অনিশ রায়
পর্দায় তাঁর উপস্থিতি দেখামাত্র যে মুগ্ধতা আমাকে গ্রাস করে এসেছে এতদিন, তার বোধহয় ক্ষয় হল না—এ-কালেও। আশৈশব গুণমুগ্ধ তাঁর। কারণ তাঁকে দেখা মানে কেবল একজন অভিনেতাকে দেখা নয়; বরং যেন বলিউডি সিনেমা-ইতিহাসের ভেতরে নীরবে চলমান এক দীর্ঘ সাংস্কৃতিক সংলাপের অংশ হয়ে ওঠা। এমন এক সংলাপ, যেখানে সময়ের স্তরগুলি একে অপরের সঙ্গে মিশে যায়—ঔপনিবেশিক অতীত, স্বাধীনতার পরবর্তী রাষ্ট্রচেতনা, এবং বিশ্বায়নের যুগে তৈরি হওয়া নতুন মধ্যবিত্ত কল্পনার ভেতরে দাঁড়িয়ে মানুষের স্বপ্ন, সংকট ও সম্ভাবনারা বহুস্বরে কথা বলে।
বলিউডের ইতিহাস তো সরলরেখা নয়; তা বহু-প্রবাহের সমান্তরাল গতিপথ। সেখানে কখনো দেখা গেছে শ্রমজীবী মানুষের দুর্মর রোমান্টিক আকাঙ্ক্ষা, যেমন এক সময় রাজ কাপুর–এর সিনেমায় যা ফুটে উঠেছিল। আবার সত্তরের দশকে শহুরে অসন্তোষ ও রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রতীক হয়ে উঠেছিলেন অমিতাভ বচ্চন। আবার নব্বইয়ের দশকে বিশ্বায়নের নতুন স্বপ্ন, প্রবাসী ভারতীয়দের আবেগ, এবং মধ্যবিত্তের রোম্যান্টিক কল্পনার কেন্দ্র হয়ে উঠেছিলেন শাহরুখ খান। এই ধারাবাহিকতার ভেতরেই এক বিশেষ সন্ধিক্ষণে আকস্মিক আসেন আমির খান—কিন্তু তিনি যেন সেই ধারার কেবল উত্তরাধিকারী নন; বরং সেই ধারার অন্তর্গত এক আশ্চর্য প্রশ্ন। তাঁর কাজের মধ্যে আমরা দেখতে পাই ইতিহাসের টুকরো বিন্দুগুলি হঠাৎ অচেনার ভিতরে নতুনভাবে চেনা হয়ে উঠছে।
আমির নিঃসন্দেহে বলিউডে একটা বিস্ময়-জড়ানো জিজ্ঞাসার স্রষ্টা। কারণ তাঁর উপস্থিতি সিনেমাকে বিনোদনের ক্ষেত্রে ধরে রাখে, আবার তার মধ্যে দাঁড়িয়েই তাকে এক ধরনের বৌদ্ধিক অভিজ্ঞতায় পরিণত করতে চাইছে। এমনকি বাজারের অঙ্ক, তারকাতন্ত্রের কোলাহল, প্রচারের উন্মাদনা—এসব সত্ত্বেও এসবের বাইরে থাকতে পারছে। যেন একটি মৌলিক প্রশ্ন উত্থাপন করে ফেলছে: সিনেমা কি কেবল দেখার জন্য, নাকি ভাবনাটাও তার গুরুত্বপূর্ণ অংশ?
এখনকার জন্য দু-একটা বলতে ইচ্ছে হল —
এই প্রশ্নের এক গভীর প্রতিধ্বনি শোনা যায় Lagaan–এ। সেই সিনেমার ভিতরে ইতিহাস নতুনভাবে বিন্যস্ত হল। একটি গ্রাম দেখা যায় ভারতীয় সমাজের বিস্তৃত বহুত্বের মানচিত্রে। উনিশ আর বিশ শতক তার সংগ্রামী সামগ্রিকতা নিয়ে দাঁড়ায় পর্দায়। ফ্যান্টাসিও তার পোশাক বদল করে। ক্রিকেট ঔপনিবেশিক রূপক হলে, অপরপক্ষে তা আবার সাংস্কৃতিক পুনর্দখলের প্রতীক। উপনিবেশের আরোপিত কাঠামোকে গ্রহণ করেও তাকে প্রতিরোধের ভাষায় রূপান্তরিত করা—এই এক ঘটনাতেই যেন ধরা থাকে ভারতীয় ইতিহাসের জটিল দ্বন্দ্ব, তার বিপ্লবী ধারার প্রতি উত্তরকালীন প্রণতি। এ তো কেবল বলিউডের সিনেমা নয়, যেন একুশ শতকের প্রথম মুহূর্তে এক দায়বোধের ভাষ্য। সময়ের প্রতিস্রোতে এক চূড়ান্ত যুগবাণী। যার প্রবক্তা নিজের অজান্তেই হয়ে গেলেন আমির।
