোপাল ভট্ট
বৈষ্ণব পদাবলির কবিগণ
- চণ্ডীদাস :পূর্বরাগের শ্রেষ্ঠ কবি
- বিদ্যাপতি :মাথুর ও প্রার্থনা পর্যায়ের শ্রেষ্ঠ কবি।
- জ্ঞানদাস :আক্ষেপানুরাগের শ্রেষ্ঠ কবি।
- গোবিন্দদাস :অভিসার পর্যায়ের শ্রেষ্ঠকবি।
- বলরামদাস :বাল্যলীলার শ্রেষ্ঠ কবি।
বিদ্যাপতি
জন্ম : বিহারের দ্বারভাঙ্গা জেলার মধুবনী মহকুমার বিসফী গ্রামে।
সময়কাল : খ্রিস্ট্রীয় চতুর্দশ শতাব্দীর শেষভাগ থেকে পঞ্চদশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধ (১৪৬০)।
পিতা : গণপতি ঠাকুর।
রচনাবলি: ‘ভূপরিক্রমা’ : (১৪০০),দেবী সিংহের নির্দেশে।
বিষয় : মিথিলা থেকে নৈমিষারণ্য পর্যন্ত যাবতীয় তীর্থের বর্ণনা।
- কীৰ্ত্তিলতা : ( ১৪০২-০৪) , অবহট্ঠ ভাষায় লেখা।
বিষয় : শিবসিংহের কীর্তি, তুর্কী আক্রমণের ঘটনা।
- পুরুষ পরীক্ষা : (১৪১০)
- কীর্তিপতাকা : (১৪১০)
- লিখনাবলী : (১৪১৮)
বিষয় : শিবসিংহ নিরুদ্দেশ হবার পর জীবিকানির্বাহের জন্য রচিত।
সংস্কৃত গ্রন্থ: শৈবসর্বস্বহার, গঙ্গাবাক্যাবলী, দানবাক্যাবলী, দুর্গাভক্তি তরঙ্গিনী, বিভাগসার।
পৃষ্ঠপোষক : শিবসিংহ, দেবীসিংহ, পদ্মসিংহ, কীৰ্তিসিংহ, ভীমসিংহ।
বিদ্যাপতির পদ প্রথম সংগ্রহ করেন জর্জ গ্রীয়ার্সন।
বৈয়ব সাহিত্যে বিদ্যাপতি
বৈয়ব পদাবলির মাথুর পর্যায়ের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি বিদ্যাপতি। তিনি ব্রজবুলি ভাষায় কাব্যরচনা করেছিলেন। যে কাব্য রাধা-কৃষ্ণ প্রেমবিষয়ক কাব্য। প্রার্থনা পর্যায়ে ও বিদ্যাপতির বিশেষ কৃতিত্ব ছিল। বিদ্যাপতি তাঁর সারাজীবনের ক্রিয়াকর্ম নিয়ে শেষ জীবনে এসে আফশোস করেছেন এবং কৃষ্ণের চরণে সমস্ত কর্মফল অর্পণ করেছিলেন।
> “মাধব বহুত মিনতি করি তোয় / দেই তুলসি তিল / এ দেহ সমপিহুঁ / দয়া জনু ছোড়বি মোয়”
মাথুর পর্যায়ে এই বিদ্যাপতি আবার উন্মাদ প্রেমে যন্ত্রণা দগ্ধা নারী। কৃষ্ণপ্রেমে পাগলিনী রাধিকা উচ্চারণ করে—
> “এ ভরা বাদর / মাহ ভাদর শূন্য মন্দির মোর”
বস্তুত পক্ষে বৈয়ব পদসাহিত্যে বিদ্যাপতির মত মাথুরে এমন আর্তি অন্য কোন কবি দেখাতে পারেননি।
বৈষ্ণব সাহিত্যে চণ্ডীদাস
পূর্বরাগের শ্রেষ্ঠ কবি চণ্ডীদাস। যে চণ্ডীদাস তাঁর রাধিকাকে সাজিয়ে রাখেন বিরহিনীর ভূমিকায়। চণ্ডীদাসের রাধিকা আরাধিকা। এ আরাধনা ভগবানের প্রতি ভক্তের। সে কারণেই চণ্ডীদাসের রাধিকা বৈরাগিনী, সারা অঙ্গে তার গেরুয়া পোশাক, এলোচুলে স্থানুবৎ বসে থাকেন তিনি আকাশের দিকে তাকিয়ে।
> “নয়ন সম্মুখে তুমি নাই নয়নের মাঝখানে নিয়েছ যে ঠাঁই”
চণ্ডীদাস রজকিনী রামীর প্রেমে পাগল ছিলেন। ছিলেন অত্যন্ত নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের মানুষ। কবি তাই বিদ্যাপতির রাজসভার মনিমুক্তা বা ধনপ্রাচুর্য চণ্ডীদাসের কাব্যে বিরল। তাঁর রাধিকার প্রেম তাই আভরণহীন, অলংকারহীন, বৈরাগ্যের দীপ্তিতে উজ্জ্বল।
বৈষ্ণব সাহিত্যে জ্ঞানদাস
রূপানুরাগ ও অনুরাগ পর্যায়ের শ্রেষ্ঠ কবি জ্ঞানদাস। জ্ঞানদাসের রাধাকৃষ্ণ কেবল রোমান্টিক ভাবাবেগে বিভোর নয়। আধুনিক কবিদের মত জ্ঞানদাস দেহসর্বস্বতার কবি। যে দেহের পথ ধরে জেগে ওঠে মন, জন্ম নেয় প্রেম।
> “প্রতি অঙ্গ লাগি কান্দে প্রতি অঙ্গ মোর।”
এই যে হৃদয় আততি দেহসর্বস্বতা এবং প্রেমিককে সর্বস্ব দিয়ে গ্রহণ করবার সাহসী উচ্চারণ সে যুগে একমাত্র জ্ঞানদাসই করতে পেরেছিলেন।
বৈষ্ণব সাহিত্যে গোবিন্দদাস
বৈয়ব পদসাহিত্যে গোবিন্দদাসকে ‘রাজাধিরাজ’ উপাধি দেওয়া হয়। অভিসার পর্যায়ে গোবিন্দদাস মর্ত্য মানব-মানবীর প্রেমলীলা নয় কৃষ্ণের জন্য রাধার কামনাকে অমর্ত্যের মাধুর্যে অভিষিক্ত করেছেন।
> “কন্টক গাড়ি কমলসম পদতল মঞ্জীর চীরহি ঝাঁপি”
তাই গোবিন্দদাসের পদগুলি বৈষ্ণব সাহিত্যে এক আলাদা মর্যাদা পায়।
৪. মঙ্গলকাব্য
মঙ্গলকাব্যের সংজ্ঞা
পঞ্চদশ থেকে অষ্টাদশ শতাব্দী পর্যন্ত লৌকিক দেব-দেবীর মাহাত্ম্য বর্ণনা করে যে এক শ্রেণীর আখ্যান কাব্য বাংলা সাহিত্যের মধ্যযুগে বিশেষভাবে রচিত হয়েছে, তাদেরই সাধারণ নাম মঙ্গলকাব্য।
মঙ্গলকাব্যের ধারা
প্রধান ধারাগুলি হল— মনসামঙ্গল, চণ্ডীমঙ্গল, ধর্মমঙ্গল
অপ্রধান ধারাগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল—শিবায়ন, কালিকামঙ্গল, অন্নদামঙ্গল, শ্রীকৃষ্ণমঙ্গল, গোবিন্দমঙ্গল
মঙ্গলকাব্যের বৈশিষ্ট্য
[i] মঙ্গলকাব্যে দেবতার মাহাত্ম্য প্রতিষ্ঠার সঙ্গে সঙ্গে মানব-জীবনের একটি অখণ্ড পরিপূর্ণ রূপ ফুটে উঠেছে।
[ii] মঙ্গলকাব্যে দেবতার যে রূপ ফুটেছে তাতে দেব মহিমার চেয়ে মর্ত্যের ক্রুর মানুষের স্বভাব বেশি পরিস্ফুট।
[iii] মঙ্গলকাব্যে বেহুলার অপূর্ব সতীধর্ম ও চাঁদ সদাগরের অজেয় পৌরুষ—তাকে মহাকাব্যের মর্যাদা দান করেছে।
[iv] তাছাড়া মঙ্গলকাব্যে ঐতিহাসিকতার একটা বড় প্রমাণ পাওয়া যায়।
মনসামঙ্গল কাব্য
- আদিকবি : কাণা হরিদত্ত
- শ্রেষ্ঠ কবি : নারায়ণ দেব
- প্রধান চরিত্র : মনসা, বেহুলা, লখীন্দর, চাঁদসদাগর, ,সনকা
চণ্ডীমঙ্গল
- আদি কবি : মানিক দত্ত
- শ্রেষ্ঠ কবি : কবিকঙ্কণ মুকুন্দ চক্রবর্তী
- মুকুন্দরাম : উপাধি : ‘কবিকঙ্কণ’,কাব্য : ‘অভয়ামঙ্গল’।
অন্নদামঙ্গল কাব্য
- শ্রেষ্ঠ কবি : ভারতচন্দ্র
- কাব্য : অন্নদামঙ্গল (১৭৫২)
৫. চৈতন্য জীবনী – বৃন্দাবনদাসের ‘চৈতন্যভাগবত’
বৃন্দাবনদাস ‘চৈতন্যভাগবত’ গ্রন্থে শ্রীচৈতন্যের লীলাময় জীবনকাহিনি বর্ণনা করেছেন। সহজ, সরল, অনাড়ম্বর এবং পরিচ্ছন্ন সর্বজনবোধ্য ভাষায় লেখা তাঁর জীবনীকাব্য চৈতন্যধর্ম সম্প্রদায়, চৈতন্যজীবনকথা এবং চৈতন্যপ্রবর্তিত ভক্তির কথা প্রকাশ করলেও কোনো স্থানে ঐতিহাসিকতা এবং বাস্তবতা ক্ষুণ্ণ হয়নি।
তিনি চৈতন্যের মানবমূর্তি ও ভগবৎ মূর্তি দুটি সমান কৃতিত্বের সঙ্গে অঙ্কিত করেছেন। বৃন্দাবন দাসকে চৈতন্যলীলার ব্যাস বলা হয়।