তারপর Rang De Basanti–এ আমরা দেখি ইতিহাসের আরেক স্তর। ভগৎ সিং, চন্দ্রশেখর আজাদ সমকালীন রাষ্ট্রব্যবস্থায় সময়ের সেতু হয়ে ওঠেন৷ ইতিহাসের বিপ্লব যে বর্তমানের শরীরেও চলমান এক প্রবাহ, এই অতি পুরনো কথাটাই জেন-ওয়াইয়ের নিজস্ব ফ্যাশনে, নিজস্ব স্টাইলে স্বঘোষিত হয়ে ওঠে ভঙ্গির অতি-সাবধানী অপচয়ে৷ এই যে ডিজে, ওরফে দিলজিৎ হয়ে একুশ শতকের প্রথম দশকে আমির একটা অন্যমনস্ক হওয়ার রিমিক্স চেতনা জাগালেন, তথাবিধ অকর্মণ্যতাও যে একটা বিশেষত্ব হতে পারে, ডিম-লাকা-লাক-দে-ডিম-লাকা-লাক — এমন অর্থহীন ধ্বনিমালাও যে দীক্ষিত হওয়ার সহজিয়া শর্ত বা মন্ত্র হতে পারে, একথা ক্যারিয়ার-মুখী প্রজন্মের মনে স্ফুলিঙ্গের মতো হলেও যে উসকানি হতে পেরেছিল, তা বলিউডি লুজ-কন্ট্রোলেও আমিরেরই সৌজন্যে। বিশৃঙ্খল বিক্ষত সমকাল আর বিপ্লবের অক্ষত স্মৃতি যেভাবে জারণ-বিজারণে তাঁর শরীর আর মেজাজের অভিব্যক্তিতে পর্দায় জায়মান হল, তা দশকের অবসন্নতার ভিতর একটা কম্পন ছিল, একথার সাক্ষ্য ও সমর্থক আমরা নিজেরাই। আবার তিনি দিলজিৎ হয়ে যতখানি আকর্ষণীয় বা সময়ের চোখে আইকনিক হলেন, ঠিক বিপরীতে চন্দ্রশেখর আজাদ হয়ে আইকন হওয়ার আলট্রা মডার্ন ব্যবস্থাপনাকে চুরমার করে দিলেন৷ এই প্র্যাকটিসটাই আমিরের স্বাতন্ত্র্য। কেবল এই সিনেমায় নয়; তাঁর সমগ্র স্টার ও শিল্পী জীবনেও। সমসাময়িকতার মস্তিষ্কে, যুগের গতির সাবলীল স্বভাবে এই দ্বন্দ্বের কার্যকরী যতি আর জিজ্ঞাসা জাগানোর জন্যই আমির কুর্নিশের চিরযোগ্য হয়ে থাকলেন।
এরপর হঠাৎই এক নীরব মোড়—Taare Zameen Par। এখানে ইতিহাসের বড়ো ঘটনাগুলি অনুপস্থিত, কিন্তু উপস্থিত থাকল চলমান ইতিকথার সাংস্কৃতিক ফাঁক। ভারতীয় শিক্ষাব্যবস্থার দীর্ঘ ঐতিহ্যের মধ্যে শৃঙ্খলা ও সাফল্যের যে কঠোর ধারণা তৈরি হয়েছে, তার আড়ালে শিশুমনের সৃজনশীল অবকাশ যে এক অবশ্যম্ভাবী নিহত ভবিষ্যতের রূপকথা, সেই অদৃশ্য ক্ষতের যন্ত্রণা শরীরে জাগিয়ে দিল। এখানে আমির (রামশঙ্কর) নায়ক নয়; যেন উচ্চ থেকে নিম্নবিত্ত শৈশবের অব্যক্ত ভাষা—যে ভাষা বলে, জ্ঞানের চেয়েও চৈতন্য শ্রেয়।
তারপর আসে 3 Idiots—যেখানে ভারতীয় মধ্যবিত্ত সমাজের আধুনিক মানসিকতার একটি তীক্ষ্ণ প্রতিচ্ছবি তৈরি হয়। স্বাধীনতার পর শিক্ষা ক্রমশ আর্থ-সামাজিক অগ্রগতিরই সমার্থক যখন, তখন শিক্ষায় আনন্দ এবং সৃজনশীলতার ভাবনা স্বভাবতই পিছনের সারিতে সরে যায়। এই গর্বিত-সংকটকে তীক্ষ্ণ ব্যঙ্গে, কপট ছলনায়, নিষ্ঠুর কিংবা নিষ্পাপ মানবিকতায় র্যাঞ্চো যখন নিষ্ফলা দেখিয়ে দেয়, তখন শিক্ষার ঊষর জমিকেও একদিন সুজলা সুফলা শস্য-শ্যামলা ভাবতে সাধ জাগে। সিনেমার ভাবনা ও নির্মাণের সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও, রবীন্দ্রনাথের বৃহৎ ও মহৎ শিক্ষাভাবনার আংশিক হলেও, একুশ শতকীয় পরিবেশন মন্দ লাগে না; বিশেষ করে র্যাঞ্চোকে ‘অচলয়াতন’-এর পঞ্চক বলে মাঝে মাঝে যখন ভ্রম হয়। এই যে শতকীয়-স্মৃতির অভিজ্ঞান, তা আমিরেরই কৌশলী কারুকাজ। স্যালুট তাই আমিরের প্রাপ্য।