কৃষ্ণদাস কবিরাজের ‘চৈতন্যচরিতামৃত’
কৃষ্ণদাস কবিরাজ গোস্বামীর শ্রেষ্ঠত্বের কারণ চৈতন্যদেবকে কেন্দ্র করে বাংলা সাহিত্যে একটি বিশেষ সাহিত্য শাখার সৃষ্টি হয়েছিল যার নাম জীবনীসাহিত্য। কৃষ্ণদাস কবিরাজ চৈতন্যজীবনীকারদের মধ্যে শ্রেষ্ঠত্বের দাবি রাখেন।
[i] চৈতন্যজীবন সম্পর্কে এমন তথ্যনিষ্ঠ সুবিস্তৃত গ্রন্থ আর নেই।
[ii] দার্শনিক তত্ত্ব ও তথ্যের এমন প্রাচুর্য এবং কবিত্বপূর্ণ প্রয়োগ গ্রন্থটিকে অন্যতর মর্যাদা এনে দিয়েছে।
[iii] বৈষ্ণবীয় ভক্তি নিষ্ঠার দ্বিধাহীন সুস্পষ্ট প্রতিষ্ঠা তাঁর কাব্যকে অসাধারণত্ব দান করেছে।
[iv] নিরহংকারী মানুষটির আত্ম উজাড় করা তত্ত্ব ও তথ্য সজ্জা গ্রন্থটিকে অভিনবত্ব দান করেছে। তাঁর ব্যক্তিত্ব ছিল যুক্তি ও বিচার নিষ্ঠ, প্রকাশ ছিল সংহত ও যথাযথ।
৬. অনুবাদ সাহিত্য
রামায়ণ
প্রথম বাংলা অনুবাদক- কৃত্তিবাস ওঝা।
জন্ম : নদীয়ার ফুলিয়া গ্রামে।
সময়কাল : চতুর্দশ শতাব্দীর শেষার্ধ।
কাব্য : ‘শ্রীরাম পাঁচালী’।
প্রথম মুদ্রণ : ১৮০২-০৩ খ্রিঃ (কেরীর উদ্যোগে শ্রীরামপুর মিশন থেকে)
দ্বিতীয় মুদ্রণ : ১৮৩০-৩৪ খ্রিঃ।
(প্রথম অনুবাদক—কৃত্তিবাস, শ্রেষ্ঠ অনুবাদক — কৃত্তিবাস)
বিষয়বস্তু :
বিষয়বস্তু (৭টি কাণ্ড)—বাল, অযোধ্যা, অরণ্য, কিষ্কিন্ধ্যা, সুন্দরা, লঙ্কা এবং উত্তরাকাণ্ড। পাঁচালির ঢঙে কৃত্তিবাস রামের জন্ম থেকে শুরু ক’রে তাঁর বাল্যকাল, তাঁর শিক্ষাদীক্ষা, বিবাহ, বনবাসকালে সীতাহরণ, বানরদের সঙ্গে মিত্রতা, সমুদ্র পার হয়ে লঙ্কায় গমন, সেখানে বানর সেনার সাহায্যে রাবণবধ, লঙ্কাবিজয়, সীতা উদ্ধার, অযোধ্যায় প্রত্যাবর্তন, সিংহাসন লাভ, সীতার বনবাস, লব-কুশের জন্ম, সীতার পাতাল প্রবেশ, রাম-লক্ষণের দেহত্যাগ প্রভৃতি বিষয় বর্ণনা করেছেন। অবশ্য এর সঙ্গে অনেক উপকাহিনিও যুক্ত হয়েছে।
রামায়ণের বৈশিষ্ট্য
[i] বাঙালীর জীবনভাবনা তথা জীবনকথার হৃদয়স্পর্শী রূপচিত্র রচিত হয়েছে রামায়নে।
[ii] বাঙালীর প্রাণের সঙ্গে এ কাহিনির অচ্ছেদ্য যোগাযোগ গড়ে উঠেছে।
[iii] রামায়ণের একান্নবর্তী রাজপরিবার, আদর্শ ও কর্তব্যনিষ্ঠ জ্যেষ্ঠ পুত্র হিসাবে রামের উপস্থিতি, লক্ষণের অসাধারণ ভ্রাতৃভক্তি, সীতার সর্বংসহা বাঙালী কুলবধূ রূপের মধ্যে বাঙালী খুঁজে পেয়েছে তার প্রাণের আরাম, আত্মার আনন্দ।
রামায়ণের ঐতিহাসিক গুরুত্ব:
[i] রামায়নের কাহিনির মধ্যে তৎকালীন সমাজব্যবস্থা, রাজনৈতিক আবহ ও ধ্যানধারণা এবং রীতিনীতির একটা গ্রহণযোগ্য রূপচিত্র পাওয়া যায়।
[ii] আর্য-অনার্য সংগ্রাম এবং অনার্য জাতির পরাজয় ও বিজয়ী আর্য জাতির সাম্রাজ্যবিস্তারের ঐতিহাসিক রূপচিত্র রামায়ণের কাহিনির মধ্যে মেলে।
[iii] রামায়ন হল আর্য-জাতির আত্মপ্রতিষ্ঠা তথা রাজ্য প্রতিষ্ঠার ইতিহাস।
কৃত্তিবাসের রামায়নের জনপ্রিয়তার কারণ:
কৃত্তিবাসের রামায়নের জনপ্রিয়তা ও প্রসিদ্ধির সবচেয়ে বড় কারণ গার্হস্থ্য জীবনরস। বাঙালীর পারিবারিক জীবনের শ্রেষ্ঠ আদর্শগুলি এতে পরিস্ফুট। কৃত্তিবাস পরিচায়ীত ভ্রাতিপ্রেমে বৈরাগী ভরত, বাৎসল্যে অধিরা কৌশল্যা, দাস্যে সুপ্রতিষ্ঠিত হনুমান, সৌহার্দ্যে সুস্থির সুগ্রীব ও বিভীষণ জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে বাঙালীর নৈতিক ও আধ্যাত্মিক জীবনে পরিবার বন্ধনে ও সমাজ সচেতনায়ও শক্তিসার করেছে।
রামচন্দ্রের অকাল বনবাসে বাঙালী অচিন্তিত দুঃখকে সহজেই বরণ করতে শিখেছে। সীতার দুঃখময় জীবনকাহিনি বাঙালী বধূর অপার দুঃখেও স্বামীর অনুগত থাকার কথা বলে। লক্ষ্মণের দৃষ্টান্ত ভাই ভয়ঙ্কর বিপদে ভাইকে সাহায্য করেছে। রাবণের অনুতাপে পাপ দগ্ধ বাঙালী ঈশ্বরের পায়ে নিজেকে সঁপেছে।
রবীন্দ্রনাথের ভাষায়—
> “ইহা যেন বৃহৎ বনস্পতির ন্যায় ভারতবর্ষের ভূতল জঠর হইতে উদ্ভূত হইয়া ভারতবর্ষকেই আশ্রয় ছায়া দান করিতেছে।”
মহাভারত
প্রথম বাংলা অনুবাদক: কবীন্দ্র পরমেশ্বর।
উপাধি : কবীন্দ্র।
কাব্য : ‘পাণ্ডববিজয় কথা’।
শ্রেষ্ঠ অনুবাদক : কাশীরাম দাস।
বিষয়বস্তু
আদি পর্ব থেকে মহাপ্রস্থান পর্ব পর্যন্ত আঠারোটি পর্বে মহাভারতের কাহিনি বিস্তৃত। ভীষ্মের জন্ম, পাণ্ডু ও ধৃতরাষ্ট্রের শাসন, কৌরব ও পাণ্ডবদের জন্ম, তাদের বাল্যকাল—উভয়ের মধ্যে দ্বন্দ্ব, সিংহাসনের উত্তরাধিকার নিয়ে বিবাদ, দ্যূত ক্রীড়ায় হেরে পাণ্ডবদের বনবাস, প্রত্যাবর্তন, পুনরায় দ্বন্দ্ব, কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ, যুদ্ধে কৌরবদের পরাজয় পাণ্ডবদের জয়, পাণ্ডবদের সিংহাসনে অধিষ্ঠান, কৃষ্ণের মহিমা—এই মহাকাব্যের বক্তব্য বিষয়।
বৈশিষ্ট্য
[i] অতি জটিল ঘটনাসংবর্তে ধর্মাধর্মের সংঘাত, ন্যায়নীতি, রাজধর্ম, প্রজাধর্ম ও দর্শন—অত্যন্ত নিপুণতার সঙ্গে সংগ্রথিত।
[ii] সৎ পক্ষের জয় এবং অসৎ পক্ষের পরাজয় দেখানোর পাশাপাশি কৃষ্ণের রাজনৈতিক কূটকুশলী রূপ অদ্ভূতভাবে প্রকাশিত।
[iii] সংহত পরিসরে এ এক জাতির ইতিহাস কথা নয়, হয়ে উঠেছে জাতির জীবনকাব্য।
ঐতিহাসিক গুরুত্ব:
[i] একটি বিস্তৃত সময়ের রাজনৈতিক, সামাজিক ও ধর্মীয় জীবনাচরনের রূপ এই কাব্যে মেলে।
[ii] আর্যজাতির আত্মপ্রতিষ্ঠার পর অনিবার্য গৃহযুদ্ধের কারণ ও তার বিবরণ আনুপুঙ্খ লিপিবদ্ধ আছে এই কাব্যে।
[iii] কূটনৈতিকতার সর্বোচ্চরূপ কিভাবে কৃষ্ণকে মহাভারতে অনন্য মর্যাদার আসন দিয়েছিল, যা পরবর্তীকালে তাঁকে অবতারত্ব দান করে তার রূপ এখানে পাই।
কাশীরাম দাস
মহাভারতের শ্রেষ্ঠ অনুবাদক হলেন কাশীরাম দাস। তাঁর জন্ম স্থান বর্ধমান জেলার ইন্দ্রানী পরগণার সিঙ্গী গ্রামে (সিদ্ধিগ্রাম)। তিনি মহাভারতের আদি, সভা, বন পর্ব সমাপ্ত করে বিরাট পর্বের কিছুটা রচনা করেন।
কৃতিত্ব : কবি প্রতিভা
মহাভারত অমৃতচরিত কথার আকর গ্রন্থ। কাব্যশ্রী ও সৌন্দর্যের অফুরন্ত ভান্ডার। ভাষা ও ভাবের মন্ডনে এক সুচারু শিল্পকলা।