আমিরের অভিনয় জীবনের আরেক গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত Dangal। ভারতীয় সমাজের পিতৃতান্ত্রিক কাঠামোর ভেতরে যে আরও শক্তিশালী সমান্তরাল যাত্রা আছে— মেয়েদের শরীর, শক্তি, চিন্তা, মেধা, সব সম্ভাবনা যে লক্ষ বিধিনিষেধেও আসলে অন্তঃসলিলা হয়ে দুর্বার গতিময়, শুধু অবহেলায় অজানা, সেই সত্যকে বলিউডের মাধ্যমে আবার স্মরণ করাল এই সিনেমা। এক পিতার এক পুরুষের জেদ, আসলে পুরুষ তো নয়, প্রকৃত মানুষের জেদ যে-কোনো ক্ষেত্রে সত্যের প্রতি যদি অবিচল হয়, তার বিশ্বাস যদি মনুষ্যত্বের হয়, তাহলে একুশ শতকের অবেলাতেও বিদ্যাসাগরকে মুহূর্তের ঝলকে দেখা যেতে পারে, এই সম্ভাবনার স্বপ্নটুকুও মহাবীর ফোগট হয়ে দেখাতে পারলেন আমির। এবং তার মেয়েদের সংগ্রাম, যা কুন্তীবালা দেবী থেকে সাবিত্রীবাঈ ফুলে, কাদম্বিনী গাঙ্গুলি থেকে প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদারের বা লক্ষ্মী সায়গলের রক্তে গীতা ফোগটও নতুন শরীর পায়— তাতে নতুন সামাজিক ভাষাও তৈরি হতে পারে। আজকের সব ভারতীয় সমাজে মহাবীর ফোগট হয়ে আমির দৃষ্টিভঙ্গির এই নতুন পরিভাষা দিতে পারলেন। আর কী চাই, সিনেমা যদি বিনোদন হয়ে মারাত্মক বাণিজ্য করে, করুক, তাতে লাভই লাভ। কিন্তু তার আড়ালে যদি আরও বড়ো চেতনার লাভ না-চাইতেই পাই, তাহলে সে স্বাদের লক্ষ লক্ষ কোটি কোটি ভাগ হবে। সমাজ-চিন্তায় আবার আমাদের সেই স্বাদের ভাগীদার করলেন তিনি। তাঁর জন্মদিনে তাই আমাদের নতুন আরেকটা স্বাদের এবং সাধের জন্ম হোক— এটুকু প্রার্থনা।
আমিরের কাজে সমকাল আছে, নাকি ইতিহাস সরাসরি, নাকি শুধুই মার্কেটিং স্ট্রাটেজি, সে সব নিয়ে তর্ক চলুক। বরং এসবের মধ্যেও তাঁর সিনেমা ভারতীয় সংস্কৃতির বহুস্বরিক বাস্তবতাকে, তার ব্যক্ত অব্যক্ত মানসিক ঐতিহ্যকে ধরতে চেয়েছে, এই প্রচেষ্টাকে স্টারডামের মধ্যে বজায় রাখতে পেরেছে, অন্তত এই কথাটাকে একবাক্যে প্রতিষ্ঠা দিতে পারছি, এটাই আজকের দিনে গাঢ় সুখানুভূতি।
এখানেই এই সময়-বৃত্তে আমির বলিউডে একক। অনন্য।
বলিউডের নোনা মাটিতে আমির স্বকৃত প্রকরণে যেমন এক অনভ্যস্তের প্রস্তাবনা, তেমনই এক নবতর সংযোজনী। তাঁকে বলিউড নামক ইতিহাসগ্রন্থের দুই মলাটের মধ্যে রাখা যায়— কারণ তিনি সেই ইতিহাসের অংশ। কিন্তু ধারাবাহিক অধ্যায়ে তাঁকে সম্পূর্ণভাবে ধারণ করাও যায় না। তিনি যেন সেই অন্তর্বর্তী মন্তব্য, যা মূল পাঠের ভেতরে হঠাৎ এক নতুন অর্থ উন্মোচন করে যায়।
তাই জন্মদিনে তাঁকে স্মরণ করা মানে কেবল একজন স্টার-অভিনেতাকে শুভেচ্ছা জানানো নয়। স্টার-ইমেজের ভিতরে বেঁচে থাকা সেই এক শিল্পীসত্তাকে— যিনি শিল্পীর দায় এবং দায়িত্বকে এখনো অন্তত বুড়ো আঙুল দেখাননি। এই সময়-অতিরেক ঔদ্ধত্যটুকুর জন্যই তিনি আজও শ্রদ্ধার আসনে থাকলেন৷
জন্মদিনে এক অনুরাগীর অকৃত্রিম শুভ কামনা।