মাইকেলের ভাষায়— > “ভারতরসের স্রোত আনিয়াছ তুমি / জুড়াতে গৌড়ের তৃষা সে বিমল জলে।”
ভাগবত
প্রথম অনুবাদক : মালাধর বসু
শ্রেষ্ঠ অনুবাদক : মালাধর বসু
গ্রন্থের নাম : শ্রীকৃষ্ণবিজয়, অপর নাম গোবিন্দবিজয় বা গোবিন্দমঙ্গল।
উপাধি : গৌড়েশ্বর রুকনুদ্দিন বরবক শাহ্ ‘গুনরাজ খাঁ’ উপাধি দেন।
বিষয়বস্তু
ভাগবতে দ্বাদশ স্কন্ধ বা পর্ব, ৩৩২ টি অধ্যায় ও ১৮,০০০ শ্লোক আছে। বাংলাদেশের অধিকাংশ স্থানে ভাগবতে দশম থেকে দ্বাদশ স্কন্ধে কৃষ্ণের বৃন্দাবন ও পরবর্তী লীলা অনূদিত হয়েছে।
বৈশিষ্ট্য
[i] শ্রীকৃষ্ণের গৌরবকাহিনি বা মঙ্গলকথা এই গ্রন্থের মূল প্রতিপাদ্য বিষয়।
[ii] এই গ্রন্থে বাঙালীর জীবন ও সংস্কৃতির রূপচিত্র ধরা আছে।
[iii] এই গ্রন্থেই সর্বপ্রথম কৃষ্ণকে ‘প্রাণনাথ’ সম্বোধন করা হয়েছে।
[iv] মূল ভাগবতের কৃষ্ণের রাজসিক ভাব কৃষ্ণচরিত্রে বিদ্যমান।
ঐতিহাসিক গুরুত্ব
[i] চৈতন্যদেবের প্রভাবে বাংলাদেশের সমাজ ও সাহিত্যে যে নবজাগরণ শুরু হয়, তার কিছু আভাস এই কাব্যে আছে।
[ii] এতে কৃষ্ণচরিত্রে যে রাজসিক ভাব ফুটে উঠেছে, তাতে পঞ্চদশ-ষোড়শ শতকের বাংলার ইতিহাসের ছায়াপাত ঘটেছে।
[iii] সেইসময়ে উপদ্রুত বাঙালী ত্রাণকর্তা চরিত্র রূপে কৃষ্ণের মতো একটি চরিত্র কামনা করছিল—মালাধর বসু সেই আদর্শেই কৃষ্ণচরিত্র রচনা করেন।
[iv] এই অনুবাদের দ্বারা বাংলায় বৈষ্ণব-মতের প্রথম শুভ সূচনা হয়।
৭. আরাকান রাজসভার কাব্য
[i] পঞ্চদশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে ইলিয়াস শাহী সুলতানদের রাজত্ব শুরু।
[ii] তুর্কী অভিযান বাংলাদেশে।
[iii] আরাকান—সংস্কৃতি সমন্বয়ের প্রাণকেন্দ্র।
[iv] দেবদেবী নয়—এই প্রথম মানব-মানবীর প্রেমকে বড় করে দেখানো হয়েছে।
[v] দৌলত কাজীর “লোরচন্দ্রানী” / ‘সতীময়না’ এই ভাবনাকে দেখিয়েছে।
[vi] মিয়াসাধনের গ্রাম্য ঠেট গোহারী ভাষায় রচিত মানবিক কাহিনি অবলম্বনে ‘লোরচন্দ্রানী’ লিখিত।
[vii] ‘লোরচন্দ্রানী’ রোমান্টিক কাব্য।
[viii] ‘লোরচন্দ্রানী’ কাব্যে সূফী ধর্মের জয় ঘোষিত।
[ix] ‘লোরচন্দ্রানী’র কাহিনি ও চরিত্র চিত্রণ রোমান্টিক ও প্রতিঘাতপূর্ণ।
[x] শকুন্তলা-উপাখ্যান, রঘুবংশ, জয়দেবের গীতগোবিন্দের সুর এই কাব্যে শোনা যায়।
[xi] আলাওল জায়সীর ‘পদুমাবৎ’ অবলম্বনে লেখেন ‘পদ্মাবতী’।
[xii] কাহিনি—ইতিহাসের প্রেক্ষাপট।
[xiii] রূপকথা আছে।
[xiv] চরিত্রচিত্রণ রোমান্টিক, প্রতিঘাত ও দ্বন্দ্বমুখর।
[xv] অ্যাডভেঞ্চারের মালা এ কাব্য।
[xvi] আলাওলের অন্যান্য কাব্যও আছে।
আরাকান রাজসভার আনুকূল্যে রচিত কাব্য
পঞ্চদশ শতক
- মুহম্মদ সগির — ‘য়ুসুফ জুলেখা’
- জৈনুদ্দিন — ‘রসুলবিজয়’
- মোজাম্মিল — ‘নীতিশাস্ত্র’, ‘সয়নামা’, ‘সঞ্জন চরিত্র’।
ষোড়শ শতক
- সারিবিদ খাঁ — ‘বিদ্যাসুন্দর’
- দোনাগাজী — ‘সয়ফুলমূলক বদিউজ্জমাল’
- দৌলত উজীর — ‘লায়লা মজনু’
- মহঃ কবীর — ‘মধুমালতী’।
সপ্তদশ শতক
- আব্দুল হাকিম — ‘ইউসুফ জুলেখা’
- নওয়াজিস খান — ‘গুলেব কাওলী’
- মোহম্মদ খান — ‘মুক্তাল হোসেন’, ‘সত্যকলি বিবাদ সংবাদ’
- সৈয়দ মোহম্মদ — ‘জৈবালমুলুক শামারোখ’
- সৈয়দ সুলতান — ‘নবি বংশ’
- সুল্লা দাউদ — ‘চন্দ্ৰায়ন’।
দৌলত কাজী
জন্ম : চট্টগ্রামের সুলতানপুর।
সময়কাল : সপ্তদশ শতক।
কাব্য : ‘লোরচন্দ্রানী’ বা ‘সতীময়না’ (১৬২১-৩৮) ১৬৫৯ খ্রিঃ আলাওল সমাপ্ত করেন।
পৃষ্ঠপোষক : শ্রী সুধর্মার সমরসচিব আশরফ খান।
সৈয়দ আলাওল
রচনা : সয়ফুলমূলক বদিউজ্জমাল (১৬৫৮-৭০), হপ্তপয়কর (১৬৬০), তোফা (১৬৬৩-৬৯), সেকেন্দরনামা (১৬৭২), পদ্মাবতী (১৬৪৬), লোরচন্দ্রানী (শেষাংশ) (১৬৫৯)
‘লোরচন্দ্রানী’ কাব্যের বিষয়বস্তু
গোহারী দেশের রাজা মোহরার সুন্দরী কন্যা চন্দ্রানীর সঙ্গে এক নপুংসক বামনের বিয়ে হয়। মহাবীর লোর বা লোরক চন্দ্রানীর প্রতি আকৃষ্ট হয়ে তাকে নিয়ে পালান। পথে নপুংসক বাধা দিতে এলে লোরক তাকে হত্যা করেন। মোহরা তাঁর বীরত্বে মুগ্ধ হয়ে চন্দ্রানীর সঙ্গে তাঁর বিয়ে দিয়ে রাজপদে বরণ করে নেন। এদিকে লোরের প্রথমা স্ত্রী ময়নামতী নানা প্রলোভন জয় ক’রে লোরের কাছে ফিরে আসার প্রার্থনা করলে রাজা লোর চন্দ্রানীসহ ফিরে এসে ময়নামতীর সঙ্গে সুখে দিন কাটাতে লাগলেন।
‘লোরচন্দ্রানী’ কাব্যের বৈশিষ্ট্য
[i] বাংলা পয়ার-ত্রিপদীতে রচিত এই কাব্যের কাহিনি খুব সংযত ও পরিচ্ছন্ন।
[ii] ময়নার সতীত্ব, প্রলোভনের সামনে অবিচল নিষ্ঠা, পলাতক স্বামীর প্রতি শ্রদ্ধা কবি চমৎকার ফুটিয়েছেন।
[iii] চন্দ্রানীর রোমান্টিকতা কবির লেখায় আরও জীবন্ত হয়ে উঠেছে।
‘লোরচন্দ্রানী’ কাব্যের ঐতিহাসিক গুরুত্ব:
[i] ‘লোরচন্দ্রানী’ কাব্য মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যের গতানুগতিকতা ভঙ্গ করে পরবর্তীকালে এক অভিনব কাব্যরচনারীতির পথ খুলে দিয়েছিল।
[ii] সতীময়নার যে গল্প সারা ভারতে লোকগাথা-গীতির আকারে প্রচলিত ছিল, দৌলত কাজী বাংলা সাহিত্যের সঙ্গে তার মেলবন্ধন ঘটান।
[iii] বৃহত্তর হিন্দু সমাজের সঙ্গে দৌলত কাজী পরিচয় করান।
‘পদ্মাবতী’ কাব্যের বিষয়বস্তু
চিতোররাজ রত্নসেনের রাণি পদ্মাবতীর রূপ-গুণের খ্যাতি সারাদেশে ছড়িয়ে পড়েছিল। তাই শুনে দিল্লির পাঠান সুলতান আলাউদ্দিন খিলজি চিতোর আক্রমণ করেন, পদ্মাবতীকে বলপূর্বক হরণ করতে আসেন। যুদ্ধে রত্নসেন ও তাঁর অনুচরেরা প্রাণ দেন, নিজ নারীধর্ম রক্ষা করবার জন্য পদ্মাবতী সখিদের সঙ্গে জহরব্রত পালন ক’রে অগ্নিকুণ্ডে প্রাণ বিসর্জন দেন।
‘পদ্মাবতী’ কাব্যের ঐতিহাসিক গুরুত্ব
[i] এই কাব্যটিতে ইতিহাসের চেয়ে কল্পনার প্রাধান্য অধিক, ইতিহাস সামান্য।
[ii] কাব্যের কোনো কোনো স্থানে বাংলাদেশের সমাজ ও পরিবেশের প্রভাব লক্ষ্য করা যায়।
[iii] হিন্দু ও মুসলমানের মিলিত জীবনচর্চার কিছু নিদর্শন কাব্যে পরিস্ফুট।
‘পদ্মাবতী’ কাব্যের বৈশিষ্ট্য:
[i] এই বইতে বাংলাদেশের সমাজ ও পরিবেশের প্রভাবও লক্ষ্য করা যায়।
[ii] এই কাব্যের কাহিনি ও কাব্যগুণের জন্য এটি হিন্দু-মুসলমান সমাজে সমান জনপ্রিয়।
[iii] জায়সীর ‘পদুমাবৎ’ কাব্যের সঙ্গে পদ্মাবতী কাব্যের কাহিনি, চরিত্র ও ভাষান্তর ঘটলেও এটি সমানভাবে জনসমর্থন পেয়েছে।
মঙ্গলকাব্য ও বৈষ্ণবসাহিত্যের মধ্যে ভাব ও রসের পার্থক্য:
মঙ্গলকাব্য ঐহিকতাবাদী, বৈষ্ণবসাহিত্য আধ্যাত্মবাদী। মঙ্গল কাব্যে ভক্তি, লোভ, ভয়ের সঙ্গে মিশ্রিত। বৈষ্ণব কাব্যের ভক্তি বিশুদ্ধ প্রেম ও ঐহিকতা বর্জিত পরিপূর্ণ আত্মনিবেদন সর্বস্ব ত্যাগ ও অহমিকা বর্জনই বৈষ্ণব ভক্তির আদর্শ। অপরদিকে মঙ্গলকাব্যে ধন চায়, মান চায়, মনোরমা ভার্যা চায়, বাঞ্ছিত পতি ও সুযোগ্য পুত্র চায়। এই বিরাট চাহিদাই ভক্তি প্রেরণা। কিন্তু বৈষ্ণব সাহিত্যে অহৈতুকি কৃষ্ণপ্রীতিই প্রার্থনা। মঙ্গলকাব্য শুনিয়েছে ঐহিকের সুখ ও ঐশ্বর্যের আশ্বাস আর বৈষ্ণব কাব্য শুনিয়েছে আত্মবিলোপের বৈরাগ্যবাণী। আর এখানেই দুই কাব্যের আদর্শগত পার্থক্য। মঙ্গলকাব্যের মানুষ, দেবতা, উপলক্ষমাত্র। বৈষ্ণব কাব্য বড়ো বেশি ব্যক্তিনিষ্ঠ, মঙ্গল কাব্য জাতি-ধর্ম-নির্বিশেষে সকল বাঙালীর জন্য, বৈষ্ণব সাহিত্য ছিল বিশেষ সম্প্রদায়ের জন্য।
পঞ্চদশ শতাব্দীর বৈষ্ণব পদাবলি ও ষোড়শ শতাব্দীর বৈষ্ণব পদাবলি:
পঞ্চদশ শতাব্দীতে রচিত পদাবলি সাধারণত চৈতন্য-পূর্ব বৈষ্ণব পদাবলি নামে পরিচিত। ষোড়শ শতাব্দীর বৈষ্ণব পদাবলি উত্তর-চৈতন্য বৈষ্ণব পদাবলির অন্তর্ভুক্ত।
পঞ্চদশ শতাব্দীর পদাবলি রচনার প্রেরণা হলো সাধারণভাবে মানবসংস্কার প্রবৃত্তি ও রসচেতনা। উৎস হলো রাখালিয়া লোকগীতি। সংস্কৃত, প্রাকৃত ও অপভ্রংশে যে সব প্রেমের কবিতা রচিত হয়েছে, তাদেরই সমগোত্রীয় এই বাংলা পদাবলি। সদুক্তিকর্ণামৃত, করীন্দ্রবচনসমুচ্চয়, প্রাকৃত পৈঙ্গল ইত্যাদি সংস্কৃত প্রকীর্ণ কবিতার সংকলনে অন্যান্য প্রেমের কবিতার সঙ্গে রাধাকৃষ্ণ নামাঙ্কিত কবিতাও স্থান পেয়েছে। দ্বাদশ শতাব্দীতে রচিত জয়দেবের ‘গীতগোবিন্দে’ যদিও রাধাকৃষ্ণের ঐশী অস্তিত্ব আরোপ করা হয়েছে, তবুও সেই ঈশ্বরভাবনা তাৎক্ষণিক, নর-নারীর জৈব আকর্ষণ-লীলায় তা গ্রস্ত ও খণ্ডিত। চণ্ডীদাস-বিদ্যাপতির পদাবলিতে প্রধানত এই কবি-প্রজ্ঞাই অনুসৃত হয়েছে।
ষোড়শ শতাব্দীর পদাবলি সমূহের প্রেরণা ও উৎস হলেন স্বয়ং চৈতন্যদেব। তাঁর ভাবোন্মত্ততায় তিনি কখনো কৃষ্ণ, কখনো রাধা। সুতরাং ভক্ত পদকর্তাগণ গৌরাঙ্গদেবের মাধ্যমেই রাধা ও কৃষ্ণের অপার্থিব প্রণয়লীলা আস্বাদ করবার সুযোগ পেয়েছিলেন এবং তাকে পদে গ্রথিতও করেছিলেন। সুতরাং বলা যেতে পারে, গৌরাঙ্গের অপ্রাকৃত ভাবমাধুর্যই চৈতন্য পরবর্তী বৈষ্ণব কবিতার উৎস।
শুধু তাই নয়, গৌরাঙ্গ তিরোভাবের পর বৃন্দাবনের ছয়জন গোস্বামী চৈতন্য প্রচারিত ভক্তিধর্মকে দার্শনিক ব্যাখ্যা যোগে লিপিবদ্ধ করেন। এই গৌড়ীয় বৈষ্ণব ভক্তিবাদ থেকেও ষোড়শ শতকের তৃতীয় পদ থেকে বহু বৈষ্ণব কবি পদাবলি রচনায় অনুপ্রাণিত হন। শ্রেষ্ঠ বৈষ্ণব-পদকর্তা গোবিন্দদাস এই পর্যায়ভুক্ত।
পঞ্চদশ শতাব্দীতে যে সব পদাবলি লেখা হয়েছে, তাতে কবিগণ ভারতীয় প্রাচীন আলঙ্কারিক রীতিই অনুসরণ করেছেন। দণ্ডী, ভামহ, বাৎস্যায়ণ প্রভৃতি পণ্ডিতেরা তাঁদের নির্দেশক। পক্ষান্তরে, ষোড়শ শতকের বৈষ্ণব পদকর্তাগণ রূপ গোস্বামী, শ্রীজীব গোস্বামী প্রভৃতি বৈষ্ণব পণ্ডিতগণের ‘উজ্জ্বল নীলমণি’, ‘পদাবলি’ ইত্যাদি গ্রন্থে বিধৃত ও ব্যাখ্যাত বৈষ্ণবোক্ত শান্ত, দাস্য, সখ্য, বাৎসল্য, মধুর নামীয় পঞ্চরস ও তার বিভিন্ন পর্যায় ও উপপর্যায়ের অনুসরণে পদরচনা করেছেন। এর মধ্যে মধুর বা শৃঙ্গার রসের পদই প্রাধান্য লাভ করেছে।
স্মরণযোগ্য যে ভারতীয় অলঙ্কারশাস্ত্রের ‘শৃঙ্গার’ ও গৌড়ীয় বৈষ্ণব দর্শনশাস্ত্রের ‘শৃঙ্গার’ এক নয়। পূর্বোক্ত ‘শৃঙ্গার’-এর স্থায়িভাব ‘রতি’, শেষোক্ত শৃঙ্গারের স্থায়িভাব—‘কৃষ্ণরতি’।
অতএব, সমগ্রত এই সিদ্ধান্ত করা যায় যে পঞ্চদশ শতাব্দীর রাধাকৃষ্ণ পদাবলির উপজীব্য নরনারীর প্রণয়লীলা, ষোড়শ শতাব্দীর রাধার পদাবলির উপজীব্য হলো শক্তিমান ভগবান এবং তাঁর অন্তরঙ্গা স্বরূপশক্তির সারভূতা হ্লাদিনী শক্তির অপ্রাকৃত আকর্ষণলীলা। ষোড়শ শতকের রচিত পদাবলির এই অপ্রাকৃত প্রেমলীলা অবশ্য মানবীয় প্রেমলীলার আধারেই পরিবেশিত হয়েছে। অর্থাৎ শক্তিমান ও শক্তির নিগূঢ় লীলা নরনারীর কামক্রীড়ার যে নিবিড় আনন্দ—একমাত্র তার সঙ্গেই তুলনীয় হতে পারে। তাই কামক্রীড়ার রূপকেই অপ্রাকৃত প্রেমলীলার বর্ণনা। ষোড়শ শতকের পদাবলিতে তাই স্বর্গ ও মর্ত্যের মিলন সংঘটিত হয়েছে। সসীমের ও অসীমের সেতুবন্ধন হয়েছে।
যদিও বৈষ্ণব পদাবলির অনুশীলন হয়েছিল বৈষ্ণব সাধনার অঙ্গ হিসাবে, তবুও একথা সত্য যে বৈষ্ণব-পদাবলির মধ্যে যে সাধনার ইঙ্গিত আছে, তা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা থেকে বিচ্ছিন্ন, কোন শুষ্ক বৈরাগ্যচর্চা নয়। ড. সুকুমার সেন মহাশয় বলেন—
> “যে স্নেহপ্রেম সম্পর্ক মানুষকে তাহার জীবনের মধ্য দিয়া পথ দেখাইয়া লইয়া যায়, তাহাই কৃষ্ণলীলা রূপকের মধ্যে দিয়া জীবনমরণাতীত নিত্যসম্পর্করূপে বৈষ্ণব পদাবলিতে উপস্থাপিত।”
উপসংহার:
বাংলা সাহিত্যের প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় সাহিত্যধারা বাংলা ভাষা, সংস্কৃতি, ধর্মচেতনা ও সমাজজীবনের বিবর্তনের এক অমূল্য দলিল। চর্যাপদের গুপ্ত সাধনভাবনা থেকে বৈষ্ণব পদাবলির প্রেমতত্ত্ব, মঙ্গলকাব্যের লোকজ জীবনচিত্র থেকে অনুবাদ সাহিত্যের মহাকাব্যিক ঐতিহ্য—সব মিলিয়ে বাংলা সাহিত্যের এই পর্ব ভারতীয় সাহিত্যভাণ্ডারের এক অনন্য সম্পদ।
### ড. অনিশ রায়

